ghatail.com
ঢাকা মঙ্গলবার, ১৯ আশ্বিন, ১৪২৯ / ০৪ অক্টোবর, ২০২২
ghatail.com
yummys

নায়কের জন্মদিন: কতো কথা যে জমা মানুষের মনে


ghatail.com
মাসুম অপু, ঘাটাইল ডট কম
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২ / ৫৩ বার পঠিত
নায়কের জন্মদিন: কতো কথা যে জমা মানুষের মনে

প্রায় ৩০ বছরের আগের কথা। ১৯৯৩ সালের ১৪ এপ্রিল। সেদিন ছিল ১৪০০ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন। নববর্ষ উদ্‌যাপনে মেতেছিল নগরবাসী। শহরের সব পথ যেন মিশেছিল রমনায়। সেদিন পুরান ঢাকার ওয়ারীর ফাহমিদা বেগম সহপাঠীদের নিয়ে বের হয়েছিলেন। সারা দিন সবাই মিলে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন ঢাকা শহরে।

আজও সেই দিনের স্মৃতি ঝলমল করছে ফাহমিদার মনে। কেননা, সেদিন ঢাকার রাস্তায় এক নায়ককে দেখেছিলেন ট্রাকে করে ঘুরে বেড়াতে। মৎস্য ভবনের মোড়ে অটোগ্রাফ দিয়েছিলেন নায়ক। তাঁকে ঘিরে সে কী উত্তেজনা অগণিত মানুষের!

হাত নেড়ে, উড়ন্ত চুম্বন ছুড়ে দিয়ে ভক্তদের শুভেচ্ছার জবাব দিচ্ছিলেন নায়ক—সালমান শাহ।

ফাহমিদা এখন একটি সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক। ওই দিনের গল্পটা অনেকবার করেছেন। সেদিন তিনি দেখেছেন একজন মানুষ কতটা ‘নায়ক’ হয়। তাঁর মতে, বাংলাদেশে নায়ক ওই একজনই ছিলেন—সালমান শাহ!

ওই সময় গাইবান্ধার স্কুলপড়ুয়া কিশোরী পাঁচ বোনের ঘুম কেড়েছিলেন নায়ক সালমান শাহ। পাঁচ বোন যে স্কুলে পড়াশোনা করতেন, তাঁর পাশেই ছিল স্টেশনারি দোকান। সেখানে সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের ভিউকার্ডও পাওয়া যেত। স্কুলে টিফিন খাওয়ার জন্য বাবা তাঁদের যে টাকা দিতেন, সেখান থেকে টাকা জমিয়ে তাঁরা প্রিয় নায়ক সালমানের ভিউকার্ড কিনতেন। আর স্টুডিও থেকে ফটো অ্যালবাম কিনে এনে ভিউকার্ডগুলো খুব যত্নে রেখে দিতেন।

যখন প্রিয় নায়ককে দেখতে ইচ্ছা করত, পড়ার টেবিলের ড্রয়ার থেকে অ্যালবামে থাকা সালমানের ভিউকার্ডগুলো বের করে দেখতেন। এমন যে কত দিন গেছে!

ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার করৈয়া বাজারের তরুণ জনি আহমেদ। সালমান যখন মারা যান, তখন তাঁর বয়স হবে ৯ কি ১০। অথচ এই জনির ধ্যানজ্ঞান সালমান। তাঁর জীবনের একটা স্বপ্ন, নায়ক হবেন। তাই সবকিছু ছেড়ে ঢাকায় এসে ছবিপাড়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন দিনের পর দিন।

বাংলা চলচ্চিত্র জগতের নায়ক সালমান শাহ। মৃত্যুর দুই যুগ পরও তাকে নিয়ে চর্চা হয় নিয়মিত। দর্শকদের কাছে তার জনপ্রিয়তা ও আবেদনে একটুও ভাটা পড়েনি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে আছে এই নায়কের স্নিগ্ধতা।

ক্ষণজন্মা এই নায়কের জন্মদিন আজ ১৯ সেপ্টেম্বর। বেঁচে থাকলে এবার তিনি ৫১ পেরিয়ে ৫২ বছরে পা রাখতেন। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন সালমান শাহ। তার বাবার নাম কমর উদ্দিন চৌধুরী এবং মায়ের নাম নীলা চৌধুরী। তিনি ছিলেন পরিবারের বড় ছেলে। সালমানের পারিবারিক নাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন।

সালমান শাহ পড়াশুনা করেন খুলনার বয়রা মডেল হাইস্কুলে। ১৯৯৩ সালে সালমান-মৌসুমী জুটি বেঁধে অভিনয় করেন সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবিতে। সেই ছবির সাফল্যের পর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।

যেকোনো ছবিতেই পরিচালক পোশাক নির্বাচনের ব্যাপারটা সালমানের ওপর ছেড়ে দিতেন। ফরমাল পোশাক পরবেন, নাকি ক্যাজুয়াল লুক নেবেন, সে সিদ্ধান্ত সালমানই নিতেন। যেকোনো প্রয়োজনে আউটডোরে গেলে কিংবা শুটিংয়ের জন্য দেশের বাইরে গেলে ফিরে আসার সময় তাঁর সঙ্গে থাকত নানা ধরনের পোশাক-আশাকভর্তি ছয় থেকে সাতটি লাগেজ।

হাঁটাচলা, কথা বলা, ছবি তোলা—সবকিছুতেই সালমানের অনুকরণ। কাকরাইল কিংবা এফডিসিতে তাঁকে প্রায়ই দেখা যায়। নায়ক হওয়ার জন্য নতুন নামও দিয়েছেন নিজের, শান আহমেদ। এমন কত গল্প জমে আছে সালমানকে নিয়ে। ঢাকাই চলচ্চিত্রে তাঁর আবির্ভাব ছিল আঁধারে আলোর ঝলকানির মতো।

চলে গেছেন বছর ছাব্বিশ হয়ে গেল; অথচ এখনো ভক্তরা কী যতনে তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে আছেন! এখনো যেন তিনি বর্তমান।

এখনো আরিফিন শুভ, ইমন, নিরবরা অকপটে জানিয়ে দেন, সালমানের অন্ধভক্ত তাঁরা। আজ যেমন শুভ লিখেছেন ফেসবুকে, ‘তারা তো অনেকগুলোই, চাঁদ কিন্তু একটাই। শুভ জন্মদিন চাঁদ।’

এখনো শাবনূর, মৌসুমীরা চোখের পানি ফেলেন সহশিল্পী, বন্ধুর কথা মনে করে। তরুণ কণ্ঠশিল্পী পড়শীরা লাইভ অনুষ্ঠানে সালমানের ছবির গান তোলেন, ‘তুমি আমার মনের মানুষ মনেরই ভেতর...।’ এসব এমনি এমনি হয়নি।

নব্বইয়ের রাজনৈতিক পালাবদলের পর ঢাকাই চলচ্চিত্রে পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। 

এর আগে ‘বেদের মেয়ে জোস্‌না’র মতো ছবি তুমুল সাফল্য পায়। ধারাবাহিকভাবে সে ধরনের ছবি তৈরি হতে থাকে। দর্শক যখন বাংলা ছবির নায়কদের যাত্রাপালার মতো একই ধাঁচের পোশাকে দেখে বিরক্ত হয়ে গেছে, তখন সালমান এই প্রচলিত ধারার বিপরীতে পোশাক-আশাকে নিয়ে এলেন আধুনিকতার ছোঁয়া। কখনো হ্যাট ও লম্বা কোটে পশ্চিমা লুক কিংবা টি-শার্ট বা লং শার্টের সঙ্গে নানা রকমের পশ্চিমা কোট থেকে শুরু করে স্যুট-টাই পরে কেতাদুরস্ত।

কখনো শার্টের কলার উঠিয়ে কিংবা হাফহাতা গেঞ্জি, জিনস ওপরের দিকে ভাঁজ, হুডি-শার্ট কখনো ইন করে আবার ওপেনে রেখে বিচিত্র লুকে আবার কাউবয় বা জমিদারি পোশাকে, কবি-সাহিত্যিকের প্রতীকী পাঞ্জাবি পরে—পর্দায় হাজির হতে দেখা গেছে সালমানকে। হাফহাতা পলো টি-শার্টের হাতা ভাঁজ করে পরা সালমান শিখিয়েছেন। 

অল্প সময়ের ব্যবধানে নিজেকে বারবার ভেঙেছেন, মাথায় ব্যানডানা বেঁধে ভিলেনদের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করাতেও তিনি ছিলেন যথেষ্ট পারদর্শী। কলেজের মেধাবী ছাত্র হয়ে ভালো ফল করার পাশাপাশি আবার ছাত্রনেতা হিসেবেও মানিয়ে যেত তাঁকে। ‘স্বপ্নের পৃথিবী’ ছবিতে জমিদারপুত্র হয়ে আবার চলে গেছেন রাখাল বালকের বেশে, দুটি চরিত্র সাবলীল ফুটিয়ে তুলেছেন।

ফেড জিনসের হাঁটুতে রুমাল বেঁধেছেন সালমান। পশ্চিমা পোশাকে তাঁকে যেমন মানিয়ে যেত, তেমনি আটপৌরে জামায় বেশ লাগত। ঢাকা, এমনকি মফস্বল শহরেও রাস্তার রোমিওদের ফ্যাশন আইকন সালমান।

ব্যাকব্রাশ করা চুল, কানের দুল, রংবেরঙের টুপি, সানগ্লাস, ফেড জিনস, মাথায় স্কার্ফ—কত স্টাইল যোগ করলেন সালমান। লাল কিংবা কালো নকশায় মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত স্কার্ফের ব্যবহার ছিল সালমানের। আকারে বড় শার্ট গুঁজে রেখেছিলেন প্যান্টের এক পাশে। মাঝে চুল কিছুটা বড় রেখেছিলেন, ছোট ঝুঁটি বাঁধা সেই চল কি এখনকার তরুণদের মধ্যে দেখা যায়?

শোনা যায়, যেকোনো ছবিতেই পরিচালক পোশাক নির্বাচনের ব্যাপারটা সালমানের ওপর ছেড়ে দিতেন। ফরমাল পোশাক পরবেন, নাকি ক্যাজুয়াল লুক নেবেন, সে সিদ্ধান্ত সালমানই নিতেন। যেকোনো প্রয়োজনে আউটডোরে গেলে কিংবা শুটিংয়ের জন্য দেশের বাইরে গেলে ফিরে আসার সময় তাঁর সঙ্গে থাকত নানা ধরনের পোশাক-আশাকভর্তি ছয় থেকে সাতটি লাগেজ। বেশ কয়েকজন পরিচালক এসব তথ্য দিয়েছেন।

কণ্ঠশিল্পী আগুনের গাওয়া অনেক গানে পর্দায় ঠোঁট মিলিয়েছেন সালমান। এক স্মৃতিচারণায় আগুন বলেন, ‘দারুণ স্মার্ট ছেলে ছিল সালমান। ওর বিহেভ, ইংরেজি বলা সবার থেকে আলাদা। ব্র্যান্ডের জিনিস ছাড়া পরত না। আবার বানানো জিনিস পরলেও দারুণ মানিয়ে যেত। সমসাময়িক অনেক নায়ক ছিল, অনেক চেনা মুখ ছিল, কিন্তু এফডিসিতে গেলে সালমানকে আলাদা করা যেত।’

শুধু কি ফ্যাশন শিখিয়েছেন সালমান? দিয়েছেন আরও বেশি। বড় পর্দায় তাঁর ক্যারিয়ার মাত্র তিন থেকে চার বছর। করেছেন মাত্র ২৭টি ছবি। অথচ প্রদর্শকদের দেওয়া তথ্য বলছে, বাংলাদেশে সর্বকালের সর্বাধিক ব্যবসাসফল ১০টি ছবির মধ্যে ৩টি সালমানের। 

তথ্য বলছে, এযাবৎ বাংলাদেশে সবচেয়ে ব্যবসাসফল ছবি ‘বেদের মেয়ে জোস্‌না’। সারা দেশে ১ হাজার ২০০ প্রেক্ষাগৃহে চলা এ ছবি ২০ কোটির মাইলফলক ছুঁয়েছিল। এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে আছে সালমান শাহ অভিনীত ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ ছবিটি। আয় করেছিল ১৯ কোটি টাকা।

তৃতীয় অবস্থানেও আছে সালমানের ‘সত্যের মৃত্যু নেই’ ছবিটি। আয় করে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সালমান অভিনীত প্রথম ছবি ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ আছে সর্বাধিক ব্যবসাসফল ছবির চতুর্থ স্থানে, আয় করেছিল ৮ কোটি ২০ লাখ টাকা।

উচ্চতা বলতে তেমন কিছু ছিল না, ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি। গল্প-উপন্যাসে বেশি বর্ণিত নায়কদের মতো নয়। ফরসা, অনেকটা গোলগাল চেহারার সালমানকে প্রথম ছবি ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দেখে অনেকে ভেবেছিলেন, পর্দায় সুন্দরী নায়িকাদের সঙ্গে প্রেম আর নাচানাচি করাতেই সীমিত থাকবেন এ তরুণ।

কিন্তু পরে দেখা গেল, অল্প সময়ের ব্যবধানে নিজেকে বারবার ভেঙেছেন, মাথায় ব্যানডানা বেঁধে ভিলেনদের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করাতেও তিনি ছিলেন যথেষ্ট পারদর্শী। কলেজের মেধাবী ছাত্র হয়ে ভালো ফল করার পাশাপাশি আবার ছাত্রনেতা হিসেবেও মানিয়ে যেত তাঁকে।

‘স্বপ্নের পৃথিবী’ ছবিতে জমিদারপুত্র হয়ে আবার চলে গেছেন রাখাল বালকের বেশে, দুটি চরিত্র সাবলীল ফুটিয়ে তুলেছেন। একটা ছবিতে সালমান বেশ অভিমান করে আছেন। হাতের পাঁচ আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে চোখ বন্ধ করে চাকু চালাচ্ছেন। চাকু আঙুলে লাগছে না, টেবিলে লাগছে। এ–ই না হলে কি নায়ক? 

এমন কত–কী করেছেন এ নায়ক। অগণিত মানুষের মন জয় করেছেন। হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতোই সবাইকে সম্মোহিত করে দিয়ে নিজে অনেক দূরে চলে গেলেন, কিন্তু তাঁকে ভুলতে দেননি! শুধু পারেননি ফিরে আসতে।

যদি সালমান ফিরে আসতেন, তাহলে তাঁর এ পরিণত বয়সে ঢাকাই চলচ্চিত্রের চিত্রটা অন্য রকম হতো। যদি ফিরে আসতেন, তাহলে হয়তো এফডিসি থাকত আগের মতোই জমজমাট।

যদি সালমান ফিরে আসতেন, তাহলে তাঁর এ পরিণত বয়সে ঢাকাই চলচ্চিত্রের চিত্রটা অন্য রকম হতো। যদি ফিরে আসতেন, তাহলে হয়তো এফডিসি থাকত আগের মতোই জমজমাট। যদি ফিরে আসতেন, তাহলে হয়তো শিল্পী সমিতি, প্রযোজক সমিতি, যৌথ প্রযোজনা, দেশি ছবি, বিদেশি ছবি—এসব নিয়ে ঝগড়াবিবাদের হিসাব-নিকাশটা অন্য রকম হতো।

ফিরে যদি আসতেন সালমান, হয়তো ঈদে ছবি মুক্তির তালিকাটা আরও বড় হতো। নায়কেরা সব পারলেও ফিরে আসতে পারেন না—এটাই বাস্তবতা। এ বাস্তবতা মেনে আজ যখন ভক্তরা সালমানের জন্মদিন উদ্‌যাপন করছেন, তখন তিনি অনতিক্রম্য দূরত্বে। তিনি কি দেখছেন ছেড়ে যাওয়া সঙ্গী ও অনুরাগীরা কী গভীর শ্রদ্ধা ও নিখাদ ভালোবাসায় স্মরণে রেখেছেন তাঁকে?

এ প্রশ্নের উত্তর কারও জানা নেই, তবু মানুষ বুকভরা আশা নিয়ে, প্রগাঢ় বিশ্বাস নিয়ে থাকে যে লোকান্তরে চলে যাওয়া স্বজন নিশ্চয়ই দেখতে পাবেন তাদের নিবেদিত শ্রদ্ধা, ব্যথাতুর হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। 

(মাসুম অপু, ঘাটাইল ডট কম)/-