ghatail.com
ঢাকা সোমবার, ২৩ শ্রাবণ, ১৪২৯ / ০৮ আগস্ট, ২০২২
ghatail.com
yummys

মদ থেকে মধু: এপি ঢাকার দীর্ঘ অভিযাত্রার গল্প


ghatail.com
শওকত আলী, আহসান হাবীব তুহিন
৩১ জুলাই, ২০২২ / ৬২ বার পঠিত
মদ থেকে মধু: এপি ঢাকার দীর্ঘ অভিযাত্রার গল্প

আরমানিটোলার একটি কারখানায় উৎপাদন হওয়া 'মৃত সঞ্জীবনী সুরা' নামে লিকারের জমজমাট ব্যবসা ছিল আয়ুর্বেদিয়া ফার্মেসির (এপি)। ১১০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই কোম্পানিটির মালিকানা পরিবর্তন হলেও নাম বদল করা হয়নি। তবে মদের ব্যবসা ছেড়ে কোম্পানিটি এখন মধু, আয়ুর্বেদিক ও ইউনানিতে ব্যবসা বড় করছে।

১৯৮৫ সালে তৎকালীন সরকার বেসরকারি কোম্পানির মদ উৎপাদনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তারা মদের ব্যবসা থেকে বেরিয়ে মধু, প্রক্রিয়াজাত খাবার, প্রসাধনী এবং ভেষজ ওষুধ উৎপাদন শুরু করে।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য রপ্তানিযোগ্য বিশ্বমানের মধু উৎপাদন করা। আর এজন্য তারা একটি কারখানাও স্থাপন করেছেন। 

কর্মকর্তাদের দাবি, এটিই দেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান যাদের মধু উৎপাদনের কারখানা রয়েছে। 

তারা নতুন প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্যও উন্মুখ হয়ে আছেন যা এই প্রতিষ্ঠানের শতাব্দীর পুরনো ইতিহাসে নতুন মাত্রা যুক্ত করবে।  

এপি-র নির্বাহী পরিচালক এবং সবচেয়ে পুরনো কর্মকর্তা একেএম রিয়াজুল করিম বলেন, 'এপি লিকার ব্র্যান্ড হিসেবে সারা দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। যদিও এটি এখন আর লিকার তৈরি করে না, তবে প্রতিষ্ঠানটি তার বৈচিত্র্যময় ভেষজ পণ্যের মাধ্যমে গ্রাহকদের মধ্যে এখনও আগের সেই জনপ্রিয়তা বজায় রেখেছে।'

মালিকানায় বদল

ছয়জন সহযোগী বা পার্টনার মিলে ১৯১২ সালে এপি (ঢাকা) লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে কোম্পানিটির নিবন্ধন হয়। শুরু থেকেই কোম্পানিটি স্থানীয় বাজারের জন্য বাংলা মদ উৎপাদন করতো।

আর এর কারখানা ছিল ঢাকার আরমানিটোলায়। তবে ওই ছয় সহযোগীর বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি।

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ওই সহযোগীরা কোম্পানিতে আর ফিরে আসেননি। তখন বাংলাদেশ সরকার কোম্পানিটি অধিগ্রহণ করে নেয়।

১৯৮০ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটি সরকারের অধীনেই ছিল। আর ওই বছরই সরকার কোম্পানিটি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়। 

ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে এপির হেড অব অ্যাডমিন হিসেবে কর্মরত এ এফ এম ফখরুল ইসলাম মুনশী এবং তার আরেক সহযোগী গোলাম ফারুক মিলে এপি কিনে নেন।

এ এফ এম ফখরুল ইসলাম মুনশী চাকরির পাশাপাশি আয়ুর্বেদিক ওষুধের ব্যবসা করতেন। 'সেবা ঔষধালয়' নামে তার ফার্মেসির দোকান ছিল। এপি কিনে নেয়ার পর তিনি ওই ব্যবসা বন্ধ করে দেন এবং চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।

তিনি ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির হয়ে কুমিল্লার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ওই সময় তিনি উপমন্ত্রী হয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

২০০০ সালে ফখরুল ইসলাম মুনশী তার পার্টনারের সব শেয়ার কিনে এপির একক মালিক হন। পরে ২০০৩ সালে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এপির শেয়ার ভাগ করে দেন।

বর্তমানে তার বড় ছেলে রকিব ​​মোহাম্মদ ফখরুল (রকি) কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন। বোর্ডে তার ভাইও রয়েছেন। 

এপির যত ব্যবসা

১৯৮০ সালে এ এফ এম ফখরুল ইসলাম মুনশী কোম্পানিটি কিনে নেয়ার পর মদের পাশাপাশি ছোট পরিসরে মধু এবং ভেষজ মেডিসিনের ব্যবসা শুরু করেন। পাশাপাশি আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি ব্যবসার জন্য দক্ষ জনবল এবং কবিরাজ তৈরিতে তিনি ওই বছরই ঢাকার বনশ্রীতে নূর-মজিদ আয়ুর্বেদিক কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। 

এদিকে ১৯৮৫ সালের দিকে নিষেধাজ্ঞার কারণে মদের উৎপাদন ও ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। ততদিনে তিনি মধু, আয়ুর্বেদিক , ইউনানি এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত পণ্যের ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন।  

পরবর্তীতে ২০১৭ সালে কোম্পানিটির কারখানা গাজীপুরে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে দেশের প্রথম মধু প্রক্রিয়াজাত কারখানা করা হয়। আর সেখানেই আয়ুর্বেদিক, ইউনানি এবং ফুড প্রসেসিং প্লান্ট বসানো হয়।

মধু ও হারবাল পণ্য ছাড়াও এই প্লান্টে শরবত, নুডলস, সস, জেলি, ভিনেগার, গোলাপজল ও কালোজিরার তেল সহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন হয়। 

কোম্পানিটির নির্বাহী পরিচালক বলেন, 'বর্তমানে আমাদের মূল ব্যবসা মধু নিয়ে। আর কারখানায় প্রসেসড করা মধুর ৮০ শতাংশ বা ৩৫০ টন রপ্তানি করা হয়। এই রপ্তানির পুরোটাই জাপানে করা হয়। আর বাকি অংশ লোকাল মার্কেটে বিক্রি হয়।' 

তিনি আরো বলেন, 'সারা দেশে আমাদের ৩৩টি বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। সেখান থেকে আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি প্রডাক্ট এবং ডিলারদের মাধ্যমে ফুড আইটেম বিক্রি হয়।'   

তিনি বলেন, বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকার মত বিক্রি হয়। করোনার বিরূপ প্রভাব ছাড়া কোম্পানিটি কোন বছরেই লোকসান দেয়নি।   

নূর-মজিদ আয়ুর্বেদিক কলেজ থেকে পাশ করা ছাত্ররা কোম্পানিটির হারবাল ঔষধ বিক্রির জন্য কবিরাজ হিসেবে কাজ করে। আর কারখানায় বেশিরভাগ কর্মীই ওই কলেজ থেকে পাশ করে যোগ দিয়েছে। তাই এই ধরণের পণ্য উৎপাদনের জন্য কোম্পানিটিকে লোকবল সঙ্কটে ভুগতে হয় না, বলেন একেএম রিয়াজুল হাসান। 

এদিকে বী-কিপারদের মাধ্যমে কোম্পানিটি সারা দেশ থেকে মধু সংগ্রহ করে। এর জন্য প্রতিষ্ঠানটি বী-কিপারদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং অর্থায়ন করে থাকে। বর্তমানে সারাদেশে বিভিন্ন জোনভিত্তিক দুই হাজারের বেশি বী-কিপার রয়েছে, যাদের ৮০ ভাগই প্রাকৃতিকভাবে সংগ্রহ করা এবং নিজেদের খামার থেকে এপিকে মধু সরবরাহ করে।

একেএম রিয়াজুল হাসান বলেন, 'সুন্দরবনের মধু আমরা নিতে পারি না। কারণ সেখানে খরচ অনেক বেশি। আমাদের মধুর বেশিরভাগই সরিষা ফুলের। আর কিছু লিচুর ফুল থেকে হয়। তাছাড়া বিদেশিরা মধুর ক্ষেত্রে কোন ফুল থেকে হয়েছে দেখে না, তারা মান দেখে।'

ভবিষ্যত পরিকল্পনা

বর্তমানে দ্বিতীয় প্রজন্মের হাতে এপি-র ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। এ এফ এম ফখরুল ইসলাম মুনশীর বড় ছেলে আয়ুর্বেদিক এবং ইউনানির পণ্য বিদেশে রপ্তানি করতে চান। কিন্তু বিদ্যমান আইন অনুযায়ী এইসব পণ্য ঔষধ হিসেবে রপ্তানি করা যায় না।

তবে ফুড সাপ্লিমেন্টারি হিসেবে আয়ুর্বেদিক এবং ইউনানি পণ্য রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। আর এই সুযোগটিই কাজে লাগাতে চাচ্ছেন কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রকিব মোহাম্মদ ফখরুল।

এজন্য এপি গাজীপুরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন মেনে আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি কারখানা স্থাপন করছে। এর জন্য প্রাথমিকভাবে ১০-১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। ধাপে ধাপে এই বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানো হবে।

একেএম রিয়াজুল হাসান বলেন, 'উপমহাদেশে ঐতিহ্যের সাথে আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি পদ্ধতি ব্যবহার হয়। আর এই পদ্ধতি যে স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিমুক্ত তা প্রমাণিত। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে রপ্তানি হয়। তাই খাদ্য হিসেবে আমরা এগুলো রপ্তানি করতে চাই।'

তিনি বলেন, 'বাজারে এপি-র সুনাম রয়েছে। আর এই সুনাম ধরে রেখে ব্যবসা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ধাপে ধাপে আমাদের কারখানাগুলো আরো আধুনিকায়ন করা হচ্ছে।'

(শওকত আলী, আহসান হাবীব তুহিন)/-