খাদেমুল ইসলাম মামুনঃ
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ন্যায় সংযুক্ত ও স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসাকে জাতীয়করণের দাবীতে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।
গত বুধবার (৭ মে) বিকালে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এর চেয়ারম্যান, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর এর মহাপরিচালক, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিবালয়ে এই স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
বাংলাদেশ সংযুক্ত ইবতেদায়ী মাদরাসা শিক্ষক ফোরাম “এর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি জনাব ডালিম শেখ স্যারের নেতৃত্বে এক ভার্চুয়াল সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, সংযুক্ত ইবতেদায়ী ও স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা শিক্ষা একসঙ্গে জাতীয়করণ প্রসঙ্গে পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য বাংলাদেশের সকল জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এবং জেলা প্রশাসক এর মাধ্যমে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব বরাবর আবেদন করে স্মারকলিপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এই কার্যক্রম ২০ এপ্রিল থেকে শুরু করি এর পর আমি ও আমার সাধারণ সম্পাদক শাহীন শিকদার ৭ই মে সশরীরে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এর চেয়ারম্যান, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর এর মহাপরিচালক,কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের মাননীয় সচিব বরাবর আবেদন করে এই সকল দপ্তরে আমাদের দাবিগুলোর স্মারকলিপি প্রদান করি।
এসময় সাংবাদিকদের সাথে মত প্রকাশের করেন ইবতেদায়ী মাদ্রাসা শিক্ষক ফোরামের নেতৃবৃন্দেরা। “বাংলাদেশ সংযুক্ত ইবতেদায়ী মাদ্রাসা শিক্ষক ফোরাম ” এর সাধারণ সম্পাদক শাহীন শিকদার বলেন আমরা ইবতেদায়ী শিক্ষক হয়েও তৃতীয় শ্রেণীর একজন কর্মচারী সমান বেতন ভাতা ও সমমানের গ্রেড পাই যা একজন সংযুক্ত ইবতেদায়ী মাদ্রাসার শিক্ষক ১৬ তম গ্রেডে ৯৩০০ টাকা স্কেলে বেতন ভাতা প্রাপ্ত হন একজন শিক্ষক হিসেবে খুবই লজ্জাকর আর যা দিয়ে একজন শিক্ষকের পরিবার চালানো বর্তমান দ্রব্য মূল্যের বাজারে খুবই কষ্টকর।
আপনি নিশ্চয়ইঅবগত আছেন যে আমরা সংযুক্ত ও স্বতন্ত্র মাদ্রাসার শিক্ষকরা প্রাইমারির সমমান হয়েও দীর্ঘদিন যাবত বৈষম্যের শিকার “বাংলাদেশ সংযুক্ত ইবতেদায়ী মাদ্রাসা শিক্ষক ফোরাম ” এর পক্ষ হতে আপনার সদয় অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, ১৫১৯টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসার একজন শিক্ষক অনুদান পান মাত্র ৩৩০০ টাকা এবং স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী প্রধান পান ৩৫০০ টাকা আর বাকি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা শিক্ষকরা কিছুই পান না। আর পক্ষান্তরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ৬৫ হাজার আর আমাদের ইবতেদায়ী মাদ্রাসা সরকারি মাত্র তিনটি ইবতেদায়ী মাদ্রাসা যা ৯২ শতাংশ মুসলমানের দেশে মেনে নেওয়া সম্ভব না। তাই এই বৈষম্য দূর করে সরকারি প্রাইমারি ন্যায় আগামী ৩১মে ২০২৫ তারিখের মধ্যে সকল সংযুক্ত ও স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা কে জাতীয়করণের ঘোষণা সহ অধ্যাদেশ বা প্রজ্ঞাপন বা গেজেট দিতে হবে তা না হলে আমরা স্বতন্ত্র ও সংযুক্ত ইবতেদায়ী মাদ্রাসার সকল শিক্ষক ক্লাস বর্জন এবং কঠোর থেকে কঠোরতম আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব। তাই বর্তমান মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ডঃ মোহাম্মদ ইউনুস স্যারের সরকার কে আকুল আবেদন আমাদের এই বৈষম্যের কথা জেনে আপনি আর চুপ থাকবেন না ।আমাদের ইবতেদায়ী মাদ্রাসার আকাশ পাতাল যে বৈষম্য সৃষ্টি করে রেখেছিল সে বৈষম্য দূর করে এক অনন্য দৃষ্টি স্থাপন করবেন এবং আমাদের ৫৪ বছরের বঞ্চনা দূর করে জাতীয়করণের ঘোষণা দিবেন। এই আশা ব্যক্ত করি এই অন্তবর্তীকালী সরকারের কাছে ইনশাল্লাহ।
তাদের স্মারকলিপির প্রস্তাবনা গুলো হলো-
যথা:
১) সংযুক্ত ইবতেদায়ী সহ সকল স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসাকে একসাথে একযোগে জাতীয়করণ করতে হবে। (স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা সংখ্যা ৭৫৩৫+এবং সংযুক্ত ইবতেদায়ী মাদ্রাসা ৮২২৯+ কম বেশি হতে পারে মোট সংখ্যা প্রায় ১৬০০০ টি ইবতেদায়ি মাদ্রাসা)
১.১। ২০১৩ সালে যেভাবে ২৬ হাজার প্রাইমারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণের আওতায় আনা হয়েছে সে একইভাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইবতেদায়ী সকল মাদ্রাসাকে জাতীয়করণের আওতায় আনা যেতে পারে।
নিম্নে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে ।
প্রথম ধাপে: :
এমপিওভুক্ত ২২ হাজার ৯৮১টি বিদ্যালয়ের ন্যায় অনুদান ভুক্ত স্বতন্ত্র মাদ্রাসা ১৫১৯ টি ও এমপিও ভুক্ত সংযুক্ত ইবতেদায়ী মাদ্রাসা ৮২২৯ টি অর্থাৎ ১৫১৯+৮২২৯=৯৭৪৮ টি ইবতেদায়ী মাদ্রাসাকে জাতীয়করণ করা যেতে পারে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে।
দ্বিতীয় ধাপে:
স্থায়ী/অস্থায়ী নিবন্ধনপ্রাপ্ত, পাঠদানের অনুমতিপ্রাপ্ত , রেজিস্টার প্রাপ্ত , কোডভুক্ত, সকল স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা কে জাতীয়করণের আওতায় আনা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডিসেম্বরের মধ্যে। শর্ত প্রযোজ্য জুলাই ২৫ থেকে বেতন ভাতাদি প্রদান করতে হবে। অর্থাৎ জুলাই ২৫ থেকে এরিয়া সহ সকল সুযোগ সুবিধা করা যেতে পারে।
তৃতীয় ধাপে: পাঠদানের অনুমতির সুপারিশপ্রাপ্ত এবং পাঠদানের অনুমতির অপেক্ষায় অর্থাৎ কোডবিহীন, অথবা যে সকল স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসার কার্যক্রম পরিচালিত রয়েছে সেই সকল স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসাকেও জাতীয়করণের মধ্যে আনা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে। শর্ত প্রযোজ্য জুলাই ২৫ থেকে বেতন ভাতাদি প্রদান করতে হবে। অর্থাৎ জুলাই ২৫ থেকে এরিয়া সহ সকল সুযোগ সুবিধা করা যেতে পারে।
২) এই সুনির্দিষ্ট অধ্যাদেশ জারী করতে হবে আগামী ৩১ মে ২০২৫ এর মধ্যে।
২.১। একীভূত বা সংযুক্ত ইবতেদায়ি মাদ্রাসা গুলোকে আলাদাকরণ করে অধ্যাদেশ জারী করা যেতে পারে।
২.২। সংযুক্ত ও স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা এর নতুন নামকরণ সরকারি ইবতেদায়ি মাদ্রাসা করা যেতে পারে।
৩) আগামী অর্থবছরের শুরু থেকেই অর্থাৎ জুলাই ২০২৫ থেকেই সকল শিক্ষক ও শিক্ষিকাগণের বেতনাদি সরকারি নিয়মে করা যেতে পারে।
৩.১। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ন্যায় সমমানের সকল সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করা যেতে পারে।
৪) ইবতেদায়ী মাদ্রাসা সকল শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের শিক্ষাগতযোগ্যতা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ন্যায় করা যেতে পারে।
৪.১। যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রী/স্নাতক/ ফাজিল/সম্মান সমমান করা যেতে পারে।
৪.২। যে শিক্ষক যে নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়েছেন সে সকল শিক্ষকদেরকেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ন্যায় সমান সুযোগ সুবিধা দেওয়া যেতে পারে ।
৫) ইবতেদায়ী প্রধান শিক্ষক পদটি সিনিয়রিটির ভিত্তিতে পদায়ন করা যেতে পারে।
৫.১। সরকারি বিদ্যালয়ে ন্যায় প্রধান শিক্ষকদের যে সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয় তা ইবতেদায়ি প্রধান শিক্ষকদেরকেও দেওয়া যেতে পারে।
৬) ইবতেদায়ী শিক্ষক অর্থাৎ জেনারেল শিক্ষকদেরকেও ইবতেদায়ী প্রধান হওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে ৬.৩ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ।
৬.১। বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেক্ষেত্রে মুসলিম শিক্ষক হলে তাকে ইবতেদায়ী প্রধান হিসেবে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে ৬.৩ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী।
৬.২। প্রশাসনিক দক্ষতা ও আইসিটির উপর দক্ষ হলেই ইবতেদায়ী প্রধান হওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে ৬.৩ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী
৬.৩। ইবতেদায়ি জেনারেল শিক্ষকদের ছয় মাসের নূরানী/ তালিমুল কুরআন/ মুজাব্বিদ / অন্যান্য আরবি কোর্স থাকলে ইবতেদায়ী প্রধান হওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
৭। সকল ইবতেদায়ী শিক্ষকদের চার বছর পর ইবতেদায়ী সহকারী প্রধান হওয়ার সুযোগ প্রদান দেওয়া যেতে পারে এবং তার তিন বছর পর ইবতেদায়ী প্রধান এর সুযোগ দিতে হবে অথবা সাত বছর পর ইবতেদায়ী ক্বারি,মৌলভী এর মত জেনারেল শিক্ষকদেরও ইবতেদায়ী প্রধান এর সমমান গ্রেড ও সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা প্রদান দেওয়া যেতে পারে ।
৭.১। সহকারী ইবতেদায়ী প্রধান পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে।
৭.২। ডিপ্লোমা ইন প্রাইমারি/ ইবতেদায়ী এডুকেশন বা সি.এন. এড ড্রিগ্রি চালু করে শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড প্রধান করা যেতে পারে।
৮ । সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র- ছাত্রীরা সরকার থেকে যে যে(উপবৃত্তি ও ফিডিং) সহযোগিতা পায় মাদ্রাসার ছাত্র ছাত্রীরাও যেন সে সকল সহযোগিতা পায় তার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে ।
৯। পিটিআই এর ন্যায় এটিআই গঠন করা যেতে পারে অথবা পিটিআইতে ইবতেদায়ী শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের সুযোগ প্রদান করা যেতে পারে।
১০। ইবতেদায়ী মাদ্রাসাগুলো তদারকি করার জন্য উপজেলায় জনবল নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।
১১। মাদ্রাসার সংশোধনী নীতিমালা ২০২৫ এই মাসের মধ্যে প্রকাশিত করা যেতে পারে। অর্থাৎ ৩১ মে মাসের মধ্যে।
১২। অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট বিলুপ্ত করে সরকারি নিয়মে পেনশন আওতায় আনা যেতে পারে।
স্মারকলিপি প্রদানের সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সংযুক্ত ইবতেদায়ী মাদরাসা শিক্ষক ফোরামের নেতৃবৃন্দ।







