মির্জাপুরে গৃহবধুকে ধর্ষনের হুমকি, সাবেক মেম্বার আটক

গৃহবধুকে মোবাইলে ধর্ষনের হুমকি ও মোবাইলে ব্লাকমেইল করে মোটা অংকের টাকা দাবী করার অভিযোগে সাবেক মেম্বার এনামুল হক ওয়াজ আলী নামে প্রতারককে আটক করেছে পুলিশ। আজ শনিবার (৭ নভেম্বর) টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার আজগানা ইউনিয়নের বেলতৈল গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে।

মুল অভিযুক্ত এনামুল হক ওয়াজ আলীর পুত্র রনির হুমকিতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে অভিযোগকারী দুই সন্তানের জননী গৃহবধুর পরিবার।

আজ শনিবার গৃহবধুর স্বামী রুস্তম আলী অভিযোগ করেন, বেলতৈল গ্রামের জামাল উদ্দিনের পুত্র ও সাবেক ইউপি মেম্বার এনামুল হক ওয়াজ আলী প্রভাব বিস্তার করে দীর্ঘ দিন ধরে তার বাড়িতে গিয়ে স্ত্রীকে নানাভাবে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছে। তার কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় মোবাইলে ধর্ষনের হুমকি দেয় এবং মোবাইলে ব্লাকমেইল করে মোটা অংকের টাকা দাবী করে।

এই ঘটনায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের নিকট বিচার দাবী করলে তার পুত্র রনি ক্ষিপ্ত হয়ে হাটুভাঙ্গা বাজারে রুস্তম লাইব্রেরী এন্ড কসমেটিকস ভাংচুর করে। দোকান ভাংচুর করে তাকে, তার স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে প্রাণ নাশের হুমকি দেয়। ফলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন পুরো পরিবার।

এদিকে সাবেক মেম্বার এনামুল হক ওয়াজ আলীর অত্যাচারে গত সোমবার রুস্তম আলীর স্ত্রী বাদী হয়ে সাবেক মেম্বার এনামুল হক ওয়াজ আলী ও তার বখাটে পুত্র রনিকে আসামী করে মির্জাপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।

অভিযোগের প্রেক্ষিতে আজ শনিবার বিকেলে অভিযুক্ত সাবেক মেম্বার এনামুল হক ওয়াজ আলীকে পুলিশ আটক করেছে।

তাকে ছাড়িয়ে নিতে একটি মহল মুল ঘটনা ধামা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অসহায় রুস্তম আলী অভিযোগ করেছেন।

এলাকাবাসি প্রতারক সাবেক মেম্বার এনামুল হক ওয়াজ আলী ও তার বখাটে পুত্র রনির দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবী জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে আজগানা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম সিকদার বলেন, অন্যায় করলে কেউ পার পাওয়ার সুযোগ নেই। অসহায় গৃহবধু থানায় আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তির দাবী জানান।

এ ব্যাপারে মির্জাপুর থানার উপ পরিদর্শক মো. একরামুল হক বলেন, গৃহবধুর অভিযোগের প্রেক্ষিতে এনামুল হক ওয়াজ আলীকে আটক করা হয়েছে। মুল ঘটনা উৎঘাটনের জন্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

(মীর আনোয়ার হোসেন টুটুল, ঘাটাইল ডট কম)/-

আরও ছয় এমপি করোনা আক্রান্ত

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন আরো ছয় এমপি। শনিবার তাদের কোভিড-১৯ পরীক্ষার পজিটিভ ফলাফল এসেছে।

করোনা আক্রান্ত এমপিরা হলেন- সংরক্ষিত নারী আসনের নাদিরা ইয়াসমিন জলি ও তাহমিনা বেগম, নাটোর-২ আসনের শফিকুল ইসলাম, পাবনা-৪ আসনের নুরুজ্জামান বিশ্বাস, নওগাঁ-২ আসনের শহিদুজ্জামান সরকার এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী বেগম হাবিবুন নাহার।

জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশন শুরু আগে এমপিদের করোনা টেস্ট করা হয়। রোববার থেকে এ বিশেষ অধিবেশন শুরু হবে।

অধিবেশনে অংশ নেবেন এমন কর্মকর্তা কর্মচারি, সাংবাদিকদেরও করোনা টেস্ট করা হয়েছে।

(স্টাফ রিপোর্টার, ঘাটাইল ডট কম)/-

টাঙ্গাইলে মেয়রের বাসভবন ভেঙে মার্কেট, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

চলতি বছরের ডিসেম্বরেই টাঙ্গাইল পৌরসভা নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে টাঙ্গাইলে বর্তমান মেয়রসহ অন্য প্রার্থীরা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তবে শেষ মুহূর্তে পৌর মেয়রের বাসবভন ভেঙে সেখানে মার্কেট নির্মাণ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে পৌর কর্তৃপক্ষ। তবে পৌর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে নির্মাণ করা দোকানগুলো পৌরসভার কাউন্সিলরদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সরেজমিনে শহরের পার্ক বাজার রোডে গিয়ে দেখা যায়, পৌরসভা মেয়রের জন্য বরাদ্দকৃত বাসভবন ভেঙে সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে মার্কেট। আর সেই মার্কেটে ইতোমধ্যে ১১টি দোকান নির্মাণ কাজ প্রায় ৯০ ভাগ শেষ হয়েছে। বাকি আরো ১৮টি দোকান নির্মাণাধীন।

পার্ক বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, প্রথমে সেখানে পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণের কথা ছিল। এজন্য সেখানে মাটি ও সয়েল টেস্টসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরিক্ষা করা হয়। পরবর্তীকালে সেখানে পাইলিংও করা হয়। কিন্তু হঠাৎ করেই ভবন নির্মাণ না করে তড়িঘড়ি করে মার্কেটের নামে ছোট ছোট দোকান নির্মাণ করছেন। আবার সেগুলো ৮-১০ লাখ টাকায় দোকান বিক্রিও করছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জানান, পৌর কর্তৃপক্ষ যেই হোক তারা দায়িত্ব নিয়েই আগে কোথায় মার্কেট নির্মাণ করা যায় সেই বিষয় নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। এজন্য তারা প্রতিবছরই নতুন নতুন মার্কেট নির্মাণ করেন আর দোকান বরাদ্দ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন।

আবার পৌরসভার কেউ কেউ নিজের নামে না নিয়ে তাদের নিকটজন আত্মীয়ের নামে দোকান বরাদ্দ নিয়ে থাকেন।

তৎকালীন পৌরসভার চেয়ারম্যান প্রয়াত শামছুল হকের ছেলে মাহমুদুল হক সানু জানান, তার বাবা দীর্ঘদিন পৌরসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সুবাধে তারা পৌর মেয়রের নির্ধারিত ওই বাসভবনে দীর্ঘ ১৬ বছর থেকেছেন। কিন্তু বর্তমানে সেটি ভেঙে ফেলে সেখানে মার্কেট নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি সম্পূর্ণ নিয়ম বহির্ভূত।

থানাপাড়া এলাকার আলমগীর হোসেন নামে এক ব্যক্তি জানান, বর্তমানে পৌরসভার খালি কোনো জায়গা নেই বললেই চলে। কারণ সেগুলোতে পর্যায়ক্রমে দোকান নির্মাণ করে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। অথচ ‘ক’ শ্রেণির টাঙ্গাইল পৌরসভায় ময়লার কোনো ভাগাড়ের জায়গা নেই। এ কারণে ময়লা আবর্জনা ফেলা হচ্ছে শহরের দুই প্রবেশ মুখে।

৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মীর মইনুল ইসলাম লিটন বলেন, পৌর মেয়রের বাসভবন ভেঙে দোকান নির্মাণ করা হচ্ছে। কিন্তু সেগুলো কাদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সেটি তিনি জানানে না।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র জামিলুর রহমান মিরনের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে ফোন কেটে দেন।

(স্টাফ রিপোর্টার, ঘাটাইল ডট কম)/-

টাঙ্গাইলে কাজীপুর মিতালী যুব সংঘের ফুটবল টুর্নামেন্ট সমাপ্ত

জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে টাঙ্গাইল সদর উপজেলায় কাজীপুর তালুকদার পাড়া মিতালী যুব সংঘ ক্লাবের উদ্যোগে মিনি ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শনিবার (৭ নভেম্বর) বিকেলে কাজীপুর পূর্ব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে তালুকদার পাড়া মিতালী যুব সংঘ ক্লাবের আয়োজনে এতে অংশ নেয় কাজীপুর তালুকদার পাড়া মিতালী যুব সংঘ ক্লাব বনাম বিষ্ণপুর নবারুন যুব সংঘ ক্লাব।

খেলার শুরু থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত মনোমুগ্ধকর কাউন্টার এটাকিং ফুটবল খেলা প্রদর্শন করে টাঙ্গাইলের খেলোয়াররা। তাদের নৈপূণ্যময় ফুটবল খেলা প্রদর্শনে মুগ্ধ হন হাজার হাজার দর্শক।

টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলায় ৬০ মিনিটের সময়সীমা শেষ হলে টাইব্রেকারে কাজীপুর তালুকদার পাড়া মিতালী যুব সংঘ ক্লাবকে ২-৩ গোলে হারিয়ে বিষ্ণপুর নবারুন যুব সংঘ ক্লাব চ্যাম্পিয়ন হয়।

চ্যাম্পিয়ন দলকে ৩২ইঞ্চি এলইডি টিভি ও রানার আপ দলকে ২৪ইঞ্চি এলইডি টিভি পুরস্কৃত করা হয়।

ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলায় প্রধান অতিথি ছিলেন টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র জামিলুর রহমান মিরন। বিশেষ অতিথি ছিলেন টাঙ্গাইল পৌরসভার কাউন্সিলর মালেক সরকার, রুস্তম আলী, মহিলা কাউন্সিলর সেলিনা আক্তার (স্বর্ণা), সাবেক কাউন্সিলর হাসিম ইমাম তালুকদার, আব্দুল্লাহ আল মামুন (বাদশা), ক্লাবের উপদেষ্টা মনিরুজ্জামান খোকা তালুকদার।

এসময় উপস্থিত ছিলেন নায়েব আলী তালুকদার, সোহরাব হোসেন তালুকদার, হুমায়ন তালুকদার, আজহার হোসেন তালুকদার, জাহাঙ্গির হোসেন তালুকদার, নুরুল ইসলাম তালুকদার, খলিলুর রহমান তালুকদার, ময়না তালুকদার, আনোয়ারুল ইসলাম, মস্তোফা কামাল, রমজান আলী তালুকদার, মিতালী যুব সংঘ ক্লাবের সভাপতি মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক রানা তালুকদারসহ ক্লাবের কর্মকর্তা ও এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তি বর্গ।

(মোল্লা তোফাজ্জল, ঘাটাইল ডট কম)/-

দুই সাংগঠনিক সম্পাদকের পর টাঙ্গাইল শহর আ’লীগ সভাপতি-সম্পাদকও মেয়র প্রার্থী

আসন্ন টাঙ্গাইল পৌর নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছে। বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় প্রচারণা চালাচ্ছে। মেয়র প্রার্থীরাও প্রার্থী হিসেবে নিজেকে পরিচিত করতে বিভিন্ন উদ্যেগ নিচ্ছে। প্লেকার্ড, শুভেচ্ছা ব্যানার টাঙানোসহ প্রার্থীতা প্রকাশ করতে সভা সমাবেশও করছে।

টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র জামিলুর রহমান মিরন আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। দীর্ঘদিন মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেকটা সময় মাঠে থাকতে হয়েছে তাকে। সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করে একটি শক্ত অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে তিনি।

এদিকে টাঙ্গাইল পৌরসভার কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র সাইফুজ্জামান সোহেল মেয়র পদে প্রার্থীতা প্রকাশ করেছেন। তরুণ ও যুবকদের মাঝে রয়েছে তার যথেষ্ট জনপ্রিয়তা। মেয়র প্রার্থীর মনোনয়ন পেতে তিনিও প্রচার প্রচারণা শুরু করেছেন।

জেলা আওয়ামী লীগের দুজন সাংগঠনিক সম্পাদক পৌর মেয়র পদে আত্মপ্রকাশের পর এবার প্রার্থীতা ঘোষণা করলেন টাঙ্গাইল শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল হক আলমগীর ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ রৌফ।

শুক্রবার সন্ধ্যায় বেড়াডোমা শহীদ মিজানুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ প্রাঙ্গনে সমাবেশের মাধ্যমে টাঙ্গাইল শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি টাঙ্গাইল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক ও সরকারি এম এম আলী কলেজের সাবেক ভিপি এম এ রৌফ তার প্রার্থীতা ঘোষণা দেন।

এসময় আলহাজ্ব মুহাম্মদ মোজাম্মেল হকের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক পৌর কাউন্সিলর মোস্তাফিজুর রহমান মিঞ্জু, শহর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক নাজমুল হুদা নবীন, পৌরসভার সাবেক কমিশনার মির্জা মজিবর রহমান জিন্নাহ্, পৌরসভার কাউন্সিলর মীর মঈনুল হক লিটন, কাউন্সিলর প্রার্থী জেলা স্বেচ্ছা সেবক লীগের সহ-সভাপতি আনোয়ার সাদাৎ তানাকা, পার্ক বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোঃ জোয়াহের আলী প্রমূখ।

এদিকে নিজেকে প্রার্থীতা ঘোষণা করতে টাঙ্গাইল শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল হক আলমগীর সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করেছেন। শনিবার টাঙ্গাইল প্রেসক্লাবের বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে এ মতবিনিময়ের আয়োজন করা হয়। আসন্ন টাঙ্গাইল পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন তিনি। মেয়র হলে টাঙ্গাইল পৌরসভাবে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, দখলমুক্ত রাখতে কাজ করা অঙ্গীকার করেন তিনি। এসময় তিনি তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাস তুলে ধরেন।

মতবিনিময় সভায় টাঙ্গাইল প্রেসক্লাবের সভাপতি জাফর আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক কাজী জাকেরুল মওলা, কবি ও সাংবাদিক মাহমুদ কামাল, সাংবাদিক কামনাশীষ শেখর, সাংস্কৃতিককর্মী মীর মেহেদীসহ টাঙ্গাইল প্রেসক্লাবের সাংবাদিকবৃন্দ এবং আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল হক আলমগীরের কর্মী ও সমর্থকরা উপস্থিত ছিলেন।

নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রচার-প্রচারণায় কে দলীয় নেতাকর্মীদের দৃষ্টি কেড়ে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন পাবে এটাই এখন দেখার বিষয় । পৌরসভার সাধারণ মানুষ সবসময় একটি পরিচ্ছন্ন, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত পৌরসভার প্রত্যাশী।

(রেজাউল করিম, ঘাটাইল ডট কম)/-

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের পূর্বাপর

শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের ৯৫ শতাংশ নেতা-কর্মীরাই খন্দকার মোশতাক আহমদের ক্ষমতা গ্রহণকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। এদিকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট মুজিব সরকারের ইতিহাস নির্ধারিত নির্মম পতনের পর ঢাকায় মালিবাগ মোড়ে অবস্থিত বাকশালের স্থানীয় অফিসটি কে বা কারা যেন মসজিদ বানিয়ে ফেলে। কিন্তু এতে স্থানীয় বাকশাল নেতারা তাদের প্রিয় নেতার মৃত্যুর জন্য যতোটা না বেদনাহত হয়, তার চেয়ে বেশি কষ্টপায় এই অফিসটিকে মসজিদ বানানোর জন্য। ১৫ আগষ্টের পর বাকশাল নেতারা আত্মগোপন করলেও ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে থাকে।

১৫ আগষ্ট রাতেই মোশতাক তাঁর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বেতার ভাষণ দেন। মোশতাক যে মন্ত্রীসভা গঠন করেছিলেন তাতে সবাই আওয়ামী লীগের ছিল। মোশতাক মন্ত্রীসভায় কোন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। ঐতিহাসিকভাবে এ কথাই সত্য যে, শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর পর গঠিত সরকার সকল বিচারেই ছিল আওয়ামী-বাকশালী সরকার। মন্ত্রীসভার একজন মাত্র সদস্য তথা প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ আলতাফ হোসেন ছিলেন বাকশাল উপলক্ষে বিলুপ্ত রুশপন্থী ন্যাপের নেতা, অন্যদিকে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা জেনারেল ওসমানী বাকশাল গঠনের প্রতিবাদে দলত্যাগ করেছিলেন।

এ প্রসঙ্গে খন্দকার মোশতাকের একটি বক্তব্যই খুব উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৪ সালের ১০ আগষ্ট একজন ভারতীয় সাংবাদিককে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘…..দেশকে সেই গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচাবার জন্য আমি ক্ষমতা নিয়েছিলাম। সেদিন তো ফণী বাবুও আমার পাশে ছিলেন…..আপনারা দেখেছেন সবই ছিল।’  (সূত্রঃ পার্থ চট্টোপাধ্যায়, ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেশে দেশে’, পৃষ্টা. ২০২-২০৬)

দেখা গেলো, শেখ মুজিবোত্তরকালের প্রেসিডেন্ট মোশতাক নিজেও স্বীকার করেছেন যে, তিনি নিজে শুধু নন, তার মন্ত্রীসভারও সকলে বাকশাল তথা আওয়ামী লীগের নেতা ও প্রতিনিধি ছিলেন। ১৬ আগষ্ট সরকারী মালিকানাধীন দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম সংবাদের মূল হেডিং ছিল ‘খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনীর শাসন ক্ষমতা গ্রহণ’ (অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি সৈয়দ এবি মাহমুদ হোসেন রাষ্ট্রপতিকে শপথ বাক্য পাঠ করান)।’

মোশতাক ক্ষমতা গ্রহণের ১৫ দিন যেতে না যেতেই সেপ্টেম্বর-অক্টোবর জুড়ে সরকার পতনের ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। ৩১ অক্টোবর থেকে প্রকাশ হতে থাকে এর আলামত। সে এক দুঃস্বপ্নের সময়। গুজব রটতে থাকে যে মোশতাক আহমদ ও সেনাবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান গৃহবন্দী অথবা নিহত হয়েছেন। বঙ্গভবন থেকে রাষ্ট্রপতির নামে যেসব নোট ইস্যু হতে থাকে, তাতে রাষ্ট্রপতির নাম বা স্বাক্ষর ছিল না। এ থেকে ধারণা করা হয় যে, ক্ষমতা দৃশ্যপট থেকে বিদায় নিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোশতাক। দেশের বেতার বা সংবাদপত্রে রাষ্ট্রপতি মোশতাকের বরাত দিয়ে কোনো খবর প্রচার বা প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়।

১৫ আগষ্ট পটপরিবর্তনের পর অভ্যুত্থান নেতারা বঙ্গভবন থেকে প্রকারান্তরে দেশ শাসন করতে থাকেন। অভ্যুত্থানকারীরা সেনা ছাউনিতে ফিরে যেতে অস্বীকার করে। কিছুদিনের মধ্যে সেনাবাহিনীর সিনিয়র সদস্যরা ক্রমশ মেজরদের ওপর ক্ষীপ্ত হয়ে ওঠেন। বিশেষত ঢাকা ব্রিগেড প্রধান শক্তিমান কর্ণেল শাফায়াত জামিল এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন।

সেনাবাহিনীর প্রধান জিয়াউর রহমান উভয় গ্র“পের মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখছিলেন। রাষ্ট্রপতি মোশতাকের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ওসমানীও উভয় গ্র“পের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টির জন্য নিরলস পরিশ্রম করেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে শাফায়াত জামিলের কাছে শিগগিরই জিয়ার ভারসাম্য আর ওসমানীর সমঝোতা অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। শাফায়াত জামিল মুক্তিযোদ্ধা, মেধাবী অফিসার এবং উচ্চাকাঙ্খী বিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে তার পরিকল্পনার ধারক ও বাহকে পরিণত করতে সক্ষম হন।

খালেদ মোশাররফ সেনাবাহিনীতে তখন ছিলেন ৩নং ব্যক্তি চীফ অব জেনারেল স্টাফ। ২ নং শক্তি ডেপুটি চীফ অব স্টাফ এরশাদ ভারতে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় থাকায় সেনাবাহিনীতে খালেদই জিয়ার পরবর্তী ব্যক্তিত্ব হয়ে দাঁড়ান।

২ নভেম্বর রাতে শাফায়াত জামিল ঢাকার রেডিও, টিভি, বিমানবন্দর এবং কেন্দ্রীয় টেলিফোন এক্সচেঞ্জ দখল করে বঙ্গভবন ঘেরাও করেন। দেশ গৃহযুদ্ধের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। ৩ নভেম্বর ভোররাতের দিকে একদল সামরিক অফিসার জিয়ার সাথে দেখা করেন। তারা তাকে রাতে তাদের গৃহীত ব্যবস্থাদি মেনে নিতে চাপ প্রয়োগ করেন।

জিয়া সকাল ১১টায় সেনাসদরে সম্মিলিত জরুরি সভা আহবানের প্রস্তাব দেন। শাফায়াত জামিল প্রেরিত এই সব অফিসাররা জিয়ার প্রস্তাব নাকচ করেন। তারা জিয়াকে হুমকি প্রদান করেন। সেনাপ্রধান হিসেবে দৃশ্যত জিয়ার কার্যকারিতা অচল হয়ে পড়ে।

এদিকে সেনাবাহিনীতে গুজব রটে যায় ভারতের নীল-নক্সা অনুযায়ী জেলে অন্তরীণ তাজউদ্দিন প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসছে। আগষ্ট বিপ্লবের নেতারা দেশ ত্যাগ করার প্রাক্কালে ৩ নভেম্বর সংঘটিত হয় মর্মান্তিক জেল হত্যাকান্ড। খালেদ মোশাররফ ইতিপূর্বের সমঝোতা অনুযায়ী খোন্দকার মোশতাককে প্রেসিডেন্ট মেনে নিয়ে সেনাপ্রধান হতে চাচ্ছিলেন। মোশতাককে কোনোক্রমে রাজি করাতে না পেরে তিনি নিজেই নিজেকে সেনাপ্রধান ঘোষণা করেন। নৌ ও বিমান প্রধানের ব্যাজ পরিয়ে দেন। কিন্তু জেল হত্যাকান্ডের ফলে অতি দ্রুত সবকিছু পাল্টে যায়।

শাফায়াত জামিল মন্ত্রিসভার বৈঠক চলাকালীন অবস্থায় সভাকক্ষে প্রবেশ করেন। তিনি মোশতাককে দারুণভাবে অপমান করে পদত্যাগে বাধ্য করেন। শাফায়াত জামিলের প্রস্তাব অনুযায়ীই পরে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এ.এস.এম. সায়েমকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট মনোনীত করা হয়।

৩ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান নিহত হন। ৪ নভেম্বর সকল মস্কোপন্থী দল. গ্রুপ এবং বাকশালীরা শেখ মুজিবের বাড়ীর দিকে এক শোক মিছিল করে এগিয়ে যায়। মস্কোপন্থী ছাত্র ইউনিয়ন জহুরুল হক হলে একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করে, সেখান থেকে বেতারে সংবাদপত্রে নানা ধরনের নির্দেশ দিতে থাকে। সেদিনই মোশতাক মন্ত্রীসভার তাহের উদ্দিন ঠাকুর ও শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। নভেম্বর মাসের প্রথমদিকে দেশে আসলে কি ঘটছে বা ঘটতে যাচ্ছে তা দেশবাসী বা মিডিয়া আচঁ করতে পারেনি।

৩ নভেম্বর থেকে ৬ নভেম্বর ছিল দেশ ও জাতির জন্য সুকঠিন, সংকট-সন্ধিকাল। ৩ থেকে ৬ নভেম্বর মূলত দেশে কোন সরকারই ছিল না। ৩ থেকে ৬ নভেম্বর বাংলাদেশের মানুষ বাস করেছে এক অসহনীয় আশংকাঘেরা পরিবেশে। রাস্তা দিয়ে তাদের চলাফেরা দেখলে মনে হত যেন মৃত লাশ রাস্তায় চলাফেরা করছে। আইন-শৃংখলার অবনতিতে পুলিশ সবকিছুতে নিয়ন্ত্রণ রাখতে ব্যর্থ হয়। গোটা রাজধানী একটি ভৌতিক এলাকায় পরিণত হয়। চারদিকে শোনা যায় নানা গুজব। রাজনৈতিক-সামাজিক পট পরিবর্তনের আভাসে একটি অস্বস্তিকর থমথমে ভাব বিরাজ করতে থাকে।

১৫ আগষ্টের অভ্যূত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী-বাকশালী সরকারের পতন ঘটলে জনমনে স্বস্তির ভাব ফিরে এলেও যেহেতু এ অভ্যূত্থান ছিল মাত্র কিছুসংখ্যক দুঃসাহসী সেনা নায়কের একটি অসমাপ্ত বিপ্লব, সুতরাং এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ছিল অনিবার্য। ৩ নভেম্বর সেই অনিবার্য বিপ্লব তথা অভ্যুত্থান সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় ব্যক্তি খালেদ মোশাররফ আর একটি পাল্টা ক্যুয়ের মাধ্যমে ঘটান। এই অভ্যূত্থানকারীরা প্রেসিডেন্ট মোশতাক আহমদকে অপসারণ করে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বসান বিচারপতি আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে। বিচারপতি সায়েম একই সঙ্গে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকও হন।

৩ নভেম্বরই ঢাকা সেনানিবাসে এক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তিনি সেনাবাহিনী প্রধান জিয়াকে পদচ্যুত ও গ্রেফতার করেন। তিনি জিয়াকে অন্তরীণ করে রাখেন এবং তার ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখার ব্যবস্থা করেন। জিয়ার টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তার সাথে বাইরের সকল যোগাযোগ বন্ধ করা হয়। একই সঙ্গে তিনি নিজে পদোন্নতি নিয়ে সেনাবাহিনীর প্রধানের পদটি দখল করে বসেন। তিনি এর আগে সিজিএস ছিলেন। ৪ নভেম্বর জিয়ার কাছ থেকে খালেদ মোশাররফ সেনাবাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সম্ভাব্য সংঘাত এড়ানোর পর ৬ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেন, প্রেসিডেন্ট মোশতাক আহমদকে গ্রেফতার করেন এবং তার মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দেন।

খালেদ মোশাররফ সেনা অভ্যূত্থান ঘটানোর সঙ্গে সঙ্গে বাকশাল নেতারা আত্মগোপন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসেন। ৩ নভেম্বর বিকেলে মোশাররফের মায়ের নেতৃত্বে বাকশাল ও সিপিবির মহিলারা ঢাকা নগরীতে একটি মিছিল বের করে। পরদিন ৪ নভেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকে ঐ মিছিলের ছবিটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সারাদেশে এই খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, একটি ভারতপন্থী অভ্যূত্থান ঘটেছে। এর ফলে পরিস্থিতি দ্রুত ঘোলাটে হয়ে ওঠে। ঢাকা মহানগরী একটি গুজবের নগরীতে পরিণত হয়। মালিবাগের স্থানীয় বাকশাল নেতারা যারা তাদের অফিসকে মসজিদ বানিয়েছে, তাদের খোঁজাখুঁজি শুরু করে। চারদিকে থমথমে পরিস্থিতি। সবাই আতঙ্কিত। কি ঘটতে যাচ্ছে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না।

ইতোমধ্যে মানুষের কানে আসছিল দেশের বিভিন্ন গ্যারিসন থেকে সৈনিকরা ঢাকা অভিমুখে আসতে শুরু করেছে ভারতপন্থী অভ্যুত্থানকারীদের হটিয়ে দিতে। মুখে মুখে গোটা নগরীতে এটা ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু অনেকে আবার বিশ্বাসও করতে পারছিল না। এভাবে তিনদিন অতিক্রম করার পর ৬ নভেম্বর রাতে কুমিল্লা ও যশোর থেকে সিপাহীরা ঢাকা অভিমুখে রাস্তায় অবস্থান নেয়। তখন টান টান উত্তেজনা। ভয়-ভীতিতে সবাই আড়ষ্ট । উচ্চস্বরে কথাবার্তা বলা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। বাকশালী দানব আবার জনপদে ফিরে আসে কিনা-সেটা নিয়েই সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল।

যেকোন ব্যাখ্যায় খালেদের সকল কর্মকান্ড ছিল অবৈধ, ক্ষমতাও তিনি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দখল করেছিলেন। কিন্তু সে সময় যেমন, পরবর্তীকালেও তেমনি একথা প্রচার করা হয়েছে যে, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা তথা চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই নাকি তিনি অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলেন। বাস্তবে এই প্রচারণা সত্ত্বেও খালেদের অভ্যুত্থানটি রাজনৈতিক পরিচিতি পেয়েছিল এবং সঠিকভাবেই বাকশালপন্থী অভ্যুত্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। ভারতীয় বেতারে সমর্থনমূলক পরোক্ষ প্রচারণা, বাকশালীদের প্রকাশ্য তৎপরতা এবং তার নিজের মা ও ভাই এর অংশগ্রহণ অনুষ্ঠিত ‘শোক মিছিল’সহ বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে একথা প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, নতুন পর্যায়ে আবারও একটি বাকশালী ও ভারতপন্থী সরকার প্রতিষ্ঠা করাই ছিল খালেদের প্রধান উদ্দেশ্য।

বাকশালী ও ভারতপন্থী পরিচিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল অন্য একটি প্রধান কারণ। সেনাবাহিনীর সকল পর্যায়ে জনপ্রিয় জিয়াকে পদচ্যুত ও গ্রেফতার করে সেনাপ্রধানের পদ দখল করায় খালেদের বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যেও খালেদ বিরোধী মনোভাব প্রচন্ড হয়ে উঠেছিল। এ সময় একটি গুজব ছড়িয়ে যায় যে, খালেদ বাকশাল ও একটি বিদেশী রাষ্ট্রের পক্ষে পাল্টা ক্যু ঘটিয়েছেন।

এরূপ অবস্থায় সেনা ছাউনির হাজার হাজার সাধারণ সৈনিক ও জনতা একত্র হয়ে একটি অভ্যুত্থান ঘটান। নিহত হন খালেদ মোশাররফ। রাষ্ট্রপতি সায়েম হন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। জিয়াউর রহমান পুনরায় সেনাবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত হন। ক্ষমতার দৃশ্যপটে চলে আসেন জাসদ নেতা কর্ণেল তাহের। তাহের ক্ষমতা গ্রহণের পর বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে আরো বিশৃংখলা সৃষ্টি করেন। মোদ্দা কথা বাকশালী সরকার, মোশারফ-তাহের সবাই দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেন।

৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনাবলী গোটা জাতিকে উদ্বেগ আকুল করে তোলে। সৈনিকরা যখন লক্ষ্য করে জুনিয়র বনাম সিনিয়রদের দ্বন্দ্ব তাদের জীবনকে শংকাকুল করে তুলেছে, ভাইয়ে ভাইয়ে সংঘর্ষ অত্যাসন্ন তখন তারা তাদের কর্তব্য নির্ধারণের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তারা অফিসারদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এবং দলাদলি দেখে তাদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। যে গুটিকয়েক অফিসারকে সৈনিকরা মোটামুটিভাবে বিশ্বাস করতো তারাও কোনো সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়। সৈনিকরা দিক শূণ্যতায় ভুগছিল। এ পরিস্থিতিতে জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে। গণবাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা প্রধান কর্নেল তাহের তখন অসুস্থ অবস্থায় নারায়ণগঞ্জ অবস্থান করছিলেন। তাঁকে বিশেষ ব্যবস্থাধীনে ঢাকা আনা হয়।

বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতারা সংকট সমাধানে ব্যাকুল সেনাবাহিনীর লোকদের তাহেরের কাছে নিয়ে যায়। রাজনৈতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এই সৈনিকদের নিয়ে তারা অসংখ্য বার সভা করেন। সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিক ও নন-কমিশন অফিসার পর্যায়ে জাসদের মোট ২৪টি সেল ছিল। এসব সেলসমূহ সৈনিকদের সংঘটিত করার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাধারণ সর্বস্তরের সৈনিকরা বিপুল সংখ্যায় সংকটের মুক্তি কামনার লক্ষ্যে কর্ণেল তাহেরের এলিফ্যান্ট রোডস্থ সাময়িক অবস্থানে ভীড় জমায়। এদের মধ্যে জিয়ার বিপুল সংখ্যক সমর্থক ছিল।

সেনাবাহিনী তথা দেশের এই সামগ্রিক পরিস্থিতিতে জাসদ তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে ব্যবহার করতে উদ্যোগী হয়। জাসদ আনুষ্ঠানিকভাবে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সিপাহী বিপ্লব পরিচালনার জন্য তাহেরকে সকল ক্ষমতা প্রদান করে এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা গোপন সভা এবং সাধারণ সৈনিকদের নিয়ে অনুষ্ঠিত উভয় সভায় তাহেরকে দায়িত্ব দেয়। তাহের এবং তার অনুসারীরা সৈনিকদের আপাত ঐক্য বজায় রাখার জন্য জিয়া বিরোধী বক্তব্য দিতে বিরত থাকে এবং জিয়াকে মুক্ত করার লক্ষ্যেই সমস্ত কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে এমন হাবভাব দেখান। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা তাদের আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বিপ্লবের ৭টি লক্ষ্য নির্ধারণ করেঃ

১। সৈনিকরা সম্মিলিতভাবে বিপ্লব করবে।

২। ষড়যন্ত্রকারী খালেদ মোশাররফকে উৎখাত করা হবে।

৩। সৈনিকরা সেনাবাহিনী ও জনজীবনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে।

৪। প্রাতিষ্ঠানিক সেনাবাহিনীর পরিবর্তে গণসেনাবাহিনী গঠিত হবে। সমাজ এই লক্ষ্যে পুনর্গঠিত হবে।

৫। বাকশাল ব্যাতীত সকল দল সমন্বয়ে একটি অন্তবর্তীকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠিত হবে।

৬। সকল রাজবন্দীর মুক্তি দেয়া হবে।

৭। চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।

এসব লক্ষ্যসমূহ অর্জনের জন্য ৬ তারিখে চূড়ান্ত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

বিপ্লবকালীন কর্মসূচি হবে নিম্নরূপঃ

১। ৬ তারিখ ঠিক ১২.০০ টায় অর্থ্যাৎ জিরো আওয়ারে বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজের মাধ্যমে বিপ্লব শুরু হবে।

২। জীবন বাঁচানোর অনিবার্য প্রয়োজনই কেবল হত্যা অনুমোদন করা যাবে।

৩। খালেদ মোশাররফকে গ্রেফতার করতে হবে।

৪ জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা হবে। কিন্তু তাকে ঢাকা সেনানিবাসের বাইরে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে রাখা হবে।

৫। সৈনিকরা ঢাকা শহর প্রদক্ষিণ করবে এবং বিপ্লবের পক্ষে শ্লোগান দিবে।

৬। প্রতিটি ট্রাকে কমপক্ষে একজন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার লোক থাকবে। তিনি সাধারণ সৈনিকদের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করবেন।

৭। ৭ নভেম্বর সকালে রেসকোর্সে সৈনিকদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঘোষিত হবে।

৮। বিপ্লবের পর রেডিও-টিভি বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা, বিপ্লবী গণবাহিনী এবং জাসদ এর কর্মসূচী এবং এর নেতাদের বক্তব্য প্রচার করবে।

৯। বিপ্লবের অব্যাবহিত পরেই বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ইউনিট অধিনায়কদের সমন্বয়ে বিপ্লবী পরিষদ গঠিত হবে।

১০। সামরিক অফিসারদের বিপ্লবকে সমর্থন জানানোর আহবান জানানো হবে। যারা বিপ্লবকে সমর্থন জানাবে না তাদের গ্রেফতার করা হবে।

১১। কর্ণেল তাহের বিপ্লবের সর্বাধিনায়ক ঘোষিত হলেন। প্রতিটি সৈনিক তার আদেশ পালনে বাধ্য থাকবে।

যথাসময়ে কোনো রকম বাধা বা বিপত্তি ছাড়াই ঘোষিত জিরো আওয়ারে বন্দুকের গুলি আকাশে ছুঁড়ে বিপ্লব শুরু হয়। সৈনিকরা ব্যারাক থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে। সুবেদার সারোয়ারের নেতৃত্বে একদল সৈনিক বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার পুর্বেকার কর্মসূচী অনুযায়ী জিয়ার বাসভবনের দিকে অগ্রসর হয়। শ’ শ’ জিয়াভক্ত সাধারণ সৈনিক সারোয়ারকে অনুসরণ করে। ফলে কর্ণেল তাহেরের নির্দেশ মোতাবেক তাকে শহরে অন্তরীণ করার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। সাধারণ সৈনিকরা জিয়াকে কাঁধে করে আনন্দ করতে থাকে।

একদল বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার কর্মী তাৎক্ষণিকভাবে ছুটে আসে কর্ণেল তাহেরের কাছে। তারা কর্ণেল তাহেরের কাছে পৌঁছতে না পৌঁছতেই প্রশ্ন করেন কর্ণেল তাহের ‘জিয়া কোথায়’? যখন সবকিছু জানতে পারেন তখন তিনি রাগে সবকিছু শেষ বলে মন্তব্য করেন। তাহের সূচিত বিপ্লব প্রতিষ্ঠার জন্য জিয়াকে অন্তরীণ করার চেষ্টা করে। এবারে সুবেদার সারোয়ার জিয়াকে গিয়ে বলেন:  ‘স্যার, কর্ণেল তাহের আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। তার নেতৃত্বেই বিপ্লব হয়েছে। আপনি মুক্ত হয়েছেন।

চলুন স্যার, দেখা করে আসবেন।’ জিয়া আবেগের সাথে তাৎক্ষণিকভাবে জবাব দেন :‘তাহের আমার বন্ধু সে কোথায়? তাকে এই ক্যান্টনমেন্ট থেকে চলে যেতে হয়েছিল। তাকে এখনই এখানে নিয়ে এসো। তিনি এই ক্যান্টনমেন্ট থেকেই সিপাহী-জনতার নেতৃত্ব দেবেন। তিনি তোমাদের নেতা, আমারও নেতা। যাও নিয়ে এসো তাকে এখানে।’

জিয়ার উপস্থিত বুদ্ধি এবং দূরদর্শিতা এবারও জিয়াকে বাঁচিয়ে দেয়। কিন্তু প্রতিপক্ষ তখনও ছিল তৎপর। এবার তারা আসে জিয়াকে রেডিওতে ভাষণ দেবার নাম করে শহরে নিয়ে যেতে। এবারের অভিযানে নেতৃত্ব দেন কর্ণেল তাহেরের ভাই আবু ইউসুফ। জিয়া ইতস্তত করছিলেন। সেখানে ঢাকা ব্রিগেডের কমান্ডার কর্ণেল এ.জেড.এম. আমিনুল হক বীর উত্তম, ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত আলী, বীর উত্তম উপস্থিত ছিলেন। কর্ণেল আমিনুল হক প্রস্তাব করেন যে, একটি রেকর্ডিং ইউনিট এখানে এনে জিয়ার ভাষণটি রেকর্ড করা হোক। জিয়ার প্রতি গভীর আস্থাশীল এই সামরিক অফিসারের হস্তক্ষেপে এবারও তিনি বেঁচে যান। ইতিমধ্যে কর্ণেল তাহের-জিয়া সাক্ষাৎকার এবং কোলাকুলি হয়ে গেছে।

কিন্তু কর্ণেল তাহের যখন বুঝতে পারেন জিয়া তার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছেন তখন বন্দুকের নল ঘুরিয়ে দেন। গোটা সামরিক বাহিনী ও সামগ্রিক অর্থে আবার অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। ৭ নভেম্বর সকালের দিকেই বিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জিয়া শহীদ মিনারে আয়োজিত সৈনিক-জনতার সভায় ভাষণ দিতে অস্বীকার করেন। তবে কারারুদ্ধ মেজর জলিল, আসম রব সহ সকল নেতাদের মুক্তি দেন। সকাল ১১টায় Two Field Artillery সদর দফতরে অনুষ্ঠিত সভায় কর্নেল তাহের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ১২ দফা দাবি উত্থাপন করেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন জেনারেল ওসমানী, মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান, এয়ার ভাইস মার্শাল তওয়াব, কমোডর, এম.এইচ. খান এবং মাহবুব আলম চাষী। কিন্তু কেউই এই দাবি মানার প্রতি কোনো আগ্রহ দেখাননি। ফলে কর্ণেল তাহের আরও ক্রুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং তার জনশক্তিকে জিয়ার বিরুদ্ধে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। অত্যন্ত দ্রুততার সাথে আবার লিফলেট বিতরণ করা হয়।

লিফলেটের ভাষা ছিলঃ ‘আমাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র নেতৃত্বের পরিবর্তন নয় এই বিপ্লব হচ্ছে গরীব শ্রেণীর পক্ষে। আমরা আপনাকে (জিয়া) এই বিপ্লবের নেতৃত্বে বসিয়েছি সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য। আপনাকে অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলতে হবে আপনি গরীব শ্রেণীর পক্ষে। আপনাকে অবশ্যই সেনাবাহিনীর কাঠামোগত পরিবর্তন করতে হবে।’

সকাল ১১টায় অনুষ্ঠিত নীতি নির্ধারণী সভায় প্রথম আলোচ্য বিষয় ছিল প্রেসিডেন্ট মনোনয়ন। যেহেতু সৈনিকদের একটি অংশ খন্দকার মোশতাকের পক্ষে শ্লোগান দিয়েছে এবং তার ছবি নিয়ে মিছিল করেছে মাহবুব আলম চাষী প্রস্তাব করেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাকেই পুনর্বহাল করা হোক। কর্ণেল তাহেরও জেনারেল খলিল এতে ঘোরতর আপত্তি জানান। সায়েম তখনও প্রেসিডেন্ট। অন্যরা মুখ খুলছিলেন না। সিদ্ধান্তের জন্য সবাই অবশেষে জিয়ার দিকে তাকান। জিয়া সায়েম এর প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। জিয়াকে যখন CMLA করার প্রস্তাব করা হয় তখন জেনারেল খলিলুর রহমান এবং কর্ণেল তাহের Warrant of precedence  এর ধুয়া তুলে আপত্তি জানান। অবশেষে জিয়াকে DCMLA nতে হয়, যদিও ইতিপূর্বে CMLA হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

৭ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ এবং তার দু’জন সঙ্গী নিহত হওয়া ব্যতীত রক্তপাতের তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু তাহেরপন্থীরা জিয়ার বিরুদ্ধে কার্যক্রম শুরু করতেই শ্লোগান উত্থিত হয় ‘সিপাহী জনতা ভাই ভাই-অফিসারের রক্ত চাই’, ‘সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই-সুবেদারের উপরে অফিসার নাই’, ‘বেঈমান জিয়ার বিরুদ্ধে লড়তে হবে এক সাথে’।

৮ নভেম্বর সকালে তাহেরপন্থীরা অরাজকতা সৃষ্টি করে এবং ১২ জন অফিসারের কোয়ার্টারে লুটপাট চালায়। এমনকি তারা এসব কাজের জন্য জাসদ তথা গণবাহিনীর লোকদের সেনানিবাসে নিয়ে আসে। জিয়া এবং জিয়াপন্থী সৈনিকদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেন কর্ণেল তাহের। অবশ্য ইতিমধ্যে তাহেরপন্থীদের মধ্যেই মতবিরোধ দেখা দেয়। কর্পোরাল হকের নেতৃত্বে একটি গ্র“প তাহেরের ধ্বংসাত্মক কাজের বিরোধিতা করেন। মেজর জলিল ব্যক্তিগত পর্যায়ে তাহেরের এসব কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা পরবর্তীকালে ২৩ নভেম্বর সারাদেশে সর্বাত্মক অভ্যূত্থানের সিদ্ধান্ত নেন কিন্তু এর আগেই কর্ণেল তাহের এবং তার অনুগামীদের গ্রেফতার করা হয়। সেসাথে সমাপ্ত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বঞ্ছনাবহুল দিনগুলোর।

১৯৭১ সালে নেতৃত্বহীন জাতিকে নেতৃত্ব দিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন সেই সাহসী মেজর, ১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তন হলে ৭ নভেম্বর বিপ্লবের পর সিপাহী জনতার ঠিকানা হয়েছিলেন সেই জিয়া। সায়েম রাষ্ট্রপতি হলেও দেশবাসীর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় জিয়ার প্রতি। বিশেষ করে প্রগতিশীল তরুণ সমাজের কাছে তিনি আবির্ভূত হলেন আলোর দিশারী হিসেবে। সারা দেশে নগরে নগরে উল্লাসমুখর সিপাহী আর জনতা প্রদক্ষিণ করে। সেনাবাহিনীর জওয়ানকে বুকে জড়িয়ে ধরে চাষা, আলিঙ্গন করে নাগরিক, ট্যাঙ্কের গলায় ওঠে মালা। যেন ঘুমন্ত নগরী হঠাৎ জেগে উঠে উৎসবে মুখরিত হয়ে। জনগণ আর একবার আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেয়।

৭ নভেম্বর পথে পথে জনতার কলরোল, পথে বিজয়ের আনন্দ ছিল। তমসাচ্ছন্ন রাত্রির ঘনঘোর অমানিশার অবসান ঘোষণা করে হেমন্তের প্রভাতসূর্যের আগমনের সাথে সাথে পথে নেমেছিল আনন্দোচ্ছল অজস্র মানুষের ঢল। ঢাকার রায়ের বাজার, ঝিগাতলা, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, শাহবাগ সেই কাকডাকা ভোর থেকেই এই সমস্ত এলাকা লোকে লোকারণ্য ছিল। ঘর আর কাউকে বেঁধে রাখতে পারেনি। স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে এসেছে সবাই। বেরিয়ে এসেছে ছাত্র-যুবক-বৃদ্ধ, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও, এমনকি মহিলারও বেরিয়ে এসেছেন কোথাও কোথাও। পথে পথে সে আর এক অভাবিত দৃশ্য। গাড়ীতে গাড়ীতে বিপ্লবী সিপাহী জনতার এক দুর্জয় উল্লাস। মানুষের নিকট স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্ব কতখানি প্রিয়তম সম্পদ তার প্রমাণ মিলেছে এই দিন। ঢাকার রাজপথে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া গাড়ীর শব্দ আর জয়ধ্বনি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত উল্লাস ধ্বনির সাথে একত্রিত হয়েছিল। রাত হতে একটানা গোলাগুলির শব্দে রাজধানীর মানুষগুলি শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় প্রহর গুনছিল-অকস্মাৎ সেনাবাহিনীর শ্লোগানে আর অভয়বাণীকে তাদের সমস্ত জড়তাকে মুছে ফেলে।

১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বরের মত একইভাবে একই উল্লসিত প্রাণচাঞ্চল্যে মুখরিত হয়েছিল ১৯৭৫ এর ৭ নভেম্বরের প্রত্যুষ। ভোর হতে রাস্তায় রাস্তায় মানুষ  নেমেছে, মিছিল করেছে-জিয়া ও মোশতাকের দীর্ঘ জীবন কামনা করেছে। ট্রাকের পর ট্রাক বোঝাই হর্সোৎফুল¬ সৈনিক-জনতা জিয়া ও মোশতাকের ছবি নিয়ে প্রদক্ষিণ করেছে ঢাকার বিভিন্ন সড়ক।

পথে পথে সিপাহী আর জনতা আলিঙ্গন করেছে, হাত নেড়ে জানিয়েছে অভিবাদন-কাঁধে কাঁধ, হাতে হাত এক কণ্ঠে একই আওয়াজ-সিপাহী জনতা ভাই ভাই, জোয়ান জোয়ান ভাই ভাই; বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ, খন্দকার মোশতাক জিন্দাবাদ, আমাদের আজাদী-রাখবই, রাখব, স্বাধীনতা স্বাধীনতা-রাখবই রাখব, হাতের সাথে হাত মিলাও এক কাতারে শামিল হও, হাতের সাথে হাত মিলাও-সিপাহী জনতা এক হও। এত আনন্দ, এত উল্লাস সিপাহী ও জনতার হৃদয়ের কোরাস, শ্লোগানের সাথে কামানের এমন অর্কেস্ট্রা-এ এক অনন্য ইতিহাস।

গাড়ীতে করে সেনাবাহিনী প্রত্যকটি মহল্লায় গিয়ে জনগণকে আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়েছে, দেশের সার্বভৌমত্বকে অক্ষুন্ন রাখার জন্য আকুল আবেদন রেখেছে-কামনা করেছে জনগণের ঐকান্তিক সহযোগিতা। সেনাবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ, আনসার, তথা সমস্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে জনগণের আন্দোলন প্রাণের স্পন্দন একইলয়ে স্পন্দিত হয়েছে। জিয়ার বীরত্বপূর্ণ প্রত্যাবর্তনে আনন্দে উদ্বেলিত ঢাকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বের করেছে মিছিল। ট্রাকে ট্রাকে উল্লসিত জনতার গগনবিদারী শ্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছে ৭ নভেম্বরের সকাল। সিপাহী ও জনতার মিলিত বিপ্লবে ৪ দিনের দুঃস্বপ্নের প্রহর শেষ হয়। এর কিছুক্ষণ পর জেনারেল জিয়া জাতির উদ্দেশ্যে তার ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই দুর্যোগময় দিনে যেভাবে উদ্বেলিত করেছিল বাংলার মানুষকে, ঠিক তেমনিভাবে যেন আবারও সৃষ্টি করেছিল উম্মাদনার জোয়ার।

রেডিওতে ঘোষণা করা হচ্ছিল, সিপাহী বিপ্লব সফল হয়েছে। প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের হাত থেকে জিয়াকে মুক্ত করা হয়েছে। বিপ্লবী সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে। সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার-এই ৪ দিনের দুঃস্বপ্নের প্রহর পেরিয়ে এসেছে শুক্রবারের সোবেহ সাদেক, সিপাহী ও জনতার মিলিত বিপ্লব এনেছে শুক্রবারের বিজয়ের সূর্য।

৭ নভেম্বরের ঘটনা অনেকটা পরিষ্কার হলেও আওয়ামী-বাকশাল, জাসদ ও কিছু রাজনৈতিক দল সিপাহী-জনতার অভ্যূত্থানকে  সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি বলেই আজ এ নিয়ে বির্তকের সূত্রপাত করতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী-বাকশাল ও জাসদ একই ঘরণার নায়ক। তাদের আসল গোড়া একই মাটিতে প্রোথিত। যেমন মোশাররফ আর কর্ণেল তাহেরের স্তুতিতে মেতে ওঠে তখন আর এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে কারো কষ্ট হবার কথা নয়। সবার আজ একটি প্রশ্ন ৭ নভেম্বরে তাহের যদি খালেদের বিরুদ্ধে সত্যিই বিপ্লব সংগঠিত করবে তাহলে দুজনকে সমর্থন করে আওয়ামী লীগ ও জাসদ স্মৃতিচারণ করে কোন হিসাবে?

দুই।

৭ ই নভেম্বর সম্পর্কে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার ‘বাংলাদেশ এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইতে লেখেন—‘১৯৭৫ সালের ৫ ও ৬ নভেম্বর ক্যান্টনমেন্টসহ সারা শহরে ছড়ানো হলো হাজার হাজার প্রচারপত্র। এই কাজগুলো করল বামপন্থী জাসদ। এ সময় রাজনৈতিক দল জাসদ ছিল নিষিদ্ধ। কিন্তু এরা কাজ করছিল বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা এবং বিপ্লবী গণবাহিনীর আবরণে।

একটি ব্যাপারে ডান ও বাম উভয় রাজনৈতিক দলই একমত ছিল। আর তা হচ্ছে, খালেদ মোশাররফ একজন বিশ্বাসঘাতক, ভারতের দালাল এবং সে ঘৃণিত বাকশাল ও মুজিববাদ ফিরিয়ে আনতে চাইছে।’

জাসদ এক ধাপ আরও এগিয়ে গেল। তারা বলল, সিনিয়র অফিসাররা নিজেদের স্বার্থে জওয়ানদের ব্যবহার করছে। সাধারণ মানুষ ও জওয়ানদের ব্যাপারে কোনো মাথাব্যথা নেই।

গণজাগরণের ডাক দিয়ে জাসদ ১২টি দাবি পেশ করে। এগুলোর মধ্যে ছিল—ব্যাটম্যান প্রথা বাতিল করতে হবে, অফিসারদের ব্যক্তিগত কাজে সৈন্যদের ব্যবহার করা চলবে না, পোশাক ও পদমর্যাদার ক্ষেত্রে জওয়ান ও অফিসারদের ব্যবধান দূর করতে হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, সব রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে হবে। জাসদের দাবিগুলো সে সময়ে তাত্ক্ষণিকভাবে সৈনিকদের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হলো।

জাসদের এই দাবিনামা এবং গণঅভ্যুত্থানের ডাক দেয়ার পেছনে যে ব্যক্তিটি কাজ করছিলেন—তিনি হলেন সাবেক আর্মি অফিসার লে. কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) আবু তাহের। তিনিই প্রথম জওয়ানদের মধ্যে ‘ওরা এবং আমরা’ এই ধারণার সৃষ্টি করান এবং অফিসারদের বিরুদ্ধে জওয়ানদের মাথা তুলে দাঁড়াতে সাহায্য করেন।

মধ্যরাতের কিছু পরই অর্থাৎ ৭ নভেম্বরের ভোরের দিকে জওয়ানরা ব্যারাক থেকে বেরিয়ে পড়ল। তারা অস্ত্রাগার থেকে স্টেনগান-রাইফেলসহ অন্যান্য অস্ত্র লুট করল এবং তারা ‘সিপাই-সিপাই ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই’ এবং ‘সিপাই-সিপাই ভাই ভাই, সুবেদারদের ওপরে অফিসার নাই’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে দিতে দ্রুত ক্যান্টনমেন্টে ছড়িয়ে পড়ল।

সারা ঢাকা শহরে এই ‘সিপাহি বিপ্লব’ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। রাত ১টার মধ্যেই সিপাহিরা পুরো ক্যান্টনমেন্ট দখল করে নিল। এদের কেউ কেউ ক্রমাগত ফাঁকা গুলি ছুড়তে লাগল। অন্যরা উত্তেজিত অবস্থায় স্লোগান দিতে দিতে অফিসারদের খুঁজতে লাগল। বেঙ্গল ল্যান্সারের হাবিলদার সারওয়ারের নেতৃত্বে একদল জওয়ান গেল জেনারেল জিয়ার বাসভবনে।

চার দিন বন্দি থাকার পর মুক্তি পেলেন জেনারেল জিয়া। নৈশ পোশাক পরিহিত অবস্থাতেই জিয়াকে উল্লসিত জওয়ানরা কাঁধে করে নিয়ে গেল ২ ফিল্ড আর্টিলারির হেডকোয়ার্টারে। ঘটনার আকস্মিকতায় তখন বিহ্বল হয়ে পড়েছেন জিয়া। নাম না জানা অনেক জওয়ানের সঙ্গে আলিঙ্গন, করমর্দন করলেন তিনি। তাদের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে জিয়া প্রথমেই ফোন করলেন জেনারেল খলিলকে। তাকে বললেন, ‘আমি মুক্ত। আমি ভালো আছি। আমার জন্য কোনো চিন্তা করবেন না।’

জিয়া তার মুক্তিদাতাদের কয়েকজন অফিসারকে তার কাছে নিয়ে আসতে বললেন। তারা হচ্ছেন জেনারেল মীর শওকত আলী, জেনারেল আবদুর রহমান এবং কর্নেল আমিনুল হক। সৈন্যরা যখন তাদের নিয়ে এলো, তখন তিনি তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে কোলাকুলি করলেন। সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণ করতে তিনি তাদের সহযোগিতা চাইলেন। বললেন, ‘আমি রক্তপাত চাই না।’

গ্রন্থটিতে আরও বলা হয়েছে, রাত দেড়টার দিকে জওয়ানরা রেডিও স্টেশন দখল করে নিল। তারা রাতের কর্মীদের জানাল যে, জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সিপাহি-জনতার বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে। বিস্মিত রেডিওর কর্মকর্তারা প্রথমে বুঝে উঠতে পারলেন না তারা কী করবেন। যখন তারা টের পেলেন যে, জওয়ানরা তাদের ভয় দেখাচ্ছে না এবং খালেদ মোশাররফ পরাজয়বরণ করেছেন; তখন তারা সবাই উল্লসিত সৈন্যদের সঙ্গে যোগ দিলেন।

সৈন্য এবং সাধারণ মানুষ ভর্তি কিছু ল্যান্সার ট্যাঙ্ক শহরের মাঝখানে এসে পৌঁছল। ক্যান্টনমেন্টে গোলাগুলির শব্দ শুনে প্রথমে লোকজন ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রেডিওতে ক্রমাগত ‘সিপাহি বিপ্লবের’ ঘোষণা এবং জেনারেল জিয়ার ক্ষমতা দখলের খবর শুনে হাজার হাজার লোক স্রোতের মতো রাস্তায় নেমে এলো।

তিন দিন ধরে তারা বিশ্বাস করছিল যে, ভারত খালেদ মোশাররফের মাধ্যমে তাদের কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতাকে বিপন্ন করছে। এখন সেই দুঃস্বপ্ন কেটে গেছে। সর্বত্র জওয়ান এবং সাধারণ মানুষ খুশিতে একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করল, রাস্তায় নামল। সারারাত তারা স্লোগান দিল, ‘আল্লাহু আকবার, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ’। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের মতো এদেশের মানুষ আবার জেগে উঠেছে। এটা ছিল একটি স্মরণীয় রাত।

রেডিও বাংলাদেশে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে জেনারেল জিয়াউর রহমান ঘোষণা করেন, তিনি সাময়িকভাবে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। সেনাবাহিনীর অনুরোধে এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, সাধ্য অনুযায়ী তিনি তার কর্তব্য পালন করবেন। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ এবং কঠোর পরিশ্রম করার আহ্বান জানান। তিনি অবিলম্বে সবাইকে কাজে যোগ দেয়ারও নির্দেশ দেন।

নভেম্বরের দিনপঞ্জি – ৬/৭ নভেম্বর

খালেদ, হুদা ও হায়দার

৫ নভেম্বর মীর শওকত আলীর ফোনে বিরক্ত হয়ে ওঠেন খালেদ মোশাররফ। অবশেষে খালেদের অনুমতি পেয়ে ৬ নভেম্বর বিমান যোগে ঢাকাতে এসে খালেদের সাথে ২/৩ ঘন্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। আমার ধারনা বৈঠকে তাঁরা বোধহয় জিয়ার ভাগ্য নিয়ে আলোচনা করে থাকবেন। আমার এটাও মনে হয় পরবর্তিতে খালেদের মৃত্যুর পিছনে এই মিটিং এর কিছুটা হলেও ভূমিকা আছে।

৬ নভেম্বর দুপুরে বঙ্গ ভবনে রাষ্ট্রপতি সায়েমের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। দুপুর থেকেই বঙ্গ ভবন, সোহরাওয়ার্দি থেকে ট্যাংক গুলো ফিরিয়ে আনা হয়। সন্ধ্যার ভেতর সবগুলো ট্যাংক তাঁদের ইউনিট লাইনে পৌঁছে যায় অবশ্য গোলন্দাজ রেজিমেন্টের কামানগুলো ৪ নভেম্বরে লাইনে ফিরে এসেছিল।

অভ্যুত্থানের চতুর্থ দিনঃ ‘সিপাহী বিপ্লব’ ও ঠাণ্ডা মাথাতে খালেদকে হত্যা।

৬ নভেম্বর খবর পেলাম “বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা” নামে একটি সংগঠন উস্কানি মূলক লিফলেট ছড়াচ্ছে। এ ধরনের কোন সংগঠনের অস্তিত্বের কথা এই প্রথম শুনলাম। যায় হোক জানতে পারলাম সৈনিকদের ভেতর চাপা উত্তেজনা ও অফিসারদের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছে তাঁরা। খালেদ সন্ধ্যার দিকে ট্যাংক রেজিমেন্টে গেলেন সৈনিকদের উত্তেজনা প্রশমন করার জন্য। সৈনিকদের ধৌর্যশীল হবার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন সৈনিকদের বিরুদ্ধে কোন ব্যাবস্থা নেওয়া হবেনা।

রাত ১০ টার দিকে খালেদ ফোনে আমাকে বঙ্গ ভবনে ডাকিয়ে নিলেন। বঙ্গ ভবনে যাবার জন্য যখন গাড়িতে উঠছি তখন ব্রিগেড মেজর হাফিজ আমাকে জানালো প্রথম বেঙ্গলের একজন সিনিয়র জেসিও বলেছে রাত ১২ টাতে সৈনিকরা বিদ্রহ করবে, জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার আহবানে ও নেতৃত্বে তাঁদের লোকেরাই এই বিদ্রহ ঘটাবে। খালেদ ও আমাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে বলে আমাকে জানানো হয়।

১১ টার দিকে বঙ্গ ভবনে পৌঁছে দেখি খালেদ তখনো এসে পৌঁছেনি। তাঁর আসতে আরো ২০/২৫ মিনিট দেরি হয় কারণ দুজন সাংবাদিক তখন খালেদের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে ঐ দুই সাংবাদিকের পত্রিকাতে খালেদের মৃত্যুর পর তাঁকে রুশ ভারতের দালাল আখ্যা দিয়ে সংবাদ ছাপানো হয়।

যায় হোক খালেদ আমাকে ডেকে মধ্যস্ততা করার জন্য বললেন। সামরিক আইন প্রশাসকদের বিন্যাস নিয়ে তাঁর সাথে অন্য দুই প্রধানের মতের মিল হচ্ছিল না। ১৫ অগাস্টের মোস্তাক নিজেকে চিফ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর ঘোষনা করলেও খালেদ চাচ্ছিলেন আর্মি চিফ কে চিফ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর করতে। এই ফাঁকে সেনানিবাসের পরিস্থিতি খালেদকে আমি জানালে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিলেন না। আমাদের কথা বার্তার মাঝ পথেই ক্যান্টনমেন্ট থেকে সিপাহী বিদ্রহ শুরু হবার খবর এলো।

মিটিং ভেঙে হুদা ও হায়দারকে নিয়ে খালেদ চলে গেলেন, অন্য দুই প্রধানও চলে গেলেন তবে আমাকে বঙ্গ ভবনে থেকে যেতে নির্দেশ দিলেন। খালেদ প্রথমে মোহাম্মদপুরে আত্মীয়র বাসা হয়ে রংপুর ব্রিগেড থেকে আসা দশম বেঙ্গলের সেলটার শেরেবাংলা নগরে অবস্থান নেন।

রাত ১২ টার পর সিপাহীরা প্রথমেই মেজর মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে জিয়াকে মুক্ত করে ফিল্ড রেজিমেন্টের মাঠে নিয়ে আসে।

রাত্রিকালীন অবস্থানের পর সকালে খালেদ ঐ ১০ম বেঙ্গলের অবস্থানে নাস্তা করেন। এরপর ১১ টার দিকে এলো সেই মর্মান্তিক মূহুর্ত। ফিল্ড রেজিমেন্টের কয়েকজন অফিসারের অর্ডারে খালেদ ও তাঁর দুই সঙ্গীকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এই হত্যাকান্ডের বিচার আজো হয়নি। ফিল্ড রেজিমেন্টে যারা সদ্য মুক্ত জেনারেল জিয়ার আশেপাশে অবস্থান নিয়েছিলেন তাঁদের ভেতর কেউ কেউ নিশ্চয় জড়িত ছিলেন। তবে সিপাহী বিপ্লবের অন্যতম নায়ক কর্নেল তাহের ও তৎকালীন জাসদ নেতৃবৃন্দ এর দায় কোনদিন এড়াতে পারবে না।

জিয়া মুক্ত হবার পরপর রাত তিনটার দিকে বঙ্গ ভবনে নিজেই আমাকে ফোন করলেনঃ

*Forgive and forget, let’s unite the army.  জিয়া বললেন।

আমি একটু রুঢ ভাবেই বললাম

*আপনি সৈনিকদের দিয়ে বিদ্রহ করিয়ে ক্ষমতাই থাকতে পারবেন না। আপনি বাঘের পিঠে সাওয়র হয়েছেন আর নামতে পারবেন না। আপনি যা করার অফিসারদের নিয়ে করতে পারতেন, সৈনিকদের নিয়ে কেন?

এই সময় একটি অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলাম, জিয়ার সাথে আমার কথা বাংলা ইংরাজি মিশিয়ে হচ্ছিল। আমাদের কথার যে অংশগুলো বাংলা ছিল কে যেন তা ইংরেজিতে ভাষান্তর করে কাউকে সাথে সাথে জানাচ্ছিল। আমি স্পষ্টত বুঝতে পারছিলাম। অর্থাৎ আমার ও জিয়ার কথোপকথন বঙ্গ ভবনের কেও একজন বিদেশি সোর্সের কাছে পাচার করছিল।

রাত ৩.৩০ নাগাদ নারায়ে তাকবির , সিপাই সিপাই ভাই ভাই/অফিসারের রক্ত চাই’ স্লোগান শুনলাম। সেই সাথে মুহু মুহু ফাঁকা গুলির আওয়াজ। ২য় বেঙ্গলের দুটি পদাতিক কোম্পানি তখন আমার সাথে বঙ্গ ভবনের দায়িত্বে ছিল , সাথে রক্ষীবাহিনী থেকে রূপান্তরিত পদাতিক ব্যাটালিয়নের একটি। সাথে সাথে কোম্পানি কমান্ডারদের নির্দেশ দিলাম পজিশন নিতে এবং বিদ্রহীরা গুলি করলে প্রতিরোধ করতে।  ১৫/২০ মিনিট পর স্লোগান ও ফাঁকা গুলির শব্দ আরো প্রখর, তীব্র ও নিকট হতে লাগলো।

আশ্চর্জ হয়ে দেখতে লাগলাম আমার সৈনিকেরা কোন পাল্টা গুলি ছুড়ছে না। বিদ্রহী সিপাহীদের ঐ শ্লোগানে তারাও মোহাবিস্ট হয়ে গিয়েছে! তাঁরা ওদের বিরুদ্ধে কিছুই করবেনা।

এই পরিস্থিতিতে আমার কোম্পানি কমান্ডারের কথাতে আমরা এখান থেকে বেড়িয়ে গিয়ে ক্যান্টনমেন্টে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম।

ওদিকে ফায়ারিং ও স্লোগান তখন একেবারে মুখোমুখি। উপায়ান্তর না পেয়ে আমি, দিদার ও কয়েকজন সৈনিক নিয়ে বঙ্গ ভবনের দেওয়াল টপকে বেড়িয়ে এসে অপেক্ষমান সামরিক ডজ গাড়িতে উঠে পরলাম। ক্যান্টনমেন্টে যাওয়া সমীচীন হবে না বুঝতে পারলাম , আর আমার জরুরী ভিত্তিতে চিকিৎসা দরকার । বঙ্গ ভবনের দেওয়াল টপকে পালানোর সময় আমার পা ভেঙে গিয়েছিল।

ভাবলাম কুমিল্লা সেনানিবাস এখনো শান্ত তাই ওখানে যাবো এবং সিএমএইচএ ট্রিটমেন্ট নেবো। মেঘনা ফেরী ঘাটে পৌঁছে মনে হল কুমিল্লা সেনানিবাসও নিরাপদ হবেনা, এতক্ষণে হয়তো ওখানেও খবর পৌঁছে গিয়েছে। সৈনিকদের ফেরত পাঠিয়ে আমি ও দিদার মুন্সিগঞ্জের যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। মেঘনা ঘাটে কর্মরত স্টাফদের কাছ থেকে লুঙ্গি গেঞ্জি নিয়ে তাড়াতাড়ি গায়ে চাপিয়ে  সামরিক ইউনিফর্ম ছাড়লাম।

দু ঘণ্টা নৌকা চলার পর দেখি এসডিও লঞ্চ নিয়ে নারায়ণগঞ্জ যাচ্ছে। তাঁকে থামিয়ে, আমার পরিচয় দিয়ে চিকিৎসার প্রয়োজনের কথা জানালাম। দিদারের পরিচয় আর জানানো হল না, দিদারকে ভার্সিটি পড়ুয়া আমার সাহায্যকারী পরিচয় দেওয়া হল।

এসডিও-র সাথে আমি পুলিশি হেফাজতে থানা হাজতে চলে গেলাম আর দিদার মিশে গেলো লাখো জনতার কাতারে।

নারায়ণগঞ্জ থানা থেকে ২য় ফিল্ড রেজিমেন্টে জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। জিয়ার পক্ষে জেনারেল মীর শওকত আলী ফোন ধরে আমাকে বললেনঃ “শাফায়াৎ তুমি ওখানেই থাকো, আমি লেঃ কর্নেল আমিনুল হককে পাঠাচ্ছি। ও তোমাকে নিয়ে আসবে”।

ঘণ্টা দুয়েক পরে আমিনুল এলো। তাঁর সাথে ২/৩ টি গাড়িতে চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক। আমরা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলাম। ঢাকাতে পৌঁছে সিএমএইচ এ ভর্তি হয়ে গেলাম ভাঙা পায়ের চিকিৎসা করার জন্য।

এখানে এসেই খালেদ, হায়দার ও হুদার নির্মম হত্যাকান্ডের খবর শুনি। পরে জানতে পারি, মুক্তি পেয়ে জিয়া দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টে এসে প্রথম অর্ডারেই বলে দিয়েছিলেন: *There should be no bloodshed. No retribution. Nobody will be punished without proper trial. বাংলাতে “ কোন ধরনের রক্তপাত ঘটানো যাবে না , কোন প্রতিশোধ নিতে পারবে না, যথাযথ বিচার ছাড়া কাউকে কোন শান্তি দেওয়া যাবে না”।

অথচ জিয়ার নির্দেশ উপেক্ষা করে এবং যাবতীত শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে, ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয় সেনাবাহিনী তথা মুক্তিযুদ্ধের তিন বীর সেনানীকে।

(তথ্য: কর্নেল শাফায়াৎ জামিল (অবঃ) ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, রক্তার্ত অগাস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর)

(জিবলু রহমান/ ওয়াসিম ইফতেখার, ঘাটাইল ডট কম)/-

কুমিল্লায় অবৈধ ইন্টারনেট সেবা দিতে গিয়ে সরঞ্জামসহ আটক ৩

কুমিল্লায় লাইসেন্সবিহীনভাবে ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণের সরঞ্জামসহ পৃথক স্থানে অভিযান চালিয়ে তিন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) সদস্যরা।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার জগতপুরের ‘রয় অনলাইন’ এবং শাহরাস্তি উপজেলার সূয়াপাড়া এলাকার ‘ডিজা অনলাইন’ ও ‘এসবিএস’ নামক প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করে র‌্যাব।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে কুমিল্লার র‌্যাব-১১ এর সিপিসি-২ এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর তালুকদার নাজমুছ সাকিব তথ্যটি নিশ্চিত করেন।

অভিযানে লাইসেন্সবিহীনভাবে ইন্টারনেট সেবা অবৈধ আইএসপি দেওয়ার অভিযোগে বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামাদিসহ তিন জনকে হাতেনাতে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। এসময় তাদের থেকে একটি সিপিইউ, একটি মনিটর, একটি কি-বোর্ড, একটি মাউস, তিনটি মাইক্রোটিক রাউটার, দুটি ল্যাপটপ, তিনটি ওএলটি, তিনটি ইন্টারনেট রাউটার, দুটি ওয়াকিটকি সেট, ১৫টি মিডিয়া কনভার্টার এবং তিনটি মাইক্রোটিক সুইচ জব্দ করা হয়।

গ্রেফতার হওয়াদের মধ্যে রয়েছে চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার জগতপুর গ্রামের রেজাউল মাওলার ছেলে তমাল হোসেন রাজিব (৩৪), চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলার বলশীদ গ্রামের মৃত মাওলানা আব্দুল হাইয়ের ছেলে মো. দিদার হোসেন পাটোয়ারী (৫২) এবং চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলার বাততলা গ্রামের মাওলানা মো. হুমায়ুন কবিরের ছেলে মো. মাহমুদুল হাসান বাবু (২৬)।

(স্টাফ রিপোর্টার, ঘাটাইল ডট কম)/-

মধুপুর বনে বৃদ্ধের মরদেহ

টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার মোনারবাইদ এলাকা থেকে আব্দুল বাছেদ নামে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

আজ শনিবার (৭ নভেম্বর) সকালে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বাছেদ ওই উপজেলার টেলকি এলাকার বাসিন্দা।

নিহতের শ্যালক লাল মিয়া জানান, শুক্রবার সকালে নিজের মহিষ চড়াতে পার্শ্ববর্তী মোনারবাইদ এলাকায় যান বাছেদ মিয়া। বিকেলে মোবাইল ফোনে শেষ কথা তার সঙ্গে। সেখান থেকে রাত হয়ে গেলেও তিনি বাড়ি ফিরে না আসায় সম্ভাব্য সব জায়গায় তাকে খোঁজাখুঁজি করা হয়।

পরে তার সন্ধান না পেয়ে বিষয়টি থানায় জানানো হয়। শনিবার সকালে মোনারবাইদ এলাকায় বনের ভেতর থেকে বাছেদ মিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ সময় তার মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও গলায় রশি বাঁধা ছিল।

মধুপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তারিক কামাল জানান, বাছেদ মিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট হত্যার আসল কারণ জানা যাবে। যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

(কামাল হোসেন, ঘাটাইল ডট কম)/-

টাঙ্গাইলে স্কুলের অভিভাবকদের জিম্মি করে টাকা আদায়ের হিড়িক

টাঙ্গাইলে নানা কৌশলে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর অভিভাবকদের জিম্মি করে টাকা আদায় করা হচ্ছে। পরীক্ষার ফি, অ্যাসাইনমেন্ট, মাসিক বেতনসহ নানা কৌশলে টাকা আদায় করা হচ্ছে। জেলা শিক্ষা অফিস থেকে টাকা না নেওয়ার নির্দেশ দিলেও তা তোয়াক্কা করছে না অসাধু শিক্ষকরা। এতে বিপাকে পড়েছেন অভিভাবকরা। তাই টাকা ফেরতের দাবি জানিয়েছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

জানা যায়, বিশ্বব্যাপী মহামারী করোনাভাইরাসের কারনে বাংলাদেশে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে ১৮ মার্চ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষনা করে সরকার। তার পর থেকে প্রায় ৮ মাস যাবত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। এ দিকে করোনাভাইরাসে কারনে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অটো পাশ দেওয়ার কথা রয়েছে।

টাঙ্গাইলে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫০৪ টি। কিন্তু টাঙ্গাইলের বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অভিভাবকদের জিম্মি করে ফি, অ্যাসাইনমেন্ট, মাসিক বেতনসহ নানা অজুহাতে টাকা আদায় করা হচ্ছে। টাকা দিতে অস্বীকার করলে শিক্ষার্থীদের স্কুল মাঠে দাঁড় করিয়ে রাখার ঘটনাও ঘটেছে।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জানিয়েছে অনলাইনে ক্লাশ হলেও হত দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্মার্ট ফোন না থাকায় তার অনলাইন ক্লাশ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তবু হত দরিদ্র শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জোড় পূর্বক টাকা আদায় করা হচ্ছে। তবে মুখ চেনা প্রভাবশালীদের কাছ থেকে কম টাকা নেওয়া হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টাঙ্গাইল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, শহীদ মিজানুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়, ধরেরবাড়ী মুসলিম হাইস্কুল এন্ড কলেজ, গালা আহসান উচ্চ বিদ্যালয়, রসুলপুর বাছিরন নেছা উচ্চ বিদ্যালয়, কাবিলাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, গোপালপুর হোমল্যান্ড স্কুল এন্ড কলেজ, দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়সহ জেলার বেশিরভাগ মাধ্যমিক বিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষার্থী প্রতি দেড় থেকে তিন হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে।

শহীদ জাহাঙ্গীর উচ্চ বিদ্যালয়ের মো. শামীম নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘স্কুল বন্ধ থাকলেও শিক্ষকরা নানা কৌশলে অভিভাবকদের কাছ থেকে জিম্মি করে টাকা আদায় করছে। শিক্ষারা বিভিন্ন শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দেড় হাজার থেকে শুরু করে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত টাকা আদায় করেছেন। টাকা না দিতে চাইলে তারা শিক্ষার্থীদের সাথে খারাপ আচরন করেন। টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’

অপর অভিভাবক আবুল কালাম বলেন, ‘সরকারের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন করার জন্য করোনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও তারা টাকা আদায় করছে।’ তবে এ স্কুলের প্রধান শিক্ষক শামসুল আলমের সাথে মুঠো ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ফোন কেটে দেন।

ধরেরবাড়ী হাইস্কুল এন্ড কলেজের আনিছুর রহমান নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘এটি গ্রাম অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীদের হাতে স্মার্ট ফোন নেই। তাই তারা অনলাইনের ক্লাশে অংশ নিতে পারে না। অথচ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসিক বেতন, পরীক্ষার ফি, অ্যাসাইনমেন্টের টাকা নেওয়া হচ্ছে। টাকা দিতে দেরী হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীকে মাঠের মধ্যে দাড় করিয়ে রেখেছে। তবে ধরেরবাড়ী হাই স্কুল এন্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক মো. শহীদুল ইসলামকে বার বার ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

কাবিলাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমরা খুবই গরীব। করোনায় স্কুল বন্ধ। তার পরও এসএসসির ফরম ফিলাপের টাকার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। এই মহুর্তে টাকা জোগাড় করা খুব কষ্ট।

দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আগামী সোমবার পরীক্ষার ফি, সারা বছরের বেতন নিয়ে স্কুলে যেতে বলেছেন। বাসায় থেকে টাকা দিতে চাচ্ছে না। আমি এখন কি করবো কিছুই বুঝতেছি না।’
শহীদ মিজান উচ্চ বিদ্যালয়ের রাজিবা হাসান নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, এর আগেও পরীক্ষার জন্য ৩০০ টাকা করে আদায় করেছেন। এখন আবার অ্যাসাইনমেন্ট ও মাসিক বেতনের জন্য চাপ দিচ্ছে। স্কুল বন্ধ থাকলেও শিক্ষকরা সারা বছরের টাকা দাবি করছে।’

গোপালপুর আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ আমাদের বিদ্যালয়টি এখনও নিবন্ধিত হয়নি। তার পরও আমার কাছ থেকে তিন হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। আমার মতো আরো অনেকের কাছ থেকে এ রকম টাকা নেওয়া হচ্ছে। আবার পরীক্ষার জন্য আরও ৫০০ টাকা করে দাবি করা হচ্ছে। আমার মতো গরীব পরিবারের পক্ষ থেকে এতো টাকা দেওয়া খুব কষ্টকর।

গোপালপুর আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ আশরাফুজ্জামান রাসেল বলেন, ‘ বিদ্যালয়ের নিবন্ধন পক্রিয়া চলমান। টাকা জন্য শিক্ষার্থীদের চাপ দেওয়া হচ্ছে না। যে যা দিচ্ছে তাই নেওয়া হচ্ছে।’

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি টাঙ্গাইল জেলা শাখার সভাপতি শামীম আল মামুন জুয়েল বলেন, ‘বিভিন্ন বিদ্যালয়ে অর্ধেক মাসের বেতন নেওয়া হচ্ছে সেই বিষয় জানি। তবে পরীক্ষার ফি ও অ্যাসাইনমেন্টের কোন টাকা নেওয়া হচ্ছে কিনা সেই বিষয়ে কিছু জানি না।’

টাঙ্গাইল জেলা শিক্ষা অফিসার লায়লা খানম বলেন, ‘করোনার মধ্যে পরীক্ষার ফি, অ্যাসাইমেন্ট ও মাসিক বেতন নেওয়ার কোন নিয়ম নেই। কেউ যদি নিয়ে থাকে তাহলে তারা ঠিক করছেন না। কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। উপরের নির্দেশনা আসার পর থেকে মাসিক বেতন নেওয়া যাবে।’

(স্টাফ রিপোর্টার, ঘাটাইল ডট কম)/-

বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে টাঙ্গাইল বিএনপির আলোচনা সভা

৭ নভেম্বর ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি টাঙ্গাইল জেলা শাখার উদ্যোগে এক আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শনিবার (৭ নভেম্বর) দুপুরে কেন্দ্রীয় কর্মসূচীর অংশ হিসেবে শহরের রেজিস্ট্রিপাড়া সিলমি কমিউনিটি সেন্টারে এক আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।

সভায় জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছাইদুল হক ছাদু’র সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফরহাদ ইকবাল, সহ-সভাপতি আতাউর রহমান জিন্না, শুকুর মাহমুদ, মাহমুদুল হক সানু, জিয়াউল হক শাহীন, যুগ্ম সম্পাদক আবুল কাশেম, খন্দকার রাশেদুল আলম রাশেদ, আনিছুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফ পাহেলী, শফিকুর রহমান খান শফি, প্রচার সম্পাদক মনিরুল হক মনির, শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহীন আকন্দ, কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাজাহান কবির, জেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সালেহ মোহাম্মদ সাফি ইথেন, সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম প্রমুখ।

এসময় বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতা কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালের এ দিনে ক্যান্টনমেন্টের বন্দিদশা থেকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেন সিপাহী-জনতা। সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে আধিপত্যবাদ, একনায়কতন্ত্র, একদলীয় শাসন, জনজীবনের বিশৃঙ্খলাসহ তখনকার বিরাজমান নৈরাজ্যের অবসান ঘটে। একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ থেকে দেশ একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশে ফিরে আসে। জাতীয় ইতিহাসের এ দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করে থাকে বিএনপি।

(মোল্লা তোফাজ্জল, ঘাটাইল ডট কম)/-