ghatail.com
ঢাকা রবিবার, ২৫ বৈশাখ, ১৪২৮ / ০৯ মে, ২০২১
ghatail.com
yummys

চিরকালের প্রণয়িনী সুচিত্রা সেনের জন্মদিনে কিছু কথা


ghatail.com
স্টাফ রিপোর্টার, ঘাটাইল ডট কম
০৭ এপ্রিল, ২০২১ / 16 views
চিরকালের প্রণয়িনী সুচিত্রা সেনের জন্মদিনে কিছু কথা

"আমার খুব ইচ্ছা ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুরঙ্গ’র দামিনি চরিত্রে অভিনয় করি। কিন্তু সেটা হয়ে ওঠেনি কোনো দিন। প্রেমেন্দ্র মিত্র একটা সিনেমার পরিকল্পনা করেছিলেন। কাজটা আমিই করতাম। কিন্তু প্রযোজক হেমেন গাঙ্গুলি হঠাৎ আত্মহত্যা করে বসলেন। আমার আর সিনেমাটা করা হয়নি। এমনকি দামিনি চরিত্রটা আমি থিয়েটারে হলেও করতে চেয়েছিলাম। উপন্যাসটার উপর আমার সত্যিই বিশাল ভালো লাগা কাজ করে। ঠাকুরের সব কাজের মধ্যে এটা আমি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি।"

সুচিত্রা এমন করেই বলতেন।

সত্যজিৎ রায় মহানায়ক উত্তম কুমারকে চিন্তা করেই যেমন ‘নায়ক’ ছবিটা বানিয়েছিলেন। তেমনি সুচিত্রা সেনকেও একজন স্পেশাল নায়িকা হিসেবেই ভেবেছিলেন এবং তাঁকে মাথায় রেখেই প্রখ্যাত উপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা উপন্যাস ‘দেবী চৌধুরানী’ অবলম্বনে একটি ছবি বানাতে চেয়েছিলেন। যেখানে দেবী চৌধুরানীর ভুমিকায় অভিনয় করার কথা ছিল সুচিত্রা সেনের।

তাহলে সত্যজিতের ছবিটা কেন হল না ?

১৯৬০ সালের কথা, সত্যজিত রায় সুচিত্রাকে তার ‘দেবী চৌধুরানী’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন, কিন্তু শিডিউল মিলছিলো না বলে সুচিত্রা সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সুচিত্রা সবসময় নিজের শর্তে পথ চলতেন। 
সত্যজিৎ তাঁকে বলেছিলেন তাঁর ছবির শুটিং চলাকালে সুচিত্রা অন্য কোন ছবিতে কাজ করতে পারবেন না। কিন্তু সুচিত্রা ঐ সময় আরও দু’টি ছবির জন্য চুক্তিবদ্ধ ছিলেন।

তাই তিনি সত্যজিতের শর্ত মানতে পারেননি। তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। 
রবর্তীতে তিনি বলেছিলেন, ‘যেসব পরিচালক আমাকে সুচিত্রা সেন বানিয়েছেন এখন যদি এই ছবির জন্য তাদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেই। তাহলে তাদের প্রতি অবিচার করা হবে।’

সুচিত্রার ব্যক্তিত্বের কাছে সবকিছুই আসলে ম্লান।

নকশাল হামলা থেকে 'মবিং'। এমনকি উত্তমকুমারের বিবাহ-প্রস্তাব। পরিস্থিতি যতই দূরূহ হোক, সুচিত্রা সেন সামলে নিতেন অবলীলায়।

সুচিত্রা সেনের শেষ ইচ্ছা 'আমায় যেন চিতায় দাহ করা হয়। চুল্লিতে আমি যাব না৷ আমি ধোঁয়া হয়ে আকাশে উড়ে যাব, ছাই হয়ে মাটিতে মিশে যাব,' এটাই শেষ ইচ্ছে ছিল সুচিত্রা সেনের।

'আলো আমার আলো'র শ্যুটিংয়ের একটা ঘটনা। তখন নকশাল আমল৷ এনটি ওয়ান থিয়েটার্সে চলছিল শ্যুট। নিজের মেক-আপ রুমে বসে তৈরি হচ্ছিলেন ম্যাডাম। হাতে 'আলো আমার আলো'র চিত্রনাট্য৷ ম্যাডাম কোনোদিনই সংলাপ মুখস্ত বলতেন না।

চিত্রনাট্যটা পড়তেন ভালো করে৷ একেবারে স্বতঃস্ফূর্ত ছিল ওনার রিয়্যাকশন। সেটাই করছিলেন। এমন সময়, ওনার ঘরে ঢুকে পড়ে তিনটি ছেলে। তাদের মধ্যে প্রধান ছিল রঞ্জিত নামে একটি ছেলে।

হঠাৎ চিৎকার- 'গেট আউট, গেট আউট!' হুড়মুড়িয়ে সুচিত্রা চিৎকার করে ছেলেগুলোকে বকছেন। "কোন সাহসে আপনারা আমার ঘরে পারমিশন ছাড়া ঢুকেছেন?" 

ছেলেগুলোও তেমনি, কিছুতেই যাবে না৷ অবশেষে, "বেশ করেছি... দেখে নেব," বলে-টলে চলে গেল।

স্টুডিয়োর গেট বন্ধ করে দেওয়া হলো৷ স্টুডিয়ো মালিককে বলে লালবাজারে পুলিশে খবর দিয়ে ম্যাডাম নিজের প্রটেকশনের ব্যবস্থা নিজেই করলেন। 

সেদিনের শ্যুটিং শেষ হলো। ততক্ষণে প্রায় ৫০০ ছেলে জড়ো হয়েছে গেটের বাইরে। গেটের ভেতরে সুচিত্রার গাড়ি দাঁড়িয়ে৷ ড্রাইভার ছিল না। উনি গিয়ে হর্নটা চেপে ধরলেন৷ ঝাঁ-ঝাঁ হর্ন বাজছে।

ড্রাইভার দৌড়ে এল৷ সুচিত্রা সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে বসে। তারপর, সবাই বারণ করা সত্ত্বেও, গেট খোলার নির্দেশ দিলেন৷ 

৫০০ ছেলে হুর্মুর করে পড়ল গাড়ির ওপর৷ উনি আস্তে আস্তে গাড়ির কাচ নামালেন। তারপর দরজা খুললেন৷ সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল, "আপনি আমাদের তাড়িয়ে দিয়েছেন৷ আপনাকে ক্ষমা চাইতে হবে।"

সুচিত্রা আরও কঠিন হয়ে গেলেন। বললেন, "কে আপনারা? স্টুডিয়ো আমার প্রফেশনাল জায়গা। আমার পারমিশন না নিয়ে ঢুকেছিলেন বলেই আমি আপনাদের বারণ করি। ক্ষমা তো আমি চাইব না৷ আপনারা বলুন কি চান?" 

ওরা বলল, 'আমরা বিপ্লবী'। ম্যাডাম বললেন, "আপনাদের বিপ্লব কি সুচিত্রা সেন-কে নিয়ে? যদি আপনাদের কোনো সাহায্য লাগে আমি করতে পারি। কিন্তু ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই নেই। আমি এখানে গাড়িতে বসে রইলাম। আপনাদের যা খুশি করতে পারেন।"

এর পর, ছেলেরা ধীরে ধীরে সেখান থেকে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত ওদের নেতা বলে, "দিদি আমাদের ক্ষমা করবেন।" মনে হলো যেন ৫০০টা ছেলে একেবারে কেঁচো হয়ে গেল।

এমনই সাহস আর ব্যক্তিত্ব ছিল সুচিত্রার। নিজে ঝামেলার মুখোমুখি হতেন। আর কারও, এমনকি উত্তমকুমারেরও এরকম পাবলিক হ্যান্ডেল করবার সাহস আর ক্ষমতা ছিল না।

‘সপ্তপদী’ ছবিতে সুচিত্রা হয়েছেন রিনা ব্রাউন। কোট-স্কার্ট, লং পনিটেল। কিংবা ফ্রিল দেয়া ছোট হাতার টপের সঙ্গে নি-লেন্থ ফ্লোরাল প্রিন্টেড স্কার্ট আর পয়েন্টেড হিলের জুতা পরে ড্রামের তালে তালে ব্যালেরিনা নাচ। মনে পড়ে?

সেদিনের সাদা-কালো যুগের সেই সুচিত্রা সেনকে মুহূর্তের জন্যও কি অবজ্ঞা করার স্পর্ধা হবে কারোর? 

একেবারেই না। বরং ফরওয়ার্ড-ব্যাকওয়ার্ড করে বারবার তাকেই দেখতে ইচ্ছে হয়। এখনও!

হারানো সুর’-এর রমা যখন নিজের সিদ্ধান্তে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয় কিংবা ‘সপ্তপদী’র রিনা ব্রাউন যখন প্রেম এবং ধর্মবিশ্বাসের মধ্যিখানে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে দেয়, বাঙালি চিনে নিতে পারে সময়ের কষ্টি পাথরে পরীক্ষিত সঠিক রমণীটিকে। 

সেই আর্কিটাইপ্যাল নারী অমরত্বকে ছুঁয়ে নজরকাজল পরিয়ে দেন ইতিহাসের কপালে।

উত্তম নাকি জিজ্ঞেস করেছিলেন, "আমাদের বিয়ে হলে কেমন হতো?" তার উত্তরে বলেছিলেন, "একদিনও সেই বিয়ে টিকত না। তোমার আর আমার ব্যক্তিত্ব অত্যন্ত স্বতন্ত্র। আর খুব স্ট্রং। সেখানে সংঘাত হতোই। তার ওপর, তুমি চাইবে তোমার সাফল্য, আমি চাইব আমার। এ রকম দু'জন বিয়ে করলে সে বিয়ে খুব বাজেভাবে ভেঙে যেত।" 

শাসনও করতেন উত্তমকে। উত্তমকুমারের একটা ভয়-মিশ্রিত শ্রদ্ধা ছিল সুচিত্রার প্রতি। বলতেন, "তোমার কোনো বেচাল দেখলে কিন্তু আমি বলব।"

বাংলা ছবির ইন্ডাস্ট্রির কাঁচা মেঠোপথটিকে যে রূপ দিতে চেয়েছিলেন একদা কাননদেবী, তাই বাঁধানো রাজপথ হয়ে ওঠে সুচিত্রা সেনের পেশাদারিত্ব ও চারিত্রিক দৃঢ়তায়।

ছবির ইতিহাস থেকে সামাজিক পাঁচালি, প্রেম থেকে স্বপ্ন, বাসনা থেকে বাসনাপূরণে তাই সুচিত্রা সেন হয়ে ওঠেন প্রায় অলৌকিক এক আচ্ছন্নতা। নশ্বর সময় ফুরিয়ে যায়। তবু তার চোখের দিকে তাকিয়ে আজো বাঙালি বলতে ভালোবাসে- তুমি না হয় রহিতে কাছে, আরো কিছুক্ষণ না হয় রহিতে কাছে।

পৃথিবীটা যদি স্বপ্নের দেশ হতো, তবে কেমন হতো জানা না যাক। তবে সে স্বপ্নের দেশের রাজরানী যে কে হতেন তা বাঙালিমাত্রই জানে। তার পাখির নীড়ের মতো চোখের আশ্রয় আছে বলেই তো বাঙালির বিশ্বাস নীড় ছোট হলেও ক্ষতি নেই, কল্পনার আকাশ চিরকালই বড়।

সে সাদা-কালো আকাশে রঙধনুর সাতরঙ ছড়িয়ে তিনি যখন বলেন ‘জান না কি তুমি কে, আমি কার’- বাঙালি তা জানার চেষ্টাও করে না। বাঙালি জীবনে এক সমাধানহীন অপার রহস্য হয়ে থেকে যান সুচিত্রা সেন।

মহাকাল তাকে দিয়েছে বাঙালির মহানায়িকার আসন। তবু সে আসনও যেন তাকে ধরতে পারে না। আসনের পরিসীমা পেরিয়ে সুচিত্রা সেন হয়ে ওঠেন এক রূপকথা। আসলে সেই সাদা-কালো দিনে তিনিই তো ছিলেন বাঙালি সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার গোপন অহংকার।

বাঁকা ঠোঁটের হাসিতে যে কত তরুণের হৃদস্পন্দন বাড়িয়েছেন সুচিত্রা, তা এতো দিন পরও বাঙ্গালির মুখে মুখে ফেরে। সুচিত্রা ঘাড় ঘুরে তাকালে, সময়ও কি একটু করে থমকে যেতো না? যেতো। 

পর্দায় সুচিত্রার চোখ টলমল করে উঠলে জল গড়াতো পর্দার এপারে। তার মুগ্ধতাকে আকণ্ঠ গ্রহণ করেছে দর্শকসমাজ। সুচিত্রা এক চিরসবুজ প্রেয়সী, যার বয়স ওই পর্দার ছবিতেই আজো স্থির হয়ে আছে।

পঞ্চাশের দশকের মানবী হয়েও মনে-প্রাণে-বিশ্বাসে তিনি হয়ে উঠেছিলেন কালোত্তীর্ণ। যা সম্ভব হয়েছিল একান্তই তার নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা, সাধনা, চেষ্টা, নিষ্ঠা ও পরিশ্রমে। তাই তো সুচিত্রা সেন আজ আর কোনো নাম নয়। ব্র্যান্ড। আইকন। যে আইকনকে আবিষ্কারের পর্ব চলছে আজও। 

সুচিত্রা সেনের গগনচুম্বী জনপ্রিয়তার রহস্য তার উত্তরপুরুষ খুঁজে বেড়াচ্ছে এখনও। তার চাহনির মাদকতা, মরাল গ্রীবার উদ্ধত ভঙ্গি, যা কিছু অপছন্দের তাকে হেলায় প্রত্যাখ্যান। সর্বোপরি পুরুষশাসিত সমাজে, পুরুষ নির্দেশিত বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে তিনিই তার শেষ কথা হয়ে উঠেছিলেন। কিভাবে? কী করে? এই স্পর্ধা, ঔদ্ধত্য, অনমনীয় মনোভাবের উৎসমুখের সন্ধান মেলেনি আজও। 

তাই, অনুসন্ধান চলবেই। কেন না, ৩৬ বছরের অন্তরালের অবগুণ্ঠন সরিয়ে মহানায়িকাকে চিনতে-জানতে-দেখতে-বুঝতে যে আজও উদগ্রীব দুই বাংলার সুন্দরের পূজারীরা!

সুচিত্রা সেন কোন নাম নয়, এক দীর্ঘ যুগের নাম। যে যুগের শুরু আছে কিন্তু শেষ কোথায় কেউ জানে না। তাইতো তাঁর চোখে জল এলে বাঙালির মনে শ্রাবণ নামে। হাসলে মন চায় এই পথের যেন শেষ না হয়।

সপ্তপদী চলচ্চিত্রের সংলাপে তিনি বলেছিলেন, ‘ও আমাকে টাচ করবে না!’ সত্যিই তিনি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান বলে শেষ করা যাবে না। ৩৫বছর ধরে পর্দার আড়ালে রইলেও যেটুকু সময় ছিলেন তাই অবিস্মরণীয় করে রাখবে তাঁর নাম – সুচিত্রা সেন।

ছবি তোলা হয়ত তাঁর ব্যাক্তি স্বাধীনতাকে হস্তক্ষেপ করা কিন্তু কজন সাংবাদিক যে দুঃসাহসিক কাজ করেন তাঁদের জন্য আমরা আমাদের গ্রেটা গার্বো-কে দেখতে পেলাম। বয়স অনুযায়ী রূপ পরিবর্তন হবে, যৌবন চলে যাবে কিন্তু ঐ ব্যাক্তিত্ব ঐ ক্যারিশমা একই। তাঁর যে সামনে হাত দুটো দিয়ে দাঁড়ানো দেখলেই বোঝা যায় তিনি সুচিত্রা সেন। 

ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজের লন দিয়ে তিনি যখন হেঁটে যাচ্ছিলেন মনে হচ্ছিল ‘হসপিটাল’ ছবির ডঃ শর্বরী হেঁটে যাচ্ছেন। হাঁটার মধ্যেও একটা কি মোহনীয় স্টাইল।

শেষ দিকে সুচিত্রা আর হাঁটতে পারতেননা। তখন আর বেরোতেননা। হাঁটতেও তাঁর কারো না কারো সাহায্য লাগত। কিন্তু এসব বার্ধক্য জরা অতিক্রম তিনি অনেকদিনই করেছেন।

১৯৪০ সালে ‘রূপমঞ্চ’ ছিল কলকাতার এক নামী জনপ্রিয় চলচ্চিত্র পত্রিকা। এর সম্পাদক ছিলেন কালীশ মুখোপাধ্যায়। ‘রূপমঞ্চ’ অফিসে কালীশবাবুর ফটো তোলার স্টুডিও ছিল। জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের পাশাপাশি নবাগতদেরও তিনি আমন্ত্রণ জানাতেন তাঁর স্টুডিও-তে ফটো তোলার জন্য। 

ততদিনে মুক্তি পেয়েছে সুচিত্রা সেনের প্রথম ছবি – সাত নম্বর কয়েদী। এটাই সুচিত্রার মুক্তি পাওয়া প্রথম সিনেমা। কারণ, তাঁর প্রথম অভিনীত ছবি ‘শেষ কোথায়’।

কালীশবাবু ছবি তোলার জন্য সুচিত্রাকেও আমন্ত্রণ জানালেন। কালীশবাবুর প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করলেন সুচিত্রা সেন। তিনি বললেন, ‘মাফ করবেন কালীশবাবু, আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনার নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে ছবি তোলা।’

এহেন আচরণে হতবাক কালীশবাবু। সাধারণত অভিনেত্রী মাত্রই প্রচারের বাসনায় ব্যাপ্ত। আজকালকার অভিনেত্রীরাও যা ক্লাসের। সেখানে এক নবাগতা ‘না’ বলবেন তা আশা করেননি কালীশবাবু। 

আর একবার যাচাই করবার জন্য কালীশবাবু সবিনয়ে বললেন, ‘আমার ওখানে গিয়ে ছবি তুলতে তোমার আপত্তির কারণ কী? ওখানে আমার স্ত্রী আছেন, সম্পাদকীয় বিভাগের অন্য কর্মীরাও আছেন। তাছাড়া ইচ্ছে করলে তুমি তোমার স্বামীকেও সঙ্গে নিয়ে আসতে পারো।’

শ্রীমতী সেন বললেন, ‘এসব নিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে চাই না। আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়, সেটাই জানিয়ে দিলাম।’

এই কথা শুনে কালীশবাবু প্রায় রেগে আগুন। রূপমঞ্চে পরবর্তী সংখ্যায় সুচিত্রা সেন সম্পর্কিত যাবতীয় মনের বিষোদগার করলেন তিনি। তিনি লিখেছিলেন, ‘নটী নটীর মতোই থাকবে। তাকে আমরা এর চেয়ে বেশি মর্যাদা দিতে চাই না।’

এই মন্তব্যে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না সুচিত্রা। তিনি বুঝেছিলেন কথায় কথা বাড়ে তার চেয়ে নিশ্চুপই শ্রেয়।

এরপর প্রায় দশ বছর পরে- কালীশ মুখোপাধ্যায় সুচিত্রার ওই গুণের প্রশংসা না করে পারেননি।

তিনি বলেছিলে, ‘সুচিত্রা আমার সঙ্গে সেদিন যে ব্যবহারই করে থাকুক, ওর স্পিরিট দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সেদিনই বুঝতে পেরেছিলাম, ভেতরে একটু যদি কিছু থাকে তাহলে মেয়েটা অনেক দূর এগোবে। ওকে কেউ আটকাতে পারবে না।’

পরবর্তীকালে রমা সেন সুচিত্রা সেন হলেন ‘রূপমঞ্চ’র কভার গার্ল। অনেকগুলো সংখ্যাতেই তাঁকে করতে বাধ্য হন সম্পাদক।

আজ মহানায়িকার চলে যাওয়ার দিন-কোনো যাদুকরী তুলির স্পর্শে পৃথিবীর কোনো চিত্রকরের পক্ষেও তার মতো নিখুঁত কিংবা তার মতো মোহময় মুখের আঙ্গিক উপহার দেয়া আদৌ সম্ভব নয়।

এমন সুচিত্রা সেনের আবির্ভাব কখনও ছায়াছবির জগতে ঘটবে কি-না, সন্দেহ। কবি তো ঠিকই বলেছেন ‘এই পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় না কো আর!

‘বেবি ডল’ গোছের ভাবমূর্তি আদৌ ছিল না তার, আর সেটাই ছিল তার অপ্রতিরোধ্য আবেদনের মূলে। তার মধ্যে কোথাও একটা ছিল পুরুষের সমকক্ষ, মাথা উঁচু করা এক সত্তা, যার জন্য পুরুষ মরিয়া হতে পারে।

নারীসম্মান টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিষ্ঠিত করার পথিকৃত সুচিত্রা সেন। যিনি বুঝিয়ে দেন নটীরাও মানুষ তাঁদেরও আত্মসম্মান আছে। যিনি বলতে পারেন আমি সুচিত্রা, আমি ইন্ডাস্ট্রি।

তিনি চিরকালের প্রনয়িনী

১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল অধুনা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্তর্গত সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানার অন্তর্গত সেন ভাঙ্গাবাড়ী গ্রামে সুচিত্রা সেনের পৈত্রিক নিবাস। পাবনা জেলার সদর পাবনায় সুচিত্রা সেন জন্মগ্রহণ করেছিলেন। 

তার বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন এক স্থানীয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও মা ইন্দিরা দেবী ছিলেন গৃহবধূ। তিনি ছিলেন পরিবারের পঞ্চম সন্তান ও তৃতীয় কন্যা। পাবনা শহরেই তিনি পড়াশোনা করেছিলেন। তিনি ছিলেন কবি রজনীকান্ত সেনের নাতনী।

১৯৪৭ সালে বিশিষ্ট শিল্পপতি আদিনাথ সেনের পুত্র দিবানাথ সেনের সঙ্গে সুচিত্রা সেনের বিয়ে হয়। তাদের একমাত্র কন্যা মুনমুন সেনও একজন খ্যাতনামা অভিনেত্রী। 

(মুজতবা খন্দকার, ঘাটাইল ডট কম)/-