মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ১৪৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) টাঙ্গাইলের ঐতিহাসিক সন্তোষে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় তাকে স্মরণ করা হয়েছে। ভোর থেকেই সন্তোষে মানুষের ঢল নামে—তার মাজার ঘিরে তৈরি হয় এক আত্মিক ও শ্রদ্ধাবোধের পরিবেশ।
মওলানা ভাসানী ১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের ধানগড়াপল্লীতে জন্মগ্রহণ করেন। হাজি শারাফত আলী ও বেগম শারাফত আলীর চার সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। শৈশবে তার ডাকনাম ছিল ‘চেগা মিয়া’। শোষণ, অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম করে তিনি বাঙালির রাজনীতিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ‘মজলুম জননেতা’ হিসেবে। গ্রামীণ জনজীবন থেকে উঠে এসে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তান আমলের স্বায়ত্তশাসন দাবি, ফারাক্কা লংমার্চসহ নানা ঐতিহাসিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
মাজার প্রাঙ্গণে ব্যাপক ভিড়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ
সকাল ৯টায় প্রথম শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি দল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. ইমাম হোসেনের নেতৃত্বে মাজারে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো. মোহাম্মদ মতিউর রহমান, লাইফ সায়েন্স অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো. আবু জুবাইর, রেজিস্ট্রার (দায়িত্বপ্রাপ্ত) প্রফেসর ড. সাজ্জাদ ওয়াহিদ, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এ. কে. এম. মহিউদ্দিনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় বক্তারা বলেন, কৃষক-শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় ভাসানী আজীবন যে সংগ্রাম করেছেন তা নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার উৎস। তার ত্যাগ-সাহসিকতা ও মানবিক রাজনীতি অনুসরণ করলে সমাজে ন্যায়-সমতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
পরিবারের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের উপস্থিতি
শ্রদ্ধা নিবেদনের পরপরই ভাসানীর পরিবারের পক্ষ থেকে তার নাতী হাসরত খান ভাসানী এবং আজাদ খান ভাসানী মাজারে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান। তারা বলেন, মজলুম জননেতার সংগ্রাম শুধু রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল না; ছিল মানুষের মুক্তি, স্বাধিকারের জন্য আজীবন দায়বদ্ধতার অনন্য উদাহরণ।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ-ভাসানী), ভাসানী পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন পৃথকভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তার স্মৃতির প্রতি সম্মান জানান। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপও তাকে শ্রদ্ধা জানায়।
র্যালি, আলোচনা, মানববন্ধন—বৈচিত্র্যময় কর্মসূচিতে মুখর ছিল দিনটি
জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সকালে মাজার প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের হয়। র্যালিতে অংশ নেয় বিভিন্ন সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনগণ। এ ছাড়াও তার কর্মময় রাজনৈতিক জীবন, দেশপ্রেম ও সাম্য-সাম্যের আদর্শ নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
তার হাতে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সংরক্ষণ, উন্নয়ন এবং ‘ভাসানী চত্বর’ ঘোষণার দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ অংশ নেন। বক্তারা বলেন, ভাসানীর নামে ও স্মৃতিতে গড়া প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষা করা জাতির দায়িত্ব। দেশ ও সমাজের উন্নয়নে এগুলোকে সম্পূর্ণরূপে কার্যকর রাখা জরুরি।
বাদ জুমায় দোয়া মাহফিল
জুমার নামাজের পর মাজার প্রাঙ্গণে ভাসানীর রূহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে তার পরিবার, ভক্ত, অনুসারী, স্থানীয় জনগণসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
দোয়া মাহফিলে দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও জাতীয় ঐক্যের জন্যও প্রার্থনা করা হয়।
ভাসানীর আদর্শের ধারক-বাহক হওয়ার আহ্বান
দিনব্যাপী কর্মসূচিতে বক্তা ও অংশগ্রহণকারীরা বলেন,
“শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনে মওলানা ভাসানীর আদর্শ অনুসরণই আমাদের এগিয়ে যেতে পথ দেখায়।”
তারা আরও বলেন, আজকের নতুন প্রজন্ম যদি ভাসানীর জীবন, সংগ্রাম ও নীতি-আদর্শ ধারণ করতে পারে, তবে দেশকে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমতাপূর্ণ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।







