সিনহা হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা, প্রদীপের ভিডিও সাক্ষাৎকারেই সর্বনাশ

সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা টানা কয়েকদিন ইয়াবা বাণিজ্যের নেপথ্য কাহিনী নিয়ে ডকুমেন্টারি তৈরিকালেও ‌বিপদমুক্ত’ ছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে টেকনাফের ওসি প্রদীপ কুমারের সাক্ষাৎকার রেকর্ড করাটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

ক্রসফায়ারের নামে নৃশংসভাবে খুন করা অসংখ্য মানুষের রক্তে রঞ্জিত প্রদীপ কুমারও ভিডিও সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় বারবারই কেঁপে উঠেন।

মেজর সিনহা’র তথ্যবহুল প্রশ্নের পর প্রশ্নে চরম অস্বস্তিতে পড়েন ওসি। নানা অজুহাতে ভিডিও সাক্ষাৎকার এড়ানোর সব কৌশল খাটিয়েও ব্যর্থ ওসি প্রদীপ বাধ্য হয়েই প্রশ্নবানে জর্জরিত হতে থাকেন, ভিডিওচিত্রে মেজরের উদঘাটন করা নানা তথ্যের সামনে সীমাহীন নাস্তানাবুদ হন তিনি।

মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের দিন বিকেল চারটার দিকে টেকনাফের বহুল বিতর্কিত ওসি প্রদীপ কুমার দাস ওই ডকুমেন্টারি ভিডিও সাক্ষাৎকারের ফাঁদে পড়েন।

প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক সূত্র জানায়, ক্রসফায়ারে অতিমাত্রায় উৎসাহী ওসি প্রদীপ ও তার সহযোগিরা ইয়াবা বাজারজাত ও পাচারের ক্ষেত্রেও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকার কথা স্বীকার করতেও বাধ্য হন।

সফল সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেই মেজর সিনহা আর একদণ্ড সময় ক্ষেপণ করেননি। ঝড়ের বেগে থানা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের গাড়িতে উঠে বসেন।

তার সঙ্গে ভিডিও রেকর্ডিংয়ে ব্যস্ত থাকা সাহেদুল ইসলাম সিফাতও ক্যামেরা, ট্রাইপড, ব্যাগ গোছাতে গোছাতেই ছুটে গিয়ে গাড়িতে উঠতেই টেকনাফ সদর ছেড়ে গাড়িটি ছুটতে থাকে উত্তর দিকে, বাহারছড়ার পথে।

বাহারছড়া সংলগ্ন মারিসঘোণা এলাকাতেই বসবাস করেন চলচ্চিত্রের ফাইটিং গ্রুপ পরিচালনাকারী ইলিয়াস কোবরা। হঠাত তার টেলিফোনে করা আমন্ত্রণ পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে পারেননি মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান।

এদিকে থানা থেকে মেজর সিনহা বেরিয়ে যেতেই ওসি প্রদীপ অচিরেই বড় রকমের বিপদের আশঙ্কায় তৎক্ষনাত কক্সবাজারের এসপি মাসুদকে ফোন করে বিস্তারিত জানিয়ে দেন।

সব শুনে এসপি নিজেও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কয়েক মিনিটেই এসপির নির্দেশনায় তৈরি হয় ‌মেজর সিনহা’র নৃশংস হত্যার নিশ্ছিদ্র পরিকল্পনা।

আলাপ আলোচনা শেষে এসপি-ওসি এমনভাবেই ত্রিমুখী মার্ডার মিশন সাজিয়েছিল- সেই ফাঁদ থেকে মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের প্রাণে বাঁচার কোন সুযোগই ছিল না।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চলচ্চিত্রের ফাইটিং গ্রুপের পরিচালক ইলিয়াস কোবরাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, আতিথেয়তার নামে নানা কৌশলে সন্ধ্যা পর্যন্ত মেজর সিনহাকে তার নিভৃত পাহাড়ি গ্রামে আটকে রাখার।

চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার পরিচিতি থাকলেও ইলিয়াস কোবরা ইদানিং ‌‍’ক্রসফায়ার মিট মিমাংসার দালালি’ কাজেই সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।

ক্রসফায়ারের তালিকায় নাম থাকার গুজব ছড়িয়ে অসংখ্য মানুষকে গোপনে ওসি প্রদীপের সঙ্গে সমঝোতা করিয়ে দিয়ে টেকনাফের শীর্ষ দালাল হিসেবে বেশ নামডাক ছড়িয়ে পড়েছে কোবরার।

তবে ক্রসফায়ারের কবল থেকে জীবন বাঁচানোর সমঝোতায় ওসি প্রদীপ হাতিয়ে নিয়েছেন ১০ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত।

অন্যদিকে দালালির কমিশন হিসেবে ইলিয়াস কোবরাকেও মাথাপিছু এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পাইয়ে দিয়েছেন প্রদীপ।

ওসিসহ পুলিশ প্রশাসনের কাছে পরীক্ষিত দালাল ইলিয়াস কোবরা ঠিকই তার উপর অর্পিত দায়িত্ব অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন।

মারিসঘোণায় নিজের বাগানবাড়ি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখার নামে ইলিয়াস কোবরা সেদিন বিকেল সাড়ে চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত নির্জন পাহাড়েই নিজ হেফাজতে রেখেছিলেন মেজর সিনহাকে।

এ সময়ের মধ্যে মেজরের অবস্থান, কতক্ষণ পর কোন রাস্তায় কোথায় যাবেন সেসব তথ্য জানিয়ে কোবরা ৯টি এসএমএস পাঠান ওসিকে।

এসপির ত্রিমুখী ছকে সিনহার প্রাণে ফেরার উপায় ছিল না

গণপিটুনিতে হত্যার জন্য প্রস্তুত রাখা হয় গ্রামবাসীকে, ওসি বাহিনী অবস্থান নেয় দক্ষিণের বড়ডিল পয়েন্টে- আর উত্তরদিকের শামলাপুর চেকপোস্টে ওৎ পেতেছিলেন খুনি লিয়াকতের বাহিনী।

পরিকল্পনা মাফিক সন্ধ্যা ৭ টার দিকেই টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাস তার পছন্দের দুই এসআই ও দুই কনস্টেবল নিয়ে নিজের সাদা নোহায় এবং আরো ৫/৭ জন পুলিশ সদস্য অপর একটি মাইক্রোবাসে হন্তদন্ত অবস্থায় থানা থেকে মেরিন ড্রাইভওয়ে ধরে উত্তর দিকে ছুটতে থাকে।

ওসি বাহিনী বাহারছড়া-কক্সবাজারের পথে শামলাপুর পুলিশ ক্যাম্পে যাওয়ার পথেই ইলিয়াস কোবরার নতুন খবর আসে।

ওসি প্রদীপকে ফোন করে তিনি জানান, এ মুহূর্তে মেজর সিনহা ও তার ভিডিওম্যান সিফাত মারিসঘোণার পাহাড় চূড়ায় উঠছেন।

পাহাড়ের উপর থেকে মেরিন ড্রাইভওয়ে, টেকনাফ সদর, নাফ নদী-মিয়ানমার সীমান্ত এবং দক্ষিণ দিকে সমুদ্রের বিস্তির্ণ অংশ দেখা যায়। গভীর সমুদ্রের দিক থেকে ছোট বড় ইঞ্জিনবোটগুলো সার্চ লাইটের আলো ফেলে ফেলে সমুদ্র সৈকতের দিকে আসতে থাকে, আবার ডজন ডজন ইঞ্জিনবোট সমুদ্র সৈকত ছেড়ে গভীর সমুদ্রের দিকেও যেতে থাকে।

পুরো দৃশ্যপটের ভিডিওচিত্র ধারন করাটাই হচ্ছে তার ডকুমেন্টারির শেষ দৃশ্য।

এ দৃশ্যপটের সঙ্গে নেপথ্য কন্ঠ জুড়ে দিতে চান মেজর সিনহা। তিনি বলতে চান রাত যত গভীর হয়, আধারে নিমজ্জিত হয় সমুদ্রের মাইলের পর মাইল জলরাশি, ঠিক তখনই টেকনাফ সীমান্ত ঘেষা জনপদের কয়েকশ’ মানুষ জেগে উঠেন, তারা মেতে উঠেন অন্যরকম কর্মযজ্ঞে।

শত শত ইঞ্জিনবোট হঠাত করেই যেন সমুদ্রের পানি ফুঁড়ে উঠে আসে উপরে, এদিক সেদিক ঘোরাফেরা করেই ট্রলারগুলো অজ্ঞাত গন্তব্যে ছুটে যায় ইঞ্জনের কর্কশ শব্দ তুলে, ধোঁয়া ছেড়ে। তখন এসব ট্রলারের প্রতিটাই হয়ে উঠে কোটি কোটি টাকার দামি।

কোনো ট্রলারে থাকে পাচারের শিকার নারী-পুরুষ, কোনোটা আবার ভরাট হয় লাখ লাখ পিস ইয়াবায়।

আবার গভীর সমুদ্রে অপেক্ষমাণ মাদার ভেসেল থেকে কোনো কোনো ট্রলারে নামিয়ে আনা হয় একে-৪৭ রাইফেল, থাকে আরজিএস গ্রেনেডের ছড়াছড়ি…

ইলিয়াস কোবরা ফোনে ওসিকে জানান, মেজর সাহেব পাহাড় থেকে নেমে কিছু সময়ের জন্য মেরিন ড্রাইভওয়ে ব্যবহার করে টেকনাফের দিকে যেতে পারেন- তারপর সেখান থেকে ফিরে যাবেন হিমছড়ির রিসোর্টে।

এটুকু শুনেই ওসি প্রদীপ তার গাড়ি থামিয়ে দেন বাহারছড়া পৌঁছানোর আগেই।

মারিসঘোণা থেকে টেকনাফ যাওয়ার পথে তিন কিলোমিটার দূরের বড়ডিল নামক স্থানে ওসি ও তার সঙ্গীদের দুটি মাইক্রো থামিয়ে পূর্ণ প্রস্তুতিতে অপেক্ষশাণ থাকেন সবাই।

এরমধ্যেই ওসি প্রদীপ কুমার মরিসঘোণা এলাকার দুই জন সোর্স ছাড়াও ক্রসফায়ার বাণিজ্যের টাকা সংগ্রহকারী এজেন্ট বলে কথিত আব্দুল গফুর মেম্বার, হাজী ইসলাম, মুফতি কেফায়েতউল্লাহ ও হায়দার আলীকে ফোন করে জানান, মারিসঘোণা পাহাড়ের চূড়ায় বেশ কয়েকজন ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জড়ো হয়েছে।

তারা কেউ পাহাড় থেকে নামার চেষ্টা করলেই যেন এলাকার লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে ডাকাত ডাকাত চিৎকার জুড়ে দেয়া হয় এবং যাদেরকে হাতেনাতে পাবে তাদেরকেই যেন গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা হয়।

বাকি সবকিছু ওসি দেখবেন এবং এজন্য তিনি মারিসঘোণার দিকে রওনা দিয়েছেন বলেও জানানো হয় তাদের।

ওসির কাছ থেকে পাওয়া এমন খবর ওসির এজেন্টরা পাহাড় সংলগ্ন চারপাশের বেশ কয়েকটি বাড়িঘরে ছড়িয়ে দিয়ে লাঠিসোটায় সজ্জিত হয়ে তারা অপেক্ষা করতে থাকেন।

কিন্তু চৌকষ সেনা অফিসার সিনহা পাহাড়ের চুড়ায় থাকাবস্থায়ই চারপাশে সাজ সাজ রব দেখে সতর্ক হয়ে উঠেন এবং এ কারণেই টর্চ লাইট না জ্বালিয়ে অন্ধকারের মধ্যেই ধীরলয়ে পাহাড় থেকে নিচে নেমে আসেন।

ঠিক তখনই বেশ সংখ্যক গ্রামবাসী ডাকাত ডাকাত চিৎকার জুড়ে দিয়ে তাদের চারপাশ থেকেই ধাওয়া দিতে থাকে। কিন্তু মেজর সিনহা তার সহযেগির হাত চেপে ধরে প্রশিক্ষণের দক্ষতা অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েই প্রায় আধা কিলোমিটার জায়গা পেরিয়ে পাকা সড়কে পৌঁছে যান এবং দ্রুত নিজের গাড়িতে উঠেই উত্তরদিকে হিমছড়ির দিকে রওনা হন।

বাহারছড়ার মারিসঘোণা থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরেই শামলাপুরের সেই পুলিশ চেকপোস্ট।

ওসির নির্দেশে যেখানে এসআই লিয়াকতসহ একদল পুলিশ আরো আগে থেকেই ওৎ পেতে অপেক্ষায় ছিল-সেখানেই পৌঁছে যায় মেজর সিনহার গাড়িটি।

গাড়িটির খুব কাছে অস্ত্র তাক করে মেজরকে হাত তুলে সামনের দিকে মুখে করে নেে আসার নির্দেশ দেন তিনি। আর গাড়ি থেকে নামতেই অব্যর্থ নিশানায় লিয়াকত পর পর চারটি বুলেট বিদ্ধ করেন মেজর সিনহার দেহে। ফলে লুটিয়ে পড়েন তিনি।

এদিকে বড়ডিল এলাকায় অপেক্ষমান ওসি বাহিনী মেজরের উত্তরদিকে রওনা দেয়ার খবর শুনেই শামলাপুর ক্যাম্পের দিকে রওনা দেন। যে কারণে লিযাকতের গুলিতে মেজর মাটিতে লুটিয়ে পড়ার ১৫/১৬ মিনিটের মধ্যেই ওসি বাহিনী সেখানে পৌঁছাতে সক্ষম হন।

কারণ, টেকনাফ থানা থেকে শামলাপুর চেকপোস্ট পর্যন্ত যেতে প্রাইভেটকারে ৪০/৪৫ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু তিনি মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরের বড়ডিল এলাকায় থাকায় ১৫/১৬ মিনিটেই চেকপোস্টে পৌঁছেই মেজর সিনহার লুটিয়ে পড়া দেহখানাকে পা দিয়ে চেপে ধরে নিজের আগ্নেয়াস্ত্র থেকে পর পর দুটি গুলি বর্ষণ করে লাথি মেরে নিথর দেহখানাকে রাস্তার ধারে ফেলে দেন।

ত্রিমুখী হত্যা মিশনের ব্যাখ্যা দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একদিকে মারিসঘোণা গ্রামে ওসি প্রদীপের নিজস্ব এজেন্টদের দ্বারা ডাকাত ডাকাত চিৎকার জুড়ে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হয়।

কিন্তু সেখান থেকে জীবন বাঁচিয়ে মেজর সিনহা যদি টেকনাফের দিকে রওনা হতেন তাহলে তিন কিলোমিটার সামনে বড়ডিলে পৌঁছেই তিনি ওসি বাহিনীর নির্বিচার গুলিতে বেঘোরে জীবন হারাতেন।

অন্যদিকে মেজর তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে হিমছড়ি রিসোর্টের দিকে রওনা দিলেও শামলাপুরে তার জীবন কেড়ে নিতে এসআই লিয়াকতের টিমকেও পূর্ণ প্রস্তুতিতে রাখা হয়। আসলে কোনো বিকল্প উপায় অবলম্বন করেই মেজর সিনহা যাতে প্রাণ নিয়ে ফিরতে না পারেন তা ১০০ ভাগ নিশ্চিত করেই পাকা পরিকল্পনা আঁটেন এসপি মাসুদ।

ওসি প্রদীপের নেতৃত্বে তা বাস্তবায়িত হয়েছে অব্যর্থভাবেই।

(যানবাহনে চলতে চলতেই এটুকু লিখতে পারলাম-কিন্তু শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনী উদঘাটনের আবেগ আর চাপা দিয়ে রাখতে পারলাম না। তাই আংশিক রিপোর্টও প্রকাশে দ্বিধা করলাম না। কিছুটা সময় অপেক্ষা করলেই মেজর হত্যাকান্ডের প্রকৃত মিশন, ক’জন পুলিশ ও ক’জন দালাল অংশগ্রহণ করেছিল, দারোগা চারটি গুলি করার পর আরো দুই রাউন্ড গুলি কে করেছিলেন? আরো আরো তথ্যের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনটি অল্প সময় পরেই পাঠ করা যাবে।)

(সিনিয়র সাংবাদিক সাইদুর রহমান রিমনের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে/ ঘাটাইল ডট কম)/-

খালেদা জিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত শেখ হাসিনার

জাতীয়তাবাদী দল – বিএনপির প্রতি, বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত শেখ হাসিনার। কৃতজ্ঞ থাকা উচিত তার সরকারের, তার দলের, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের। কৃতজ্ঞ থাকা উচিত এদেশের কূটনৈতিক দঙ্গল-প্রশাসন-আমলাতন্ত্রের এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক জনগণের।

কৃতজ্ঞ থাকা উচিত অনেক কারণেই। তবে এখন আমি কেবল একটি কারণের কথা বলবো। বিএনপির অনেক সমস্যা। তবে অনেক দিন ধরেই এ দলের নিজস্ব একটা বড় সমস্যা দেখা যাচ্ছে। সেটা হলো এ-দলে হোমওয়ার্ক ও রিসার্চ কমে গিয়েছে। সব সময় তারা রক্ষণশীল, আত্মরক্ষামূলক, ডিফেন্সিভ অবস্থানে থাকে। নিজেদের সাফল্য ও কৃতিত্বের কথাটাও ভালো করে বলতে পারেনা।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারেনা, আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে পারেনা, জাতীয় অঙ্গনেও পারছে না। কাজেই সে প্রতিপক্ষের একতরফা আক্রমণাত্মক ক্যাম্পেইনে ধরাশায়ী হচ্ছে।

বশংবদ এবং গণভিত্তিহীন দুর্বল সরকার হলে যা হয়। বিএনপি ও খালেদা জিয়ার বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে ওরা কিছুটা বার্গেইনিং ক্ষমতা অর্জন করলেও এজন্য কখনো কৃতজ্ঞতা দূরে থাকুক, সামান্য সৌজন্য প্রদর্শনও করেনি।

জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক ঐক্য ও সমঝোতা থাকলে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিমন্ডলে সরকারের বার্গেইনিং ক্ষমতা বাড়ে। ওরা সেটা বিসর্জন দিয়ে নিজেদেরকেই দুর্বল করেছে। এই চুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশের আরো কিছু সুবিধা পাবার অন্যান্য শর্তগুলো তারা ছেড়ে দিয়েছে। এই চুক্তির পাশাপাশি আমাদের ফেনী নদীর পানি নেয়ার জন্য ইন্ডিয়াকে একতরফা সুবিধা দিয়েও তিস্তার পানি বন্টনের কোনো সুরাহা তারা করতে পারেনি।

বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার, মাল পরিবহন ও নিরাপত্তা ছত্রছায়া দেয়ার ক্ষেত্রে শুল্ক, কর ও সার্ভিস চার্জের হার তারা একেবারেই কমিয়ে রেখেছে।

ইন্ডিয়ার পণ্যকে সকল ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়ার শর্ত তারা চুক্তিতে জুড়ে দিয়েছে। সর্বোপরি ইন্ডিয়াকে এই সার্ভিস দিতে গিয়ে আমাদের বন্দর ও সড়ক সহ বিভিন্ন কাঠামো ও স্থাপনার যে ক্ষতি হবে সে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কোনো রকম করারোপের ব্যবস্থা এই চুক্তিতে নেই।

জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ইন্ডিয়াকে কৃতজ্ঞ রাখাই যাদের উদ্দেশ্য তাদের কাছ থেকে এরচেয়ে ভালো আর কী-ই বা আশা করা যায়?

আরেকটা সচতুর ধাপ্পাবাজ গোষ্ঠী আছে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় এরা খুব সক্রিয়। এদের প্রচারণা হচ্ছে :

“ভাইরে বিএনপির কথা ছাড়ান দাও। আওয়ামী লীগ আর এ-দলে কোনো ফারাক নাই। এক গাছেরই দুই ডাল। এরা শুধু পাওয়ার চায় যে কোনো মূল্যে। ক্ষমতায় গিয়ে পাব্লিকের জন্য ভালো কিছু করেনা, দেশের বা জাতীয় স্বার্থও রক্ষা করেনা, শুধু চুরিদারি করে নিজেদের আখের গোছায়।

বিএনপিও কম সুবিধাবাদী, স্বার্থান্বেষী, ফরচুন মেকার নয়। এরাও দেশের স্বার্থ বিকিয়ে হলেও ক্ষমতায় আসতে চায়। কাজেই মাইনাস টু।

খালি আওয়ামী লীগ নয়, দুটাই বাদ, বিএনপিকেও ধসিয়ে দিতে হবে একই সাথে।”

এদেরকে জিজ্ঞেস করুন :

“আচ্ছা ভাইয়া, বিএনপিকে ধসালে কে আসবে? বিকল্প কী?” এর কোনো জবাব এরা দেবেনা।

একটা ধোঁয়াটে জবাব দিয়ে রহস্যময় মিচকা হাসি হেসে বলবে : “আসবে আসবে। জায়গা কি খালি থাকে? পরিস্থিতি কি কারো জন্য বসে থাকে? নেতৃত্বের আসন কি কখনো শূণ্য থাকে? সময়ের প্রয়োজনে কেউ না কেউ এসে যাবেই।”

কেউ যে কখনো আসমান থেকে নাজিল হয় না বা মাটি ফুঁড়ে উঠে আসেনা, প্রতিটি শূণ্যস্থান পূরণে যে একটা প্রক্রিয়া লাগে, আর সে প্রক্রিয়া শুরু না হলে দুঃশাসন ও ব্যর্থ রেজিমই যে টিকে থাকে সেটা এদের অনেকেই জানে।

এরা জেনে-শুনেই বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায় ব্যর্থ রেজিমকে টিকিয়ে রাখতে। দুঃশাসনের ছদ্মবেশী বি-টিম বা সেকেন্ড ফ্রন্ট এরা। স্টান্টবাজি এদের একটা কৌশল। আর আছে মহামূর্খ ও হঠকারি এবং সব কিছুর ওপর আস্থা হারানো হতাশ কিছু লোক। কেউ কেউ আবার সবদিকে তাল মেরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ইম্পর্ট্যান্ট থাকতে চায়। এদের নিয়ে কথা না বলাই ভালো।

আমি বাংলাদেশের রাজনীতির ‘ইন্ডিয়া ইস্যু’ নিয়ে অল্প কিছু কথা বলবো। তার আগে আমি বিএনপি-বিরোধী অতিবিপ্লবীদের উদ্দেশে একটা কথা বলবো। সেটা হলো, অন্যান্য সব ইস্যুর মতন এ ইস্যুতেও বিএনপি নিশ্চয়ই বিএনপির রাজনীতিই করবে।

নিশ্চয়ই আওয়ামীলীগ, জাতীয় পার্টি বা সিপিবির রাজনীতি বিএনপি করবে না। এমনকি সর্বহারা পার্টি, জাসদ, মুসলিম লীগ এবং অন্যান্য খুচরা দলের রাজনীতিও নয়।

এ-দেশের বিপুল জনসমর্থনধন্য মূলধারার প্রধান দল বিএনপি কেন ইন্ডিয়া ইস্যুতে অন্যান্য খুচরা দলের নীতি-কৌশল ফলো করেনা – এজন্য যারা কান্দে তাদেরকে এক বোতল সমবেদনা উপহার দেয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই।

এই অতিবিপ্লবীদের উদ্দেশে আরো নিবেদন, আচ্ছা ব্রাদার, বাংলাদেশে কোন্ দলকে ক্ষমতায় রাখলে ইন্ডিয়ার লাভ হয় সেটা কি তারা তোমার চেয়ে কম বুঝে? তারা তো জেনে বুঝেই বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার গ্লোবাল ক্যাম্পেইনে অগ্রণী হয়েছিল। এ-দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায়  আওয়ামীলীগকে বহাল রাখতে সব কূটনৈতিক রীতি ভেঙ্গে ইন্ডিয়া যে প্রকাশ্যে তাদের পররাষ্ট্র সচিবকে মাঠে নামিয়েছিল সেটা তো সকলেই দেখেছে।

দিল্লীতে তো বটেই, ঢাকার মাটিতে দাঁড়িয়েও ইন্ডিয়ান কূটনীতিকদের বিএনপির বিরুদ্ধে অশোভন মন্তব্য কে না শুনেছে? দুই দলের মধ্যে কোনো তফাত না থাকলে বিএনপির বিরুদ্ধে এত প্রাণান্তকর প্রয়াস কেন তাদের? বিএনপিও যদি দেশের ও জাতীয় স্বার্থ বেচে ক্ষমতায় আসতে চায় তাহলে বিএনপিকে গ্রহন করলেই তো ইন্ডিয়ার বেশি সুবিধা হবার কথা। কারণ এ পার্টির জনসমর্থন বেশি।

কেন তারা জনসমর্থনহীন একটা দলের সঙ্গে এভাবে গাঁটছড়া বেধে থাকছে? এর কারণ ইন্ডিয়া ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে তোমার চোখে কোনো পার্থক্য না থাকলেও ইন্ডিয়া কিন্তু ঠিকই জানে ও বুঝে পার্থক্য কতোটা আছে।

কাজেই বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত দু-একটি ঘটনা বা উক্তির কাটপিস জোড়া দিয়ে সেটাকে পুঁজি করে বিএনপি-আওয়ামী লীগকে এক কাতারে ফেলে প্রপাগান্ডার কিছু নেই।

একটা ছোট্ট উদাহরণ দেবো। তার আগে একটা কথা বলে রাখি। ১৯৭৫ সালের ৭ নবেম্বরে সৈনিক-জনতার মিলিত জাগৃতির মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির হাত ধরেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব অর্জন করে। জিয়ার অকাল শাহাদতবরণ ও এরশাদের ক্ষমতাদখল সেই সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে।

আর এই রাষ্ট্রটি তথাকথিত এক-এগারোতে তার সার্বভৌমত্ব পুরোপুরি হারিয়েছে। এখন উদাহরণটিতে আসছি।

বাংলাদেশী জামায়াতে ইসলামী একসময় দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেয় প্রতিবেশী ইন্ডিয়ার সঙ্গে একটি ওয়ার্কিং রিলেশন গড়ে তোলার। সে সময় কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ইন্ডিয়া সফর করে। বিজেপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তাদের দীর্ঘ মতবিনিময় ও কয়েকদফা বৈঠকও হয়। ঢাকায় ইন্ডিয়ান কূটনীতিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্ব পান আব্দুল কাদের মোল্লা। কোনো এক সময়ের কৌশলগত এ-সব উদ্যোগের কারণে জামায়াত কিন্তু মোটেও প্রো-ইন্ডিয়ান পার্টি হয়ে যায়নি। এমনকি বিজেপি ইন্ডিয়ার ক্ষমতায় আসা সত্বেও বাংলাদেশের ভারতপ্রিয় সরকার জামায়াতের শীর্ষনেতাদের ফাঁসি দেয়ার প্রক্রিয়া থেকে সরেও আসেনি।

এখন আসল কথায় আসি।

বাংলাদেশে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ২০০১ সালে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার আগে থেকেই ইন্ডিয়া সেভেন সিস্টার নামে পরিচিত তার উত্তর-পূবের সাত অঙ্গরাজ্যের সংগে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে দ্রুত ও সহজ যোগাযোগের দাবি জানিয়ে আসছিল।

তখন আওয়ামী সরকার তাতে রাজিও ছিল। কিন্তু বিএনপির প্রবল বিরোধিতার কারণে তারা সেটি করতে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে।

তাছাড়া দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও তখন এতোটা হীনবল হয়ে পড়েনি। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বিচ্ছিন্নতাপ্রবণ এই সেভেন সিস্টারের ব্যাপারে ইন্ডিয়া আরও শংকিত ও স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে।

তারা এই যোগাযোগ পেতে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহনযোগ্য ‘কানেক্টিভিটি’ ও ‘ট্রানজিট’ টার্ম ব্যবহার করতে থাকে।

এসব প্রচারণায় ইউরোপ-আমেরিকাও বিভ্রান্ত হয়ে বিএনপিকে বলতে থাকে, কেন তোমরা বিচ্ছিন্ন থাকতে চাও? কেন কানেক্টিভিটি ও ট্রানজিটের বিরুদ্ধে তোমরা? বিএনপি তখন সে চাপ দৃঢ়ভাবে খুব দক্ষতার সঙ্গেই মোকাবিলা করেছে।

বিএনপি বলেছে, আমরা কানেক্টিভিটির বিরোধী নই। কানেক্টিভিটির পথ ইন্ডিয়া থেকে এসে ইন্ডিয়ায় গিয়ে ফুরাবে না। আর ট্রানজিট হয় দু’য়ের অধিক দেশের মধ্যে পণ্য ও জনপরিবহনের ক্ষেত্রে। কিন্তু ইন্ডিয়া আসলে কানেক্টিভিটি ও ট্রানজিটের নামে যা চাইছে সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে তার সেভেন সিস্টার অংগরাজ্যগুলোর সঙ্গে সহজ ও দ্রুত যোগাযোগের রুট।

এটা আসলে করিডোর। নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং সার্বভৌম সমতা সহ বিভিন্ন প্রশ্নে বাংলাদেশ এই করিডোর সুবিধা ইন্ডিয়াকে দিতে পারবে না।সে সময়েই ইন্ডিয়ার এসব প্রস্তাবের বিপরীতে বিএনপি কতিপয় শর্তসাপেক্ষে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব দেয়। সেই ট্রান্সশিপমেন্ট প্রস্তাব ছিল উভয় দেশের জন্য অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে লাভজনক।

এর বিনিময়ে বিএনপি ইন্ডিয়ার কাছে নেপালের জন্য ট্রানজিট সুবিধা এবং পানিবন্টন সংকট ও ছিটমহল সমস্যার নিরসনের শর্ত দিয়েছিল।

ইন্ডিয়া বিএনপির এ প্রস্তাব ও শর্ত মেনে নেয়নি। তখনকার বিরোধীদল আওয়ামী লীগ কখনো জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বিএনপির এ অবস্থানের পক্ষে দাঁড়ায়নি।এরপর ওয়ান-ইলেভেন পেরিয়ে আওয়ামীলীগ আবার ক্ষমতায় এলে ইন্ডিয়া কানেক্টিভিটি ও ট্রানজিটের নামে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে করিডোর লাভের ব্যাপারে তাদের পুরনো প্রচেষ্টা আবারো জোরদার করে। আওয়ামী লীগ সরকারও তাতে সায় দেয়।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার ইন্ডিয়ায় রাষ্ট্রীয় সফরকালে দু’দেশের পঞ্চাশ দফার যৌথ ইশতেহারে ‘ট্রানজিট’ নাম দিয়ে ইন্ডিয়াকে সেই সব সুবিধা দেয়ার সম্মতি ঘোষণা করা হয়।

বিরোধী দলে থেকে বিএনপি সংসদের ভেতরে ও বাইরে সকল ফ্রন্টে সম্ভাব্য সকল পন্থায় এর তীব্র বিরোধিতা করে ও প্রতিবাদ জানায়।

ইন্ডিয়ার তখনকার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকা ও দিল্লীতে দু’টি বৈঠকেই বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অন্ততঃ এই ইস্যুতে বিরোধিতা না করার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ জানান।

বেগম জিয়া শোভন কূটনৈতিক ভাষায় জানিয়ে দেন, বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূল নয় বলে তার পক্ষে এটা নিঃশব্দে মেনে নেয়া সম্ভব নয়।

তিনি আবারো এর বিকল্প হিসেবে শর্তসাপেক্ষ ট্রান্সশিপমেন্ট প্রস্তাবের কথা তুলে ধরেন।ইন্ডিয়া বিএনপির এ প্রস্তাব মানেনি।

তারা যে-কোনো মূল্যে ট্রানজিট চাপিয়ে দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। প্রায় গায়ের জোরে একটি অস্থায়ী প্রটোকল সই করিয়ে নিয়ে পরীক্ষামূলক ভাবে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতীয় যানবাহনে করে সেভেন সিস্টারে মালামাল পরিবহনও তারা শুরু করে দেয়।

এর বিরুদ্ধে বিএনপি এবং একমাত্র বিএনপি ও বেগম খালেদা জিয়াই তীব্র প্রতিবাদ ও আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।

তখন বিএনপি ও খালেদা জিয়াকে ‘কথায় কথা ভারত-বিরোধিতা’ ও ‘শস্তা এন্টি-ইন্ডিয়ান পলিটিক্স’-এর  জন্য দোষারোপ ও ব্যঙ্গ করা হতো।

তাতে না দমে এই প্রতিবাদ জারি রাখার কারণেই শেখ হাসিনা, বাংলাদেশ সরকার এবং আমাদের কূটনৈতিক-প্রশাসনিক টিম ইন্ডিয়ার সংগে কিছুটা বার্গেইনিং করার শক্তি-সাহস-সামর্থ অর্জন করে।

ইতিমধ্যে ইন্ডিয়ার ইলেকশনে কংগ্রেস গিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসে। দীর্ঘ আলোচনায় ইন্ডিয়া অবশেষে সেভেন সিস্টারের সংগে দ্রুত ও সহজে যোগাযোগের জন্য ট্রানজিটের নামে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে করিডোর পাবার অবস্থান স্থগিত রেখে ট্রান্সশিপমেন্ট মেনে নিতে বাধ্য হয় এবং ২০১৮ সালে এ ব্যাপারে দু’দেশের মধ্যে চুক্তি হয়।

বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ইন্ডিয়ার যানবাহন সরাসরি সেভেন সিস্টারে যাওয়া নয়। এখন ইন্ডিয়ার মাল আসবে কন্টেইনারে করে। বাংলাদেশী কোম্পানির জাহাজ তা বয়ে আনবে বন্দরে।

সেই কন্টেইনার বাংলাদেশের পরিবহনে করে আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ছত্রছায়ায় যাবে সীমান্তের স্থলবন্দরে।

সেখানে কাস্টম চেকিংয়ের পর ইন্ডিয়ার অফিসারেরা সে মাল বুঝে নেবে। সম্প্রতি সে চুক্তির পরীক্ষামূলক বাস্তবায়নও শুরু হয়ে গিয়েছে।

তবে বশংবদ এবং গণভিত্তিহীন দুর্বল সরকার হলে যা হয়। বিএনপি ও খালেদা জিয়ার বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে ওরা কিছুটা বার্গেইনিং ক্ষমতা অর্জন করলেও এজন্য কখনো কৃতজ্ঞতা দূরে থাকুক, সামান্য সৌজন্য প্রদর্শনও করেনি।

জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক ঐক্য ও সমঝোতা থাকলে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিমন্ডলে সরকারের বার্গেইনিং ক্ষমতা বাড়ে। ওরা সেটা বিসর্জন দিয়ে নিজেদেরকেই দুর্বল করেছে।

এই চুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশের আরো কিছু সুবিধা পাবার অন্যান্য শর্তগুলো তারা ছেড়ে দিয়েছে। এই চুক্তির পাশাপাশি আমাদের ফেনী নদীর পানি নেয়ার জন্য ইন্ডিয়াকে একতরফা সুবিধা দিয়েও তিস্তার পানি বন্টনের কোনো সুরাহা তারা করতে পারেনি।

বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার, মাল পরিবহন ও নিরাপত্তা ছত্রছায়া দেয়ার ক্ষেত্রে শুল্ক, কর ও সার্ভিস চার্জের হার তারা একেবারেই কমিয়ে রেখেছে। ইন্ডিয়ার পণ্যকে সকল ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়ার শর্ত তারা চুক্তিতে জুড়ে দিয়েছে।

সর্বোপরি ইন্ডিয়াকে এই সার্ভিস দিতে গিয়ে আমাদের বন্দর ও সড়ক সহ বিভিন্ন কাঠামো ও স্থাপনার যে ক্ষতি হবে সে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কোনো রকম করারোপের ব্যবস্থা এই চুক্তিতে নেই।

জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ইন্ডিয়াকে কৃতজ্ঞ রাখাই যাদের উদ্দেশ্য তাদের কাছ থেকে এরচেয়ে ভালো আর কী-ই বা আশা করা যায়?

(মারুফ কামাল খান, ঘাটাইল ডট কম)/-

মহিলাদের স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে জিয়ার অবদান

আন্তর্জাতিক নারী দিবস। মানুষের প্রয়োজন ন্যায্যতা, দিবস নয়। জিয়াউর রহমান মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে নারীদের সমান কাতারে এনেছিলেন। নারী সমাজের উপযুক্ত মর্যাদা দান করে তাঁদের দেশের কাজে লাগানোর ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানই অগ্রদূত। নারীদের সমস্যা ও তাঁদের অবস্থান উন্নতির ব্যাপারে তিনি  সর্বপ্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

দুটি সবল হাত থাকলে কাজ যত সহজে করা যায়, একহাত সে কাজ অসম্ভব হতে পারে। পুরুষ এবং মহিলা সমাজের দুটি হাতের মতন। দেশকে মনের মত গড়তে হলে দু’টি হাতেরই দরকার এবং দু’টোই সবল হতে হবে।” –প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান [দৈনিক দেশ , ৩০ জানুয়ারি ১৯৮১]

তিনি বুঝতেন মেয়েরা শিক্ষিত হলে সেই পরিবারের ছেলে-মেয়েরাও শিক্ষিত হবে। মেয়েদের আত্মবিশ্বাস এবং সমাজে মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য তিনি মেয়েদের গ্রাম প্রতিরক্ষা দলেও অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁর সময়েই গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে ৩৫ লাখ মহিলা সদস্য অন্তর্ভুক্ত হয়। জিয়া বিশ্বাস করতেন কাঠমোল্লাদের আপত্তি স্বত্তেও পুলিসসহ বিভিন্ন বাহিনীতে নারী অংশ গ্রহণ নিশ্চিত করে এগিয়ে যেতে হবে।

আনসার, পুলিশ বাহিনীতে নারীদের নিয়োগ দেন জিয়া। তিনি অনুধাবন করেছিলেন ক্রমবর্ধমান অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রনে ও নারীর ক্ষমতায়নে প্রশাসনের মূল ধারাতে নারীদের অংশ গ্রহণ সমাজকে এগিয়ে দেবে।

মহিলাদের স্বাবলম্বী করতে তিনি মহিলাদের জন্য চাকুরী ক্ষেত্রে শতকরা ১০ ভাগ কোটা বা সংরক্ষিত পদ নির্ধারণ করেন। তিনি বিশেষ কয়েকটি ক্ষেত্র যেমন শিক্ষকতা, এই মর্মে নির্দেশ দেন যে যতদিন না মহিলা কোটা পূরণ হয় ততদিন কেবল মেয়েদেরই নিয়োগ দেওয়া হবে। তাহলে মেয়েদের কোটা পূরণ হতে আর বেশি সময় লাগবে না।

মহিলাদের সমস্যা সমাধানের লক্ষে জিয়া ১৯৭৮ সালে প্রথম  স্বতন্ত্র মহিলা মন্ত্রনালয় স্থাপন করেন এবং মহিলা মন্ত্রী নিয়োগ করেন।

কর্মজীবী মহিলাদের সুবিধার্থে তিনি প্রথম মহিলা কর্মজীবী হোস্টেল নির্মানের ব্যবস্থা করেন । অনেক কর্মজীবী মহিলারা এতে উপকৃত হয়েছেন এবং চাকরিকালে তাঁদের বাসস্থানের সমস্যা অনেকাংশে দূর হয়।

তিনি নারী সমাজকে স্বনির্ভর করতে চেয়েছিলেন। তিনি বুঝতেন যে মেয়েরা নিজেরা যদি উপার্জন ক্ষম হয়, তাহলে সেই পরিবারের সকলের কাছে তাঁর মর্যাদা বেড়ে যাবে এবং নারীদের উপর অযথা হয়রানি ও অত্যাচার কমে যাবে।

তিনি বুঝতেন মেয়েরা শিক্ষিত হলে সেই পরিবারের ছেলে-মেয়েরাও শিক্ষিত হবে। মেয়েদের আত্মবিশ্বাস এবং সমাজে মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য তিনি মেয়েদের গ্রাম প্রতিরক্ষা দলেও অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁর সময়েই গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে ৩৫ লাখ মহিলা সদস্য অন্তর্ভুক্ত হয়।

জিয়া বিশ্বাস করতেন কাঠমোল্লাদের আপত্তি স্বত্তেও পুলিসসহ বিভিন্ন বাহিনীতে নারী অংশ গ্রহণ নিশ্চিত করে এগিয়ে যেতে হবে। আনসার, পুলিশ বাহিনীতে নারীদের নিয়োগ দেন জিয়া। তিনি অনুধাবন করেছিলেন ক্রমবর্ধমান অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রনে ও নারীর ক্ষমতায়নে প্রশাসনের মূল ধারাতে নারীদের অংশ গ্রহণ সমাজকে এগিয়ে দেবে। লিংকঃ https://goo.gl/2eE41U

আজকে সেনাবাহিনীতে নারীরা যোগ দিচ্ছে। শুধু ডাক্তার বা নার্স হিসাবে নয়, সরাসরি যোদ্ধা হিসাবে, গোলন্দাজ বা কমিউনিকেশন ইউনিটে অফিসার হচ্ছেন। এই সিদ্ধান্ত কিন্তু ১৯৮০ সালেই জিয়া নিয়ে ছিলেন।

উনি খুব স্পষ্ট ভাষাতে বলে দিয়েছিলেনঃ “ভবিষ্যৎ সেনাবাহিনীর জন্য মেয়েদের প্রস্তুত হতে হবে।” 

প্রায় প্রতিটি জনসভাতেই তিনি মেয়েদেরকে উপদেশ দিতেন যেন তারা স্বাবলম্বী হয়, কোন না কোন কাজ করে যেন তারা সংসারের আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে সেইসব পরামর্শ দিতেন।

তিনি বলেছিলেন “আপনারা জেগে উঠুন; আপনারা আমাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। আপনারা  সক্রিয়ভাবে জন্ম নিয়ন্ত্রণ করুন ,আপনাদের স্বামীদেরকেও বাধ্য করুন জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অবলম্বনের জন্য” । 

পরিবার পরিকল্পনার কথা এই দেশে এক সময় ভাবাই যেতো না। অথচ জিয়া আগামীর সমস্যা সবাইকে বুঝিয়ে এই দেশে পরিবার পরিকল্পনা প্রকল্প হাতে নেন। মিশরের গ্রান্ড ইমামকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এনেছিলেন দেশে। জন্ম নিয়ন্ত্রণ কেন নাজায়েজ নয়, তা বিস্তারিত বুঝিয়ে ছিলেন অতি রক্ষণশীলদের।

নারী সমাজকে উন্নয়নের মূল স্রোতে আনতে জন্ম-নিয়ন্ত্রণ সহ যে সব উদ্যোগ জিয়া নিয়েছিলেন তার কিছুটা জানতে পারবেন এই লিংকে। https://goo.gl/PjCQQL

চট্টগ্রামের মত রক্ষণশীল এলাকাতেও তিনি এমনি ভাবেই কথা বলতেন এবং মেয়েরাও তাঁর কথাতে প্রাণ পেতো, উল্লসিত হতো; তিনি যে মেয়ের মনের কথাগুলিই বলতেন তা বোঝা যেতো মেয়েদের উল্লাস মুখর আর আন্তরিক হাততালির ধ্বনি থেকে।

মহিলাদের মধ্যে আত্মসচেতনতা ও আত্মবিশ্বাস তিনি জাগাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন পুরুষ ও মহিলা সব্বাইকে দেশের উন্নয়নের কাজে শরিক করতে।

তিনি বলেছিলেন “সেই জন্য আমাদের পার্টিতে মহিলা অঙ্গ দল, যুব মহিলা অঙ্গ দল আছে এবং জাতীয়তাবাদের যে চেতনা রয়েছে,আমাদের যে আদর্শ রয়েছে তাতে আমরা সকলকে অন্তর্ভুক্ত করেছি।আমাদের ধর্মও বলে যে কাজের বেলাতে পুরুষ ও মহিলা সব সমান।”

মেয়েদেরকে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাতে সম্পর্কে সচেতন হতে তিনি সব জনসভাতেই সর্বদা পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলতেন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা একই সূত্রে গাঁথা। পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে স্বাস্থ্য থাকবে না। তাঁর আগে আর কোন নেতা মহিলাদের স্বাস্থ্য রক্ষার ব্যাপারে কোন সক্রিয় মনোভাব বা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নাই। আত্ম-কর্মসংস্থানমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে অগুনতি মহিলা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে জিয়ার আরো একটি কাজ আমাদের জানা থাকা খুব প্রয়োজন। বাংলাদেশে মেয়েদের ফুটবল খেলাকে আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। তার সময় থেকেই মেয়েদের অন্তঃস্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট চালু হয়। ডকুমেন্টঃ  https://goo.gl/zXRVkU

নারীদের যুগোপযোগী করার প্রকৃয়া মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান শুরু করলেও এক্ষেত্রে সবচে শক্তিশালী বাস্তবায়ন অবশ্য মুক্তিযোদ্ধা প্রেসিডেন্ট জিয়ার নয়। সেসব বাস্তবায়ন করেছিলেন একজন ৪০০ টাকার মেজরের গঠিত রাজনৈতিক দলের চেয়ারপার্সন এক নারী, যে নারী আজ কারাগারে বসে প্রতিক্রিয়াশীল শত্রুর বিরুদ্ধে পাঞ্জা লড়ছেন। আমি উন্মুক্ত এ্যকাডেমিক চ্যলেঞ্জ দিতে পারি যে, নারীর ক্ষমতায়ন যুগোপযোগী বাস্তবায়ন করতে বেগম জিয়ার চেয়ে অধিক পারঙ্গমতা এশিয়া মহাদেশে আর কেউ-ই দেখাতে পারেন নি। আমি চ্যলেঞ্জ ছুড়ে দিলাম। আছেন কোন বীরপুঙ্গব চ্যলেঞ্জ গ্রহন করার মত?

তথ্য সহায়তা

▪ অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক বিচিত্রা ▪ এস আব্দুল হাকিম ▪ দৈনিক ইত্তেফাক ▪ অধুনালুপ্ত দৈনিক দেশ

(ওয়াসিম ইফতেখার, অনলাইন এক্টিভিটস)/-

‘দরকার স্বাস্থ্যসেবা খাতের আমুল পরিবর্তন’

স্বাস্থ্যের ডিজিকে সরানো হলো বলে আহ্লাদিত হবার কিছু নেই। ডিজি রোগ ছিলোনা, ছিলো উপস্বর্গ। রোগ যখন সমু্লে বিস্তার করেছে, তখন উপস্বর্গ গেছে বলে তুষ্টির কিছু নেই।

দেশের স্বাস্থ্যের এই হাল একদিনে তো হয়নি। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে তিলে তিলে ধবংস করা হয়েছে। সেজন্য কে কার চেয়ে বেশী জড়িত সেটা নিয়ে আসুন আলাপ করি।

অধিদপ্তরের ডিজিকে একা শাপশাপান্ত করলে অন্যদের প্রতি অবিচার করা হবে। কারন তারা তো সবাই জোট বেঁধে ডিজির মাথায় কাঠাল ভেঙ্গে খেয়েছে বছরের পর বছর।

আমাকে ভুল বুঝবেননা। আমি ডিজির পক্ষে সাফাই গাইছিনা। সে তো অবশ্যই দোষি। প্রথম কোপটা তাকেই খেতে হবে, এটা যেমন সত্যিই, তেমনি একজন ডিজি কিন্তু স্বাস্থ্যের মা বাপ মোটেও নেই। তাকে অপসারন করা হয়েছে।

এটা আরো আগেই করা উচিৎ ছিলো। কিন্তু তার কাছেও তো অনেকের হিসাব নিকাস ছিলো। তাকে সরানো হলে অন্যদের যাতে কোনো অসুবিধায় পড়তে না হয়, সেসব ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে সব আটঘাট বেধে এরপর তাকে সরানো হলো।

শুধু সরানো কেন, তাকে চাকরিচ্যুত করা সময়সাপেক্ষ হলেও, তাকে সাময়িক বরখাস্ত করাটা অত জটিল কিছু ছিলো না। কিন্তু সে দিকে হাটেনি মন্ত্রনালয়, তার সঙ্গত কারনও কিছু আছে নিশ্চয়ই।

বাকিরা যেমন মন্ত্রি, সচিব সহ অন্যরা যদি না চায়, তবে ডিজির একার পক্ষে যেমন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে ফেলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তেমনি, অকাম কুকাম সেটাও করা অনেকটা কঠিন। কারন লাইন মিনিস্ট্রির সহযোগিতা বিনা তার পক্ষে কোনো অপকর্মই করা সহজ কাজ নয়।

সুতরাং ডিজিকে বাইফোর্স এক্সিট দিয়ে বাকিদের সেফ এক্সিট দেয়া হলো কি না, সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বাংলাদেশের মত তৃতীয় অনুনন্নত দেশে (সরকার হয়ত আমার এ কথায় মাইন্ড করবে, তাতে আমার কিছু যায় আসেনা। আমি অন্তত: উন্নয়নশীল দেশের কোনো নমুনা কোথাও খুজে পাইনি, সরকার যতই মুখে এসব গালগপ্প শোনাক আমাদের) যেসব খাতে আন্তর্জাতিকভাবে বেশী সহযোগিতা আসে, বেশী গুরুত্ব দেয়া হয় তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দেশের স্বাস্থ্যখাত।

আর যেখানে যত বেশী মধু,সেখানে তত বেশী মৌমাছি। সেকারনে স্বাস্থ্যখাত কেন্দ্রিক দেশে গড়ে উঠেছে অগুনতি এনজিও, ডাক্তারদের অগুনতি সংগঠন, সেই সাথে আছে বেসরকারি ওষুধ কিম্বা হাসপাতাল কেন্দ্রিক উদ্যোক্তাদের অপরিসিম প্রভাব।

আর সেকারনে এই খাতে কোটি কোটি ডলার বরাদ্দ করা হলেও সমস্যার সমাধান এখনো সদুরপরাহত।

তাই বলছি, শুধু ডিজিকে গিলোটিনে পুরলে কি সমস্যার সমাধান হবে? হবে না। দরকার এই সেকটরের আমুল পরিবর্তন।

সবচেয়ে বড় দরকার রাজনৈতিক সরকারের ভালো কিছু করার আন্তরিকতা। সেটা কারো আছে বলে তো মনে হয়না।

রিজেন্ট হাসপাতাল নিয়ে গত কিছুদিন ধরে এত কথা হচ্ছে, সেই হাসপাতালটা রাতারাতি কিভাবে গড়ে উঠলো? শুধু তাই নয়, তাদের একাধিক শাখাও গড়ে উঠলো।

ইদানিংকালে হাসপাতালের শাখা গড়ে ওঠার একটা হিড়িক লক্ষ্য করি। হাসপাতাল তো কোনো বিপনিবতান নয় যে তার আউটলেট বাড়াতে হবে।

হাসপাতালের শাখা আবার কি!?

হলে একটি পরিপূর্ন হাসপাতাল হতে হবে। সেসব জায়গায় আবার সরকারী ডাক্তাররা সকাল বিকেল রোগি দেখেন।

আসলে কি দেখেন না কি বড় বড় সার্টিফিকেট, বিদেশী ডিগ্রি দেখিয়ে আমাদের দেশের গরিব জনগনের পকেট কাটেন।

সরকারী হাসপাতালের ডাক্তার কেন বেসরকারী হাসপাতালে বসবেন, রোগি দেখবেন। এটা দিনের পরদিন চলে আসছে।

রিজেন্ট হাসপাতালের সাথে করোনারোগিদের ট্রিটমেন্টের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চুক্তি করলো। ঘটা করে চুক্তি হলো। যেন ছায়াছবির মহরত অনুষ্ঠান। সেখানে উপস্থিত থাকলেন, খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

আচ্ছা স্বাস্থ্যমন্ত্রী না হয় থাকলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়েরর সচিব হেলাল উদ্দীন সেখানে কোন ক্রাইটেরিয়ায় উপস্থিত থাকেন।

যিনি কিনা এর আগে ইলেকশন কমিশন সচিব ছিলেন। যাকে দেশের মানুষ উনিশ সালের ডিসেম্বরের মিডনাইট ইলেকশনের কারিগর বলে জানেন।

এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই কারো কাছে।

আমি কখনো স্বাস্থ্যবিটের রিপোর্টার ছিলাম না। তবে, সহকর্মী জুনিয়র যারা স্বাস্থ্যবিটে কাজ করেন, তাদের কাছে শুনেছি এই সেক্টরের হালহকিকত।

সরকারের একটা সংগঠন আছে যার গাল ভরা নাম। স্বাধিনতা চিকিৎসক পরিষদ। এদের কাজ কি কেউ বলতে পারেন।

আর এই কোভিট ১৯ যখন বাংলাদেশে হানা দেয়, তারপর একটা সংগঠন রাতারাতি খোলা হলো যার প্রধান পৃষ্ঠপোষক অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ডা. হাসনাৎ মিল্টন। তাদের কাজটা কি?

আমি শুনেছি, স্বাচিপের কথা ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কোন কাজ হয়না। এমনকি পোষ্টিং পদায়ন পর্যন্ত।

একটা ছোট্ট উদাহরন দেই, তাহলে বিষয়টা খোলাসা হবে।

আমার এক পরিচিত দম্পতি। দুজনেই চিকিৎসক। একজনের পোষ্টিং নীলফামারি, আরেকজনের ঢাকা সলিমুল্লাহ।

তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী রুহুল হক। আমার এক কলিগকে বললাম, স্বামী স্ত্রি এত দুরে। তাদের কোনোক্রমে এক জায়গা পোষ্টিং হলে ভালো হয়। একটু চেষ্টা করবে না কি। আমার কলিগ বললো, দেখি কি করা য়ায়, মন্ত্রিকে বলতে পারি।

তিনি মন্ত্রিকে বললেন, মন্ত্রি অসহায়। তিনি আমাকে বললেন, স্বাচিপেরর সভাপতি কিম্বা এই সংগঠনের সুপারিশ ছাড়া মন্ত্রীও পারেননা কিছু করতে।

আমাকে স্বাচিপের কাছে যেতে বললেন। আমি অসহায়।

সেই দম্পতির আর একসাথে হওয়া হলোনা।

শুধু পোষ্টিং, পদায়ন নয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সব কেনাকাটায় স্বাচিপেের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে, বোধ করি এখনো আছে।

মন্ত্রীর তাহলে কিছু কি করার নেই, অবশ্যই আছে। সব কেনাকাটাও ওপর টেন পার্সেন্ট! এই হচ্ছে দেশের স্বাস্থ্যের অবস্থা।

তাহলে একজন আবুল কালাম আজাদকে সরিয়ে কি কোনো পরিবর্তন আসবে, এখানে। আমি ভরসা পাইনা।

সরকারী হাসপাতালের যেখানে তথৈবচ অবস্থা। তখন রাতারাতি ব্যাংকের ছাতা অথবা তারকা হোটেলগুলোর মত দেশে গড়ে উঠছে বেসরকারী হাসপাতালের রিসিপশনে গেলে ভিমড়ি খেতে হয়!

এটাকি হাসপাতাল না কি তারকা হোটেল। ঠিক এই পর্যন্ত।

তাদের চিকিৎসা সুবিধার কথা বললে, শব্দের অপচয় করা হবে।

সরকার এদের শুধুমাত্র লাইসেন্স দিয়েই খালাস। এসব হাসপাতালের মান কেমন, রোগিদের প্রতি তাদের আচরন কেমন, সঠিক চিকিৎসা সেবা রোগিরা পাচ্ছেন কি না.. সে সব বিষয়ের নেই কোনো তদারকি।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে কে করবে তদারকি কার ঘাড়ে কয়টি মাথা।

মোটা টাকার বিল, লাশ হয়ে রোগি ফিরছে। অনেক সময় টাকা না দিলে লাশও বের হতে দিচ্ছেনা। আছে কোনো জবাবদিহিতা। অবশ্য কে করবে জবাবদিহিতা। এরা যে যখন সে সরকার তার ঘনিষ্ট। এত বড় প্রভাবশালীদের ঘাটাতে গিযে নিজের চাকরী কিম্বা জীবন বিপন্ন করতে কে চায়!

আমাদের দেশের সরকারের কোনো মন্ত্রী, এমপি কিম্বা কথিত টাকাওয়ালারা দেশের চিকিৎসার ওপর ভরসা করেনা। এমনকি তাদের হাতে গড়া তারকা হাসপাতালের প্রতিও নয়।

তারা জানেননা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা এখন কতটা সঙ্গিন! কতটা ভেঙ্গে পড়েছে।

আমার বাসা মিরপুর আমি বাসে প্রতিদিন, বাসে অফিসে যাওয়ার পথে সোহরাওয়ার্দি হাসপাতালের সামনে একটি বিলবোর্ড দেখি। সেখানে লেখা আছে, আমাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেবেননা। আমি দেশেই চিকিৎসা নেব।

এই লেখাটি যে কতখানি প্রানে বাজে এ দেশের মানুষের, সেটা ওরা তথন উপলব্দি করে, যখন, ওদের কোনো স্বজন অসুস্থ হলেও সরকারী হাসপাতালে কোনো বেড পায়না..

ওরা তখনি উপলব্দি করে যখন দেখে ওদের রাষ্ট্রপতি কদিন কদিন পর পর বিদেশে চিকিৎসার জন্য উড়াল দেন!

(মুজতবা খন্দকার, ঘাটাইল ডট কম)/-

পানি ও স্নায়ু যুদ্ধ, মজলুমের কথা

‘খরা কালে পোড়াও, বর্ষাকালে ভাসাও’ এ কেবল আর বাংলাদেশ-ভারত পানি সমস্যার উপাখ্যান নয়। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশ নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, পাকিস্তান এমনকি চীনও এই পানি সমস্যা নিয়ে ভাবছে এবং একে অপরকে ভাবাচ্ছে।

বাংলাদেশ অবশ্য বছরের পর বছর ধরে খরা-বন্যা সহ্য করেও সর্বোচ্চ সহনশীলতা দেখিয়ে ভারতের বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষা করে আসছে। এক্ষেত্রে ভারত খুব সহজেই ফারাক্কা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর সমস্যা সমাধান করে বাংলাদেশকে আস্থায় নিতে পারতো।

বিশেষ করে অবস্থাটা যখন এমন খোদ ভারতের অভ্যন্তরেই ফারাক্কা বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে কথা উঠছে, প্রতিবাদ হচ্ছে। কিন্তু ভারত সেদিক থেকে খুব বেশি বাস্তবিক সমাধানের পথে হাঁটেনি। তার চেয়ে বরং লাল ফিতার ঘেরাটোপে প্রলেপ দেয়ার চেষ্টা করেছে।

ক্ষতটা তাই ক্রমেই করোনার মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

হঠাৎ করেই নেপাল কিংবা ভুটানের প্রতিবাদী আচরণ শুধু ভারতকেই ভাবিয়ে তুলছে না; এতদঞ্চলের শান্তি ও সংহতির পথকে কন্টকাকীর্ণ করে তুলছে।

কথায় আছে ছোটও বটে\ফুল তবে\অবহেলা করো না। আমার তো মনে হয় এই অঞ্চলের ছোট দেশগুলোর প্রতি ভারতের দীর্ঘদিনের অবহেলার সুযোগ চীন, আমেরিকাকে প্রলুব্ধ করছে।

বিশেষ করে চীন তো পানি নিয়ে রীতিমতো পানি ঘোলা করে সেই পানিতে শুধু মাছ নয় হাঙর তিমি শিকার করার চেষ্টা করছে।

ভারত-চীন দ্বন্দ আর আমেরিকার ইন্ধন রীতিমতো এই অঞ্চলকে ঘিরে আধিপত্যের নতুন খেলায় মেতে উঠেছে। পানি পথের রূপক যুদ্ধকে বাস্তবে পানি যুদ্ধের ক্ষেত্র বানাতে চাইছে। উভয় দেশই নিজেদের শক্তিমত্তা আর মোড়লগিরি চটাতে চাইছে। এতে করে বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচালে শুধু আঞ্চলিক নয় অভ্যন্তরীণ সংহতিও হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে।

পানি যতটা না তৃষ্ণা নিবারণের উপকরণ, তার চেয়ে বেশি রাজনীতির ঘুঁটি হচ্ছে। সেই পানিতে বড় নাক ছোট নাক দেদারছে গলে যাচ্ছে। আর আমাদের মতো নাক ছাড়া ছোট দেশগুলো টিভি সেটের সামনে বসে সেই থ্রিল দেখছি। মাঝে মাঝে খেদ প্রকাশ করছি।

বাস্তবে শুকনো মৌসুমে চুইয়ে পড়া পানির আশায় জিহবা টান টান করে রাখি আর বর্ষাকালে ভাসাইলিরে ডুবাইলিরে গান গাই। ভুলে গেলে চলবে না প্রকৃতির চেয়ে মানুষ কি বেশী শক্তিশালী? যদি তাই না হয় প্রকৃতির বিরুদ্ধাচারণ করে তৈরীকৃত বাঁধ, ব্যারেজ, ড্যাম, রাবার ড্যাম নিদান কালে কারোর জন্য কোনো কাজে আসবে না। দিন শেষে মানুষের ভোগান্তি বাড়াবে।

জনতার মৈত্রী ও সংহতি নষ্ট হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে দূরত্বই বাড়তেই থাকবে। অন্ততঃ করোনাকাল আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে একা একা ভালো থাকা যায় না; সবাইকে নিয়েই ভালো থাকতে হয়।

তাই এখনও অনুধাবন করার সময় আছে ‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।’

য়তো সবাই মিলে একদিন পানির জন্য কারবালার কোরাস গাইতে হতে পারে।

আবারো বলছি উজান ভাটির দেশসমুহের পানিসহ অন্যান্য অমীমাংশিত বিষয়সমূহ ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাধানে ভারতকেই অগ্রনী ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোকে আস্থায় নিতে হবে।

অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য ভারত বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধুপ্রতিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও বহু দিন ধরে যৌথনদীগুলোর সমস্যা সমাধানে তালবাহানা ছাড়া কার্যকরী কোন ভূমিকা পালন করছে না।

তাই এতদঞ্চলের জনসাধারণের মনে ভারতের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই বড় হচ্ছে। এই মনোভাবের প্রকাশ্য বিরোধীতাও সরব হচ্ছে। বল এখন ভারতেরই কোর্টে। তাদের সহনশীল ও মানবিক উপলব্ধির ওপর এতদঞ্চলের শান্তি ও সংহতি অনেকাংশে নির্ভর করছে।

আমার মনে হয় ভারত যদি আজ তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হতো তাহলে চীনও এতোটা আশকারা পেতো না।

সমাধানের পথ হিসেবে ২০১৪ সালের ১৭ আগষ্ট কার্যকর হওয়া ‘আন্তর্জাতিক নদীধারা সনদ’টিকে সামনে আনা যেতে পারে।

এই সনদের ৭.১ ধারায় বলা হয়েছে যে, উজানে কোন দেশ আন্তর্জাতিক নদীর পানি এমনভাবে ব্যবহার করতে পারবে না যাতে ভাটির দেশের কোন ক্ষতি হয়। অববাহিকার এসব দেশের ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ, পানি ব্যবহার নিয়ে বিরোধ, আন্তর্জাতিক আদালত, পরিবেশ রক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে ওই সনদে।

ধারা ৭.২ তে বলা হয়েছে যে, উজানের দেশের পানি ব্যবহারের ফলে ভাটির দেশের ক্ষতি হয় তাহলে তাকে (ভাটির) দেশের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

সনদটিকে কার্যকর করতে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক নদী কমিশন গঠন করা যেতে পারে। যাতে করে এক দেশ বা অঞ্চল ওপর কোন দেশ বা অঞ্চলের ওপর যেন উদ্দেশ্যমূলকভাবে পানি আগ্রাসন চালাতে না পারে।

স্নায়ুযুদ্ধের কৌশল হিসেবে মরুকরণ বা বন্যায় ভাসাতে না পারে। এসব দিক বিবেচনায় রেখে অত্রাঞ্চলের জীববৈচিত্র রক্ষাসহ জনগণের মৈত্রী ও সংহতিকে প্রাধান্য দিয়ে এখনই সময় প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সন্দেহ, অবিশ্বাস, দূরন্ত কমিয়ে আনা।

এক্ষেত্রে অত্রাঞ্চলের জনসাধারণের মাঝে অভিন্ন ভ্রাতৃত্ব ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন আমাদের পথ দেখাতে পারে। হাজার বছর ধরে একসাথে শান্তিতে বসবাস করার নজীর আমাদের রয়েছে।

জনগণের এই ঐক্যকে পানি আগ্রাসন দিয়ে নস্যাৎ করার প্রচেষ্টা রুখতে হবে। আসুন সবাই মিলে আওয়াজ তুলি, পানি আগ্রাসন নিপাত যাক। জনতার মৈত্রীর জয় হোক।

(আজাদ খান ভাসানী/ সভাপতি, মওলানা ভাসানী কৃষক সমিতি ও সাধারণ সম্পাদক, ভাসানী পরিষদ, মাভাবিপ্রবি সন্তোষ, টাঙ্গাইল)/-

এমাজউদ্দীন আহমদ অনন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আদর্শ শিক্ষক

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষকতার পাশাপাশি গবষেণায় সংশ্লিষ্ট থাকেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক অবশ্যই একজন গবেষকও হবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ শুধু একজন আদর্শ শিক্ষক ও গুরুত্বপূর্ণ গবেষকই নন; তিনি বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়ন ও গবেষণায় আগ্রহী পরের প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব।

বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত থেকেও তাঁর আন্তরিক ও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়ন, পাঠদান ও গঠনে যে কয়েকজন প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বের অবদান স্মরণীয়; তিনি তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

এককথায় বললে, বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তাঁর মূল অবদান হলো সুনির্দিষ্ট গবেষণাপদ্ধতি ও তত্ত্ব অনুসরণ করে বিভিন্ন ইস্যুতে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষায় বিস্তৃত পরিসরে গবেষণা করা ও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছা।

রাজনীতি, বিজ্ঞান অধ্যয়নের বিস্তৃত পরিধির বিভিন্ন ক্ষেত্রে, একাডেমিক ডিসকোর্সে স্বীকৃত লেখনীর মাধ্যমে তিনি অনন্য অনুরণন সৃষ্টি করতে পেরেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘১৪০০ সাল’ কবিতার পঙ্‌ক্তি ধার করে বলা যায়, অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ সৃষ্ট এই অনুরণন ‘অনুরাগে সিক্ত’ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তরুণ অধ্যয়নকারীদের উজ্জীবিত করতে পেরেছে; যা ‘শতবর্ষ’ পেরিয়েও বেঁচে থাকবে।

অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের নিকট স্মরণীয় হয়ে আছেন। শ্রেণিকক্ষে যাঁরা সরাসরি উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের নিকট থেকে শুনেছি যে স্যার অসাধারণভাবে গুছিয়ে কথা বলতেন। তাঁর বক্তব্য সাবলীল ছিল। আলোচনায় ছিলেন উদার ও নিরপেক্ষ।

একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক হিসেবে তিনি শ্রেণিকক্ষে সঠিক সময়ে প্রবেশ করতেন এবং বিষয়ভিক্তিক বক্তব্য দিতেন।

আমাদের এই প্রজন্ম সরাসরি শ্রেণিকক্ষে তাঁর ছাত্র হতে না পারলেও বিভিন্ন সময় আলাপচারিতায় দেখেছি, তিনি বিষয়ের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রেখে শ্রোতাকে সম্পৃক্ত করে কথা বলতেন। তাঁর শব্দচয়ন ও বাচনভঙ্গি উল্লেখ করার মতো।

কঠিন বিষয়কে তাত্ত্বিক ভিত্তি দিয়ে গল্পাকারে ব্যাখ্যা করতেন।

ব্যক্তিগতভাবে আমার একবার সৌভাগ্য হয়েছিল গণতন্ত্রের ওপর স্যারের তত্ত্বাবধানে কাজ করার। তিনি আমার লেখা পড়ে আমাকে সুমিষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন, তত্ত্বকে কীভাবে বাস্তব ইস্যুতে ব্যাখ্যা করা যায়। যেখানে তত্ত্ব থাকবে বাস্তবতার আড়ালে।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়নের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত দেওয়ার কর্তৃত্বও তাঁর ছিল। এর একটি প্রধান কারণ হলো পদ্ধতিগতভাবে গবেষণার বেলায় তাঁর দক্ষতা।

বিশ্ববিখ্যাত কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইডি ডিগ্রি অর্জন করতে গিয়ে পশ্চিমা ধাঁচের একাডেমিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি হয়তো পদ্ধতিগত গবেষণার ক্ষেত্রে এ দক্ষতা অর্জন করেছেন।

তাঁর গ্রন্থ বা প্রবন্ধ অধ্যয়ন করলে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে গবেষণায় সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন রয়েছে এবং পদ্ধতিগতভাবেই গবেষণা করে তিনি সেই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর দিচ্ছেন।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়নে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি প্রয়োগের একটি সংকট ছিল, যা তিনি পূরণ করার চেষ্টা করেছেন।

অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন গবেষক। গুগল স্কলার পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ৩৭৩ বার তাঁকে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় তাঁর আগ্রহের বিষয়গুলো ছিল আমলাতান্ত্রিক এলিট, বাংলাদেশে ইসলাম, সামরিক শাসন ও গণতন্ত্র, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা ও ভারতের ভূমিকা, বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রশাসন ও কৌশল এবং বাংলাদেশে সমাজ ও রাজনীতি।

বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ কর্তৃক রচিত অসংখ্য গ্রন্থ রয়েছে। এশিয়ান সার্ভে, ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল সায়েন্স রিভিউ, ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলিসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে তাঁর নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য গবেষকদের থেকে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ এ কারণে ব্যতিক্রম যে তিনি ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষায়ও অনেক গ্রন্থ ও নিবন্ধ লিখেছেন।

বাংলায় লিখিত তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো সমকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতি, আমার দেশ, গণতন্ত্রের শত্রু মিত্র, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, মধ্যযুগের রাষ্ট্রচিন্তা, আধুনিক রাষ্ট্র, পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রবন্ধ।

অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ রচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হলো ‘ব্যুরোক্রেটিক এলিটস ইন সেগমেন্টেড ইকোনমিক গ্রোথ: পাকিস্তান অ্যান্ড বাংলাদেশ’ (Bureaucratic elites in Segmented Economic Growth: Pakistan and Bangladesh)।

এ গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন, পাকিস্তানে আমলাতান্ত্রিক এলিট কর্তৃক গৃহীত উন্নয়নের কৌশল কীভাবে পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক সুবিধাভোগী শ্রেণির কাজে এসেছে। গণতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীর স্বার্থের বিষয়ে গবেষণায়ও তাঁর ব্যাপক আগ্রহ ছিল।

তিনি তাঁর মিলিটারি রুল অ্যান্ড দ্য মিথ অব ডেমোক্রেসি (Military Rule and the Myth of Democracy) গ্রন্থে বলেছেন, ‘যে সকল দেশে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল ও অস্থিতিশীল এবং দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনায় রাজনৈতিক এলিটদের সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হয়; সে সকল দেশে সামরিক বাহিনীর করপোরেট স্বার্থ নষ্ট করে রাজনৈতিক এলিটগণ সাধারণত দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকতে পারে না।’

সার্ককে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার সংহতির বিষয়েও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। সার্ক: সিডস অব হারমনি (SAARC: Seeds of Harmony) হলো এ প্রসঙ্গে তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

এ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন যে একটি কার্যকর সার্ক দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থেই প্রয়োজন, যা এই অঞ্চলের ছোট-বড় সব রাষ্ট্রের জন্য অর্থবহ সভার একটি ফোরাম হিসেবে কাজ করবে।

উপরোল্লিখিত বিষয়গুলো ছাড়াও অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ছয় দফা কর্মসূচি ও এর শ্রেণি ভিত্তি এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বিষয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর এসব গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ফলে বাংলাদেশের রাজনীতি অধ্যয়নের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে এবং রাজনীতিচর্চা সমৃদ্ধ হয়েছে।

‘রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কথা’ এবং ‘তুলনামূলক রাজনীতি: রাজনৈতিক বিশ্লেষণ’ নামে বাংলায় লিখিত তাঁর গ্রন্থ দুটি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের প্রথমিক ধারণা সুস্পষ্টকরণে বিশেষ অবদান রাখছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তাঁর গবেষণার সব ইস্যুই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গবেষণার কাজে বিশেষ অবদান রাখবে। বিশেষ করে বাংলা ভাষায় রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়নের যে পরিধি তিনি বিস্তৃত করেছেন, তা তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে।

গণবুদ্ধিজীবী হিসেবেও তাঁর অবদান শীর্ষস্থানীয়। সমসাময়িক ও রাজনৈতিক বিষয়ে তিনি বাংলাদেশের স্বনামধন্য দৈনিক পত্রিকা, সাপ্তাহিক ও মাসিক সাময়িকীগুলোতে লিখতেন।

অনেক সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রদান করতেন। লেখালেখি ও সাক্ষাৎকারে তিনি সমকালীন বিষয়ে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিতেন। সত্যিই বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পরিবার তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অভিভাবক হারাল।

অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ যখনই কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব পেয়েছেন, তা দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন এবং সফল হয়েছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের উপ-উপাচার্য ও পরবর্তী সময়ে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার স্বনামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন।

ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভের উপাচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। গবেষণা ও কর্মক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি বিশেষভাবে সম্মানিত হয়েছেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে অনবদ্য অবদানের জন্য ১৯৯২ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন।

ব্যক্তিজীবনে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন সদালাপী ও মিষ্টভাষী। তিনি অল্প সময়েই সবাইকে কাছে টেনে নিতে পারতেন।

প্রথম পরিচয়েই তাঁর মধ্যে আন্তরিকতার কোনো অভাব ছিল না। সরাসরি রাজনৈতিক দলের কর্মী না হলেও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি রাজনৈতিক মতামত প্রদানে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করতেন।

জন্মের সঙ্গে মৃত্যু অনিবার্য। অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ মৃত্যুবরণ করলেও সামাজিক বিজ্ঞান, বিশেষ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষকদের মধ্যে তিনি দীর্ঘকাল বেঁচে থাকবেন।

(কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)/-

ভাবমূর্তি সংকটের মুখে বাংলাদেশ

 

সাম্প্রতিক সময়ে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কয়েকটি সংবাদ প্রচারিত হয়েছে, যা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে নষ্ট করেছে।

গত ১০ জুলাই এর খবর ছিল এ রকম : নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইতালি, জাপান ও কোরিয়া। অর্থাৎ এসব দেশে বাংলাদেশিরা আপাতত আর যেতে পারছেন না।

কারণ ওইসব দেশে যেসব বাংলাদেশি অবস্থান করছিলেন তারা যখন ফিরে যান, তখন তাদের শরীরে কভিড-১৯ ‘পজিটিভ’ ধরা পড়ে।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ইতালির নাগরিকরা করোনাভাইরাস ‘নেগেটিভ’ সার্টিফিকেট নিয়ে রোম বিমানবন্দরে অবতরণ করলে তাদের শরীরে করোনাভাইরাস ‘পজিটিভ’ ধরা পড়ে। ফলে তাদেরকে আর ইতালি ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তাদের সবাইকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

এই ঘটনায় আকাশপথ বন্ধের ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে ইতালি আগামী এক সপ্তাহ বাংলাদেশ থেকে আসা সব ফ্লাইটে নিষেধজ্ঞা আরোপ করেছে।

ইতালির পর তুরস্কও ঢাকা থেকে সরাসরি ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশও বাংলাদেশিদের জন্য ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

চীনের চায়না সাউদার্নও ঢাকায় ফ্লাইট চালাতে পারছে না। এর কারণ হিসেবে যা জানা যাচ্ছে, তা হচ্ছে বাংলাদেশি যাত্রীদের কাছে ভুয়া করোনা ‘নেগেটিভ’ সনদ। এদের অনেকেরই করোনা ‘পজিটিভ’ ছিল। কিন্তু তারা ভুয়া করোনা ‘নেগেটিভ’ সনদ সংগ্রহ করে।

সম্প্রতি ঢাকার রিজেন্ট হাসপাতালে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে দেখতে পায় যে, সেখান থেকে কোনো পরীক্ষা না করেই করোনাভাইরাস ‘নেগেটিভ’ রিপোর্ট দিয়েছে, শুধু টাকার বিনিময়ে।

প্রায় কয়েক কোটি টাকা এভাবেই ‘আয়’ করেছে রিজেন্ট হাসপাতাল, যে প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদনের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।

ইতালিতে ঢুকতে না দেওয়া বাংলাদেশ বংশোদ্ভূত ইতালিয়ান নাগরিকদের অনেকেই এই হাসপাতাল থেকেই ভুয়া রিপোর্ট সংগ্রহ করেছিলেন।

রিজেন্ট হাসপাতালের পাশাপাশি আরও একটি প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া গেছে, যারা ভুয়া সার্টিফিকেট ইস্যু করেছিল টাকার বিনিময়ে।

এই প্রতিষ্ঠানটির নাম জেকেজি। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে কোনো পরীক্ষা না করেই জেকেজি ১৫ হাজার ৪৬০ জনকে করোনার টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট সরবরাহ করেছিল।

ওইসব টেস্টে জনপ্রতি নেওয়া হতো সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা। বিদেশিদের কাছ থেকে একশ’ ডলার। আর এভাবেই তারা হাতিয়ে নিয়েছে সাত কোটি ৭০ লাখ টাকা। অথচ তাদের কোনো ল্যাব বা পরীক্ষাগার ছিল না।

সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত জেকেজি হেলথের চেয়ারম্যান জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের ডাক্তার সাবরিনা চৌধুরী ও তার স্বামী আরিফ চৌধুরী।

সংবাদপত্রে তাদের সম্পর্কে প্রতিবেদন এলেও, ডা. সাবরিনা জানিয়েছেন জেকেজির সঙ্গে তিনি জড়িত নন। ইতালি থেকে যাদের ফেরত পাঠানো হয়, তাদের মাঝে কেউ কেউ এই জেকেজির ভুয়া সনদধারী করোনা রোগীও থাকতে পারেন।

একজন সাহেদ কিংবা সাবরিনা-আরিফ জুটি বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে কোথায় নিয়ে গেছেন, তা ইতালির প্রধানমন্ত্রী জুসেপ্পো কন্তের একটি মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়।

বাংলাদেশের সঙ্গে ইতালির ফ্লাইট বন্ধের যৌক্তিকতা তুলে ধরে কন্তে সম্প্রতি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ থেকে আসা বেশিরভাগ যাত্রীর মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত হচ্ছে। একেকজন বাংলাদেশি একেকটা ‘ভাইরাস বোমা’ (ইত্তেফাক, ১১ জুলাই)। কী সাংঘাতিক কথা!

একেকজন বাংলাদেশি ভাইরাস বোমা! কন্তে একটি প্রশ্ন তুলেছেন- এসব নাগরিকরা কীভাবে বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন পার হলো যেটা অবশ্যই ভাবার বিষয়।

আমাদের ভাবনার জায়গাটা এখানেই- ভুয়া সনদ আর ইমিগ্রেশন পার হওয়ার বিষয়টি। আমরা যারা নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণ করি, একজন বিদেশি প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের বক্তব্য আমাদের জন্য কি কোনো শঙ্কা তৈরি করে না?

লাখ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে যান, কাজ করেন, বিদেশের নাগরিকত্ব নিয়ে অনেকে বিদেশে বসবাস করেন। ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক লাখ বাংলাদেশি বসবাস করেন।

ইতালির ঘটনাবলি যখন বিশ্বের শীর্ষ সংবাদপত্রগুলোতে ছাপা হয়, তখন আমাদের ভাবমূর্তি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? শত শত বাংলাদেশি এখন নানা জটিলতায় জড়িয়ে পড়বেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশনের কড়া নজরদারিতে এরা পড়ে যাবেন এখন। এরা বাংলাদেশের কোনো রিপোর্টকেই আর গ্রহণ করবে না। ফলে নতুন নতুন আইন, বিধিনিষেধ আর ডিপোর্টের মুখোমুখি হবেন তারা।

করোনাভাইরাসের ভুয়া রিপোর্ট যখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছাপা হয়েছে তখন আরেকটি সংবাদ আমাদের শঙ্কার জায়গাটা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এবারের ঘটনা ভিয়েতনাম।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেন আমাদের জানালেন, ২৭ জন বাংলাদেশি ভিয়েতনামে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ‘দখল’ করে নিয়েছে (ডেইলি স্টার, ৭ জুলাই)।

কী সাংঘাতিক কথা? দূতাবাস দখল? স্বয়ং পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন সে কথা!

জানা গেল, এসব বাংলাদেশি দালালদের খপ্পরে পড়ে ভিয়েতনামে গিয়েছিলেন এবং তারা সবাই সরকারি খরচে দেশে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন। এ জন্যই তারা গিয়েছিলেন দূতাবাসে।

দূতাবাস তাদের দেশে ফিরে আসার ব্যবস্থা করলেও, তারা টিকিটের টাকা দিতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন এই ঘটনাকে ‘দূতাবাস দখল’ ও এর সঙ্গে ডাকসুর ভিপিকে জড়িয়ে মন্তব্য করেন, তখন তা গুরুত্ব পায় বৈকি!

আসলেই কি এরা ‘দূতাবাস দখল’ করতে গিয়েছিলেন? এ ধরনের মন্তব্য করা কি একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর শোভা পায়?

আসল জায়গায় ফিরে আসি। একটা দালালচক্র বাংলাদেশিদের ভিয়েতনাম নিয়ে গেছে, সেখান থেকে তাদের অস্ট্রেলিয়ায় পাচার করবে বলে। ভিয়েতনামে বিদেশিদের জন্য কোনো কাজের জায়গা নেই।

মধ্যপ্রাচ্যের মতো ভিয়েতনামে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন নেই। তাদের জনশক্তি তাদের নিজ দেশের চাহিদার জন্য যথেষ্ট। অথচ দালালচক্র তাদের ভিয়েতনাম পাঠিয়েছিল।

প্রশ্নটা এখানেই- হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্তব্যরত ইমিগ্রেশনের স্টাফরা ভিয়েতনামগামী বাংলাদেশিদের সেখানে যাওয়ার অনুমতি দিলেন কীভাবে? কোন ভিসায় তারা সেখানে গিয়েছিলেন? নিশ্চয়ই ‘ওয়ার্ক ভিসা’ তাদের ছিল না! ট্যুরিস্ট ভিসার সম্ভাবনা বেশি।

ইমিগ্রেশন অফিসাররা কী এটা বুঝবেন না কারা এবং কী উদ্দেশ্যে সেখানে যাচ্ছেন? এখানে ‘হিসাব’টা সহজ। দালালচক্র জানে কীভাবে, কোন উপায়ে, কোন পদ্ধতিতে এসব লোকদের বিমানবন্দর ‘পার’ করতে হয়! সবচেয়ে বড় কথা, ভিয়েতনামে ‘লোক পাঠানোর’

ঘটনা এই প্রথম নয়।

পাঠকদের ২০১৯ সালের ৯ মার্চে নিউএজে প্রকাশিত একটি রিপোর্টের দিকে দৃষ্টি দিতে অনুরোধ করি। এক বছর আগের সংবাদ- বলা হচ্ছে, বাংলাদেশিদের প্রলুব্ধ করে দালালচক্র ভিয়েতনামে ‘লোক’ পাঠাচ্ছে!

এভাবে দালালচক্র ভিয়েতনামে বাংলাদেশিদের পাঠিয়েছে। এদের টার্গেট ভিয়েতনাম নয়, টার্গেট অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ড। দালালরা নৌকায় করে তাদের অস্ট্রেলিয়ায় পাঠায়। প্রায় ক্ষেত্রেই সমুদ্রে এরা অস্ট্রেলিয়ার কোস্টগার্ডের নজরে আসে, তারপর তাদের স্থান হয় ক্রিসমাস কিংবা কোকোস দ্বীপপুঞ্জের ‘ডিটেনশন সেন্টারে’। কিংবা পাপুয়া নিউগিনির লস নেগরোস দ্বীপে।

কতজন বাংলাদেশি এসব ‘ডিটেনশন সেন্টারে’ এখনও আছেন, তার খবর আমরা কোনোদিনই পাব না।

ইতালি আর ভিয়েতনামের ঘটনায় বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। প্রায় ক্ষেত্রেই এসব ঘটনায় যারা জড়িত থাকেন, তাদের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা যায় না।

আমরা সাহেদ, সাবরিনা-আরিফদের খবর জেনেছি। কিন্তু ভিয়েতনামের ঘটনায় কারা তাদের সেখানে পাঠিয়েছিল, আমরা তাদের পরিচয় জানি না। ঘুষ, দুর্নীতি, শৈথিল্য, অদক্ষতা, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেওয়া বাংলাদেশকে আজ কোথায় নিয়ে গেছে, এই দুটো ঘটনা তার বড় প্রমাণ।

(ড. তারেক শামসুর রেহমান, ঘাটাইল ডট কম)/-

দেশকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে সাংবাদিকতা প্রয়োজন

দেশ ছেয়ে গেছে দুর্নীতিতে। যেদিকে তাকাই, সেদিকেই দুর্নীতির কালো ছায়া। দুর্নীতির ঘোর অন্ধকার কেটে কবে জাতি আলোর সন্ধান পাবে এটাও অনিশ্চিত।

তবুও চিল্লাই না। চিল্লাইয়া কি মার্কেট পাওয়া যাবে? সমাধান হবে ? অবশ্যই না।

জীবন নিয়ে শাহেদ সাবরিনার কান্ড দেখে ভাবলাম, সিংহ হয়ে ঘুমিয়ে থাকার চেয়ে কুকুরের মতো চিৎকারে লাভ না হলেও ক্ষতি হবে না। এজন্য লেখার আগ্রহ হলো।

দুর্নীতির কয়টা খবর আমরা পাই? যতোগুলো গণমাধ্যমে উঠে আসে তাতেই দম বন্ধ হয়ে যায়। দপ্তরে-দপ্তরে দুর্নীতি। দেশ এগুবে কিভাবে? মন্ত্রীর কালো বিড়াল থেকে ছাত্রনেতা। কর্মকর্তা থেকে কর্মচারী।

তৃণমুলে দেশের সবচেয়ে বৃহৎ সেবা কেন্দ্র ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্রে । এখানে রয়েছে সীমাহীন দুর্নীতি আর হয়রানী।

দুর্নীতি রোধে রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। অথচ সেই দুর্নীতি দমন কমিশনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ। পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অহরহ দুর্নীতির অভিযোগ।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক এবং পুলিশের এক ডিআইজির মধ্যে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ তদন্ত করে দুজনেরই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানিয়েছিলেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

কর্মকর্তারা কিভাবে দায়িত্ব পালন করছে? এদের কাজের জবাবদিহিতা কতোটুকু?

২০১২ সালে সোনালী ব্যাংকের সাথে হলমার্ককান্ডে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা জালিয়াতি। অথচ ২০১৩ সালের আগস্টে জামিন পান হলমার্কের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা রাখা সোনা শংকর ধাতু হয়ে যায়। দিনাজপুরের বড়পৃুকুরিয়ার কয়লার খনি থেকে দেড় লাখ টন কয়লা গায়েব হলো।

পাবনার রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকায় প্রকল্প কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের থাকার জন্য গ্রিন সিটি আবাসন পল্লীতে প্রতিটি বালিশ কিনতে খরচ দেখানো হলো ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা। আর বালিশ ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ৭৬০ টাকা।

কৃষি খামার থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকার ১২৯ মট্রিক টন ধানের বীজ পাচারের অভিযোগ। ঝিনাইদহের মহশেপুর উপজেলার দত্তনগর কৃষি খামারের তিন উপপরিচালকসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। কর্মকর্তারা অতিরিক্ত বীজ উৎপাদনের পরিমাণ নিয়ম অনুযায়ী মজুত ও কাল্টিভেশন রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করেননি। এমনকি অতিরিক্ত কোনো বীজ পাঠানোর কোনো চালান বা তথ্য প্রমাণ খামারে রাখেননি ।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৭ লাখ টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে আইসোলেশন কক্ষের পর্দা । একটি আমেরিকার তৈরি ভিএসএ অনসাইড অক্সিজেন জেনারেটিং পাঁচ কোটি ২৭ লাখ টাকা।

খাগড়াছড়ির ৬-আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) ঘর মেরামতের কাজে দুই বান টিনের দাম ১৪ লাখ টাকা ।

এরপর ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে ৮৬ কোটি টাকা চাঁদা চাওয়ার অভিযোগটি স্পষ্ট করে দিয়েছে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও আমাদের দেখে ভুল পথে যাচ্ছে। এবার শাহেদের ঘটনায় আমরা মানুষের জীবন নিয়েও খেলতে দ্বিধা করিনা।

এখান থেকে বেড়িয়ে আসা জরুরি। সরকার যদি এখান থেকে দ্রুত বেড়িয়ে না আসতে পারে তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে সরকারেই। এর সাথে সহযোগিতা করা প্রয়োজন সাংবাদিকদের। স্বচ্ছ সাংবাদিকতা দুর্নীতি দমন করতে পারে। স্বচ্ছ সাংবাদিকতার সামনে দুর্নীতি হতে পারে না। আর যদি সাংবাদিকতা বিকল হযে পড়ে ঘুরে দাড়ানোর আর কোন রাস্তা থাকে না।

(রেজাউল করিম, ঘাটাইল ডট কম)/-

‘করোনায় সৃষ্ট ভোগান্তি উচ্চবর্গের তুলনায় নিম্নবর্গের উপরেই বেশি’

জীবাণুও ঈশ্বরের মতন। অদৃশ্য কিন্তু শক্তিমান। ধনী-গরীব, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে সমান চোখে দেখে। চরিত্রের বিবেচনায় করোনাভাইরাসকে তাই সমাজতান্ত্রিক বলেও চিহ্নিত করা যায় বৈকি!

কিন্তু ভুলে গেলে চলবে কেন, পূবে-পশ্চিমে সমাজ কাঠামোটা ধনতান্ত্রিক। পুঁজিবাদী সমাজে এসে সাম্যবাদী ভাইরাসও তার চরিত্র খুইয়েছে। মানে করোনাভাইরাস-জনিত মহামারিতে সৃষ্ট আর্থ-সামাজিক ভোগান্তি উচ্চবর্গের তুলনায় দৃশ্যত নিম্নবর্গের উপরেই বেশি।

প্রোটিন খান, প্রতিরোধ গড়ুন

করোনাভাইরাস বিষয়ে জনসচেতনতামূলক সরকারি-বেসরকারি প্রচার-প্রচারণাগুলো তো দেখেছেন। সবখানে বলেছে, ঘরে থাকুন। বেশি করে প্রোটিন-জাতীয় খাবার আর ফল-মূল ও শাক-সবজি খান। মানে এগুলো খেলে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। শরীরের প্রতিরোধের কাছে ধরাশায়ী হবে জীবাণু।

প্রোটিনের উৎস মাছ-মাংস-ডিম-দুধ-বাদাম। দামী খাবার। ধরে নিচ্ছি, নিম্ন-মধ্যবিত্তরাও মোটামুটি প্রোটিনের ব্যবস্থা করতে পারলো। কিন্তু গরীবের উপায় কী? বলবেন তো, ডালে প্রোটিন আছে। তা বটে! মোটা চালের ভাত আর ডাল যার সম্বল, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ছাড়াও, ডালই তার শেষ আশ্রয়।

সচেতনতা কার্যক্রমের ভাষাই বলে দিচ্ছে, টার্গেট অডিয়েন্সের তালিকায় অন্ত্যজ গোষ্ঠী ধর্তব্যে নেই।

এখানেই অন্ত্যজ গোষ্ঠীর সাথে ভাইরাসেরও একটা সাদৃশ্য লক্ষণীয়। উভয়েই বিরাজমান। কিন্তু উভয়েই অদৃশ্য। বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত তাদের অস্তিত্ব নিয়ে কারো রা’টি নেই। ভুখা-নাঙা সংঘবদ্ধ না হলে তাদের প্রতি সমাজ উদাসীন।

ঈশ্বর নিশ্চয়ই ভদ্রপল্লীরই বাসিন্দা

সাম্যবাদী দর্শনে উদ্বুদ্ধ সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসে তিনি দীনহীন অন্ত্যজ সমাজের দারিদ্র-পীড়িত চিত্র এঁকেছেন।

গল্পে বিশেষ এক পরিস্থিতি তৈরি করে মানিক বলেছেন, ”ঈশ্বর থাকেন ঐ গ্রামে, ভদ্র পল্লীতে—এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না”।

ঝড়-বৃষ্টি যে বিপদই আসুক, জেলে পল্লীর দরিদ্ররাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি। ভদ্রপল্লীর বাসিন্দাদের জীবন অপেক্ষাকৃত স্বস্তি মাখা।

করোনাভাইরাস মহামারিতেও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওই অমোঘবাণীই সত্য হলো। ভদ্রপল্লীর বাসিন্দারা বাজার খালি করে নিজেদের ঘরগুলোকে খাদ্য-গুদামে পরিণত করেছেন। ওষুধের দোকান খালি করে নিজেদের ঘরগুলোকেই কেউ বানিয়েছেন ফার্মেসি, কেউ বানিয়েছেন মিনি-হাসপাতাল।

ভদ্রপল্লীর অভিজাতকুলের পক্ষ থেকে এমনও বলা হয়েছে যে, গরীবদের এক ধরণের শক্তি থাকে। তাই, তারা করোনাভাইরাসে কম আক্রান্ত হন। বটে! তাই হবে বৈকি!

বিত্তবানেরা স্ব স্ব খাদ্য গুদামসহ নিজেদের ঘর বন্দী করেছেন। নিম্নবর্গের বাসিন্দারা হাঁটতে-হাঁটতে জেলার পর জেলা পাড়ি দিয়ে পোকা-মাকড়ের মতন পিল-পিল করে ছুটেছেন ঢাকার দিকে। গলায় অদৃশ্য দড়ি বেঁধে কে তাদের হিড়হিড় করে টেনে এনেছে?

কোরবানীর গরুগুলোকে আন্তঃজেলা পারাপার করে বিক্রেতারা। তবে, প্রাণীটাকে তারা ট্রাকে বা লঞ্চে আনে। কিন্তু সমাজের হাইয়ারার্কিতে গরীব-গুর্বোর মর্যাদা বুঝি ইতর প্রাণীরও নিচে।

ঈশ্বর যে ভদ্রপল্লীতেই থাকেন তার আরো প্রমাণ আছে।

সরকারি কর্তাদের জন্য প্রণোদনার ঘোষণা এসেছে। সরকারি প্রাণ চলে গেলে পরিবার পাবে অর্ধ কোটি টাকা। আর করোনা হলে দিবে এক মিলিয়ন। ভদ্রপল্লীর দামী প্রাণ। লাগে টাকা দেবে করদাতাগণ।

হায়! বেসরকারি প্রাণ। আহা! জীবন্মৃত হয়ে বাঁচা নিম্নবর্গ! মুড়ি-মুড়কির চেয়েও সস্তা বলেই-না ধনতন্ত্রের উৎসবের হাঁড়িকাঠে অকাতরে বলি হয় এইসব প্রাণ।

মহামারি এবং বিধবা রমণীর কাহিনি

ছোটো শহরের এক বিধবা নারীর গল্প বলি। বয়স প্রায় ৪৫। দুই কিশোরীর মা। বসত ঘরের অর্ধেকটা দোকান হিসেবে ভাড়া দিয়ে চলতো সংসার। মহামারিতে ভাড়াটিয়ার ব্যবসা নেই। ভাড়াও বন্ধ। কতইবা তার জমানো টাকা? কী করে হয় তিনটি মুখের গ্রাসাচ্ছাদন? অসুস্থ হলে কে দেবে খরচ?

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত নারী-পুরুষের অনুপাত জানা যায়। বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানও প্রকাশিত। কিন্তু মৃত ও আক্রান্তদের অর্থনৈতিক শ্রেণি-পরিচয় জানা যাচ্ছে না।

ধরা যাক কোনো একটি জরিপে জানা গেলো, আক্রান্তদের অধিকাংশই ভদ্রপল্লীর বাসিন্দা। তাহলেও কি কথা ফুরায়? না। বরং ওখানেই শুরু হবে আরেক আলাপ।

ভদ্রপল্লীর সদস্যদের চিকিৎসার সুযোগ ও সামর্থ্য বেশি। কিন্তু গরীবের মধ্যেও যারা হদ্দ গরীব, নিভৃত পল্লী, দুর্গম চর বা হাওরাঞ্চলে যারা থাকে অথবা মফস্বলে ও উপজেলা অঞ্চলে যে দরিদ্র জনগোষ্ঠী আছে, চিকিৎসার ন্যুনতম সুযোগ না থাকায় তারা যে স্বাস্থ্য পরীক্ষাই করাতে যায় না সেই তদন্ত কে করবে?

উদ্বাস্তু সময়, লঙ্গরখানার ডাক

মানুষ শহর ছাড়ছে। ফেসবুকের ওয়ালে ভাসছে শহরত্যাগী মানুষের মাল-বোঝাই ট্রাকের ছবি ও খবর। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় এই প্রস্থান দৃশ্য।

বহু মধ্যবিত্তের জীবনও চিড়া-চ্যাপ্টা। নিম্নমধ্যবিত্তদের তো মাথা ঢাকলে পা উদ্যম।

কাজ নেই। আয়-রোজগার নেই। সঞ্চয়ও কারো শেষ, কারো বা তলানিতে।

এই দুর্দিনে কীভাবে চলে কৃষক-শ্রমিক-কুলি-মজুর-তাঁতি-জেলে-কুমার-দেহপসারিনী-গৃহপরিচারিকাদের সংসার?

উবার-পাঠাও চালিয়ে, গৃহশিক্ষকতা করে, কাপড় ইস্ত্রির দোকান দিয়ে, পার্ট-টাইম বিক্রয় কর্মীর কাজ করে যাদের অন্ন জুটতো, কী করে চলছে তাদের?

কুবেরের মতন সমাজের তলানিতে থাকা এই বাসিন্দারাও প্রত্যক্ষ না হলেও, পরোক্ষ কর দিয়ে থাকেন। তাদের টাকায় প্রণোদনা পায় সাহেব-সুবো, বণিকের দল। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রণোদনা প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত হয় না অন্ত্যজ শ্রেণীর সংসার?

ট্র্রিকল-ডাউন, ট্রিকল-আপ

রাষ্ট্রের বড় মাথা। বড় ভাবনা। বড় মাথায় বড় বড় বণিকের কথা থাকে। তাই তাদের জন্য প্রণোদনা আসে। ডুবে যাওয়া লঞ্চকে টেনে তুলতে যায় উদ্ধারকারী জাহাজ। আর বেসরকারি বণিকদের টেনে তোলে প্রণোদনা প্যাকেজ।

ব্যক্তি-মালিকানাধীন বাণিজ্যের পেছনে ঢেলে দেয়া হয় রাষ্ট্রের কোষাগারে থাকা কৃষক-কামার-কুমার-তাঁতি-জেলের অর্থ। এভাবেই বণিকেরা ব্যবসার মুনাফাটুকু গচ্ছিত রাখে নিজেদের একাউন্টে। আর লোকসানের ভারটুকু চাপিয়ে দেয় জনতার কাঁধে।

ট্রিকল-ডাউনের চক্করে গরীব হয় প্রতারিত। মহামারির দিনে অন্ত্যজ শ্রেণী নাভিশ্বাস উঠে মরছে। কিন্তু রাষ্ট্রের মগজে ‌এখনো ধনিক-তোষণ। ধনতন্ত্রের পুঞ্জিভূত সম্পদের পাহাড় গরীবের দিন ফেরায় না। পৃথিবী সাক্ষী, ধনীকে আরো ধনী করার পথ বাৎলানোর তরিকায় কোন দিন গরীবের গরিবি দূর হয়নি এবং তা হয় না এবং তা হবে না।

তাই, ট্রিকল-ডাউনকে উল্টে ট্রিকল-আপ করতে হবে। মাঝারি ও ক্ষুদ্রের স্বার্থে রাষ্ট্রকে দেখতে হবে। নিম্নবর্গকে নিতে হবে মনোযোগের কেন্দ্রে।

উন্নয়ন বহু যুগ উপর থেকে নিচে চুইয়েছে, এবার নিচ থেকে উপরে যাবার বন্দোবস্ত করে দেখুন। গাছের শেকড় থেকে যেভাবে কাণ্ড ও পাতায় যায় সঞ্জীবনী রস, সেইভাবে উন্নয়নকেও চালনা করুন।

বদল ঘটে না, ঘটাতে হয়…

গরীবের প্রতি আর কত জারি থাকবে সিস্টেমেটিক বঞ্চনা? গরীবের টাকা নেই; ফলে সন্তানের জন্য উচ্চশিক্ষা ক্রয়ের সামর্থ্য নেই; উচ্চতর ডিগ্রি নেই তাই ভালো চাকরী নেই; বড় চাকরী নেই তো বড় বেতন নেই; বড় বেতন নেই বলে ভালো বাসস্থান এবং পুষ্টিকর খাদ্য নেই; খাবার নেই তাই রোগ-বালাইয়ের শেষ নেই; রোগ হলেও চিকিৎসা কেনার টাকা নেই; ভালো-খেয়ে-পড়ে-চিকিৎসা সেবা নিয়ে-আরামে-আনন্দে জীবন কাটানোর সুযোগ নেই বলে গরীবেরা তাড়াতাড়ি মারা যায়; আর তাদের সন্ততিরাও ঘুরতে থাকে একই চক্করে।

কিন্তু এইভাবে কতকাল? ঈশ্বরকে এবার ভদ্রপল্লী থেকে টেনে বের করুন।

তবে, সমাজে কোনো বদলই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না। বদল ঘটে না। বদল ঘটাতে হয়।

ভাইরাস শ্রেণি নিরপেক্ষ। কিন্তু রাষ্ট্র কাঠামো ও সমাজ ব্যবস্থা নিরপেক্ষ নয়। তাই, এক দেশে দুই নীতি হয়। সরকারি কর্তা আক্রান্ত হলে তাকে এক মিলিয়ন দেওয়ার ঘোষণা আসে। কিন্তু, অন্ত্যজ শ্রেণির জীবন হাঁড়িকাঠে বলি হয়ে যায়। এভাবেই, দুই নীতির দেশে শ্রেণী-নিরপেক্ষ ভাইরাসও পেয়ে যায় শ্রেণী পরিচয়।

(বিবিসি, ঘাটাইল ডট কম)/-

লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হোক

১.

সমগ্র বিশ্বে ছাত্ররা জাতি গঠনে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশেও সেই ব্রিটিশ আমল থেকে ছাত্ররা জাতি গঠনে বিভিন্নভাবে ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ’৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন; সর্বোপরি স্বাধীনতা আন্দোলনে এ দেশের ছাত্ররা গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে। স্বাধীনতার পরও জাতীয় স্বার্থে ছাত্ররা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠেছে। বিশেষ করে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে, নব্বইয়ের গণআন্দোলন।

কিন্তু দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির ফলে একদিকে যেমন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাস্তানি ইত্যাদির কারণে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে; অন্যদিকে একটি খুনোখুুনির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যার সর্বশেষ বলি বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার।

সোনিয়া নামের মেধাবী ছাত্রী ২০০৪ সালে এ বুয়েটেই নিহত হয়েছেন।

আবরার হত্যার পর অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী, আইনুন নিশাত, অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামসহ অনেক বিশিষ্টজন লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে মত প্রকাশ করেছেন।

১৯৭২ সালে মুহসীন হলে সাত মার্ডারসহ শতাধিক ছাত্র খুনের শিকার হন। ১৯৮৪-৮৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলে থাকার সময় লেখাপড়ার পরিবর্তে ছাত্র রাজনীতির সন্ত্রাস ও মাস্তানরূপ দেখার সুযোগ হয়েছে।

২.

স্বাধীনতার পর থেকেই দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি জাতীয় উন্নয়নে অগ্রসরতার চেয়ে অনগ্রসরতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বর্তমানে প্রকট আকার ধারণ করেছে।

ছাত্ররা নিকট অতীতে ভ্যাট-বিরোধী আন্দোলন, কোটাবিরোধী আন্দোলন, ট্রাফিক-বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ধর্ষণের বিরুদ্ধে ছাত্ররা জেগে উঠেছে, আন্দোলন করেছে এবং করছে।

এখানে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজন হয়নি। জাতীয় যে কোনো প্রয়োজনে ছাত্ররা জেগে উঠবে, এটাই আমাদের ইতিহাস।

অতএব জাতীয় স্বার্থে এখনই এ নষ্ট দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হওয়া জরুরি।

৩.

সংকীর্ণ ও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝতে অক্ষম যে, দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি জাতির ভয়াবহ ক্ষতির কারণ।

দলীয় ছাত্র রাজনীতির অনিবার্য ফলস্বরূপ অনেক শিক্ষকও দলীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। এ নষ্ট ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতির কারণে শিক্ষার মান তলানিতে। বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে, প্রতিযোগিতায় আমরা অনবরত পিছিয়ে যাচ্ছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এখন র‌্যাংকিংয়ে বিশ্বের ১ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ ধরনের ছাত্র রাজনীতির কারণে শিক্ষার মান উন্নয়ন না করে, গবেষণা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে  প্রতিযোগিতা না করে, সভ্যতা-ভদ্রতা-নম্রতা চর্চা না করে, গুটিকয় ছাত্রনেতা ও শিক্ষক জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে ব্যতিব্যস্ত।

এ কথা বলা প্রয়োজন যে, রোগটি মূলত মূল রাজনৈতিক নেতৃত্বের মেধা, দূরদর্শিতা ও অপরিণামদর্শিতার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

৪.

ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে অনেক ভালো নেতা জাতি পেয়েছে সত্য, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য সাধারণ মানুষ ছাত্রনেতাদের আর সম্মানের চোখে দেখে না, ভয় পায়।

কেউ কেউ ছাত্র রাজনীতি থেকে আসা ভালো-মন্দ, অনৈতিক, চরিত্রহীন, দুর্নীতিবাজসহ সবাইকে গণহারে ছাত্র রাজনীতির সোনালি ফসল বলে আখ্যা দিতে চায়।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বলে বলীয়ান হয়ে এরা কমবেশি যেসব ফসল উৎপাদন করে তা হলো লেখাপড়া না করা, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ফাও খাওয়া, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, ভাড়া খেটে জমি দখল, টাকা আদায়, ধর্ষণে সেঞ্চুরি করা, দুর্নীতির মাধ্যমে ১২০টি ফ্ল্যাটের মালিক, নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দেওয়া, অনৈতিকতায় সিদ্ধহস্ত হওয়া, ক্যাডারবাজি, বেয়াদবি, অনৈতিকতা ও সন্ত্রাস সমাজে সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া, দুর্বৃত্ত রাজনীতিকদের দুর্বৃত্তপনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া, সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি ইত্যাদি।

ছাত্রদের প্রধান কাজ লেখাপড়া করা। জীবনযুদ্ধে জ্ঞান অর্জন করে আন্তর্জাতিক মান অর্জন করা। একই সঙ্গে সভ্যতা, ভদ্রতা, নম্রতা, সংস্কৃতি শিখে নেওয়া। নৈতিকতাহীন জীবন তো পশুর জীবন।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দলীয় রাজনীতিতে জড়িত ছাত্ররা এখন আর জাতীয় স্বার্থের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে, গণতন্ত্র, সুশাসনের পক্ষে মাঠে নামে না। বরং দুর্নীতিবাজ, দুর্বৃত্তদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৫.

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সন্ত্রাস ও অনৈতিকতার হাতেখড়ি এখানেই, যা রাষ্ট্রের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমান লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির কারণে একদিকে যেমন তারা জ্ঞান অর্জনে অত্যন্ত নিম্নগামী অন্যদিকে চাঁদাবাজি ও সম্পত্তি লোভের কারণে অনৈতিকতার শিক্ষা গ্রহণ করে।

ফলে এসব ছাত্রের বেশির ভাগ শিক্ষাগত নিম্নমান ও অনৈতিকতা নিয়ে প্রশাসন, শিক্ষা, নেতৃত্বসহ সমগ্র সমাজে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই উক্ত নিম্নমান ও অনৈতিকতা পরিচর্যা চালিয়ে যেতে থাকে।

সন্ত্রাস ও অনৈতিকতাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে বেছে নেয়। ফলে জাতীয় নৈতিকতা তলানিতে এবং এটাই হলো সমাজ ও রাষ্ট্রের অনগ্রসরতার মূল কারণ।

৬.

বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এমনকি ভারতেও এর উদাহরণ নেই। ছাত্র রাজনীতি নেতা তৈরির একমাত্র কারখানা হলে, পৃথিবীর অন্য দেশসমূহে নেতৃত্ব আসে কীভাবে?

নেতৃত্ব যে কোনো জায়গা থেকেই আসতে পারে, একাংশ ছাত্র রাজনীতি থেকেও আসবে। ইতিহাস বলে, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি নেতৃত্ব এসেছে সশস্ত্র বাহিনী ও আইন পেশা থেকে।

উদাহরণস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪ জন প্রেসিডেন্টের মধ্যে ৩৪ জন সশস্ত্র বাহিনীর চাকরি করেছেন। এ ৩৪ জন কিন্তু সামরিক শাসনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট হননি। তারা অবসরের পর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। ফ্রান্সের চার্লস ডাগল, তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ন, সুহার্ত, দক্ষিণ কোরিয়ার পার্ক চুং-হি ইত্যাদি।

আমাদের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন জেনারেল, যিনি ২৩টি বড় যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন। অন্যদিকে ছিলেন শাসক।

আবার এ কে ফজলুল হক, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, জওহরলাল নেহরু, টনি ব্লেয়ার, বিন ক্লিনটন ছিলেন আইন পেশার লোক।

৭.

কেহই ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে নয়। দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে। দলীয় ছাত্র রাজনীতি যদি জাতি গঠনে এতটাই প্রয়োজন হতো তাহলে উন্নত দেশে এ ধরনের ছাত্র রাজনীতির চর্চা দেখা যেত।

উন্নত দেশের ছাত্র রাজনীতির মূল কার্যক্রম আবর্তিত হয় শিক্ষামূলক কার্যক্রম নিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশের দুর্বল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এখন পর্যন্ত এ বাস্তবতা অনুধাবন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন।

অতএব জাতীয় স্বার্থে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি এখনই বন্ধ হওয়া উচিত।

(ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেন, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, সাবেক সেনা কর্মকর্তা)/-