ghatail.com
ঢাকা শনিবার, ৩০ আশ্বিন, ১৪২৮ / ১৬ অক্টোবর, ২০২১
ghatail.com
yummys

একাত্তরে শহীদ মছলিম হত্যার বিচার দেখে যেতে পারলেন না গোপালপুরের প্রবীন এখলাস


ghatail.com
জয়নাল আবেদীন, ঘাটাইল ডট কম
০৯ অক্টোবর, ২০২১ / ৭৮ বার পঠিত
একাত্তরে শহীদ মছলিম হত্যার বিচার দেখে যেতে পারলেন না গোপালপুরের প্রবীন এখলাস

মুসলিম উদ্দীন♣♣ এখলাস উদ্দীন।।

ষাটের দশক হতে দুজনই একসাথে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন। একজন একাত্তরে শহীদ হন। অপরজন এর বিচার দাবিতে স্বাধীন বাংলাদেশে পঞ্চাশ বছর দুঃখের কাল অতিক্রমের পর গতপরশু পরপারে চলে গেলেন। 

পরিতাপের বিষয়, শহীদ মছলিম হত্যার বিচার নিযে কোনকালেই স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যেমন সরব ছিলেন না, তেমনি একটানা সত্তর বছর বর্তমান সরকারি দলের সাথে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত  প্রবীন নেতা এখলাস সাহেবকেও মূল্যায়ন করতে দেখা যাযনি।

মছলিম উদ্দীনের জন্মস্থান ছিল টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হাদিরা ইউনিযনের কড়িয়াটা গ্রামে। গ্রাজুযেশনের পর তিনি ঝাওযাইল ইউনিযনের সুরেন্দ্রবালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালযের প্রধান শিক্ষক পদে যোগ দেন। গোলাবাড়ীর বিখ্যাত সরকার পরিবারের খোদেজা বেগমকে বিযের পর তিনি ঝাওযাইল বাজারে বাসা নিযে থাকতেন।

১৯৬৬ সালে ৬দফা আন্দোলনের সময তিনি বঙ্গবন্ধুর সহচর এবং সাবেক এমএনএ হাতেম আলী তালুকদারের হাত ধরে আওযামী লীগে যোগ দেন। এরপর তিনি ঝাওযাইল ইউনিযন আওযামী লীগের সম্পাদক নির্বাচিত হন। অপরদিকে এখলাছ উদ্দীনের জন্মস্থান ছিল ঝাওযাইল ইউনিযনের ছযানীপাড়া গ্রামে। আইয়ুব আমলে তিনি ঝাওযাইল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। 

১৯৬৪ সালে পাকিস্তানে মৌলিক গনতন্ত্রের নামে যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয, সেই নির্বাচনে আইযুব খান গোলাপফুল এবং পাকিস্তানের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কনিষ্ঠ ভগ্নী ফাতেমা জিন্নাহ হ্যারিকেন মার্কা নিযে প্রতিদ্বন্ধিতা করেন। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের দল আওযামী লীগ এবং মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওযামী পার্টিসহ পূ্র্ব পাকিস্তানের বেশ কযেকটি দল ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে নির্বাচনে নামেন। 

ওই নির্বাচনে উত্তর টাঙ্গাইলে ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে কাজ করেন প্রখ্যাত কৃষক নেতা  ন্যাপের সম্পাদক হাতেম আলী খান এবং বঙ্গবন্ধুর সহচর আওযামী লীগের হাতেম আলী তালুকদার। মৌলিক গনতন্ত্র নামের সেই অদ্ভুত নির্বাচনী ব্যবস্থায সাধারন ভোটারদের সেখানে ভোট দেযার কোন সুযোগ ছিলনা। শুধুমাত্র ইউপি সদস্যরাই ভোট দিতে পারতেন। 

আর সেই নির্বাচনকে ঘিরে হাতেম আলী তালুকদার এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাথে এখলাস উদ্দীন ওরফে আক্কাস মেম্বারের পরিচয় ঘটে। এরপর এখলাস ঝাওযাইল ইউনিযন আওযামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এভাবে একাত্তর সাল পর্যন্ত এখলাস সভাপতি আর মছলিম সম্পাদক ছিলেন।

১৯৭১ সালে ঝাওযাইল ইউনিযন ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ ঘাটি। এলাকার যুবকদের মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে ভারতে পাঠানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখেন এখলাস ও মছলিম। সেই ভূমিকার কথা রাজাকার, আলবদর ও পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর জানা ছিল। 

একাত্তর সালের জুন মাসে মছলিম উদ্দীন জরুরী কাজে গোপনে টাঙ্গাইল শহরে এক আত্মীযের বাসায যান। ফেরার পথে টাঙ্গাইল বাসস্ট্যান্ডে দেখা হয পাশ্ববর্তী মৌজা ডাকুরী গ্রামের এক আলবদর কমান্ডারের সাথে। ওই কমান্ডার পাকিস্তানী সেনাদের সহযোগিতায তাকে ক্যাম্পে ধরে নিযে যান। তারপর নৃশংস হত্যার শিকার হন শিক্ষক মছলিম উদ্দীন। তার লাশও আর পাওযা যাযনি।

মছলিম হত্যাকান্ডের পর ওই আলবদর কমান্ডারের যোগসাজশে খান সেনারা এক সপ্তাহের মধ্যে এখলাস উদ্দীনকে আত্মসমর্পনের নির্দেশ দেন। নির্দেশ অমান্য করলে রাস্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে মৃত্যূদন্ড হবে বলে ঘোষণা ছিল। কিন্তু এখলাস বর্বর পাকিস্তানী হানাদারদের মৃত্যূদন্ডের হুমকি উপেক্ষা করে ১৬ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় কাজ করেন। এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের থাকাখাওযা সব কিছুর দেখাশোনা নিজ হাতে করতেন।

তারপর দেশ স্বাধীন হলো। সবাই মছলিম উদ্দীনকে ভুলে যেতে লাগলেন। শুধুমাত্র দুজন মানুষ মছলিম হত্যার বিচার এবং তার লাশের সন্ধ্যান চেযে অশ্রূপাত করতেন। একজন মছলিমের স্ত্রী খোদেজা মছলিম। আর অপরজন তার রাজনৈতিক সহযোগী এখলাস উদ্দীন। 

পঁচাত্তর সালের আগস্টে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের একদেড় মাস পর ঝাওযাইল মহারাণী হেমন্তকুমারী হাইস্কুলে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প বসে। স্কুলের লাইব্রেরী কক্ষ দখলে নিযে একজন সুবেদার সেখানে বিচারালয খুলে বসেন। প্রত্যেকদিন কাউকে না কাউকে  ধরে আনা হতো। আর অস্ত্র উদ্ধারের নামে তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন করা হতো। 

'বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর' যারা কম্বল চুরি, রিলিফ চুরি, ডাকাতি, লুট, অস্ত্রবাজি অথবা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করেছিলেন সেই লীগ নেতারা এবং জাসদের গণবাহিনীর সদস্যরা গাঢাকা দিযেছিলেন। আর জলপাই জালে যারা ধরা খেতেন তাদের বেশিরভাগ ছিলেন জাসদ ও লীগের সাধারন নেতাকর্মী। 

এখন ঝাওযাইল মহারাণী হেমন্তকুমারী হাইস্কুলের দক্ষিণ পাশের যে পুকুর সেটি এখনো সেনানির্যাতনের নীরব সাক্ষী হযে বিরাজ করছে। দুস্কৃতকারি নামে যাদেরকে ধরে ক্যাম্পে আনা হতো তাদের অধিকাংশই ছিলেন নির্দোষ বা নিরীহ। তাদেরকে বস্তায ভরে এ পুকুর জলে ফেলা হতো। আবার দ্রুততম সমযে তাদের ডাঙ্গায উঠানো হতো। 

হাদিরা ইউনিযন আওযামী লীগের সভাপতি মরহুম এসএম ইব্রাহীম, তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাকিম এবং নিযামতপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ফরহাদ হোসেনকে ওই ক্যাম্পে ধরে নিযে যে অমানুষিক নির্যাতন করা হয, আমি তার চাক্ষুস সাক্ষী। পঁচাত্তর সালে  সেনা অভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পে আটককৃতদের উপর যে ভযাবহ নির্যাতনের চিত্র ছিল সেটি যদি  সমূলে তুলে ধরা যেতো তাহলে সরকারি দলের হাইব্রীড, খুচরা  এবং সুবিধাবাদী নেতারা সম্ভবত দল করা ছেড়ে দিতেন। 

কিন্তু এখলাসরা শত নির্যাতনেও দল ছেড়ে যাননি। দলের নামে কখনো সুবিধা আদায করেননি। পঁচাত্তরে ঝাওযাইল সেনাক্যাম্পে শত নির্যাতনের মুখেও এখলাস নিজের সততা এবং বিশ্বাস জিইযে রেখে মুক্তি পান। দুই হাজার সাল পর্যন্ত তিনি সক্রিয রাজনীতি করেন। রাজনৈতিক কারণে তিনি বহুভাবে হযরানির শিকার হযেছেন। বযসের ভারে রাজনীতি থেকে তিনি অবসর নেন। মৃত্যূকালে তার বযস হযেছিল ১০৫ বছর। 

জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তিনি সহকর্মী মছলিম হত্যার সাথে জড়িত সেই কুখ্যাত আল বদর কমান্ডারের বিচার দাবিতে সরব ছিলেন। কিন্তু তার দল ওই বদর কমান্ডারকে নিযে বরাবরই ছিলেন নীরব। ওই আলবদর কমান্ডার একাত্তর সালের ডিসেম্বর মাসে টাঙ্গাইল হতে পাকি বাহিনীর সাথে পালিযে ঢাকা গমন করেন। ১৬ ডিসেম্বর রমনা রেসকোর্স মযদানে পাকিস্তানী সোলজার পরিচযে ৯৩ হাজার পাকির সাথে মিত্র ও মুক্তিবাহিনী তথা যৌথ বাহিনীর নিকট তিনিও আত্মসমর্পন করেন। 

পরে পাকি সোলজারের সাথেই ভারতের জব্বলপুর কারাগারে আড়াই বছর বন্দী থাকার পর মুক্তি পেযে পাকিস্তান চলে যান। বেশ ক,বছর পাকিস্তানে অবস্থানের পর পাকিস্তানী নাগরিকত্ব নিযে জাপান যান। দীর্ঘ দিন জাপানে প্রবাস জীবন কাটিযে নব্বযের দশকে বাংলাদেশে ফেরন। এখন তিনি নারাযনগঞ্জের এক বড় শিল্পপতি। শীর্ষ ব্যবসাযী সংগঠনের নেতা। 

মছলিম উদ্দীনের শোকাহত পরিবার এখনো ওই যুদ্ধাপরাধী আলবদর কমান্ডারের বিচার দাবিতে অনড় রযেছেন। দুই হাজার সালে বাংলাদেশ ডাকবিভাগ শহীদ মছলিম উদ্দীনের নামে একটি স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশ করেন। 

এখলাস উদ্দীন। মছলিম উদ্দীন। দুই জনই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সৈনিক। তার ডাকে একজন শহীদ হযেছেন। অপরজন অশেষ ক্লেশ আর নির্যাতন সহ্য করেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সহকর্মী হত্যার সাথে জড়িত আলবদর কমান্ডারের বিচার দাবি করেছেন। 

এদের মতো নির্লোভ আর ত্যাগী মানুষরা একদিন রাজনীতি করতেন বলেই বাংলাদেশ নামক একটা রাস্ট্র আমরা পেযেছিলাম। মুক্তিযুদ্ধটা যদি ১৯৭১ সালে না হযে ২০২১ সালে শুরু হতো তাহলে অস্ত্র হাতে নিযে ডিজিটাল সৈনিকরা হানাদারমুক্ত দেশ গড়তো নাকি নিজের ভাগ্য গড়তো কে জানে!  এখলাস উদ্দীন এবং মছলিম উদ্দীন দুজনের আত্মার প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা।

(জয়নাল আবেদীন, ঘাটাইল ডট কম)/-