ghatail.com
ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৮ আশ্বিন, ১৪২৮ / ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১
ghatail.com
yummys

মওলানা ভাসানী ও সৈয়দ মুজতবা আলী


ghatail.com
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঘাটাইল ডট কম
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ / ৬৫ বার পঠিত
মওলানা ভাসানী ও সৈয়দ মুজতবা আলী

বাঙলার অসামান্য সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্মবার্ষিকী ছিল গতকাল ১৩ সেপ্টেম্বর। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এদেশের আরেক কৃতিমানব, শতাব্দীর মহীরুহ মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গে মুজতবা আলীর সম্পর্ক ও পত্রালাপের সামান্য বিবরণ তুলে ধরছি।

মওলানা সাহেব সন্তোষে তাঁর নিজের স্থাপিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর করতে চেয়েছিলেন আলী সাহেবকে। কিন্তু দু'জনেই তখন জীবন সায়াহ্নে। আলী সাহেব ১৯৭৪ সালে এবং মওলানা সাহেব ১৯৭৬ সালে ইন্তেকাল করেন। ফলে এই স্বপ্ন পূরণ ও মণি-কাঞ্চন যোগ আর সম্ভব হয়ে উঠেনি।

তবে ১৯৭২ সালে লেখা মওলানা ভাসানীর চিঠির জবাবে লেখা সৈয়দ মুজতবা আলীর একটা চিঠি আমরা পেয়েছি সৈয়দ ইরফানুল বারী লিখিত 'ভাসানী সমীপে নিবেদন ইতি' বইটিতে।

ঐতিহাসিক সেই চিঠিটি তুলে ধরে ভাসানী-স্নেহধন্য সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্মদিনে তাঁর স্মৃতির প্রতি নিবেদন করছি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

139 F Dhanmondi Road No. 1.   ৪ বৈশাখ ১৩৭২

ঢাকা-২                                                                                                                                                                                                               ব্যক্তিগত

বহু সম্মানিত মহতরম জনাব মৌলানা সাহেব সমীপেষু,

আপনি আমাকে পত্র লিখিয়া যে প্রকারে গৌরবান্বিত করিয়াছেন এই প্রকারের সম্মান আমাকে কেহই কস্মিনকালে জানায় নাই। বলা বাহুল্য আমি এ-হেন শ্লাঘা লাভের উপযুক্ত নই। আপনি আমার সশ্রদ্ধ ধন্যবাদ ও হাজার হাজার সালাম গ্রহণ করুন। আপনি লিখিয়াছেন আপনি কোন কূলকিনারা করিতে পারিতেছেন না।

আশাবাদী রবীন্দ্রনাথ একদা গাহিয়াছিলেনঃ-

“পথের শেষ কোথায়, শেষ কোথায়, কী আছে শেষে? 

            এত কামনা এত সাধনা কোথায় মেশে?

            ঢেউ ওঠে পড়ে কাঁদার, সম্মুখে ঘন আঁধার, 

                পার আছে কোন দেশে?

আজ ভাবি মনে মনে    মরীচিকা অন্বেষণে

    বুঝি তৃষ্ণার শেষ নেই,     মনে ভয় লাগে সেই-

     হাল-ভাঙা পাল-ছেঁড়া   ব্যথা চলেছে নিরুদ্দেশে।

                কী আছে শেষে।"

কিন্তু তিনি আশা ছাড়েন নাই।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনি কূল পাইবেন, কুলায় পাইবেন। আল্লাতালার কাছে সেই প্রার্থনা জানাই।

দেশ গড়িয়া তুলিবার জন্য যাহা লেখা প্রয়োজন, বলা প্রয়োজন তাহা সবল কণ্ঠে বলিবার মত শক্তি আমার থাকিলে আল্লাতালা আমাকে ‘কান-পকড়কে’ লেখাইত, বলাইত। এই বাবদে ইহাই আমার দৃঢ়তম বিশ্বাস। এবং সর্বপ্রথম সর্বশেষ বিশ্বাস- আমার ইমান- গরীব দুঃখীকে যদি অন্নবস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা ব্যবস্থা না করিয়া দিতে পারিলাম তবে কি কচু হইল স্বাধীনতা লাভ করিয়া?

আপনি আমার জন্য দোয়া করুন, হুজুর যেন আমার কানে ধরিয়া আমাকে দিয়া তাঁহার হুকুম, আপনার খাহেশ, তামীল করাইয়া লয়। আমিন। 

আপনার সহৃদয়পত্র আমার নিকট দেরীতে পৌঁছে। আমি এখন এক আচম্বিত দুর্ঘটনার ফলস্বরূপ শয্যাশায়ী। এখনও তাহার ধকল সম্পূর্ণ কাটে নাই। বিশেষত আপনাকে পত্র লিখিবার মত সাহস আমি কিছুতেই খুঁজিয়া পাই না।

আমি নিশ্চয়ই ‘সন্তোষ’ লাভ করিব। তবে বর্ষাকালে ও সম্ভব হইলে সম্পূর্ণ সফর নৌকাযোগে। তবে আপনার বিনানুমতিতেই একটি ‘বাল্‌কা’ সঙ্গে লইয়া আসিব। আমার বাপ্‌, দাদা আমার গোষ্ঠী মোল্লা। ‘বাল্‌কা’ ভিন্ন বাহির হই কি প্রকারে! তদুপরি আমার স্বাস্থ্য ভালো নয়। ছেলেটি বড়ই সৎ। আপানার ভক্ত, ছাত্রকর্মী। নাম জালাল আহমদ। কলেজে পড়ে। আমার জ্যষ্ঠালির পুত্র। বাল্যকাল হইতেই তাহাকে অন্তরঙ্গরূপে চিনি। নিবাস রাজশাহী।

আমার বহুত বহুত সালাম গ্রহণ করিবেন।

কোনো প্রকারের গোস্তাখী হইয়া থাকিলে মাফ করিতে মরজী হয়। 

খাকসার ফকির, মুজতবা আলী।

১৯৭২ সনের এপ্রিলে মওলানা ভাসানী সৈয়দ মুজতবা আলীর কথা ভাবেন। আলী সাহেব তখন বাংলাদেশেই, ঢাকায় ধানমণ্ডির বাসায় থাকতেন। সে সময় মওলানা সাহেব সৈয়দ ইরফানুল বারীকে তাঁর ভাবনার কথা জানিয়ে বলেন, মুজতবা আলীর অভিজ্ঞতা রয়েছে রবীন্দ্রনাথের শান্তি নিকেতন এবং মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের।

ভাষা জানেন অনেকগুলো- ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, আরবি, ল্যাটিন, হিন্দি, গুজরাটি, বাংলা-উর্দু তো বটেই।

সৈয়দ মুজতবা আলী আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়েছেন। কাবুলের কৃষিবিজ্ঞান কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। একসময় বগুড়ার আজিজুল হক কলেজেরও অধ্যক্ষ ছিলেন। তাছাড়া তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্বভারতী সহ অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও শিক্ষকতা করেছেন। হালকা মেজাজে আড্ডার ঢঙে রসাত্মক রচনা লিখেও তিনি বিশ্বমানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা, আন্তর্জাতিক চেতনা, শাস্ত্রচর্চা সহ গুরুগম্ভীর অনেক বিষয় সরস ভাষায় তাঁর লেখায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

এমন জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও যোগ্যতার কারণেই তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন মওলানা ভাসানী।

আর একটি বিষয়। সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর চিঠিতে তারিখ ৪ বৈশাখ ঠিক লিখলেও ভুলক্রমে বাংলা সন ১৩৭২ লিখেছিলেন। আসলে সেটি ছিল ১৩৭৯ সন।

সন্তোষ পোস্ট অফিসের সিল অনুযায়ী ১৯৭২ সনের ২২ এপ্রিল চিঠিটি সন্তোষে পৌঁছে এবং সেদিনই বিলি হয়ে মওলানা ভাসানীর হাতে আসে।

(নিজস্ব প্রতিবেদক, ঘাটাইল ডট কম)/-

সর্বশেষ - প্রচ্ছদ