ghatail.com
ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ / ১৯ মে, ২০২২
ghatail.com
yummys

গারো ও বাঙ্গালী স্বাতন্ত্র্যতা নিয়েই বেঁচে থাকুক


ghatail.com
জয়নাল আবেদীন, ঘাটাইল ডট কম
১১ মে, ২০২২ / ৭২ বার পঠিত
গারো ও বাঙ্গালী স্বাতন্ত্র্যতা নিয়েই বেঁচে থাকুক

বাইরে বোশেখের তপ্ত রোদ। লাল মাটির পাহাড়ী টিলায় দখিন দুয়ারী মাটির ঘরের লম্বাটে বারান্দায় বসা। ভাব বিনিময় শেষ হতে না হতেই নির্ভয়ে কচি বাম হাতটা রাখলো আমার ডান উরুতে। তারপর মিষ্টি মুখে হালকা ঢেউ তুলে জবান দিলো, "নাও এবার ছবি তুলো আচ্ছু।" বলছিলাম, গারো শিশু ওয়ানমি চিশিমের কথা। তার প্রতি আমার অপরিসীম স্নেহ আর ভালোবাসার গল্প।

গারো শিশু ওয়ানমি চিশিমের বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার শোলাকুড়ী ইউনিয়নের পাহাড়ী গ্রাম ভেদুরিয়ায়। গত শনিবার ওই গ্রামের বিখ্যাত গারো নারী উদ্যোক্তা মুনমুন নকরেকের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে এ দেব শিশুর সাথে পরিচয়। ওর শিয়রে বেণীগাঁথা বাহারী কেশ আমাকে মুগ্ধ করে। ওর মায়ের নাম মিইচেং। বাবা প্লাবন নকরেক। গার্মেন্টসকর্মী।  

ওয়ানমির জন্ম ঢাকায়। মাস খানেক আগে মায়ের সাথে বাড়ি এসেছে। উদ্দেশ্য গারো ভাষা শেখা। ঢাকার অনাত্মীয় পরিবেশে জন্ম হওয়া ওয়ানমি চারপাশ থেকে অনেক বাঙলা রপ্ত করেছে। কিন্তু মায়ের বুলি গারো ভাষা ভালো করে আয়ত্ব করতে পারেনি। তাই পিতৃভূমি পাহাড়ী গ্রাম ভেদুরিয়ায় ফিরেছে।

পাড়ায় খেলার সাথী,অনেক গারো শিশু, আত্মীয়স্বজন এবং পারিপাশ্বিক পরিবেশ থেকে আদিভাষা শেখার চেষ্টা করছে ওয়ানমি।

বলা অনাবশ্যক, মধুপুর উপজেলার পাহাড়ী ১৩৪টি গ্রামের ৪৪টিতে আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্টির গারো ও কোচরা বাস করেন (২০১৮ সালে সেড এর জরীপ মোতাবেক)। এই ৪৪ গ্রামে লোকসংখ্যা ৪৯'৭২৬জন। এর মধ্যে ৬১.১১% বাঙ্গালী। ৩৫.৩৩% গারো এবং৫.%৫২% কোচ বা বর্মণ।

৪৪ গ্রামের ২০টিতে এখনো গারোরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এর মধ্যে ভেদুরিয়া অন্যতম। এ গ্রামে ৯০ পরিবারের ৮২টিই গারো। এ ছাড়াও আশপাশের জয়নাগাছা,কাকড়াগুনি, কেজাই, পোনামারি, বন্দরীয়া এবং সাধু পাড়ার শতকরা ৯৮% গারো।

এ কথা আজ বলতেই হয় যে, মধুপুর বনাঞ্চলের আদি বাসিন্দা গারোরা। তারাই প্রথম বনাঞ্চলে বসবাস শুরু করে। এরপর কোচরা। সর্বশেষ বাঙ্গালীরা  বসতি গাড়েন। দিনে দিনে জনসংখ্যার রুপ পাল্টে যাচ্ছে। বাঙ্গালীরা গারো জনপদে সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছে।

মাতৃতান্ত্রিক গারোদের শিক্ষার হার ৯০% ছাড়িয়ে। আদি সাংসারেক ধর্ম ছেড়ে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহনের পর তাদের মধ্যে এসেছে ব্যাপক মানসিক জাগরন। স্ব জাতিত্ব বোধ, পুরনো রীতিনীতি ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার দুনির্বার আকাঙ্খা লক্ষনীয় হয়ে উঠছে। 

সরকারের বনবিভাগের সাথে মধুপুরের গারোদের যে আজন্ম বিরোধ, সেটি শুধু বন সম্পদ ধ্বংস বা উজাড় নয়- পুরো বনভূমিতেই তাদের ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং অস্তিত্ব ফলানোর সংগ্রাম বলে মনে করেন অনেকে। দেশের সম্পত্তির মালিকানা আইনে গোষ্ঠিগত মালিকানার অধিকার থাক বা না থাক এবং প্রচলিত সরকারি নিয়মে যাই থাকনা কেন-গারোরা পাহাড়ী এলাকার বনভূমিতে প্রথাগত ভূমি মালিকানা অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

এ জন্য বিভিন্ন দেশীয় বা আন্তর্জাতিক ফোরামে নিজেদের আদিবাসী হিসাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি এবং ভূমি-মালিকানার ক্ষেত্রে দেশীয় আইন পরিবর্তন করে দখল সুত্রে প্রথারীতি সিদ্ধ করতে চায়। 

সুতরাং এসব দাবি কোন সরকারই মেনে নেয়নি। নিচ্ছেনা। দৃশ্যত্য বনবিভাগের সাথে গারোদের যে লড়াই তার নেপথ্যে পাহাড়ী ভূমি-মালিকানার লড়াই এবং প্রচ্ছন্নভাবে সরকারি নীতি ও পলিসির বিরুদ্ধে লড়াই- যা সহজে শেষ হবার নয়। তাই বনবিভাগের সাথে গারোদের অব্যাহত লড়াইটার রুপ এমন যে, সামান্য বিষয় নিয়েই মতবিরোধ দানা বাঁধে এবং ফুঁসাফুঁসি হয়  সব সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গেলেই।

তরুন গারোদের অনেকেই মনে করেন, মধুপুর পাহাড়ী এলাকা তাদের মাতৃভূমি। বন উজাড় হোক বা বন থাকুক সর্বাবস্থাতেই তারা বনভূমির হকদার। এরা গারো জনপদে বাঙ্গালীদের নতুন বসতি গড়ে তোলার তীব্র বিরোধী। তাদের ধারনা বাঙ্গালীরা গারো জনপদে নতুন বসতি গড়ে তুললে গারোরা ক্রমান্বয়ে আরো কোনঠাসা হয়ে পড়বে। অতীতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালীদের উৎপাতে বহু গ্রাম থেকে গারোরা বিলীন হয়ে গেছে।

এবার ধান ভানতে শিবের গীত বন্ধ রেখে, প্রকৃত আলোচনায় আসা যাক। পৃথিবীতে যেসব হতভাগা জাতি বা গোষ্ঠির মানুষ নিজ বর্ণমালা হারিয়েছেন, তাদের অন্যতম গারোরা। তাই গারো ভাষা নানাভাবে সমৃদ্ধ হলেও এর লেখ্যরুপ নেই। যদিও ভিন্ন হরফে এখন গারো ভাষায় গ্রন্থ রচনা করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গারো শিশুদের পড়াশোনার ব্যবস্থা চলছে।

একটি এনজিও দীর্ঘ দিন বেশ কয়েকটি আদিবাসী গ্রামে স্কুল খুলে গারো ভাষায় শিশুদের শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা করে। 

খৃষ্টমিশন স্কুল গুলোতে গারো শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তারপরও নানা কারণে অনেক গারো শিশু নিজের মাতৃভাষা হারিয়ে বাংলাকেই গ্রহন করছে। বিশেষ করে যেসব গ্রামে বা জনপদে গারোরা সংখ্যায় কম, সেসব স্থানের স্কুল বা সামাজিক পরিবেশ পরিস্থিতির চাপে, গারো শিশুরা নিজ ভাষা ছেড়ে বাংলাকেই গ্রহন করছে। 

এতে গারো শিশুরা নিজ জনগোষ্ঠির প্রচলিত রীতিনীতি, অনুষ্ঠান, ভাবনা, ঐতিহ্য, স্বাতন্ত্র্যতা ও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গীর বিষয়াদি ভুলে  শেকড়চ্যূত হচ্ছে।  এমনকি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির গারোরা বৃহৎ জনগোষ্ঠি বাঙ্গালী থেকে যেসব বৈশিষ্ট্যের কারণে পৃথক- সেই বিভক্তির বহুমুখী মাত্রার রেখাটা অনুভব করতে পারছেনা। 

এমতাবস্থায় গারো শিশুরা দৈহিক অবয়বে মোঙ্গলীয় ধাঁচ বহন করলেও মননে বাঙ্গালী বা শংকর জাতিগোষ্ঠির পর্যায়ে চলে আসছে। গারোরা গারোই থাক। শংকর বাঙ্গালীরা বাঙ্গালীই থাক। যার যার ভাষা, দৈহিক গঠনবৈচিত্র্য, মননশীলতা ও কৃষ্টি কালচার নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে সবাই বেড়ে উঠুক, বেঁচে থাক। সংস্কৃতির বহুরুপ বহুদর্শী হয়ে ধরা দিক।

ওয়ানমি চিশিম শিক্ষায়, ভাবনায়, আদর্শে সত্যিকার গারো হয়ে উঠুক। জীবনের সব পরতে গারো পরিচয়ে যেন গর্ববোধ করতে পারে। সারা জীবন ওর মুখে আচ্ছু(দাদু বা নানু)ডাক শুনে ধন্য হতে চাই। জগতের সব শিশুরা আনন্দে থাক, ভালো থাক, সুখে থাক।

(জয়নাল আবেদীন/ সভাপতি, গোপালপুর প্রেস ক্লাব/ ঘাটাইল ডট কম)/-