নবজাগরণের পথিকৃৎ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রয়াণ দিবস আজ

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রয়াণ দিবস আজ । ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ১৮২০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ সেপ্টেম্বর বর্তমান পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বীরসিংহ সেই সময় অধুনা পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ঈশ্বরচন্দ্রের পিতামহ রামজয় তর্কভূষণ ছিলেন সুপণ্ডিত ও বলিষ্ঠ দৃঢ়চেতা পুরুষ। ইনিই ঈশ্বরচন্দ্রের নামকরণ করেছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্রের পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতায় চাকরি করতেন। পরিবার নিয়ে শহরে বাস করা তার সাধ্যের অতীত ছিল। সেই কারণে বালক ঈশ্বরচন্দ্র গ্রামেই মা ভগবতী দেবী ও ঠাকুমার সঙ্গে বাস করতেন। তার আসল নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উনবিংশ শতকের একজন বিশিষ্ট বাঙালি শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও গদ্যকার। তার প্রকৃত নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য প্রথম জীবনেই তিনি বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেন। সংস্কৃত ছাড়াও বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় বিশেষ বুৎপত্তি ছিল তার। তিনিই প্রথম বাংলা লিপি সংস্কার করে তাকে যুক্তিবহ ও অপরবোধ্য করে তোলেন। বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক রূপকার তিনিই। তাকে বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী বলে অভিহিত করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

তিনি রচনা করেছেন জনপ্রিয় শিশুপাঠ্য বর্ণপরিচয় সহ, একাধিক পাঠ্যপুস্তক, সংস্কৃত ব্যাকরণ গ্রন্থ। সংস্কৃত, হিন্দি ও ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞান সংক্রান্ত বহু রচনা।

অন্যদিকে বিদ্যাসাগর মহাশয় ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারকও। বিধবা বিবাহ ও স্ত্রীশিক্ষার প্রচলন, বহুবিবাহ ও বাল্য বিবাহের মতো সামাজিক অভিশাপ দূরীকরণে তার অক্লান্ত সংগ্রাম আজও স্মরিত হয় যথোচিত শ্রদ্ধার সঙ্গে। বাংলার নবজাগরণের এই পুরোধা ব্যক্তিত্ব দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘দয়ার সাগর’ নামে। দরিদ্র, আর্ত ও পীড়িত কখনই তার দ্বার থেকে শূন্য হাতে ফিরে যেত না। এমনকি নিজের চরম অর্থসংকটের সময়ও তিনি ঋণ নিয়ে পরোপকার করেছেন। তার পিতামাতার প্রতি তার ঐকান্তিক ভক্তি ও বজ্রকঠিন চরিত্রবল বাংলায় প্রবাদপ্রতিম। মাইকেল মধুসূদন দত্ত তার মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন প্রাচীন ঋষির প্রজ্ঞা, ইংরেজের কর্মশক্তি ও বাঙালি মায়ের হৃদয়বৃত্তি।

বাঙালি সমাজে বিদ্যাসাগর মহাশয় আজও এক প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুরে তার স্মৃতিরক্ষায় স্থাপিত হয়েছে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়। রাজধানী কলকাতার আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বিদ্যাসাগর সেতু তারই নামে উৎসর্গিত।

শিক্ষাজীবন

চার বছর নয় মাস বয়সে ঠাকুরদাস বালক ঈশ্বরচন্দ্রকে গ্রামের সনাতন বিশ্বাসের পাঠশালায় ভর্তি করে দেন। কিন্তু সনাতন বিশ্বাস বিদ্যাদানের চেয়ে শাস্তিদানেই অধিক আনন্দ পেতেন। সেই কারণে রামজয় তর্কভূষণের উদ্যোগে পার্শ্ববর্তী গ্রামের কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায় নামে এক উৎসাহী যুবক বীরসিংহ গ্রামে একটি নতুন পাঠশালা স্থাপন করেন।

আট বছর বয়সে এই পাঠশালায় ভর্তি হন ঈশ্বরচন্দ্র। তার চোখে কালীকান্ত ছিলেন আদর্শ শিক্ষক। কালীকান্তের পাঠশালায় তিনি সেকালের প্রচলিত বাংলা শিক্ষা লাভ করেছিলেন।

১৮২৮ সালের নভেম্বর মাসে পাঠশালার শিক্ষা সমাপ্ত করে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য পিতার সঙ্গে কলকাতায় আসেন। তাদের সঙ্গে কলকাতায় এসেছিলেন কালীকান্ত ও চাকর আনন্দরাম গুটিও। কথিত আছে, পদব্রজে মেদিনীপুর থেকে কলকাতায় আসার সময় পথের ধারে মাইলফলকে ইংরেজি সংখ্যাগুলি দেখে তিনি সেগুলি অল্প আয়াসেই আয়ত্ত করেছিলেন।

কলকাতার বড়বাজার অঞ্চলের বিখ্যাত সিংহ পরিবারে তারা আশ্রয় নেন। এই পরিবারের কর্তা তখন জগদ্দুর্লভ সিংহ। ১৮২৯ সালের ১ জুন সোমবার কলকাতা গভর্নমেন্ট সংস্কৃত কলেজে (যা বর্তমানে  সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুল নামে পরিচিত) ব্যাকরণের তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন তিনি।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই সংস্কৃত কলেজের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৮২৪ সালে; অর্থাৎ, ঈশ্বরচন্দ্রের এই কলেজে ভর্তি হওয়ার মাত্র পাঁচ বছর আগে। তার বয়স তখন নয় বছর। এই কলেজে তার সহপাঠী ছিলেন মদনমোহন তর্কালঙ্কার। বিদ্যাসাগরের আত্মকথা থেকে জানা যায় মোট সাড়ে তিন বছর তিনি ওই শ্রেণীতে অধ্যয়ন করেন।

ব্যাকরণ পড়ার সময় ১৮৩০ সালে সংস্কৃত কলেজের ইংরেজি শ্রেণীতেও ভর্তি হন ঈশ্বরচন্দ্র। ১৮৩১ সালের মার্চ মাসে বার্ষিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের জন্য মাসিক পাঁচ টাকা হারে বৃত্তি এবং ‘আউট স্টুডেন্ট’ হিসেবে একটি ব্যাকরণ গ্রন্থ ও আট টাকা পারিতোষিক পান। সংস্কৃত কলেজে মাসিক বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্রদের ‘পে স্টুডেন্ট’ ও অন্য ছাত্রদের ‘আউট স্টুডেন্ট’ বলা হত।

অন্যদিকে তিন বছর ব্যাকরণ শ্রেণীতে পঠনপাঠনের পর বারো বছর বয়সে প্রবেশ করেন কাব্য শ্রেণীতে। সে যুগে এই শ্রেণীর শিক্ষক ছিলেন বিশিষ্ট পণ্ডিত জয়গোপাল তর্কালঙ্কার।

১৮৩৩ সালে ‘পে স্টুডেন্ট’ হিসেবেও ঈশ্বরচন্দ্র ২ টাকা পেয়েছিলেন। ১৮৩৪ সালে ইংরেজি ষষ্ঠশ্রেণীর ছাত্র ঈশ্বরচন্দ্র বার্ষিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের জন্য ৫ টাকা মূল্যের পুস্তক পারিতোষিক হিসেবে পান। এই বছরই ক্ষীরপাই নিবাসী শত্রুঘ্ন ভট্টাচার্যের কন্যা দীনময়ী দেবীর সঙ্গে তার বিবাহ হয়।

১৮৩৫ সালে ইংরেজি পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র রূপে পলিটিক্যাল রিডার নং ৩ইংলিশ রিডার নং ২ পারিতোষিক পান। এই বছরই নভেম্বর মাসে সংস্কৃত কলেজ থেকে ইংরেজি শ্রেণী উঠিয়ে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় বর্ষে সাহিত্য পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে পনেরো বছর বয়সে প্রবেশ করেন অলংকার শ্রেণীতে। অলংকার শাস্ত্র একটি অত্যন্ত কঠিন বিষয়। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই তিনি সাহিত্য দর্পণ, কাব্যপ্রকাশরসগঙ্গাধর প্রভৃতি অলংকার গ্রন্থে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন।

১৮৩৬ সালে অলংকার পাঠ শেষ করেন। বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে রঘুবংশম্, সাহিত্য দর্পণ, কাব্যপ্রকাশ, রত্নাবলী, মালতী মাধব, উত্তর রামচরিত, মুদ্রারাক্ষস, বিক্রমোর্বশী ও মৃচ্ছকটিক গ্রন্থ পারিতোষিক পান।

১৮৩৭ সালের মে মাসে তার ও মদনমোহনের মাসিক বৃত্তি বেড়ে হয় আট টাকা। এই বছরই ঈশ্বরচন্দ্র স্মৃতি শ্রেণীতে ভর্তি হন (এই অংশের সমতুল্য আজকের সংস্কৃত কলেজ-র পঠন)। সেই যুগে স্মৃতি পড়তে হলে আগে বেদান্ত ও ন্যায়দর্শন পড়তে হত। কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্রের মেধায় সন্তুষ্ট কর্তৃপক্ষ তাকে সরাসরি স্মৃতি শ্রেণীতে ভর্তি নেন। এই পরীক্ষাতেও তিনি অসামান্য কৃতিত্বের সাক্ষর রাখেন এবং হিন্দু ল কমিটির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

ত্রিপুরায় জেলা জজ পণ্ডিতের পদ পেয়েও পিতার অনুরোধে তা প্রত্যাখ্যান করে ভর্তি হন বেদান্ত শ্রেণীতে। শম্ভুচন্দ্র বাচস্পতি সেই সময় বেদান্তের অধ্যাপক। ১৮৩৮ সালে সমাপ্ত করেন বেদান্ত পাঠ। এই পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং মনুসংহিতা, প্রবোধ চন্দ্রোদয়, অষ্টবিংশতত্ত্ব, দত্তক চন্দ্রিকা ও দত্তক মীমাংসা গ্রন্থ পারিতোষিক পান। সংস্কৃতে শ্রেষ্ঠ গদ্য রচনার জন্য ১০০ টাকা পুরস্কারও পেয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র। ১৮৪০-৪১ সালে ন্যায় শ্রেণীতে পঠনপাঠন করেন ঈশ্বরচন্দ্র। এই শ্রেণীতে দ্বিতীয় বার্ষিক পরীক্ষায় একাধিক বিষয়ে তিনি পারিতোষিক পান। ন্যায় পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে ১০০ টাকা, পদ্য রচনার জন্য ১০০ টাকা, দেবনাগরী হস্তাক্ষরের জন্য ৮ টাকা ও বাংলায় কোম্পানির রেগুলেশন বিষয়ক পরীক্ষায় ২৫ টাকা – সর্বসাকুল্যে ২৩৩ টাকা পারিতোষিক পেয়েছিলেন। বিদ্যাসাগর ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা নামে স্বাাক্ষর করতেন৷

বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ

জন্ম গ্রহণ কালে তার পিতামহ তার বংশানু্যায়ী নাম রেখেছিলেন “ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়”। ১৮৩৯ সালের ২২ এপ্রিল হিন্দু ল কমিটির পরীক্ষা দেন ঈশ্বরচন্দ্র। এই পরীক্ষাতেও যথারীতি কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ১৬ মে ল কমিটির কাছ থেকে যে প্রশংসাপত্রটি পান, তাতেই প্রথম তার নামের সঙ্গে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিটি ব্যবহৃত হয়। এই প্রশংসাপত্রটি ছিল নিম্নরূপ :

HINDOO LAW COMMITTEE OF EXAMINATION
We hereby certify that at an Examination held at the Presidency of Fort William on the 22nd Twenty-second April 1839 by the Committee appointed under the provisions of Regulation XI 1826 Issur Chandra Vidyasagar was found and declared to be qualified by his eminent knowledge of the Hindoo Law to hold the office of Hindoo Law officer in any of the Established Courts of Judicature.
H.T. Prinsep
President
J.W.J. Ousely
Member of the Committee of Examination

This Certificate has been granted to the said Issur Chandra Vidyasagar under the seal of the committee. This 16th Sixteenth day of May in the year 1839 Corresponding with the 3rd Third Joistha 1761 Shukavda.
J.C.C. Sutherland

Secy To the Committee (পুরনো বানান অপরিবর্তিত)

সংস্কৃত কলেজে বারো বছর পাঁচ মাস অধ্যয়নের পর তিনি এই কলেজ থেকে অপর একটি প্রশংসাপত্র লাভ করেন। ১৮৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রাপ্ত দেবনাগরী হরফে লিখিত এই সংস্কৃত প্রশংসাপত্রে কলেজের অধ্যাপকগণ ঈশ্বরচন্দ্রকে ‘বিদ্যাসাগর’ নামে অভিহিত করেন।

বিধবা বিবাহ আইন

সংস্কৃত শাস্ত্রের বিরাট পণ্ডিত হয়েও পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতি গ্রহণে দ্বিধা করেননি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। নারীমুক্তি আন্দোলনের প্রবল সমর্থক ছিলেন তিনি।

হিন্দু বিধবাদের অসহনীয় দুঃখ, তাদের প্রতি পরিবারবর্গের অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল তাকে। এই বিধবাদের মুক্তির জন্য তিনি আজীবন সর্বস্ব পণ করে সংগ্রাম করেছেন।

হিন্দুশাস্ত্র উদ্ধৃত করে প্রমাণ করেছেন, যে লোকাচার ধর্মের নামে সমাজে প্রচলিত, আসলে তা ধর্মবহির্ভূত স্থবিরতার আচারমাত্র। তার আন্দোলন সফল হয়েছিল।

১৮৫৬ সালে সরকার বিধবা বিবাহ আইনসিদ্ধ ঘোষণা করেন। তবে শুধু আইন প্রণয়নেই ক্ষান্ত থাকেননি বিদ্যাসাগর মহাশয়। তার উদ্যোগে একাধিক বিধবা বিবাহের অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। তার পুত্রও( নারায়ণচন্দ্র) এক ভাগ্যহীনা বিধবাকে বিবাহ করেন। এজন্য সেযুগের রক্ষণশীল সমাজ ও সমাজপতিদের কঠোর বিদ্রুপ ও অপমানও সহ্য করতে হয় তাকে।

বিধবা বিবাহ প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বহুবিবাহের মতো একটি কুপ্রথাকে নির্মূল করতেও আজীবন সংগ্রাম করেন বিদ্যাসাগর মহাশয়। প্রচার করেন বাল্যবিবাহ রোধের সপক্ষেও। এর সঙ্গে সঙ্গে নারীশিক্ষার প্রচারেও যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।

শুধু কলকাতায় নয়, নারীমুক্তির বার্তা বাংলার গ্রামে গ্রামে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে, বিভিন্ন জেলাতেও বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করে নারীশিক্ষার সপক্ষে জোর প্রচার চালান তিনি। যদিও তার এই উদ্যোগও সমাজের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিত্ব দ্বারা নিন্দিত হয়। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত পর্যন্ত অত্যন্ত হীন বাক্যবাণে নারীমুক্তি আন্দোলনের ব্যঙ্গ করেন।

তবু তার জীবদ্দশাতেই নারীশিক্ষা আন্দোলন ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।

শেষ জীবন

১৮৭৫ সালের ৩১ মে নিজের উইল প্রস্তুত করেন বিদ্যাসাগর মহাশয়। পরের বছর ২৬ ফেব্রুয়ারি হিন্দু ফ্যামিলি অ্যানুয়িটি ফান্ডের ট্রাস্টি পদ থেকে ইস্তফা দেন। এপ্রিল মাসে কাশীতে পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়। এই সময় কলকাতার বাদুড়বাগানে বসতবাড়ি নির্মাণ করেন। বর্তমানে এই বাড়ি সংলগ্ন রাস্তাটি বিদ্যাসাগর স্ট্রিট ও সমগ্র বিধানসভা কেন্দ্রটি বিদ্যাসাগর নামে পরিচিত। ১-২ আগস্ট আদালতে উপস্থিত থেকে চকদিঘির জমিদার সারদাপ্রসাদ রায়ের উইল মামলায় উইল প্রকৃত নয় বলে জমিদার পত্নী রাজেশ্বরী দেবীর স্বপক্ষে সাক্ষী দেন।

১৮৭৭ সালের জানুয়ারি থেকে বাদুড়বাগানে বাস করতে থাকেন বিদ্যাসাগর মহাশয়। এ বছর বাংলার গভর্নর কতৃক সন্মাননা লিপি প্রদান করা হয় তাকে। এপ্রিল মাসে গোপাললাল ঠাকুরের বাড়িতে উচ্চবিত্ত ঘরের ছেলেদের পড়াশোনার জন্য বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ছাত্রদের বেতন হয় মাসিক ৫০ টাকা। ১৮৭৯ সালে মেট্রোপলিটান কলেজ [কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়] কর্তৃক দ্বিতীয় থেকে প্রথম শ্রেণীর কলেজে উন্নীত হয়।

১৮৮০ সালের ১ জানুয়ারি বিদ্যাসাগর মহাশয় সিআইই উপাধি পান। ১৮৮১ সালে মেট্রোপলিটান কলেজ থেকে প্রথম বিএ পরীক্ষার্থী পাঠানো হয়।

১৮৮২ সালের ৫ আগস্ট রামকৃষ্ণ পরমহংস তার বাদুড়বাগানের বাড়িতে আসেন। দুজনের মধ্যে ঐতিহাসিক এক আলাপ ঘটে। এই বছর মেট্রোপলিটান কলেজে চালু হয় আইন পাঠ্যক্রম। ১৮৮৩ সালে বিদ্যাসাগর মহাশয় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো নির্বাচিত হন। মার্চে বাণভট্টের হর্ষচরিতম্ তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়।

১৮৮৪ সালের নভেম্বরে ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’ ছদ্মনামে ব্রজবিলাস গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এছাড়াও প্রকাশিত হয় ‘কস্যচিৎ তত্ত্বান্বেষিণঃ’ ছদ্মনামে বিধবা বিবাহ ও যশোহর হিন্দুধর্মরক্ষিণীসভা পুস্তক। দ্বিতীয় সংস্করণে তিনি এর নামকরণ করেন বিনয় পত্রিকা। এই নভেম্বরেই কানপুরে বেড়াতে যান এবং সেখানে দিনকতক থাকেন।

১৮৮৫ সালে মেট্রোপলিটান কলেজের বউবাজার শাখা স্থাপিত হয়। ১৮৮৬ সালের অগস্টে ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোসহচরস্য’ ছদ্মনামে রত্নপরীক্ষা পুস্তক প্রকাশ করেন।

১৮৮৭ সালের জানুয়ারিতে শঙ্কর ঘোষ লেনের নতুন ভবনে মেট্রোপলিটান কলেজ স্থানান্তরিত হয়। ১৮৮৮ সালের এপ্রিলে নিষ্কৃতিলাভ প্রয়াস, জুনে আখ্যান মঞ্জরী (দ্বিতীয় ভাগ), জুলাইতে পদ্যসংগ্রহ নামক সংকলন গ্রন্থের প্রথম ভাগ প্রকাশ করেন। ১৩ আগস্ট পত্নী দীনময়ী দেবীর মৃত্যু হয়।

১৮৮৯ সালের নভেম্বরে প্রকাশ করেন সংস্কৃত রচনা। ১৮৯০ সালের ১৪ এপ্রিল বীরসিংহ গ্রামে মায়ের নামে স্থাপন করেন ভগবতী বিদ্যালয়। মে মাসে নির্বাচিত উদ্ভট শ্লোকসংগ্রহ শ্লোকমঞ্জরী প্রকাশিত হয়।

বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রয়াত হন ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই, বাংলা ১২৯৮ সনের ১৩ শ্রাবণ, রাত্রি দুটো আঠারো মিনিটে তার কলকাতার বাদুড়বাগানস্থ বাসভবনে।

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর ১০ মাস ৪ দিন। মৃত্যুর কারণ, ডাক্তারের মতে, লিভারের ক্যানসার।

মৃত্যুর পর ১৮৯১ সালের সেপ্টেম্বরে তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী বিদ্যাসাগর চরিত প্রকাশ করেন পুত্র নারায়ণচন্দ্র বিদ্যারত্ন। ১৮৯২ সালের এপ্রিলে ৪০৮টি শ্লোকবিশিষ্ট ভূগোল খগোল বর্ণনম্ গ্রন্থটিও প্রকাশিত হয়। পশ্চিম ভারতের এক সিভিলিয়ন জন লিয়রের প্রস্তাবে বিদ্যাসাগর পুরাণ, সূর্যসিদ্ধান্ত ও ইউরোপীয় মত অনুসারে এই ভূগোল গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন। বিবিসি জরিপকৃত(২০০৪) সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় তার স্থান নবম।

(উইকিপিডিয়া, ঘাটাইল ডট কম)/-

হুমায়ূন আহমেদের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী

বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ২০১২ সালের এই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে মারা যান তিনি।

দিবসটি উপলক্ষ্যে কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের পরিবারের পক্ষ থেকে গাজীপুরের নুহাশ পল্লীতে প্রতি বছরই নানা আয়োজন থাকে। তবে এ বছর করোনা মহামারির জন্য কর্মসূচি সীমিত করা হয়েছে।

সকালে হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও তার দুই ছেলে বাবার কবর জিয়ারত করবেন।

নুহাশপল্লীর ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বুলবুল জানান, দিনটি উপলক্ষ্যে সকাল থেকে কোরআনখানির আয়োজন করা হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।

হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। উপন্যাসে নিজের প্রতিভার বিস্তার ঘটলেও তার শুরুটা ছিল কবিতা দিয়ে। এরপর নাটক, শিশুসাহিত্য, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী, চলচ্চিত্র পরিচালনা থেকে শিল্প-সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর।

হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর জনকও বটে। ১৯৭২ সালে প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশের পর পরই তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। উপন্যাসে ও নাটকে তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো বিশেষ করে ‘হিমু’, ‘মিসির আলী’, ‘শুভ্র’ তরুণ-তরুণীদের কাছে হয়ে ওঠে অনুকরণীয়।

হুমায়ূন আহমেদের শরীরে ২০১১ সালের সেপ্টেস্বর মাসে মরণব্যাধি ক্যানসার ধরা পড়ে। এরপর তিনি উন্নত চিকিত্সার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে যান। সেখানে ২০১২ সালের জুলাই মাসের ১৬ তারিখ তিনি চলে যান লাইফ সাপোর্টে। সে অবস্থাতেই ১৯ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

নিউ ইয়র্ক থেকে ২০১২ সালের ২৩ জুন দেশে ফিরিয়ে আনা হয় হুমায়ূন আহমেদের মরদেহ। ২৪ জুন তাকে সমাহিত করা হয় তার গড়ে তোলা নন্দনকানন নুহাশ পল্লীর লিচুতলায়। তার মৃত্যুতে শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে গোটা জাতি, যে শোক আজও কাটেনি ভক্ত-পাঠকদের হূদয় থেকে।

হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ডাক নাম কাজল। বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ও মা আয়েশা ফয়েজের প্রথম সন্তান তিনি। বাবা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা, আর মা ছিলেন গৃহিনী। তিন ভাই দুই বোনের মাঝে তিনি সবার বড়। কথাসাহিত্যিক জাফর ইকবাল তার ছোট ভাই। সবার ছোট ভাই আহসান হাবীব নামকরা কার্টুনিস্ট ও রম্যলেখক।

হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে আগুনের পরশমণি, শ্যামল ছায়া, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, চন্দ্রকথা ও নয় নম্বর বিপদ সংকেত, ঘেটুপুত্র কমলা প্রভৃতি। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক ‘একুশে পদক’ লাভ করেন।

এছাড়া তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮১), হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০), লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩ ও ১৯৯৪), বাচসাস পুরস্কার (১৯৮৮) লাভ করেন। দেশের বাইরেও তাকে নিয়ে রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। জাপান টেলিভিশন ‘এনএইচকে’ তাকে নিয়ে নির্মাণ করেছে পনের মিনিটের তথ্যচিত্র ‘হু ইজ হু ইন এশিয়া’।

(অনলাইন ডেস্ক, ঘাটাইল ডট কম)/-

তানিয়া সুলতানার তিনটি কবিতা

বাউলা প্রেম

সব ভালবাসা মিলেনাতো সাগরের মোহনায়।
কিছুর বা স্থান হয়,
অবহেলার বিষম দরিয়ার ঝড়ে!
কিছু বা হারিয়ে যায়
মুসাফিরের সাথে,
কোন সুদুরের তপ্ত মরুভূমির বালুকা বেলারঝড়ে!

কিছু ভালবাসা, রাতে ফোঁটা হাসনাহেনার মতো
সৌরভ ছড়িয়ে ঝড়ে পড়ে অবহেলে!
কিছু অপরাজিতা,বকুল,বেলি,জুইঁ,হাস্নাহেনা
মালা হয়ে প্রেম বিলি করে।

কিছু কুড়িঁ রা আবার ফুটেনা কুসুম কাননে!
পঁচে যায় আপন বৃন্তেরই মাঝে।
কেউবা গোপন প্রেমের ব্যর্থ সাধনার বোঝা
নিরবে সয়ে ধুঁকে ধুঁকেই
আমরন বাঁচে।

কেউ বা ঘুমন্ত পৃথিবীতে মোমের আলোয়
শুধুই লিখে যায় ব্যর্থতার ডায়রী।
কেহবা একচেটিয়া, ভালবাসাহীন,
নির্দয়া সংসারে!
কর্পদকহীন! কুলাংগার! গালি অপবাদ
নিয়েই ত্যাগ করে শেষ নিঃশ্বাস!

কেউ বা হারিয়ে যাওয়া ভালবাসা
খুঁজে ফিরে কেবলি আনকোরা
ঝড় জলে, জংগলে!
কিছু ভালবাসা ভবঘুরে হয়ে পথে, পথে
ঘুরে বেড়ায় বাউল রাজার সাধকের বেশে!

কেউ বা বিরহ ব্যথায় মুচড়ে পড়ে।
শেষ বানী, হতাশা সম্বলে! নিঃসংগ রাতের আঁধারের কোলেই নিজেকে করে সমর্পণ।

ভালোবাসা অবিরাম খুঁজে খুজেঁ অবশেষে,
বাউল প্রেমের সাধক কখনো বা
ভবঘুরে দেবদাস হয়ে অনন্তকাল ধরে, হেঁটে চলে
নক্ষত্র ফোটা রাতের চাদরে।

তবুও হয়তো-বা খুঁজে না পায়
হ্রদমাঝারে কভু, বুকের পিঞ্জিরায় পোষা
আপন সেই মনবেরির পাখটিরে?

পার্থিব বাসনায়

জন্মিলে মরিতে হইবে
এবড়ো কঠিন সত্য!
পার্থিব সমৃদ্ধির বাসনায় তবুও
আপন পিয়াসী মন,
যেন লিপ্ত করে সকল ব্যাভিচারে!

রাজ্যপাট যেন চলছে
স্বার্থে র সচলায়তন,
জবরদখলদারীতে।
যার বলি তে, ম্রিয়মাণ প্রজাদের ভোরের
স্বপ্ন গুলো।

ওরে পথিক, এবার থামো, একটি বার।
কতো আর করবে আত্ম হনন?
অপ্রয়োজনীয় অহমিকা ত্যাগ করি
এসো সকলে!
অপ্রতুল প্রাসাদ আর স্হাপনা বাসনা
ত্যাগ করে এবার চলো নিজ নিজ আত্মার
অস্তিত্বের সভ্যতা গড়ে তুলি।

পার্থিব সমৃদ্ধির নির্মান কৌশল
শুধু ই নিজেদের আখের গোছানো র
গোপন পাঠশালা!
আছে শুধু নিজের অপার্থিব ধ্বংস-লীলা!

ওরে পথিক!থামিয়ে দাও
নিজ নিজ রিপুকে।এসো এবার
সেতু কালভার্ট, মিউজিয়াম,পিরামিড,
পার্থিব সমৃদ্ধির বাসনা ত্যাগ করি।

এবার চলো
নিজেকে আবিস্কার করি,নির্মাণ করি!
আত্ম হনন না করে, সকল পার্থিব – দর্পচূর্ণ করে
এসো অপার্থিব ধ্যান সাধনায়
কিয়দংশ আত্মা নির্মাণ করি।

ক্ষুদ্র অনুজীবী ও মানব বন্ধন

সাদা সাদা নরম পালকে
পায়রা, কবুতর, শালিক, চিল উড়ে বেড়ায়
কতো শত দূরের আকাশের নিঃসীম অজানায়?
ছোট্ট বাবুই,চড়ুই, ময়না, টিয়ে।

ফুড়ুৎ, ফুড়ুৎ উড়াউড়ি করে
জড়ো করে খরকুটো বড় আশা নিয়ে।
একে একে খুঁটে খুঁটে বয়ে নিয়ে,
ঠোঁটে কি নিবিড় ভালবেসে
অতি যত্নে সে বোনে,
ছোট্র সে আপন বাসা খানিরে!

হঠাৎ অজানা ঝড়ের তান্ডবে
ভেঙে যায় যদি সে ছোট্ট নীড় খানি!
তবুও আবার আশায় ভর করে,
পতপত করে পাখনা মেলে,
নীড় গড়ে চলে, রোদেলা গ্রীষ্মের দুপুরে!
সারি বেঁধে চলে,
পিপড়েঁর দল যেন রেলগাড়ী!
ছয় পায়ে পিলপিল চলে,
করে আহরণ
শীতের খাদ্য শষ্য!
ক্ষূদ্র যত অনুজীবী, দল বেঁধে, জোড়া বেঁধে
চলছে আপন আলয়ে নিরবধি!

আমরা জনতা,আমাদের ঘর গৃহস্হালী ও মিছিলে
আজ আছে কি কোন একতা?
ভাইয়ে –ভাই য়ে ঠাঁই –ঠাঁই!
মানব বন্ধনে নেই, সমঅধিকার ও সমতা!,

ছোট্র অনুজীবী
তৃনভূজী সব পিঁপড়ে
পাখ,পাখালির দল,
এক সাথে ঐকতানে চলে সবে
ওদের হয়না কভু রদবদল!
মিছে বুলি নেই,আছে শুধু কিচিরমিচির
আছে শুধু ঐক্য কুহুতান!
পাখিদের গানে, কলকাকলিতে
মুখরিত ত্রিভুবন!এ যেন
শ্রষ্ঠার এক অপরূপ! সৃষ্টি!
পাখপাখালির দল!

(লেখকের অনুমতি সাপেক্ষে প্রকাশিত/ ঘাটাইল ডট কম)

ঘাটাইলের আলম তালুকদার: একজন আপাদমস্তক লেখক

আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, আমার বন্ধু, সরকারী চাকুরীতে আমার এক সময়ের ব্যাচম্যাট, বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রাক্তন অতিরিক্ত সচিব, কবি আলম তালুকদার বিনা নোটিশে চলে গেছেন কোন এক না ফেরার রাজ্যে।

করোনা আক্রান্ত কবি আলম তালুকদার (৬৪) বুধবার বিকাল ২.২০ এ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন।

জীবনে আমার দেখা সবচাইতে প্রাণবন্ত এই মানুষটি এইভাবে চলে যাওয়ায় দেশের সাহিত্যাঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

কবি আলম তালুকদারের সঙ্গে আমার সবশেষ দেখা এ বছরের ৪ঠা ফেব্রুয়ারী বাংলা একাডেমীর কবি শামসুর রাহমান হলে আমার কবিতার বই ‘বিবর্ণ বর্ণমালা’র প্রকাশনা উৎসবে। সেদিন হাস্যরস, ছড়া আর ছন্দের যাদুতে ভরা তাঁর শুভেচ্ছা বক্তব্যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করেছিল।

সপ্তাহ দুয়েক আগে তাঁর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হলো। শুরুতেই গরমে অতিষ্ঠ, গেঞ্জিপরা আলম তালুকদার স্বভাবসিদ্ধ কন্ঠে করোনার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করলেন।

তারপর, তাঁর সঙ্গে ভালো কথা, মন্দ কথার সঙ্গে হলো কবিতা, ছড়া আর জোকসের মিশাল দিয়ে জমপেশ ভার্চুয়াল আড্ডা।

করোনা চলে গেলে আবার হবে দেখা, আবার বসবে মেলা, তাই ছিলো আমাদের শেষ কথা। আর সেই করোনাই কেড়ে নিলো আমার বন্ধুর প্রাণ।

আলম তালুকদার একজন বহুমুখী প্রতিভার নাম। আপাদমস্তকে তিনি ছিলেন একজন গুণী লেখক। শিশুসাহিত্যিক হিসাবে ব্যাপক পরিচিতি থাকলেও তাঁর সাচ্ছন্দ্য বিচরণ ছিল সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায়।

কি না লিখেছেন তিনি, কবিতা, গান, ছড়া, গল্প, প্রবন্ধ, রম্যরচনা, কৌতুক, সব কিছুতেই তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী।

কবি আলম তালুকদার ১৯৫৬ সালের ১লা জানুয়ারি টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব কেটেছে গ্রামে।

অতিরিক্ত সচিব হিসেবে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের আগে তিনি জাতীয় গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ছিলেন।

তাঁর প্রথম বই ‘ঘুম তাড়ানো ছড়া’ প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে। তারপর আর পছন ফিরে তাকাননি। লিখেছেন দেদারসে। প্রকাশ করেছেন অসংখ্য বই আর লেখালেখি ছডিয়ে ছিটিয়ে দিয়েছেন পত্র পত্রিকায়, দেশে বিদেশে।

যতটা অবদান ততটা স্বীকৃতি অবশ্য মেলেনি এই পাঠকনন্দিত লেখকের।

তবে জাতীয় পর্যায়ে সরকারি স্বীকৃতি না পেলেও পেয়েছেন হল-পালক অ্যাওয়ার্ড ১৯৯৬, অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার ১৪০৫, জসীম উদদীন পুরস্কার ২০০১, কবি কাদির নওয়াজ পুরস্কার ২০০৪, স্বাধীনতা সংসদ পুরস্কার ২০০৬ এবং শিল্পাচার্য জয়নুল পুরস্কার ২০০৮।

তিনি ছিলেন এক দিলখোলা, সদাহাস্য, সাদা মনের নিরহংকার মানুষ।

সবাইকে খুব সহজে আপন করে নিতে পারতেন আলম তালুকদার। তাঁর মধ্যে ছিল না কোন ভনিতা, ঈর্ষা, কিংবা স্বার্থপরতা।

এই মুহূর্তে ইচ্ছা করছে আমার হঠাৎ চলে যাওয়া এই খালেস দোস্ত তালুকদারকে আমার কষ্টের কথা মন খুলে আমাদের আড্ডার ভাষায় বলি:

কি কইরা ভুলি যে তোমারে
কি কইরা যে মনরে বুঝাই –
তোমার লগে আর হইবো না দেখা,
আড্ডায়, পিকনিকে, বইয়ের মেলায়,
হইবো না ছড়া আর কবিতার বাহারী বাহাস।

তোমার হাতের পান খামু না তো আর,
হইবো না খিস্তি খিউর ।
এইভাবে যায় কি কেউ? এ কেমন যাওয়া?
ডাকাইত্যা করোনার কালে –
ফাঁকি দিয়া গেলা চইলা আতকা এমন!
ঢাকার শহর বুঝি শুনশান
খালি হইয়া গেলো!

দোয়া করি, বিমূর্ত কবিতার মত ভালো থাকুন কবি আলম তালুকদার, ওপারে, মেঘ আর তারাদের সাথে। আর কায়মনোবাক্যে সৃষ্টিকর্তার কাছে আকুল প্রার্থণা করি তাঁর শান্তি ও মঙ্গলের জন্য। বিদায়, বন্ধু। ভালোবাসা অপার।

ড. শরীফ আস্-সাবের
প্রাক্তন আমলা, সাংবাদিক ও লেখক।

করোনায় মারা গেলেন ঘাটাইলের কৃতি সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা আলম তালুকদার

বিশিষ্ট ছড়াকার, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব আলম তালুকদার আর নেই। আজ বুধবার বিকেলে (৮ জুলাই) ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। করোনায় আক্রান্ত হয়ে এই শিশুসাহিত্যিক মারা গেছেন বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।

আলম তালুকদারের মেয়ে নিপা বলেন, ‘ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বাবা মারা গেছেন। গত শনিবার উনার করোনার পরীক্ষার ফল পজেটিভ আসে।’

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ আলম তালুকদারের স্ত্রীর উদ্বৃতি দিয়ে জানান, আলম তালুকদার হৃদরোগের সমস্যা নিয়ে সিএমএইচ এ গত রবিবার ভর্তি হয়েছিলেন। এরপর শনিবার তার করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরীক্ষায় ফল পজিটিভ আসে। আজ বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তিনি মারা গেছেন।

তিনি ১৯৫৬ সালে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার জামুরিয়া ইউনিয়নের গালা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের মাধ্যমে চাকুরিতে যোগদান করেন। তিনি বেগম সুফিয়া কামাল গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও পরিবার পরিকল্পনা মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চাকুরির মেয়াদ শেষে সরকারের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে ২০১৬ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

তিনি বিশিষ্ট ছড়াকার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা একশত ২০টি। তার প্রথম বই ’ঘুম তাড়ানোর ছড়া’ প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে।

উল্লেখযোগ্য বই হচ্ছে- খোঁচান ক্যান, চাঁদের কাছে জোনাকি, ডিম ডিম ভুতের ডিম,ঐ রাজাকার, যুদ্ধে যদি যেতাম। তিনি অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হন।

মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন।

মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

আলম তালুকদারের মৃত্যুর সংবাদে কবি, লেখক, ছড়াকারদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

তাঁর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে শোক প্রকাশ করে কবি খালেদ খালেদ হোসাইন লিখেছেন, ‌”ভালোবাসার অসামান্য সামর্থ্য নিয়ে জন্মেছিলেন, অশেষ ছিল হাসবার ও হাসাবার ক্ষমতা, বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে বয়সের কোনো তোয়াক্কা করতেন না, অজস্র হাতে আপনি লিখে গিয়েছেন প্রতিনিয়ত, ছড়া তো বটেই, অন্যা্ন্য সাহিত্য-আঙ্গিকেও। যোগ্য মানুষের প্রশংসা করতেন অকুণ্ঠ চিত্তে, অযোগ্য উক্তিকে নস্যাত করতে তীব্র ও তাৎক্ষণিকভাবে। আপনি ছিলেন সার্বক্ষণিক মুক্তিযোদ্ধা। ভালোবেসেছিলেন বলে, ভালোবাসা পেয়েওছেন আপনি। এতো ভালোবাসা, জীবনঘনিষ্ঠ আবেগ, এতো কর্ম স্পৃহা–সব ফেলে এমন আকস্মিকভাবে আপনি চলে যাবেন, তা তো কল্পনাও করা যায় ন! একটু আগে বন্ধু মাহবুব বোরহান এই দৃঃসংবাদটাই জানালেন, করুণাহীন করোনা আপনাকেও চিরদিনের মতো কেড়ে নিয়ে গেছে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্নালিল্লাহি রাজেউন। এ শোক আমাকে বিচলিত ও অসুস্থ করে তুললো। ভালো থাকবেন, আলম ভাই।”

তার মৃত্যুতে ঘাটাইল প্রেসক্লাব, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, গালা গণ পাঠাগারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন ও সংবাদ মাধ্যম ঘাটাইল ডট কম শোক প্রকাশ করেছেন।

(মাসুম মিয়া, ঘাটাইল ডট কম)/-

আহমেদ ছফার জন্মদিন এবং কিছু কথা

লেখক, ঔপন্যাসিক, কবি, চিন্তাবিদ আহমদ ছফার জন্মদিন আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন)। ১৯৪৩ সালের এই দিনে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে আহমদ ছফা ছিলেন বাবা-মার দ্বিতীয় সন্তান।

১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম নাজিরহাট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন; একই বৎসরে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে। পরে বাংলা বিভাগে ক্লাশ করা অব্যাহত রাখেননি। ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে এমএ পরীক্ষা দেয়ার আগেই বাংলা একাডেমির পিএইচডি গবেষণা বৃত্তির জন্য আবেদন করেন এবং তিন বছরের ফেলোশিপ প্রোগ্রামের জন্য মনোনীত হন। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে প্রাইভেটে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ পরীক্ষা দেন। তার পিএইচডি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

১৯৭১ সালে ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’ গঠন ও এর বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় অংশ নেন। ৭ই মার্চ ‘স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা’ হিসেবে প্রতিরোধ প্রকাশ করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এপ্রিল মাসে কলকাতা চলে যান। মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সেখান থেকে দাবানল নামের পত্রিকা সম্পাদনা করেন। দেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশে ফিরে লেখালেখি করতে থাকেন। ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক নাজিমুদ্দিন মোস্তানের সহায়তায় কাঁটাবন বস্তিতে ‘শিল্পী সুলতান কর্ম ও শিক্ষাকেন্দ্র’ চালু করেন।

পরে ১৯৮৬-তে জার্মান ভাষার ওপর গ্যেটে ইনস্টিটিউটের ডিপ্লোমা ডিগ্রিও লাভ করেন তিনি, যা তাকে পরবর্তী সময়ে গ্যেটের অমর সাহিত্যকর্ম ফাউস্ট অনুবাদে সহায়তা করেছিল।

আহমদ ছফা সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন দীপ্তিময়ভাবে। গল্প, গান, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, ইতিহাস, ভ্রমণকাহিনি মিলিয়ে তিরিশটির বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার জনপ্রিয় লেখা হলো আব্দুর রাজ্জাক স্যারকে নিয়ে লেখা “যদ্যপি আমার গুরু”, বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস, বাঙালি মুসলমানের মন, গাভী বিত্তান্ত, পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গপুরাণ, অলাতচক্র।

প্রতিষ্ঠানবিরোধী আহমদ ছফা ১৯৭৫ সালে লেখক শিবির পুরস্কার ও ১৯৯৩ সালে বাংলা একাডেমির সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ২০০২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে সাহিত্যে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করেন।

২০০১ খ্রিষ্টাব্দের আটাশে জুলাই অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। মিরপুরের বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

২।

মনীষী লেখক, দার্শনিক, ও কবি আহমদ ছফাকে নিয়ে লেখার জন্য করোনাকালে কবিগুরুর বয়ানে ‘যাসনে ঘরের বাহিরে’ বিধান উপেক্ষা করে বাংলা একাডেমির ভেতরে থাকা অগ্রণী ব্যাংকের ছবি তুলতে গিয়েছিলাম। গত ২৫ জুন তোলা ছবিগুলোর একটি আমার ফেসবুকে প্রকাশ করেছি। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে ঢাকা শহরে অগ্রণী ব্যাংকের কয়েকডজন শাখা থাকতে বাংলা একাডেমির শাখাটির ছবি কেন? এই কৈফিয়ত দেয়ার আগে দুটো কথা বলে নিতে চাই।

১৯৯৬-৯৭ খ্রিষ্টাব্দের কথা। সরকারি জগন্নাথ কলেজের (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) ছাত্র হলেও দিনের বেশিরভাগ সময় কেটে যায় সরকারি অফিসে অফিসে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে ও রিপোর্ট লিখতে। একটা রিপোর্ট প্রকাশ হলে তখন যে আনন্দ হতো এখন ৫০ হাজার টাকা পেলেও তার সমান আনন্দ পাই না। একটি লেখা প্রকাশ হলে সহপাঠীদের অনেকে ঈর্ষার চোখে দেখতো। তখন তা খুব মজার বিষয় ছিল।

তবে, এই লেখালেখিতে কত টাকা পেতাম তা সাংবাদিকদের বেতন-কড়ির খবর যারা রাখেন তাদেরকে আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। টাকা বড় বিষয় নয়, ছাপার অক্ষরে লেখা প্রকাশ হয়েছে সেটাই ছিল পরিতৃপ্তির বিষয়।

সেইসব দিনগুলোতে ঢাকার বাংলামোটরে আহমদ ছফার বাসা অথবা শাহবাগের আজিজ মার্কেটের আড্ডাখানায় প্রায় প্রতিদিনই যেতাম। আড্ডা ছাড়াও আমার কাজ ছিল ছফা ভাইয়ের লেখার ডিকটেশন নেয়া। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন ছফা ভাই। বিশেষ করে সাহিত্যপাতায় তার লেখা বেশি ছাপা হতো। তখন ডিজিটাল পদ্ধতি ছিল না। মোবাইলও ফোনও খুব কম ছিল।

ছফা ভাইয়ের একটা ৯৬৬.. টিএন্ডটি নম্বর থাকলেও আমার কোন ফোনই ছিল না। অগত্যা ফোন-ফ্যাক্সের দোকান থেকে মাঝে-মধ্যে ফোন দিয়ে জেনে নিতাম কখন কোন লেখার জন্য বাসায় অথবা আজিজে যেতে হবে। এই যে টাকা নেই তারপরও টাকা খরচ করে ফোন করতাম কেন? আমার লাভের জন্যই। দুইভাবে লাভ। যেসব লেখার ডিকটেশন নিতাম সেগুলোতে  লেখক ছফা ভাইয়ের নাম থাকতো। আর নিচে লেখা থাকতো, অনুলিখন: সিদ্দিকুর রহমান খান।

ছফা ভাইয়ের লেখার সাথে আমার নাম যাচ্ছে তা সে সময় আমার কাছে এটার যে কি মূল্য তা এখন পুরোটা বোঝাতে পারবো না। রীতিমতো গর্ব করতাম। এখানেও সহপাঠী ও সহকর্মী সাংবাদিকদের ঈর্ষাপরায়ণতাটাকে উপভোগ করতাম। ওই সময়ে ছফার মতো মনীষীর নামের সাথে আমার নাম ইত্তেফাক, আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ, বাংলাবাজারসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ছাপা হওয়াকে বিশাল পাওয়া মনে করতাম।

দৈনিক পত্রিকার হার্ড রিপোর্টার হিসেবে নিজের লেখা হাজার হাজার রিপোর্ট প্রকাশ হলেও ছফা ভাইয়ের নামের সাথে আমার নাম প্রকাশ হওয়াটাকেই আমার কাছে ভিন্ন স্বাদের, ভিন্ন মর্যাদার মনে হতো, এখনও হয়। এখনও মনে করি বিশাল সৌভাগ্য আমার, ছফার এ্যাতো এ্যাতো স্নেহ পেয়েছি। এখনও কেউ যদি জিজ্ঞেস করেন, ‘সিদ্দিক, আপনার সাথে তো আহমদ ছফার জানাশোনা ছিল, তাই না। তখন ঘুরিয়ে আমি বলি, শুধু পরিচয় ছিল না। আহমাদ ছফার অনেকগুলো প্রবন্ধ/নিবন্ধ ও বইয়ের মধ্যে যে সাংবাদিক সিদ্দিকুর রহমান খানের উল্লেখ দেখেন সেই সিদ্দিকুর রহমানই আমি’।

প্রিয় পাঠক, এবার আসি অগ্রণী ব্যাংকের ছবি তোলা প্রসঙ্গে। ২৫ জুন ছবি তুলতে গিয়েছিলাম। দেখলাম আগের সেই জীর্ণ ভবনটি নেই। কাঁচঘেরা অত্যাধুনিক এক ভবন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে তুলতে মনে পড়ছিল সেই ম্যানেজার সাহেবের কথা। তাঁর নামটি অনেকবছর মনে রেখেছিলাম, এখন মনে পড়ছে না। এই ম্যানেজার সাহেব অন্য দশজন ম্যানেজারের চেয়ে আলাদা। আহমদ ছফার সাথে সখ্য না থাকলেও ছফার লেখালেখি এবং আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে জানা ছিল তাঁর।

খুব সম্ভবত ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসের শেষদিকে। দুদিন ধরে ছফা ভাই আমাকে বলছেন, সিদ্দিক তোমাকে কিছু টাকা দেবো। আমার খুব খুশি হওয়ার কথা থাকলেও জানতাম ছফা ভাইয়ের টাকা নেই। তাই নিম্ন স্বরে বলতাম, না ভাই, দরকার নেই। আমি অফিস থেকে কদিন আগেই কিছু টাকা পেয়েছি। যদিও সংবাদপত্র অফিস থেকে টাকা পাওয়ার কথাগুলো কতটা সত্য বা সত্যের কাছাকাছি তা আমি ছাড়া আর কে জানতো!

যাহোক, এক সকালে ছফা ভাইয়ের বাসায় গেলাম। এক নাগাড়ে তিনটা বড় লেখা লিখতে দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। তখন কর্ণফুলি পেপার কোম্পানির লম্বা সাইজের সাদা কাগজে লিখতেন ছফা ভাই। এক পাতায় লিখতে হতো। এপিঠ-ওপিঠ লিখতে মানা। লেখা শেষে আমার হাতে একট চেক দিলেন। চেকের দিকে তাকালাম না। ভাজ করে পকেটেও ঢুকালাম না। শুধু বললাম ছফা ভাই লাগবে না। বললেন, তাড়াতাড়ি যাও ব্যাংক আওয়ার শেষ হয়ে যাচ্ছে।

বাংলামোটর থেকে মনে হয় বাংলা একাডেমির অগ্রণী ব্যাংকের শাখায় যেতে আমার পনেরো মিনিটের বেশি লাগেনি। অগ্রণী ব্যাংকে ঢুকে চেকটা দিতে চাইলাম একজনের কাছে, তিনি ইশারা করে বললেন, এখানে না ওখানে। গেলাম সেই ডেস্কে। চেকটা রেখে একটা পিতলের টোকেন ধরিয়ে দিল মনে হয়। পুরোটা মনে পড়ছে না। কিছুক্ষণ পড়ে একজন অফিস সহকারী টাইপের ভদ্রলোক লোক এসে বললেন, সিদ্দিকুর রহমান খান কে? আমি এগিয়ে গেলাম। বললেন, আসেন আমার সাথে। তিনি নিয়ে গেলেন ম্যানেজার সাহেবের রুমে। ম্যানেজারের হাতে থাকা চেকটার দিকে সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলাম লাল কালি দিয়ে কি যেন লিখেছেন ব্যাংকেরই কেউ। আমাকে আর টাকা দেবে না এমনটা সন্দেহ হলো। মন খারাপ হলেও বুঝতে না দেয়ার চেষ্টা করে যেতে থাকলাম।

চশমার ফাঁক দিয়ে ম্যানেজার সাহেব আমাকে জিজ্ঞেস করলেন ছফা সাহেব আপনার কি হন? আমি কি করি? কখন এই চেক লিখে দিয়েছেন ছফা সাহেব? এ্যাতো এ্যাতো প্রশ্ন শুনে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তবুও জবাব দিলাম। সব  শেষে জিজ্ঞেস করলেন, এই টাকা দিয়ে আমি কি করবো? আমার উত্তর শুনে ম্যানেজার সাহেব খুব খুশি হয়েছেন মনে হলো। লাল কালি দিয়ে আকাঁবুকি করা চেকটার ওপর ফের কি যেন লিখলেন ম্যানেজার সাহেব। ক্যাশিয়ার বা ক্যাশ শাখার কেউ একজনের সাথে ম্যানেজারের আলাপে বুঝলাম ছফা ভাইয়ের ওই ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তিনশ টাকা ছিল না। দুশো অথবা দুশো পঞ্চাশ টাকার মতো ছিল। তবু, মনীষী ছফার চেকটি ডিজঅনার করেননি। তিনশ টাকাই দিয়েছিলেন আমাকে।

ম্যানেজার সাহেব আমাকে বললেন, ছফা সাহেবকে বলবেন, খুব তাড়াতাড়ি যেন কিছু টাকা এই শাখায় জমা রাখেন। ম্যানেজারের মুখের দিক তাকিয়ে ধন্যবাদ দিয়ে বের হলাম। ক্যাশ শাখা থেকে একজন ডেকে নিয়ে আমাকে তিনশ টাকা দিলেন। আমি ব্যাংকের ভেতরে থেকেই গোপন পকেটে টাকাগুলো ঢুকিয়ে সোজা হাঁটা শুরু করলাম ছফা ভাইয়ের বাসার দিকে। এবার পকেটে টাকা আছে। এবার মনে হয় দশ মিনিটে  পৌঁছে গেলাম বাংলামোটরে।

টাকাগুলো হাতে দিতে চাইলে ছফা বললেন, ‘আরে বোকা এটাতো তোমাকে দিয়েছি। যাও অফিসে যাও। কাল বিকেলে আজিজে এসো। মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে আজকের কাগজের জন্য একটা লেখা দিতে হবে। সাহিত্য সম্পাদক সালাম সালাহউদ্দিন সাহেব ফোন দিয়েছিল।’

আমার কাছে মনে হলো ম্যানেজার সাহেব যা বলেছেন এবং আমিও ম্যানেজারের প্রশ্নবানে যে ভড়কে গিয়েছিলাম তা ছফা ভাইকে বলা দরকার। সবশেষে বললাম, ম্যানেজার বলেছেন খুব শিগগিরই যেন কিছু টাকা জমা রাখেন। শুনে হেসে দিলেন ছফা। বললেন, বুঝতে পেরেছো, তিনশ টাকা ছিল না আমার এ্যাকাউন্টে। তবুও তোমাকে টাকা দিলেন। ম্যানেজারের নামটা আবার বলো সিদ্দিক।’

পাদটীকা : দুই যুগেরও বেশি সময় আগের ছফাভক্ত সেই অসাধারণ ম্যানেজারের নামটা ভুলে যাওয়া বা তার খোঁজ না রাখা আজও আমার কাছে অপরাধ মনে হয়। আর মাত্র কয়েকবছর আগে সরকারি বেসিক ব্যাংক যে ‘সরল বিশ্বাসে, কোনো কাগজ বা গ্যারান্টার ছাড়াই এক ব্যক্তিকে ৩০০ কোটি টাকা ঋণ দিলেন।’ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনগুলো এবং ঋণ গ্রহীতার নাম এবং বেসিক ব্যাংকের সেই শাখার ম্যানেজারের নাম মনে রাখাও অপরাধ!

আহমদ ছফা বেঁচে থাকলে এইসব অপরাধের রকমফের নিয়ে দারুণ লিখতেন। তাঁকে মিস করি, তাঁর লেখা মিস করি।

৩।

আহমদ ছফার একটি কবিতা বা গান নিয়ে এই লেখা।
ঘরে পরে তফাৎ আমার
কখন গেছে মুছে
তবু লোকে সকাল বিকাল
ঘরের খবর পুছে।
আসতে যেতে নানান মানুষ
ঘরের খবর লয়
আমার কখন ঘর ছিল কি
মনেতে সংশয়
হাল সাকিনের লজ্জা আমার
কেমনে জানি মুছে।

যদি বলি ঘরটি হবে
সাগর জলের নিচে
ঘাড় দুলিয়ে বলবে মানুষ
কখখনো নয় মিছে
নিত্যি নতুন ঘরের খবর
শ্রবণে না রুচে।
যদি বলি ঘরটি হবে
নীল আকাশের নীলে
মিটিমিটি চেরাগ জ্বলা
লক্ষ তারার বিলে
বলবে মানুষ সে সব খবর
সত্য হবার নয়
তবু লোকে সকাল বিকাল
ঘরের খবর পুছে।

আহিতাগ্নি/আহমদ ছফা


পরকে আঁকিবার এহেন দৌলতের নাম পরকীয়া। মানে পরকে পরখ করিয়া লওয়া। মনকে আঁকিয়া লওয়া বলা যাইবে।


জার্মান গুরুকবি যোহান ভলফ্‌গ্যাঙ ফন গ্যেটে তাহার জীবনের ‘সত্য আর কল্পনা’ (Dichtung und wahrheit) বহিতে সাংঘাতিক ঘটনা চাউর করিয়াছেন। বহিতে ওয়ের্থার রচনায় গ্যেটের ভাষ্য, ‘আমি এক ইংরেজ ভদ্রলোকের গল্প শুনিয়াছি। যিনি নিত্যদিন পোশাক বদলের বিড়ম্বনার হাত হইতে বাঁচিবার তাগিদে গলায় রশি দিয়া আত্মহত্যা করিয়াছেন। অপর একজন চিত্তবৈভবের প্রভু। একদিন বাগানে বেড়াইতে বেড়াইতে চিৎকার করিয়া বলিলেন, বৃষ্টি ভরা মেঘের পশ্চিম হইতে পূর্বদিকে যাইবার দৃশ্যই কি আমাকে জীবনভর দেখিতে হইবে? তেসরা, আমার দেশের এক বিখ্যাত আদমি—যিনি বসন্তে পত্রপল্লবে সবুজ দেখিয়া যারপরনাই ক্লান্ত হইয়া বলিলেন, এইবার না হয় তো লাল হইতে পারিত! কত না নানা রকমফেরে মানবসন্তান আত্মহত্যা করিতেছে।’ তিন আদমির আত্মহত্যা কি সরল পদার্থ? গ্যেটে আরো জানাইতেছেন, ইংরেজ জাতি কথায় কথায় আত্মহত্যা করিতে উস্তাদ।

গ্যেটে কারণ হিশাবে দেখাইতেন, জীবনের বড় দায় দেহ আর মনের। কেননা মনের দায় মিটাইতে না পারিলে জীবনের দায় মিটাইবে কী করিয়া? মন তো দেহের মহাশয় বটে। মনে জাগিলে দেহ তাহা ঘটাইবে। আর জীবন তাহাতে ভর করিয়া চলে। চলা আর চালাইবার গতিই তো মন। দেহ তার আধার মাত্র। তাহা নহে কি? তাঁহার চারিত ঘটনায় তিন আদমির আত্মহত্যার কারণ কি সামান্য? তাহা অতি কম নহে, বরং বেশি। দুনিয়াবি সাহিত্যের বাজারে শোনা, মহাত্মা গ্যেটে মনের জগতে খুঁড়িয়া বেড়াইতেন। গ্যেটে তরুণ বয়সে রাতালি সময়ে বুকের ’পরে নাঙা ছুরি ঘুরাইতেন। আর মৃত্যুকে কিভাবে সহজ করা যায় তাহাই ভাবিতেন। তো গ্যেটের লাহান আহমদ ছফাও নাকি কোমরে বিষের বোতল রাখিতেন। এহেন রাখার ভিতরে গ্যেটের ভাব কি ছফার ভিতরে ছিল? তবে সত্য, দৈহিকভাবে গ্যেটে আত্মহত্যা করেন নাই। আর বিষ পান করেন নাই আহমদ ছফাও। দুই মনীষীর ভিতর অদ্ভুত মিল এইখানে।

তাহারা হয়তো ভাবিয়াছিলেন, এই জীবন লইয়া কী করিব? কোথায় রাখিব দেহ? শুদ্ধ ‘ঘর’ নামক বোতলে বন্দি করিলে জীবন-নামক পদার্থের পদ খাটো হইতেছে। তাহাতে পরও দরকার। পরকে আঁকিবার এহেন দৌলতের নাম পরকীয়া। মানে পরকে পরখ করিয়া লওয়া। মনকে আঁকিয়া লওয়া বলা যাইবে। আর পর বাসা বাধিলেই ঘর বাক্য হইয়া ওঠে?

বাংলার মনীষী আহমদ ছফার কবিখ্যাতি বিশেষ নাই, এহেন কথা আমরা হলফ করিয়া বলিতে পারিব না। কবিখ্যাতি তাহার গানের লাহান। গান টান মারিলে প্রাণও নড়িয়া ওঠে। টান দেখিব কিসে? কবি হিশেবে তাহার বিশেষ কুখ্যাতিও রহিয়াছে তেমন সাক্ষ্য-প্রমাণ নাই। তাহার কারণ বিস্তর। কারণের আস্তর তুলিতে আমাদের পাড়া কথা খানিক পাড়াতে পাড়াতে রটাইব। আমাদের রটনার নাম ‘সত্য’। আস্তরের নাম ‘মায়া’। জনে জনে জিজ্ঞাসিতে পারেন, সত্যের জমিনে মায়া কী পদার্থ? বাংলা চিন্তার জগতে ‘মায়া’ বা ‘মা’ স্ত্রীলিঙ্গ বিশেষ। আমরা মায়ার অন্য অর্থ দেখিতে পাইতেছি। মায়া মানে মা ভাবের আয়া। আয়া ভাব মা ডাকিলেই মায়া ভাব জাগিয়া যায়। বলা যাইতে পারে, মা ভাব যাহাতে আসিয়া বাসা বাঁধে। এই বাঁধা লিঙ্গের বাঁধা নহে। তাহা লিঙ্গেরও অধিক কিছু বাড়া। এহেন ‘বাড়া’কে কি আমরা কায়া বলিতে পারি? না, তাহাতেও এক বেহায়াপনা মাথাচাড়া দিয়া উঠিতেছে। তাহা ছায়া বা ঘর। ভাবার্থ ধরিলে ‘ঘর’ মালটা তো আস্তর অশেষ। আস্তরের পলেস্তরা খসিলে গোপন রহস্য আর গোপন থাকিতেছে না। তাহাতে ছায়াও ছায়াহীন হইয়া পড়ে। ঘরও পাইতেছে পরের আকার। ঘরকে পরের রূপই তো পরকে অপর করিবার আদি নিয়ম। তাহা কী রকম?


ইংরাজ বুদ্ধিজীবী জন মিল্টনের মতে, সহজ-সরল, ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও আবেগের চেরাগ জ্বালানোই কবিতা।


মহাত্মা ছফা রচিত অনেক কবিতায় ঘরের খবর চাউর করিয়াছেন। আলোচনার স্বার্থে আমরা মহাত্মা আহমদ ছফার আহিতাগ্নির বার নম্বর কবিতাখানি বাছিয়া লইলাম। ছফার কবিতায় তথাকথিত আধুনিকতাবাদীদের মতো ভানভণিতা নাই। নাই কলাকৈবল্যবাদীদের আঙ্গিকের বৈকল্য। আঙ্গিক যাহাতে বিষয়াবলিকে ক্ষুণ্ন করিয়া থাকে ছফা সেই আইলে পা রাখেন নাই। ফলে তাহার কবিতা কাইলও পড়া যাইতে পারে। তাহার কবিতার সরল তর্জমা এই—জগৎসংসারে তিনি ঘর আর পরের তফাৎ ঘুচাইয়া ফেলিয়াছেন। তবুও লোকে তাহাকে পুছ করিতেছে ঘরের খবর। লোকের এহেন জিজ্ঞাসায় ছফার মনে সংশয়—আমার কখনো ঘর ছিল কি?

কবি কহেন, সাগর জলের নিচে কিংবা নীল আকাশের নীলে আমার ঘর। না না, তাহাতে লোকে কয়, সেসব খবর সত্য নয়। তাহার পরও লোকে পুছে ঘরের খবর কী! মানবসংসারে এহেন কলা কাঁদির মতো যেন আঁটি আঁটি ঝুলিয়া থাকে। গোপন বাসরেও সার সার কলা ঝুলিয়া আছে যেন!

ইংরাজ বুদ্ধিজীবী জন মিল্টনের মতে, সহজ-সরল, ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও আবেগের চেরাগ জ্বালানোই কবিতা। ইন্দ্রিয় তো আবেগের বায়ুধার। প্রশ্ন জাগিতেছে, কবিতার আয়ুই-বা কোথায়? যাহা ইন্দ্রিয়ানুভূতি আবেগের আধার তাহা কি সহজ সরল হইবে? না সেই রকম সরল শপথ কবিতায় নাই। এমন ধরাবাঁধা বালাই কবিতা কতখানি কবিতা তাহাও দেখিবার বিষয় বটে। কেননা একক বান্দার চেতনা তাহার অস্তিত্ব নির্ধারণ করিতেছে না। তাহার অস্তিত্ব নির্ধারণ করিতেছে ব্যক্তির অপর। পর-অপরের সম্বন্ধের নামই তো মিলন।

যাহাকে আমরা ছপ্পর মারিতেছি সামাজিক চেতনা বলিয়া। এই চেতনা একা চলিতেছে না। একা চলিতেই পারে না। তাহার অঙ্গে সঙ্গ চায়। এইরূপ সঙ্গ অপরের সহিত সম্বন্ধ করিতেছে। করিতেছে কি?

ধুরন্ধর কবি জন মিল্টনের এহেন তত্ত্বকে খানিক আড়মোড়া মারিয়াছেন স্পেনের যুদ্ধে শহিদ ইংরাজ বুদ্ধিজীবী র‌্যাল্ফ ফক্স (১৯৯০-১৯৩৭)। ফক্স তাহার কাহানি ও মানুষ বহিতে কহিলেন অন্যকথা, ‘সৃজনের মর্ম পরম, যাহা বাস্তবের লড়াই’। আর এই বাস্তবের ভিতর দিয়া সত্যের উৎপাদন করা। বাস্তব নির্ধারিত হইলে অবাস্তবও নির্ধারিত হইবে। কেননা বাস্তবের অচিন রূপ অবাস্তব বটেন। আর বাস্তবই বলিতেছে অবাস্তব কী মাল! মিল্টনের বড় দোষ কবিতার সংজ্ঞায় ভাষা প্রশ্নখানি মীমাংসা করেন নাই। আমরা বলিতেছি না, ভাষা মাত্র চরম। বলিতেছি ভাষার পরমের কথা। কহিতে শরম নাই আজি। তাহা কী?


ছফা বর্ণিত ‘আমার’ শুধু আত্মরতির ‘আমি’ বা নিছক ‘বান্দা’ থাকিতেছে না। ‘আমার’ হইতেছে তফাৎ ঘর আর পরের যৌথ উৎপাদন।


পশ্চিমের ডাহা ডাহা পণ্ডিতেরা বলিয়াছেন, ভাষা পদার্থখানি প্রকৃতি সারিত। মানে বস্তু বিশেষের মাধ্যমে ভাব প্রকাশ। প্রশ্ন জাগিতেছে, ভাব মালটা আসে কোথা হইতে? খোদ বস্তু হইতে নাকি পরমের কোঠা হইতে? বলা দরকার, বস্তুমাত্র ভাব। ভাব মাত্রই বস্তু নহে, বস্তুর অধিক কিছু। তাহা হইলে অধিক কিছুই পরম নয় কি? যাহাতে বন্তু ও পর ভাবের ওম পায়। জনে জনে জিজ্ঞাসিতে পারেন, ছফার কবিতায় ভাবের ওম বহিতেছে কোথায়? উত্তর উপরে নহে, গভীরে।

জন মিল্টনের পাটাতনে বসিয়া খালি কতক ইংরাজ কবি নহে, কত কত বাঙালি কবি শহিদ হইয়াছেন তাহার খবর রাখিতেছে কে? প্রভু যুদ্ধের ময়দান কতদূর? নদ আর নদীতে কতইবা রক্ত বহিতেছে আর। নিছক ইন্দ্রিয়ানুভূতির আবেগের রসে ছফা সিক্ত হইতে চাহেন নাই। ছফা খানিক রক্তাক্ত হইয়াছেন। তাই ছফার মন সংশয়ী। কবিতায় তাহার জিজ্ঞাসা, আমার কখনো ঘর ছিল কি? সকলেই জানেন, বাংলা তালুকে ছফা জমিনদারির প্রভু হয়েন নাই। ব্যক্তিগত জীবনে ধুরন্ধর বুদ্ধিকে পুঁজি করিয়া রাষ্ট্রের অর্থকড়িও বেহাত করেন নাই। এই না করিবার আদিতে কি সামাজিক চেতনা কাজ করিয়াছে? বাংলা অর্থবিদ্যা মতে, ‘ঘর’ শব্দখানি সংসার আর খানিক বাসস্থান অর্থে চালু। ছফার কবিতায় ঘর শব্দখানি আরো নতুন অর্থে গড়া। তাহা কেমন?

তাহার কবিতার ভাষ্য—

ঘরে পরে তফাৎ আমার
কখন গেছে ঘুচে
তবু লোকে সকাল বিকাল
ঘরের খবর পুছে।

ছফার জগতে ঘর আর পরে ফারাক ঘুচিয়া গিয়াছে। কেননা ‘তফাৎ’ বা ‘বৈষম্য’ বিরুদ্ধে লড়াই তাহার সার। ভাবের লড়াইয়ে জয়ী হইয়াছেন ছফা। কেননা ছফা বর্ণিত ‘আমার’ শুধু আত্মরতির ‘আমি’ বা নিছক ‘বান্দা’ থাকিতেছে না। ‘আমার’ হইতেছে তফাৎ ঘর আর পরের যৌথ উৎপাদন। মানে বান্দার সহিত সম্পর্কিত পরমার বা সামাজিক মালিকানা। কেননা আত্মরতির আমি কানাই কানা। এই কানা না পারে দেখিতে না পারে বিলাইতে। কহিতে পারেন, ‘ইহাই ছফার ইউটোপিয়া’। ভাববেত্তা টমাস মোরের সন্দেশ হইলেও মন্দ শোনাইত না। না দেশ না পরদেশ।

প্রশ্ন খাড়াইতেছে, মায়ের ভগ হইতে ভাগ হইয়া বান্দা বা সন্তান ‘আমার’ বলিতেছে কেন? কারণ আমার ভাগ বা গর্ভে দুই পদ। একপদে আম বা তামাম, অন্য পদের নাম ‘আর’ সকল পদার্থকে লইয়া। আম অপর অপর অর্থ বিলাইলে গণ হইবে। এহেন মহামিলনের সন্ধান যাহারা পাইয়াছেন তাহারাই ‘মানুষ’ সাব্যস্ত হইয়াছেন। আর যাহারা পান নাই তাহারা বুর্জোয়া সমাজের অর্থ-মাংস-খেকো ‘সুশীল সমাজ’ হইতেছেন। দেখা যাইতেছে, ‘তবু’ অব্যয় মারিয়া কাহারা ছফাকে ঘরের খবর পুছ করিতেছে।


সুশীল সমাজ রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও ব্যক্তি স্বার্থের প্রদায়ক। ছফা কথিত ‘লোক’ নামক গণ্ডুষই তো সুশীল সমাজ।


‘সুশীল সমাজ’ নয় কি? ছফাও তাহাদের ‘তবু’ বা ‘অব্যয়’ পদের কুঠুরিতে টুকাইয়াছেন। এই তবু ‘ধুরন্ধর’ ওর্ফে ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ বলিয়া সাব্যস্ত। ‘সুশীল সমাজ’ নামক উপজাতখানি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সরল ক্রীড়নক। রাষ্ট্র তাহাদের লইয়া খেলে এবং খেলায়! রাষ্ট্র ও সুশীল (ওর্ফে বুর্জোয়া) সমাজই তো নিপীড়ন-সমাজের হোতা। কেননা সুশীল সমাজ রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও ব্যক্তি স্বার্থের প্রদায়ক। ছফা কথিত ‘লোক’ নামক গণ্ডুষই তো সুশীল সমাজ।

তো আহমদ ছফার কবিতা কী পদার্থ? ইন্দ্রিয় আবেগের বশে যাহারা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের মর্ষকাম করিতেছেন, হয়তো তাহাদের কাছে ছফার কবিতা কবিতা-পদবাচ্য নহে। কবিতাখানি কবিতার অধিক গান। যাহা টান মারিয়া প্রাণকে জাগায়। এই প্রাণ পরকে জড়াইয়া ধরে। আর প্রাণ তাহাতে যৌথ জীবনের সামাজিক মর্ম ভেদিয়া ওঠে। আমরা বলিতেছি, কবিতাই তো যৌথ চেতনার সামাজিক মালিকানা। কারণ ভাষা ভাষাকে বিলায়। আলয়ে তাহার অর্থ হয়। তাহা নয় কি?

মহাত্মা ফিদারিক এঙ্গেলস ১৮৯০ নাগাদ জে ব্রশের সকাশে চিরকুট লিখিয়াছেন। তাহার ভাষ্য, ‘ইতিহাসের উপাদান শেষ নাগাদ জীবনের সত্য চাষ আর তাহার পুনরুৎপাদন করিয়া যাওয়া।’ তবে ইহাকে নিছক অর্থনৈতিক কোঠায় একমাত্র নির্ধারক উপাদন বলিলে ভুলে পর্যবসিত হইবার শঙ্কা থাকিতেছে। এই শঙ্কা মহামতি এঙ্গেলসের। তো পুড়িয়া পুড়িয়া কতখানি অঙ্গার হইলে ইতিহাস খাঁটি সোনা হয়? ছফার বয়ানে তাহাই তো ‘আহিতাগ্নি’। বাংলা ভাববিদ্যা মতে, আগুনের হিত ইতিহাসের গোড়া আহিতাগ্নি। ইতিহাসের আগুনে যাহা সম্পাদিত হয়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের বায়ুরোগের বাসনা তাহাতে নাই। কী আছে?

জর্মান বাড়ির দার্শনিক সিগমুন্ড ফ্রয়েড ‘স্বপ্নের বয়ান’ বহিতে এক স্বপ্নদর্শির কথা চাউর করিয়াছেন। ফ্রয়েডের জবানে, এক ব্যক্তির ছাওয়াল গত হইয়াছে। চলরীতি মোতাবেক ছাওয়ালের চারিদিকে চেরাগ জ্বালানো হইল। পাহারা বসাইতে ভাড়া করা হইল লোক। পাশের ঘরে নিদ্রামগ্ন পিতা। দুই ঘরের দরজা খোলা। পিতা স্বপ্নে দেখিলেন অদ্ভুত! ছাওয়াল তাহার সামনে দাঁড়াইয়া বলিতেছে—আব্বাজান, দেখিতেছেন না আমি পুড়িতেছি। পিতার ঘুম ভাঙিয়া গেল। পাশের ঘরে দেখিলেন পাহারাদার ঘুমে অচেতন। একটি জ্বলন্ত কুপি পড়িয়া মরা সন্তানের গায়ে আগুন লাগিয়াছে। ফলে সন্তানের একখানা হাত পুড়িয়া গিয়াছে।

ইহাতে আমরা দেখিলাম সত্যের কেরামতি। ঘর ও পর কিভাবে সত্যের মুখোমুখি হইতেছে। মুখোমুখি হইতেছে পিতা আর ছাওয়াল। মনের ঘর ইহাতে অপর কুঠুরিও ভেদ করিয়াছে। কেননা পিতার বাসনায় ছাওয়ালের মরণ নাই। হয়তো এহেন বাসনাই সত্যের কুঠুরি। যাহা সত্য আকারে স্বপ্ন রূপ লাভ করিয়াছে। তবে সত্যের মুখোমুখি হইবার নাম কি বাসনা? যে বাসনার মৃত্যু নাই। জাগিবার আগে বারবার জাগায়। জাগে বারবার সামাজিক মালিকানায়। আহমদ ছফায়।

(অনলাইন ডেস্ক, ঘাটাইল ডট কম)/-

বড়াল ব্রীজ ও স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং আমেনা

বড়াল ব্রীজের ওপর দিয়ে যখনই যাই তখনই চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনের লেখা ‘বড়াল ব্রীজের সেই মেয়েটি’র কথা মনে পড়ে।

নুরুদ্দিনের কথা লিখতে গিয়ে আরেক জনের কথা মনে পড়ল। শুধু দেখছিলাম তাকে কয়েক মুহূর্তের জন্যে। সে-ও ছিল মানসিক ব্যাধি- আক্রান্ত, এক মহিলা । সম্পূর্ণ উলঙ্গ। উঠে বসেছিল বড়াল রেলওয়ে ব্রিজের ওপর। হেলেদুলে হাসছিল সে, কখনো কাঁদছিল। ব্রিজের নিচে বৃত্তাকার যে আকাশমুখো জঁলা, মাঝে মাঝে তার উপর থুথু ছিটাচ্ছিল সে।

সিরাজগঞ্জ ঘাট থেকে যে রেল পথটি চলে গেছে ঈশ্বরদী জংশন পর্যন্ত তারই মাঝামাঝি জায়গায় বড়াল ব্রীজ স্টেশন। পাশেই বড়াল নদী। এই নদী ধরে দক্ষিণে যাওয়া যায় পাবনার এক থানা-জনপদ ফরিদপুরে। উত্তরে ভাঙ্গুরার বিভিন্ন গ্রাম। বছর সতের আগের কথা। তখনো শ্যালো-ইঞ্জিনের নৌকা আসেনি।, বড়ালব্রীজ থেকে ফরিদপুরের সড়কও তৈরি হয়নি।

আমি একটা দাঁড়-টানা নৌকা করে ফরিদপুরের বনওয়ারীনগর থেকে বড়াল ব্রীজ স্টেশনে আসছি। এখান থেকে ঈশ্বরদী ট্রেন ধরব। ঈশ্বরদী থেকে রাজশাহীতে।

আমার নৌকার মাঝি সেকেন্দার ওরফে সেকেন। সেটা ছিলো শুকনো মৌসুমের এক সকাল, নৌকা ভিড়ল ব্রিজ থেকে একটু দূরে। সহকারীকে নৌকা বাঁধতে বলে সেকেন মাঝি নিজের কাঁধে তুলে নিল আমার ব্যাগপত্র। আগেই কথা হয়েছে সে আমাকে ট্রেনে তুলে দেবে।

চৈত্রের শুকিয়ে-ওাঠা বড়ালের ধার ঘেঁষে আমরা হাঁটছি পাশাপাশি। সামনেই মূল নৌকাঘাট, তারপর স্টেশনের প্লাটফরমে উাঠবার সিঁড়ি। একটি পাকা, অপরটি নদীর ঢাল কেটে কেটে তৈরি করা। আমরা একটুখানি ঘুরে প্লাটফরম-লাগোয়া পাকা সিঁড়ি বেয়েই উাঠলাম, কেননা টিকিট করতে হবে, চা খেতে হবে। আর ট্রেন আসতেও ঘণ্টাখানিক দেরি আছে।

হাঁটছি। সেকেন মাঝির সাথে টুকটাক কথা হচ্ছে। হঠাৎ চোখে পড়লো ব্রিজের নিচে বেশ জটলা প্রথমে ভাবলাম: বুঝি মাছ কেনাবেচা হচ্ছে। ধারে কাছেই তো মাছের বাজার, আড়ত। কিন্তু না, আরো একটুখানি এগোতেই দেখলাম চক্রাকারে দাঁড়িয়ে আছে একদল মানুষ। সবার চোখ উপর-মুখো। তাকিয়ে আছে সবাই ব্রিজের স্প্যানের দিকে। আছে যুবক, বৃদ্ধ, মায় কিশোর পর্যন্ত।

সেখানে বইখাতা বগলে স্কুল-ছাত্র, কলেজ পড়ুয়া, মাছ ব্যবসায়ী, ঝাঁকা হাতে হলধর, তরকারিওয়ালা, নৌকার হইলা-মাঝি, টুপি মাথায় গামছা কাঁধে মৌলবি সাহেব। প্যান্ট-শার্ট পরা কয়েকজন ভদ্রলোককেও দেখলাম দাঁড়িয়ে হা করে আছে উপরের দিকে, জঁলা থেকে একটুখানি দূরে। হাতের ব্যাগ সুটকেশ দেখে বোঝা যায় ট্রেনের যাত্রী এরা।

ব্রিজের ওপরে চড়ে বসা মেয়েটি ভরা-যুবতী, সম্পূর্ণ উলঙ্গ। সে নাচের ভঙ্গিতে হাত নাড়ছে।

মাথার উপর, তার বিকৃত কণ্ঠে ভীষণ চিৎকারের গান: ‘ধাজা মেওে বলমা, তেরা এন্তেজার হ্যায়’।

একটি লাইন শেষ করেই সে তৎক্ষণাৎ বাংলার দিকে চলে গেছে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেই গানটি গাইতে লাগল।

সে প্রায় গলা ফাটিয়ে ‘আজ দূজনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে।’

বেঁকে উচ্চারণের সাথে সাথে তার কণ্ঠ আরো কর্কশ শোনায়।

গান থামিয়ে হঠাৎ ধমকে ওঠে যুবতী : যাহ্ শালারা ভাগ… ভাগ… । তারপর ঐ অতদূর থেকে ভীষণ শব্দ মুখে নিয়ে থুথু ছিটাতে থাকে।

মেয়েটির প্রতিটির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেন গিলে-চেটে খাচ্ছে সবাই। নিষ্পলক চোখ। চকচকে মণি। থুথু ছিটানো শুরু হলে ব্রীজের নিচে হাসির রোল ওঠে।

মেয়েটিকে ব্রীজের ওপর থেকে নামতে বলছেনা কেউ, বরং ভিড়ের ভেতর থেকে একজন চিৎকার কওে ওাল: ‘হই পাগলী, এইবার একখানা নাচ দেখাও তো।’

এই বলে হ্যাংলা-পাতলা যুবকটি উর্ধ্বমুখে তাকিয়ে নিজের নাচের অঙ্গভঙ্গি করতে থাকে। খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে সবাই।

… এবার হঠাৎ ‘আঁউ বলে আকাশ ফাটানো চিৎকার করে ওঠে ব্রীজের যুবতী, তারপর ততোধিক জোর শব্দে হাসতে থাকে হা হা। সেই অট্রহাস্যে বুঝিবা কেঁপে ওঠে বড়ালের দুই তীর, পুবদিকের প্লাটফরম, সংলগ্ন বাজার এবং অদৃশ্য শয়তানের হৃদয়।

মেয়েটির হা হা হাসির সাথে যুক্ত হয় জনতার বিচিত্র ভঙ্গিও হাসি।

এসময় এক বালক পাশেরই এক চা-দোকানের বয়, মাটির শক্ত ঢেলা তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারতে থাকে পাগলীর দিকে। প্রথমটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, দ্বিতীয়টিও, কিন্তু তৃতীয় ঢিলটি লাগে মেয়েটির মাথার পেছনের দিকে।

আহ্ শব্দে ভীষণরকম চিৎকার করে ওঠে মেয়েটি।

একটু আগেই যে কিনা অট্টহাস্য করছিল, এখন সে মাথার পেছন দিকটি দুহাতে চেপে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতেই সে যৌন-সম্পর্ক স্থাপন করে ঢিলছোড়া কিশোরের পিতা এবং মাতা উভয়ের সাথে। শালা… হারামজাদা… কুত্তার বাচ্চা… তোর মায়ওে আমি… তোর বাপরে আমি…

মেয়েটি কাঁদছে। কাঁদছেই। নিজের চুল নিজেই টানছে।

এই অবস্থায় নিচের জঁটলা আরো পুলকিত, উল্লাসিত, ভীষণরকম মজা পাচ্ছে সবাই এরকম হাসছে।মৌলবি সাহেব, চকচকে চোখে গিলছিল যে যুবতীর শরীর এবং থেকে থেকে উচ্চারণ করছিল ‘নাউজুবিল্লাহ’, পাগলীর কান্না এবং গালাগালির মাত্র বৃদ্ধিও সাথে সাথে তার ঠোঁট চাপা হাসি আরো বিসৃত হয়।

ঐ ছেলেটি, যে ঢিল মেরেছিল যুবতীর আকাশ-কাপানো কান্নার বিপরীতে দাঁত বের করে হাসতে থাকে সে-ও। এবার ঢিল মারার ভঙ্গিতে হাত ছুঁড়েছে মেয়েটিও।

একবার কিশোরের দিকে, একবার ব্রীজের নিচে ঊর্দ্ধমুখী মানুষগুলোর দিকে।

আমার খুব খারাপ বোধ হতে থাকে। বুকের ভেতর বিচিত্র রকম অনুভতি হচ্ছে। মানুষের এই অপমান, মনে হচ্ছে…

জটলা সরাতে আমার কিছু করা দরকার কি? মেয়েটিকে নামানো যায় না ব্রীজের ওপর থেকে? কী করে ঐ উঁচুতে উঠল সে ? কবে কোত্থেকে এই জনপদে এসে পড়ল উলঙ্গ যুবতী? ভাবনার ছেদ পড়ে।

আমার ব্যাগ দুটো মাটির ওপর নামিয়ে রাখে সেকেন মাঝি, তারপর ছুটে গিয়ে হামাল দেয় জটলায়। তার কণ্ঠে হুংকার : সব ব্যাটারা সর! ভাগ! ভাগ!

একটু বাদে, জনতার ভিড় এলোমেলো এবং ক্রমশ ফাঁকা হয়ে যাবার পর, দুপদাপ পায়ে দ্রুত পূর্ব-অবস্থানে ফিরে আসে সেকেন মাঝি। হাঁপাচ্ছে সে, আক্রোশে কাঁপছে হাত দুটো।

ঘাড় ফিরিয়ে ঘন ঘন তাকাচ্ছে ঘটনাস্থল থেকে সওে যাওয়া মানুষগুলোর দিকে। সে কাঁপা হাতে আরো শক্ত কওে বাঁধার ব্যর্থ চেষ্টা কওে লুঙ্গিও ওপর খাটো গামছাটি।

সেকেন মাঝি এবার এবার বেশ গম্ভীর আবার সে ব্যাগ তুলে নিল কাঁধে হাঁটতে লাগল সামনের দিকে। আমি অবাক হয়ে কৃষ্ণবর্ণ দীর্ঘ এবং পেশিবহুল মানুষটির দিকে তাকিয়ে থাকি। ব্রীজের ওপর মেয়েটি তখনো কাঁদছে।

এবার সামনে হাঁটছে সেকেন মাঝি। পেছনে আমি। হঠাৎ সে থামল। ঘুরে দাঁড়াল বলে উঠল : ‘ দেখছেন স্যার কাণ্ডকারখানা !’

আমি কিছু বলতে চাইলাম। একটু থেমে আমাকে অবাক করে সে বলে উঠল: ‘আপনিই কন স্যার পাগল কিডা? উপরের ঐ পাগলী না নিচের এই হারামজাদাগুলা?’

প্রশ্ন ছুড়ে দেয়ার সাথে সাথে একদলা থুথু ছিটাল সে চৈত্রের ঝাচটা বাতাসে সেই থুথুর একটুখানি আমার মুখেও এসে পড়ল। শার্টের আস্তিনে মুছে নিলাম তা আস্তে করে। নীরবে।

বছর খানেক বাদে আবার ভাঙ্গুরা গেলাম। সেই বড়ালব্রীজ স্টেশন চায়ের দোকানে বসে মেয়েটির কথা জানতে চাই। কোথায় সে? দেখছি না তো?

চা দোকনদার নতুন এসেছে এখানে কিছু বলতে পারে না। কিন্তু প্রশ্নের জবাব জানাল পাশের আরেকটি দোকানের কর্মচারী। কার কথা বলছেন? আমেনা? সেই ল্যাংটা পাগলী ? সে তো স্যার মারা গেছে ট্রেনে কাটা পড়ে। …

গতবছর… ঐদিকের লাইনের ওপর বসেছিল সে…। ঐ সময়… ভীষণরকম একটা আতঙ্কে শিউরে উঠি। কান ঝাঁ ঝাঁ করছে । গলার কাঁটার কাছে বিচিত্ররকম শিরশির একটা অনুভতি হচ্ছে …।

বুঝতে পারি বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল… ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে কান্না।

সেই সময়ে, চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই, পৃথিবীর সমস্ত মানুষ আমেনার মতো উলঙ্গ, প্রত্যেকে চড়ে বসে আছে একেকটি ব্রিজের ওপর, হা হা করে হাসছে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে প্রচণ্ড কান্নায় ভেঙে পড়ছে।

মৃত্যুর বেদনার সঙ্গে অপেক্ষা করছিল বিষ্ময়। শুনলাম : আমেনা নামের ঐ মেয়েটির বাড়ি ছিল ঈশ্বরদীর এক গ্রামে। একাত্তরে পাকসেনা আর স্থানীয় কতিপয় অবাঙালি যুবক তার বাবা মাকে হত্যা করে, আমেনাকে ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। যুদ্ধশেষে, জনতা যখন বিজয়ের উল্লাসে মাতোয়ারা, অনেক যুবতীর সাথে এই মেয়েটিকেও ঐ ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করা হয় এবং মন্তিষ্কবিকৃত অবস্থায়…।

(ফেসবুক থেকে প্রাপ্ত, ঘাটাইল ডট কম)/-

পল্লব বোসের তিনটি কবিতা

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল পৌরসভার অধিবাসী পল্লব বোসের তিনটি কবিতা ঘাটাইল ডট কম পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল

এক.

সন্তান আজ পিতার কাছেও হয়ে গেছে যেনো ভয়,

জীবন অতি তুচ্ছ বিষয় যদি এভাবে হারাতে হয়।

প্রতিটি প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ করতেই হবে গ্রহণ,

মৃত্যুর চেয়ে যন্ত্রনাদায়ক এমন দৃশ্যের দহন।

পুত্র মা কে রাস্তায় ফেলে চলে যায় যখন একা,

এমন দৃশ্য এই জগতে হয়নি কখনো দেখা।

মৃত্যুর পর আত্মীয়- স্বজন দিচ্ছেনা পরিচয়,

বেওয়ারিশ বলে দাফন দাহন কতটা বেদনাময়।

বুকভরা ব্যাথা অশ্রু শুকিয়ে হয়ে গেছে খরা নদী,

প্রতিশোধ নিবে এভাবে পৃথিবী বদলে না যাই যদি।

 

দুই.

কর্মহারা মানুষের মুখে বিষাদের কালো ছায়া,

পৃথিবীর এই কঠিন রূপে নেই যে কোনো মায়া।

সামাজিকতা লকডাউনে উধাও হয়ে গেছে,

ইচ্ছে হলেও যায় না যাওয়া প্রিয়জনের কাছে।

মহামারী আজ নিচ্ছে কেড়ে প্রিয়জনের মুখ,

এসব দৃশ্য দেখে মানুষ কেঁদে ভাসায় বুক।

আয়ের পথটা বন্ধ হয়ে জীবন যখন অচল,

কেউ জানেনা কখন হবে আয়ের চাকা সচল।

বুকের ভেতর কষ্ট চাপা মুখে নিয়ে হাসি,

বলছি তবু আছি ভালো তোমার পাশাপাশি।

 

তিন.

ছেলেবেলার সব স্মৃতির মেলা ভেসে আসে ক্ষণে ক্ষণে,

হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মুখগুলো অতীতের দিকে টানে।

কৈশোর ছিল প্রাণচঞ্চল ছিলো না তো কোন বাঁধা,

বন্ধুরা মিলে জয় করেছি কত যে কঠিন ধাঁধা।

যৌবনে এসে আড্ডায় কত সময় করেছি পার,

চায়ের কাপে ঝড় তুলে শেষে কত যে হয়েছে শেয়ার।

একদিন যদি দেখা না হতো বুকে হতো হাহাকার,

কোথায় তোরা কেমন আছিস দেখা হবে তো আবার?

ফুটবল খেলা শেষ হলে পরে পুকুরে তে ঝাঁপাঝাপি,

বনভোজন এর সময় এলে করেছি কত লাফালাফি।

আত্মার সাথে আত্মা মিলে বিন্দু থেকে সিন্ধু,

সকল কিছুর উর্দ্ধে যে জন সেই তো হলো বন্ধু।

(স্টাফ রিপোর্টার, ঘাটাইল ডট কম)/-

গেরিলা থেকে সুরেলা আজম খান

একজন পপ গুরু, মুক্তিযোদ্ধা, ব্যান্ডসম্রাট, ক্রিকেটার, সংগঠক, গায়ক, অভিনেতা, মডেল আজম খান। তাঁর পুরো নাম মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান। দীর্ঘদিন দূরারোগ্য ক্যান্সার ব্যাধির সাথে লড়াই করে ২০১১ সালের ৫ জুন রোববার সকাল ১০টা ২০মিনিটে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার জন্য প্রয়াণ দিবসের বিনম্র ভালবাসা, শ্রদ্ধাযুক্ত স্মরণ।

১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আজিমপুরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবার নাম মোহাম্মদ আফতাব উদ্দিন খান, মা জোবেদা খাতুন।

১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানের সময়ে আজম খান পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তখন তিনি ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে গণসঙ্গীত প্রচার করেন।

১৯৭১ সালে আজম খানের বাবা আফতাব উদ্দিন সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থাকায় বাবার অনুপ্রেরণায় যুদ্ধে যাবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন তিনি। যুদ্ধ শুরু হলে, তিনি তার দুই বন্ধু সহ পায়ে হেঁটে আগরতলা চলে যান। এসময় তার লক্ষ্য ছিল সেক্টর ২’এ খালেদ মোশাররফের অধীনে যুদ্ধে যোগদান করা।

আজম খান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন ২১ বছর বয়সে। তার গাওয়া গান প্রশিক্ষণ শিবিরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরনা যোগাতো। তিনি প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন ভারতের মেলাঘরের শিবিরে। যুদ্ধ প্রশিক্ষণ শেষে তিনি কুমিল্লায় পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সন্মুখ সমরে অংশ নেয়া শুরু করেন। কুমিল্লার সারদায় প্রথম সরাসরি যুদ্ধ করেন, এরপর ফিরে যান আগরতলায়। তারপর তাকে পাঠানো হয় ঢাকায় গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিতে।

আজম খান ছিলেন দুইনম্বর সেক্টরের একটা সেকশনের ইন-চার্জ, সেক্টর কমান্ডার ছিলেন কর্ণেল খালেদ মোশাররফ। ঢাকায় তিনি সেকশন কমান্ডার হিসেবে ঢাকা ও এর আশেপাশে বেশ কয়েকটি গেরিলা আক্রমণে অংশ নেন। মূলত তিনি যাত্রাবাড়ি- গুলশান এলাকার গেরিলা অপারেশনগুলো পরিচালনার দায়িত্ব পান। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল তার নেতৃত্বে সংঘটিত ‘অপারেশান তিতাস’।

তাদের দায়িত্ব ছিল ঢাকার কিছু গ্যাস পাইপ লাইন ধ্বংস করার মাধ্যমে বিশেষ করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, হোটেল পূর্বাণী ইত্যাদির গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানো। তাদের লক্ষ্য ছিল, হোটেলে অবস্থানরত বিদেশীরা যাতে বুঝতে পারে, দেশে যুদ্ধ চলছে।

এই অপারেশনে তিনি বাম কানে আঘাত পান, পরবর্তীতে এই আঘাত আজম খানের শ্রবণ ক্ষমতায় বিঘ্ন ঘটায়। যুদ্ধে বাঁ কানে আঘাত পান, তারপর থেকে আজীবন ভালো শুনতে পেতেন না। তবু গান থামেনি।

“প্রশিক্ষণ শেষে সন্ধা ৬টার পর সদলবলে সবাই ক্যাম্পে আত্মশক্তি জাগানোর জন্য বাটি, চামচ, ক্যান, কৌটা, ডিব্বা পিটিয়ে বাজিয়ে সবাই মিলে গাইতেন গণসংগীত।”, বাবাকে নিয়ে আলাপচারিতায় জানিয়েছিলেন ইমা খান।

স্বাধীনতা যুদ্ধ জয়লাভ করে আজম খান তার সঙ্গীদের নিয়ে পুরোপুরি ঢাকায় প্রবেশ করেন ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। এর আগে তারা মাদারটেকের কাছে ত্রিমোহনীতে সংগঠিত যুদ্ধে পাক সেনাদের পরাজিত করেন।

আজম খানের কর্মজীবনের শুরু হয় ষাটের দশকের শুরুতে। ১৯৭১ সালের পর তার ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’ এবং আখন্দ (লাকী আখন্দ ও হ্যাপী আখন্দ) ভাতৃদ্বয় দেশব্যাপী সঙ্গীতের জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশে তরুণ প্রজন্ম যখন খুব দ্রুতই হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে গেলো, তখন আজম খানের মনে হলো এই তারুণ্যকে কোনো একটা আনন্দের সঙ্গে যুক্ত করা না গেলে এরা দেশের জন্য ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসবে।

বন্ধু নিলু আর মনসুরকে গিটারে, সাদেক ড্রামে আর নিজেকে প্রধান ভোকাল করে করলেন অনুষ্ঠান। ১৯৭২ সালে বিটিভিতে ‘এতো সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’ এবং ‘চার কালেমা সাক্ষীদেবে’ গান দু’টি প্রচার হলে তুমুল প্রশংসা ও জনপ্রিয়তা পান আজম খান, দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়ে যায় তাদের দল।

১৯৭৪’৭৫ সালের দিকে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে বাংলাদেশ (রেললাইনের ঐ বস্তিতে) শিরোনামের গান গেয়ে হৈ-চৈ ফেলে দেন।

আজম খানের পাড়ার বন্ধু ছিলেন ফিরোজ সাঁই। পরবর্তী কালে তার মাধ্যমে পরিচিত হন ফকির আলমগীর, ফেরদৌস ওয়াহিদ, পিলু মমতাজের সাথে। একসাথে বেশ কয়েকটা জনপ্রিয় গান করেন তারা।

এরই মধ্যে আরেক বন্ধু ইশতিয়াকের পরামর্শে সৃষ্টি করেন একটি এসিডরক ঘরানার গান ‘জীবনে কিছু পাবোনা এ হে হে!’। আজম খানের দাবী, এটি বাংলা গানের ইতিহাসে প্রথম হার্ডরক।

মুক্তিযুদ্ধকালে যেভাবে গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে অনুপ্রাণিত করেছেন, যুদ্ধের পরও আবার কণ্ঠে তুলে নিলেন গান। নতুন ধরনের গান। গেয়ে ওঠেন সালেকা মালেকা আর আলাল দুলালদের গান, রেল লাইনের বস্তিতে সন্তানহারা মায়ের কান্না তুলে আনেন গিটারের ছয়তারে, হারিয়ে যাওয়া অভিমানীকে খুঁজে ফেরেন গানে গানে আর পেয়েও হারিয়ে ফেলার আর্তনাদে ভরে তোলেন বাংলা গানের আকাশ…

১৯৮৬ সালে ‘কালাবাউল’ শিরোনামের একটি নাটকে কালা বাউলের চরিত্রে এবং ২০০৩ সালে শাহীন-সুমন পরিচালিত ‘গডফাদার’ চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি।

২০০৩ সালে ক্রাউন এনার্জি ড্রিংকসের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রথম বিজ্ঞাপন চিত্রের মডেল হন। এরপর ২০০৫’০৮সালে বাংলালিংক এবং ২০১০ সালে কোবরা ড্রিংকসের বিজ্ঞাপনের মডেল হন।

খেলাধুলায়ও ব্যাপক আগ্রহ ছিলো আজম খানের। ক্রিকেটার হিসেবে বেশ পরিচিত ছিলেন এ পপতারকা। গোপীবাগ ফ্রেন্ডসক্লাবের হয়ে ১৯৯১’২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলেছেন। ৯ বছরে অনেকগুলো ক্রিকেট ম্যাচে নিজের খেলোয়ার প্রতিভার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

মুখগহ্বরের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন আজম খান। দেশে-বিদেশে অনেক চিকিৎসাও তাকে ফেরাতে ব্যর্থ হয়। অসাধারণ প্রতিভা ও দৃপ্ত কণ্ঠের একসংগীত জাদুকরের জীবন থেমে যায় ৬১ বছর বয়সে।

দীর্ঘদিন দূরারোগ্য ক্যান্সার ব্যাধির সাথে লড়াই করে ৫জুন ২০১১ রোববার সকাল ১০টা ২০ মিনিটে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আজম খান।

আজকের এই দিনে পৃথিবী থেকে চলে গিয়ে আজম খান রেখে গেছেন তার নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের সুরেলা সংগ্রাম এবং বাংলা ব্যান্ড নিয়ে আজীবন মগ্ন থাকার উপাখ্যান।

(নিজস্ব প্রতিবেদক, ঘাটাইল ডট কম)/-

শুভ জন্মদিন হুমায়ুন ফরীদি

তিনি আজ (২৯ মে) ৬৮ বছর ছুঁতেন; যদি না ৮ বছর আগে হুট করে চলে যেতেন। শুভ জন্মদিন, বহুমাত্রিক অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি। ১৯৫২ সালের এই দিনে তিনি জন্মেছিলেন, ঢাকার নারিন্দায়।

মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র। সমানতালে তিন দশক দাপট ছিল এই অভিনেতার। অভিনয়ের মাধ্যমে আমৃত্যু ছড়িয়েছেন জীবনের বর্ণিল আলো। অথচ তার ব্যক্তিজীবনটা ছিল পুরোটাই সাদামাটা।

১৯৭০ সালে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জৈব রসায়ন বিভাগে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্থগিত হয়ে যায় পড়াশোনা। স্বাধীনতার পর অর্থনীতি বিষয়ে ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। মেধার স্বাক্ষর রাখেন প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফলে। প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতক সম্মান পরীক্ষা পাস করেন। এমন ফল নিয়ে নিশ্চিন্ত পেশা হিসেবে বেছে নিতে পারতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন অভিনয়কে, যেখানে অনিশ্চয়তা ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

হুমায়ুন ফরীদির অভিনয় জীবন শুরু ছাত্রজীবনে মঞ্চ নাটকের মধ্য দিয়ে। টিভি নাটকে প্রথম অভিনয় করেন আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় ‘নিখোঁজ সংবাদ’-এ। তার অভিনীত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য টিভি নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘সাত আসমানের সিঁড়ি’, ‘একদিন হঠাৎ’, ‘চাঁনমিয়ার নেগেটিভ পজেটিভ’, ‘অযাত্রা’, ‘পাথর সময়’, ‘দুই ভাই’, ‘শীতের পাখি’, ‘সংশপ্তক’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘নীল আকাশের সন্ধানে’, ‘দূরবীন দিয়ে দেখুন’, ‘ভাঙনের শব্দ শুনি’, ‘বকুলপুর কতদূর’, ‘মহুয়ার মন’, ‘সমুদ্রে গাঙচিল’,‌ ‘তিনি একজন’, ‘চন্দ্রগ্রস্ত’, ‘কাছের মানুষ’, ‘মোহনা’, ‘বিষকাঁটা’, ‘শৃঙ্খল’, ‘ভবের হাট’ প্রভৃতি।

প্রথম মঞ্চনাটক কিশোরগঞ্জে মহল্লার নাটকে ১৯৬৪ সালে। মঞ্চে প্রথম নির্দেশনা দেন স্কুলজীবনে, নাম ‘ভূত’। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য মঞ্চনাটক ‘মুনতাসীর ফ্যান্টাসি’, ‘ফণীমনসা’, ‘শকুন্তলা’, ‘কীর্ত্তনখোলা’, ‘কেরামত মঙ্গল’ প্রভৃতি। টিভি নাটক অথবা মঞ্চে সেলিম আল দীন এবং নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু জুটির বাইরে হুমায়ুন ফরীদির সর্বাধিক সংখ্যক এবং সর্বাধিক সফল কাজ ছিল হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে। ‘সংশপ্তক’ ধারাবাহিকে হুমায়ুন ফরীদি অভিনীত চরিত্র কানকাটা রমজানের কথা নতুন করে বলার কিছু নেই।

হুমায়ুন ফরীদির প্রথম চলচ্চিত্র অভিনয় তানভীর মোকাম্মেলের ‘হুলিয়া’। প্রথম বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত ‘সন্ত্রাস’। এছাড়া উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ছবি হচ্ছে ‘ভণ্ড’, ‘ব্যাচেলর’, ‘জয়যাত্রা’, ‘শ্যামলছায়া’, ‘একাত্তরের যীশু’, ‘মায়ের মর্যাদা’, ‘বিশ্বপ্রেমিক’ ও ‘পালাবি কোথায়’। যার বেশিরভাগই সুপারহিট। বাংলা চলচ্চিত্রে খল চরিত্রে তিনি যোগ করেছিলেন নতুন মাত্রা। ‘সন্ত্রাস’ ছবির মাধ্যমে খলনায়ক চরিত্র শুরু হয় তার। তিনি ‘মাতৃত্ব’ ছবির জন্য সেরা অভিনেতা শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন ২০০৪ সালে।

হুমায়ুন ফরীদি অভিনীত শেষ ছবি ‘এক জবানের জমিদার, হেরে গেলেন এবার’। ছবিটি ২০১৬ সালের ২৬ আগস্ট মুক্তি পায়। এটি পরিচালনা করেছেন উত্তম আকাশ।

নিয়মিত টিভি অভিনয়ের পাশাপাশি হুমায়ুন ফরীদি তেমন একটা লিখতেন না। তবে কিছু টেলিফিল্ম, ধারাবাহিক ও এক ঘণ্টার নাটক নির্মাণ করেছেন।

দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত এবং রোমান্টিক এ মানুষটি ব্যক্তিগত জীবনে প্রথমে বেলি ফুলের মালা দিয়ে ফরিদপুরের মেয়ে মিনুকে বিয়ে করেন। তখন এ বিয়ে সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। সেই ঘরে তাদের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। নাম দেবযানি। পরে তিনি ঘর বাঁধেন প্রখ্যাত অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে। কিন্তু ২০০৮ সালে তাদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। তবে ব্যক্তিজীবন ছাপিয়ে হুমায়ুন ফরীদি সবার প্রিয় অভিনেতা হিসেবে এখনও আবিষ্ট করে রেখেছেন অগুনতি দর্শক-সমালোচকদের।

যার প্রমাণ মিলেছে চলমান করোনাকালেও। অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ‘অকশন ফর অ্যাকশন’-এর আয়োজনে নিলামে তোলা হয় হুমায়ুন ফরীদির ব্যবহৃত বস ব্র্যান্ডের একটি চশমা। ১ মে নিলামে তোলার পর চশমাটি বিক্রি হলো ৩ লাখ ২৫ হাজার ১২ টাকায়!

২০১২ সালে ফাল্গুনের প্রথম দিনে (১৩ ফেব্রুয়ারি) পৃথিবীর সব আলো পেছনে ফেলে তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

(অনলাইন ডেস্ক, ঘাটাইল ডট কম)/-