ghatail.com
ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৮ আশ্বিন, ১৪২৮ / ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১
ghatail.com
yummys

বাংলাদেশে সবথেকে ধনী বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ


ghatail.com
হাছান আদনান ও সাইফ সুজন, ঘাটাইল ডট কম
০৩ আগস্ট, ২০২১ / ১৮০ বার পঠিত
বাংলাদেশে সবথেকে ধনী বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ

শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে প্রতি বছর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (এনএসইউ) আয় হয় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিচালনায় আয়কৃত এ অর্থের অর্ধেকও ব্যয়ের প্রয়োজন পড়ে না। এনএসইউর বার্ষিক অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ ২৫০ কোটি টাকারও কম। প্রতি বছরই বেঁচে যাওয়া বড় অংকের এ অর্থ যুক্ত হচ্ছে নর্থ সাউথের তহবিলে। উদ্বৃত্ত অর্থে ক্রমেই ফুলেফেঁপে উঠছে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির তহবিল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে, বর্তমানে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে জমা আছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। দেশের এক ডজনেরও বেশি বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মেয়াদি আমানত হিসেবে এ অর্থ জমা রাখা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) বলছে, দেশের আর কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েরই এত বড় অংকের তহবিল নেই। এমনকি আয়ের পরিমাণ ও উদ্বৃত্ত তহবিলের আকারে নর্থ সাউথ এখন দেশের অনেক বৃহৎ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকেও ছাড়িয়েছে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বেশি অর্থ জমা আছে সাউথইস্ট ব্যাংক লিমিটেডে। মেয়াদি আমানত হিসেবে ব্যাংকটির বসুন্ধরা শাখায় জমা আছে ৩৪৭ কোটি টাকা। সাউথইস্ট ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকদের বড় অংশই নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি। বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান চেয়ারম্যান আজিম উদ্দিন আহমেদ সাউথইস্ট ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক। এছাড়া সাউথইস্ট ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এমএ কাশেমও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়টির বড় অংকের আমানত জমা রয়েছে দ্য সিটি ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) লিমিটেডেও। এছাড়া পিকে হালদারের লুটপাটের শিকার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে ১০ কোটি টাকার বেশি জমা রাখা হয়েছে। যদিও দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও এ অর্থ ফিরে পাচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয়টি।

অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয়টির বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা নিজেদের পছন্দ ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানতের অর্থ জমা রেখেছেন। যদিও স্বার্থের সংঘাতজনিত অভিযোগ উঠতে পারে এমন কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা না করার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টের প্রতি নির্দেশনা রয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের।

আইন অনুযায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হবে অবাণিজ্যিকভাবে। আর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় যে ট্রাস্টের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত তার চুক্তিপত্রেও বলা হয়েছে, এ ট্রাস্ট মানবহিতৈষী, দানশীল, জনহিতকর, অরাজনৈতিক, অলাভজনক ও অবাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত হবে। যদিও অভিযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণ টিউশন ফি আরোপ করে বড় অংকের অর্থ লাভ করছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। তবে ইউজিসি বলছে, শিক্ষার্থীদের ওপর মোটা অংকের টিউশন ফি আরোপ করে বড় অংকের তহবিল গঠন সম্পূর্ণভাবে অযৌক্তিক।

বিশাল অংকের তহবিলের বিষয়ে জানতে চাইলে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আতিকুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় অংকের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে বোর্ড অব ট্রাস্টিজ সিদ্ধান্ত নেয়। উদ্বৃত্ত তহবিলের অর্থ জমা রাখার বিষয়েও সিদ্ধান্ত বোর্ড অব ট্রাস্টিজ থেকে নেয়া হয়। ট্রাস্টিদের নেয়া সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাস্তবায়ন করে। তাই আমার পক্ষে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করার সুযোগ নেই। ট্রাস্টিরাই এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।

দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থে ভর করে। অবাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর ওপর মোটা অংকের ফি আরোপ করে বড় তহবিল গঠন সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। যেহেতু আয়ের বিপরীতে ব্যয়ের পরিমাণ অর্ধেক বা তার কম। সেক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়টির টিউশন ফির পরিমাণ ৪০-৫০ শতাংশ কমানোর সুযোগ রয়েছে। অন্যথায় দরিদ্র মেধাবী পরিবার থেকে আসা ৪০-৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বিনা খরচে পড়াতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়টি। কারণ বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হলেও সরকার জনকল্যাণেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিয়েছে। শুধু তথাকথিত অভিজাত ও বিত্তশালী পরিবারের সন্তানদের জন্য বিশেষায়িত কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন সরকার দেয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, বড় অংকের তহবিল থেকে নিজেদের ইচ্ছামতো অর্থ ব্যয় করছে বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ড। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির টাকায় একেকজন ট্রাস্টি প্রায় ৩ কোটি টাকার ল্যান্ড রোভারের বিলাসবহুল রেঞ্জ রোভার গাড়ি কিনে ব্যবহার করছেন। বিওটিসহ নিজেদের তৈরি করা বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় কমিটির সভা ডেকে বড় অংকের সিটিং অ্যালাউন্স নেন ট্রাস্টিরা। সভাভেদে সিটিং অ্যালাউন্স বাবদ সদস্যদের কেউ কেউ ৫০ হাজার টাকাও নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিজেদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও কেনাকাটা কিংবা সেবার নামে মোটা অংকের অর্থ বের করে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে এনএসইউর কয়েকজন ট্রাস্টির বিরুদ্ধে। এমনকি স্ত্রীসহ স্বজনদের নামমাত্র নিয়োগ দিয়ে তাদের বেতন-ভাতা বাবদও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন অনেক ট্রাস্টি।

এমন কিছু অভিযোগ ও এর মধ্যে কোনো কোনোটির প্রমাণ পাওয়ায় নর্থ সাউথের আর্থিকসহ সার্বিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়টিকে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত—২৮ বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাবের পুনর্নিরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে এ নিয়ে একটি চিঠি এনএসইউ ট্রাস্টি বোর্ডকে পাঠানো হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়ে ইউজিসির তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এ চিঠি দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল অর্থাৎ ১৯৯২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত নিরীক্ষিত হিসাব মন্ত্রণালয় কর্তৃক মনোনীত একটি নিরীক্ষা ফার্ম কর্তৃক পুনর্নিরীক্ষা করাতে হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব একেএম আফতাব হোসেন প্রামাণিক বলেন, আইন অনুযায়ী দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয় ট্রাস্টের অধীনে। বিভিন্ন সময় অনেক ট্রাস্টির বিরুদ্ধেই অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এসব বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে তদন্ত পরিচালনা ও সে আলোকে ব্যবস্থা নেয়া হয়। তেমনি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নির্দেশনার আলোকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের মাধ্যমে একটি তদন্ত করানো হয়। কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে সম্প্রতি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়কে বেশকিছু বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি এর তাত্ক্ষণিক জবাবে জানিয়েছে, নির্দেশনার আলোকে গৃহীত পদক্ষেপ বিষয়ে তারা সময়ে সময়ে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবে।

সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চেয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আজিম উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য ট্রাস্টিরাও এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে চাননি।

(হাছান আদনান ও সাইফ সুজন, ঘাটাইল ডট কম)/-

সর্বশেষ - প্রচ্ছদ