ঈদের দিনে বিদায় নিলেন ঘাটাইলের একজন আদর্শ শিক্ষক

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল গণ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক সকলের প্রিয় আদর্শ শিক্ষক এ কে এম শামসুজ্জামান স্যার আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

গত শনিবার পবিত্র ঈদুল আযহার দিন দুপুরে তিনি ঢাকার বাসভবনে বাধ্যর্কজনিত কারনে মৃত্যুবরণ করেন।

তিনি ১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ দুই যুগে বিদ্যালয়টিকে একটি সত্যিকারের গুরুসদন হিসাবে গড়ে তোলার মূল কারিগর ছিলেন তিনি।

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী তিন পুত্র ও তিন কন্যা সহ অসংখ্য ছাত্র ও গুনগ্রাহী রেখে গেছেন।

তার প্রথম জানাযা নামাজ শনিবার বিকালে ঢাকায়, দ্বিতীয় জানাযা নামাজ বাদ এশা তার প্রিয় বিদ্যালয় সংলগ্ন ঘাটাইল সদর ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়।

তার তৃতীয় জানাযা নামাজ ২ আগষ্ট রোববার সকাল ১০ টায় টাঙ্গাইলের কেন্দ্রীয় গোরস্থান মাঠে অনুষ্ঠিত হয়।

পরে তাকে টাঙ্গাইলের কেন্দ্রীয় গোরস্থানে দাফন করা হয়।

তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন উপজেলা চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম লেবু, পৌরসভার মেয়র শহিদুজ্জামান খান, ঘাটাইল প্রেসক্লাব, বংশাই সাহিত্য সংসদ. মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন।

সংবাদ মাধ্যম ঘাটাইল ডট কম তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও বিনম্র শ্রদ্ধা জানায়।

(নজরুল ইসলাম, ঘাটাইল ডট কম)/-

ঘাটাইলে অটিস্টিক শিশুদের মাঝে ঈদ উপহার নিয়ে কুয়েট ছাত্রলীগ

আসন্ন ঈদুল আযহা উপলক্ষ্যে টাংগাইলের ঘাটাইল উপজেলার শাহপুর অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে ঈদ উপহার বিতরণ করেছে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ।

আজ বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক আসাদুজ্জামান প্রান্ত স্কুল প্রাঙ্গনে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে এই উপহার সামগ্রী বিতরণ করেন।

উপহার বিতরণ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অত্র বিদ্যালয়ের সভাপতি মোঃ কামরুজ্জামান রানা।

প্রায় শতাধিক অটিস্টিক শিক্ষার্থীদের মাঝে এই উপহার সামগ্রী বিতরন করা হয়। উপহার সামগ্রীর হিসেবে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে পাঁচ কেজি চাল, ডাল, তেল, চিনি, সেমাই, দুধ, সাবান ঈদ উপহার হিসেবে দেওয়া হয়।

ছাত্রলীগ নেতা প্রান্ত বলেন, সমাজের পিছিয়ে পরা শিশুদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পেরে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কুয়েট শাখা অত্যন্ত আনন্দিত। ভবিষ্যতেও আমাদের এই উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।

তিনি বলেন, অটিস্টিক শিশুদের সম্পদে পরিনত করতে হবে। তাদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত কল্পে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ অটিস্টিক শিশুদের পাশে আছে।

প্রতিষ্ঠানের সভাপতি কামরুজ্জামান রানা কুয়েট ছাত্রলীগকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কুয়েট শাখার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আশা করছি ছাত্রলীগের সকল ইউনিটি আমাদের শিশুদের পাশে থাকবে।

এছাড়া সমাজের সকল শ্রেণীর লোকজনকে অটিস্টিক শিশুদের পাশে থাকার আহবান জানান রানা।

উপহার বিতরণ অনুষ্ঠানে গ্রামের সকল শ্রেণীর লোকজন সে সময় উপস্থিত ছিলেন।

(স্টাফ রিপোর্টার, ঘাটাইল ডট কম)/-

৩১ আগস্ট পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চলমান ছুটি আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এই সময়ে দেশের সব রকমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবুল খায়ের আজ বুধবার (২৯ জুলাই) এ তথ্য জানিয়েছেন। করোনাভাইরাস জনিত বৈশ্বিক মহামারির কারণে শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আজ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে ছুটির এই নতুন তারিখ নির্ধারণ করে। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি অনলাইনে মিটিং করে এ সিদ্ধান্ত জানান।

এর আগে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এবার তা ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হলো।

প্রসঙ্গত, করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় এ পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি কয়েক দফা বাড়ানো হয়। গত ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ছুটির সময় শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এমনকি ঘরে বসেই শিক্ষার্থীদের অনলাইনে পাঠদানের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘আমার ঘরে আমার স্কুল’ শিরোনামে সংসদ টেলিভিশনে ক্লাস চলছে এবং ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিও ক্লাস আপলোড করা হচ্ছে। এছাড়া, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ঘরে বসে শিখি’ শিরোনামে সংসদ টেলিভিশনে ভিডিও ক্লাস চলছে। এই নামে একটি ওয়েব পোর্টালও ডেভেলপ করা হচ্ছে।

দীর্ঘ ছুটির কারণে সাধারণ এলাকার পাশাপাশি পাহাড়ি , চরাঞ্চল ও হাওরসহ দুর্গম এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের আওতায় আনারও চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি কমিউনিটি রেডিও’র মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রমের আওতায় আনার চিন্তাভাবনা হচ্ছে। তবে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি কমিয়ে এবং ক্লাস বাড়িয়ে ক্ষতিপূরণ করার কথা ভাবছে সরকার।

(বাংলা নিউজ, ঘাটাইল ডট কম)/-

নবজাগরণের পথিকৃৎ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রয়াণ দিবস আজ

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রয়াণ দিবস আজ । ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ১৮২০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ সেপ্টেম্বর বর্তমান পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বীরসিংহ সেই সময় অধুনা পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ঈশ্বরচন্দ্রের পিতামহ রামজয় তর্কভূষণ ছিলেন সুপণ্ডিত ও বলিষ্ঠ দৃঢ়চেতা পুরুষ। ইনিই ঈশ্বরচন্দ্রের নামকরণ করেছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্রের পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতায় চাকরি করতেন। পরিবার নিয়ে শহরে বাস করা তার সাধ্যের অতীত ছিল। সেই কারণে বালক ঈশ্বরচন্দ্র গ্রামেই মা ভগবতী দেবী ও ঠাকুমার সঙ্গে বাস করতেন। তার আসল নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উনবিংশ শতকের একজন বিশিষ্ট বাঙালি শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও গদ্যকার। তার প্রকৃত নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য প্রথম জীবনেই তিনি বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেন। সংস্কৃত ছাড়াও বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় বিশেষ বুৎপত্তি ছিল তার। তিনিই প্রথম বাংলা লিপি সংস্কার করে তাকে যুক্তিবহ ও অপরবোধ্য করে তোলেন। বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক রূপকার তিনিই। তাকে বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী বলে অভিহিত করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

তিনি রচনা করেছেন জনপ্রিয় শিশুপাঠ্য বর্ণপরিচয় সহ, একাধিক পাঠ্যপুস্তক, সংস্কৃত ব্যাকরণ গ্রন্থ। সংস্কৃত, হিন্দি ও ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞান সংক্রান্ত বহু রচনা।

অন্যদিকে বিদ্যাসাগর মহাশয় ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারকও। বিধবা বিবাহ ও স্ত্রীশিক্ষার প্রচলন, বহুবিবাহ ও বাল্য বিবাহের মতো সামাজিক অভিশাপ দূরীকরণে তার অক্লান্ত সংগ্রাম আজও স্মরিত হয় যথোচিত শ্রদ্ধার সঙ্গে। বাংলার নবজাগরণের এই পুরোধা ব্যক্তিত্ব দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘দয়ার সাগর’ নামে। দরিদ্র, আর্ত ও পীড়িত কখনই তার দ্বার থেকে শূন্য হাতে ফিরে যেত না। এমনকি নিজের চরম অর্থসংকটের সময়ও তিনি ঋণ নিয়ে পরোপকার করেছেন। তার পিতামাতার প্রতি তার ঐকান্তিক ভক্তি ও বজ্রকঠিন চরিত্রবল বাংলায় প্রবাদপ্রতিম। মাইকেল মধুসূদন দত্ত তার মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন প্রাচীন ঋষির প্রজ্ঞা, ইংরেজের কর্মশক্তি ও বাঙালি মায়ের হৃদয়বৃত্তি।

বাঙালি সমাজে বিদ্যাসাগর মহাশয় আজও এক প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুরে তার স্মৃতিরক্ষায় স্থাপিত হয়েছে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়। রাজধানী কলকাতার আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বিদ্যাসাগর সেতু তারই নামে উৎসর্গিত।

শিক্ষাজীবন

চার বছর নয় মাস বয়সে ঠাকুরদাস বালক ঈশ্বরচন্দ্রকে গ্রামের সনাতন বিশ্বাসের পাঠশালায় ভর্তি করে দেন। কিন্তু সনাতন বিশ্বাস বিদ্যাদানের চেয়ে শাস্তিদানেই অধিক আনন্দ পেতেন। সেই কারণে রামজয় তর্কভূষণের উদ্যোগে পার্শ্ববর্তী গ্রামের কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায় নামে এক উৎসাহী যুবক বীরসিংহ গ্রামে একটি নতুন পাঠশালা স্থাপন করেন।

আট বছর বয়সে এই পাঠশালায় ভর্তি হন ঈশ্বরচন্দ্র। তার চোখে কালীকান্ত ছিলেন আদর্শ শিক্ষক। কালীকান্তের পাঠশালায় তিনি সেকালের প্রচলিত বাংলা শিক্ষা লাভ করেছিলেন।

১৮২৮ সালের নভেম্বর মাসে পাঠশালার শিক্ষা সমাপ্ত করে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য পিতার সঙ্গে কলকাতায় আসেন। তাদের সঙ্গে কলকাতায় এসেছিলেন কালীকান্ত ও চাকর আনন্দরাম গুটিও। কথিত আছে, পদব্রজে মেদিনীপুর থেকে কলকাতায় আসার সময় পথের ধারে মাইলফলকে ইংরেজি সংখ্যাগুলি দেখে তিনি সেগুলি অল্প আয়াসেই আয়ত্ত করেছিলেন।

কলকাতার বড়বাজার অঞ্চলের বিখ্যাত সিংহ পরিবারে তারা আশ্রয় নেন। এই পরিবারের কর্তা তখন জগদ্দুর্লভ সিংহ। ১৮২৯ সালের ১ জুন সোমবার কলকাতা গভর্নমেন্ট সংস্কৃত কলেজে (যা বর্তমানে  সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুল নামে পরিচিত) ব্যাকরণের তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন তিনি।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই সংস্কৃত কলেজের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৮২৪ সালে; অর্থাৎ, ঈশ্বরচন্দ্রের এই কলেজে ভর্তি হওয়ার মাত্র পাঁচ বছর আগে। তার বয়স তখন নয় বছর। এই কলেজে তার সহপাঠী ছিলেন মদনমোহন তর্কালঙ্কার। বিদ্যাসাগরের আত্মকথা থেকে জানা যায় মোট সাড়ে তিন বছর তিনি ওই শ্রেণীতে অধ্যয়ন করেন।

ব্যাকরণ পড়ার সময় ১৮৩০ সালে সংস্কৃত কলেজের ইংরেজি শ্রেণীতেও ভর্তি হন ঈশ্বরচন্দ্র। ১৮৩১ সালের মার্চ মাসে বার্ষিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের জন্য মাসিক পাঁচ টাকা হারে বৃত্তি এবং ‘আউট স্টুডেন্ট’ হিসেবে একটি ব্যাকরণ গ্রন্থ ও আট টাকা পারিতোষিক পান। সংস্কৃত কলেজে মাসিক বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্রদের ‘পে স্টুডেন্ট’ ও অন্য ছাত্রদের ‘আউট স্টুডেন্ট’ বলা হত।

অন্যদিকে তিন বছর ব্যাকরণ শ্রেণীতে পঠনপাঠনের পর বারো বছর বয়সে প্রবেশ করেন কাব্য শ্রেণীতে। সে যুগে এই শ্রেণীর শিক্ষক ছিলেন বিশিষ্ট পণ্ডিত জয়গোপাল তর্কালঙ্কার।

১৮৩৩ সালে ‘পে স্টুডেন্ট’ হিসেবেও ঈশ্বরচন্দ্র ২ টাকা পেয়েছিলেন। ১৮৩৪ সালে ইংরেজি ষষ্ঠশ্রেণীর ছাত্র ঈশ্বরচন্দ্র বার্ষিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের জন্য ৫ টাকা মূল্যের পুস্তক পারিতোষিক হিসেবে পান। এই বছরই ক্ষীরপাই নিবাসী শত্রুঘ্ন ভট্টাচার্যের কন্যা দীনময়ী দেবীর সঙ্গে তার বিবাহ হয়।

১৮৩৫ সালে ইংরেজি পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র রূপে পলিটিক্যাল রিডার নং ৩ইংলিশ রিডার নং ২ পারিতোষিক পান। এই বছরই নভেম্বর মাসে সংস্কৃত কলেজ থেকে ইংরেজি শ্রেণী উঠিয়ে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় বর্ষে সাহিত্য পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে পনেরো বছর বয়সে প্রবেশ করেন অলংকার শ্রেণীতে। অলংকার শাস্ত্র একটি অত্যন্ত কঠিন বিষয়। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই তিনি সাহিত্য দর্পণ, কাব্যপ্রকাশরসগঙ্গাধর প্রভৃতি অলংকার গ্রন্থে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন।

১৮৩৬ সালে অলংকার পাঠ শেষ করেন। বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে রঘুবংশম্, সাহিত্য দর্পণ, কাব্যপ্রকাশ, রত্নাবলী, মালতী মাধব, উত্তর রামচরিত, মুদ্রারাক্ষস, বিক্রমোর্বশী ও মৃচ্ছকটিক গ্রন্থ পারিতোষিক পান।

১৮৩৭ সালের মে মাসে তার ও মদনমোহনের মাসিক বৃত্তি বেড়ে হয় আট টাকা। এই বছরই ঈশ্বরচন্দ্র স্মৃতি শ্রেণীতে ভর্তি হন (এই অংশের সমতুল্য আজকের সংস্কৃত কলেজ-র পঠন)। সেই যুগে স্মৃতি পড়তে হলে আগে বেদান্ত ও ন্যায়দর্শন পড়তে হত। কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্রের মেধায় সন্তুষ্ট কর্তৃপক্ষ তাকে সরাসরি স্মৃতি শ্রেণীতে ভর্তি নেন। এই পরীক্ষাতেও তিনি অসামান্য কৃতিত্বের সাক্ষর রাখেন এবং হিন্দু ল কমিটির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

ত্রিপুরায় জেলা জজ পণ্ডিতের পদ পেয়েও পিতার অনুরোধে তা প্রত্যাখ্যান করে ভর্তি হন বেদান্ত শ্রেণীতে। শম্ভুচন্দ্র বাচস্পতি সেই সময় বেদান্তের অধ্যাপক। ১৮৩৮ সালে সমাপ্ত করেন বেদান্ত পাঠ। এই পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং মনুসংহিতা, প্রবোধ চন্দ্রোদয়, অষ্টবিংশতত্ত্ব, দত্তক চন্দ্রিকা ও দত্তক মীমাংসা গ্রন্থ পারিতোষিক পান। সংস্কৃতে শ্রেষ্ঠ গদ্য রচনার জন্য ১০০ টাকা পুরস্কারও পেয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র। ১৮৪০-৪১ সালে ন্যায় শ্রেণীতে পঠনপাঠন করেন ঈশ্বরচন্দ্র। এই শ্রেণীতে দ্বিতীয় বার্ষিক পরীক্ষায় একাধিক বিষয়ে তিনি পারিতোষিক পান। ন্যায় পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে ১০০ টাকা, পদ্য রচনার জন্য ১০০ টাকা, দেবনাগরী হস্তাক্ষরের জন্য ৮ টাকা ও বাংলায় কোম্পানির রেগুলেশন বিষয়ক পরীক্ষায় ২৫ টাকা – সর্বসাকুল্যে ২৩৩ টাকা পারিতোষিক পেয়েছিলেন। বিদ্যাসাগর ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা নামে স্বাাক্ষর করতেন৷

বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ

জন্ম গ্রহণ কালে তার পিতামহ তার বংশানু্যায়ী নাম রেখেছিলেন “ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়”। ১৮৩৯ সালের ২২ এপ্রিল হিন্দু ল কমিটির পরীক্ষা দেন ঈশ্বরচন্দ্র। এই পরীক্ষাতেও যথারীতি কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ১৬ মে ল কমিটির কাছ থেকে যে প্রশংসাপত্রটি পান, তাতেই প্রথম তার নামের সঙ্গে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিটি ব্যবহৃত হয়। এই প্রশংসাপত্রটি ছিল নিম্নরূপ :

HINDOO LAW COMMITTEE OF EXAMINATION
We hereby certify that at an Examination held at the Presidency of Fort William on the 22nd Twenty-second April 1839 by the Committee appointed under the provisions of Regulation XI 1826 Issur Chandra Vidyasagar was found and declared to be qualified by his eminent knowledge of the Hindoo Law to hold the office of Hindoo Law officer in any of the Established Courts of Judicature.
H.T. Prinsep
President
J.W.J. Ousely
Member of the Committee of Examination

This Certificate has been granted to the said Issur Chandra Vidyasagar under the seal of the committee. This 16th Sixteenth day of May in the year 1839 Corresponding with the 3rd Third Joistha 1761 Shukavda.
J.C.C. Sutherland

Secy To the Committee (পুরনো বানান অপরিবর্তিত)

সংস্কৃত কলেজে বারো বছর পাঁচ মাস অধ্যয়নের পর তিনি এই কলেজ থেকে অপর একটি প্রশংসাপত্র লাভ করেন। ১৮৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রাপ্ত দেবনাগরী হরফে লিখিত এই সংস্কৃত প্রশংসাপত্রে কলেজের অধ্যাপকগণ ঈশ্বরচন্দ্রকে ‘বিদ্যাসাগর’ নামে অভিহিত করেন।

বিধবা বিবাহ আইন

সংস্কৃত শাস্ত্রের বিরাট পণ্ডিত হয়েও পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতি গ্রহণে দ্বিধা করেননি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। নারীমুক্তি আন্দোলনের প্রবল সমর্থক ছিলেন তিনি।

হিন্দু বিধবাদের অসহনীয় দুঃখ, তাদের প্রতি পরিবারবর্গের অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল তাকে। এই বিধবাদের মুক্তির জন্য তিনি আজীবন সর্বস্ব পণ করে সংগ্রাম করেছেন।

হিন্দুশাস্ত্র উদ্ধৃত করে প্রমাণ করেছেন, যে লোকাচার ধর্মের নামে সমাজে প্রচলিত, আসলে তা ধর্মবহির্ভূত স্থবিরতার আচারমাত্র। তার আন্দোলন সফল হয়েছিল।

১৮৫৬ সালে সরকার বিধবা বিবাহ আইনসিদ্ধ ঘোষণা করেন। তবে শুধু আইন প্রণয়নেই ক্ষান্ত থাকেননি বিদ্যাসাগর মহাশয়। তার উদ্যোগে একাধিক বিধবা বিবাহের অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। তার পুত্রও( নারায়ণচন্দ্র) এক ভাগ্যহীনা বিধবাকে বিবাহ করেন। এজন্য সেযুগের রক্ষণশীল সমাজ ও সমাজপতিদের কঠোর বিদ্রুপ ও অপমানও সহ্য করতে হয় তাকে।

বিধবা বিবাহ প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বহুবিবাহের মতো একটি কুপ্রথাকে নির্মূল করতেও আজীবন সংগ্রাম করেন বিদ্যাসাগর মহাশয়। প্রচার করেন বাল্যবিবাহ রোধের সপক্ষেও। এর সঙ্গে সঙ্গে নারীশিক্ষার প্রচারেও যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।

শুধু কলকাতায় নয়, নারীমুক্তির বার্তা বাংলার গ্রামে গ্রামে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে, বিভিন্ন জেলাতেও বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করে নারীশিক্ষার সপক্ষে জোর প্রচার চালান তিনি। যদিও তার এই উদ্যোগও সমাজের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিত্ব দ্বারা নিন্দিত হয়। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত পর্যন্ত অত্যন্ত হীন বাক্যবাণে নারীমুক্তি আন্দোলনের ব্যঙ্গ করেন।

তবু তার জীবদ্দশাতেই নারীশিক্ষা আন্দোলন ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।

শেষ জীবন

১৮৭৫ সালের ৩১ মে নিজের উইল প্রস্তুত করেন বিদ্যাসাগর মহাশয়। পরের বছর ২৬ ফেব্রুয়ারি হিন্দু ফ্যামিলি অ্যানুয়িটি ফান্ডের ট্রাস্টি পদ থেকে ইস্তফা দেন। এপ্রিল মাসে কাশীতে পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়। এই সময় কলকাতার বাদুড়বাগানে বসতবাড়ি নির্মাণ করেন। বর্তমানে এই বাড়ি সংলগ্ন রাস্তাটি বিদ্যাসাগর স্ট্রিট ও সমগ্র বিধানসভা কেন্দ্রটি বিদ্যাসাগর নামে পরিচিত। ১-২ আগস্ট আদালতে উপস্থিত থেকে চকদিঘির জমিদার সারদাপ্রসাদ রায়ের উইল মামলায় উইল প্রকৃত নয় বলে জমিদার পত্নী রাজেশ্বরী দেবীর স্বপক্ষে সাক্ষী দেন।

১৮৭৭ সালের জানুয়ারি থেকে বাদুড়বাগানে বাস করতে থাকেন বিদ্যাসাগর মহাশয়। এ বছর বাংলার গভর্নর কতৃক সন্মাননা লিপি প্রদান করা হয় তাকে। এপ্রিল মাসে গোপাললাল ঠাকুরের বাড়িতে উচ্চবিত্ত ঘরের ছেলেদের পড়াশোনার জন্য বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ছাত্রদের বেতন হয় মাসিক ৫০ টাকা। ১৮৭৯ সালে মেট্রোপলিটান কলেজ [কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়] কর্তৃক দ্বিতীয় থেকে প্রথম শ্রেণীর কলেজে উন্নীত হয়।

১৮৮০ সালের ১ জানুয়ারি বিদ্যাসাগর মহাশয় সিআইই উপাধি পান। ১৮৮১ সালে মেট্রোপলিটান কলেজ থেকে প্রথম বিএ পরীক্ষার্থী পাঠানো হয়।

১৮৮২ সালের ৫ আগস্ট রামকৃষ্ণ পরমহংস তার বাদুড়বাগানের বাড়িতে আসেন। দুজনের মধ্যে ঐতিহাসিক এক আলাপ ঘটে। এই বছর মেট্রোপলিটান কলেজে চালু হয় আইন পাঠ্যক্রম। ১৮৮৩ সালে বিদ্যাসাগর মহাশয় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো নির্বাচিত হন। মার্চে বাণভট্টের হর্ষচরিতম্ তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়।

১৮৮৪ সালের নভেম্বরে ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’ ছদ্মনামে ব্রজবিলাস গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এছাড়াও প্রকাশিত হয় ‘কস্যচিৎ তত্ত্বান্বেষিণঃ’ ছদ্মনামে বিধবা বিবাহ ও যশোহর হিন্দুধর্মরক্ষিণীসভা পুস্তক। দ্বিতীয় সংস্করণে তিনি এর নামকরণ করেন বিনয় পত্রিকা। এই নভেম্বরেই কানপুরে বেড়াতে যান এবং সেখানে দিনকতক থাকেন।

১৮৮৫ সালে মেট্রোপলিটান কলেজের বউবাজার শাখা স্থাপিত হয়। ১৮৮৬ সালের অগস্টে ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোসহচরস্য’ ছদ্মনামে রত্নপরীক্ষা পুস্তক প্রকাশ করেন।

১৮৮৭ সালের জানুয়ারিতে শঙ্কর ঘোষ লেনের নতুন ভবনে মেট্রোপলিটান কলেজ স্থানান্তরিত হয়। ১৮৮৮ সালের এপ্রিলে নিষ্কৃতিলাভ প্রয়াস, জুনে আখ্যান মঞ্জরী (দ্বিতীয় ভাগ), জুলাইতে পদ্যসংগ্রহ নামক সংকলন গ্রন্থের প্রথম ভাগ প্রকাশ করেন। ১৩ আগস্ট পত্নী দীনময়ী দেবীর মৃত্যু হয়।

১৮৮৯ সালের নভেম্বরে প্রকাশ করেন সংস্কৃত রচনা। ১৮৯০ সালের ১৪ এপ্রিল বীরসিংহ গ্রামে মায়ের নামে স্থাপন করেন ভগবতী বিদ্যালয়। মে মাসে নির্বাচিত উদ্ভট শ্লোকসংগ্রহ শ্লোকমঞ্জরী প্রকাশিত হয়।

বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রয়াত হন ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই, বাংলা ১২৯৮ সনের ১৩ শ্রাবণ, রাত্রি দুটো আঠারো মিনিটে তার কলকাতার বাদুড়বাগানস্থ বাসভবনে।

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর ১০ মাস ৪ দিন। মৃত্যুর কারণ, ডাক্তারের মতে, লিভারের ক্যানসার।

মৃত্যুর পর ১৮৯১ সালের সেপ্টেম্বরে তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী বিদ্যাসাগর চরিত প্রকাশ করেন পুত্র নারায়ণচন্দ্র বিদ্যারত্ন। ১৮৯২ সালের এপ্রিলে ৪০৮টি শ্লোকবিশিষ্ট ভূগোল খগোল বর্ণনম্ গ্রন্থটিও প্রকাশিত হয়। পশ্চিম ভারতের এক সিভিলিয়ন জন লিয়রের প্রস্তাবে বিদ্যাসাগর পুরাণ, সূর্যসিদ্ধান্ত ও ইউরোপীয় মত অনুসারে এই ভূগোল গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন। বিবিসি জরিপকৃত(২০০৪) সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় তার স্থান নবম।

(উইকিপিডিয়া, ঘাটাইল ডট কম)/-

বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর আহমদ ছফার ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, প্রখ্যাত লেখক, সাহিত্যিক ও সংগঠক আহমদ ছফার ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ মঙ্গলবার। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী কীর্তিমান এ লেখক ২০০১ সালের ২৮ জুলাই অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যুবরণ করেন।

সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন আহমদ ছফা। গল্প, গান, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, ইতিহাস, ভ্রমণকাহিনী মিলিয়ে রচনা করেছেন ৩০টির বেশি বই। এ ছাড়া আমৃত্যু তিনি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় কলাম লিখেছেন।ষাটের দশকে সাহিত্য জগতে পা রাখেন আহমদ ছফা। সমসাময়িক উপন্যাস লেখকদের মধ্যে তিনি ছিলেন একেবারেই আলাদা। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয় আহমদ ছফার প্রথম উপন্যাস ‘সূর্য তুমি সাথী’। বক্তব্যের স্পষ্টতা আর তীব্রতার জন্য খুব দ্রুত পাঠকদের মধ্যে সাড়া ফেলেন তিনি। তার লেখা প্রবন্ধমূলক গ্রন্থগুলো সর্বাধিক আলোচিত। তার প্রবন্ধ গ্রন্থের মধ্যে জাগ্রত বাংলাদেশ, বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস, বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা, শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য প্রবন্ধ, বাঙালি জাতি এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য।

প্রতিষ্ঠানবিরোধী আহমদ ছফা ‘লেখক শিবির পুরস্কার’ এবং বাংলা একাডেমি প্রণীত ‘সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার’ প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৮০ সালে ‘ইতিহাস পরিষদ পুরস্কার’ ও ২০০২ সালে ‘মরণোত্তর একুশে পদক’-এ ভূষিত হন তিনি।

আহমদ ছফা ছিলেন একাধারে গল্পকার, ঔপন্যাসিক, কবি ও পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তিক নানান কর্মকান্ডের মাধ্যমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বাংলাদেশের জাতিসত্তার পরিচয়, সামাজিকতা, রাজনৈতিকতা তার লেখায় বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে। অনন্য বয়ানভঙ্গি ও সহজাত রসবোধে ছফার সাহিত্য ভাস্বর। নানা সময়ে, নানা প্রেক্ষিতে ছফা প্রাসঙ্গিক নানা চমকপ্রদ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কথা লিখেছেন যা উদ্ধৃতিযোগ্য।

“একটা মানুষের মধ্যেই গোঁজামিল থাকে। কিন্তু যে সাপ সে হান্ড্রেড পারসেন্ট সাপ। যে শেয়াল সে হান্ড্রেড পার্সেন্ট শেয়াল। মানুষ সাপও হইতে পারে, শেয়ালও হইতে পারে, পাখিও হইতে পারে। মানুষেরই বিভিন্ন চরিত্র নেয়ার ক্ষমতা আছে। বুঝছো, গ্রাম দেশে আগে সাপ আর শেয়াল পাওয়া যাইতো। এগুলা নাই এখন। কারণ সাপ, শেয়াল এরা মানুষ হিসাবে জন্মাইতে আরম্ভ করছে”।

নাসির আলী মামুনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ঠিক এই কথাগুলোই বলেন আহমদ ছফা।

সাবলীল ভাষায় লেখা এই সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয় ‘আহমদ ছফার সময়’ বইটিতে। খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল বইটি। কারণ বইয়ের মানুষটি যে ছিলেন সবার চোখের মণি।

সারাজীবন নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষের না বলা কথাগুলো বলে যাওয়া এই মানুষটি আজও মিশে আছেন তরুণ সমাজের প্রেরণায়, চেতনায়।

বাংলাদেশের সাহিত্য ইতিহাসের অন্যতম প্রতিবাদী এবং প্রগতিশীল লেখক আহমদ ছফা। ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। নিজের পরিবার সম্পর্কে বলেন,

“আমার পরিবার চাষা। আমার পক্ষে এটা ওভারলুক করা কষ্টকর, রঙ চড়িয়ে কিছু বলতে চাই না। আমার পূর্বপুরুষেরা সরাসরি কৃষি উৎপাদনের সাথে যুক্ত ছিল। এই পরিচয় আমার অহংকার”।  

সাদামাটা এই মানুষটি তাই সহজেই ছুঁয়ে গেছেন সবার হৃদয়। তার পিতার নাম হেদায়েত আলী ওরফে ধন মিয়া, মার নাম আসিয়া খাতুন। দুই ভাই চার বোনের মধ্যে আহমদ ছফা ছিলেন দ্বিতীয়।

বাবার হাতে গড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ গাছবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়ায় হাতেখড়ি হয় ছফার। ১৯৬০ সালে নিজের গ্রামের নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন তিনি। ১৯৬২ সালে চট্টগ্রাম নাজিরহাট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে সে বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন তিনি। যদিও সেখানে খুব বেশি দিন ক্লাস করেননি ছফা। খুব সম্ভবত ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে এমএ পরীক্ষা দেয়ার আগেই বাংলা একাডেমির পিএইচডি গবেষণা বৃত্তির জন্য আবেদন করেন এবং তিন বছরের ফেলোশিপ প্রোগ্রামের জন্য মনোনীত হন। গবেষণার বিষয় ছিল ‘১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব, বিকাশ এবং বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তার প্রভাব’।  ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন ছফা। পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করা আর সম্ভব হয়নি তার।

সৃষ্টিশীল এই লেখক শুরু থেকেই ছিলেন প্রথাবিরোধী। পড়াশোনা চলাকালীন অবস্থায় সুধাংশু বিমল দত্তের মাধ্যমে কৃষক সমিতি ন্যাপ বা তৎকালীন জনপ্রিয় গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। মাস্টারদা সূর্যসেনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করে আহমদ ছফাকে। কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন উপড়ে ফেলেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি গ্রেপ্তার এড়াতে এবং পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছুদিন আত্মগোপন করেন। এরপর ১৯৮৬ সালের দিকে এসে জার্মান ভাষার উপর গ্যেটে ইন্সটিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। গ্যেটের অমর সাহিত্য ‘ফাউস্ট’ অনুবাদের ক্ষেত্রে এটিই ছিল প্রথম সোপান।

ষাটের দশকে সাহিত্য জগতে পা রাখেন আহমদ ছফা। সমসাময়িক উপন্যাস লেখকগণের মধ্যে তিনি ছিলেন একেবারেই আলাদা। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয় আহমদ ছফার প্রথম উপন্যাস ‘সূর্য তুমি সাথী’। বক্তব্যের স্পষ্টতা আর তীব্রতার জন্য খুব দ্রুত পাঠকদের মাঝে সাড়া ফেলে দেন তিনি।

১৯৭১ সালের জুলাই মাসে স্বাধীনতার পথে হাঁটতে থাকা বাংলাদেশের প্রথম গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয় ছফার প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’। পরবর্তীতে বাংলা একাডেমি থেকে সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন তিনি। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, গান, প্রবন্ধ, অনুবাদ, ইতিহাস, ভ্রমণ কাহিনী সব মিলিয়ে ত্রিশটিরও বেশি গ্রন্থের প্রণেতা আহমদ ছফা। তার লেখাগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় নজরে পড়বে। প্রায় প্রতিটি লেখাই সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সমসাময়িক পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে।

বেশ কিছু পত্রিকার সাহিত্য পাতার সম্পাদক ছিলেন আহমদ ছফা। অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক গণকন্ঠ’ এর সম্পাদকীয় উপদেষ্টা এবং ‘সাপ্তাহিক উত্তরণ’ এর প্রধান সম্পাদক ছিলেন তিনি। স্পষ্টভাষী ছফা সত্যের প্রচারে সদা সচেষ্ট ছিলেন। তিনি খুব ধার্মিক ছিলেন এমন প্রমাণ পাওয়া না গেলেও ধর্মের প্রতি তার বিশ্বাস ছিল প্রশ্নাতীত।

১৯৭০ সালে আহমেদ শরীফের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’, তিনি ছিলেন সংগঠনটির প্রথম সভাপতি। তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল প্রগতিশীল লেখকদের আন্দোলনকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। ব্যক্তিত্বের ছটায় তরুণ প্রজন্মের কাছে খুব সহজেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন আহমদ ছফা। তবে কখনোই সস্তা খ্যাতির মুখাপেক্ষী ছিলেন না তিনি।

ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাবিদ হিসেবে আলাদা কদর ছিল তার। কাব্যিক ভঙ্গিমায় স্থানীয় ভাষায় ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি ফুটিয়ে তুলতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। গ্যোতের লেখার পাশাপাশি বার্ট্রান্ড রাসেলের অ্যাগনোস্টিক বা ঈশ্বরে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝামাঝি অবস্থা নিয়ে বেশ কিছু লেখাও অনুবাদ করেন তিনি। তবে প্রাবন্ধিক হিসেবেই আহমদ ছফার পরিচিতি সবচেয়ে বেশি।

বাংলার নামকরা চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন আহমদ ছফা। দুজনেই ছিলেন বোহেমিয়ান বা ভবঘুরে, অবিবাহিত এবং খ্যাতি, ধন-সম্পদ বা অন্যান্য বৈষয়িক মোহ বিবর্জিত। ১০০ বছরেও এমন ব্যক্তিত্ব আর দুটি খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আহমদ ছফা নিজেই।

“আমি মনে করি আমার স্বীকৃতি নিয়ে পশ্চিম বাংলা কী বলতে চায় সেটা আমার লুক আউট নয়। আমি পৃথিবীর গন্ধ এবং স্বাদ বুঝি। তুমি দেখবা আমি যখন আমেরিকায় যাবো তখন ওখানেও ঝড় তুলবো। তখন ওখানকার পন্ডিতদের সাথে দেখবে আমি কিভাবে মিশে গেছি। সুলতানের বিশালত্ব চিন্তা করো, ৭৬-এর আগে এই জায়ান্ট কোথায় ছিলো? কেউ তাকে আবিস্কার করলো না কেন? এই আমি যাকে প্রেজেন্ট করেছি, আরেকজন লোক আসুক তো এমন।

‘আহমদ ছফার সময়’ বইটিতে এমনটাই বলেছিলেন তিনি। তার চোখে সুলতানও ছিলেন একজন দার্শনিক। বাংলার মাটির প্রতীক তিনি, বাংলার মাটির যোগ্য সন্তান তিনি। আমাদের চারপাশে ঘিরে থাকা খুঁটিনাটি সমস্যাগুলোই ছিল তার শিল্পের খোরাক। শিল্প-সংস্কৃতির জগতে তাকে সাহায্য করতে কেউ এগিয়ে আসেনি।

আহমদ ছফা মনে করতেন এই বাংলায় সুলতানকে আরও বেশি দরকার। জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসানরাও বড় শিল্পী, ভদ্রলোক। তবে খেটে খাওয়া মানুষের কাছে শিল্পের জায়গা করে দিতে হলে সুলতানদের কোনো বিকল্প নেই বলেই তিনি বিশ্বাস করতেন।

সাধারণত ছোট ভলিউমে বই বের করতেন আহমদ ছফা। এই ছোট বইগুলোই চট করে পাঠকদের মনে জায়গা করে নিতো, কেননা তাতে থাকতো গণমানুষের কষ্টের প্রতিফলন, তাদের জীবনের দুর্দশার চালচিত্র। ‘সূর্য তুমি সাথী’ (১৯৬৭), ‘উদ্ধার’ (১৯৭৫), ‘একজন আলী কেনানের উত্থান পতন’ (১৯৮৯), ‘অলাতচক্র’ (১৯৯০), ‘ওঙ্কার’ (১৯৯৩), ‘গাভীবিত্তান্ত’ (১৯৯৪), ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’ (১৯৯৬), ‘পুষ্পবৃক্ষ ও বিহঙ্গপুরাণ’ (১৯৯৬) আহমদ ছফার উপন্যাস এবং ‘নিহত নক্ষত্র’ (১৯৬৯) তাঁর গল্পগ্রন্থ। কবিতার ক্ষেত্রেও সমুজ্জ্বল আহমদ ছফা। ‘জল্লাদ সময়’, ‘একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা’, ‘লেনিন ঘুমোবে এবার’ ইত্যাদি একাধিক কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা তিনি।

অনুভূতির প্রত্যক্ষ প্রকাশ, লোকজ ভাষার ব্যবহার, পুঁথিপুরাণের শব্দ প্রয়োগ ও বাক্যরীতির সঠিক চয়নে তার কবিতাগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আহমদ ছফার অন্যতম জনপ্রিয় একটি বই ‘যদ্যপি আমার গুরু’।

১৯৭০ সালে গবেষণার কাজ করতে গিয়ে জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সান্নিধ্যে আসেন তিনি। তাদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্কের ভিত্তিতে দেশবরেণ্য এই বুদ্ধিজীবীকে নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বই লেখেন ছফা। রাজ্জাক ছিলেন চিন্তাবিদ, দার্শনিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তৎকালীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু তুলে ধরেন আহমদ ছফা। নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের লেখায় আহমদ ছফার প্রভাব রয়েছে।

ছফার ‘সূর্য তুমি সাথী’ বইটি হাতে পাওয়ার পর পাঠকরা মুগ্ধ হয়ে ভাবে, বহুদিন পর তারা এমন একজন লেখক খুঁজে পেয়েছেন যে তাদের মনের কথাগুলো ছাপার হরফে তুলে ধরতে জানে। ছফা কেবলমাত্র তা-ই লিখতেন যা তিনি নিজে বিশ্বাস করতেন। ভান ধরা বা কোনো কিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি করা তিনি একদম পছন্দ করতেন না। আমাদের দেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য লিখতেন তিনি, তাদের প্রতিনিধিত্ব করেই লিখতেন তিনি। লেখালেখি ছিল তার নেশা।

ছফার গভীর চিন্তাশীলতার প্রতিফলন ঘটেছে তার দুটি উল্লেখযোগ্য রচনা ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ (১৯৭৩) ও ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ (১৯৭৬) গ্রন্থে। এ দুটি বিশেষ চিন্তামূলক রচনাসহ দেশ, সমাজ ও রাজনীতিবিষয়ক নিবন্ধাবলি ছফাকে বাংলাদেশের  বুদ্ধিজীবী লেখকের মর্যাদাপূর্ণ আসন দিয়েছে। এতকিছু সত্ত্বেও আরাম-আয়েশের জীবন তাকে কখনোই টানতে পারেনি। খুব সাধারণ আর চাকচিক্যহীনভাবে দিন কাটাতেন ছফা। দীর্ঘকাল যাবত তিনি একটি মাত্র ঘরে থাকতেন যার মধ্যে আসবাব বলতে ছিল শুধু একটি খাট, চেয়ার, টেবিল আর বইয়ের তাক।

‘লেখক শিবির পুরস্কার’ এবং বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রণীত ‘সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার’ প্রত্যাখ্যান করেন ছফা। ১৯৮০ সালে ‘ইতিহাস পরিষদ পুরস্কার’ এবং ২০০২ সালে ‘মরণোত্তর একুশে পদক’ এ ভূষিত হন আহমদ ছফা। তার বেশ কিছু বই বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। ২০০১ সালের ২৮ জুলাই অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে নেয়ার পথে মৃত্যুবরণ করেন ৫৮ বছর বয়সী ছফা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে জানাজা শেষে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে দাফন করা হয় বাংলার কালজয়ী এই সাহিত্যিককে।

তার সাহিত্যকর্মের দ্বারা বিশেষত তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। এই একটি লেখায় তার পুরো জীবনী তুলে ধরা প্রায় অসম্ভব। আহমদ ছফার মতো প্রতিভাবানদের জীবনী নিয়েই লেখা যায় যুগ পাল্টে দেয়ার মতো শক্তিশালী সব সাহিত্য।

(স্টাফ রিপোর্টার, ঘাটাইল ডট কম)/-

মধুপুরে গারোদের বন্ধু ফাদার হোমরিক যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় মারা গেছেন

টাঙ্গাইলের মধুপুর বনের গারো জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বন্ধু, মুক্তিযোদ্ধা ফাদার ইউজিন হোমরিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরলোকগমন করেছেন।

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাংলাদেশ সময় আজ রোববার সকাল আটটায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

দীর্ঘ ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি টাঙ্গাইলের মধুপুর বনে কাটান।

ফাদার হোমরিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন মধুপুরের জলছত্র ধর্মপল্লীর পাল পুরোহিত ফাদার ডনেল স্টিফেন ক্রুশ।

ফাদার হোমরিকের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে মধুপুরের গারোদের মাঝে।

ক্যাথলিক ধর্মযাজক ফাদার হোমরিক ১৯২৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মিশিগানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া করেছেন মিশিগানের নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেরিনল কলেজে।

ফাদার হোমরিক ১৯৬০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মধুপুর গড়ে থেকে ধর্ম প্রচার করেন। পাশাপাশি এই এলাকার বনবাসী গারোদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তার এবং স্বাস্থ্যসেবায় ব্যাপক কাজ করেছেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জলছত্র ধর্মপল্লীতে তিনি মুক্তিকামী অনেক মানুষকে আশ্রয় দিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবাসহ নানাভাবে সহায়তা করেছেন। এজন্য তাকে মুক্তিযোদ্ধার সনদ দেয় বাংলাদেশ সরকার।

৫৬ বছর মধুপুরে কাটানোর পর ২০১৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। সেখানে তিনি মিশিগানে অবস্থান করছিলেন।

মধুপুরের জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক বলেন, ‘মধুপুরের আদিবাসীদের উন্নয়নে ফাদার হোমরিক অনেক অবদান রেখেছেন। তাঁকে এ অঞ্চলের আদিবাসীরা চিরদিন মনে রাখবে।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোক প্রকাশ করছেন অনেকেই। নকরেক পেট্রোস লিখেছেন, ‘ওপারে ভালো থাকবেন ফাদার।’ ফিডেল ডি সাংমা লিখেছেন ‘যেখানেই থাক সুখে থাক তুমি। সৃষ্টিকর্তা তোমাকে চিরশান্তি দান করুক।’

(মধুপুর সংবাদদাতা, ঘাটাইল ডট কম)/-

ঈদের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার খবরটি গুজব

‘বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষা বোর্ড’ নামক ফেসবুক পেজের মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে ‘ঈদের পর সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সরকার’। এটি ভিত্তিহীন ও গুজব বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

বুধবার (২২ জুলাই) রাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানায়।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল খায়ের বলেন, ‘এ ধরনের মিথ্যা ও ভিত্তিহীন সংবাদের মাধ্যমে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় যখনই এ বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেবে, তখন গণমাধ্যমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিষয়টি জানানো হবে।’

আবুল খায়ের জানান, ঈদের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি। তাছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষা বোর্ড নামে কোনও বোর্ড নেই।

(অনলাইন ডেস্ক, ঘাটাইল ডট কম)/-

করোনা ঠেকাতে অক্সফোর্ডের টিকা নিরাপদ ও প্রতিশ্রুতিশীল

করোনাভাইরাস ঠেকাতে ব্রিটেনের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির উদ্ভাবিত টিকাটি মানব শরীরের জন্য নিরাপদ এবং সেটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উজ্জীবিত করে তুলতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে।

প্রায় ১,০৭৭ মানুষের ওপর পরীক্ষার পর দেখা গেছে, এই টিকার ইনজেকশন তাদের শরীরে অ্যান্টিবডি এবং হোয়াইট ব্লাড সেল বা শ্বেতকণিকা তৈরি করে, যা শরীরের ভেতর করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে।

একে একটি বড় রকমের প্রতিশ্রুতিশীল আবিষ্কার হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। তবে এটি পুরোপুরি সুরক্ষা দিতে পারবে কি-না, তা বলার সময় এখনও আসেনি। এ নিয়ে ব্যাপক আকারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখনও চলছে।

যুক্তরাজ্য এর মধ্যেই ১০ কোটি টিকার জন্য চাহিদা জানিয়েছে।

টিকা কীভাবে কাজ করে?

ChAdOx1 nCoV-19 নামের এই টিকাটি তৈরি করতে অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে কাজ চলছে।

শিম্পাঞ্জির শরীরের সাধারণ সর্দিকাশি তৈরি করে, এমন একটি ভাইরাসের জিনগত পরিবর্তন করে এই টিকাটি তৈরি করা হচ্ছে।

এটাকে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে, যাতে এটা মানব শরীরে সংক্রমণ তৈরি না করে। এটাকে করোনাভাইরাসের কাছাকাছি একটা সাদৃশ্যও দেয়া হয়েছে।

যে টিকাটি তৈরি করা হচ্ছে, তার ভেতরে করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের জিনগত বৈশিষ্ট্য ঢুকিয়ে (যে অংশটি আমাদের কোষকে আক্রমণ করে) দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

এর মানে হলো, টিকাটি করোনাভাইরাসের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং তখন শরীরের ভেতর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বুঝতে পারে যে, কীভাবে করোনাভাইরাসকে আক্রমণ করে পরাস্ত করা যাবে।

অ্যান্টিবডি এবং টি-সেল কী?

করোনাভাইরাসের প্রতিরোধে বেশিরভাগ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে অ্যান্টিবডির দিকে, যা আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার একটি অংশ মাত্র।

অ্যান্টিবডি হচ্ছে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার তৈরি করা ছোট আকারের প্রোটিন, যা ভাইরাসের সঙ্গে সেটে গিয়ে সেটাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে।

অ্যান্টিবডি করোনাভাইরাসকে অকার্যকর করে দিতে পারে।

টি-সেল, রক্তের সাদা একটি অংশ আক্রান্ত কোষগুলোকে খুঁজে বের করতে আর ধ্বংস করতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সাহায্য করে।

প্রায় সব কার্যকর টিকা অ্যান্টিবডি এবং টি-সেল ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তোলার মাধ্যমে কাজ করে।

টিকা দেয়ার ১৪ দিন পরে টি-সেলের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায় আর অ্যান্টিবডির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায় ২৮দিনের মধ্যে।

তবে দীর্ঘমেয়াদী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ব্যাপারটি কেমন হতে পারে, সেটি এখনো যাচাই করে দেখতে পারেননি গবেষকরা।

এটা কি নিরাপদ?

এটা নিরাপদ, তবে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে। যদিও সেগুলো খুব বিপদজনক কিছু নয়।

পরীক্ষায় অংশ নেয়া ৭০ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন যে, টিকা নেয়ার পর তাদের জ্বর অথবা মাথাব্যথা হয়েছিল।

গবেষকরা বলছেন, প্যারাসিটামল খেয়ে এটা সামলানো যেতে পারে।

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সারাহ গিলবার্ট বলেছেন, ” কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবেলায় আমাদের টিকা কাজ করবে, সেটা বলার আগে আমাদের আরও অনেক কিছু করার বাকি রয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে পাওয়া ফলাফল বেশ আশা যোগাচ্ছে।”

পরীক্ষার পরবর্তী ধাপে কি হবে?

এখন পর্যন্ত পাওয়া ফলাফল যদিও যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক, কিন্তু এর মূল উদ্দেশ্য হলো সব মানুষকে দেয়ার জন্য নিরাপদ কিনা, সেটা নিশ্চিত করা।

গবেষণায় এটা জানা যায়নি যে, এটা মানুষজনকে অসুস্থতা থেকে রক্ষা করবে নাকি তাদের কোভিড-১৯ উপসর্গ কমিয়ে দেবে।

পরবর্তী ধাপের পরীক্ষায় যুক্তরাজ্য জুড়ে ১০ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেবে।

তবে এই পরীক্ষাটি অন্যান্য দেশেও করা হবে। যেহেতু যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাস রোগীর সংক্রমণের হার এখন কম, তাই টিকাটি কতটা কার্যকর তা সেখানে বের করা কঠিন।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের ওপর পরীক্ষা চলবে বলে জানা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকায় দুই হাজার আর ব্রাজিলে পাঁচ হাজার মানুষের ওপর পরীক্ষা করা হবে।

(বিবিসি, ঘাটাইল ডট কম)/-

এমাজউদ্দীন আহমদ অনন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আদর্শ শিক্ষক

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষকতার পাশাপাশি গবষেণায় সংশ্লিষ্ট থাকেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক অবশ্যই একজন গবেষকও হবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ শুধু একজন আদর্শ শিক্ষক ও গুরুত্বপূর্ণ গবেষকই নন; তিনি বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়ন ও গবেষণায় আগ্রহী পরের প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব।

বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত থেকেও তাঁর আন্তরিক ও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়ন, পাঠদান ও গঠনে যে কয়েকজন প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বের অবদান স্মরণীয়; তিনি তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

এককথায় বললে, বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তাঁর মূল অবদান হলো সুনির্দিষ্ট গবেষণাপদ্ধতি ও তত্ত্ব অনুসরণ করে বিভিন্ন ইস্যুতে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষায় বিস্তৃত পরিসরে গবেষণা করা ও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছা।

রাজনীতি, বিজ্ঞান অধ্যয়নের বিস্তৃত পরিধির বিভিন্ন ক্ষেত্রে, একাডেমিক ডিসকোর্সে স্বীকৃত লেখনীর মাধ্যমে তিনি অনন্য অনুরণন সৃষ্টি করতে পেরেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘১৪০০ সাল’ কবিতার পঙ্‌ক্তি ধার করে বলা যায়, অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ সৃষ্ট এই অনুরণন ‘অনুরাগে সিক্ত’ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তরুণ অধ্যয়নকারীদের উজ্জীবিত করতে পেরেছে; যা ‘শতবর্ষ’ পেরিয়েও বেঁচে থাকবে।

অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের নিকট স্মরণীয় হয়ে আছেন। শ্রেণিকক্ষে যাঁরা সরাসরি উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের নিকট থেকে শুনেছি যে স্যার অসাধারণভাবে গুছিয়ে কথা বলতেন। তাঁর বক্তব্য সাবলীল ছিল। আলোচনায় ছিলেন উদার ও নিরপেক্ষ।

একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক হিসেবে তিনি শ্রেণিকক্ষে সঠিক সময়ে প্রবেশ করতেন এবং বিষয়ভিক্তিক বক্তব্য দিতেন।

আমাদের এই প্রজন্ম সরাসরি শ্রেণিকক্ষে তাঁর ছাত্র হতে না পারলেও বিভিন্ন সময় আলাপচারিতায় দেখেছি, তিনি বিষয়ের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রেখে শ্রোতাকে সম্পৃক্ত করে কথা বলতেন। তাঁর শব্দচয়ন ও বাচনভঙ্গি উল্লেখ করার মতো।

কঠিন বিষয়কে তাত্ত্বিক ভিত্তি দিয়ে গল্পাকারে ব্যাখ্যা করতেন।

ব্যক্তিগতভাবে আমার একবার সৌভাগ্য হয়েছিল গণতন্ত্রের ওপর স্যারের তত্ত্বাবধানে কাজ করার। তিনি আমার লেখা পড়ে আমাকে সুমিষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন, তত্ত্বকে কীভাবে বাস্তব ইস্যুতে ব্যাখ্যা করা যায়। যেখানে তত্ত্ব থাকবে বাস্তবতার আড়ালে।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়নের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত দেওয়ার কর্তৃত্বও তাঁর ছিল। এর একটি প্রধান কারণ হলো পদ্ধতিগতভাবে গবেষণার বেলায় তাঁর দক্ষতা।

বিশ্ববিখ্যাত কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইডি ডিগ্রি অর্জন করতে গিয়ে পশ্চিমা ধাঁচের একাডেমিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি হয়তো পদ্ধতিগত গবেষণার ক্ষেত্রে এ দক্ষতা অর্জন করেছেন।

তাঁর গ্রন্থ বা প্রবন্ধ অধ্যয়ন করলে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে গবেষণায় সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন রয়েছে এবং পদ্ধতিগতভাবেই গবেষণা করে তিনি সেই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর দিচ্ছেন।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়নে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি প্রয়োগের একটি সংকট ছিল, যা তিনি পূরণ করার চেষ্টা করেছেন।

অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন গবেষক। গুগল স্কলার পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ৩৭৩ বার তাঁকে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় তাঁর আগ্রহের বিষয়গুলো ছিল আমলাতান্ত্রিক এলিট, বাংলাদেশে ইসলাম, সামরিক শাসন ও গণতন্ত্র, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা ও ভারতের ভূমিকা, বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রশাসন ও কৌশল এবং বাংলাদেশে সমাজ ও রাজনীতি।

বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ কর্তৃক রচিত অসংখ্য গ্রন্থ রয়েছে। এশিয়ান সার্ভে, ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল সায়েন্স রিভিউ, ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলিসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে তাঁর নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য গবেষকদের থেকে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ এ কারণে ব্যতিক্রম যে তিনি ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষায়ও অনেক গ্রন্থ ও নিবন্ধ লিখেছেন।

বাংলায় লিখিত তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো সমকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতি, আমার দেশ, গণতন্ত্রের শত্রু মিত্র, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, মধ্যযুগের রাষ্ট্রচিন্তা, আধুনিক রাষ্ট্র, পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রবন্ধ।

অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ রচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হলো ‘ব্যুরোক্রেটিক এলিটস ইন সেগমেন্টেড ইকোনমিক গ্রোথ: পাকিস্তান অ্যান্ড বাংলাদেশ’ (Bureaucratic elites in Segmented Economic Growth: Pakistan and Bangladesh)।

এ গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন, পাকিস্তানে আমলাতান্ত্রিক এলিট কর্তৃক গৃহীত উন্নয়নের কৌশল কীভাবে পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক সুবিধাভোগী শ্রেণির কাজে এসেছে। গণতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীর স্বার্থের বিষয়ে গবেষণায়ও তাঁর ব্যাপক আগ্রহ ছিল।

তিনি তাঁর মিলিটারি রুল অ্যান্ড দ্য মিথ অব ডেমোক্রেসি (Military Rule and the Myth of Democracy) গ্রন্থে বলেছেন, ‘যে সকল দেশে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল ও অস্থিতিশীল এবং দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনায় রাজনৈতিক এলিটদের সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হয়; সে সকল দেশে সামরিক বাহিনীর করপোরেট স্বার্থ নষ্ট করে রাজনৈতিক এলিটগণ সাধারণত দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকতে পারে না।’

সার্ককে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার সংহতির বিষয়েও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। সার্ক: সিডস অব হারমনি (SAARC: Seeds of Harmony) হলো এ প্রসঙ্গে তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

এ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন যে একটি কার্যকর সার্ক দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থেই প্রয়োজন, যা এই অঞ্চলের ছোট-বড় সব রাষ্ট্রের জন্য অর্থবহ সভার একটি ফোরাম হিসেবে কাজ করবে।

উপরোল্লিখিত বিষয়গুলো ছাড়াও অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ছয় দফা কর্মসূচি ও এর শ্রেণি ভিত্তি এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বিষয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর এসব গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ফলে বাংলাদেশের রাজনীতি অধ্যয়নের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে এবং রাজনীতিচর্চা সমৃদ্ধ হয়েছে।

‘রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কথা’ এবং ‘তুলনামূলক রাজনীতি: রাজনৈতিক বিশ্লেষণ’ নামে বাংলায় লিখিত তাঁর গ্রন্থ দুটি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের প্রথমিক ধারণা সুস্পষ্টকরণে বিশেষ অবদান রাখছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তাঁর গবেষণার সব ইস্যুই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গবেষণার কাজে বিশেষ অবদান রাখবে। বিশেষ করে বাংলা ভাষায় রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়নের যে পরিধি তিনি বিস্তৃত করেছেন, তা তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে।

গণবুদ্ধিজীবী হিসেবেও তাঁর অবদান শীর্ষস্থানীয়। সমসাময়িক ও রাজনৈতিক বিষয়ে তিনি বাংলাদেশের স্বনামধন্য দৈনিক পত্রিকা, সাপ্তাহিক ও মাসিক সাময়িকীগুলোতে লিখতেন।

অনেক সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রদান করতেন। লেখালেখি ও সাক্ষাৎকারে তিনি সমকালীন বিষয়ে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিতেন। সত্যিই বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পরিবার তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অভিভাবক হারাল।

অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ যখনই কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব পেয়েছেন, তা দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন এবং সফল হয়েছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের উপ-উপাচার্য ও পরবর্তী সময়ে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার স্বনামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন।

ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভের উপাচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। গবেষণা ও কর্মক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি বিশেষভাবে সম্মানিত হয়েছেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে অনবদ্য অবদানের জন্য ১৯৯২ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন।

ব্যক্তিজীবনে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন সদালাপী ও মিষ্টভাষী। তিনি অল্প সময়েই সবাইকে কাছে টেনে নিতে পারতেন।

প্রথম পরিচয়েই তাঁর মধ্যে আন্তরিকতার কোনো অভাব ছিল না। সরাসরি রাজনৈতিক দলের কর্মী না হলেও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি রাজনৈতিক মতামত প্রদানে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করতেন।

জন্মের সঙ্গে মৃত্যু অনিবার্য। অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ মৃত্যুবরণ করলেও সামাজিক বিজ্ঞান, বিশেষ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষকদের মধ্যে তিনি দীর্ঘকাল বেঁচে থাকবেন।

(কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)/-

একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন শুরু ৯ আগস্ট

আগামী ৯ আগস্ট থেকে ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে অনলাইন ভর্তির কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তি কার্যক্রম চলবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবুল খায়ের এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

জানা গেছে, এ বছর একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিতে মুক্তিযোদ্ধা, প্রবাসী ও বিকেএসপি কোটা বহাল থাকছে। তবে, অন্যান্য কোটা নিয়ে নীতিমালায় কোনো কিছু উল্লেখ করা হয়নি।

ভর্তি প্রক্রিয়ায় জটিলতা ও ব্যয় কমাতে এসএমএসের মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়েছে। শুধু অনলাইনে সর্বোচ্চ ১০টি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে পারবেন শিক্ষার্থীরা।

এছাড়া ভর্তিতে ফি আবেদন ফি ও ভর্তি ফি কিছুটা বাড়ানো হয়েছে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটির সূত্র জানায়, ভর্তির সময় পরিবর্তন হলেও ইতোমধ্যে প্রকাশিত নীতিমালা অনুসারে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে।

নীতিমালায় একাদশে বিশেষ কোটা হিসেবে ৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা, দশমিক পাঁচ শতাংশ বিকেএসপি এবং দশমিক পাঁচ শতাংশ প্রবাসী কোটা বহাল থাকছে।

প্রবাসীদের সন্তান ভর্তির বিষয়ে সরাসরি বোর্ডে আবেদন করতে হবে।

তবে, বিভাগীয় ও জেলা সদর এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধস্তন দপ্তরগুলোর কোটার বিষয়ে খসড়ায় কিছু উল্লেখ করা হয়নি।

এবার ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার এমপিওভুক্ত কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার টাকা।

এছাড়া ঢাকার মধ্যে আংশিক এমপিওভুক্ত ও এমপিওবিহীন প্রতিষ্ঠানের বাংলা মাধ্যম ভর্তির জন্য ৯ হাজার ও ইংরেজি মাধ্যমের ভর্তি ফি ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হবে। সব প্রতিষ্ঠানের জন্য উন্নয়ন ফি ৩ হাজার টাকার বেশি করা যাবে না।

প্রতিটি খাতে অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে রসিদ প্রদানের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া মফস্বল ও পৌর এলাকার জন্য ভর্তি ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার টাকা, পৌর জেলা সদরে ২ হাজার টাকা, ঢাকা ব্যতীত অন্যান্য মেট্রোপলিটন এলাকায় ৩ হাজার টাকার বেশি নেয়া যাবে না বলে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ জানান, ইতোমধ্যে প্রকাশিত ভর্তি নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে শুধু সময়সূচিতে পরিবর্তন করা হয়েছে। ভর্তি প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ সময়সূচি খুব তাড়াতাড়ি সবার সাথে আলোচনা করে নির্ধারণ করবে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটির।

(দৈনিক শিক্ষা, ঘাটাইল ডট কম)/-