ghatail.com
ঢাকা মঙ্গলবার, ১৯ শ্রাবণ, ১৪২৮ / ০৩ আগস্ট, ২০২১
ghatail.com
yummys

ঘাটাইলের গর্ব অহংকার ইরফান আলী


ghatail.com
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঘাটাইল ডট কম
১৭ জুলাই, ২০২১ / ৯৫৩ বার পঠিত
ঘাটাইলের গর্ব অহংকার ইরফান আলী

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার একজন কৃতি সন্তান ইরফান আলী। তার সম্পর্কে জানতে গিয়ে আমরা খুবই অবাক হয়েছি যে, এমন একজন গুণী, কীর্তিবান, সুশিক্ষিত, সচেতন, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, দেশপ্রেমিক, পরোপকারী মানুষ জন্মগ্রহণ করেছিলেন ঘাটাইলের একেবারেই প্রত্যন্ত পাহাড়িয়া অঞ্চল সন্ধানপুর এলাকায়। এমন একটা নিভৃত এলাকায় জন্ম নিয়ে তিনি স্বপ্রতিভায় উদ্ভাসিত হয়ে নিজেকে মেলে ধরেছিলেন দেশ সেবায়।

আলহাজ জনাব আলীর ছেলে ইরফান আলী সম্পর্কে ঘাটাইল ডট কমের সাথে কথা হয় তার দ্বিতীয় পুত্র ফারুক মাসুদের সাথে। তিনি ঢাকার উত্তরা ইউনিভার্সিটির ফ্যাশন ডিজাইন বিভাগের প্রফেসর ও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাবার সৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি নানান বিষয় এবং কর্মজীবনের অনেক অজানা কথা তুলে ধরেছেন। এছাড়াও চাকুরীজীবী মাসুদ রানা এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন।

ঘাটাইল ডট কম পাঠকদের জন্য আমরা ঘাটাইলের এই কৃতি সন্তান ইরফান আলীকে সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামছুল হক, কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমের বাবা আবদুল আলী সিদ্দিকী, বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরীরা ছিলেন ইরফান আলীর সমসাময়িক বন্ধুবর। তিনি বৃটিশ আমলে প্রথমে ফুড অফিসার হিসাবে চাকুরিতে যোগদান করে পরবর্তীতে প্রশাসনে সার্কেল অফিসার (ম্যাজিস্ট্রেট) হিসাবে যোগ দেন। সে সময় সার্কেল অফিসারের বুনিয়াদী প্রশিক্ষণে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন।

ঘাটাইল উপজেলার প্রত্যন্ত পাহাড়িয়া অঞ্চল সন্ধানপুরের নিভৃত গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ইরফান। ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ইরফান স্কুলের কোন পরীক্ষায় দ্বতীয় হননি। প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিলেন তিনি। ঘাটাইলের ব্রাম্মনশাসন হাইস্কুল হওয়ার পুর্বে এটি মাদ্রাসা ছিল। সেখানে ম্যাট্রিকে একমাত্র প্রথম বিভাগ পেয়ে পাশ করেন তিনি। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে করটিয়া সাদত কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে কৃতকার্য হয়ে গোটা এলাকায় সাফল্য দেখান।

টাঙ্গাইল সাদত কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াজেদ আলী খান পন্নী (চান মিয়া) পরিবারের কাছ থেকে তৎকালীন সময়ে সংবর্ধনা পেয়ে সন্ধানপুরের এই কৃতি সন্তান ঘাটাইলের জন্য অনন্য গৌরব এনে দেন। এমনকি তখন জমিদার পরিবার হাতি নিয়ে ঘাটাইলে আসেন ইরফান আলীকে একনজর দেখার জন্য। এ সম্মান ছিল পুরো ঘাটাইলের। পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাশ করেন (বৃটিশ আমল) তিনি।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা সত্বেও ভাষার টানে আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রাখেন দেশপ্রেমিক ইরফান। ১৯৭১ সালে প্রশাসনিক দায়িত্নে থাকাবস্থায় দেশের টানে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগটিত করার লক্ষে বিশেষ ভুমিকা রাখায় পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত হতে হয়েছিলো তাঁকে। এমনকি সে সময় বাসভবনে হামলা করে বসতবাড়ি গুড়িয়ে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় পাকিস্তানি হানাদাররা।

দেশমাতৃকার প্রতি ভালবাসার কারণে সারাজীবন তিনি প্রশাসনে একই পদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে এরশাদ সরকারের পরপরই চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। সে সময় এরশাদ সরকার সার্কেল অফিসারদের ডিসি হবার পথ সুগম করে দেন। সরকার কর্তৃক তার চাকুরী দু’বছর বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হলেও সাদা মনের নির্লোভ ইরফান উক্ত প্রস্তাব গ্রহণ না করে অবসরে চলে যান।

ইরফান আলীর চার পুত্রসন্তান ও ছয় কন্যা সন্তানদের সবাই সুশিক্ষিত। তার প্রথম সন্তান প্রয়াত ফোরকান মোহাম্মদ মামুন কলেজের শিক্ষকতা করতেন। তিনি টাঙ্গাইল জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। দ্বিতীয় পুত্র ফারুক মাসুদ ঢাকার উত্তরা ইউনিভার্সিটির ফ্যাশন ডিজাইন বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে বর্তমানে কর্মরত। তৃতীয় পুত্র ফয়সাল মোহাম্মদ মাহবুব দীর্ঘদিন জাপানে ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি কালিহাতী রাজাপুর হাইস্কুলে সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার চতুর্থ পুত্র ফরহাদ মোহাম্মদ মাসুম কানাডার একটি ব্যাংকে চাকুরিরত আছেন।

বাবা ইরফান আলীর সৃতিচারণ করতে গিয়ে তার ছেলে ফারুক মাসুদ ঘাটাইল ডট কমকে বলেন, আমার বাবা অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। একটি নিভৃত পাড়াগাঁয়ে জন্মলাভ করে তিনি তার মেধা ও কর্মকে যেভাবে বিকাশ ঘটিয়েছিলেন সেটি একটি অপার বিস্ময়। উনি সবসময় নিজেকে আড়াল করে রাখাকে বেশী ভালোবাসতেন। অবসর সময়কে তিনি পড়াশোনা দিয়ে ব্যস্ত রাখতেন। যারা তার কাছে আসতেন তাদের সাথেই তিনি সময় কাটাতেন। তিনি অবসরে যাওয়ার কিছুদিন পরই মৃত্যুবরণ করায় তার আত্মজীবনী সম্পর্কে কিছু লিখে যেতে পারেননি। আমরা তার সাহচর্য পেয়ে যতটুকু শিখেছি বা জেনেছি ততটুকুনই।

ফারুক মাসুদ বলেন, আমার বাবা ইরফান আলী সময়ের প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। কখনও কোন অনুষ্ঠানে তিনি দেরি করে উপস্থিত না হয়ে একটু আগেই উপস্থিত হতেন। তৎকালীন সময়ে বাসার বাইরে বের হলে তিনি সবসময় স্যুটটাই পরিহিত অবস্থায় পরিপাটি হয়ে বের হতেন। আমরা ভাইবোনেরা সবাই আমার বাবার নীতি আদর্শকে লালন ও পালন করে কোন ধরনের অন্যায়ে মাথা নত করিনি। সবসময় চেয়েছি যেন আমার বাবার সন্মান যেন আমাদের মাধ্যমে সমুন্নত থাকে।

শিক্ষকতা পেশাকে কেন বেঁছে নিলেন- এমন প্রশ্নর জবাবে ফারুক মাসুদ বলেন, আমি চাই আমার ধারনকৃত বাবার কীর্তি আদর্শ নতুন প্রজন্মর নিকট রেখে যেতে। সারাজীবনে নানা যায়গায় লেখাপড়া এবং কর্ম অভিজ্ঞতাগুলো আমি চাই পরবর্তী প্রজন্মর নিকট সংরক্ষিত থাকুক। যেন দেশপ্রেমিক এবং সুশিক্ষিত হয়ে তারা আলো ছড়াতে সক্ষমতা অর্জন করে।

ইরফান খানের সন্তান ফারুক মাসুদ আরও বলেন, অনেক ঘটনা আর সমৃদ্ধ জীবন ওনার। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক সামসুল হক উনার ক্লাস ফ্রেন্ড ছিলেন। প্রায়ই ওনার কথা বলতেন। এরশাদ সরকারের সময় টাঙ্গাইল জেলার কোঅর্ডিনেটর ডাক্তার শওকত এবং কাদের সিদ্দিকীর বাবা ওনার বন্ধু ছিলেন।শেষ জীবনে আবার বাবা যখন টাঙ্গাইলে এসিস্টেন্ট কমিশনার ছিলেন তখন ওনারা সবাই বাবার সাথে দেখা করতেন এবং আড্ডা দিতেন।

তিনি বলেন, আব্বা যখন ইহলোক ত্যাগ করেন তখন আমি পড়াশুনা করতেছিলাম। ভেবেছিলাম পড়াশোনা শেষ করে তার অবসর জীবনে অনেক অভিজ্ঞতা ভারত থেকে শুরু করে পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশ সব শুনবো। কিন্তু তার অকাল বিদায় আমাকে অনেক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত করেছে। পুরাতন কিছু স্মৃতি আজও মনে পড়ে।

তিনি বলেন, একবার বাবা একটা মানি অর্ডারে (ডাকঘরের মাধ্যমে টাকা পাঠানো) লিখে দিয়েছেন পোস্ট অফিস গিয়ে পোস্ট মাস্টারকে দেয়ার জন্য। পোস্ট মাস্টার ছোট একটি ভূল ধরার চেষ্টা করেছিল। আব্বা বললেন, পোস্ট মাস্টারকে বলে আয় আমার আব্বা ভুল করতে পারে না। পরে পোস্ট মাস্টার তার ভূল বুঝতে পেরেছিলেন। মসজিদের ইমাম সাহেবরা ভয়ে থাকতেন, তারা জানতেন তার জ্ঞান সম্পর্কে। উনি সবসময় পবিত্র কোরআন শরীফের ইংলিশ তর্জমা পড়তেন। তার উপরের বসদের কোন ল্যাংগুয়েজ পছন্দ না হলে সঙ্গে সঙ্গে বলে বসতেন। ওনার ইংলিশ ড্রাফট অনেকের কাছে এখনো সংরক্ষিত আছে। ওনার একটা খাতা আমার কাছে ছিলো। সমস্ত খাতায় কোথাও একটি কাটাছিঁটা ছিলো না। সমস্ত খাতা ছিল ক্লিন। হাতের লেখাছিল চমৎকার।

ফারুক মাসুদ আরও জানান, সন্ধানপুরের দুইজন ব্যক্তি ওনাকে অসম্ভব সম্মান করতেন। একজন করিম কাকা এবং আরেকজন জলিল কাকা। জলিল কাকা যখন ভারতে অসুস্থ ছিলেন, তখন নুরুলকে বলেছিলেন- তোরা ইরফানের ভাইয়ের জন্য কিছু করিস। এ কথাটি পরে নুরুল আমাকে বলেছিলো আমার অফিসে এসে। জলিল কাকা যেখানে গেছেন সেখানে তার ইরফান ভাইয়ের কথা বলতেন। তিনি যখন সময় পেতেন তখনই আব্বাকে দেখার জন্য চলে আসতেন।

ইরফান আলীর কন্যা নাজনিন আলম বলেন, উনি কখনো পরাজিত হতে শেখেননি। ওনার অদম্য মনোবলের কারনেই অত্যন্ত প্রতিকূল অবস্থায় অনেক সংগ্রাম করে ওই অজপাড়াগাঁ থেকে বেরিয়ে মাথা উঁচু করে দাড়াতে পেরেছিলেন। চাকুরি জীবন ওনার চলার পথটা খুব একটা মসৃণ ছিল না। প্রথম জীবনে অর্থাৎ বৃটিশ আমলে ভারতবর্ষের মেদিনীপুরে চাকুরিরত অবস্থায় দেশভাগের সময় শূন্য হাতে নিজ দেশে ফিরে আসেন। আবার ১৯৭১ সালে পাকবাহিনী ওনার বাড়িঘর পুড়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। এভাবে বারবার হোঁচট খাওয়া সত্যেও উনি পুনরায় বীরদর্পে মাথা উঁচু করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। উনি কখনো মাথা নত করতে শেখেননি। আমরা ওনার সন্তান হিসেবে গর্ব বোধ করি। আল্লাহ্ আমার বাবাকেসহ সকল কবরবাসীকে জান্নাত দান করুন, আমিন।

(নিজস্ব প্রতিবেদক, ঘাটাইল ডট কম)/-