মওলানা ভাসানী ও তাঁর ঈদ

নামাজ হইতে আসিয়া হুজুর কোরবাণীর হুকুম দিলেন। ময়মনসিংহের সৈয়দ শরফুদ্দীন হাবীব একটি গরু পাঠাইয়াছিলেন। মুরিদদের কেউ কেউ খাসী দিয়াছিলেন। সব জবেহ হইল।

হুজুর কাহাকেও গোশত দেন না। পাক করাইয়া একসাথে সবাইকে খাওয়াইয়া দেন।

পাকের মশলার অভাবে অনেক গরীব গোশত বিক্রয় করিয়া দেয়। অথবা কোন রকম সিদ্ধ করিয়া খায়। তাই হুজুর খিচুড়ী ও গোশত খাওয়ান।

হুজুরের বাড়িতে একটা কুকুর থাকিত। এক টুকরা ভাল গোশত কুকুরটাকে নিজেই খাইতে দিলেন। বলিলেন, নাড়ি-ভুড়ি তো খাবেই। কিন্তু কোরবানীর গোশতের হিস্যা হিসাবে এইটা।

দুপুরে হাজার হাজার লোকের জমায়েত হইল। সবার হাতে কলাপাতা।

দশের হাতে শীগগীর পাকও হইয়া গেল। গরু খাসী যাহা পাক হইল সবই খাওয়ানো হইল।

আমরাও কিছু খাইতে পাইলাম বটে। রাত্রে অবিশ্বাস্য হইলে সত্য- হুজুর ও আমরা ডাল ভর্তায় ভাত খাইলাম।

খাইতে বসিয়া হুজুর বলিলেন, একটা ভুল হইয়া গেল রে। বাবুর মার (স্ত্রী) লাগি আমাদের কোরবানীর তরকারি তো রাখা হইল না।

তারপর নিজেই বলিলেন, ঠিক আছে, কাল নানান জায়গা তনে (থেকে) তো তরকারি আসবই।

হক কথা/২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৬

৩১ আগস্ট পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চলমান ছুটি আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এই সময়ে দেশের সব রকমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবুল খায়ের আজ বুধবার (২৯ জুলাই) এ তথ্য জানিয়েছেন। করোনাভাইরাস জনিত বৈশ্বিক মহামারির কারণে শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আজ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে ছুটির এই নতুন তারিখ নির্ধারণ করে। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি অনলাইনে মিটিং করে এ সিদ্ধান্ত জানান।

এর আগে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এবার তা ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হলো।

প্রসঙ্গত, করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় এ পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি কয়েক দফা বাড়ানো হয়। গত ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ছুটির সময় শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এমনকি ঘরে বসেই শিক্ষার্থীদের অনলাইনে পাঠদানের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘আমার ঘরে আমার স্কুল’ শিরোনামে সংসদ টেলিভিশনে ক্লাস চলছে এবং ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিও ক্লাস আপলোড করা হচ্ছে। এছাড়া, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ঘরে বসে শিখি’ শিরোনামে সংসদ টেলিভিশনে ভিডিও ক্লাস চলছে। এই নামে একটি ওয়েব পোর্টালও ডেভেলপ করা হচ্ছে।

দীর্ঘ ছুটির কারণে সাধারণ এলাকার পাশাপাশি পাহাড়ি , চরাঞ্চল ও হাওরসহ দুর্গম এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের আওতায় আনারও চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি কমিউনিটি রেডিও’র মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রমের আওতায় আনার চিন্তাভাবনা হচ্ছে। তবে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি কমিয়ে এবং ক্লাস বাড়িয়ে ক্ষতিপূরণ করার কথা ভাবছে সরকার।

(বাংলা নিউজ, ঘাটাইল ডট কম)/-

বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর আহমদ ছফার ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, প্রখ্যাত লেখক, সাহিত্যিক ও সংগঠক আহমদ ছফার ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ মঙ্গলবার। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী কীর্তিমান এ লেখক ২০০১ সালের ২৮ জুলাই অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যুবরণ করেন।

সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন আহমদ ছফা। গল্প, গান, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, ইতিহাস, ভ্রমণকাহিনী মিলিয়ে রচনা করেছেন ৩০টির বেশি বই। এ ছাড়া আমৃত্যু তিনি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় কলাম লিখেছেন।ষাটের দশকে সাহিত্য জগতে পা রাখেন আহমদ ছফা। সমসাময়িক উপন্যাস লেখকদের মধ্যে তিনি ছিলেন একেবারেই আলাদা। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয় আহমদ ছফার প্রথম উপন্যাস ‘সূর্য তুমি সাথী’। বক্তব্যের স্পষ্টতা আর তীব্রতার জন্য খুব দ্রুত পাঠকদের মধ্যে সাড়া ফেলেন তিনি। তার লেখা প্রবন্ধমূলক গ্রন্থগুলো সর্বাধিক আলোচিত। তার প্রবন্ধ গ্রন্থের মধ্যে জাগ্রত বাংলাদেশ, বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস, বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা, শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য প্রবন্ধ, বাঙালি জাতি এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য।

প্রতিষ্ঠানবিরোধী আহমদ ছফা ‘লেখক শিবির পুরস্কার’ এবং বাংলা একাডেমি প্রণীত ‘সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার’ প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৮০ সালে ‘ইতিহাস পরিষদ পুরস্কার’ ও ২০০২ সালে ‘মরণোত্তর একুশে পদক’-এ ভূষিত হন তিনি।

আহমদ ছফা ছিলেন একাধারে গল্পকার, ঔপন্যাসিক, কবি ও পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তিক নানান কর্মকান্ডের মাধ্যমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বাংলাদেশের জাতিসত্তার পরিচয়, সামাজিকতা, রাজনৈতিকতা তার লেখায় বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে। অনন্য বয়ানভঙ্গি ও সহজাত রসবোধে ছফার সাহিত্য ভাস্বর। নানা সময়ে, নানা প্রেক্ষিতে ছফা প্রাসঙ্গিক নানা চমকপ্রদ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কথা লিখেছেন যা উদ্ধৃতিযোগ্য।

“একটা মানুষের মধ্যেই গোঁজামিল থাকে। কিন্তু যে সাপ সে হান্ড্রেড পারসেন্ট সাপ। যে শেয়াল সে হান্ড্রেড পার্সেন্ট শেয়াল। মানুষ সাপও হইতে পারে, শেয়ালও হইতে পারে, পাখিও হইতে পারে। মানুষেরই বিভিন্ন চরিত্র নেয়ার ক্ষমতা আছে। বুঝছো, গ্রাম দেশে আগে সাপ আর শেয়াল পাওয়া যাইতো। এগুলা নাই এখন। কারণ সাপ, শেয়াল এরা মানুষ হিসাবে জন্মাইতে আরম্ভ করছে”।

নাসির আলী মামুনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ঠিক এই কথাগুলোই বলেন আহমদ ছফা।

সাবলীল ভাষায় লেখা এই সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয় ‘আহমদ ছফার সময়’ বইটিতে। খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল বইটি। কারণ বইয়ের মানুষটি যে ছিলেন সবার চোখের মণি।

সারাজীবন নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষের না বলা কথাগুলো বলে যাওয়া এই মানুষটি আজও মিশে আছেন তরুণ সমাজের প্রেরণায়, চেতনায়।

বাংলাদেশের সাহিত্য ইতিহাসের অন্যতম প্রতিবাদী এবং প্রগতিশীল লেখক আহমদ ছফা। ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। নিজের পরিবার সম্পর্কে বলেন,

“আমার পরিবার চাষা। আমার পক্ষে এটা ওভারলুক করা কষ্টকর, রঙ চড়িয়ে কিছু বলতে চাই না। আমার পূর্বপুরুষেরা সরাসরি কৃষি উৎপাদনের সাথে যুক্ত ছিল। এই পরিচয় আমার অহংকার”।  

সাদামাটা এই মানুষটি তাই সহজেই ছুঁয়ে গেছেন সবার হৃদয়। তার পিতার নাম হেদায়েত আলী ওরফে ধন মিয়া, মার নাম আসিয়া খাতুন। দুই ভাই চার বোনের মধ্যে আহমদ ছফা ছিলেন দ্বিতীয়।

বাবার হাতে গড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ গাছবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়ায় হাতেখড়ি হয় ছফার। ১৯৬০ সালে নিজের গ্রামের নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন তিনি। ১৯৬২ সালে চট্টগ্রাম নাজিরহাট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে সে বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন তিনি। যদিও সেখানে খুব বেশি দিন ক্লাস করেননি ছফা। খুব সম্ভবত ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে এমএ পরীক্ষা দেয়ার আগেই বাংলা একাডেমির পিএইচডি গবেষণা বৃত্তির জন্য আবেদন করেন এবং তিন বছরের ফেলোশিপ প্রোগ্রামের জন্য মনোনীত হন। গবেষণার বিষয় ছিল ‘১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব, বিকাশ এবং বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তার প্রভাব’।  ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন ছফা। পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করা আর সম্ভব হয়নি তার।

সৃষ্টিশীল এই লেখক শুরু থেকেই ছিলেন প্রথাবিরোধী। পড়াশোনা চলাকালীন অবস্থায় সুধাংশু বিমল দত্তের মাধ্যমে কৃষক সমিতি ন্যাপ বা তৎকালীন জনপ্রিয় গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। মাস্টারদা সূর্যসেনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করে আহমদ ছফাকে। কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন উপড়ে ফেলেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি গ্রেপ্তার এড়াতে এবং পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছুদিন আত্মগোপন করেন। এরপর ১৯৮৬ সালের দিকে এসে জার্মান ভাষার উপর গ্যেটে ইন্সটিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। গ্যেটের অমর সাহিত্য ‘ফাউস্ট’ অনুবাদের ক্ষেত্রে এটিই ছিল প্রথম সোপান।

ষাটের দশকে সাহিত্য জগতে পা রাখেন আহমদ ছফা। সমসাময়িক উপন্যাস লেখকগণের মধ্যে তিনি ছিলেন একেবারেই আলাদা। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয় আহমদ ছফার প্রথম উপন্যাস ‘সূর্য তুমি সাথী’। বক্তব্যের স্পষ্টতা আর তীব্রতার জন্য খুব দ্রুত পাঠকদের মাঝে সাড়া ফেলে দেন তিনি।

১৯৭১ সালের জুলাই মাসে স্বাধীনতার পথে হাঁটতে থাকা বাংলাদেশের প্রথম গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয় ছফার প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’। পরবর্তীতে বাংলা একাডেমি থেকে সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন তিনি। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, গান, প্রবন্ধ, অনুবাদ, ইতিহাস, ভ্রমণ কাহিনী সব মিলিয়ে ত্রিশটিরও বেশি গ্রন্থের প্রণেতা আহমদ ছফা। তার লেখাগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় নজরে পড়বে। প্রায় প্রতিটি লেখাই সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সমসাময়িক পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে।

বেশ কিছু পত্রিকার সাহিত্য পাতার সম্পাদক ছিলেন আহমদ ছফা। অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক গণকন্ঠ’ এর সম্পাদকীয় উপদেষ্টা এবং ‘সাপ্তাহিক উত্তরণ’ এর প্রধান সম্পাদক ছিলেন তিনি। স্পষ্টভাষী ছফা সত্যের প্রচারে সদা সচেষ্ট ছিলেন। তিনি খুব ধার্মিক ছিলেন এমন প্রমাণ পাওয়া না গেলেও ধর্মের প্রতি তার বিশ্বাস ছিল প্রশ্নাতীত।

১৯৭০ সালে আহমেদ শরীফের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’, তিনি ছিলেন সংগঠনটির প্রথম সভাপতি। তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল প্রগতিশীল লেখকদের আন্দোলনকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। ব্যক্তিত্বের ছটায় তরুণ প্রজন্মের কাছে খুব সহজেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন আহমদ ছফা। তবে কখনোই সস্তা খ্যাতির মুখাপেক্ষী ছিলেন না তিনি।

ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাবিদ হিসেবে আলাদা কদর ছিল তার। কাব্যিক ভঙ্গিমায় স্থানীয় ভাষায় ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি ফুটিয়ে তুলতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। গ্যোতের লেখার পাশাপাশি বার্ট্রান্ড রাসেলের অ্যাগনোস্টিক বা ঈশ্বরে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝামাঝি অবস্থা নিয়ে বেশ কিছু লেখাও অনুবাদ করেন তিনি। তবে প্রাবন্ধিক হিসেবেই আহমদ ছফার পরিচিতি সবচেয়ে বেশি।

বাংলার নামকরা চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন আহমদ ছফা। দুজনেই ছিলেন বোহেমিয়ান বা ভবঘুরে, অবিবাহিত এবং খ্যাতি, ধন-সম্পদ বা অন্যান্য বৈষয়িক মোহ বিবর্জিত। ১০০ বছরেও এমন ব্যক্তিত্ব আর দুটি খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আহমদ ছফা নিজেই।

“আমি মনে করি আমার স্বীকৃতি নিয়ে পশ্চিম বাংলা কী বলতে চায় সেটা আমার লুক আউট নয়। আমি পৃথিবীর গন্ধ এবং স্বাদ বুঝি। তুমি দেখবা আমি যখন আমেরিকায় যাবো তখন ওখানেও ঝড় তুলবো। তখন ওখানকার পন্ডিতদের সাথে দেখবে আমি কিভাবে মিশে গেছি। সুলতানের বিশালত্ব চিন্তা করো, ৭৬-এর আগে এই জায়ান্ট কোথায় ছিলো? কেউ তাকে আবিস্কার করলো না কেন? এই আমি যাকে প্রেজেন্ট করেছি, আরেকজন লোক আসুক তো এমন।

‘আহমদ ছফার সময়’ বইটিতে এমনটাই বলেছিলেন তিনি। তার চোখে সুলতানও ছিলেন একজন দার্শনিক। বাংলার মাটির প্রতীক তিনি, বাংলার মাটির যোগ্য সন্তান তিনি। আমাদের চারপাশে ঘিরে থাকা খুঁটিনাটি সমস্যাগুলোই ছিল তার শিল্পের খোরাক। শিল্প-সংস্কৃতির জগতে তাকে সাহায্য করতে কেউ এগিয়ে আসেনি।

আহমদ ছফা মনে করতেন এই বাংলায় সুলতানকে আরও বেশি দরকার। জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসানরাও বড় শিল্পী, ভদ্রলোক। তবে খেটে খাওয়া মানুষের কাছে শিল্পের জায়গা করে দিতে হলে সুলতানদের কোনো বিকল্প নেই বলেই তিনি বিশ্বাস করতেন।

সাধারণত ছোট ভলিউমে বই বের করতেন আহমদ ছফা। এই ছোট বইগুলোই চট করে পাঠকদের মনে জায়গা করে নিতো, কেননা তাতে থাকতো গণমানুষের কষ্টের প্রতিফলন, তাদের জীবনের দুর্দশার চালচিত্র। ‘সূর্য তুমি সাথী’ (১৯৬৭), ‘উদ্ধার’ (১৯৭৫), ‘একজন আলী কেনানের উত্থান পতন’ (১৯৮৯), ‘অলাতচক্র’ (১৯৯০), ‘ওঙ্কার’ (১৯৯৩), ‘গাভীবিত্তান্ত’ (১৯৯৪), ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’ (১৯৯৬), ‘পুষ্পবৃক্ষ ও বিহঙ্গপুরাণ’ (১৯৯৬) আহমদ ছফার উপন্যাস এবং ‘নিহত নক্ষত্র’ (১৯৬৯) তাঁর গল্পগ্রন্থ। কবিতার ক্ষেত্রেও সমুজ্জ্বল আহমদ ছফা। ‘জল্লাদ সময়’, ‘একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা’, ‘লেনিন ঘুমোবে এবার’ ইত্যাদি একাধিক কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা তিনি।

অনুভূতির প্রত্যক্ষ প্রকাশ, লোকজ ভাষার ব্যবহার, পুঁথিপুরাণের শব্দ প্রয়োগ ও বাক্যরীতির সঠিক চয়নে তার কবিতাগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আহমদ ছফার অন্যতম জনপ্রিয় একটি বই ‘যদ্যপি আমার গুরু’।

১৯৭০ সালে গবেষণার কাজ করতে গিয়ে জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সান্নিধ্যে আসেন তিনি। তাদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্কের ভিত্তিতে দেশবরেণ্য এই বুদ্ধিজীবীকে নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বই লেখেন ছফা। রাজ্জাক ছিলেন চিন্তাবিদ, দার্শনিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তৎকালীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু তুলে ধরেন আহমদ ছফা। নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের লেখায় আহমদ ছফার প্রভাব রয়েছে।

ছফার ‘সূর্য তুমি সাথী’ বইটি হাতে পাওয়ার পর পাঠকরা মুগ্ধ হয়ে ভাবে, বহুদিন পর তারা এমন একজন লেখক খুঁজে পেয়েছেন যে তাদের মনের কথাগুলো ছাপার হরফে তুলে ধরতে জানে। ছফা কেবলমাত্র তা-ই লিখতেন যা তিনি নিজে বিশ্বাস করতেন। ভান ধরা বা কোনো কিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি করা তিনি একদম পছন্দ করতেন না। আমাদের দেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য লিখতেন তিনি, তাদের প্রতিনিধিত্ব করেই লিখতেন তিনি। লেখালেখি ছিল তার নেশা।

ছফার গভীর চিন্তাশীলতার প্রতিফলন ঘটেছে তার দুটি উল্লেখযোগ্য রচনা ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ (১৯৭৩) ও ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ (১৯৭৬) গ্রন্থে। এ দুটি বিশেষ চিন্তামূলক রচনাসহ দেশ, সমাজ ও রাজনীতিবিষয়ক নিবন্ধাবলি ছফাকে বাংলাদেশের  বুদ্ধিজীবী লেখকের মর্যাদাপূর্ণ আসন দিয়েছে। এতকিছু সত্ত্বেও আরাম-আয়েশের জীবন তাকে কখনোই টানতে পারেনি। খুব সাধারণ আর চাকচিক্যহীনভাবে দিন কাটাতেন ছফা। দীর্ঘকাল যাবত তিনি একটি মাত্র ঘরে থাকতেন যার মধ্যে আসবাব বলতে ছিল শুধু একটি খাট, চেয়ার, টেবিল আর বইয়ের তাক।

‘লেখক শিবির পুরস্কার’ এবং বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রণীত ‘সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার’ প্রত্যাখ্যান করেন ছফা। ১৯৮০ সালে ‘ইতিহাস পরিষদ পুরস্কার’ এবং ২০০২ সালে ‘মরণোত্তর একুশে পদক’ এ ভূষিত হন আহমদ ছফা। তার বেশ কিছু বই বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। ২০০১ সালের ২৮ জুলাই অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে নেয়ার পথে মৃত্যুবরণ করেন ৫৮ বছর বয়সী ছফা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে জানাজা শেষে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে দাফন করা হয় বাংলার কালজয়ী এই সাহিত্যিককে।

তার সাহিত্যকর্মের দ্বারা বিশেষত তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। এই একটি লেখায় তার পুরো জীবনী তুলে ধরা প্রায় অসম্ভব। আহমদ ছফার মতো প্রতিভাবানদের জীবনী নিয়েই লেখা যায় যুগ পাল্টে দেয়ার মতো শক্তিশালী সব সাহিত্য।

(স্টাফ রিপোর্টার, ঘাটাইল ডট কম)/-

স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি বাবু আর নেই

বিএনপির স্বেচ্ছাসেবী সংগঠক বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবকদল কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি শফিউল বারী বাবু মারা গেছেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ভোর ৪টার দিকে রাজধানী ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে (এপোলো হাসপাতাল) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং সদস্য শায়রুল কবির খান ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদির ভূইয়া জুয়েল।

তারা জানান, শফিউল বারী বাবু বেশ কিছুদিন যাবত অসুস্থ। সোমবার অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তার অবস্থার আরও অবনতি হলে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ভোর ৪টার দিকে তিনি ইন্তেকাল করেন।

শফিউল বারী বাবুর করোনা পরীক্ষা করা হয়েছিল, রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে বলেও জানান শায়রুল কবির খান। মৃত্যু কালে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন বাবু।

তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

এর আগে রাত ১টা ৫২ মিনিটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবুকে আনোয়ার খান মর্ডাণ হাসপাতাল থেকে এভার কেয়ার হাসপাতালের সিসিইউ-তে স্থানান্তর করা হয়েছিল।

প্রচুর শ্বাসকষ্ট থাকায় শফিউল বারী বাবুকে সোমবার বেলা ১১ টায় তাৎক্ষণিকভাবে রাজধানীর ধানমন্ডির আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।

গত বেশ কিছুদিন ধরে ফুসফুসের সংক্রমণে ভুগছিলেন বলে জানান স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-সভাপতি গোলাম সারোয়ার। তিনি বলেন, শফিউল বারী বাবু বেশ কিছুদিন ধরে ফুসফুসে সংক্রমণজনিত রোগে ভুগছিলেন। এর ফলে তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি রাজধানীর ইস্কাটনের বাসাতেই ছিলেন। কিন্তু সোমবার হঠাৎ করে তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে দ্রুত তাকে আনোয়ার খান হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান শফিউল বারী বাবুর চিকিৎসার নিয়মিত খোঁজ-খবর নিয়েছেন বলেও জানান গোলাম সারোয়ার।

এদিকে শফিউল বারী বাবুর প্রথম জানাজা সকাল ১০ টায় রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।

(অনলাইন ডেস্ক, ঘাটাইল ডট কম)/-

ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) জন্মকথা

উপমহাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন রাজনৈতিক সংগঠন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) ৬৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ছিল গতকাল ২৬ জুলাই।

১৯৫৭ সালের ৬-১০ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারিতে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং আওয়ামী লীগ নেতা ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে বিশেষ করে সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থ রক্ষার স্যান্টো ও সিয়েটা চুক্তি নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়।

এ প্রশ্নে দলের ডানপন্থী পাতি বুর্জোয়া নেতা-কর্মীরা সোহরাওয়ার্দীর পক্ষাবলম্বন করেন এবং বামপন্থী অংশ মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে স্বাধীন ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি এবং পূর্ব পাকিস্তানের সর্বাধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলেন। ফলে আওয়ামী লীগ আদর্শিক কারণে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

ঐ বছর ১৮ মার্চ মওলানা ভাসানী পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ ত্যাগ করেন। আওয়ামী লীগের বামপন্থী এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবিদার অংশের উদ্যোগে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে ২৫-২৬ জুলাই গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

এ সম্মেলনে পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হয়।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে কেন মওলানা ভাসানী এই কর্মী সম্মেলনের আয়োজন করলেন কিংবা কেনই বা তিনি আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে নতুন দল গড়ার দিকে মনোনিবেশ করলেন?

অনেকেই এর কারণের গভীরতায় না গিয়ে ঢালাওভাবে তার দল ত্যাগের সমালোচনা করে থাকেন।

এ প্রসঙ্গে কবি বুলবুল খান মাহবুব তার মওলানা ভাসানী- অনন্য ব্যতিক্রম নিবন্ধে লিখেছেন:

“মওলানা ভাসানীর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি প্রায় সব সময়েই কোন না কোন পার্লামেন্টারি দলের সঙ্গে সংযুক্ত থেকেছেন। কিন্তু কখনই জনতার স্বার্থের চেয়ে দলের স্বার্থ তার কাছে বড় হয়ে দেখা দেয়নি। তাই যে মুহূর্তে তার দল ক্ষমতার মোহে জনতার স্বার্থের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে সেই মুহূর্তেই তিনি তার প্রাণ প্রিয় সংগঠনকে ছিন্ন বস্ত্রের ন্যায় ত্যাগ করতে দ্বিধা করেননি। এই দল ত্যাগের ব্যাপারে মওলানা ভাসানীর সমালোচকরা বলে থাকে তিনি বার বার দল ত্যাগ করেন।

কিন্তু এই বুদ্ধিমানদের কাছে আমার জিজ্ঞাস্য, কোন মুহূর্তে তিনি দল ত্যাগ করেছেন?

দেখা গেছে যে সংগঠনকে গড়ে তুলতে এই মজলুম নেতা তাঁর দিন-রাত্রির আরামকে কোরবানি করে গ্রামে গঞ্জে ঘুরে বেড়িয়েছেন, সভা সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সংগঠনের প্রাণ সঞ্চার করেছেন- সেই সংগঠনের চরম দুর্দিনে তিনি কি দল ত্যাগ করেছেন? নিশ্চয়ই নয়।

বহু বছরের ত্যাগের বিনিময়ে ক্ষমতা দখলের পর সংগঠনের সুদিনে যখন একটু অবসর নেয়ার পালা সেই মুহূর্তে জনতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিবাদে আবার নতুন করে জনতার দাবি নিয়ে তাকে নতুন বিরোধীদলের জম্ম দিতে হয়েছে।

বহু তথাকথিত দেশপ্রেমিক নেতার ক্ষেত্রে দেখা গেছে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে যে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিজের জীবনে বারবার লাঞ্ছনা ভোগ করেছেন দীর্ঘদিন সংগ্রামের পর ক্ষমতা দখল করে অতীতের অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করে জনতা এবং তার বিরোধীদের উপর তিনি তার পূর্বসুরীদের একই কায়দায় অত্যাচার চালাচ্ছেন।

মওলানা ভাসানী তার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এই কপটতাকে স্বীকার করতে পারেননি- জনগণ এবং তাদের সুখ-দুঃখ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারেননি বলেই তাকে দু’তিনবার নিজের হাতে গড়া সংগঠন ত্যাগ করতে হয়েছে।

নিজের দীর্ঘ দিনের দুঃসময়ের সহকর্মীরা যখন ক্ষমতায় গিয়ে জনতার কথা ভুলে গেছে তখন নিজের হাতে গড়ে তোলা কর্মীদের ত্যাগ করে নতুন কর্মী সৃষ্টি করার কাজে নতুন করে আত্মনিয়োগ করেছেন।”

স্মরণ করা যেতে পারে মওলানা ভাসানীর আসাম জীবনের কথা। সেখানেও তিনি মুসলিম লীগকে প্রতিষ্ঠিত করে ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন। স্যার সাদুল্লাহকে আসামের প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সাদুল্লাহ যখন তার ঘোষিত অঙ্গিকার থেকে সরে যেতে থাকলেন ভাসানী তখন সংসদে ও সংসদের বাইরে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। জনতার স্বার্থে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন।

এরপর যে পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য একদিন তিনি আন্দোলনে আন্দালন সংগ্রাম করেছেন; সেই পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৮ সালের ১৭ মার্চ বাজেট অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যের প্রতিবাদে তিনি নিজ দলের বিরুদ্ধে আঙুল তুলে বলেছেন, আমরা কি সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের গোলাম?

মুসলিম লীগ সরকারের অপকীর্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পাকিস্তানের প্রথম বিরোধীদল আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তরুণ শেখ মুজিবকে সাথে নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে, হাটে-বাজারে, শহরে-বন্দরে উল্কার মতো ছুটে বেড়িয়েছেন।

মুসলিম লীগ সরকারের জেল জুলুম অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করে সদ্য প্রতিষ্ঠিত দলটিকে প্রদেশব্যাপী জনপ্রিয় করেছেন। ‘৫২-র ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এটা সেই সময় যখন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে কথা বলাকে আল্লাহর নাফরমানী বলে প্রচার করা হতো।

১৯৫৫ সালের ২১ অক্টোবর তারিখে দলের কাউন্সিল অধিবেশনে দলটিকে অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘আওয়ামী লীগ’ নামকরণ করেছেন।

আওয়ামী লীগে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অন্তর্ভুক্তি একদিকে যেমন দলকে শক্তিশালী করেছে; অন্যদিকে দলের প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ থেকে বিচ্যুতিও ঘটিয়েছে। যার প্রকাশ ঘটতে থাকে ‘৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়লাভের পর থেকে।

নির্বাচনের পূর্বে যুক্তফ্রন্টের দেয়া ২১ দফার প্রতি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই জনগণের মোহভঙ্গ ঘটে। এমতাবস্থায়, যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করলেও নিজেদের অর্ন্তদ্বন্দ্ব আর অন্তঃকলহের কারণে ৩০ মে মওলানা ভাসানীর অনুপস্থিতিতে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল  হক মন্ত্রীসভাকে বরখাস্ত করে পূর্ববাংলায় গভর্নরের শাসন প্রবর্তন করে।

এসময় বিশ্বশান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য লন্ডনে অবস্থানরত মওলানা ভাসানী সাংবাদিক সম্মেলন করে তীব্র ভাষায় এর প্রতিবাদ করেন। এরপর অনেক পানি ঘোলা করে সোহরাওয়ার্দী কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী হয়েই তার বিখ্যাত ‘জিরো প্লাস জিরো ইকুয়েল টু জিরো’ থিউরি দিলেন।

ঘোষণা করলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী হওয়া মানে পূর্ব পাকিস্তানের ৯৮% স্বায়ত্বশাসন লাভ হয়ে গেছে’।

এসময় ক্ষমতাসীনরা দল এবং ২১-দফার আদর্শ উদ্দেশ্য বিরোধী গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দফার প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করতে থাকলে মওলানা ভাসানী প্রকাশ্যেই তার সমালোচনা শুরু করেন।

এহেন পরিস্থিতিতে মওলানা ভাসানী ১৯৫৭ সালের ৬, ৭, ৮, ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি কাগমারীতে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন এবং একই সাথে এক সাংস্কৃতিক সম্মেলন আহ্বান করেন। কেন্দ্রে ও প্রদেশে তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়।

৭ ফেব্রুয়ারির কাউন্সিল অধিবেশনে ভাসানী স্বায়ত্বশাসন, পশ্চিম পাকিস্তানে এক ইউনিট চালু; বিশেষ করে বৈদেশিক নীতির প্রশ্নে প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর তীব্র সমালোচনা করেন।

এরপর থেকে ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী দ্বন্ধ প্রকট হতে থাকে। একই সম্মেলনে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানিয়ে একদিকে যেমন ভাঙনের আওয়াজ তোলেন; অন্যদিকে সাংস্কৃতিক  সম্মেলনে পর্বে তিনি নতুন একটি দেশের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক চেহারার স্বরূপ উন্মোচন করেন। রূপক অর্থে এ যেন ইংরেজ কবি শেলীর ‘Destroyer’ & preserver’ তত্ত্বের সাথে তুলনীয়।

কাগমারী সম্মেলনের পূর্বাপর দৈনিক ইত্তেফাক বিশেষ উস্কানীদাতার ভূমিকা পালন করতে থাকে। সোহরাওয়ার্দীপন্থীরা মওলানা ভাসানীকে ভারতের লেলিয়ে দেয়া কুকুর বলে আক্রমণ করে।

অথচ এই সোহরাওয়ার্দীকেই একদিন মওলানা ভাসানী দলে টেনেছিলেন। তার উল্লেখ পাওয়া যায় শেখ মুজিবুর রহমান এর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে।

এই গ্রন্থের ২১৬ পৃষ্ঠায় শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দীকে উল্লেখ করে লিখেছেন, আমি তাকে জানালাম, “আপনি জিন্নাহ আওয়ামী লীগ করেছেন, আমরা নাম পরিবর্তন করতে পারব না। কোনো ব্যক্তির নাম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগ করতে চাই না। দ্বিতীয়ত আমাদের ম্যানিফেস্টো আছে, গঠনতন্ত্র আছে, তার পরিবর্তন করা সম্ভবপর নয়। মওলানা ভাসানী সাহেব আমাকে ১৯৪৯ সালে আপনার কাছে পাঠিয়েছিলেন।

তখনও তিনি নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ গঠনের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তারও কোনো আপত্তি থাকবে না, যদি আপনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টো ও গঠনতন্ত্র মেনে নেন।”

এখানে একটি ব্যাপার উপলব্ধি করতে হবে যে, মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে নয়; সুসময়ে দল ছেড়েছেন। যে দলটির তিনি শুধু প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিই নন, দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে তিনি এই দলটিকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সকল অঞ্চলে সকল সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য করে গড়ে তুলেছিলেন।

সেই দল পরিত্যাগ করার সময় তিনি মানসিকভাবে আঘাত পেয়েছিলেন বৈকি! কিন্তু আদর্শের কাছে আপোষ করা তার ধাতে ছিল না। তাই তিনি ‘৫৭ সালের ১৮ মার্চ অলি আহাদের মাধ্যমে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান বরাবর এক পদত্যাগ পত্র পেশ করেন।

সপ্তাহখানেক পর ২৬ মার্চ আওয়ামী লীগ কর্মী ও দেশবাসীর প্রতি আবেদন শিরোনামে এক প্রচারপত্রে তিনি বলেন, ‘২১-দফা দাবি আদায়ের জন্য সারা দেশময় আন্দোলন করুন।’

এই প্রচারপত্র এটাই প্রমাণ করে যে তখনও তিনি আওয়ামী লীগ ছাড়েন নাই। কিন্তু ৩০ মার্চ ৫৬ সিম্পসন রোডে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাহী পরিষদের এক জরুরি সভায় বহিস্কার-পাল্টা বহিস্কার প্রশ্নে দল ভেঙে যাওয়ার সমস্ত আয়োজন প্রায় সম্পন্ন হয়ে যায়।

যদিও শেখ মুজিবুর রহমান ভাসানীকে তাঁর পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের জন্য জোরালো অনুরোধ জানান।

একই বছর ১৩-১৪ জুন ঢাকার ‘শাবিস্তান’ প্রেক্ষাগৃহে ফের আওয়ামী লীগ নির্বাহী পরিষদের অধিবেশন বসে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেকের অনুরোধে মওলানা ভাসানী কিছুক্ষণের জন্য সভায় উপস্থিত হন।

কিন্তু “ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শয্যা থেকে আগত অসুস্থ নেতা মওলানা ভাসানীকে ‘ভারতের দালাল মুর্দাবাদ’ জাতীয় অশালীন শ্লোগানের মাধ্যমে অপমান করা হয়, তাকে স্বচ্ছন্দে বলতে দেয়া হয়নি এবং ফলে তিনি দ্রুত ভাষণ ‘শেষ’ করেই ফিরে গিয়েছিলেন হাসপাতালে।”

এরপর ‘৫৭-র ২৪ জুলাই ভাসানী আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্কের পরিসমাপ্তি ঘটান।

এবার ‘নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন’ প্রসঙ্গে আসা যাক।

‘৫৭-র ২৫ জুলাই মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে সম্মেলন আরম্ভ হয় একদিকে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা অন্যদিকে হুমকি ও ভয়ভীতির মধ্য দিয়ে। সম্মেলনে ভাসানী তার দীর্ঘ লিখিত ভাষণে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে নতুন দল গঠনের প্রেক্ষিত বর্ণনা করেন।

কৃষিপ্রধান পাকিস্তানের কৃষকদের সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার দশ বছর পরও দেশের কৃষক সমাজ স্বাধীনতার কোনো আস্বাদন পায় নাই। তারা আজ ভুখা।’

শ্রমিকদের শোষণের বিরুদ্ধে সরকারের নিন্দা করে তিনি বলেন, ‘শ্রমিকরা নূন্যতম মজুরি থেকে বঞ্চিত, তারা কোনো আন্দোলন করতে গেলে তাদের ওপর নেমে আসে অবর্ণনীয় নির্যাতন। প্রশাসনে ব্যাপক দুর্নীতি।’

তিনি তার ভাষণে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন, পররাষ্ট্রনীতি ও বৈদেশিক সাহায্য সম্পর্কেই তিনি বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বস্তুত সরকারের সঙ্গে মনোমালিন্যের সেটাই ছিলো মুখ্য কারণ।

সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তান হতে যোগ দিয়েছিলেন পাক-ভারত স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপকথার নায়ক সীমান্ত প্রদেশের লালকোঠা নেতা সীমান্ত গান্ধী খান আবদুল গাফফার খান, পাঞ্জাবের জননেতা মিয়া ইফতেখার উদ্দিন, সিন্ধুর জননেতা ঝানু পার্লামেন্টারিয়ান জিএম সৈয়দ, পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হক ওসমানী, বেলুচিস্তানের আবদুস সামাদ খান আচাকজাই, খান আবদুল ওয়ালী খান, পাঞ্জাবের মেজর ইসহাক, ব্যারিস্টার মিয়া মাহমুদ আলী কাসুরী, আফজল খান, প্রিন্স আবদুল করিম, গাউস বকস বেজেঞ্জো, খায়ের বকশ মারী, আতাউল্লাহ খান মেঙ্গল, আবরার আবদুল গফুর, আবরার সেকেন্দর খান, গোলাম মোহাম্মদ লেঘারী, হাশিম খান গিলয়াই, এয়ার কমান্ডার জানজুয়া, আবদুল মজিদ সিন্ধী প্রমূখ।

যে সকল নেতাকর্মী সম্মেলন সফল করতে নিরলস ভূমিকা রেখেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ, মোহাম্মদ তোয়াহা, মোজাফ্ফর আহমদ, মহিউদ্দিন আহমদ, পূর্ণেন্দু দস্তিদার, সৈয়দ আলতাফ হোসেন, চৌধুরী হারুন-উর রশীদ, পীর হাবিবুর রহমান, অলি আহাদ, দেওয়ান মাহবুব আলী, আতাউর রহমান, বেগম সেলিনা বানু, মণিকৃষ্ণ সেন, কাজী মোহাম্মদ ইদরিস, আবু জাফর শামসুদ্দিন, হাতেম আলী খান, মোহাম্মদ সুলতান, শওকত আলী খান, ইয়ার মোহাম্মদ খান, ডাঃ আবদুল করিম, অধ্যাপক মফিজুল ইসলাম, মাহমুদ আলী, মোখলেসুর রহমান, মীর্জা গোলাম হাফিজ, খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, সাইদুল হাসান, নুরুল হক চৌধুরী, সলিমুল হক খান মিল্কি, আবদুল মোত্তাকিম চৌধুরী, আবদুস সামাদ আজাদ প্রমূখ।

সম্মেলনে উপস্থিত রণেশ মৈত্রের ভাষায়, দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচীতে “পিনপতন নিরবতার মধ্যে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্মেলন অগ্রসর হতে থাকলো, তর্ক-বিতর্কও চললো। দলের নাম, দলীয় পতাকা (সবুজ এবং লাল কাপড়ে- লাল অংশে পাকিস্তানের পাঁচটি প্রদেশের স্মারক হিসেবে পাঁচটি সাদা তারকা খচিত), ঘোষণাপত্র, গঠনতন্ত্র,  দু’টি কমিটির নির্বাচন সম্পন্ন হলো বিকেল তিনটে সাড়ে তিনটে নাগাদ।

সেদিন আসলেই এক অভূতপূর্ব প্রাণবন্যা পরিলক্ষিত হয়েছিলো পাকিস্তানের সকল প্রদেশ ও অঞ্চল থেকে আগত নেতা ও কর্মীদের মধ্যে। হলটি বারবার ফেটে পড়েছিলো মুহুর্মুহু করতালি ও গগণবিদারী শ্লোগানের মধ্যে।

প্রতিনিধি সম্মেলনের কাজের সমাপ্তি ঘোষণা করার সাথে সাথে রূপমহল সিনেমা হলের সামনে সকলকে সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়াতে বলা হলো।

পূর্ব পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দসহ সমবেত সকল প্রতিনিধি স্বেচ্ছাসেবক ও কর্মী মিছিল করে যাবেন ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে জনসভা করতে।

যেভাবে বলা হলো, সেভাবেই মুহূর্তের মধ্যে সকলে প্রস্তুতি নিয়ে ফেললো।

গগণবিদারী শ্লোগান, করতালি ও নতুন পার্টি “ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি জিন্দাবাদ”, “মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক”, “পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন দিতে হবে”, “পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিট বাতিল করো”, “মাশরেকী ঔর মাগরেবী পাকিস্তান কি আওয়াম কি ইত্তেহাদ”, (পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ঐক্য জিন্দাবাদ) প্রভৃতি ধ্বনিতে মুখরিত হলো এই ঐতিহাসিক মিছিল, যার সামনের সারিতে ছিলেন মওলানা ভাসানী, খান আবদুল গাফ্ফার খান প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।”

পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি বৃহত্তর উদারনৈতিক দল হিসেবে জন্ম নিলো ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- সংক্ষেপে ন্যাপ।

পরদিন দৈনিক সংবাদ এর প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিলো এরুপঃ ‘পাকিস্তানের উভয় অংশের গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের সমন্বয়ে পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নামে নয়া রাজনৈতিক দল গঠিত। ঢাকায় অনুষ্ঠানরত গণতান্ত্রিক সম্মেলনের অভূতপূর্ব সাফল্যঃ বার শতাধিক প্রতিনিধির সমাবেশে জাগ্রত জনমতের অভিব্যক্তি।’

নবগঠিত দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন যথাক্রমে মওলানা ভাসানী ও মাহমুদুল হক উসমানী।

এছাড়া পূর্ব পাকিস্তান কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে মওলানা ভাসানী ও মাহমুদ আলী এবং পশ্চিম পাকিস্তান কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে খান আবদুল গাফ্ফার খান ও মাহমুদ আলী কাসুরী নির্বাচিত হন।

পার্টির নীতি ও আদর্শ ছিল অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। চূড়ান্ত লক্ষ্য সমাজতন্ত্র।

১৯৭১ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি সন্তোষ দরবার হলে ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান সর্বদলীয় সম্মেলন’ উপলক্ষে এক প্রতিনিধি সম্মেলনে দেশের ইতিহাস, আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণ পূর্বক স্বাধীনতার স্বপক্ষে যুক্তি প্রদর্শণ করে জনগণ এখন স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত বলে টানা ছয় ঘন্টা বক্তৃতা করেন।

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর ৯ মার্চ পল্টনের জনসভায় তিনি জনগণকে প্রত্যক্ষ স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপাইয়া পরার আহ্বান জানিয়ে ১৪ দফা দাবীনামা পেশ করেন।

২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের নামে নিরীহ বাঙ্গালির উপর শুরু করে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ। ২৬ মার্চ শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতা যুদ্ধ।

১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল হানাদার বাহিনী টাঙ্গাইলে প্রবেশ করে এবং ৪ এপ্রিল মওলানা ভাসানীর খোঁজে সন্তোষে প্রবেশ করে তার বসত বাড়ি ও দরবার হলে আগুন ধরিয়ে দেয়। সন্তোষে তাঁকে না পেয়ে তারা ৬ এপ্রিল মাইল দুয়েক পশ্চিমে বিন্যাফৈর গ্রাম আক্রমণ করে এবং স্ট্রেচার বুলেট দিয়ে দূর থেকে তার বিন্যাফৈরের বাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেয়।

এর আগে তিনি বিন্যাফৈরের বাড়িতে তাঁর রাজনৈতিক কর্মীদের নিয়ে যুদ্ধের ‘পরিকল্পনা নির্ধারণী সভা’করছিলেন। সেখানে তিনি তাঁর কর্মীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, “জনবল আছে, শুধু অস্ত্র চাই।”

সভা চলাকালীণ সময়ই তিনি হানাদারদের উপস্থিতি টের পান এবং গান পয়েন্টে এগিয়ে আসা হানাদার বাহিনীর ফাঁক-ফোকর গলিয়ে চাদর মুরি দিয়ে সেখান থেকে সরে পরতে সক্ষম হন।

১৫-১৬ এপ্রিল ধলেশ্বরী-যমুনা হয়ে রৌমারীর নামাজের চর সীমান্ত দিয়ে তিনি ভারতে প্রবেশ করেন। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করলে তিনি এই সরকারকে সমর্থন দান করেন।

তথাপি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দুই মাস বাঙ্গালি নেতাদের মধ্যে মওলানা ভাসানীর বক্তৃতা বিবৃতি সাক্ষাৎকারই ভারতের পত্র পত্রিকায় সবচেয়ে গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়েছে।

২৩ এপ্রিল আনন্দবাজার পত্রিকায় তাঁর একটি ঐতিহাসিক বিবৃতি গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়।

এতে তিনি বলেন, “বর্তমান দুর্যোগের মুহুর্তে মানবজাতির কাছে বাংলাদেশের জ্বলন্ত প্রশ্ন: বর্বর পশুশক্তির কাছে কি ন্যায়সঙ্গত মহান সংগ্রাম চিরতরে নিষ্পেষিত হবে?”

বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দান এবং গণহত্যা বন্ধের অনুরোধ জানিয়ে তিনি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানকে তারবার্তা পাঠান। যার মধ্যে ছিলেন চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুং ও প্রধানমন্ত্রী চৌএনলাই, রুশ কমিউনিষ্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক লিওনিড ব্রেঝনেভ, সুপ্রিম সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগোর্নি ও প্রধানমন্ত্রী আলেস্কি কোসিগিন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন, ফরাসী প্রেসিডেন্ট জর্জ পম্পিডু, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডোয়ার্ড হীথ, জুগোস্লাভ প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো, মিশরীয় প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সা’দাত, আরব লীগ সেক্রেটারি ডিলাল্লো তেলি প্রমুখ।

সেসব তারবার্তা ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় ফলাও করে ছাপানো হয়। যেমন নিক্সনকে লেখা চিঠিতে তিনি বলেন, “আর অস্ত্র দেবেন না।”

১৬ মে আনন্দবাজার পত্রিকা ‘ইয়াহিয়া খাঁকে ভাসানীর চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে একটি বড় প্রতিবেদন ছাপায়।

৮ জুন আনন্দবাজার লেখে, ‘লক্ষ প্রাণের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতা আসবে-মওলানা ভাসানী।’

‘Sovereign Bangladesh is the’ শিরোনামে দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরদের সর্তক করে দেন।

১৯৭১ সালের ২৪ জুন এক বিবৃতিতে মওলানা ভাসানী বলেন, “জীবনের সব সম্পদ হারিয়ে, নারীর ইজ্জত বিকিয়ে, ঘরবাড়ি হারিয়ে, দেশ থেকে বিতারিত হয়ে এবং দশ লক্ষ অমূল্য প্রাণ দান করে স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণ রাজনৈতিক মীমাংশার নামে ধোঁকাবাজি কিছুতেই গ্রহণ করবে না। তাদের একমাত্র পণ হয় পূর্ণ স্বাধীনতা, না হয় মৃত্যু। এর মধ্যে গোজামিলের কোন স্থান নাই।”

এ সময় প্রবাসী সরকারের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সিআইএ-র চক্রান্ত ক্রমেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। পাকিস্তানও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেবল একদলীয় যুদ্ধ বলে আন্তর্জাতিক মহলে প্রচারণাকালে মুক্তিযুদ্ধকে একটি সর্বদলীয় রূপ দিতে ভাসানী-তাজউদ্দিনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ৭১’র ৯ সেপ্টেম্বর পাঁচটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে প্রবাসী সরকারের ‘উপদেষ্টা পরিষদ’গঠিত হয়।

৮ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা ভাসানী। কলকাতার হাজরা স্ট্রীটে অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম বৈঠকে মওলানা ভাসানী কোন রকম আপস চক্রান্তের বিরুদ্ধে হুশিয়ারী উচ্চারণ করে ‘সাত দফা’ প্রস্তাব গ্রহণ করেন।

এর আগে ৩০-৩১ মে কলকাতার বেলাঘাটায় প্রবাসী বামপন্থী রাজনীতিবিদদের দু’দিনব্যপী এক সম্মেলন শেষে ০১ জুন মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় কমিটি’। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে নভেম্বর মাসে দেরাদুনে অবস্থানকালে অসুস্থ হয়ে পড়লে ভারত সরকার তাঁকে ‘অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস’-এ চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের জন্য অনুরোধ করেন।

৩ ডিসেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হলে হাসপাতাল থেকে তাকে দিল্লীর উপকন্ঠে একটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। দেশে ফেরার পূর্ব পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন।

১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।

লেখক: আজাদ খান ভাসানী, সভাপতি, মওলানা ভাসানী কৃষক সমিতি; সাধারণ সম্পাদক, ভাসানী পরিষদ-মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

সূত্র:

*সৈয়দ আবুল মকসুদ, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী

*আবু জাফর শামসুদ্দিন, কাগমারী সম্মেলন ও ন্যাপ গঠন প্রসঙ্গ

*বদরুদ্দীন উমর, কাগমারী সম্মেলনের ৫০ বছর পূর্তি ও বর্তমান বাংলাদেশ

*অধ্যাপক কে এ এম সা’দউদ্দিন, কাগমারী সম্মেলনঃ আগে ও পরে

*মহসিন শস্ত্রপাণি, কাগমারী সম্মেলনঃ পরিপ্রেক্ষিত ও তাৎপর্য

*শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী

*জাতীয় নেতা মওলানা ভাসানী-জীবন ও সংগ্রাম, শাহ আহমদ রেজা

*বাংলাদেশে ভাসানী ন্যাপের রাজনীতি, শামিমা আকতার লিপি।

*নজমুল হক নান্নু, ইতিহাসের ধারায় মওলানা ভাসানী

*আমজাদ হোসেন, মওলানা ভাসানীর জীবন ও রাজনীতি

করোনায় মারা গেলেন আ’লীগের এমপি ইসরাফিল আলম

নওগাঁ-৬ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মো. ইসরাফিল আলম সোমবার (২৭ জুলাই) ঢাকার একটি হাসপাতালে করোনাভাইরাস সংক্রমণে মারা গেছেন।

শ্বাসকষ্ট নিয়ে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন আওয়ামী লীগের এ সংসদ সদস্য। সেখানে সকাল ৬টা ২০ মিনিটে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

তার স্ত্রী সুলতানা পারভিন বিউটি জানান, কাশির সাথে রক্ত আসায় গত ১৭ জুলাই দ্বিতীয় দফায় ইসরাফিলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় শুক্রবার তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।

পারভিন আরও জানান, ইসরাফিল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তাকে গত ৬ জুলাই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে করোনাভাইরাস পরীক্ষার ফলো-আপ রিপোর্ট নেগেটিভ আসলে গত ১৪ জুলাই তিনি হাসাপাতাল থেকে বাড়িতে ফেরেন।

ইসরাফিল আলম ২০০৮ সালে ঢাকা মহানগর শাখা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন প্রথমবারের মতো এমপি হন। দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ তিনি তিনবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন।

এছাড়া তিনি নওগাঁ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় ফেডারেশনের সভাপতি এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন।

ইসরাফিল আলম এমপির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোক বার্তায় তিনি বলেন, ইসরাফিল সারা জীবন দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।

(ইউএনবি, ঘাটাইল ডট কম)/-

মালয়েশিয়ায় টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেয়ায় আটক বাংলাদেশী রায়হান কবির

মালয়েশিয়ায় করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে অভিবাসী শ্রমিকদের দুর্ভোগ নিয়ে আল জাজিরা টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেয়ার অপরাধে সে দেশের পুলিশ বাংলাদেশী নাগরিক রায়হান কবিরকে গ্রেফতার করেছে।

আল জাজিরা টেলিভিশনে প্রচারিত একটি তথ্যচিত্রে তিনি বলেছিলেন যে অনিবন্ধিত বিদেশি শ্রমিকরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন, এবং ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে শত শত অভিবাসীকে জেলে পাঠানো হয়েছে।

মালয়েশিয়ায় অভিবাসীদের প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক চলতি লকডাউনে বৈষম্যমূলক ও বর্ণবাদী আচরণ নিয়ে ‘লকডআপ ইন মালয়েশিয়াস লকডাউন’ শিরোনামে গত ৩ জুলাই ২৫ মিনিটের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আল-জাজিরা টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। সেখানে সাক্ষাৎকার দেন রায়হান কবির।

প্রতিবেদনটি প্রচারিত হওয়ার পর মালয়েশিয়া সরকার এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে আল-জাজিরার এমন প্রতিবেদনকে ‘ভিত্তিহীন ও মিথ্যাচার’ বলে অভিহিত করে।

এরপর রায়হান কবিরের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির সঙ্গে সঙ্গে দেশটিতে রায়হান কবিরের (২৫) ওয়ার্ক পারমিটও (ভিসা) বাতিল করা হয়।

ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে মালয় মেইল সংবাদপত্র খবর দিয়েছে, দু’সপ্তাহ ধরে খোঁজ করার পর পুলিশ শুক্রবার সন্ধ্যায় মি. কবিরকে গ্রেফতার করেছে।

পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, ইমিগ্রেশন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক খাইরুল জাইমি দাউদ জানিয়েছেন যে মি. কবিরকে এখন বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে এবং ভবিষ্যতে তাকে আর মালয়েশিয়ায় ঢুকতে দেয়া হবে না।

আল জাজিরা গত ৩রা জুলাই ‘লকড আপ ইন মালয়েশিয়াস লকডাউন’ নামে একটি তথ্যচিত্র সম্প্রচার করে।

প্রায় ২৬ মিনিটের ঐ ডকুমেন্টারিতে মালয়েশিয়ায় আটকে পড়া অবৈধ শ্রমিকদের বেহাল দশার কথা তুলে ধরা হয়।

রায়হান কবির ঐ তথ্যচিত্রে এ সম্পর্কে কুয়ালালামপুর কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করেছিলেন।

ঐ ডকুমেন্টারিতে বলা হয়, মহামারির মধ্যে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ দু’হাজারেরও বেশি অনিবন্ধিত শ্রমিককে আটক করেছে এবং কঠোর ভাইরাস লকডাউনের মধ্যে তাদের আটকে রাখা হয়েছে।

ঐ ভিডিওটি প্রচারের পর থেকেই মালয় সোশাল মিডিয়াতে মি. কবিরের বিরুদ্ধে প্রবল সমালোচনা শুরু হয়।

এর জেরে কর্তৃপক্ষ তার ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করে, এবং তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে।

শুক্রবার গ্রেপ্তারের ঠিক আগে রায়হান কবির নিজের হোয়াটসঅ্যাপ থেকে ঢাকার ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, “আমার অপরাধটা কী? আমি তো কোনও মিথ্যা বলিনি। প্রবাসীদের ওপর যে বৈষম্য ও নিপীড়ন চলেছে, আমি শুধু সেই কথাগুলো বলেছি।

“আমি চাই প্রবাসে থাকা কোটি বাংলাদেশি ভালো থাকুক। আমি চাই পুরো বাংলাদেশ আমার পাশে থাকুক।”

কী বলছে আল জাজিরা?

আল জাজিরা টেলিভিশন রায়হান কবিরের গ্রেফতার নিয়ে সরাসরি কোন মন্তব্য না করলেও তারা মি. রায়হানের বিরুদ্ধে আনা ফৌজদারি অভিযোগগুলি তুলে নেয়ার ডাক দিয়েছে।

এক রিপোর্টে আল জাজিরা তাদের রিপোর্টের সত্যতা সম্পর্কে জোরালো বক্তব্য রেখেছে।

চ্যানেলটি জানিয়েছে, এই ঘটনায় পুলিশ তাদের একদল সাংবাদিককে কঠোরভাবে জেরা করেছে।

মালয়েশিয়ার পুলিশের আইজি তানশ্রি আব্দুল হামদি বাদর জানিয়েছেন, পুলিশ এবং অ্যাটর্নি জেনারেরেলের দফতর আল জাজিরার ডকুমেন্টারিটি বিশ্লেষণ করেছে এবং তাতে ‘অনেক রাষ্ট্রদ্রোহিতার উপকরণ‌’ রয়েছে বলে মনে করছে।

বাংলাদেশ দূতাবাস নি:শ্চুপ

রায়হান কবিরের গ্রেফতারের ব্যাপারে বিবিসি বাংলার তরফ থেকে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শহীদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এনিয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তিনি শুধু জানিয়েছেন যে তিনি একটি ‘বিশেষ পরিবেশের’ মধ্যে আছেন। কিন্তু সেটা কি তার কোন ব্যাখ্যা জানা যায়নি।

গ্রেফতার হওয়ার পর বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে যে কনসুলার সেবা মি. কবিরের পাওয়ার কথা, তিনি সেটা পেয়েছেন কিনা, তাও জানা যাচ্ছে না।

(বিবিসি, ঘাটাইল ডট কম)/-

খালেদা জিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত শেখ হাসিনার

জাতীয়তাবাদী দল – বিএনপির প্রতি, বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত শেখ হাসিনার। কৃতজ্ঞ থাকা উচিত তার সরকারের, তার দলের, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের। কৃতজ্ঞ থাকা উচিত এদেশের কূটনৈতিক দঙ্গল-প্রশাসন-আমলাতন্ত্রের এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক জনগণের।

কৃতজ্ঞ থাকা উচিত অনেক কারণেই। তবে এখন আমি কেবল একটি কারণের কথা বলবো। বিএনপির অনেক সমস্যা। তবে অনেক দিন ধরেই এ দলের নিজস্ব একটা বড় সমস্যা দেখা যাচ্ছে। সেটা হলো এ-দলে হোমওয়ার্ক ও রিসার্চ কমে গিয়েছে। সব সময় তারা রক্ষণশীল, আত্মরক্ষামূলক, ডিফেন্সিভ অবস্থানে থাকে। নিজেদের সাফল্য ও কৃতিত্বের কথাটাও ভালো করে বলতে পারেনা।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারেনা, আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে পারেনা, জাতীয় অঙ্গনেও পারছে না। কাজেই সে প্রতিপক্ষের একতরফা আক্রমণাত্মক ক্যাম্পেইনে ধরাশায়ী হচ্ছে।

বশংবদ এবং গণভিত্তিহীন দুর্বল সরকার হলে যা হয়। বিএনপি ও খালেদা জিয়ার বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে ওরা কিছুটা বার্গেইনিং ক্ষমতা অর্জন করলেও এজন্য কখনো কৃতজ্ঞতা দূরে থাকুক, সামান্য সৌজন্য প্রদর্শনও করেনি।

জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক ঐক্য ও সমঝোতা থাকলে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিমন্ডলে সরকারের বার্গেইনিং ক্ষমতা বাড়ে। ওরা সেটা বিসর্জন দিয়ে নিজেদেরকেই দুর্বল করেছে। এই চুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশের আরো কিছু সুবিধা পাবার অন্যান্য শর্তগুলো তারা ছেড়ে দিয়েছে। এই চুক্তির পাশাপাশি আমাদের ফেনী নদীর পানি নেয়ার জন্য ইন্ডিয়াকে একতরফা সুবিধা দিয়েও তিস্তার পানি বন্টনের কোনো সুরাহা তারা করতে পারেনি।

বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার, মাল পরিবহন ও নিরাপত্তা ছত্রছায়া দেয়ার ক্ষেত্রে শুল্ক, কর ও সার্ভিস চার্জের হার তারা একেবারেই কমিয়ে রেখেছে।

ইন্ডিয়ার পণ্যকে সকল ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়ার শর্ত তারা চুক্তিতে জুড়ে দিয়েছে। সর্বোপরি ইন্ডিয়াকে এই সার্ভিস দিতে গিয়ে আমাদের বন্দর ও সড়ক সহ বিভিন্ন কাঠামো ও স্থাপনার যে ক্ষতি হবে সে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কোনো রকম করারোপের ব্যবস্থা এই চুক্তিতে নেই।

জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ইন্ডিয়াকে কৃতজ্ঞ রাখাই যাদের উদ্দেশ্য তাদের কাছ থেকে এরচেয়ে ভালো আর কী-ই বা আশা করা যায়?

আরেকটা সচতুর ধাপ্পাবাজ গোষ্ঠী আছে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় এরা খুব সক্রিয়। এদের প্রচারণা হচ্ছে :

“ভাইরে বিএনপির কথা ছাড়ান দাও। আওয়ামী লীগ আর এ-দলে কোনো ফারাক নাই। এক গাছেরই দুই ডাল। এরা শুধু পাওয়ার চায় যে কোনো মূল্যে। ক্ষমতায় গিয়ে পাব্লিকের জন্য ভালো কিছু করেনা, দেশের বা জাতীয় স্বার্থও রক্ষা করেনা, শুধু চুরিদারি করে নিজেদের আখের গোছায়।

বিএনপিও কম সুবিধাবাদী, স্বার্থান্বেষী, ফরচুন মেকার নয়। এরাও দেশের স্বার্থ বিকিয়ে হলেও ক্ষমতায় আসতে চায়। কাজেই মাইনাস টু।

খালি আওয়ামী লীগ নয়, দুটাই বাদ, বিএনপিকেও ধসিয়ে দিতে হবে একই সাথে।”

এদেরকে জিজ্ঞেস করুন :

“আচ্ছা ভাইয়া, বিএনপিকে ধসালে কে আসবে? বিকল্প কী?” এর কোনো জবাব এরা দেবেনা।

একটা ধোঁয়াটে জবাব দিয়ে রহস্যময় মিচকা হাসি হেসে বলবে : “আসবে আসবে। জায়গা কি খালি থাকে? পরিস্থিতি কি কারো জন্য বসে থাকে? নেতৃত্বের আসন কি কখনো শূণ্য থাকে? সময়ের প্রয়োজনে কেউ না কেউ এসে যাবেই।”

কেউ যে কখনো আসমান থেকে নাজিল হয় না বা মাটি ফুঁড়ে উঠে আসেনা, প্রতিটি শূণ্যস্থান পূরণে যে একটা প্রক্রিয়া লাগে, আর সে প্রক্রিয়া শুরু না হলে দুঃশাসন ও ব্যর্থ রেজিমই যে টিকে থাকে সেটা এদের অনেকেই জানে।

এরা জেনে-শুনেই বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায় ব্যর্থ রেজিমকে টিকিয়ে রাখতে। দুঃশাসনের ছদ্মবেশী বি-টিম বা সেকেন্ড ফ্রন্ট এরা। স্টান্টবাজি এদের একটা কৌশল। আর আছে মহামূর্খ ও হঠকারি এবং সব কিছুর ওপর আস্থা হারানো হতাশ কিছু লোক। কেউ কেউ আবার সবদিকে তাল মেরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ইম্পর্ট্যান্ট থাকতে চায়। এদের নিয়ে কথা না বলাই ভালো।

আমি বাংলাদেশের রাজনীতির ‘ইন্ডিয়া ইস্যু’ নিয়ে অল্প কিছু কথা বলবো। তার আগে আমি বিএনপি-বিরোধী অতিবিপ্লবীদের উদ্দেশে একটা কথা বলবো। সেটা হলো, অন্যান্য সব ইস্যুর মতন এ ইস্যুতেও বিএনপি নিশ্চয়ই বিএনপির রাজনীতিই করবে।

নিশ্চয়ই আওয়ামীলীগ, জাতীয় পার্টি বা সিপিবির রাজনীতি বিএনপি করবে না। এমনকি সর্বহারা পার্টি, জাসদ, মুসলিম লীগ এবং অন্যান্য খুচরা দলের রাজনীতিও নয়।

এ-দেশের বিপুল জনসমর্থনধন্য মূলধারার প্রধান দল বিএনপি কেন ইন্ডিয়া ইস্যুতে অন্যান্য খুচরা দলের নীতি-কৌশল ফলো করেনা – এজন্য যারা কান্দে তাদেরকে এক বোতল সমবেদনা উপহার দেয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই।

এই অতিবিপ্লবীদের উদ্দেশে আরো নিবেদন, আচ্ছা ব্রাদার, বাংলাদেশে কোন্ দলকে ক্ষমতায় রাখলে ইন্ডিয়ার লাভ হয় সেটা কি তারা তোমার চেয়ে কম বুঝে? তারা তো জেনে বুঝেই বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার গ্লোবাল ক্যাম্পেইনে অগ্রণী হয়েছিল। এ-দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায়  আওয়ামীলীগকে বহাল রাখতে সব কূটনৈতিক রীতি ভেঙ্গে ইন্ডিয়া যে প্রকাশ্যে তাদের পররাষ্ট্র সচিবকে মাঠে নামিয়েছিল সেটা তো সকলেই দেখেছে।

দিল্লীতে তো বটেই, ঢাকার মাটিতে দাঁড়িয়েও ইন্ডিয়ান কূটনীতিকদের বিএনপির বিরুদ্ধে অশোভন মন্তব্য কে না শুনেছে? দুই দলের মধ্যে কোনো তফাত না থাকলে বিএনপির বিরুদ্ধে এত প্রাণান্তকর প্রয়াস কেন তাদের? বিএনপিও যদি দেশের ও জাতীয় স্বার্থ বেচে ক্ষমতায় আসতে চায় তাহলে বিএনপিকে গ্রহন করলেই তো ইন্ডিয়ার বেশি সুবিধা হবার কথা। কারণ এ পার্টির জনসমর্থন বেশি।

কেন তারা জনসমর্থনহীন একটা দলের সঙ্গে এভাবে গাঁটছড়া বেধে থাকছে? এর কারণ ইন্ডিয়া ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে তোমার চোখে কোনো পার্থক্য না থাকলেও ইন্ডিয়া কিন্তু ঠিকই জানে ও বুঝে পার্থক্য কতোটা আছে।

কাজেই বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত দু-একটি ঘটনা বা উক্তির কাটপিস জোড়া দিয়ে সেটাকে পুঁজি করে বিএনপি-আওয়ামী লীগকে এক কাতারে ফেলে প্রপাগান্ডার কিছু নেই।

একটা ছোট্ট উদাহরণ দেবো। তার আগে একটা কথা বলে রাখি। ১৯৭৫ সালের ৭ নবেম্বরে সৈনিক-জনতার মিলিত জাগৃতির মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির হাত ধরেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব অর্জন করে। জিয়ার অকাল শাহাদতবরণ ও এরশাদের ক্ষমতাদখল সেই সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে।

আর এই রাষ্ট্রটি তথাকথিত এক-এগারোতে তার সার্বভৌমত্ব পুরোপুরি হারিয়েছে। এখন উদাহরণটিতে আসছি।

বাংলাদেশী জামায়াতে ইসলামী একসময় দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেয় প্রতিবেশী ইন্ডিয়ার সঙ্গে একটি ওয়ার্কিং রিলেশন গড়ে তোলার। সে সময় কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ইন্ডিয়া সফর করে। বিজেপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তাদের দীর্ঘ মতবিনিময় ও কয়েকদফা বৈঠকও হয়। ঢাকায় ইন্ডিয়ান কূটনীতিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্ব পান আব্দুল কাদের মোল্লা। কোনো এক সময়ের কৌশলগত এ-সব উদ্যোগের কারণে জামায়াত কিন্তু মোটেও প্রো-ইন্ডিয়ান পার্টি হয়ে যায়নি। এমনকি বিজেপি ইন্ডিয়ার ক্ষমতায় আসা সত্বেও বাংলাদেশের ভারতপ্রিয় সরকার জামায়াতের শীর্ষনেতাদের ফাঁসি দেয়ার প্রক্রিয়া থেকে সরেও আসেনি।

এখন আসল কথায় আসি।

বাংলাদেশে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ২০০১ সালে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার আগে থেকেই ইন্ডিয়া সেভেন সিস্টার নামে পরিচিত তার উত্তর-পূবের সাত অঙ্গরাজ্যের সংগে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে দ্রুত ও সহজ যোগাযোগের দাবি জানিয়ে আসছিল।

তখন আওয়ামী সরকার তাতে রাজিও ছিল। কিন্তু বিএনপির প্রবল বিরোধিতার কারণে তারা সেটি করতে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে।

তাছাড়া দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও তখন এতোটা হীনবল হয়ে পড়েনি। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বিচ্ছিন্নতাপ্রবণ এই সেভেন সিস্টারের ব্যাপারে ইন্ডিয়া আরও শংকিত ও স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে।

তারা এই যোগাযোগ পেতে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহনযোগ্য ‘কানেক্টিভিটি’ ও ‘ট্রানজিট’ টার্ম ব্যবহার করতে থাকে।

এসব প্রচারণায় ইউরোপ-আমেরিকাও বিভ্রান্ত হয়ে বিএনপিকে বলতে থাকে, কেন তোমরা বিচ্ছিন্ন থাকতে চাও? কেন কানেক্টিভিটি ও ট্রানজিটের বিরুদ্ধে তোমরা? বিএনপি তখন সে চাপ দৃঢ়ভাবে খুব দক্ষতার সঙ্গেই মোকাবিলা করেছে।

বিএনপি বলেছে, আমরা কানেক্টিভিটির বিরোধী নই। কানেক্টিভিটির পথ ইন্ডিয়া থেকে এসে ইন্ডিয়ায় গিয়ে ফুরাবে না। আর ট্রানজিট হয় দু’য়ের অধিক দেশের মধ্যে পণ্য ও জনপরিবহনের ক্ষেত্রে। কিন্তু ইন্ডিয়া আসলে কানেক্টিভিটি ও ট্রানজিটের নামে যা চাইছে সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে তার সেভেন সিস্টার অংগরাজ্যগুলোর সঙ্গে সহজ ও দ্রুত যোগাযোগের রুট।

এটা আসলে করিডোর। নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং সার্বভৌম সমতা সহ বিভিন্ন প্রশ্নে বাংলাদেশ এই করিডোর সুবিধা ইন্ডিয়াকে দিতে পারবে না।সে সময়েই ইন্ডিয়ার এসব প্রস্তাবের বিপরীতে বিএনপি কতিপয় শর্তসাপেক্ষে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব দেয়। সেই ট্রান্সশিপমেন্ট প্রস্তাব ছিল উভয় দেশের জন্য অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে লাভজনক।

এর বিনিময়ে বিএনপি ইন্ডিয়ার কাছে নেপালের জন্য ট্রানজিট সুবিধা এবং পানিবন্টন সংকট ও ছিটমহল সমস্যার নিরসনের শর্ত দিয়েছিল।

ইন্ডিয়া বিএনপির এ প্রস্তাব ও শর্ত মেনে নেয়নি। তখনকার বিরোধীদল আওয়ামী লীগ কখনো জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বিএনপির এ অবস্থানের পক্ষে দাঁড়ায়নি।এরপর ওয়ান-ইলেভেন পেরিয়ে আওয়ামীলীগ আবার ক্ষমতায় এলে ইন্ডিয়া কানেক্টিভিটি ও ট্রানজিটের নামে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে করিডোর লাভের ব্যাপারে তাদের পুরনো প্রচেষ্টা আবারো জোরদার করে। আওয়ামী লীগ সরকারও তাতে সায় দেয়।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার ইন্ডিয়ায় রাষ্ট্রীয় সফরকালে দু’দেশের পঞ্চাশ দফার যৌথ ইশতেহারে ‘ট্রানজিট’ নাম দিয়ে ইন্ডিয়াকে সেই সব সুবিধা দেয়ার সম্মতি ঘোষণা করা হয়।

বিরোধী দলে থেকে বিএনপি সংসদের ভেতরে ও বাইরে সকল ফ্রন্টে সম্ভাব্য সকল পন্থায় এর তীব্র বিরোধিতা করে ও প্রতিবাদ জানায়।

ইন্ডিয়ার তখনকার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকা ও দিল্লীতে দু’টি বৈঠকেই বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অন্ততঃ এই ইস্যুতে বিরোধিতা না করার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ জানান।

বেগম জিয়া শোভন কূটনৈতিক ভাষায় জানিয়ে দেন, বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূল নয় বলে তার পক্ষে এটা নিঃশব্দে মেনে নেয়া সম্ভব নয়।

তিনি আবারো এর বিকল্প হিসেবে শর্তসাপেক্ষ ট্রান্সশিপমেন্ট প্রস্তাবের কথা তুলে ধরেন।ইন্ডিয়া বিএনপির এ প্রস্তাব মানেনি।

তারা যে-কোনো মূল্যে ট্রানজিট চাপিয়ে দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। প্রায় গায়ের জোরে একটি অস্থায়ী প্রটোকল সই করিয়ে নিয়ে পরীক্ষামূলক ভাবে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতীয় যানবাহনে করে সেভেন সিস্টারে মালামাল পরিবহনও তারা শুরু করে দেয়।

এর বিরুদ্ধে বিএনপি এবং একমাত্র বিএনপি ও বেগম খালেদা জিয়াই তীব্র প্রতিবাদ ও আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।

তখন বিএনপি ও খালেদা জিয়াকে ‘কথায় কথা ভারত-বিরোধিতা’ ও ‘শস্তা এন্টি-ইন্ডিয়ান পলিটিক্স’-এর  জন্য দোষারোপ ও ব্যঙ্গ করা হতো।

তাতে না দমে এই প্রতিবাদ জারি রাখার কারণেই শেখ হাসিনা, বাংলাদেশ সরকার এবং আমাদের কূটনৈতিক-প্রশাসনিক টিম ইন্ডিয়ার সংগে কিছুটা বার্গেইনিং করার শক্তি-সাহস-সামর্থ অর্জন করে।

ইতিমধ্যে ইন্ডিয়ার ইলেকশনে কংগ্রেস গিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসে। দীর্ঘ আলোচনায় ইন্ডিয়া অবশেষে সেভেন সিস্টারের সংগে দ্রুত ও সহজে যোগাযোগের জন্য ট্রানজিটের নামে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে করিডোর পাবার অবস্থান স্থগিত রেখে ট্রান্সশিপমেন্ট মেনে নিতে বাধ্য হয় এবং ২০১৮ সালে এ ব্যাপারে দু’দেশের মধ্যে চুক্তি হয়।

বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ইন্ডিয়ার যানবাহন সরাসরি সেভেন সিস্টারে যাওয়া নয়। এখন ইন্ডিয়ার মাল আসবে কন্টেইনারে করে। বাংলাদেশী কোম্পানির জাহাজ তা বয়ে আনবে বন্দরে।

সেই কন্টেইনার বাংলাদেশের পরিবহনে করে আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ছত্রছায়ায় যাবে সীমান্তের স্থলবন্দরে।

সেখানে কাস্টম চেকিংয়ের পর ইন্ডিয়ার অফিসারেরা সে মাল বুঝে নেবে। সম্প্রতি সে চুক্তির পরীক্ষামূলক বাস্তবায়নও শুরু হয়ে গিয়েছে।

তবে বশংবদ এবং গণভিত্তিহীন দুর্বল সরকার হলে যা হয়। বিএনপি ও খালেদা জিয়ার বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে ওরা কিছুটা বার্গেইনিং ক্ষমতা অর্জন করলেও এজন্য কখনো কৃতজ্ঞতা দূরে থাকুক, সামান্য সৌজন্য প্রদর্শনও করেনি।

জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক ঐক্য ও সমঝোতা থাকলে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিমন্ডলে সরকারের বার্গেইনিং ক্ষমতা বাড়ে। ওরা সেটা বিসর্জন দিয়ে নিজেদেরকেই দুর্বল করেছে।

এই চুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশের আরো কিছু সুবিধা পাবার অন্যান্য শর্তগুলো তারা ছেড়ে দিয়েছে। এই চুক্তির পাশাপাশি আমাদের ফেনী নদীর পানি নেয়ার জন্য ইন্ডিয়াকে একতরফা সুবিধা দিয়েও তিস্তার পানি বন্টনের কোনো সুরাহা তারা করতে পারেনি।

বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার, মাল পরিবহন ও নিরাপত্তা ছত্রছায়া দেয়ার ক্ষেত্রে শুল্ক, কর ও সার্ভিস চার্জের হার তারা একেবারেই কমিয়ে রেখেছে। ইন্ডিয়ার পণ্যকে সকল ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়ার শর্ত তারা চুক্তিতে জুড়ে দিয়েছে।

সর্বোপরি ইন্ডিয়াকে এই সার্ভিস দিতে গিয়ে আমাদের বন্দর ও সড়ক সহ বিভিন্ন কাঠামো ও স্থাপনার যে ক্ষতি হবে সে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কোনো রকম করারোপের ব্যবস্থা এই চুক্তিতে নেই।

জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ইন্ডিয়াকে কৃতজ্ঞ রাখাই যাদের উদ্দেশ্য তাদের কাছ থেকে এরচেয়ে ভালো আর কী-ই বা আশা করা যায়?

(মারুফ কামাল খান, ঘাটাইল ডট কম)/-

মহিলাদের স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে জিয়ার অবদান

আন্তর্জাতিক নারী দিবস। মানুষের প্রয়োজন ন্যায্যতা, দিবস নয়। জিয়াউর রহমান মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে নারীদের সমান কাতারে এনেছিলেন। নারী সমাজের উপযুক্ত মর্যাদা দান করে তাঁদের দেশের কাজে লাগানোর ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানই অগ্রদূত। নারীদের সমস্যা ও তাঁদের অবস্থান উন্নতির ব্যাপারে তিনি  সর্বপ্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

দুটি সবল হাত থাকলে কাজ যত সহজে করা যায়, একহাত সে কাজ অসম্ভব হতে পারে। পুরুষ এবং মহিলা সমাজের দুটি হাতের মতন। দেশকে মনের মত গড়তে হলে দু’টি হাতেরই দরকার এবং দু’টোই সবল হতে হবে।” –প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান [দৈনিক দেশ , ৩০ জানুয়ারি ১৯৮১]

তিনি বুঝতেন মেয়েরা শিক্ষিত হলে সেই পরিবারের ছেলে-মেয়েরাও শিক্ষিত হবে। মেয়েদের আত্মবিশ্বাস এবং সমাজে মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য তিনি মেয়েদের গ্রাম প্রতিরক্ষা দলেও অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁর সময়েই গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে ৩৫ লাখ মহিলা সদস্য অন্তর্ভুক্ত হয়। জিয়া বিশ্বাস করতেন কাঠমোল্লাদের আপত্তি স্বত্তেও পুলিসসহ বিভিন্ন বাহিনীতে নারী অংশ গ্রহণ নিশ্চিত করে এগিয়ে যেতে হবে।

আনসার, পুলিশ বাহিনীতে নারীদের নিয়োগ দেন জিয়া। তিনি অনুধাবন করেছিলেন ক্রমবর্ধমান অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রনে ও নারীর ক্ষমতায়নে প্রশাসনের মূল ধারাতে নারীদের অংশ গ্রহণ সমাজকে এগিয়ে দেবে।

মহিলাদের স্বাবলম্বী করতে তিনি মহিলাদের জন্য চাকুরী ক্ষেত্রে শতকরা ১০ ভাগ কোটা বা সংরক্ষিত পদ নির্ধারণ করেন। তিনি বিশেষ কয়েকটি ক্ষেত্র যেমন শিক্ষকতা, এই মর্মে নির্দেশ দেন যে যতদিন না মহিলা কোটা পূরণ হয় ততদিন কেবল মেয়েদেরই নিয়োগ দেওয়া হবে। তাহলে মেয়েদের কোটা পূরণ হতে আর বেশি সময় লাগবে না।

মহিলাদের সমস্যা সমাধানের লক্ষে জিয়া ১৯৭৮ সালে প্রথম  স্বতন্ত্র মহিলা মন্ত্রনালয় স্থাপন করেন এবং মহিলা মন্ত্রী নিয়োগ করেন।

কর্মজীবী মহিলাদের সুবিধার্থে তিনি প্রথম মহিলা কর্মজীবী হোস্টেল নির্মানের ব্যবস্থা করেন । অনেক কর্মজীবী মহিলারা এতে উপকৃত হয়েছেন এবং চাকরিকালে তাঁদের বাসস্থানের সমস্যা অনেকাংশে দূর হয়।

তিনি নারী সমাজকে স্বনির্ভর করতে চেয়েছিলেন। তিনি বুঝতেন যে মেয়েরা নিজেরা যদি উপার্জন ক্ষম হয়, তাহলে সেই পরিবারের সকলের কাছে তাঁর মর্যাদা বেড়ে যাবে এবং নারীদের উপর অযথা হয়রানি ও অত্যাচার কমে যাবে।

তিনি বুঝতেন মেয়েরা শিক্ষিত হলে সেই পরিবারের ছেলে-মেয়েরাও শিক্ষিত হবে। মেয়েদের আত্মবিশ্বাস এবং সমাজে মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য তিনি মেয়েদের গ্রাম প্রতিরক্ষা দলেও অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁর সময়েই গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে ৩৫ লাখ মহিলা সদস্য অন্তর্ভুক্ত হয়।

জিয়া বিশ্বাস করতেন কাঠমোল্লাদের আপত্তি স্বত্তেও পুলিসসহ বিভিন্ন বাহিনীতে নারী অংশ গ্রহণ নিশ্চিত করে এগিয়ে যেতে হবে। আনসার, পুলিশ বাহিনীতে নারীদের নিয়োগ দেন জিয়া। তিনি অনুধাবন করেছিলেন ক্রমবর্ধমান অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রনে ও নারীর ক্ষমতায়নে প্রশাসনের মূল ধারাতে নারীদের অংশ গ্রহণ সমাজকে এগিয়ে দেবে। লিংকঃ https://goo.gl/2eE41U

আজকে সেনাবাহিনীতে নারীরা যোগ দিচ্ছে। শুধু ডাক্তার বা নার্স হিসাবে নয়, সরাসরি যোদ্ধা হিসাবে, গোলন্দাজ বা কমিউনিকেশন ইউনিটে অফিসার হচ্ছেন। এই সিদ্ধান্ত কিন্তু ১৯৮০ সালেই জিয়া নিয়ে ছিলেন।

উনি খুব স্পষ্ট ভাষাতে বলে দিয়েছিলেনঃ “ভবিষ্যৎ সেনাবাহিনীর জন্য মেয়েদের প্রস্তুত হতে হবে।” 

প্রায় প্রতিটি জনসভাতেই তিনি মেয়েদেরকে উপদেশ দিতেন যেন তারা স্বাবলম্বী হয়, কোন না কোন কাজ করে যেন তারা সংসারের আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে সেইসব পরামর্শ দিতেন।

তিনি বলেছিলেন “আপনারা জেগে উঠুন; আপনারা আমাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। আপনারা  সক্রিয়ভাবে জন্ম নিয়ন্ত্রণ করুন ,আপনাদের স্বামীদেরকেও বাধ্য করুন জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অবলম্বনের জন্য” । 

পরিবার পরিকল্পনার কথা এই দেশে এক সময় ভাবাই যেতো না। অথচ জিয়া আগামীর সমস্যা সবাইকে বুঝিয়ে এই দেশে পরিবার পরিকল্পনা প্রকল্প হাতে নেন। মিশরের গ্রান্ড ইমামকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এনেছিলেন দেশে। জন্ম নিয়ন্ত্রণ কেন নাজায়েজ নয়, তা বিস্তারিত বুঝিয়ে ছিলেন অতি রক্ষণশীলদের।

নারী সমাজকে উন্নয়নের মূল স্রোতে আনতে জন্ম-নিয়ন্ত্রণ সহ যে সব উদ্যোগ জিয়া নিয়েছিলেন তার কিছুটা জানতে পারবেন এই লিংকে। https://goo.gl/PjCQQL

চট্টগ্রামের মত রক্ষণশীল এলাকাতেও তিনি এমনি ভাবেই কথা বলতেন এবং মেয়েরাও তাঁর কথাতে প্রাণ পেতো, উল্লসিত হতো; তিনি যে মেয়ের মনের কথাগুলিই বলতেন তা বোঝা যেতো মেয়েদের উল্লাস মুখর আর আন্তরিক হাততালির ধ্বনি থেকে।

মহিলাদের মধ্যে আত্মসচেতনতা ও আত্মবিশ্বাস তিনি জাগাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন পুরুষ ও মহিলা সব্বাইকে দেশের উন্নয়নের কাজে শরিক করতে।

তিনি বলেছিলেন “সেই জন্য আমাদের পার্টিতে মহিলা অঙ্গ দল, যুব মহিলা অঙ্গ দল আছে এবং জাতীয়তাবাদের যে চেতনা রয়েছে,আমাদের যে আদর্শ রয়েছে তাতে আমরা সকলকে অন্তর্ভুক্ত করেছি।আমাদের ধর্মও বলে যে কাজের বেলাতে পুরুষ ও মহিলা সব সমান।”

মেয়েদেরকে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাতে সম্পর্কে সচেতন হতে তিনি সব জনসভাতেই সর্বদা পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলতেন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা একই সূত্রে গাঁথা। পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে স্বাস্থ্য থাকবে না। তাঁর আগে আর কোন নেতা মহিলাদের স্বাস্থ্য রক্ষার ব্যাপারে কোন সক্রিয় মনোভাব বা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নাই। আত্ম-কর্মসংস্থানমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে অগুনতি মহিলা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে জিয়ার আরো একটি কাজ আমাদের জানা থাকা খুব প্রয়োজন। বাংলাদেশে মেয়েদের ফুটবল খেলাকে আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। তার সময় থেকেই মেয়েদের অন্তঃস্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট চালু হয়। ডকুমেন্টঃ  https://goo.gl/zXRVkU

নারীদের যুগোপযোগী করার প্রকৃয়া মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান শুরু করলেও এক্ষেত্রে সবচে শক্তিশালী বাস্তবায়ন অবশ্য মুক্তিযোদ্ধা প্রেসিডেন্ট জিয়ার নয়। সেসব বাস্তবায়ন করেছিলেন একজন ৪০০ টাকার মেজরের গঠিত রাজনৈতিক দলের চেয়ারপার্সন এক নারী, যে নারী আজ কারাগারে বসে প্রতিক্রিয়াশীল শত্রুর বিরুদ্ধে পাঞ্জা লড়ছেন। আমি উন্মুক্ত এ্যকাডেমিক চ্যলেঞ্জ দিতে পারি যে, নারীর ক্ষমতায়ন যুগোপযোগী বাস্তবায়ন করতে বেগম জিয়ার চেয়ে অধিক পারঙ্গমতা এশিয়া মহাদেশে আর কেউ-ই দেখাতে পারেন নি। আমি চ্যলেঞ্জ ছুড়ে দিলাম। আছেন কোন বীরপুঙ্গব চ্যলেঞ্জ গ্রহন করার মত?

তথ্য সহায়তা

▪ অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক বিচিত্রা ▪ এস আব্দুল হাকিম ▪ দৈনিক ইত্তেফাক ▪ অধুনালুপ্ত দৈনিক দেশ

(ওয়াসিম ইফতেখার, অনলাইন এক্টিভিটস)/-

৬ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা

কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নওগাঁ জেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

অপরদিকে, সিলেট, সুনামগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নেত্রকোনা, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর, রাজবাড়ী, শরিয়তপুর ও ঢাকা জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আগামী ২৪ ঘণ্টায় স্থিতিশীল থাকতে পারে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা আগামী ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।

গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল আছে যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থিতিশীল থাকতে পারে। ঢাকা জেলার আশেপাশের নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।

এছাড়া, কুশিয়ারা ব্যতীত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদীসমূহের পানি সমতল হ্রাস পাচ্ছে। যা আগামী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থিতিশীল থাকতে পারে।

অন্যদিকে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় বালু নদীর ডেমরা পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি সমতল হ্রাস পেতে পারে এবং ধরলা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে।

সারাদেশে পর্যবেক্ষণাধীণ ১০১ টি পানি সমতল স্টেশনের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে ৫৭ টির, হ্রাস পেয়েছে ৪৩ টির,অপরিবর্তিত রয়েছে ১ টির এবং বিপদসীমার উপরে নদীর সংখ্যা ২০টি।

গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে গাইবান্ধা ২৫০ মিলিমিটার, বরগুনা ১৮৫ মিলিমিটার, সুনামগঞ্জ ১০০ মিলিমিটার, সাতক্ষীরা ৮৩ মিলিমিটার, দেওয়ানগঞ্জ ৮০, পটুয়াখালী ৭৮ মিলিমিটার, মহাদেবপুর ৭৩ মিলিমিটার, চাঁদপুর বাগান ৬৯ মিলিমিটার এবং চট্টগ্রাম ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

(ইত্তেফাক, ঘাটাইল ডট কম)/-