ghatail.com
ঢাকা মঙ্গলবার, ১৯ আশ্বিন, ১৪২৯ / ০৪ অক্টোবর, ২০২২
ghatail.com
yummys

ঢাকার মধ্যপন্থায় আশ্বস্ত দিল্লি!


ghatail.com
তাসনিম মহসিন, ঘাটাইল ডট কম
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২২ / ৫৯ বার পঠিত
ঢাকার মধ্যপন্থায় আশ্বস্ত দিল্লি!

নতুন মাত্রা পেয়েছে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সাতটি সমঝোতা সই করে দুই দেশ। বৈঠকে উঠে আসে পারস্পরিক স্বার্থ ও ভূরাজনীতি। যেখানে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সীমান্তে অপরাধ, জঙ্গিবাদ ও সামরিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা বাংলাদেশকে জানিয়েছে ভারত। তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় এই অঞ্চলে চীনের ভূমিকা নিয়ে দেশটি যে উদ্বেগ জানিয়েছে তার জবাবে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতির কথাই বলেছে বাংলাদেশ।

এখানে অন্য কারও উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা জাগতে পারে বাংলাদেশ সে নীতিতে বিশ্বাস করে না- এ কথাটিই পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। বৈঠক সূত্রে এ সব তথ্য জানা গেছে।

প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের সূত্র জানায়, উত্তর-পূর্ব ভারতে সন্ত্রাসবাদ দমন ভারতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশে কোনো জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ হতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে ঢাকা।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামরিক খাতে সহযোগিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বিশেষ করে জঙ্গিবাদ দমন নিয়ে কীভাবে দুই দেশ একত্রে কাজ করতে পারে। সেসঙ্গে সামরিক খাতে উদ্বেগের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে ভারতের পক্ষ থেকে। ভারতের নিরাপত্তায় কোনো ঝুঁকি তৈরি করে এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না বাংলাদেশ- এ বার্তাই দেওয়া হয়েছে বৈঠকে।

ওই বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে সমকালকে বলেন, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তারের দিকে ইঙ্গিত দিয়েছে ভারত। সে বিষয়ে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়টিতেও বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বৈঠকে।

কারণ, দুই দেশের সামনে শ্রীলঙ্কার উদাহরণ রয়েছে। যেখানে অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে সরকার পতনের মতো ঘটনা ঘটেছে। ফলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে জোর দেওয়া হয়েছে বৈঠকে।

গত মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলন করে। এতে উপস্থিত থেকে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন দেশটির পররাষ্ট্র সচিব বিনয় মোহন কোয়াত্রা।

ওই সংবাদ সম্মেলনে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সম্পর্ক টেনে বাংলাদেশে চীনের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন করলে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বলেন, দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনা বেশ বিস্তারিত হয়েছে। এর মধ্যে রাজনীতি ও নিরাপত্তা নিয়ে কীভাবে দুই দেশ একে অপরকে সহযোগিতা করতে পারে এবং এ সহযোগিতা চালিয়ে যেতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে দুই দেশের সম্পর্কের কৌশলগত অগ্রাধিকারের বিষয়ে আগে ভুল বোঝাবুঝি ছিল, তা বৈঠকে পরিস্কার হয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের কৌশলগত অগ্রাধিকারে ভারতের আগ্রহ ও উদ্বেগ এবং বাংলাদেশের আগ্রহ ও অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের সম্পর্ক নিজ গুণে নিজস্ব অগ্রাধিকার লক্ষ্য করে এগোচ্ছে।

বাংলাদেশে চীনের উপস্থিতি নিয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে বিনয় মোহন কোয়াত্রা বলেন, বৈঠকে দুই প্রধানমন্ত্রী সামরিক সুরক্ষা, সুরক্ষা, দুই দেশের সামরিক কল্যাণ, সম্পর্কের কল্যাণ, ভারতের কল্যাণ, ভারতের আগ্রহ ও উদ্বেগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। দুই দেশের কল্যাণ ও সামরিক কল্যাণকে এগিয়ে নিতে সম্পর্কে যা করা প্রয়োজন তা দুই নেতা একত্রে মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ এগিয়ে নেবে।

প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এরই মধ্যে ভারত থেকে কিছু সামরিক সরঞ্জাম কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ঋণের আওতায়। যদিও শুরুতে খুবই ছোট অঙ্ক তারা ব্যবহার করছে। তবে কৌশলগত, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দিক থেকে এটি খুবই জরুরি। দুই দেশের প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা আরও বাড়বে।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ক্রমাগত বৈঠক হয়ে আসছে। বাংলাদেশ সরকার বৈঠকে এবং জনসমক্ষে একাধিকবার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতির কথা জানিয়েছে।

বৈঠকে উপস্থিত আরেক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, চীন বাংলাদেশের যে জায়গাগুলোতে নিজেদের স্থান করে নিয়েছে, তার সবগুলো জায়গায় থাকতে চায় ভারত। বাংলাদেশ চীন থেকে আগেই সাবমেরিন কিনেছে। ফলে সাবমেরিন বিষয়ক সামরিক প্রশিক্ষণে বঙ্গোপসাগরে চীনা উপস্থিতির বিষয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে দুই দেশের মধ্যে উপকূলীয় রাডার ব্যবস্থাপনা সরবরাহ নিয়ে করা সমঝোতার দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে জোর দেওয়া হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সমুদ্রে নিরাপত্তা নজরদারি জোরদারের জন্য রাডার সিস্টেম দেবে ভারত। এ ছাড়া বাংলাদেশের মহাকাশ ব্যবস্থাপনায় সংযুক্ত থাকতে চলতি সফরে সমঝোতা হয়েছে। চীনের উপস্থিতি নিয়ে যতদিন থেকে ভারত নিরাপত্তা ঝুঁকি মনে করছে, সেসব দিকেই বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তারা। আর এ ক্ষেত্রে তাদের উদ্বেগও এক এক করে দূর করছে বাংলাদেশ।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, বাংলাদেশের যে পররাষ্ট্র নীতি রয়েছে 'সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়' সেটি বজায় রেখেই সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী ও স্বাধীনতা যুদ্ধে অন্যমত সাহায্যকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সবসময়ে ভারতকে প্রয়োজন। আর একই সঙ্গে বাংলাদেশ যে ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন, তা ধরে রাখতে প্রচুর অর্থ সহযোগিতারও প্রয়োজন, আর সেটি রয়েছে চীনের কাছে।

এ কারণে দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের মধ্যে তাদের উদ্বেগ দূর করে খুবই ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করছে বাংলাদেশ।

সূত্র জানায়, দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার আলোকে দুই প্রধানমন্ত্রী ঐকমত্যে এসেছেন। বৈশ্বিক এ পরিস্থিতিতে উপাঞ্চলিক সহযোগী বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন তাঁরা। জ্বালানি সরবরাহ করাসহ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধরে রাখা, একে অপরের সহযোগিতা করা এবং নিত্যপণ্য নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের বিষয়ে সহযোগিতার বিষয়টি সামনে এসেছে।

দুই দেশের দেওয়া যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সম্পর্কের বিষয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। প্রতিরক্ষা খাতে ভারতের দেওয়া ঋণের প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করতে দুই নেতা একমত হয়েছেন।

এবারের সফরে দুই দেশের মধ্যে কোনো চুক্তি না হলেও কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে সমঝোতা, বিজ্ঞান বিষয়ে সহযোগিতা নিয়ে দুই দেশের কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের মধ্যে সমঝোতা, বিচার বিভাগের মধ্যে সহযোগিতা, রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রশিক্ষণ নিয়ে সমঝোতা, রেলওয়ের তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক একটি সমঝোতা, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও প্রসার ভারতীর মধ্যে সমঝোতা এবং মহাকাশ প্রযুক্তি নিয়ে মোট সাতটি সমঝোতা সই হয়েছে।

দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা, জ্বালানি অংশীদারিত্ব, পানি সহযোগিতা, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, উন্নয়ন অংশীদারিত্ব এবং মানুষে মানুষে যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেসঙ্গে দুই প্রধানমন্ত্রী আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। বর্তমান বৈশ্বিক সংকটময় মুহূর্তে দ্বিপক্ষীয় ও উপাঞ্চলিক সহযোগিতাবিষয়ক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে ঐকমত্য হয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী।

জঙ্গিবাদ দমন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং সীমান্ত ঘিরে অপরাধ দমনে দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে একমত হয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। তবে বৈঠকে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরটি অনেকেই চুক্তি ও সমঝোতার সংখ্যায় সফলতা ও ব্যর্থতার দিকে মূল্যায়ন করছেন। কিন্তু এ সফরটি কোনো চাওয়া-পাওয়ার সফর ছিল না। সফরটি ছিল মূলত কৌশলগত দিক বিবেচনায়। বর্তমান বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে- সেই চাপ সামাল দেওয়া নিয়ে দুই দেশের মধ্যকার বোঝাপড়া করতেই এ সফর।

এর মধ্যে থেকে বহুল প্রত্যাশিত তিস্তা চুক্তি সই হলে ভালো হতো। কিন্তু দুই দেশ যে একত্রে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বা পশ্চিমা চাপ মোকাবিলার মতো বিষয়গুলোতে একমত হতে চেয়েছিল, সেই বার্তা রয়েছে এ সফরে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে বড় কোনো চুক্তি হওয়ার আভাস ছিল না। এটি মূলত কূটনৈতিক ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার সফর। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ককে ঝালিয়ে নেওয়ার বিষয় ছিল সফরের মধ্য দিয়ে। সম্পর্কে আরও আস্থা ও গতি সঞ্চারই ছিল প্রধান বিষয়। সে চেষ্টাই করা হয়েছে।

চার দিনের ভারত সফর শেষ করে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সফরের শেষ দিন গতকাল সকালে জয়পুর যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে আজমিরে খাজা গরিবে নেওয়াজ দরগাহ শরিফ জিয়ারত করেন তিনি।

সেখানেই সারাদিন কাটিয়ে বিকেলে জয়পুর থেকেই বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হন তিনি।

(তাসনিম মহসিন, ঘাটাইল ডট কম)/-