ghatail.com
ঢাকা সোমবার, ২৩ শ্রাবণ, ১৪২৯ / ০৮ আগস্ট, ২০২২
ghatail.com
yummys

বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান ঘটালেন ভাষা সৈনিক জুলকারনাইন


ghatail.com
ঘাটাইল ডট কম প্রতিবেদন
২৫ জুলাই, ২০২২ / ৯১ বার পঠিত
বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান ঘটালেন ভাষা সৈনিক জুলকারনাইন

বজলুর রহমান জুলকারনাইন একজন ভাষা সৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার এই কৃতি সন্তান আজ ২৫ জুলাই সোমবার সকাল আনুমানিক সাড়ে আটটার সময় বার্ধক্যজনিত কারণে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

৫২'র ভাষা আন্দোলনে বজলুর রহমান জুলকারনাইন ছিলেন প্রথম সারির যোদ্ধা। প্রথম দিনের মিছিলে ভাষা সৈনিক গাজীউল হক তাঁর সঙ্গে ছিলেন। সামান্য আহত হয়েছিলেন মিছিলে। তারপর কার্জন হলের কাঁটাতারের বেড়া টপকাতে গিয়ে ক্ষত বিক্ষত হয়েছিল জুলকারনাইনের দুহাত। তারপরও থেমে থাকেননি, রাত জেগে লিখেছেন পোস্টার, তৈরি করেছেন প্ল্যাকার্ড।

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার নূরপাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে বজলুর রহমান জন্মগ্রহন করেন। তার পিতা মৌলবী ময়েজ উদ্দিন ছিলেন দেওবন্দ পাশ মাওলানা। তিনি নিজ বাড়িতে এবতেদায়ি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে এলাকার ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। স্থানীয় মসজিদে তিনি ইমামতিও করতেন।

তার মাতা নাজিরুন্নিসা ছিলেন একজন আদর্শ গৃহিণী। জুলকারনাইনের অন্য ভাইবোনরা হচ্ছেন- ভাষাসৈনিক কবি মোফাখখারুল ইসলাম, আলহাজ্ব আজহারুল ইসলাম (বাংলা-জার্মান কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক প্রশিক্ষক) এবং ডাঃ আসাদুজ্জামান। তার দুই ছেলে এবং দুই মেয়ে। তারা সবাই বাংলাদেশ ও দেশের বাইরে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত।

পিতার কাছ থেকে জুলকারনাইন পবিত্র কুরআন, আরবি ব্যাকরণসহ অন্যান্য বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন।

করটিয়া হাইস্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন এবং সা'দত কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে বিএ (অনার্স), এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।

ভাষা সৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ বর্ষের টগবগে যুবক বজলুর রহমান। রক্ত তখন কোন বাঁধাই মানে না। একটাই লক্ষ্য ভাষাকে কেড়ে আনতেই হবে। তারপর সত্যি সত্যি সফল হয় আন্দোলন। নিজেদের রক্তের বিনিময়ে আমাদের উপহার দেন বাংলা ভাষা।

তারপর ৭১'এর মহান মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধের সময় তাঁর মোহাম্দপুরের বাসাটি বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। টাকা দিয়ে, জামাকাপড় দিয়ে এমনকি শশুড়ের কেনা রাইফেল দিয়ে তিনি সহযোগিতা করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের।

বোমা হামলার সময় তাঁর পরিবার পরিজন দেশের বাড়িতে থাকায় সবাই প্রাণে বেঁচে যান। আর বজলুর রহমান বেঁচে যান, যখন দেখেন তাঁর বাসার আশেপাশে কিছু মুখোশধারী লোক সন্দেহভাজন ঘোরাঘুরি করছে।  তখন তিনি বাসার পিছন দিক দিয়ে পালিয়ে যান। 

তারপর পায়ে হেঁটে ৫/৬ দিনের মাথায় তার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে পৌঁছান।

২০১৩ সালে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে ভাষা সৈনিকের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। গত ২০২১ সালের ডিসেম্বরে রাজধানী ঢাকার জেলা প্রশাসক বজলুর রহমান জুলকারনাইনকে ভাষা সৈনিক সম্মাননা স্মারক প্রদান করেন।

কর্মজীবন ও লেখালেখি

যুদ্ধ পরবর্তীতে কোনপ্রকার রাজনীতিতে জড়াননি বজলুর রহমান জুলকারনাইন। কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন এর পরিচালক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পদ মর্যাদায় চাকরি থেকে অবসরগ্রহণ করেন। সময় পেলেই লেখালেখি করতেন। অনুবাদ এবং ধর্ম বিষয়ক বই লিখতে বেশি পছন্দ করতে তিনি।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে ইমানের ইশারা, আল্লাহ্ রাসুলের বিচারালয়, পত্রাবলী, ভাষা আন্দোলনের অভিযাত্রী, মুজিব বর্ষে নব্য প্রজন্মের ভাবনা এবং নাহাজুল বালাগা। ৮০০ পৃষ্ঠার একটা অনুবাদের বই নাহাজুল বালাগা। এছাড়া তার লিখিত ISLAm A UNIQE CULTURE OF THE WORLD নামক গ্রন্থটি আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত হয়।

বজলুর রহমান সমাজ উন্নয়নের কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন সর্বদাই। এলাকায় বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, গোরস্থান প্রতিষ্ঠায় তাঁর অনন্য অবদানের কথা এলাকাবাসী কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। ঘাটাইলে সাবিকনূদ মাদ্রাসা, এতিমখানা, গোরস্থান ও মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নিঃস্বার্থ সমাজকর্মী বজলুর রহমান জুলকারনাইন প্রায় ১০০ বছর বয়সে এক ঐতিহাসিক বর্ণাঢ্য জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটালেন।

তার মনে শেষ আশা ছিল একুশে পদক প্রাপ্তির। সরকারের কাছে দুইবার আবেদনও করা হয়। তিনি চাইছিলেন নিজের হাতে গ্রহণ করবেন এটি। দুঃখের বিষয় পদক ঘোষণার পর যখন জানলেন সেখানে তাঁর নাম নেই, তখন উল্টো সান্ত্বনা দেন, "থাক বুবু দুঃখ করো না, আমাদের তো তদবির করার লোক নাই।

তাঁর সহ সাথীরা অনেকেই একুশে পদকে ভূষিত। মাঝে মাঝেই বলতেন গাজীউল হকের কথা। মিছিল থেকে পালিয়ে যাবার সময় কাঁটাতারের বেড়া টপকাতে গিয়ে ব্যথা পেয়েছিলেন, গাজীউল হক তখন তাঁর হাত ব্যান্ডেজ করে দিয়েছিলেন।

তার পারিবারিক সুত্রে জানা গেছে, পরিবার সদস্যরা দেশের বাইরে অবস্থান করায় আগামী বুধবার তাঁকে তার গ্রামের বাড়ি ঘাটাইলের নুরপাড়া গ্রামে নিজের পারিবারিক গোরস্থানে তাঁকে দাফন করার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় পর্যন্ত তার লাশ ঢাকার হাসপাতালে হিমঘরে রাখা হবে বলে তারা জানিয়েছেন।

তাঁর মৃত্যুতে ঘাটাইল ডট কম গভীর শোক প্রকাশ করছে।

(ঘাটাইল ডট কম প্রতিবেদন)/-