মওলানা ভাসানী ও তাঁর ঈদ

নামাজ হইতে আসিয়া হুজুর কোরবাণীর হুকুম দিলেন। ময়মনসিংহের সৈয়দ শরফুদ্দীন হাবীব একটি গরু পাঠাইয়াছিলেন। মুরিদদের কেউ কেউ খাসী দিয়াছিলেন। সব জবেহ হইল।

হুজুর কাহাকেও গোশত দেন না। পাক করাইয়া একসাথে সবাইকে খাওয়াইয়া দেন।

পাকের মশলার অভাবে অনেক গরীব গোশত বিক্রয় করিয়া দেয়। অথবা কোন রকম সিদ্ধ করিয়া খায়। তাই হুজুর খিচুড়ী ও গোশত খাওয়ান।

হুজুরের বাড়িতে একটা কুকুর থাকিত। এক টুকরা ভাল গোশত কুকুরটাকে নিজেই খাইতে দিলেন। বলিলেন, নাড়ি-ভুড়ি তো খাবেই। কিন্তু কোরবানীর গোশতের হিস্যা হিসাবে এইটা।

দুপুরে হাজার হাজার লোকের জমায়েত হইল। সবার হাতে কলাপাতা।

দশের হাতে শীগগীর পাকও হইয়া গেল। গরু খাসী যাহা পাক হইল সবই খাওয়ানো হইল।

আমরাও কিছু খাইতে পাইলাম বটে। রাত্রে অবিশ্বাস্য হইলে সত্য- হুজুর ও আমরা ডাল ভর্তায় ভাত খাইলাম।

খাইতে বসিয়া হুজুর বলিলেন, একটা ভুল হইয়া গেল রে। বাবুর মার (স্ত্রী) লাগি আমাদের কোরবানীর তরকারি তো রাখা হইল না।

তারপর নিজেই বলিলেন, ঠিক আছে, কাল নানান জায়গা তনে (থেকে) তো তরকারি আসবই।

হক কথা/২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৬

বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর আহমদ ছফার ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, প্রখ্যাত লেখক, সাহিত্যিক ও সংগঠক আহমদ ছফার ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ মঙ্গলবার। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী কীর্তিমান এ লেখক ২০০১ সালের ২৮ জুলাই অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যুবরণ করেন।

সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন আহমদ ছফা। গল্প, গান, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, ইতিহাস, ভ্রমণকাহিনী মিলিয়ে রচনা করেছেন ৩০টির বেশি বই। এ ছাড়া আমৃত্যু তিনি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় কলাম লিখেছেন।ষাটের দশকে সাহিত্য জগতে পা রাখেন আহমদ ছফা। সমসাময়িক উপন্যাস লেখকদের মধ্যে তিনি ছিলেন একেবারেই আলাদা। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয় আহমদ ছফার প্রথম উপন্যাস ‘সূর্য তুমি সাথী’। বক্তব্যের স্পষ্টতা আর তীব্রতার জন্য খুব দ্রুত পাঠকদের মধ্যে সাড়া ফেলেন তিনি। তার লেখা প্রবন্ধমূলক গ্রন্থগুলো সর্বাধিক আলোচিত। তার প্রবন্ধ গ্রন্থের মধ্যে জাগ্রত বাংলাদেশ, বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস, বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা, শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য প্রবন্ধ, বাঙালি জাতি এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য।

প্রতিষ্ঠানবিরোধী আহমদ ছফা ‘লেখক শিবির পুরস্কার’ এবং বাংলা একাডেমি প্রণীত ‘সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার’ প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৮০ সালে ‘ইতিহাস পরিষদ পুরস্কার’ ও ২০০২ সালে ‘মরণোত্তর একুশে পদক’-এ ভূষিত হন তিনি।

আহমদ ছফা ছিলেন একাধারে গল্পকার, ঔপন্যাসিক, কবি ও পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তিক নানান কর্মকান্ডের মাধ্যমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বাংলাদেশের জাতিসত্তার পরিচয়, সামাজিকতা, রাজনৈতিকতা তার লেখায় বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে। অনন্য বয়ানভঙ্গি ও সহজাত রসবোধে ছফার সাহিত্য ভাস্বর। নানা সময়ে, নানা প্রেক্ষিতে ছফা প্রাসঙ্গিক নানা চমকপ্রদ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কথা লিখেছেন যা উদ্ধৃতিযোগ্য।

“একটা মানুষের মধ্যেই গোঁজামিল থাকে। কিন্তু যে সাপ সে হান্ড্রেড পারসেন্ট সাপ। যে শেয়াল সে হান্ড্রেড পার্সেন্ট শেয়াল। মানুষ সাপও হইতে পারে, শেয়ালও হইতে পারে, পাখিও হইতে পারে। মানুষেরই বিভিন্ন চরিত্র নেয়ার ক্ষমতা আছে। বুঝছো, গ্রাম দেশে আগে সাপ আর শেয়াল পাওয়া যাইতো। এগুলা নাই এখন। কারণ সাপ, শেয়াল এরা মানুষ হিসাবে জন্মাইতে আরম্ভ করছে”।

নাসির আলী মামুনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ঠিক এই কথাগুলোই বলেন আহমদ ছফা।

সাবলীল ভাষায় লেখা এই সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয় ‘আহমদ ছফার সময়’ বইটিতে। খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল বইটি। কারণ বইয়ের মানুষটি যে ছিলেন সবার চোখের মণি।

সারাজীবন নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষের না বলা কথাগুলো বলে যাওয়া এই মানুষটি আজও মিশে আছেন তরুণ সমাজের প্রেরণায়, চেতনায়।

বাংলাদেশের সাহিত্য ইতিহাসের অন্যতম প্রতিবাদী এবং প্রগতিশীল লেখক আহমদ ছফা। ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। নিজের পরিবার সম্পর্কে বলেন,

“আমার পরিবার চাষা। আমার পক্ষে এটা ওভারলুক করা কষ্টকর, রঙ চড়িয়ে কিছু বলতে চাই না। আমার পূর্বপুরুষেরা সরাসরি কৃষি উৎপাদনের সাথে যুক্ত ছিল। এই পরিচয় আমার অহংকার”।  

সাদামাটা এই মানুষটি তাই সহজেই ছুঁয়ে গেছেন সবার হৃদয়। তার পিতার নাম হেদায়েত আলী ওরফে ধন মিয়া, মার নাম আসিয়া খাতুন। দুই ভাই চার বোনের মধ্যে আহমদ ছফা ছিলেন দ্বিতীয়।

বাবার হাতে গড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ গাছবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়ায় হাতেখড়ি হয় ছফার। ১৯৬০ সালে নিজের গ্রামের নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন তিনি। ১৯৬২ সালে চট্টগ্রাম নাজিরহাট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে সে বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন তিনি। যদিও সেখানে খুব বেশি দিন ক্লাস করেননি ছফা। খুব সম্ভবত ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে এমএ পরীক্ষা দেয়ার আগেই বাংলা একাডেমির পিএইচডি গবেষণা বৃত্তির জন্য আবেদন করেন এবং তিন বছরের ফেলোশিপ প্রোগ্রামের জন্য মনোনীত হন। গবেষণার বিষয় ছিল ‘১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব, বিকাশ এবং বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তার প্রভাব’।  ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন ছফা। পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করা আর সম্ভব হয়নি তার।

সৃষ্টিশীল এই লেখক শুরু থেকেই ছিলেন প্রথাবিরোধী। পড়াশোনা চলাকালীন অবস্থায় সুধাংশু বিমল দত্তের মাধ্যমে কৃষক সমিতি ন্যাপ বা তৎকালীন জনপ্রিয় গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। মাস্টারদা সূর্যসেনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করে আহমদ ছফাকে। কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন উপড়ে ফেলেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি গ্রেপ্তার এড়াতে এবং পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছুদিন আত্মগোপন করেন। এরপর ১৯৮৬ সালের দিকে এসে জার্মান ভাষার উপর গ্যেটে ইন্সটিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। গ্যেটের অমর সাহিত্য ‘ফাউস্ট’ অনুবাদের ক্ষেত্রে এটিই ছিল প্রথম সোপান।

ষাটের দশকে সাহিত্য জগতে পা রাখেন আহমদ ছফা। সমসাময়িক উপন্যাস লেখকগণের মধ্যে তিনি ছিলেন একেবারেই আলাদা। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয় আহমদ ছফার প্রথম উপন্যাস ‘সূর্য তুমি সাথী’। বক্তব্যের স্পষ্টতা আর তীব্রতার জন্য খুব দ্রুত পাঠকদের মাঝে সাড়া ফেলে দেন তিনি।

১৯৭১ সালের জুলাই মাসে স্বাধীনতার পথে হাঁটতে থাকা বাংলাদেশের প্রথম গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয় ছফার প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’। পরবর্তীতে বাংলা একাডেমি থেকে সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন তিনি। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, গান, প্রবন্ধ, অনুবাদ, ইতিহাস, ভ্রমণ কাহিনী সব মিলিয়ে ত্রিশটিরও বেশি গ্রন্থের প্রণেতা আহমদ ছফা। তার লেখাগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় নজরে পড়বে। প্রায় প্রতিটি লেখাই সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সমসাময়িক পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে।

বেশ কিছু পত্রিকার সাহিত্য পাতার সম্পাদক ছিলেন আহমদ ছফা। অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক গণকন্ঠ’ এর সম্পাদকীয় উপদেষ্টা এবং ‘সাপ্তাহিক উত্তরণ’ এর প্রধান সম্পাদক ছিলেন তিনি। স্পষ্টভাষী ছফা সত্যের প্রচারে সদা সচেষ্ট ছিলেন। তিনি খুব ধার্মিক ছিলেন এমন প্রমাণ পাওয়া না গেলেও ধর্মের প্রতি তার বিশ্বাস ছিল প্রশ্নাতীত।

১৯৭০ সালে আহমেদ শরীফের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’, তিনি ছিলেন সংগঠনটির প্রথম সভাপতি। তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল প্রগতিশীল লেখকদের আন্দোলনকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। ব্যক্তিত্বের ছটায় তরুণ প্রজন্মের কাছে খুব সহজেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন আহমদ ছফা। তবে কখনোই সস্তা খ্যাতির মুখাপেক্ষী ছিলেন না তিনি।

ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাবিদ হিসেবে আলাদা কদর ছিল তার। কাব্যিক ভঙ্গিমায় স্থানীয় ভাষায় ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি ফুটিয়ে তুলতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। গ্যোতের লেখার পাশাপাশি বার্ট্রান্ড রাসেলের অ্যাগনোস্টিক বা ঈশ্বরে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝামাঝি অবস্থা নিয়ে বেশ কিছু লেখাও অনুবাদ করেন তিনি। তবে প্রাবন্ধিক হিসেবেই আহমদ ছফার পরিচিতি সবচেয়ে বেশি।

বাংলার নামকরা চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন আহমদ ছফা। দুজনেই ছিলেন বোহেমিয়ান বা ভবঘুরে, অবিবাহিত এবং খ্যাতি, ধন-সম্পদ বা অন্যান্য বৈষয়িক মোহ বিবর্জিত। ১০০ বছরেও এমন ব্যক্তিত্ব আর দুটি খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আহমদ ছফা নিজেই।

“আমি মনে করি আমার স্বীকৃতি নিয়ে পশ্চিম বাংলা কী বলতে চায় সেটা আমার লুক আউট নয়। আমি পৃথিবীর গন্ধ এবং স্বাদ বুঝি। তুমি দেখবা আমি যখন আমেরিকায় যাবো তখন ওখানেও ঝড় তুলবো। তখন ওখানকার পন্ডিতদের সাথে দেখবে আমি কিভাবে মিশে গেছি। সুলতানের বিশালত্ব চিন্তা করো, ৭৬-এর আগে এই জায়ান্ট কোথায় ছিলো? কেউ তাকে আবিস্কার করলো না কেন? এই আমি যাকে প্রেজেন্ট করেছি, আরেকজন লোক আসুক তো এমন।

‘আহমদ ছফার সময়’ বইটিতে এমনটাই বলেছিলেন তিনি। তার চোখে সুলতানও ছিলেন একজন দার্শনিক। বাংলার মাটির প্রতীক তিনি, বাংলার মাটির যোগ্য সন্তান তিনি। আমাদের চারপাশে ঘিরে থাকা খুঁটিনাটি সমস্যাগুলোই ছিল তার শিল্পের খোরাক। শিল্প-সংস্কৃতির জগতে তাকে সাহায্য করতে কেউ এগিয়ে আসেনি।

আহমদ ছফা মনে করতেন এই বাংলায় সুলতানকে আরও বেশি দরকার। জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসানরাও বড় শিল্পী, ভদ্রলোক। তবে খেটে খাওয়া মানুষের কাছে শিল্পের জায়গা করে দিতে হলে সুলতানদের কোনো বিকল্প নেই বলেই তিনি বিশ্বাস করতেন।

সাধারণত ছোট ভলিউমে বই বের করতেন আহমদ ছফা। এই ছোট বইগুলোই চট করে পাঠকদের মনে জায়গা করে নিতো, কেননা তাতে থাকতো গণমানুষের কষ্টের প্রতিফলন, তাদের জীবনের দুর্দশার চালচিত্র। ‘সূর্য তুমি সাথী’ (১৯৬৭), ‘উদ্ধার’ (১৯৭৫), ‘একজন আলী কেনানের উত্থান পতন’ (১৯৮৯), ‘অলাতচক্র’ (১৯৯০), ‘ওঙ্কার’ (১৯৯৩), ‘গাভীবিত্তান্ত’ (১৯৯৪), ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’ (১৯৯৬), ‘পুষ্পবৃক্ষ ও বিহঙ্গপুরাণ’ (১৯৯৬) আহমদ ছফার উপন্যাস এবং ‘নিহত নক্ষত্র’ (১৯৬৯) তাঁর গল্পগ্রন্থ। কবিতার ক্ষেত্রেও সমুজ্জ্বল আহমদ ছফা। ‘জল্লাদ সময়’, ‘একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা’, ‘লেনিন ঘুমোবে এবার’ ইত্যাদি একাধিক কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা তিনি।

অনুভূতির প্রত্যক্ষ প্রকাশ, লোকজ ভাষার ব্যবহার, পুঁথিপুরাণের শব্দ প্রয়োগ ও বাক্যরীতির সঠিক চয়নে তার কবিতাগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আহমদ ছফার অন্যতম জনপ্রিয় একটি বই ‘যদ্যপি আমার গুরু’।

১৯৭০ সালে গবেষণার কাজ করতে গিয়ে জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সান্নিধ্যে আসেন তিনি। তাদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্কের ভিত্তিতে দেশবরেণ্য এই বুদ্ধিজীবীকে নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বই লেখেন ছফা। রাজ্জাক ছিলেন চিন্তাবিদ, দার্শনিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তৎকালীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু তুলে ধরেন আহমদ ছফা। নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের লেখায় আহমদ ছফার প্রভাব রয়েছে।

ছফার ‘সূর্য তুমি সাথী’ বইটি হাতে পাওয়ার পর পাঠকরা মুগ্ধ হয়ে ভাবে, বহুদিন পর তারা এমন একজন লেখক খুঁজে পেয়েছেন যে তাদের মনের কথাগুলো ছাপার হরফে তুলে ধরতে জানে। ছফা কেবলমাত্র তা-ই লিখতেন যা তিনি নিজে বিশ্বাস করতেন। ভান ধরা বা কোনো কিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি করা তিনি একদম পছন্দ করতেন না। আমাদের দেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য লিখতেন তিনি, তাদের প্রতিনিধিত্ব করেই লিখতেন তিনি। লেখালেখি ছিল তার নেশা।

ছফার গভীর চিন্তাশীলতার প্রতিফলন ঘটেছে তার দুটি উল্লেখযোগ্য রচনা ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ (১৯৭৩) ও ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ (১৯৭৬) গ্রন্থে। এ দুটি বিশেষ চিন্তামূলক রচনাসহ দেশ, সমাজ ও রাজনীতিবিষয়ক নিবন্ধাবলি ছফাকে বাংলাদেশের  বুদ্ধিজীবী লেখকের মর্যাদাপূর্ণ আসন দিয়েছে। এতকিছু সত্ত্বেও আরাম-আয়েশের জীবন তাকে কখনোই টানতে পারেনি। খুব সাধারণ আর চাকচিক্যহীনভাবে দিন কাটাতেন ছফা। দীর্ঘকাল যাবত তিনি একটি মাত্র ঘরে থাকতেন যার মধ্যে আসবাব বলতে ছিল শুধু একটি খাট, চেয়ার, টেবিল আর বইয়ের তাক।

‘লেখক শিবির পুরস্কার’ এবং বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রণীত ‘সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার’ প্রত্যাখ্যান করেন ছফা। ১৯৮০ সালে ‘ইতিহাস পরিষদ পুরস্কার’ এবং ২০০২ সালে ‘মরণোত্তর একুশে পদক’ এ ভূষিত হন আহমদ ছফা। তার বেশ কিছু বই বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। ২০০১ সালের ২৮ জুলাই অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে নেয়ার পথে মৃত্যুবরণ করেন ৫৮ বছর বয়সী ছফা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে জানাজা শেষে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে দাফন করা হয় বাংলার কালজয়ী এই সাহিত্যিককে।

তার সাহিত্যকর্মের দ্বারা বিশেষত তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। এই একটি লেখায় তার পুরো জীবনী তুলে ধরা প্রায় অসম্ভব। আহমদ ছফার মতো প্রতিভাবানদের জীবনী নিয়েই লেখা যায় যুগ পাল্টে দেয়ার মতো শক্তিশালী সব সাহিত্য।

(স্টাফ রিপোর্টার, ঘাটাইল ডট কম)/-

ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) জন্মকথা

উপমহাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন রাজনৈতিক সংগঠন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) ৬৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ছিল গতকাল ২৬ জুলাই।

১৯৫৭ সালের ৬-১০ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারিতে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং আওয়ামী লীগ নেতা ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে বিশেষ করে সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থ রক্ষার স্যান্টো ও সিয়েটা চুক্তি নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়।

এ প্রশ্নে দলের ডানপন্থী পাতি বুর্জোয়া নেতা-কর্মীরা সোহরাওয়ার্দীর পক্ষাবলম্বন করেন এবং বামপন্থী অংশ মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে স্বাধীন ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি এবং পূর্ব পাকিস্তানের সর্বাধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলেন। ফলে আওয়ামী লীগ আদর্শিক কারণে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

ঐ বছর ১৮ মার্চ মওলানা ভাসানী পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ ত্যাগ করেন। আওয়ামী লীগের বামপন্থী এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবিদার অংশের উদ্যোগে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে ২৫-২৬ জুলাই গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

এ সম্মেলনে পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হয়।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে কেন মওলানা ভাসানী এই কর্মী সম্মেলনের আয়োজন করলেন কিংবা কেনই বা তিনি আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে নতুন দল গড়ার দিকে মনোনিবেশ করলেন?

অনেকেই এর কারণের গভীরতায় না গিয়ে ঢালাওভাবে তার দল ত্যাগের সমালোচনা করে থাকেন।

এ প্রসঙ্গে কবি বুলবুল খান মাহবুব তার মওলানা ভাসানী- অনন্য ব্যতিক্রম নিবন্ধে লিখেছেন:

“মওলানা ভাসানীর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি প্রায় সব সময়েই কোন না কোন পার্লামেন্টারি দলের সঙ্গে সংযুক্ত থেকেছেন। কিন্তু কখনই জনতার স্বার্থের চেয়ে দলের স্বার্থ তার কাছে বড় হয়ে দেখা দেয়নি। তাই যে মুহূর্তে তার দল ক্ষমতার মোহে জনতার স্বার্থের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে সেই মুহূর্তেই তিনি তার প্রাণ প্রিয় সংগঠনকে ছিন্ন বস্ত্রের ন্যায় ত্যাগ করতে দ্বিধা করেননি। এই দল ত্যাগের ব্যাপারে মওলানা ভাসানীর সমালোচকরা বলে থাকে তিনি বার বার দল ত্যাগ করেন।

কিন্তু এই বুদ্ধিমানদের কাছে আমার জিজ্ঞাস্য, কোন মুহূর্তে তিনি দল ত্যাগ করেছেন?

দেখা গেছে যে সংগঠনকে গড়ে তুলতে এই মজলুম নেতা তাঁর দিন-রাত্রির আরামকে কোরবানি করে গ্রামে গঞ্জে ঘুরে বেড়িয়েছেন, সভা সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সংগঠনের প্রাণ সঞ্চার করেছেন- সেই সংগঠনের চরম দুর্দিনে তিনি কি দল ত্যাগ করেছেন? নিশ্চয়ই নয়।

বহু বছরের ত্যাগের বিনিময়ে ক্ষমতা দখলের পর সংগঠনের সুদিনে যখন একটু অবসর নেয়ার পালা সেই মুহূর্তে জনতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিবাদে আবার নতুন করে জনতার দাবি নিয়ে তাকে নতুন বিরোধীদলের জম্ম দিতে হয়েছে।

বহু তথাকথিত দেশপ্রেমিক নেতার ক্ষেত্রে দেখা গেছে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে যে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিজের জীবনে বারবার লাঞ্ছনা ভোগ করেছেন দীর্ঘদিন সংগ্রামের পর ক্ষমতা দখল করে অতীতের অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করে জনতা এবং তার বিরোধীদের উপর তিনি তার পূর্বসুরীদের একই কায়দায় অত্যাচার চালাচ্ছেন।

মওলানা ভাসানী তার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এই কপটতাকে স্বীকার করতে পারেননি- জনগণ এবং তাদের সুখ-দুঃখ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারেননি বলেই তাকে দু’তিনবার নিজের হাতে গড়া সংগঠন ত্যাগ করতে হয়েছে।

নিজের দীর্ঘ দিনের দুঃসময়ের সহকর্মীরা যখন ক্ষমতায় গিয়ে জনতার কথা ভুলে গেছে তখন নিজের হাতে গড়ে তোলা কর্মীদের ত্যাগ করে নতুন কর্মী সৃষ্টি করার কাজে নতুন করে আত্মনিয়োগ করেছেন।”

স্মরণ করা যেতে পারে মওলানা ভাসানীর আসাম জীবনের কথা। সেখানেও তিনি মুসলিম লীগকে প্রতিষ্ঠিত করে ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন। স্যার সাদুল্লাহকে আসামের প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সাদুল্লাহ যখন তার ঘোষিত অঙ্গিকার থেকে সরে যেতে থাকলেন ভাসানী তখন সংসদে ও সংসদের বাইরে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। জনতার স্বার্থে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন।

এরপর যে পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য একদিন তিনি আন্দোলনে আন্দালন সংগ্রাম করেছেন; সেই পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৮ সালের ১৭ মার্চ বাজেট অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যের প্রতিবাদে তিনি নিজ দলের বিরুদ্ধে আঙুল তুলে বলেছেন, আমরা কি সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের গোলাম?

মুসলিম লীগ সরকারের অপকীর্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পাকিস্তানের প্রথম বিরোধীদল আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তরুণ শেখ মুজিবকে সাথে নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে, হাটে-বাজারে, শহরে-বন্দরে উল্কার মতো ছুটে বেড়িয়েছেন।

মুসলিম লীগ সরকারের জেল জুলুম অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করে সদ্য প্রতিষ্ঠিত দলটিকে প্রদেশব্যাপী জনপ্রিয় করেছেন। ‘৫২-র ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এটা সেই সময় যখন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে কথা বলাকে আল্লাহর নাফরমানী বলে প্রচার করা হতো।

১৯৫৫ সালের ২১ অক্টোবর তারিখে দলের কাউন্সিল অধিবেশনে দলটিকে অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘আওয়ামী লীগ’ নামকরণ করেছেন।

আওয়ামী লীগে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অন্তর্ভুক্তি একদিকে যেমন দলকে শক্তিশালী করেছে; অন্যদিকে দলের প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ থেকে বিচ্যুতিও ঘটিয়েছে। যার প্রকাশ ঘটতে থাকে ‘৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়লাভের পর থেকে।

নির্বাচনের পূর্বে যুক্তফ্রন্টের দেয়া ২১ দফার প্রতি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই জনগণের মোহভঙ্গ ঘটে। এমতাবস্থায়, যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করলেও নিজেদের অর্ন্তদ্বন্দ্ব আর অন্তঃকলহের কারণে ৩০ মে মওলানা ভাসানীর অনুপস্থিতিতে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল  হক মন্ত্রীসভাকে বরখাস্ত করে পূর্ববাংলায় গভর্নরের শাসন প্রবর্তন করে।

এসময় বিশ্বশান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য লন্ডনে অবস্থানরত মওলানা ভাসানী সাংবাদিক সম্মেলন করে তীব্র ভাষায় এর প্রতিবাদ করেন। এরপর অনেক পানি ঘোলা করে সোহরাওয়ার্দী কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী হয়েই তার বিখ্যাত ‘জিরো প্লাস জিরো ইকুয়েল টু জিরো’ থিউরি দিলেন।

ঘোষণা করলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী হওয়া মানে পূর্ব পাকিস্তানের ৯৮% স্বায়ত্বশাসন লাভ হয়ে গেছে’।

এসময় ক্ষমতাসীনরা দল এবং ২১-দফার আদর্শ উদ্দেশ্য বিরোধী গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দফার প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করতে থাকলে মওলানা ভাসানী প্রকাশ্যেই তার সমালোচনা শুরু করেন।

এহেন পরিস্থিতিতে মওলানা ভাসানী ১৯৫৭ সালের ৬, ৭, ৮, ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি কাগমারীতে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন এবং একই সাথে এক সাংস্কৃতিক সম্মেলন আহ্বান করেন। কেন্দ্রে ও প্রদেশে তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়।

৭ ফেব্রুয়ারির কাউন্সিল অধিবেশনে ভাসানী স্বায়ত্বশাসন, পশ্চিম পাকিস্তানে এক ইউনিট চালু; বিশেষ করে বৈদেশিক নীতির প্রশ্নে প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর তীব্র সমালোচনা করেন।

এরপর থেকে ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী দ্বন্ধ প্রকট হতে থাকে। একই সম্মেলনে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানিয়ে একদিকে যেমন ভাঙনের আওয়াজ তোলেন; অন্যদিকে সাংস্কৃতিক  সম্মেলনে পর্বে তিনি নতুন একটি দেশের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক চেহারার স্বরূপ উন্মোচন করেন। রূপক অর্থে এ যেন ইংরেজ কবি শেলীর ‘Destroyer’ & preserver’ তত্ত্বের সাথে তুলনীয়।

কাগমারী সম্মেলনের পূর্বাপর দৈনিক ইত্তেফাক বিশেষ উস্কানীদাতার ভূমিকা পালন করতে থাকে। সোহরাওয়ার্দীপন্থীরা মওলানা ভাসানীকে ভারতের লেলিয়ে দেয়া কুকুর বলে আক্রমণ করে।

অথচ এই সোহরাওয়ার্দীকেই একদিন মওলানা ভাসানী দলে টেনেছিলেন। তার উল্লেখ পাওয়া যায় শেখ মুজিবুর রহমান এর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে।

এই গ্রন্থের ২১৬ পৃষ্ঠায় শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দীকে উল্লেখ করে লিখেছেন, আমি তাকে জানালাম, “আপনি জিন্নাহ আওয়ামী লীগ করেছেন, আমরা নাম পরিবর্তন করতে পারব না। কোনো ব্যক্তির নাম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগ করতে চাই না। দ্বিতীয়ত আমাদের ম্যানিফেস্টো আছে, গঠনতন্ত্র আছে, তার পরিবর্তন করা সম্ভবপর নয়। মওলানা ভাসানী সাহেব আমাকে ১৯৪৯ সালে আপনার কাছে পাঠিয়েছিলেন।

তখনও তিনি নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ গঠনের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তারও কোনো আপত্তি থাকবে না, যদি আপনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টো ও গঠনতন্ত্র মেনে নেন।”

এখানে একটি ব্যাপার উপলব্ধি করতে হবে যে, মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে নয়; সুসময়ে দল ছেড়েছেন। যে দলটির তিনি শুধু প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিই নন, দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে তিনি এই দলটিকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সকল অঞ্চলে সকল সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য করে গড়ে তুলেছিলেন।

সেই দল পরিত্যাগ করার সময় তিনি মানসিকভাবে আঘাত পেয়েছিলেন বৈকি! কিন্তু আদর্শের কাছে আপোষ করা তার ধাতে ছিল না। তাই তিনি ‘৫৭ সালের ১৮ মার্চ অলি আহাদের মাধ্যমে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান বরাবর এক পদত্যাগ পত্র পেশ করেন।

সপ্তাহখানেক পর ২৬ মার্চ আওয়ামী লীগ কর্মী ও দেশবাসীর প্রতি আবেদন শিরোনামে এক প্রচারপত্রে তিনি বলেন, ‘২১-দফা দাবি আদায়ের জন্য সারা দেশময় আন্দোলন করুন।’

এই প্রচারপত্র এটাই প্রমাণ করে যে তখনও তিনি আওয়ামী লীগ ছাড়েন নাই। কিন্তু ৩০ মার্চ ৫৬ সিম্পসন রোডে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাহী পরিষদের এক জরুরি সভায় বহিস্কার-পাল্টা বহিস্কার প্রশ্নে দল ভেঙে যাওয়ার সমস্ত আয়োজন প্রায় সম্পন্ন হয়ে যায়।

যদিও শেখ মুজিবুর রহমান ভাসানীকে তাঁর পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের জন্য জোরালো অনুরোধ জানান।

একই বছর ১৩-১৪ জুন ঢাকার ‘শাবিস্তান’ প্রেক্ষাগৃহে ফের আওয়ামী লীগ নির্বাহী পরিষদের অধিবেশন বসে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেকের অনুরোধে মওলানা ভাসানী কিছুক্ষণের জন্য সভায় উপস্থিত হন।

কিন্তু “ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শয্যা থেকে আগত অসুস্থ নেতা মওলানা ভাসানীকে ‘ভারতের দালাল মুর্দাবাদ’ জাতীয় অশালীন শ্লোগানের মাধ্যমে অপমান করা হয়, তাকে স্বচ্ছন্দে বলতে দেয়া হয়নি এবং ফলে তিনি দ্রুত ভাষণ ‘শেষ’ করেই ফিরে গিয়েছিলেন হাসপাতালে।”

এরপর ‘৫৭-র ২৪ জুলাই ভাসানী আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্কের পরিসমাপ্তি ঘটান।

এবার ‘নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন’ প্রসঙ্গে আসা যাক।

‘৫৭-র ২৫ জুলাই মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে সম্মেলন আরম্ভ হয় একদিকে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা অন্যদিকে হুমকি ও ভয়ভীতির মধ্য দিয়ে। সম্মেলনে ভাসানী তার দীর্ঘ লিখিত ভাষণে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে নতুন দল গঠনের প্রেক্ষিত বর্ণনা করেন।

কৃষিপ্রধান পাকিস্তানের কৃষকদের সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার দশ বছর পরও দেশের কৃষক সমাজ স্বাধীনতার কোনো আস্বাদন পায় নাই। তারা আজ ভুখা।’

শ্রমিকদের শোষণের বিরুদ্ধে সরকারের নিন্দা করে তিনি বলেন, ‘শ্রমিকরা নূন্যতম মজুরি থেকে বঞ্চিত, তারা কোনো আন্দোলন করতে গেলে তাদের ওপর নেমে আসে অবর্ণনীয় নির্যাতন। প্রশাসনে ব্যাপক দুর্নীতি।’

তিনি তার ভাষণে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন, পররাষ্ট্রনীতি ও বৈদেশিক সাহায্য সম্পর্কেই তিনি বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বস্তুত সরকারের সঙ্গে মনোমালিন্যের সেটাই ছিলো মুখ্য কারণ।

সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তান হতে যোগ দিয়েছিলেন পাক-ভারত স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপকথার নায়ক সীমান্ত প্রদেশের লালকোঠা নেতা সীমান্ত গান্ধী খান আবদুল গাফফার খান, পাঞ্জাবের জননেতা মিয়া ইফতেখার উদ্দিন, সিন্ধুর জননেতা ঝানু পার্লামেন্টারিয়ান জিএম সৈয়দ, পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হক ওসমানী, বেলুচিস্তানের আবদুস সামাদ খান আচাকজাই, খান আবদুল ওয়ালী খান, পাঞ্জাবের মেজর ইসহাক, ব্যারিস্টার মিয়া মাহমুদ আলী কাসুরী, আফজল খান, প্রিন্স আবদুল করিম, গাউস বকস বেজেঞ্জো, খায়ের বকশ মারী, আতাউল্লাহ খান মেঙ্গল, আবরার আবদুল গফুর, আবরার সেকেন্দর খান, গোলাম মোহাম্মদ লেঘারী, হাশিম খান গিলয়াই, এয়ার কমান্ডার জানজুয়া, আবদুল মজিদ সিন্ধী প্রমূখ।

যে সকল নেতাকর্মী সম্মেলন সফল করতে নিরলস ভূমিকা রেখেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ, মোহাম্মদ তোয়াহা, মোজাফ্ফর আহমদ, মহিউদ্দিন আহমদ, পূর্ণেন্দু দস্তিদার, সৈয়দ আলতাফ হোসেন, চৌধুরী হারুন-উর রশীদ, পীর হাবিবুর রহমান, অলি আহাদ, দেওয়ান মাহবুব আলী, আতাউর রহমান, বেগম সেলিনা বানু, মণিকৃষ্ণ সেন, কাজী মোহাম্মদ ইদরিস, আবু জাফর শামসুদ্দিন, হাতেম আলী খান, মোহাম্মদ সুলতান, শওকত আলী খান, ইয়ার মোহাম্মদ খান, ডাঃ আবদুল করিম, অধ্যাপক মফিজুল ইসলাম, মাহমুদ আলী, মোখলেসুর রহমান, মীর্জা গোলাম হাফিজ, খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, সাইদুল হাসান, নুরুল হক চৌধুরী, সলিমুল হক খান মিল্কি, আবদুল মোত্তাকিম চৌধুরী, আবদুস সামাদ আজাদ প্রমূখ।

সম্মেলনে উপস্থিত রণেশ মৈত্রের ভাষায়, দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচীতে “পিনপতন নিরবতার মধ্যে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্মেলন অগ্রসর হতে থাকলো, তর্ক-বিতর্কও চললো। দলের নাম, দলীয় পতাকা (সবুজ এবং লাল কাপড়ে- লাল অংশে পাকিস্তানের পাঁচটি প্রদেশের স্মারক হিসেবে পাঁচটি সাদা তারকা খচিত), ঘোষণাপত্র, গঠনতন্ত্র,  দু’টি কমিটির নির্বাচন সম্পন্ন হলো বিকেল তিনটে সাড়ে তিনটে নাগাদ।

সেদিন আসলেই এক অভূতপূর্ব প্রাণবন্যা পরিলক্ষিত হয়েছিলো পাকিস্তানের সকল প্রদেশ ও অঞ্চল থেকে আগত নেতা ও কর্মীদের মধ্যে। হলটি বারবার ফেটে পড়েছিলো মুহুর্মুহু করতালি ও গগণবিদারী শ্লোগানের মধ্যে।

প্রতিনিধি সম্মেলনের কাজের সমাপ্তি ঘোষণা করার সাথে সাথে রূপমহল সিনেমা হলের সামনে সকলকে সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়াতে বলা হলো।

পূর্ব পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দসহ সমবেত সকল প্রতিনিধি স্বেচ্ছাসেবক ও কর্মী মিছিল করে যাবেন ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে জনসভা করতে।

যেভাবে বলা হলো, সেভাবেই মুহূর্তের মধ্যে সকলে প্রস্তুতি নিয়ে ফেললো।

গগণবিদারী শ্লোগান, করতালি ও নতুন পার্টি “ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি জিন্দাবাদ”, “মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক”, “পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন দিতে হবে”, “পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিট বাতিল করো”, “মাশরেকী ঔর মাগরেবী পাকিস্তান কি আওয়াম কি ইত্তেহাদ”, (পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ঐক্য জিন্দাবাদ) প্রভৃতি ধ্বনিতে মুখরিত হলো এই ঐতিহাসিক মিছিল, যার সামনের সারিতে ছিলেন মওলানা ভাসানী, খান আবদুল গাফ্ফার খান প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।”

পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি বৃহত্তর উদারনৈতিক দল হিসেবে জন্ম নিলো ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- সংক্ষেপে ন্যাপ।

পরদিন দৈনিক সংবাদ এর প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিলো এরুপঃ ‘পাকিস্তানের উভয় অংশের গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের সমন্বয়ে পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নামে নয়া রাজনৈতিক দল গঠিত। ঢাকায় অনুষ্ঠানরত গণতান্ত্রিক সম্মেলনের অভূতপূর্ব সাফল্যঃ বার শতাধিক প্রতিনিধির সমাবেশে জাগ্রত জনমতের অভিব্যক্তি।’

নবগঠিত দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন যথাক্রমে মওলানা ভাসানী ও মাহমুদুল হক উসমানী।

এছাড়া পূর্ব পাকিস্তান কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে মওলানা ভাসানী ও মাহমুদ আলী এবং পশ্চিম পাকিস্তান কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে খান আবদুল গাফ্ফার খান ও মাহমুদ আলী কাসুরী নির্বাচিত হন।

পার্টির নীতি ও আদর্শ ছিল অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। চূড়ান্ত লক্ষ্য সমাজতন্ত্র।

১৯৭১ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি সন্তোষ দরবার হলে ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান সর্বদলীয় সম্মেলন’ উপলক্ষে এক প্রতিনিধি সম্মেলনে দেশের ইতিহাস, আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণ পূর্বক স্বাধীনতার স্বপক্ষে যুক্তি প্রদর্শণ করে জনগণ এখন স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত বলে টানা ছয় ঘন্টা বক্তৃতা করেন।

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর ৯ মার্চ পল্টনের জনসভায় তিনি জনগণকে প্রত্যক্ষ স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপাইয়া পরার আহ্বান জানিয়ে ১৪ দফা দাবীনামা পেশ করেন।

২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের নামে নিরীহ বাঙ্গালির উপর শুরু করে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ। ২৬ মার্চ শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতা যুদ্ধ।

১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল হানাদার বাহিনী টাঙ্গাইলে প্রবেশ করে এবং ৪ এপ্রিল মওলানা ভাসানীর খোঁজে সন্তোষে প্রবেশ করে তার বসত বাড়ি ও দরবার হলে আগুন ধরিয়ে দেয়। সন্তোষে তাঁকে না পেয়ে তারা ৬ এপ্রিল মাইল দুয়েক পশ্চিমে বিন্যাফৈর গ্রাম আক্রমণ করে এবং স্ট্রেচার বুলেট দিয়ে দূর থেকে তার বিন্যাফৈরের বাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেয়।

এর আগে তিনি বিন্যাফৈরের বাড়িতে তাঁর রাজনৈতিক কর্মীদের নিয়ে যুদ্ধের ‘পরিকল্পনা নির্ধারণী সভা’করছিলেন। সেখানে তিনি তাঁর কর্মীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, “জনবল আছে, শুধু অস্ত্র চাই।”

সভা চলাকালীণ সময়ই তিনি হানাদারদের উপস্থিতি টের পান এবং গান পয়েন্টে এগিয়ে আসা হানাদার বাহিনীর ফাঁক-ফোকর গলিয়ে চাদর মুরি দিয়ে সেখান থেকে সরে পরতে সক্ষম হন।

১৫-১৬ এপ্রিল ধলেশ্বরী-যমুনা হয়ে রৌমারীর নামাজের চর সীমান্ত দিয়ে তিনি ভারতে প্রবেশ করেন। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করলে তিনি এই সরকারকে সমর্থন দান করেন।

তথাপি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দুই মাস বাঙ্গালি নেতাদের মধ্যে মওলানা ভাসানীর বক্তৃতা বিবৃতি সাক্ষাৎকারই ভারতের পত্র পত্রিকায় সবচেয়ে গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়েছে।

২৩ এপ্রিল আনন্দবাজার পত্রিকায় তাঁর একটি ঐতিহাসিক বিবৃতি গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়।

এতে তিনি বলেন, “বর্তমান দুর্যোগের মুহুর্তে মানবজাতির কাছে বাংলাদেশের জ্বলন্ত প্রশ্ন: বর্বর পশুশক্তির কাছে কি ন্যায়সঙ্গত মহান সংগ্রাম চিরতরে নিষ্পেষিত হবে?”

বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দান এবং গণহত্যা বন্ধের অনুরোধ জানিয়ে তিনি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানকে তারবার্তা পাঠান। যার মধ্যে ছিলেন চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুং ও প্রধানমন্ত্রী চৌএনলাই, রুশ কমিউনিষ্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক লিওনিড ব্রেঝনেভ, সুপ্রিম সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগোর্নি ও প্রধানমন্ত্রী আলেস্কি কোসিগিন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন, ফরাসী প্রেসিডেন্ট জর্জ পম্পিডু, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডোয়ার্ড হীথ, জুগোস্লাভ প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো, মিশরীয় প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সা’দাত, আরব লীগ সেক্রেটারি ডিলাল্লো তেলি প্রমুখ।

সেসব তারবার্তা ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় ফলাও করে ছাপানো হয়। যেমন নিক্সনকে লেখা চিঠিতে তিনি বলেন, “আর অস্ত্র দেবেন না।”

১৬ মে আনন্দবাজার পত্রিকা ‘ইয়াহিয়া খাঁকে ভাসানীর চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে একটি বড় প্রতিবেদন ছাপায়।

৮ জুন আনন্দবাজার লেখে, ‘লক্ষ প্রাণের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতা আসবে-মওলানা ভাসানী।’

‘Sovereign Bangladesh is the’ শিরোনামে দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরদের সর্তক করে দেন।

১৯৭১ সালের ২৪ জুন এক বিবৃতিতে মওলানা ভাসানী বলেন, “জীবনের সব সম্পদ হারিয়ে, নারীর ইজ্জত বিকিয়ে, ঘরবাড়ি হারিয়ে, দেশ থেকে বিতারিত হয়ে এবং দশ লক্ষ অমূল্য প্রাণ দান করে স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণ রাজনৈতিক মীমাংশার নামে ধোঁকাবাজি কিছুতেই গ্রহণ করবে না। তাদের একমাত্র পণ হয় পূর্ণ স্বাধীনতা, না হয় মৃত্যু। এর মধ্যে গোজামিলের কোন স্থান নাই।”

এ সময় প্রবাসী সরকারের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সিআইএ-র চক্রান্ত ক্রমেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। পাকিস্তানও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেবল একদলীয় যুদ্ধ বলে আন্তর্জাতিক মহলে প্রচারণাকালে মুক্তিযুদ্ধকে একটি সর্বদলীয় রূপ দিতে ভাসানী-তাজউদ্দিনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ৭১’র ৯ সেপ্টেম্বর পাঁচটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে প্রবাসী সরকারের ‘উপদেষ্টা পরিষদ’গঠিত হয়।

৮ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা ভাসানী। কলকাতার হাজরা স্ট্রীটে অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম বৈঠকে মওলানা ভাসানী কোন রকম আপস চক্রান্তের বিরুদ্ধে হুশিয়ারী উচ্চারণ করে ‘সাত দফা’ প্রস্তাব গ্রহণ করেন।

এর আগে ৩০-৩১ মে কলকাতার বেলাঘাটায় প্রবাসী বামপন্থী রাজনীতিবিদদের দু’দিনব্যপী এক সম্মেলন শেষে ০১ জুন মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় কমিটি’। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে নভেম্বর মাসে দেরাদুনে অবস্থানকালে অসুস্থ হয়ে পড়লে ভারত সরকার তাঁকে ‘অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস’-এ চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের জন্য অনুরোধ করেন।

৩ ডিসেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হলে হাসপাতাল থেকে তাকে দিল্লীর উপকন্ঠে একটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। দেশে ফেরার পূর্ব পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন।

১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।

লেখক: আজাদ খান ভাসানী, সভাপতি, মওলানা ভাসানী কৃষক সমিতি; সাধারণ সম্পাদক, ভাসানী পরিষদ-মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

সূত্র:

*সৈয়দ আবুল মকসুদ, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী

*আবু জাফর শামসুদ্দিন, কাগমারী সম্মেলন ও ন্যাপ গঠন প্রসঙ্গ

*বদরুদ্দীন উমর, কাগমারী সম্মেলনের ৫০ বছর পূর্তি ও বর্তমান বাংলাদেশ

*অধ্যাপক কে এ এম সা’দউদ্দিন, কাগমারী সম্মেলনঃ আগে ও পরে

*মহসিন শস্ত্রপাণি, কাগমারী সম্মেলনঃ পরিপ্রেক্ষিত ও তাৎপর্য

*শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী

*জাতীয় নেতা মওলানা ভাসানী-জীবন ও সংগ্রাম, শাহ আহমদ রেজা

*বাংলাদেশে ভাসানী ন্যাপের রাজনীতি, শামিমা আকতার লিপি।

*নজমুল হক নান্নু, ইতিহাসের ধারায় মওলানা ভাসানী

*আমজাদ হোসেন, মওলানা ভাসানীর জীবন ও রাজনীতি

তাজউদ্দিন আহমেদের জন্মদিন ও কিছু তথ্য

বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ৯৫ তম জন্মবার্ষিকী আজ। তিনি ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই গাজীপুরের কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

তার পিতা মৌলভি মুহাম্মদ ইয়াসিন খান ও মাতা মেহেরুন্নেসা খানম। তারা ছিলেন ছয় বোনের মধ্যে চার ভাই। তার মাঝে তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন চতুর্থ।

তাজউদ্দীন আহমদ ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তিনি মুক্তিযুদ্ধকে সফল সমাপ্তির দিকে নিয়ে যেতে অসামান্য অবদান রাখেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকারে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর দায়িত্ব পান তাজউদ্দীন। পরে ১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাজউদ্দীন আহমদকে গ্রেপ্তার করা হয়। কারাবন্দি থাকার সময়ে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে তাঁকে হত্যা করা হয়।

তাজউদ্দিনের সম্পর্কে কিছু তথ্য ঘাটাইল ডট কম পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল:

১।

বেসিক্যলি তাজউদ্দিন সাহেব রুশপন্থী বাম ছিলেন ।

এই ব্যাপারে কমরেড তোয়াহা বলেন , তাজউদ্দীন পূর্বাপর কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন ।

যদিও তাজউদ্দীন বাহ্যত: আওয়ামী লীগ করতেন কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমাদের সাথেই জড়িত ছিলেন ।

পার্টির সিদ্ধান্তেই তাকে আওয়ামী লীগে রাখা হয় ।

(পাক্ষিক তারকালোক পত্রিকা, ১৫-৩০ ডিসেম্বর ’৮৭)

২।

“একবার সম্ভবত: ‘৬২ সালের দিকে তিনি জেল থেকে বের হয়ে আমাদের বললেন ‘আর ছদ্মনামে (অর্থাৎ আওয়ামী লীগে) কাজ করতে আমার ভালো লাগছে না। আমি নিজ পার্টিতেই কাজ করবো ।’

তখন কেউ কেউ মনে করলো, ‘থাক না আমাদের একজন আওয়ামী লীগে আছে , সেখানেই কাজ করুক না ।’

পরে অবশ্য পার্টিতে এ নিয়ে আলোচনাও হয়েছিল কিন্তু তাজউদ্দীনকে প্রত্যক্ষভাবে পার্টিতে নেয়া হয়নি।

আমার মতে সেটা ছিল ভুল সিদ্ধান্ত।

তবে তাজউদ্দিন আওয়ামী লীগে থেকেও আমাদের জন্য কাজ করেছেন । আওয়ামী লীগের সব তথ্য আমাদের সরবরাহ করেছেন।

ইন্ডিয়াতে গিয়ে অসম-চুক্তি করার পরই তার মাঝে একটা বিক্ষিপ্ত ভাব এসে যায় । এরপর তিনি কিছুটা যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন ।

তবে , বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর যখন আমরা তাকে তাঁবেদার সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনে করতাম, তখনও তিনি আমাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। (বারান্দার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে) প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে একবার এ বারান্দায় বসে আমার সাথে আলাপ করে গেছেন।

ভুল-শুদ্ধ যখন যা করেছেন সবই এসে আমাদের কাছে অকপটে বলেছেন। ”

(তথ্যসূত্রঃ ভাষা আন্দোলন : সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন / মোস্তফা কামাল)

৩।

১৯৭১ সালে তাজউদ্দিন আহমেদের কাজ ছিল কেবল ইন্ডিয়ান এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা।

উপপ্রেসিডেন্ট নজরুল ইসলামকে দিয়ে অসম ৭ দফা চুক্তি করে বাংলাদেশ বিক্রীর ব্যবস্থা করে ভারতে নিশ্চিন্ত জীবন যাপন করেছেন।

এই বিষয়ে ৯ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর আবদুল জলিল বলেছেন, দেশের শান্তিপ্রিয় জনগনকে হিংস্র দানবের মুখে ঠেলে দিয়ে কোলকাতার বালিগঞ্জে একটি আবাসিক এলাকার দোতলা বাসায় প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রীসভা সহকারে নিরাপদে তাস খেলছিলেন দেখে আমি শুধুই বিস্মিত হইনি, মনে মনে বলেছিলাম ধরনী দ্বিধা হও ।

(তথ্যসূত্রঃ অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা/ মেজর জলিল, পৃঃ ৪৪)

৪।

১৭ই এপ্রিল নতুন প্রবাসী সরকার গঠনের ঘোষনা দিয়ে দেশের মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে তিনি কিভাবে নিশ্চিন্ত ছিলেন তা আমরা বুঝতে পারবো যদি ভারত সরকারের সাথে তার চুক্তিগুলো একটু পড়ি ।

১- মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যারা যুদ্ধ করেছে তারাই দেশ স্বাধীন হলে প্রশাসনে নিয়োগ পাবে। বাকীরা চাকরীচ্যুত হবে । যে শূন্যপদ সৃষ্টি হবে তা ভারতীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা দ্বারা পূরণ করা হবে ।

২- বাংলাদেশ ও ভারতের সশস্ত্র বাহিনী মিলে যৌথ কমান্ড গঠন করে যুদ্ধ পরিচালনা করা হবে। ভারতের সেনাপ্রধান উক্ত যৌথ কমান্ডের প্রধান হবেন । তার কমান্ড অনুসারেই যুদ্ধে শামিল হওয়া বা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হবে ।

৩- স্বাধীন বাংলাদেশের কোন নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী থাকবেনা ।

৪- আভ্যন্তরীন আইন-শৃংখলা রক্ষার জন্য মুক্তিবাহিনীকে কেন্দ্র করে প্যারামিলিটারি বাহিনী প্রতিষ্ঠা করা হবে ।

৫- দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে । কিন্তু সময়ে সময়ে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বানিজ্য নীতি নির্ধারণ করা হবে ।

৬- বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতীয় সেনাবাহিনী অনির্ধারিত সময়ের জন্য বাংলাদেশে অবস্থান করা হবে ।

৭- বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশ আলোচনা করে একই ধরণের পররাষ্ট্র নীতি ঠিক করবে ।

(তথ্যসূত্রঃ বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধে “র” এবং “সি আই এ”/ মাসুদুল হক, পৃঃ ৮১)

৫।

তাজউদ্দিন আহমদ এ চুক্তি স্বাক্ষর করার জন্য চাপ দিতে থাকেন সৈয়দ নজরুল ইসলামকে।

নজরুল ইসলাম সাহেব নিরুপায় হয়ে এই চুক্তি স্বাক্ষর করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন ।

(তথ্যসূত্রঃ বাংলাদেশে ‘র’/ আবু রুশদ; দুঃসময়ের কথাচিত্র সরাসরি/ ড. মাহবুবুল্লাহ ও আফতাব আহমেদ।)

৬।

৭১ এর পুরো বিষয়টা অনুধাবন করতে বঙ্গবন্ধুর সময় লাগেনি। দেশে এসে ক্ষমতা গ্রহন করেই উপরোক্ত চুক্তি ভেঙ্গে দেয়ার চেষ্টা করেন। তিনি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন তাজউদ্দিনের প্রতি।

যে কয়টা দিন বঙ্গবন্ধু ক্ষমতায় ছিলেন সে কয়টা বছর তাজউদ্দিন শেখ মুজিবের কাছে ঘেঁষতে পারেনি।

১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু যখন মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সম্মেলন ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করেন, তখন তাদের বাধা প্রদান করেন তাজউদ্দিন আহমেদ।

(তথ্যসূত্রঃ বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধে “র” এবং “সি আই এ”/ মাসুদুল হক, পৃঃ ১১৮)

৭।

১৯৭৪ সালের ২৬শে অক্টোবর বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দিন আহমেদকে মন্ত্রীসভা থেকে অপসারণ করেন৷

(স্টাফ রিপোর্টার, ঘাটাইল ডট কম)/-

এরশাদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী

জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই)। ২০১৯ সালের এই দিনে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

এই উপলক্ষে স্বাস্থ্যবিধি মেনে জাতীয় পার্টি সারাদেশে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে পার্টি কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন, এরশাদের কবর জিয়ারত, পুষ্প অর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন, দোয়া ও আলোচনা সভা।

সকাল সাড়ে ১০টায় রংপুর পল্লী নিবাসে এরশাদের কবর জিয়ারত করবেন জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলীয় উপনেতা জি এম কাদেরসহ পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারা। পরে নেতৃবৃন্দ মিলাদ মাহফিল ও মুনাজাতে অংশ নেবেন।

বিকেল সাড়ে ৪টায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের বনানী অফিসে এরশাদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মিলাদ মাহফিল ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।

সাবেক সেনাপ্রধান ও রাজনীতিবদ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

এরশাদ ১৯৩০ সালের ২০ মার্চ অবিভক্ত ভারতের কোচবিহার জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। পরে তার পরিবার রংপুরে চলে আসেন।

রংপুরেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এরশাদ। ১৯৬৯ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি পেয়ে ১৯৭১-৭২ সালে সপ্তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ওই বছরই আগস্ট মাসে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে তাকে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে নিয়োগ করা হয়।

১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে এরশাদকে সেনাবাহিনী প্রধান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৭৯ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন। ১৯৯১ সালে এরশাদ গ্রেফতার হন। ১৯৯১ সালে জেলে অভ্যন্তরীণ থাকা অবস্থায় এরশাদ রংপুরের পাঁচটি আসনে বিজয়ী হন।

১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনেও এরশাদ সংসদে পাঁচটি আসনে বিজয়ী হন। ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি জামিনে মুক্ত হন।

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি ১৪টি আসনে জয়ী হয়। ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের সঙ্গে মহাজোট গঠন করেন।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তার দল ২৭টি আসনে বিজয়ী হয়। এরপর ১০ ও সবশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য হন। তিনি চলতি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা ছিলেন।

“সবশালা, কবি হবে, পিঁপড়ে গো ধরেছে উড়বেই;

বন থেকে দাঁতাল শুয়োর রাজাসনে বসবেই;

হঠাৎ আকাশে ফুঁড়ে তৃতীয় বিশ্বের গঞ্জে গাঁয়ে

হুট করে নেমে আসে জলপাই লেবাস্যা দেবতা;

পায়ে বুট; হাতে রাইফেলের উদ্ধত সঙ্গীন;

এইবার ইনশাআল্লাহ সমস্যার যথাযথ

সমাধান হবে; দীন-গরীবের মিলবে বেহেস্ত;

জলপাই লেবাস্যা দেবতা অবিশ্বাস্য বাণী ঝাড়ে।”

– মোহাম্মদ রফিক / খোলা কবিতা

“… আমরা যারা ৮০ র দশকে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে সামিল ছিলাম, তাদের কাছে খুবই পরিচিত এই কবি আর তার এই কবিতা। মনে পড়ে, সেই সময় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্মেলন বা নবীন বরণে এই কবি বা তার এই কবিতার উপস্থিতি। এই কবিতার জন্য এই কবিকে সেনাবাহিনীর ৯ম ডিভিশনে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। কবির মুখ থেকেই শুনুন, সেই সব আগুনঝরা দিন গুলোতে একজন অঙ্গিকারাবদ্ধ মানুষের কথা –

শিলালিপি : ‘কপিলা’, ‘গাওদিয়া’ নিয়েও অনেক কিছু বলার ছিল। তবে আপনার ‘খোলা কবিতা’ বোধ হয় বেশি পঠিত, আলোড়িত ও আলোচিত। এ কবিতা লেখার জন্য আপনাকে সেনাছাউনিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা বলেন।

রফিক : সেটা ১৯৮৩ সালের কথা। আমাকে নিয়ে গিয়েছিল ৯ নম্বর সেক্টর, নবীনগরে। দিনটা মনে করতে পারছি এখন। সেদিন সকালে অতর্কিতে সেনাবাহিনীর গাড়ি থামে আমার বাসার সামনে। সেনাবাহিনীর এক সৈনিক আমার বাসায় এসে বলে, আমাদের অফিসার আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান। আমাদের সঙ্গে চলুন।

শিলালিপি : আমরা জানি, সেনাবাহিনীর চারজন অফিসারের সমন্বয়ে একটি বোর্ড আপনাকে সেদিন নানা প্রশ্ন করেছিল। সেদিনের কথা বলুন।

রফিক : সেখানে গিয়ে দেখি ‘খোলা কবিতা’-র একটি কপি তাদের হাতে। সেনাবাহিনীর ওই বোর্ড আমাকে প্রথম প্রশ্ন করে, এটা কি আপনার লেখা। আমি উত্তরে বললাম – হ্যাঁ, আমারই লেখা। তারপর আমার দিকে একে একে ছুড়ে দেওয়া হয় প্রশ্নবাণ। আমি বলি, আপনারা আমাকে যা যা প্রশ্ন করবেন, আমি সঠিক উত্তর দেব। শুধু একটি প্রশ্নের উত্তর দেব না। সেটা হলো, এই কবিতার প্রকাশক ও বইটি কোথায় থেকে বের হয়েছে তার ঠিকানা বলব না।

শিলালিপি : আপনাকে মারধর করেনি?

রফিক : নাহ!

শিলালিপি : বলেন কী! শুধু প্রশ্ন করেই ছেড়ে দিয়েছে, কিছুই করেনি?

রফিক : একপর্যায়ে তারা একটু চড়াও হওয়ার চেষ্টা করে। আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে। আমি তাদের বললাম, দেখুন আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করবেন না। এটাই প্রথম নয় যে আমি সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হয়েছি। আমি যখন রাজশাহী কলেজের ইংরেজি অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র, তখন ‘মার্শাল ল কোর্টে’ আমার বিচার হয়। তাতে কোর্টের প্রধান বিচারক ছিলেন পাকিস্তান আর্মির একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। বিচারে আমার ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছিল। আমাকে ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। এতে বরং আমারই লাভ বেশি, আপনাদের নয়।

শিলালিপি : তারপর কি জেলের ভাত খেলেন পেটভরে। সেনাবাহিনীর ওই বোর্ডের সদস্যরা আর কিছু বলেননি?

রফিক : বেশি দিন খেতে হয়নি। আমি অবশ্য ছাত্র আন্দোলনের কারণে দ্রুত ছাড়া পেয়ে যাই। সেনাবাহিনীর ওই সদস্যদের বলি, আপনারা এবার বড়জোর আমাকে ধরে ১৪ বছর কারাদণ্ড দিতে পারেন। এতে আমারই লাভ, আপনাদের ক্ষতি। একজন অফিসার আমাকে বললেন, কী করে? আমি বললাম, এখন আমি হয়তো আপনাদের জন্য সমস্যা নই। তবে ১৪ বছর কারাদণ্ডের কারণে আমি এতই বিখ্যাত হয়ে যাব স্বদেশে ও বিদেশে, তখন কিন্তু আপনাদের পক্ষে সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এ সময় আরেকজন অফিসার মাঝখান থেকে বলে বসলেন, আপনি আমাদের ‘শুয়োরের বাচ্চা’ বলেছেন। আমি তাদের বিনীতভাবে বললাম, আপনারা কি শুয়োরের বাচ্চা যে আমি আপনাদের শুয়োরের বাচ্চা বলব। আপনারা ভালোভাবে পড়ে দেখেন, কাদের শুয়োরের বাচ্চা বলা হয়েছে।

শিলালিপি : এরশাদকে নিয়ে কিছু বলেনি?

রফিক : বলবে না আবার, এটাই তো ছিল তাদের আসল উদ্দেশ্য। শেষদিকে এক অফিসার আমাকে বলেন, আপনি আমাদের প্রধানকে ‘শালা’ বলে গালি দিয়েছেন। আমি বললাম, আপনি কেন ধরে নিচ্ছেন যে এখানে শুধু আপনার প্রধানকেই শালা বলা হয়েছে। এই দেশে যার যা করার নয়, তাদের অনেকে তাই করতে চায়। উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা ক্ষমতাবলে শিল্প-সাহিত্য করার চেষ্টা করে। আপনাদের প্রধানও শিল্প-সাহিত্য করতে চান। আমি কেন আপনাদের প্রধানকে ঈর্ষা করতে যাব। তবে আপনি বলুন না, এরশাদ সাহেব যা লেখেন, আপনি যদি কোনো পত্রিকার সম্পাদক হতেন, পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় তা কী ছাপতেন। আমার কথায় ভদ্রলোকগোছের ওই অফিসার একটু আনমনা হয়ে কী যেন ভাবলেন। তারপর কথাবার্তা একটু ধীর লয়ে চলে। তাঁদের বলেছিলাম, আমি কবিতা লিখি। সুতরাং এ কবিতার জন্য আমাকে যদি দায় বহন করতে হয়, আমার তাতে আপত্তি নেই। আপনারা ইচ্ছা করলে এখনই আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারেন। শাস্তি দিতে পারেন। আমার কথায় বোর্ড নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করে। সমাধান খুঁজে না পেয়ে, ঢাকার সঙ্গে একজন যোগাযোগ করতে উঠে গেলেন। ইতিমধ্যে প্রায় বেলা ২টা বেজে গেছে। কিছু সময়ের মধ্যে ওই অফিসার ফিরে এসে বললেন, আপনি এবার যেতে পারেন। তবে আপনাকে প্রয়োজনে আবার ডাকব। আমি আচ্ছা বলে বলে চলে আসি॥”

তথ্যসূত্র : দৈনিক কালের কন্ঠ (শিলালিপি) / ২২-১০-২০১০ইং

মওলানা ভাসানী কাহিনী

মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলের সন্তোষে থাকলে মাঝে মাঝে চারাবাড়ি ধলেশ্বরী নদীর ঘাট থেকে নৌকায় করে তাঁর শিষ্য কৃষক নেতা তোরাব আলী ফকিরের বাড়িতে যেতেন।

এই বাড়িতে কখনও কখনও তিনি রাতও যাপন করতেন।

এলাকাটির নাম এখন তোরাবগঞ্জ। তোরাবগঞ্জ বাজারটি এখন বেশ সমৃদ্ধ। তবে নদীটি এখন মৃতপ্রায়। নদীর পেটে এখন ধান-পাট-সবজী চাষ হয়।

মওলানা ভাসানী নৌকাতে তোরাবগঞ্জ ও আশেপাশের চর এলাকায় ঘুরে বেড়ানো পছন্দ করতেন। নৌকায় নদীতে বিশেষ করে জোছনা রাতে ভেসে বেড়ানোতে তাঁর ছিল অপার আনন্দ।

তোরাব ফকিরের বাড়িতে তিনি গেলে আশেপাশের বাগবাড়ি, করাইল, গোলাবাড়ি, আলোকদিয়া প্রভৃতি গ্রাম থেকে বহু লোক; গ্রামের গরিব কৃষকই বেশী, দলে দলে আসতো।

কেউ আসতো আধ্যাত্মিক শিক্ষা নিতে, কেই আসতো রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা আলোচনা করতে, কেউ আসতো তার ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান চাইতে।

গ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সমস্যা এবং তা দূর করার বিভিন্ন উপায় নিয়ে ভাসানী তাদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। যত দরিদ্রই হোক তাদের কথার মূল্য দিতেন। বিশেষ বিশেষ স্থানীয় সমস্যা সমাধানে গ্রামবাসীকে উপদেশ ও পরামর্শ দিতেন।

মওলানা ভাসানীর খাওয়া-দাওয়া নিয়ে কোনরকম বাছবিচার বা শুচিবাই ছিল না। চায়ের নেশা তাঁর ছিল না, তবে ফজরের নামাজের পর ভোরে মুড়িসহ এক পেয়ালা চা খেতেন। তাছাড়া সকালে বিচি-কলা খেতে পছন্দ করতেন।

বিকেলে যদি পথে-ঘাটে না থেকে বাড়িতে থাকতেন তাহলে আর এক কাপ চা ও সামান্য নাশতা খেতেন। কখনও কখনও মুড়ি বা খই খেতে পছন্দ করতেন। সফরে না থাকলে বারটার মধ্যে দুপুরের খাওয়া খেয়ে নিতেন।

যমুনা ধলেশ্বরী বা খাল-বিলের ছোট মাছ বাজার থেকে আনাতেন। বর্ষাকালে শোল, গজার বা টাকি মাছের পোনা পেঁয়াজ দিয়ে রান্না করা চচ্চড়ি অত্যন্ত পছন্দ করতেন। তবে যে কোন মাছই ছিল তাঁর অতি প্রিয়।

কোনদিন সন্তোষে তাঁর বাড়ির সামনে চেয়ারে বসে থাকতেন। তসবি হাতে দোয়া-দরুদ পড়তেন। রাস্তা দিয়ে মৎস্যজীবীরা মাছ নিয়ে যাওয়ার সময় বলত, হুজুর কিছু মাছ দিয়া যামু?

মওলানা ভাসানী উঠে গিয়ে মাছের ডালিতে মাছগুলো দেখতেন। বেছে বেছে তাঁর প্রিয় ছোট মাছগুলো আলাদা করতেন। মাছ ব্যবসায়ীরা দাম নিতে চাইত না, কিন্তু তিনি জোর করে বকাঝকা করে দাম দিয়ে দিতেন।

(নিজস্ব প্রতিবেদক, ঘাটাইল ডট কম)/-

আহমেদ ছফার জন্মদিন এবং কিছু কথা

লেখক, ঔপন্যাসিক, কবি, চিন্তাবিদ আহমদ ছফার জন্মদিন আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন)। ১৯৪৩ সালের এই দিনে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে আহমদ ছফা ছিলেন বাবা-মার দ্বিতীয় সন্তান।

১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম নাজিরহাট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন; একই বৎসরে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে। পরে বাংলা বিভাগে ক্লাশ করা অব্যাহত রাখেননি। ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে এমএ পরীক্ষা দেয়ার আগেই বাংলা একাডেমির পিএইচডি গবেষণা বৃত্তির জন্য আবেদন করেন এবং তিন বছরের ফেলোশিপ প্রোগ্রামের জন্য মনোনীত হন। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে প্রাইভেটে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ পরীক্ষা দেন। তার পিএইচডি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

১৯৭১ সালে ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’ গঠন ও এর বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় অংশ নেন। ৭ই মার্চ ‘স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা’ হিসেবে প্রতিরোধ প্রকাশ করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এপ্রিল মাসে কলকাতা চলে যান। মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সেখান থেকে দাবানল নামের পত্রিকা সম্পাদনা করেন। দেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশে ফিরে লেখালেখি করতে থাকেন। ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক নাজিমুদ্দিন মোস্তানের সহায়তায় কাঁটাবন বস্তিতে ‘শিল্পী সুলতান কর্ম ও শিক্ষাকেন্দ্র’ চালু করেন।

পরে ১৯৮৬-তে জার্মান ভাষার ওপর গ্যেটে ইনস্টিটিউটের ডিপ্লোমা ডিগ্রিও লাভ করেন তিনি, যা তাকে পরবর্তী সময়ে গ্যেটের অমর সাহিত্যকর্ম ফাউস্ট অনুবাদে সহায়তা করেছিল।

আহমদ ছফা সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন দীপ্তিময়ভাবে। গল্প, গান, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, ইতিহাস, ভ্রমণকাহিনি মিলিয়ে তিরিশটির বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার জনপ্রিয় লেখা হলো আব্দুর রাজ্জাক স্যারকে নিয়ে লেখা “যদ্যপি আমার গুরু”, বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস, বাঙালি মুসলমানের মন, গাভী বিত্তান্ত, পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গপুরাণ, অলাতচক্র।

প্রতিষ্ঠানবিরোধী আহমদ ছফা ১৯৭৫ সালে লেখক শিবির পুরস্কার ও ১৯৯৩ সালে বাংলা একাডেমির সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ২০০২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে সাহিত্যে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করেন।

২০০১ খ্রিষ্টাব্দের আটাশে জুলাই অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। মিরপুরের বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

২।

মনীষী লেখক, দার্শনিক, ও কবি আহমদ ছফাকে নিয়ে লেখার জন্য করোনাকালে কবিগুরুর বয়ানে ‘যাসনে ঘরের বাহিরে’ বিধান উপেক্ষা করে বাংলা একাডেমির ভেতরে থাকা অগ্রণী ব্যাংকের ছবি তুলতে গিয়েছিলাম। গত ২৫ জুন তোলা ছবিগুলোর একটি আমার ফেসবুকে প্রকাশ করেছি। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে ঢাকা শহরে অগ্রণী ব্যাংকের কয়েকডজন শাখা থাকতে বাংলা একাডেমির শাখাটির ছবি কেন? এই কৈফিয়ত দেয়ার আগে দুটো কথা বলে নিতে চাই।

১৯৯৬-৯৭ খ্রিষ্টাব্দের কথা। সরকারি জগন্নাথ কলেজের (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) ছাত্র হলেও দিনের বেশিরভাগ সময় কেটে যায় সরকারি অফিসে অফিসে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে ও রিপোর্ট লিখতে। একটা রিপোর্ট প্রকাশ হলে তখন যে আনন্দ হতো এখন ৫০ হাজার টাকা পেলেও তার সমান আনন্দ পাই না। একটি লেখা প্রকাশ হলে সহপাঠীদের অনেকে ঈর্ষার চোখে দেখতো। তখন তা খুব মজার বিষয় ছিল।

তবে, এই লেখালেখিতে কত টাকা পেতাম তা সাংবাদিকদের বেতন-কড়ির খবর যারা রাখেন তাদেরকে আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। টাকা বড় বিষয় নয়, ছাপার অক্ষরে লেখা প্রকাশ হয়েছে সেটাই ছিল পরিতৃপ্তির বিষয়।

সেইসব দিনগুলোতে ঢাকার বাংলামোটরে আহমদ ছফার বাসা অথবা শাহবাগের আজিজ মার্কেটের আড্ডাখানায় প্রায় প্রতিদিনই যেতাম। আড্ডা ছাড়াও আমার কাজ ছিল ছফা ভাইয়ের লেখার ডিকটেশন নেয়া। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন ছফা ভাই। বিশেষ করে সাহিত্যপাতায় তার লেখা বেশি ছাপা হতো। তখন ডিজিটাল পদ্ধতি ছিল না। মোবাইলও ফোনও খুব কম ছিল।

ছফা ভাইয়ের একটা ৯৬৬.. টিএন্ডটি নম্বর থাকলেও আমার কোন ফোনই ছিল না। অগত্যা ফোন-ফ্যাক্সের দোকান থেকে মাঝে-মধ্যে ফোন দিয়ে জেনে নিতাম কখন কোন লেখার জন্য বাসায় অথবা আজিজে যেতে হবে। এই যে টাকা নেই তারপরও টাকা খরচ করে ফোন করতাম কেন? আমার লাভের জন্যই। দুইভাবে লাভ। যেসব লেখার ডিকটেশন নিতাম সেগুলোতে  লেখক ছফা ভাইয়ের নাম থাকতো। আর নিচে লেখা থাকতো, অনুলিখন: সিদ্দিকুর রহমান খান।

ছফা ভাইয়ের লেখার সাথে আমার নাম যাচ্ছে তা সে সময় আমার কাছে এটার যে কি মূল্য তা এখন পুরোটা বোঝাতে পারবো না। রীতিমতো গর্ব করতাম। এখানেও সহপাঠী ও সহকর্মী সাংবাদিকদের ঈর্ষাপরায়ণতাটাকে উপভোগ করতাম। ওই সময়ে ছফার মতো মনীষীর নামের সাথে আমার নাম ইত্তেফাক, আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ, বাংলাবাজারসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ছাপা হওয়াকে বিশাল পাওয়া মনে করতাম।

দৈনিক পত্রিকার হার্ড রিপোর্টার হিসেবে নিজের লেখা হাজার হাজার রিপোর্ট প্রকাশ হলেও ছফা ভাইয়ের নামের সাথে আমার নাম প্রকাশ হওয়াটাকেই আমার কাছে ভিন্ন স্বাদের, ভিন্ন মর্যাদার মনে হতো, এখনও হয়। এখনও মনে করি বিশাল সৌভাগ্য আমার, ছফার এ্যাতো এ্যাতো স্নেহ পেয়েছি। এখনও কেউ যদি জিজ্ঞেস করেন, ‘সিদ্দিক, আপনার সাথে তো আহমদ ছফার জানাশোনা ছিল, তাই না। তখন ঘুরিয়ে আমি বলি, শুধু পরিচয় ছিল না। আহমাদ ছফার অনেকগুলো প্রবন্ধ/নিবন্ধ ও বইয়ের মধ্যে যে সাংবাদিক সিদ্দিকুর রহমান খানের উল্লেখ দেখেন সেই সিদ্দিকুর রহমানই আমি’।

প্রিয় পাঠক, এবার আসি অগ্রণী ব্যাংকের ছবি তোলা প্রসঙ্গে। ২৫ জুন ছবি তুলতে গিয়েছিলাম। দেখলাম আগের সেই জীর্ণ ভবনটি নেই। কাঁচঘেরা অত্যাধুনিক এক ভবন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে তুলতে মনে পড়ছিল সেই ম্যানেজার সাহেবের কথা। তাঁর নামটি অনেকবছর মনে রেখেছিলাম, এখন মনে পড়ছে না। এই ম্যানেজার সাহেব অন্য দশজন ম্যানেজারের চেয়ে আলাদা। আহমদ ছফার সাথে সখ্য না থাকলেও ছফার লেখালেখি এবং আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে জানা ছিল তাঁর।

খুব সম্ভবত ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসের শেষদিকে। দুদিন ধরে ছফা ভাই আমাকে বলছেন, সিদ্দিক তোমাকে কিছু টাকা দেবো। আমার খুব খুশি হওয়ার কথা থাকলেও জানতাম ছফা ভাইয়ের টাকা নেই। তাই নিম্ন স্বরে বলতাম, না ভাই, দরকার নেই। আমি অফিস থেকে কদিন আগেই কিছু টাকা পেয়েছি। যদিও সংবাদপত্র অফিস থেকে টাকা পাওয়ার কথাগুলো কতটা সত্য বা সত্যের কাছাকাছি তা আমি ছাড়া আর কে জানতো!

যাহোক, এক সকালে ছফা ভাইয়ের বাসায় গেলাম। এক নাগাড়ে তিনটা বড় লেখা লিখতে দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। তখন কর্ণফুলি পেপার কোম্পানির লম্বা সাইজের সাদা কাগজে লিখতেন ছফা ভাই। এক পাতায় লিখতে হতো। এপিঠ-ওপিঠ লিখতে মানা। লেখা শেষে আমার হাতে একট চেক দিলেন। চেকের দিকে তাকালাম না। ভাজ করে পকেটেও ঢুকালাম না। শুধু বললাম ছফা ভাই লাগবে না। বললেন, তাড়াতাড়ি যাও ব্যাংক আওয়ার শেষ হয়ে যাচ্ছে।

বাংলামোটর থেকে মনে হয় বাংলা একাডেমির অগ্রণী ব্যাংকের শাখায় যেতে আমার পনেরো মিনিটের বেশি লাগেনি। অগ্রণী ব্যাংকে ঢুকে চেকটা দিতে চাইলাম একজনের কাছে, তিনি ইশারা করে বললেন, এখানে না ওখানে। গেলাম সেই ডেস্কে। চেকটা রেখে একটা পিতলের টোকেন ধরিয়ে দিল মনে হয়। পুরোটা মনে পড়ছে না। কিছুক্ষণ পড়ে একজন অফিস সহকারী টাইপের ভদ্রলোক লোক এসে বললেন, সিদ্দিকুর রহমান খান কে? আমি এগিয়ে গেলাম। বললেন, আসেন আমার সাথে। তিনি নিয়ে গেলেন ম্যানেজার সাহেবের রুমে। ম্যানেজারের হাতে থাকা চেকটার দিকে সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলাম লাল কালি দিয়ে কি যেন লিখেছেন ব্যাংকেরই কেউ। আমাকে আর টাকা দেবে না এমনটা সন্দেহ হলো। মন খারাপ হলেও বুঝতে না দেয়ার চেষ্টা করে যেতে থাকলাম।

চশমার ফাঁক দিয়ে ম্যানেজার সাহেব আমাকে জিজ্ঞেস করলেন ছফা সাহেব আপনার কি হন? আমি কি করি? কখন এই চেক লিখে দিয়েছেন ছফা সাহেব? এ্যাতো এ্যাতো প্রশ্ন শুনে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তবুও জবাব দিলাম। সব  শেষে জিজ্ঞেস করলেন, এই টাকা দিয়ে আমি কি করবো? আমার উত্তর শুনে ম্যানেজার সাহেব খুব খুশি হয়েছেন মনে হলো। লাল কালি দিয়ে আকাঁবুকি করা চেকটার ওপর ফের কি যেন লিখলেন ম্যানেজার সাহেব। ক্যাশিয়ার বা ক্যাশ শাখার কেউ একজনের সাথে ম্যানেজারের আলাপে বুঝলাম ছফা ভাইয়ের ওই ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তিনশ টাকা ছিল না। দুশো অথবা দুশো পঞ্চাশ টাকার মতো ছিল। তবু, মনীষী ছফার চেকটি ডিজঅনার করেননি। তিনশ টাকাই দিয়েছিলেন আমাকে।

ম্যানেজার সাহেব আমাকে বললেন, ছফা সাহেবকে বলবেন, খুব তাড়াতাড়ি যেন কিছু টাকা এই শাখায় জমা রাখেন। ম্যানেজারের মুখের দিক তাকিয়ে ধন্যবাদ দিয়ে বের হলাম। ক্যাশ শাখা থেকে একজন ডেকে নিয়ে আমাকে তিনশ টাকা দিলেন। আমি ব্যাংকের ভেতরে থেকেই গোপন পকেটে টাকাগুলো ঢুকিয়ে সোজা হাঁটা শুরু করলাম ছফা ভাইয়ের বাসার দিকে। এবার পকেটে টাকা আছে। এবার মনে হয় দশ মিনিটে  পৌঁছে গেলাম বাংলামোটরে।

টাকাগুলো হাতে দিতে চাইলে ছফা বললেন, ‘আরে বোকা এটাতো তোমাকে দিয়েছি। যাও অফিসে যাও। কাল বিকেলে আজিজে এসো। মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে আজকের কাগজের জন্য একটা লেখা দিতে হবে। সাহিত্য সম্পাদক সালাম সালাহউদ্দিন সাহেব ফোন দিয়েছিল।’

আমার কাছে মনে হলো ম্যানেজার সাহেব যা বলেছেন এবং আমিও ম্যানেজারের প্রশ্নবানে যে ভড়কে গিয়েছিলাম তা ছফা ভাইকে বলা দরকার। সবশেষে বললাম, ম্যানেজার বলেছেন খুব শিগগিরই যেন কিছু টাকা জমা রাখেন। শুনে হেসে দিলেন ছফা। বললেন, বুঝতে পেরেছো, তিনশ টাকা ছিল না আমার এ্যাকাউন্টে। তবুও তোমাকে টাকা দিলেন। ম্যানেজারের নামটা আবার বলো সিদ্দিক।’

পাদটীকা : দুই যুগেরও বেশি সময় আগের ছফাভক্ত সেই অসাধারণ ম্যানেজারের নামটা ভুলে যাওয়া বা তার খোঁজ না রাখা আজও আমার কাছে অপরাধ মনে হয়। আর মাত্র কয়েকবছর আগে সরকারি বেসিক ব্যাংক যে ‘সরল বিশ্বাসে, কোনো কাগজ বা গ্যারান্টার ছাড়াই এক ব্যক্তিকে ৩০০ কোটি টাকা ঋণ দিলেন।’ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনগুলো এবং ঋণ গ্রহীতার নাম এবং বেসিক ব্যাংকের সেই শাখার ম্যানেজারের নাম মনে রাখাও অপরাধ!

আহমদ ছফা বেঁচে থাকলে এইসব অপরাধের রকমফের নিয়ে দারুণ লিখতেন। তাঁকে মিস করি, তাঁর লেখা মিস করি।

৩।

আহমদ ছফার একটি কবিতা বা গান নিয়ে এই লেখা।
ঘরে পরে তফাৎ আমার
কখন গেছে মুছে
তবু লোকে সকাল বিকাল
ঘরের খবর পুছে।
আসতে যেতে নানান মানুষ
ঘরের খবর লয়
আমার কখন ঘর ছিল কি
মনেতে সংশয়
হাল সাকিনের লজ্জা আমার
কেমনে জানি মুছে।

যদি বলি ঘরটি হবে
সাগর জলের নিচে
ঘাড় দুলিয়ে বলবে মানুষ
কখখনো নয় মিছে
নিত্যি নতুন ঘরের খবর
শ্রবণে না রুচে।
যদি বলি ঘরটি হবে
নীল আকাশের নীলে
মিটিমিটি চেরাগ জ্বলা
লক্ষ তারার বিলে
বলবে মানুষ সে সব খবর
সত্য হবার নয়
তবু লোকে সকাল বিকাল
ঘরের খবর পুছে।

আহিতাগ্নি/আহমদ ছফা


পরকে আঁকিবার এহেন দৌলতের নাম পরকীয়া। মানে পরকে পরখ করিয়া লওয়া। মনকে আঁকিয়া লওয়া বলা যাইবে।


জার্মান গুরুকবি যোহান ভলফ্‌গ্যাঙ ফন গ্যেটে তাহার জীবনের ‘সত্য আর কল্পনা’ (Dichtung und wahrheit) বহিতে সাংঘাতিক ঘটনা চাউর করিয়াছেন। বহিতে ওয়ের্থার রচনায় গ্যেটের ভাষ্য, ‘আমি এক ইংরেজ ভদ্রলোকের গল্প শুনিয়াছি। যিনি নিত্যদিন পোশাক বদলের বিড়ম্বনার হাত হইতে বাঁচিবার তাগিদে গলায় রশি দিয়া আত্মহত্যা করিয়াছেন। অপর একজন চিত্তবৈভবের প্রভু। একদিন বাগানে বেড়াইতে বেড়াইতে চিৎকার করিয়া বলিলেন, বৃষ্টি ভরা মেঘের পশ্চিম হইতে পূর্বদিকে যাইবার দৃশ্যই কি আমাকে জীবনভর দেখিতে হইবে? তেসরা, আমার দেশের এক বিখ্যাত আদমি—যিনি বসন্তে পত্রপল্লবে সবুজ দেখিয়া যারপরনাই ক্লান্ত হইয়া বলিলেন, এইবার না হয় তো লাল হইতে পারিত! কত না নানা রকমফেরে মানবসন্তান আত্মহত্যা করিতেছে।’ তিন আদমির আত্মহত্যা কি সরল পদার্থ? গ্যেটে আরো জানাইতেছেন, ইংরেজ জাতি কথায় কথায় আত্মহত্যা করিতে উস্তাদ।

গ্যেটে কারণ হিশাবে দেখাইতেন, জীবনের বড় দায় দেহ আর মনের। কেননা মনের দায় মিটাইতে না পারিলে জীবনের দায় মিটাইবে কী করিয়া? মন তো দেহের মহাশয় বটে। মনে জাগিলে দেহ তাহা ঘটাইবে। আর জীবন তাহাতে ভর করিয়া চলে। চলা আর চালাইবার গতিই তো মন। দেহ তার আধার মাত্র। তাহা নহে কি? তাঁহার চারিত ঘটনায় তিন আদমির আত্মহত্যার কারণ কি সামান্য? তাহা অতি কম নহে, বরং বেশি। দুনিয়াবি সাহিত্যের বাজারে শোনা, মহাত্মা গ্যেটে মনের জগতে খুঁড়িয়া বেড়াইতেন। গ্যেটে তরুণ বয়সে রাতালি সময়ে বুকের ’পরে নাঙা ছুরি ঘুরাইতেন। আর মৃত্যুকে কিভাবে সহজ করা যায় তাহাই ভাবিতেন। তো গ্যেটের লাহান আহমদ ছফাও নাকি কোমরে বিষের বোতল রাখিতেন। এহেন রাখার ভিতরে গ্যেটের ভাব কি ছফার ভিতরে ছিল? তবে সত্য, দৈহিকভাবে গ্যেটে আত্মহত্যা করেন নাই। আর বিষ পান করেন নাই আহমদ ছফাও। দুই মনীষীর ভিতর অদ্ভুত মিল এইখানে।

তাহারা হয়তো ভাবিয়াছিলেন, এই জীবন লইয়া কী করিব? কোথায় রাখিব দেহ? শুদ্ধ ‘ঘর’ নামক বোতলে বন্দি করিলে জীবন-নামক পদার্থের পদ খাটো হইতেছে। তাহাতে পরও দরকার। পরকে আঁকিবার এহেন দৌলতের নাম পরকীয়া। মানে পরকে পরখ করিয়া লওয়া। মনকে আঁকিয়া লওয়া বলা যাইবে। আর পর বাসা বাধিলেই ঘর বাক্য হইয়া ওঠে?

বাংলার মনীষী আহমদ ছফার কবিখ্যাতি বিশেষ নাই, এহেন কথা আমরা হলফ করিয়া বলিতে পারিব না। কবিখ্যাতি তাহার গানের লাহান। গান টান মারিলে প্রাণও নড়িয়া ওঠে। টান দেখিব কিসে? কবি হিশেবে তাহার বিশেষ কুখ্যাতিও রহিয়াছে তেমন সাক্ষ্য-প্রমাণ নাই। তাহার কারণ বিস্তর। কারণের আস্তর তুলিতে আমাদের পাড়া কথা খানিক পাড়াতে পাড়াতে রটাইব। আমাদের রটনার নাম ‘সত্য’। আস্তরের নাম ‘মায়া’। জনে জনে জিজ্ঞাসিতে পারেন, সত্যের জমিনে মায়া কী পদার্থ? বাংলা চিন্তার জগতে ‘মায়া’ বা ‘মা’ স্ত্রীলিঙ্গ বিশেষ। আমরা মায়ার অন্য অর্থ দেখিতে পাইতেছি। মায়া মানে মা ভাবের আয়া। আয়া ভাব মা ডাকিলেই মায়া ভাব জাগিয়া যায়। বলা যাইতে পারে, মা ভাব যাহাতে আসিয়া বাসা বাঁধে। এই বাঁধা লিঙ্গের বাঁধা নহে। তাহা লিঙ্গেরও অধিক কিছু বাড়া। এহেন ‘বাড়া’কে কি আমরা কায়া বলিতে পারি? না, তাহাতেও এক বেহায়াপনা মাথাচাড়া দিয়া উঠিতেছে। তাহা ছায়া বা ঘর। ভাবার্থ ধরিলে ‘ঘর’ মালটা তো আস্তর অশেষ। আস্তরের পলেস্তরা খসিলে গোপন রহস্য আর গোপন থাকিতেছে না। তাহাতে ছায়াও ছায়াহীন হইয়া পড়ে। ঘরও পাইতেছে পরের আকার। ঘরকে পরের রূপই তো পরকে অপর করিবার আদি নিয়ম। তাহা কী রকম?


ইংরাজ বুদ্ধিজীবী জন মিল্টনের মতে, সহজ-সরল, ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও আবেগের চেরাগ জ্বালানোই কবিতা।


মহাত্মা ছফা রচিত অনেক কবিতায় ঘরের খবর চাউর করিয়াছেন। আলোচনার স্বার্থে আমরা মহাত্মা আহমদ ছফার আহিতাগ্নির বার নম্বর কবিতাখানি বাছিয়া লইলাম। ছফার কবিতায় তথাকথিত আধুনিকতাবাদীদের মতো ভানভণিতা নাই। নাই কলাকৈবল্যবাদীদের আঙ্গিকের বৈকল্য। আঙ্গিক যাহাতে বিষয়াবলিকে ক্ষুণ্ন করিয়া থাকে ছফা সেই আইলে পা রাখেন নাই। ফলে তাহার কবিতা কাইলও পড়া যাইতে পারে। তাহার কবিতার সরল তর্জমা এই—জগৎসংসারে তিনি ঘর আর পরের তফাৎ ঘুচাইয়া ফেলিয়াছেন। তবুও লোকে তাহাকে পুছ করিতেছে ঘরের খবর। লোকের এহেন জিজ্ঞাসায় ছফার মনে সংশয়—আমার কখনো ঘর ছিল কি?

কবি কহেন, সাগর জলের নিচে কিংবা নীল আকাশের নীলে আমার ঘর। না না, তাহাতে লোকে কয়, সেসব খবর সত্য নয়। তাহার পরও লোকে পুছে ঘরের খবর কী! মানবসংসারে এহেন কলা কাঁদির মতো যেন আঁটি আঁটি ঝুলিয়া থাকে। গোপন বাসরেও সার সার কলা ঝুলিয়া আছে যেন!

ইংরাজ বুদ্ধিজীবী জন মিল্টনের মতে, সহজ-সরল, ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও আবেগের চেরাগ জ্বালানোই কবিতা। ইন্দ্রিয় তো আবেগের বায়ুধার। প্রশ্ন জাগিতেছে, কবিতার আয়ুই-বা কোথায়? যাহা ইন্দ্রিয়ানুভূতি আবেগের আধার তাহা কি সহজ সরল হইবে? না সেই রকম সরল শপথ কবিতায় নাই। এমন ধরাবাঁধা বালাই কবিতা কতখানি কবিতা তাহাও দেখিবার বিষয় বটে। কেননা একক বান্দার চেতনা তাহার অস্তিত্ব নির্ধারণ করিতেছে না। তাহার অস্তিত্ব নির্ধারণ করিতেছে ব্যক্তির অপর। পর-অপরের সম্বন্ধের নামই তো মিলন।

যাহাকে আমরা ছপ্পর মারিতেছি সামাজিক চেতনা বলিয়া। এই চেতনা একা চলিতেছে না। একা চলিতেই পারে না। তাহার অঙ্গে সঙ্গ চায়। এইরূপ সঙ্গ অপরের সহিত সম্বন্ধ করিতেছে। করিতেছে কি?

ধুরন্ধর কবি জন মিল্টনের এহেন তত্ত্বকে খানিক আড়মোড়া মারিয়াছেন স্পেনের যুদ্ধে শহিদ ইংরাজ বুদ্ধিজীবী র‌্যাল্ফ ফক্স (১৯৯০-১৯৩৭)। ফক্স তাহার কাহানি ও মানুষ বহিতে কহিলেন অন্যকথা, ‘সৃজনের মর্ম পরম, যাহা বাস্তবের লড়াই’। আর এই বাস্তবের ভিতর দিয়া সত্যের উৎপাদন করা। বাস্তব নির্ধারিত হইলে অবাস্তবও নির্ধারিত হইবে। কেননা বাস্তবের অচিন রূপ অবাস্তব বটেন। আর বাস্তবই বলিতেছে অবাস্তব কী মাল! মিল্টনের বড় দোষ কবিতার সংজ্ঞায় ভাষা প্রশ্নখানি মীমাংসা করেন নাই। আমরা বলিতেছি না, ভাষা মাত্র চরম। বলিতেছি ভাষার পরমের কথা। কহিতে শরম নাই আজি। তাহা কী?


ছফা বর্ণিত ‘আমার’ শুধু আত্মরতির ‘আমি’ বা নিছক ‘বান্দা’ থাকিতেছে না। ‘আমার’ হইতেছে তফাৎ ঘর আর পরের যৌথ উৎপাদন।


পশ্চিমের ডাহা ডাহা পণ্ডিতেরা বলিয়াছেন, ভাষা পদার্থখানি প্রকৃতি সারিত। মানে বস্তু বিশেষের মাধ্যমে ভাব প্রকাশ। প্রশ্ন জাগিতেছে, ভাব মালটা আসে কোথা হইতে? খোদ বস্তু হইতে নাকি পরমের কোঠা হইতে? বলা দরকার, বস্তুমাত্র ভাব। ভাব মাত্রই বস্তু নহে, বস্তুর অধিক কিছু। তাহা হইলে অধিক কিছুই পরম নয় কি? যাহাতে বন্তু ও পর ভাবের ওম পায়। জনে জনে জিজ্ঞাসিতে পারেন, ছফার কবিতায় ভাবের ওম বহিতেছে কোথায়? উত্তর উপরে নহে, গভীরে।

জন মিল্টনের পাটাতনে বসিয়া খালি কতক ইংরাজ কবি নহে, কত কত বাঙালি কবি শহিদ হইয়াছেন তাহার খবর রাখিতেছে কে? প্রভু যুদ্ধের ময়দান কতদূর? নদ আর নদীতে কতইবা রক্ত বহিতেছে আর। নিছক ইন্দ্রিয়ানুভূতির আবেগের রসে ছফা সিক্ত হইতে চাহেন নাই। ছফা খানিক রক্তাক্ত হইয়াছেন। তাই ছফার মন সংশয়ী। কবিতায় তাহার জিজ্ঞাসা, আমার কখনো ঘর ছিল কি? সকলেই জানেন, বাংলা তালুকে ছফা জমিনদারির প্রভু হয়েন নাই। ব্যক্তিগত জীবনে ধুরন্ধর বুদ্ধিকে পুঁজি করিয়া রাষ্ট্রের অর্থকড়িও বেহাত করেন নাই। এই না করিবার আদিতে কি সামাজিক চেতনা কাজ করিয়াছে? বাংলা অর্থবিদ্যা মতে, ‘ঘর’ শব্দখানি সংসার আর খানিক বাসস্থান অর্থে চালু। ছফার কবিতায় ঘর শব্দখানি আরো নতুন অর্থে গড়া। তাহা কেমন?

তাহার কবিতার ভাষ্য—

ঘরে পরে তফাৎ আমার
কখন গেছে ঘুচে
তবু লোকে সকাল বিকাল
ঘরের খবর পুছে।

ছফার জগতে ঘর আর পরে ফারাক ঘুচিয়া গিয়াছে। কেননা ‘তফাৎ’ বা ‘বৈষম্য’ বিরুদ্ধে লড়াই তাহার সার। ভাবের লড়াইয়ে জয়ী হইয়াছেন ছফা। কেননা ছফা বর্ণিত ‘আমার’ শুধু আত্মরতির ‘আমি’ বা নিছক ‘বান্দা’ থাকিতেছে না। ‘আমার’ হইতেছে তফাৎ ঘর আর পরের যৌথ উৎপাদন। মানে বান্দার সহিত সম্পর্কিত পরমার বা সামাজিক মালিকানা। কেননা আত্মরতির আমি কানাই কানা। এই কানা না পারে দেখিতে না পারে বিলাইতে। কহিতে পারেন, ‘ইহাই ছফার ইউটোপিয়া’। ভাববেত্তা টমাস মোরের সন্দেশ হইলেও মন্দ শোনাইত না। না দেশ না পরদেশ।

প্রশ্ন খাড়াইতেছে, মায়ের ভগ হইতে ভাগ হইয়া বান্দা বা সন্তান ‘আমার’ বলিতেছে কেন? কারণ আমার ভাগ বা গর্ভে দুই পদ। একপদে আম বা তামাম, অন্য পদের নাম ‘আর’ সকল পদার্থকে লইয়া। আম অপর অপর অর্থ বিলাইলে গণ হইবে। এহেন মহামিলনের সন্ধান যাহারা পাইয়াছেন তাহারাই ‘মানুষ’ সাব্যস্ত হইয়াছেন। আর যাহারা পান নাই তাহারা বুর্জোয়া সমাজের অর্থ-মাংস-খেকো ‘সুশীল সমাজ’ হইতেছেন। দেখা যাইতেছে, ‘তবু’ অব্যয় মারিয়া কাহারা ছফাকে ঘরের খবর পুছ করিতেছে।


সুশীল সমাজ রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও ব্যক্তি স্বার্থের প্রদায়ক। ছফা কথিত ‘লোক’ নামক গণ্ডুষই তো সুশীল সমাজ।


‘সুশীল সমাজ’ নয় কি? ছফাও তাহাদের ‘তবু’ বা ‘অব্যয়’ পদের কুঠুরিতে টুকাইয়াছেন। এই তবু ‘ধুরন্ধর’ ওর্ফে ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ বলিয়া সাব্যস্ত। ‘সুশীল সমাজ’ নামক উপজাতখানি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সরল ক্রীড়নক। রাষ্ট্র তাহাদের লইয়া খেলে এবং খেলায়! রাষ্ট্র ও সুশীল (ওর্ফে বুর্জোয়া) সমাজই তো নিপীড়ন-সমাজের হোতা। কেননা সুশীল সমাজ রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও ব্যক্তি স্বার্থের প্রদায়ক। ছফা কথিত ‘লোক’ নামক গণ্ডুষই তো সুশীল সমাজ।

তো আহমদ ছফার কবিতা কী পদার্থ? ইন্দ্রিয় আবেগের বশে যাহারা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের মর্ষকাম করিতেছেন, হয়তো তাহাদের কাছে ছফার কবিতা কবিতা-পদবাচ্য নহে। কবিতাখানি কবিতার অধিক গান। যাহা টান মারিয়া প্রাণকে জাগায়। এই প্রাণ পরকে জড়াইয়া ধরে। আর প্রাণ তাহাতে যৌথ জীবনের সামাজিক মর্ম ভেদিয়া ওঠে। আমরা বলিতেছি, কবিতাই তো যৌথ চেতনার সামাজিক মালিকানা। কারণ ভাষা ভাষাকে বিলায়। আলয়ে তাহার অর্থ হয়। তাহা নয় কি?

মহাত্মা ফিদারিক এঙ্গেলস ১৮৯০ নাগাদ জে ব্রশের সকাশে চিরকুট লিখিয়াছেন। তাহার ভাষ্য, ‘ইতিহাসের উপাদান শেষ নাগাদ জীবনের সত্য চাষ আর তাহার পুনরুৎপাদন করিয়া যাওয়া।’ তবে ইহাকে নিছক অর্থনৈতিক কোঠায় একমাত্র নির্ধারক উপাদন বলিলে ভুলে পর্যবসিত হইবার শঙ্কা থাকিতেছে। এই শঙ্কা মহামতি এঙ্গেলসের। তো পুড়িয়া পুড়িয়া কতখানি অঙ্গার হইলে ইতিহাস খাঁটি সোনা হয়? ছফার বয়ানে তাহাই তো ‘আহিতাগ্নি’। বাংলা ভাববিদ্যা মতে, আগুনের হিত ইতিহাসের গোড়া আহিতাগ্নি। ইতিহাসের আগুনে যাহা সম্পাদিত হয়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের বায়ুরোগের বাসনা তাহাতে নাই। কী আছে?

জর্মান বাড়ির দার্শনিক সিগমুন্ড ফ্রয়েড ‘স্বপ্নের বয়ান’ বহিতে এক স্বপ্নদর্শির কথা চাউর করিয়াছেন। ফ্রয়েডের জবানে, এক ব্যক্তির ছাওয়াল গত হইয়াছে। চলরীতি মোতাবেক ছাওয়ালের চারিদিকে চেরাগ জ্বালানো হইল। পাহারা বসাইতে ভাড়া করা হইল লোক। পাশের ঘরে নিদ্রামগ্ন পিতা। দুই ঘরের দরজা খোলা। পিতা স্বপ্নে দেখিলেন অদ্ভুত! ছাওয়াল তাহার সামনে দাঁড়াইয়া বলিতেছে—আব্বাজান, দেখিতেছেন না আমি পুড়িতেছি। পিতার ঘুম ভাঙিয়া গেল। পাশের ঘরে দেখিলেন পাহারাদার ঘুমে অচেতন। একটি জ্বলন্ত কুপি পড়িয়া মরা সন্তানের গায়ে আগুন লাগিয়াছে। ফলে সন্তানের একখানা হাত পুড়িয়া গিয়াছে।

ইহাতে আমরা দেখিলাম সত্যের কেরামতি। ঘর ও পর কিভাবে সত্যের মুখোমুখি হইতেছে। মুখোমুখি হইতেছে পিতা আর ছাওয়াল। মনের ঘর ইহাতে অপর কুঠুরিও ভেদ করিয়াছে। কেননা পিতার বাসনায় ছাওয়ালের মরণ নাই। হয়তো এহেন বাসনাই সত্যের কুঠুরি। যাহা সত্য আকারে স্বপ্ন রূপ লাভ করিয়াছে। তবে সত্যের মুখোমুখি হইবার নাম কি বাসনা? যে বাসনার মৃত্যু নাই। জাগিবার আগে বারবার জাগায়। জাগে বারবার সামাজিক মালিকানায়। আহমদ ছফায়।

(অনলাইন ডেস্ক, ঘাটাইল ডট কম)/-

ঘাটাইলের কয়েকশত গ্রামের নাম ও উপজেলার কিছু তথ্য

বাংংলাদেশের বিভাগ ঢাকার অন্যতম জেলা টাঙ্গাইল। টাঙ্গাইলের একটি উপজেলা ঘাটাইল একটি পৌরসভা এবং ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। উপজেলাটি ছোট বড় কয়েকশত গ্রাম নিয়ে গঠিত।

ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. শাহীদুল ইসলাম ঘাটাইল উপজেলার নানা গ্রামগুলোর একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেছেন। বিভিন্ন সরকারি ওয়েবসাইট ও উইকিপিডিয়া থেকে তিনি গ্রামের নামের এই তথ্যগুলো সংগ্রহ করেন।

ঘাটাইল ডট কম পাঠকদের জন্য ঘাটাইল উপজেলার নানা গ্রামগুলোর নাম ইউনিয়ন ভিত্তিক তুলে ধরা হল। তালিকায় হয়তোবা সবগুলো গ্রামের নাম সন্নিবেশিত সম্ভব হয়নি, তবে পরবর্তীতে আপডেট করা হবে।

১৯৮৪ সালে উপজেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ৪৫১.৩০ বর্গকিমি এবং ৪১১টি গ্রাম ও ১৭টি মহল্লার ঘাটাইল বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা। যা ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। এটি ঢাকা বিভাগের অধীন টাঙ্গাইল জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং টাঙ্গাইল জেলার উত্তরে অবস্থিত।

ঘাটাইল উপজেলার উত্তরে গোপালপুর ও মধুপুর উপজেলা, দক্ষিণে কালিহাতি ও সখীপুর উপজেলা, পূর্বে ফুলবাড়িয়া ও ভালুকা উপজেলা, পশ্চিমে ভুঞাপুর ও গোপালপুর উপজেলা।

ঘাটাইলের উপর দিয়ে বংশী, ঝিনাই ও লৌহজং নদী নামে তিনটি নদী প্রবাহিত হয়েছে।

নিচে ইউনিয়ন ও পৌরসভা ভিত্তিক গ্রাম ও মহল্লার নামের তালিকা দেওয়া হল।

ঘাটাইল পৌরসভা:

চান্দশী (উ. ও দ.), জয়নাবাড়ী, ভানীকাত্রা, বানিয়াপাড়া (উ. ও দ.), ঘাটাইল (উ., দ., মধ্য ও প.), ঝরকা, চতিলা, শিমলা, খারপাড়া, খরাবর, কলেজ পাড়া, হালুয়া পাড়া, তেলেঙ্গাপাড়া, ফতেরপাড়া, চতিলা, রতনপুর, ধারিয়াল।

১নং দেউলাবাড়ী ইউনিয়ন:

দেউলাবাড়ী, রতন বরিষ, চকপাড়া, খিলগাতী (উ. ও দ.), নুচিয়া মামুদপুর, মুখ্য গাঙ্গাইর, আইনপুর, কুতুবপুর, টোলাজান, দার পোটল, পাকুটিয়া (পূ. ও প.), বাহাদীপুর, সন্তোষপুর, হাড়বাড়ী, রামজীবনপুর, রামচন্দ্রপুর, ঝুনকাইল, পানজানা, চৈথট্ট, রসুলপুর, নাগবাড়ী, পোড়াবাড়ী, বন্দকুলিয়া, হাজীপুর, কোলাহা, দয়াকান্দি, পোয়া কোলাহা, ফুলহারা, বানিবাড়ী।

২নং ঘাটাইল ইউনিয়ন :

নরজনা, রামপুর, রৌহা, কাজীপাড়া, নিয়ামতপুর, কুলিয়া, বিরাহিমপুর, করিমপুর, চুহালিয়াবাড়ী, শিমলা, কান্দুলিয়া, খিলপাড়া, কাইতাই, বাইচাইল (উ. ও দ.), দড়ি চৈথট্ট, মজমপুর, আন্দিপুর, কমলাপাড়া, জামালপুর, শাহাপুর।

৩নং জামুরিয়া ইউনিয়ন :

গালা, শংকরপুর, শরীফবাড়ী, ছুনটিয়া, বেতবাড়ী, হাতীবর, কৈডলা, জামুরিয়া, নন্দনগাতী, পুংলী, হেলনাপাড়া, কোনাবাড়ী, ডৌজানী, রাধানগর ফুলহারা, সাধুর গলগণ্ডা, মোমরেজ গলগণ্ডা, শ্রীপুর ফুলহারা, অষ্ট চল্লিশা, নবরত্নবাড়ী, বেনীমাধব, কর্ণা, কোচবাড়ী কর্ণা, কোনাবাড়ী কর্ণা, মধ্য কর্ণা, অলিপুর, এনায়েতপুর, কালিদাসপাড়া, গুণগ্রাম, বীর ঘাটাইল, স্বল্প কর্ণা, হরিপুর, চানতারা, লাউয়া গ্রাম, কাত্রা, কিসমত কাত্রা, বীর খাগিয়ান।

৪নং লোকেরপাড়া ইউনিয়ন :

লোকেরপাড়া, লোকেরপাড়া উত্তর, আথাইল শিমুল, মনোহরা, দশানী বকশিয়া, ছয়ানী বকশিয়া, চর বকশিয়া, গর্জনা, চর বীরসিংহ, বীরসিংহ, রূপের বয়ড়া, গৌরীশ্বর, পাঁচ টিকড়ী (উ., দ. ও মধ্য), বিল গৌরীশ্বর।

৫নং আনেহলা ইউনিয়ন :

গৌরঙ্গী (উ. ও দ. পাড়া), ফুলহারা, সাংগাইলা পাড়া, একাশী, চরপাড়া, খায়েরপাড়া, হাট কয়ড়া, আনেহলা, হোসেননগর, ডাকাতিয়া, পাড়াগ্রাম, মাকেশ্বর, সাইটশৈলা, বগাজান, সিঙ্গুরিয়া, চেংটা, যোগীহাটি, শিমলাকান্দী, ডাকিয়া পটল, বাইশকাইল, পাটিতাকান্দি।

৬নং দিঘলকান্দী ইউনিয়ন :

কোলাহা, দত্তগ্রাম, মাদারীপাড়া কামালপুর, ইনায়েতবাড়ী, ঘুনী, দড়ি বীরচারী, করবাড়ী, বেংরোয়া, সাধুটি, কোকডহরা, চান্দেরপাড়া, বসুবাড়ী, বাদে বৈল তৈল, বীরচারী, কাইজালীপুর, কুরমুশী, শেখ শিমুল, সাইটাপাড়া, মনিদহ, কাগমারী বৈল তৈল, জোতনশর, পুখুরিয়া বৈল তৈল, পূর্ব দত্তগ্রাম, বেলদহ, মোগলপাড়া, মেঘ শিমুল, পারশী, আনার, উপলদিয়া, দিঘলকান্দী, বিয়াড়া, আড়ালিয়া, নাটশালা, মুজাহাটি, কালিয়া গ্রাম, বাদে পারশী, সালেংকা, তেরবাড়ীয়া, পুরুলী মাইজবাড়ী, বাগুনডালী, ভদ্রবাড়ী, মাইজবাড়ী, মিলকুড়িয়া।

৭নং দিগড় ইউনিয়ন :

ধোপাজানী, নজুনবাগ, ব্রাহ্মণশাসন, দিগড়, কচিমধরা, গারট্র, গোবিন্দপুর, মশাজান, আঠারদানা, গোলামগাতী, গোসাইবাড়ী, ভদ্রবাড়ী, হামিদপুর, কাশতলা, বাজে ডাবৈর, কৈডলা, পাকুটিয়া, বাগুন্তা, মেদেনীপাড়া, ঢালুয়াবাড়ী, করের দেওনাপাড়া, গোবিন্দেরপাড়া, চৌধুলীপাড়া, জগতেরপাড়া, দেওনাপাড়া, নারাংগাইল, কাছড়া, অর্জুন কাছড়া, তেঘুরী, দুলাল, নয়াবাড়ী, পুরলী হাসন, ফুলবাড়ী, মানাজী, গুণদত্ত, গুশূয়া, ছামলা।

৮নং দেওপাড়া ইউনিয়ন :

সরাশাক, কালিকাপুর, কোচপাড়া, পাঞ্জারচালা, শিবেরপাড়া, বাদে আমজানী, তালতলা, দেওপাড়া, কালিয়ান, গান্দী, চাম্বলতলা, রহমত খার বাইদ, রানাদহ, চৈতার বাইদ, মলাজানী, যুগিয়া টেঙ্গর, কুমারপাড়া, গানজানা, মাকড়াই, মাকড়াই ভবানী, মালেংগা, গণ্ডঘোষ, চৌরাশা, কোচক্ষিরা, কাপাসিয়া, বারইপাড়া, ভোজদত্ত, হরিণাচালা, কান্দুলিয়াপাড়া, করিমের পাড়া, কাকুরিয়া, কালু কাছড়া, খামার কাছড়া, দেলুটিয়া, ভাগলের পাড়া, ভাবনদত্ত, ঘোড়া মারা, বানীভাসা।

৯নং সন্ধানপুর ইউনিয়ন :

গড় জয়নাবাড়ী, গৌরীশ্বর (২ ও ৪ নং ওয়ার্ড অংশ), শুকনী, ভাটপাড়া, চৌডাল, সন্ধানপুর, মোনারপাড়া, ইসলামপুর, চিংগীবাইদ, সাতকোয়াবাইদ, সাপুয়াচালা, নয়নচালা, টেপিকুশারিয়া, বিদুরিয়া, খাগারাটা, কুশারিয়া (৫নং ওয়ার্ড অংশ), পাড়া কুশারিয়া, গুয়াগম্ভীর, কোকরবাড়ী, কুড়িপাড়া, গিলাবাড়ী, পলাশতলী, চকদিয়াবাড়ী, দিয়াবাড়ী, সিকিবাইদ, চুনাটী, রামখালী, রামপুর, হাজীপুর, চকপাড়া, বিলদুবলাই।

১০নং রসুলপুর ইউনিয়ন :

ধলূয়া, হামকুড়া, রসুলপুর, দিলদারপুর, মমিনপুর, গড়ানচালা, ঘোনার দেউলী, চান্দের দেউলী, খুপিবাড়ী পটল, বিল আঠারচোড়া, চকটানকরাকৈর, পেচারআটা, মাহব, রঘুনাথপুর, খুপি আটা (মাটি আটা), করবাড়ী, শালিয়াবহ সাপটার বাইদ, চিরিংচালা, ফরিদা আটা, জাঙ্গালিয়া, শালিয়াবহ, ঘোড়ার টেকী, সরাবাড়ী, আথেক্কাপাড়া, টানকরাকৈর, মধ্যপাড়া, কাঠালিয়া আটা।

১১নং ধলাপাড়া ইউনিয়ন :

বিলজলঙ্গী, কোনাবাড়ী, সাফাকোট, ভর করা কৈর, পূর্বপাড়া, মেধার, মধ্যপাড়া, ধলাপাড়া (উ. ও দ.), নামাপাড়া, হিন্দুপাড়া, সরিষাআটা, টানপাড়া, গাঙ্গাইর (উ., দ. ও মধ্য পাড়া), ঘোনাপাড়া, বন্যাপাড়া, চকপাড়া, নোয়াপাড়া, শহর গোপিনপুর আষাড়িয়া চালা, দিঘলিয়া চালা, শামচালা, তেঁতুলিয়া চালা, বেউলাতৈল, চাম্বলচারী বটতলা, শহর গোবিন্দপুর, ইউনিনের চালা, ভূইয়ার চালা, পরপাশা, মোথাজুড়ি, সিড়ির চালা, ভবানীপুর, সুন্দর ফকির, রামদেবপুর নামাপাড়া, রামদেবপুর আষাড়িয়া চালা, টানপাড়া, জোয়ালভাঙ্গা, হেঙ্গারচালা।

১২নং সংগ্রামপুর ইউনিয়ন :

বগা, সত্তরবাড়ী, খাগরাটা, ছনখোলা, নলমা, টেপীমদন গোপাল, বেলুয়াটিকী, বোয়ালীচালা, কড়ালিয়া, এগারকাহনিয়া, মূলবাড়ী, ফুলবাড়ী, দেওজানা, ফকিরচালা, বড়চালা, বেউলাচালা, কাউটেনগর, বোয়ালী হাটবাড়ী, চাম্বুলিয়া, চাপড়ী, লাহিড়ীবাড়ী, ফসল, আমুয়াবাইদ, কামারচালা, খোপিবাড়ী, মানিকপুর, সংগ্রামপুর।

১৩নং লক্ষিন্দর ইউনিয়ন :

মুরাইদ, সিংহেরচালা, দুলালিয়া, শাপলাপাড়া, সিদ্দিখালী, খাজনাগড়া, মধুপুরচালা, চারিয়া বাইদ, কাজলা, বাসাবাইদ, আকন্দের বাইদ, হারংচালা, লক্ষিন্দর, ফাইটামারী, বাগাড়া, কাইকারচালা, বেইলা, মনতলা, সুক্তার বাইদ, তালতলা।

১৪নং সাগরদিঘী ইউনিয়ন :

কামালপুর, পাহারিয়া, উত্তরপাড়া, দক্ষিণ পাড়া, চুলাবর, গাবতলী, গরবান্দা, ইছালীপাড়া, বিয়ালপাড়া, জোড়াদিঘী, গোয়ারিয়া পাড়া, বড়চালা, তেবাইতেপাড়া, সাগরদিঘী, হাতীমারা, নয়াপাড়া, বড়বাইদ, জালালপুর, বেতুয়াপাড়া, গুপ্তবৃন্দাবন, শোলাকুড়া।

উইকিপিডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে (সর্বশেষ তথ্য নয়) ঘাটাইল উপজেলার লোকসংখ্যা চার লাখ ৩৪ হাজার জন। এতে পুরুষ- দুই লাখ ১৩ হাজার এবং মহিলা ২ লাখ ২০ হাজার জন। উপজেলার গ্রামের সংখ্যা ৪১১ টি, মহল্লার সংখ্যা ১৭ টি, পরিবারের সংখ্যা এক লাখ চার হাজারটি, হাট-বাজারের সংখ্যা ৩৭টি, বনাঞ্চল ৮৮.৪৫ বর্গ কিঃ মিঃ।

উপজেলায় শিক্ষার হার ৪৪ শতাংশ,·কলেজের সংখ্যা সাতটি (মহিলা কলেজ একটি), ফাজিল মাদ্রাসা পাঁচটি, দাখিল মাদ্রাসা ২৭ টি, এবতেদিয়া মাদ্রাসা (স্বতন্ত্র ও এমপিও ভূক্ত) ১২ টি, সরকারি প্রাথ্যমিক বিদ্যালয় ১৫৯ টি, রেজিষ্টার প্রাথ্যমিক বিদ্যালয় ১৭ টি, নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছয়টি, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় (বালক) ৩৬ টি, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় (বালিকা) সাতটি।

উপজেলায় মোট রাস্তার পরিমাণ ৮০৮ কিঃ মিঃ, পাকা রাস্তার পরিমাণ ১৯১ কিঃ মিঃ, এইচ. বি রাস্তা সাত কিঃ মিঃ, কাচা রাস্তা ৯৫০ কিঃ মিঃ, নদীর সংখ্যা চারটি, জমির পরিমাণ ৪৫ হাজার ১৭১ হেক্টর, আবাদী জমি ৩ হাজার ১৫০ হেক্টর, অনাবাদী জমি ৪০ হেক্টর, খাদ্যের চাহিদা ১২ হাজার ৬৪ মেঃ টন, উৎপাদন চাহিদা ১৫ হাজার ১৪২ মেঃ টন।

উপজেলায়·মসজিদ ৬৯৪ টি,·মন্দির ৩০ টি, গির্জা একটি, এতিমখানার সংখ্যা ১৪ টি।

ঘাটাইলে বন্দোবস্থ যোগ্য খাস জমির পরিমান ১ হাজার ৩৭৪ একর, বন্দোবস্থকৃত খাস জমির পরিমান ৭৪৩ একর, বন্দোবস্থ গ্রহনকারীর সংখ্যা ১ হাজার ১৫৫ জন, বদ্ধ জলমহলের সংখ্যা ৫২ টি, পুকুরের সংখ্যা ৫ হাজার ৬৯২ টি, খাস পুকুরের সংখ্যা ৫২ টি।

ঘাটাইল উপজেলায় বয়স্ক ভাতা গ্রহনকারীর সংখ্যা ৮ হাজার ৯১ টি, বিধবা ভাতা গ্রহনকারীর সংখ্যা ২১৫৪ টি, মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা গ্রহনকারীর সংখ্যা ১ হাজার ৪৮ জন, প্রতিবন্ধি ভাতা গ্রহনকারীর সংখ্যা ৯৫০ জন, প্রতিবন্ধি শিক্ষা উপবৃ্ত্তি গ্রহনকারীর সংখ্যা ৬২ জন।

(স্টাফ রিপোর্টার, ঘাটাইল ডট কম)/-

গেরিলা থেকে সুরেলা আজম খান

একজন পপ গুরু, মুক্তিযোদ্ধা, ব্যান্ডসম্রাট, ক্রিকেটার, সংগঠক, গায়ক, অভিনেতা, মডেল আজম খান। তাঁর পুরো নাম মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান। দীর্ঘদিন দূরারোগ্য ক্যান্সার ব্যাধির সাথে লড়াই করে ২০১১ সালের ৫ জুন রোববার সকাল ১০টা ২০মিনিটে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার জন্য প্রয়াণ দিবসের বিনম্র ভালবাসা, শ্রদ্ধাযুক্ত স্মরণ।

১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আজিমপুরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবার নাম মোহাম্মদ আফতাব উদ্দিন খান, মা জোবেদা খাতুন।

১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানের সময়ে আজম খান পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তখন তিনি ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে গণসঙ্গীত প্রচার করেন।

১৯৭১ সালে আজম খানের বাবা আফতাব উদ্দিন সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থাকায় বাবার অনুপ্রেরণায় যুদ্ধে যাবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন তিনি। যুদ্ধ শুরু হলে, তিনি তার দুই বন্ধু সহ পায়ে হেঁটে আগরতলা চলে যান। এসময় তার লক্ষ্য ছিল সেক্টর ২’এ খালেদ মোশাররফের অধীনে যুদ্ধে যোগদান করা।

আজম খান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন ২১ বছর বয়সে। তার গাওয়া গান প্রশিক্ষণ শিবিরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরনা যোগাতো। তিনি প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন ভারতের মেলাঘরের শিবিরে। যুদ্ধ প্রশিক্ষণ শেষে তিনি কুমিল্লায় পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সন্মুখ সমরে অংশ নেয়া শুরু করেন। কুমিল্লার সারদায় প্রথম সরাসরি যুদ্ধ করেন, এরপর ফিরে যান আগরতলায়। তারপর তাকে পাঠানো হয় ঢাকায় গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিতে।

আজম খান ছিলেন দুইনম্বর সেক্টরের একটা সেকশনের ইন-চার্জ, সেক্টর কমান্ডার ছিলেন কর্ণেল খালেদ মোশাররফ। ঢাকায় তিনি সেকশন কমান্ডার হিসেবে ঢাকা ও এর আশেপাশে বেশ কয়েকটি গেরিলা আক্রমণে অংশ নেন। মূলত তিনি যাত্রাবাড়ি- গুলশান এলাকার গেরিলা অপারেশনগুলো পরিচালনার দায়িত্ব পান। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল তার নেতৃত্বে সংঘটিত ‘অপারেশান তিতাস’।

তাদের দায়িত্ব ছিল ঢাকার কিছু গ্যাস পাইপ লাইন ধ্বংস করার মাধ্যমে বিশেষ করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, হোটেল পূর্বাণী ইত্যাদির গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানো। তাদের লক্ষ্য ছিল, হোটেলে অবস্থানরত বিদেশীরা যাতে বুঝতে পারে, দেশে যুদ্ধ চলছে।

এই অপারেশনে তিনি বাম কানে আঘাত পান, পরবর্তীতে এই আঘাত আজম খানের শ্রবণ ক্ষমতায় বিঘ্ন ঘটায়। যুদ্ধে বাঁ কানে আঘাত পান, তারপর থেকে আজীবন ভালো শুনতে পেতেন না। তবু গান থামেনি।

“প্রশিক্ষণ শেষে সন্ধা ৬টার পর সদলবলে সবাই ক্যাম্পে আত্মশক্তি জাগানোর জন্য বাটি, চামচ, ক্যান, কৌটা, ডিব্বা পিটিয়ে বাজিয়ে সবাই মিলে গাইতেন গণসংগীত।”, বাবাকে নিয়ে আলাপচারিতায় জানিয়েছিলেন ইমা খান।

স্বাধীনতা যুদ্ধ জয়লাভ করে আজম খান তার সঙ্গীদের নিয়ে পুরোপুরি ঢাকায় প্রবেশ করেন ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। এর আগে তারা মাদারটেকের কাছে ত্রিমোহনীতে সংগঠিত যুদ্ধে পাক সেনাদের পরাজিত করেন।

আজম খানের কর্মজীবনের শুরু হয় ষাটের দশকের শুরুতে। ১৯৭১ সালের পর তার ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’ এবং আখন্দ (লাকী আখন্দ ও হ্যাপী আখন্দ) ভাতৃদ্বয় দেশব্যাপী সঙ্গীতের জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশে তরুণ প্রজন্ম যখন খুব দ্রুতই হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে গেলো, তখন আজম খানের মনে হলো এই তারুণ্যকে কোনো একটা আনন্দের সঙ্গে যুক্ত করা না গেলে এরা দেশের জন্য ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসবে।

বন্ধু নিলু আর মনসুরকে গিটারে, সাদেক ড্রামে আর নিজেকে প্রধান ভোকাল করে করলেন অনুষ্ঠান। ১৯৭২ সালে বিটিভিতে ‘এতো সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’ এবং ‘চার কালেমা সাক্ষীদেবে’ গান দু’টি প্রচার হলে তুমুল প্রশংসা ও জনপ্রিয়তা পান আজম খান, দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়ে যায় তাদের দল।

১৯৭৪’৭৫ সালের দিকে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে বাংলাদেশ (রেললাইনের ঐ বস্তিতে) শিরোনামের গান গেয়ে হৈ-চৈ ফেলে দেন।

আজম খানের পাড়ার বন্ধু ছিলেন ফিরোজ সাঁই। পরবর্তী কালে তার মাধ্যমে পরিচিত হন ফকির আলমগীর, ফেরদৌস ওয়াহিদ, পিলু মমতাজের সাথে। একসাথে বেশ কয়েকটা জনপ্রিয় গান করেন তারা।

এরই মধ্যে আরেক বন্ধু ইশতিয়াকের পরামর্শে সৃষ্টি করেন একটি এসিডরক ঘরানার গান ‘জীবনে কিছু পাবোনা এ হে হে!’। আজম খানের দাবী, এটি বাংলা গানের ইতিহাসে প্রথম হার্ডরক।

মুক্তিযুদ্ধকালে যেভাবে গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে অনুপ্রাণিত করেছেন, যুদ্ধের পরও আবার কণ্ঠে তুলে নিলেন গান। নতুন ধরনের গান। গেয়ে ওঠেন সালেকা মালেকা আর আলাল দুলালদের গান, রেল লাইনের বস্তিতে সন্তানহারা মায়ের কান্না তুলে আনেন গিটারের ছয়তারে, হারিয়ে যাওয়া অভিমানীকে খুঁজে ফেরেন গানে গানে আর পেয়েও হারিয়ে ফেলার আর্তনাদে ভরে তোলেন বাংলা গানের আকাশ…

১৯৮৬ সালে ‘কালাবাউল’ শিরোনামের একটি নাটকে কালা বাউলের চরিত্রে এবং ২০০৩ সালে শাহীন-সুমন পরিচালিত ‘গডফাদার’ চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি।

২০০৩ সালে ক্রাউন এনার্জি ড্রিংকসের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রথম বিজ্ঞাপন চিত্রের মডেল হন। এরপর ২০০৫’০৮সালে বাংলালিংক এবং ২০১০ সালে কোবরা ড্রিংকসের বিজ্ঞাপনের মডেল হন।

খেলাধুলায়ও ব্যাপক আগ্রহ ছিলো আজম খানের। ক্রিকেটার হিসেবে বেশ পরিচিত ছিলেন এ পপতারকা। গোপীবাগ ফ্রেন্ডসক্লাবের হয়ে ১৯৯১’২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলেছেন। ৯ বছরে অনেকগুলো ক্রিকেট ম্যাচে নিজের খেলোয়ার প্রতিভার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

মুখগহ্বরের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন আজম খান। দেশে-বিদেশে অনেক চিকিৎসাও তাকে ফেরাতে ব্যর্থ হয়। অসাধারণ প্রতিভা ও দৃপ্ত কণ্ঠের একসংগীত জাদুকরের জীবন থেমে যায় ৬১ বছর বয়সে।

দীর্ঘদিন দূরারোগ্য ক্যান্সার ব্যাধির সাথে লড়াই করে ৫জুন ২০১১ রোববার সকাল ১০টা ২০ মিনিটে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আজম খান।

আজকের এই দিনে পৃথিবী থেকে চলে গিয়ে আজম খান রেখে গেছেন তার নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের সুরেলা সংগ্রাম এবং বাংলা ব্যান্ড নিয়ে আজীবন মগ্ন থাকার উপাখ্যান।

(নিজস্ব প্রতিবেদক, ঘাটাইল ডট কম)/-

বজ্রপাতে কি করবেন- কি করবেন না

বজ্রপাতের সময় কী করা উচিত, আর কী উচিত নয়- সে বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে গতকাল এবং আজকে বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দুইজনের মৃত্যু হয়েছে বজ্রপাতে। এছাড়াও দেশে বিভিন্ন জায়গায় মর্মান্তিক এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

আমাদের দেশে সাধারণত ধান কাটার সময় বজ্রপাতে নিহতের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। এরপর সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে মাছ ধরতে গিয়ে। এছাড়া মাঠে গরু আনতে গিয়ে, টিন ও খড়ের ঘরে অবস্থান ও ঘুমানোর সময় বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের প্রতিবেদনে বজ্রপাতের সময় করণীয় সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়, যারা ক্ষেত-খামারে কাজ করেন তারা বেশি বজ্রপাতের ঝুঁকিতে থাকেন। একারণে আকাশে মেঘ দেখলে আগে থেকে সাবধান হতে হবে এবং নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে পাকা বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া বেশি নিরাপদ। বৃষ্টির আগে বাড়ির ছাদ বা উঁচু স্থানে থাকলে দ্রুত সেখান থেকে নেমে যেতে হবে।

  • বজ্রপাতের সময় পাকা বাড়ির নিচে আশ্রয় নিতে এবং উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের লাইন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এ সময় জানালা থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি ধাতব বস্তু এড়িয়ে চলা, টিভি-ফ্রিজ না ধরা, গাড়ির ভেতর অবস্থান না করা এবং খালি পায়ে না থাকারও পরামর্শ দিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।
  • ঘন ঘন বজ্রপাত হতে থাকলে খোলা বা উঁচু জায়গায় না থাকাই ভালো। সবচেয়ে ভালো হয় যদি কোনও দালানের নিচে আশ্রয় নেওয়া যায়।
  • বজ্রপাত হলে উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটিতে বিদ্যুৎস্পর্শের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই বজ্রঝড়ের সময় গাছ বা খুঁটির কাছাকাছি থাকা নিরাপদ নয়। ফাঁকা জায়গায় যাত্রী ছাউনি বা বড় গাছে বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে অত্যন্ত বেশি।
  • বজ্রপাতের সময় বাড়িতে থাকলে জানালার কাছে গিয়ে উঁকিঝুঁকি নিরাপদ নাও হতে পারে। এ সময় জানালা বন্ধ রেখে ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
  • বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করা ঠিক হবে না। এমনকি ল্যান্ড ফোন ব্যবহার না করতেও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বজ্রপাতের সময় এগুলোর সংস্পর্শ এসে অনেকে স্পৃষ্ট হন।
  • বজ্রপাতের সময় পানি ও যেকোনো ধাতব বস্তু যেমন-পানির কল, সিঁড়ি বা বারান্দার রেলিং স্পর্শ করা যাবে না। বিদ্যুৎ পরিবাহী কোনো বস্তু থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হবে।
  • বজ্রপাতের সময় ইলেকট্রিক সংযোগ ও ডিশের ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। সেগুলো বন্ধ থাকলেও স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক সংযোগযুক্ত সব ধরনের যন্ত্রপাতি এড়িয়ে চলা উচিত। টিভি, ফ্রিজ ইত্যাদি বন্ধ করা থাকলেও স্পর্শ করা ঠিক হবে না। বজ্রপাতের আভাস পেলে আগেই প্লাগ খুলে রাখা ভালো।
  • বজ্রপাতের সময় রাস্তায় গাড়িতে থাকলে যত দ্রুত সম্ভব বাড়িতে ফেরার চেষ্টা করতে বলেছেন আবহাওয়াবিদরা। যদি তখন প্রচণ্ড বজ্রপাত ও বৃষ্টি হয়, তাহলে গাড়ি কোনও গাড়িবারান্দা বা পাকা ছাউনির নিচে রাখা যেতে পারে। ওই সময় গাড়ির কাচে হাত দেওয়াও বিপজ্জনক হতে পারে।
  • বৃষ্টি হলে রাস্তায় পানি জমতে পারে। অনেক সময় বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে সেই পানিতে পড়ে হতে পারে দুর্ঘটনার কারণ। কাছে কোথাও বাজ পড়লেও সেই পানি হয়ে উঠতে পারে বিদ্যুতস্পৃষ্টের কারণ।
  • বজ্রপাতের সময় চামড়ার ভেজা জুতা বা খালি পায়ে থাকা খুবই বিপজ্জনক। যদি একান্ত বের হতেই হয়, পা ঢাকা জুতো ব্যবহার করা ভালো। রাবারের গামবুট এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো কাজ করবে।
  • বজ্রপাতের সময় রাস্তায় চলাচলেও খেয়াল রাখতে হবে। কেউ আহত হয়ে থাকলে দেরি না করে তাকে হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করতে হবে। তবে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট কাউকে ঘটনার সময় খালি হাতে স্পর্শ করলে নিজেও ঝুঁকিতে পড়তে হবে।
  • মাঠের মধ্যে ফাঁকা স্থানে থাকলে বজ্রপাতের সময় কানে আঙুল দিয়ে চোখ বন্ধ করে নিচু হয়ে বসে থাকতে হবে। তবে মাটিতে শোওয়া যাবে না। কারণ, মাটিতে শুলে বিদ্যুৎপৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • বজ্রপাতের সময় গাড়ির ভেতরে থাকা নিরাপদ। তবে গাড়ির ধাতব কোনো অংশ স্পর্শ করা যাবে না।
  • বজ্রপাতের সময় চামড়ার ভেজা জুতা বা খালি পায়ে থাকা খুবই বিপজ্জনক।

বিলুপ্ত সার্ক আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক সুজিত কুমার দেবশর্মা বলেন, কালবৈশাখীর মৌসুমে বজ্রঝড় বেশি হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে গড়ে দুই থেকে তিনশ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

“যখন কিউমুলোনিম্বাস মেঘ তৈরি হয়, তখনই বজ্রঝড় হয়ে থাকে। কিউমুলোনিম্বাস মেঘ হচ্ছে খাড়াভাবে সৃষ্টি হওয়া বিশাল আকৃতির পরিচালন মেঘ; যা থেকে শুধু বিদ্যুৎ চমকানো নয়, বজ্রপাত-ভারি বর্ষণ-শিলাবৃষ্টি-দমকা-ঝড়ো হাওয়া এমনকি টর্নেডোও সৃষ্টি হতে পারে।”

বায়ুমণ্ডলে বাতাসের তাপমাত্রা ভূ-ভাগের উপরিভাগের তুলনায় কম থাকে। এ অবস্থায় বেশ গরম আবহাওয়া দ্রুত উপরে উঠে গেলে আর্দ্র বায়ুর সংস্পর্শ পায়। তখন গরম আবহাওয়া দ্রুত ঠাণ্ডা হওয়ায় প্রক্রিয়ার মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে বজ্রমেঘের সৃষ্টি হয়।

বজ্রপাতে আহতদের চিকিৎসা বৈদ্যুতিক শকে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মতো। তাদের শরীর থেকে যত দ্রুত সম্ভব বৈদ্যুতিক চার্জ অপসরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে আহত ব্যক্তির শরীরে ম্যাসাজ করতে হবে। এছাড়া যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

(অনলাইন ডেস্ক, ঘাটাইল ডট কম)/-