করোনা দূর্যোগে পুলিশের ভূমিকা এবং প্রাপ্তি; প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে অলোচিত একটি বিষয় কোভিড-১৯ বা নোভেল করোনা ভাইরাস। মহামারি এই করোনা শব্দটি এখন মূর্তিমান এক আতঙ্কের নাম। অতিমাত্রায় ছোঁয়াচে এই নোভেল করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি সূদূর চীন দেশের উহানে হলেও ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন মহাদেশকে কাবু করে এখন আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি সোনার বাংলাদেশে তার করাল থাবা বসিয়েছে।

১৫ মে পর্যন্ত বাংলাদেশে ২০ হাজারের বেশি ব্যক্তি করোনা পজিটিভ সনাক্ত হয়েছে। মারা গিয়েছেন ২৯৮ জন। আর করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদেরকে সামনের সাড়িতে অবস্থান নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন, দেশের সম্মানিত চিকিৎসকবৃন্দ এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা।

হাসপাতালের বাইরে বিদেশ ফেরতদের খুঁজে বের করে হোম কোয়ারেন্টিন করা, ঢাকা-নারায়নগঞ্জ এবং গাজীপুরে সনাক্তকৃত করোনা রোগীদের কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন ও চিকিৎসায় সহায়তা করা, কোন কোন ক্ষেত্রে আত্মীয়-স্বজন কর্তৃক ফেলে যাওয়া রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এবং অলিখিতভাবে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তির জানাজার ব্যবস্থা করাতো এখন পুলিশেরই দায়িত্ব হয়ে গিয়েছে।

করোনা মোকাবেলায় সামনের সাঁড়িতে থেকে স্বাভাবিক পুলিশিং এর পাশাপাশি এসব কাজ করে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০০ (দুই) হাজার পুলিশ সদস্য কোভিড-১৯ এ সংক্রমিত হয়েছেন। শাহাদত বরণও করেছেন বেশ কয়েকজন। (মহান আল্লাহতায়ালা তাদের জান্নাতবাসি করুন)।

নোভেল করোন ভাইরাসের প্রাদূর্ভাবের শুরু থেকেই সাবেক এবং বর্তমান আইজিপি স্যারের নির্দেশনায় মাঠপর্যায়ে কর্মরত সকল পুলিশ সদস্য, বাংলাদেশের মানুষের সকল ধরণের সেবা দেওয়ার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা করোনাকালীন সময়ে পুলিশের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। যা পুলিশের মনোবলকে বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেভাবে তাঁর বিচক্ষণতা দিয়ে এই করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাতে ইনশাআল্লাহ জয় আমাদের হবেই।

বেশীরভাগ পুলিশ সদস্যই তাদের পরিবার থেকে দুরে অবস্থান করেন। প্রায় দুই মাস ধরে সকল ধরনের ছুটি বন্ধ। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবেলায় পুলিশ সদস্যদের একেবারে সামনের সাঁড়িতে থেকে কাজ করতে হচ্ছে।

মজার ব্যাপার হলো, ছুটিবিহীন এতো কাজ, প্রতিদিন এতো সহকর্মী কোভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন জেনেও, এখন পর্যন্ত কোন পুলিশ সদস্যেকে আমি কোনরূপ বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখি নাই। কেন জানি সকল সদস্যই পুলিশের স্বাভাবিক কাজের পাশাপাশি এই আনইউজুয়াল কাজটিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে অতি আনন্দের সাথে করে যাচ্ছে।
ঠিক যেমনিভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এঁর ডাকে সাঁড়া দিয়ে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরেই ঝাপিয়ে পড়ে, প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তুলেছিল ঐ পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে।

বর্তমান এই করোনা মহামারীর সময় মানুষও যেন সবকিছুতেই আমাদের কাছে ছুটে আসছেন, এমনকি পুলিশের এখতিয়ারে নয় এমন বিষয়েও। আমাদের সীমাবদ্ধতার কথা জানালে তারা জবাব দেন, ঐ অফিসতো খোলা নেই, তারা কি করবেন? প্রতিবেশি কারও সর্দি-কাঁশির সংবাদ পেলেও নিজে একবার দেখতে না গিয়ে আমাদের সংবাদ দেন। সর্দি-কাশির রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে, গ্রামের কোন ভ্যান/ অটোরিক্সাই হাসপাতালে নিতে রাজি হচ্ছেনা, তখনও আস্থা পুলিশেই। যার পাশে যখন কেউ নেই তখন তার পাশে পুলিশ অবশ্যই আছে।

এখন যেন মানুষের শেষ এবং শতভাগ আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। এটা কিভাবে সম্ভব হল?

করোনা ভাইরাসের প্রাদূর্ভাবেতো আর নতুন করে আলাদা পুলিশ নিয়োগ দেয়া হয় নাই। সেই আগের পুলিশইতো এখন কাজ করছে। আমি মনে করি এটা সম্ভব হয়েছে আমাদের সকলের মানসিকতার পরিবর্তনের মাধ্যমে। আর সে পরিবর্তন হয়েছে সেবাদাতা এবং সেবা গ্রহীতা উভয়েরই মানসিকতার পরিবর্তনের মাধ্যমে।

আমরা পুলিশ সদস্যরা আইন-শৃংখলা রক্ষার স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কোভিড-১৯ মোকাবেলায় অতিরিক্ত যে কাজগুলো করছি, তা নিয়ে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে কোন ধরণের অশ্বস্তি নেই বা জোর করেও কারও উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। যেমন কোন করোনা রোগী হ্যান্ডেলিং বা করোনায় মৃতব্যক্তির দাফনের কাজে কোন পুলিশকে জোর করে পাঠাতে হয়না, বরং চাহিদার চেয়ে জনবল সবসময় বেশীই পাওয়া যায়।

মহান সৃষ্টিকর্তাই বাংলাদেশ পুলিশের প্রতিটি সদস্যের মধ্যে এই শক্তি নিজের হাতে প্রদান করেছেন, না হলে প্রাদূর্ভাবের শুরুর দিকে অপ্রতুল নিরাপত্তা কিটস্ এবং করোনা রোগী হ্যান্ডেলিং এর কোনরূপ প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই, আমরা কোন ওজর আপত্তি ব্যতিরেকেই ঝাপিয়ে পড়েছি এই করোনা যুদ্ধে। আমার মনে হয় বাংলাদেশ পুলিশের কোন সদস্যের মনেই একবারের জন্যও মনে হয় নাই, এটা নাই-সেটা নাই, আমি কেন কাজে যাব, কিংবা এটা-ওটা না দেয়া হলে আমরা কাজে যাব কেন?

আমরা বাংলাদেশ পুলিশের প্রতিটি সদস্য মনে করি শুধু করোনা সংক্রমণ কেন, জাতির যেকোন দূর্যোগে বা প্রয়োজনে কোনরূপ শর্ত ছাড়াই মানুষের পাশে থাকব। আর এটাই স্বাভাবিক। আমারতো এটাই কাজ, আমি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি, আর আমার প্রধান এবং একমাত্র কাজ হলো, প্রজাতন্ত্রের মানুষকে সেবা দেয়া এবং সেটা অবশ্যই কোনরূপ শর্ত ব্যতিরেকে।

আমি লোক প্রশাসনের ছাত্র। লোকপ্রশানে খুব সহজভাবেই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীকে সঙ্গায়িত করা হয়েছে যে-“A proud public servant is defined as someone who works honorably, conscientiously, and with dedication.”

আমরা বোধহয় বলতেই পারি, বাংলাদেশ পুলিশ এই করোনা সংক্রমণের সময় নিজেদের কাজের দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর উল্লিখিত সঙ্গাকে পরিপূর্ণতা দিতে পেরেছে।

এবার আসি নিজের কথায়। আমি কোভিড-১৯ পজিটিভ। বর্তমানে থানা কোয়ার্টারে আমি রুম আইসোলেশানে থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করছি। গত ৫ মে ২০২০ তারিখে অতি সামান্য উপসর্গ অনুভব করায় একজন সহকর্মীসহ কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য নমুনা প্রদান করি।
৭ মে ২০২০ সকালে টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জনাব আলীম আল রাজী মহোদয় যখন ফোনে আমাকে জানালেন, আমার করোনা পরীক্ষার ফলাফল পজিটিভ, তখন মানসিকভাবে বিরাট একটি ধাক্কা খেলেও ভেঙ্গে পরিনি একবারের জন্যও। মনোবলও কমেনি সামান্যতম পরিমাণ।

তাৎক্ষনিকভাবে মাননীয় পুলিশ সুপার জনাব সঞ্জিত কুমার রায়, বিপিএম স্যারসহ জেলার সকল উর্ধতন কর্মকর্তা এবং সকল সহকর্মীরা যেভাবে পাশে এসে দাড়িয়েছেন, তাতে আরো বড়ো কোন অসুখেও প্রাথমিক ধাক্কা খুব সহজেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

প্রথম ২/৩ ঘন্টা একটু ঘোরের মধ্যে কাটলেও, আমার অসুস্থতার কথা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গোপালপুর তথা টাঙ্গাইল এবং আমার নিজ এলাকার মানুষসহ পুলিশ বিভাগের সকল সহকর্মী, গোপালপুরের UHFPO মহোদয়সহ অন্যান্য বিভাগের সহকর্মীবৃন্দ, টাঙ্গাইলের সকল সংবাদকর্মী, পরিচিত বন্ধু-বান্ধব, সিনিয়র-জুনিয়র এবং আত্মীয়-স্বজন আমার প্রতি ভালোবাসার যে বহিঃপ্রকাশ দেখিয়েছেন, তা আমাকে সুস্থ হওয়ার টনিক দিচ্ছে।

শ্রদ্ধেয় পুলিশ সুপার, টাঙ্গাইল স্যার যেভাবে বাসায় প্রয়োজনীয় মেডিকেল ইকুইম্পমেন্ট এবং ঔষধের সাপোর্ট দিয়েছেন, তা আমার জন্য এক বিরাট প্রাপ্তি। একবারের জন্যও মনে হয়নি, স্বাস্থ্যগত কোন জটিলতা দেখা দিলে আমার চিকিৎসার কোন ঘাটতি থাকবে।
যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতি যদি মনোবল যোগান, তাহলে একজন সৈনিকের জন্য যুদ্ধ করাটা অনেক সহজ হয়ে যায়।

থানা কম্পাউন্ডে আমাদের অভিভাবক, গোপালপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জনাব মোঃ আমির খসরু স্যার, লকডাউনে থাকা একটি পরিবারের মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্য যা প্রয়োজন তার থেকে অনেক বেশীই করেছেন।

করোনাক্রান্ত হওয়ার পরও থানার সকল সহকর্মীদের নিকট থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি, তার ঋণ আমি কোনদিনই শোধ করতে পারব না।

একইসাথে বাংলাদেশ পুলিশের আইকন, ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি জনাব মোঃ হাবিবুর রহমান বিপিএম (বার) পিপিএম (বার) স্যারও ফোন করে স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিয়েছেন। যা আমার মনোবলকে আরও চাঙ্গা করে তুলেছে।

আমার কোভিড-১৯ পরীক্ষার ফলাফল পজিটিভ আসার প্রথম দিন থেকেই যে মানুষটি প্রতিদিন অন্তত একবার আমার খোঁজ নেন তিনি হলেন, করোনা প্রাদূর্ভাবের প্রথম থেকেই সবসময় গোপালপুর-ভূঞাপুরের গণমানুষের পাশে থাকা মানুষ, টাঙ্গাইল-২ আসনের মাননীয় জাতীয় সংসদ সদস্য জনাব ছোট মনির।

শেষ বার গত পরশু (১৪ মে) বিকেলে তিনি থানায় এসেছিলেন, নিজ চোখে আমাকে একবার দেখার জন্য। বারান্দায় দাড়িয়ে হাত নাড়িয়ে তার এই নিখাঁদ ভালোবাসা গ্রহণ করাটাও আমার জন্য অনেক বড় একটি পাওয়া।

আসলে এতসব ভালো মানুষের দোয়া এবং ভালোবাসা পেলে যেকোন কঠিনতম পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যায় খুব সহজেই।

একজন করোনা পজিটিভ রোগিকে বাসায় একটি রুমে আইসোলেশনে রেখে তার মহামূল্যবান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সকল ধরণের সেবাযত্ন করতে যে মানুষটি সবচেয়ে বেশী কষ্ট করে যাচ্ছেন, তিনি আমার প্রিয়তমা সহধর্মিনী। আমার জন্য স্বাভাবিক সেবার পাশাপাশি ঘরোয়া টোটকা চিকিৎসার যাবতীয় ব্যবস্থা তিনি নিজ হাতেই করছেন, আমার কাছ থেকে শেখা সামান্য নিরাপত্তা জ্ঞান নিয়ে। একই সাথে তাকে আরও সামলাতে হচ্ছে আমার ছোট দুটি সন্তানকেও। আল্লাহর কাছে দোয়া করি সে যেন সারাজীবন সুস্থ থাকে, এভাবেই আমাদের আগলে রাখার জন্য।

গত ১৪ মে ২০২০ তারিখ বিকালের একটি ঘটনা দিয়ে লেখাটা শেষ করব। বিকালে সহকর্মী এসআই সোহাগ আমাকে ফোনে জানান, এক বয়স্ক ভদ্র মহিলা আমার সাথে দেখা করতে এসেছেন এবং তিনি তার বাড়ির কিছু জিনিস আমার জন্য নিয়ে এসেছেন। সোহাগ বিভিন্নভাবে বুঝিয়েও যখন ভদ্র মহিলাকে বোঝাতে সক্ষম হয়নি, তখন আমাকে ফোন দিয়ে বিষয়টি অবগত করেন। ভদ্র মহিলা দূর থেকে হলেও আমাকে একবার দেখবেন, তারপর চলে যাবেন। বাধ্য হয়েই বাসার বারান্দার দাড়িয়ে তাকে দেখা দিতে হলো এবং তার আনা জিনিসপত্রগুলোও গ্রহণ করতে হল।

বেশ কিছুদিন আগের ঘটনা, ভদ্র মহিলার স্বামী তার সাথে থাকেন না এবং তার ছেলে তার কথা শুনেন না। এরুপ অভিযোগের ভিত্তিতে একদিন তার ছেলেকে ডেকে আমি একটু বুঝিয়ে ছিলাম এবং তারপর থেকে তার ছেলে ভদ্র মহিলার কথা শোনেন। উপকার বলতে এটুকুই।

লোকমুখে আমার অসুস্থতার কথা শুনেই আমাকে একবার দেখার জন্য থানায় ছুটে এসেছেন। কিন্ত এতটুকু কাজেই ভদ্র মহিলা যে আমাকে এভাবে মনে রাখবেন, তা আমার কল্পনাতেও আসেনি কোনদিন। তবে এটাই প্রাপ্তি এবং এটা করতে পেরেছি শুধুমাত্র পুলিশে চাকুরী করার জন্য।

আজ সত্যিই আমি গর্বিত বাংলাদেশের মানুষের সর্বোচ্চ অস্থার জায়গায় থাকা বাংলাদেশ পুলিশের একজন সদস্য হতে পেরে।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী, স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে বাংলদেশ পুলিশের স্লোগান হল “মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার, পুলিশ হবে জনতার”।

আমি মনে করি, এই স্লোগানের মর্মার্থ অনুধাবন করে বাংলাদেশ পুলিশ ইতোমধ্যে জনতার পুলিশ হতে সক্ষম হয়েছে। আলো একদিন আসবেই, অবশ্যই আমাদের দেশ করোনা মুক্ত হবে এবং আমরা আমাদের কাজের এই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে, জনতার পুলিশ হয়েই আপনাদের পাশে থাকতে চাই।

আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, সবার দোয়ার বদৌলতে যেন এ যাত্রায় সুস্থ হয়ে, আবার মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে পারি।

সবশেষে আপনাদের কাছে বিনীত অনুরোধ, নিতান্ত জরুরী প্রয়োজন ছাড়া ঘরে থাকুন, নিজেকে এবং আপনার পরিবারকে সুরক্ষিত রাখুন। পুলিশ সদস্যরা বাহিরে আছেন, আপনাদের নিরাপত্তার জন্য।

লেখক: মো. মুস্তাফিজুর রহমান, অফিসার ইনচার্জ (ওসি), গোপালপুর থানা, টাঙ্গাইল।

ঘাটাইলে পিপিই পড়ে ৮৫ কেজি মাংস নিয়ে চম্পট কথিত সেনা অফিসার!

টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে ৮৫ কেজি গরুর গোশত নিয়ে কৌশলে চম্পট দিয়েছেন কথিত এক সেনা অফিসার। কসাই মুক্তার আলী গোশতের দাম না পেয়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আজ শনিবার (১৬ মে) সকালে ঘাটাইল উপজেলার হামিদপুর বাজারে এ ঘটনা ঘটে।

মুক্তার আলীর বাড়ি ঘাটাইলের দিগর ইউনিয়নের কাশতলা গ্রামে।

কসাই মুক্তার আলী জানান, শনিবার সকালে মোটরসাইকেল নিয়ে সবুজ রঙের পিপিই পরা এক ব্যক্তি কসাইখানায় এসে নিজেকে বঙ্গবন্ধু সেতু সংলগ্ন ক্যান্টনমেন্টের একজন সেনা অফিসার হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি জানান অসহায় মানুষকে ত্রাণ দেয়ার জন্য তাদের ক্যান্টনমেন্টে সেনাপ্রধান আসবেন। এ জন্য গরুর গোশত লাগবে। এই বলে দুটি বস্তায় ৮৫ কেজি গোশত ভরে তার মোটরসাইকেলের সঙ্গে বাঁধেন।

ফাঁকে ফাঁকে তিনি রাস্তায় গিয়ে যারা মুখে মাস্ক লাগাননি তাদের জিআই তার দিয়ে পিটিয়ে আতঙ্ক তৈরি করেন। এরপর সাদা কাগজে ভাউচার লেখিয়ে বলেন, চাপাতিসহ আমার সঙ্গে একজন লোক দেন। তিনি ক্যান্টনমেন্ট পর্যন্ত গিয়ে গোশত কেটে দিয়ে টাকা নিয়ে চলে আসবেন।

তখন কসাইখানা থেকে আনোয়ার হোসেন নামে একজনকে ওই ব্যক্তির মোটরসাইকেলে পাঠানো হয়। ওই সেনা অফিসার পরিচয় দেয়া ব্যক্তি কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ডের কাছে পৌঁছে আনোয়ারকে মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে দিয়ে বলেন, তুমি দাঁড়াও আমি মোটরসাইকেলে তেল তুলে নিয়ে আসি। এই বলে ওই কথিত সেনা অফিসার গোশতের মূল্য পরিশোধ না করেই উধাও হয়ে যান।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার অজ্ঞন কুমার সরকার ঘাটাইল ডট কমকে বলেন,পুলিশকে বলেছি তদন্ত করে প্রতারক চক্রকে আইনের আওতায় আনা হবে।

(রাজু, ঘাটাইল ডট কম)/-

সখীপুরে প্রবাসীর স্ত্রীর আত্মহত্যা

টাঙ্গাইলের সখীপুরে পারিবারিক কলহের জের ধরে ফাঁসি দিয়ে হাসনা বেগম (২৫) নামের এক প্রবাসীর স্ত্রী আত্মহত্যা করেছে। শুক্রবার রাতে  উপজেলার কালিদাস বল্লাচালা গ্রামে স্বামীর বাড়িতে বসবাসের ঘরের ধরনার সাথে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে।

নিহত হাসনা বেগম ওই গ্রামের ইরাক প্রবাসী ফারুক হোসেনের স্ত্রী। এ ঘটনায় সখীপুর থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে।

জানা যায়, শুক্রবার রাতে স্বামী ফারুকের সঙ্গে মুঠোফোনে তার কথা কাটাকাটি হয়। শনিবার সকালে ডাকাডাকির একপর্যায়ে ঘুম থেকে না ওঠায় পরিবারের লোকজন ঘরের দরজা ভেঙে ধরনার সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় তাকে দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন।

পরে  সখীপুর থানা-পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য টাঙ্গাইল মর্গে পাঠায়।

সখীপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) জাহিদুল ইসলাম বলেন, পারিবারিক কলহের কারণে হাসনা বেগমের আত্মহত্যার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

(সখীপুর সংবাদদাতা, ঘাটাইল ডট কম)/-

ঘাটাইলে লটারির মাধ্যমে বোরেধান সংগ্রহের কৃষক নির্বাচন

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলায় চলতি মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বোরো ধান সংগ্রহের জন্য লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করা হয়েছে। আজ (১৬ মে) শনিবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অঞ্জন কুমার সরকার তার নিজ কার্যালয়ে লটারির মধ্যমে কৃষক নির্বচনের নির্বাচনের কাজ সম্পন্ন করেন।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায় ,চলতি মৌসুমে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যে ঘাটাইলের ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ৩৪টি ব্লকের মোট চার হাজার ২০০ জন কৃষকের তালিকা থেকে লটারির মাধ্যমে এক হাজার ৮ শত ২০ জন কৃষক নির্বাচন করা হয়।

উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ( খাদ্য পরিদর্শক) মুহাম্মদ খোরশেদ আলম মাসুদ বলেন, বলেন, কৃষকদের কাছ থেকে ২ হাজার ৬৮৪ মেট্রিক টন আমন ধান সংগ্রহ করা হবে। আগামীকাল রোববার বোরধান সংগ্রহের কার্যক্রম উদ্বোধন করা হবে।

এক কৃষক সর্বোচ্চ ৩ মেট্রিক টন এবং সর্বনিম্ন ১ মেট্রিক টন ধান দিতে পারবে।

লটারির কার্যক্রম পরিচালনার সময় উপস্থিত ছিলেন, সহকারি কমিশনার (ভুমি) মোছা: ফারজানা ইয়াসমিন, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সাইফুল আবেদীন, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক শাকির হোসেন খান, উপজেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্র্তা মো. মনিরুজ্জামান ঘাটাইল প্রেসক্লাবের সভাপতি নজরুল ইসলাম প্রমুখ।

(মাসুম মিয়া, ঘাটাইল ডট কম)/-

ফারাক্কা লং মার্চ, মিছিল নয় একটি আন্দোলন

সৃষ্টিকর্তার যে ক’টি অমূল্য নিয়ামত আমরা প্রায় বিনামূল্যে ভোগ করে থাকি- পানি তন্মদ্ধে অন্যতম। পানি প্রকৃতির অনন্য এক আধার। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই মানুষ বাধাহীন পানির অধিকার ভোগ করে আসছে। আবার এই পানি নিয়ে যুদ্ধও হয়েছে ঢের। তাই অনেকেই বলে থাকেন আজকে বিশ্বব্যাপী তেল নিয়ে যে যুদ্ধ চলছে অদূর ভবিষ্যতে তা পানিতে গিয়ে ঠেকবে। আর তা অবশ্যই হবে মিঠা পানি নিয়ে।

কাজেই পানি নিয়ে ইনসাফ আজ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত বটে। এই ইনসাফকে যারা অস্বীকার করে তারা মানবতার শত্রু। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার পথে অন্তরায়। মানবতার শত্রু, তা সে যত শক্তিশালীই হোক না কেন তার পতনের নজির ইতিহাসে ভুরি ভুরি।

মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ১৯৭৬ সালের ১৬ মে ফারাক্কা আন্দোলনের ডাক দিয়ে বিশ্বজনমতের কাছে মানবতার এক অনন্য গীতিকাব্য রচনা করে গিয়েছিলেন। ভাসানীর এই ডাক কেবল ফারাক্কার ন্যায্য হিস্যা আদায়ের ডাকই নয়। এই ডাক জুলুমের বিরুদ্ধে মজলুমের টিকে থাকার ডাক। স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে জাতিকে এক হবার ডাক। জাতিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার ডাক। মাথা নত না করার ডাক। অধিকার আদায়ে বিশ্বজনমত গঠনের ডাক।

ভাসানীই প্রথম ফারাক্কা আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের দেশকে মরুকরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার করেছিলেন।

ফারাক্কার রাজনৈতিক গুরুত্বকে ভবিষ্যত স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ বলে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। আমরা এখন ক্রমশই মরুকরণের পার্শ্বিকতা টের পেতে শুরু করেছি। আগুনের আঁচ টের না পেলে বাঙালি নাকি তেঁতে ওঠে না। বাঙালি এখন তার আঁচ পেতে শুরু করেছে। শুধু জেগে ওঠা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

পানির দাবীকে যারা ভারত বিরোধীতা কিংবা ভারত প্রীতির দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে নাকে তেল দিয়ে ঘুমানোর কথা ভাবছেন। তাদেরও ঘুম একদিন হারাম হয়ে যেতে পারে মিঠা পানির অভাবে অথবা লবনাক্ত পানির দাপটে। এরই মধ্যে আমরা টের পেতে শুরু করেছি একদিকে অকাল বন্যা অন্যদিকে পানির জন্য হাহাকারে। তাই আমাদের এই বাঁচা মরার সমস্যাকে কেবলমাত্র রাজনৈতিক সমস্যা বলেও পাশ কাটিয়ে যাবার পথ নেই। কারণ আমরা যাদেরকে আমাদের রাজনৈতিক প্রতিভু বানিয়ে তুষ্ট মনে দায়িত্বের শেষ ভাবছি, তাদের বেশিরভাগই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিকল্প আবাসন গড়ে তুলেছে। তাই এই সমস্যা নিরসনে এদেশের কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ জনতাকেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আমরা যারা ভাবছি এ দায়িত্ব আমাদের নয়, তারাই এদেশের নব্বই ভাগ মানুষ। তাই দায়িত্বটা আমাদেরকেই নিতে হবে।

পৃথিবীর কোন পরাশক্তিই অন্য জাতির ন্যায্য দাবী অগ্রাহ্য করে টিকে থাকতে পারেনি। সে যত ক্ষমতাশালীই হোক না কেন। বিশেষ করে ভারতের অভ্যন্তরেই যখন ফারাক্কা বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে কথা উঠেছে। প্রতিবাদ হচ্ছে। জনমত গঠন হচ্ছে। মনে রাখতে হবে এ লড়াই কোন দেশ বা জাতির বিরুদ্ধে নয়। এ লড়াই মানুষ এবং প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণের বিরুদ্ধে প্রকৃতিবাদীদের লড়াই। ভারতের নিপীড়িত জনতা আমাদের পাশে থাকবে বলে আমার বিশ্বাস। দু’ভাবেই আমরা এ ব্যাপারে সোচ্চার হতে পারি। এক. কুটনৌতিক আলোচনা, দুই. আন্তর্জাতিক জনমত।

সবিশেষ ফারাক্কা লংমার্চকে যারা কেবলই একটি দিবস বা মিছিল বলে চালিয়ে দিতে চান, তারা এখনও বুঝে উঠতে পারেননি এর অন্তর্নিহিত সক্ষমতা। তা না হলে আজও বাংলার আপামর জনতা ধারণ করতো না ফারাক্কার চেতনা। ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার মালিকরা আজ বুঝতে পারছে স্বাধীনতা কেবল ভৌগলিক অখন্ডতার আকাঙ্খা নয়। অধিকার নিয়ে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার নামই স্বাধীনতা।

পৃথিবীর মানচিত্রে আমরা এমন একটা জাতি যারা কোনদিন কারও শান্তি বিনষ্ট করিনি। কারও ভুখন্ডে শোষণ জুলুমের চেষ্টা করিনি। তাই অন্য কোন রাষ্ট্র, সে যত শক্তিশালীই হোক না কেন বাঙালিকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। পারবেও না ইনশাআল্লাহ। সময়ের প্রয়োজনে ফারাক্কা আন্দোলনের চেতনার ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত হবে। আর সে দিন বেশী দুরে নয় যেদিন একটি হাত বল্লমের মতো ঝলসে উঠে বলবে- খামোশ।

লেখক: আজাদ খান ভাসানী, সভাপতি, মওলানা ভাসানী কৃষক সমিতি ও সাধারণ সম্পাদক, ভাসানী পরিষদ, মাভাবিপ্রবি, সন্তোষ, টাঙ্গাইল

‘সম্পদ বৃদ্ধিতে জাকাত যাকে, যেভাবে, যখন দেবেন’

জাকাত ইসলামী সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান। জাকাত একদিকে দরিদ্র, অভাবী ও অক্ষম জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। জাকাত ইসলামী শরিয়তের অন্যতম স্তম্ভ। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হলো জাকাত।

জাকাত আরবি শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে পবিত্রতা, ক্রমবৃদ্ধি, আধিক্য ইত্যাদি। পারিভাষিক অর্থে জাকাত হলো, ধনীদের ধন-মাল থেকে আল্লাহর নির্ধারিত হারে উপযুক্ত ব্যক্তিকে দান করা। এর আভিধানিক অর্থ কোনো বস্তুকে পরিশুদ্ধকরণ, প্রবৃদ্ধিকরণ, পবিত্রতা, সুসংবদ্ধকরণ ইত্যাদি। আর জাকাতের শাব্দিক অর্থ পরিচ্ছন্নতা বা পবিত্রতা, ক্রমবৃদ্ধি, আধিক্য ইত্যাদি। কোরআনে শব্দটি আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

মহান আল্লাহ সম্পদশালীদের সম্পদ থেকে জাকাত সংগ্রহ করে নির্ধারিত আটটি খাতে ব্যয় বণ্টন করার জন্য ইসলামী রাষ্ট্রের সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন।

জাকাত একদিকে জাকাতদাতার মন ও আত্মাকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে, তার ধন-সম্পদকেও পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র করে দেয়; অন্যদিকে দরিদ্রদের অভাব পূরণে সহায়তা করে এবং সম্পদে ক্রমবৃদ্ধি বয়ে আনে।

জাকাত বলতে ধন-সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ দান করাকে বোঝায়। পারিভাষিক অর্থে জাকাত হলো, সাহেবে নিসাবের ধন-মাল, জমির ফসল ও খনিজ সম্পদের ওপর ইসলামী শরিয়াহ নির্ধারিত অংশ নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করা। আল্লাহ তাআলা জাকাত ব্যয়ের খাতগুলো সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন।

সূরা রুমের ৩৯ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “হে মানুষ! ধনসম্পত্তি বৃদ্ধির জন্যে তোমরা যে সুদী বিনিয়োগ করো, আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায় না। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের জন্যে শুদ্ধচিত্তে যা দান করো, তা-ই বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।”

ইসলামে জাকাতের গুরুত্ব

মহান আল্লাহ বলেন, ‘…সম্পদ যেন শুধু তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।’ (সুরা : হাশর,  আয়াত : ৭)

অন্য আয়াতে এসেছে, ‘আমার রহমত সব কিছু পরিব্যাপ্ত করে নিয়েছে। শিগগির আমি তা লিখে দেব সেই লোকদের জন্য যারা তাকওয়া অবলম্বন করে ও জাকাত দেয় এবং যারা আমার আয়াতগুলোর প্রতি ঈমান রাখে।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৫৬)

কোনো সংগঠনকে দেওয়ার দ্বারা জাকাত আদায়ের শর্ত পূরণ হয় না, তাই জাকাত আদায় হবে না। (আদ দুররুল মুখতার: ২/৩৪৪, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/১৮৮)

নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হলে ভাই-বোন, চাচা, মামা, ফুফু, খালা ও তাদের সন্তানদেরকে জাকাতের টাকা দিতে পারবে। (ফাতহুল কাদির: ২/২০৯, রদ্দুল মুহতার: ২/৩৪২)

মেয়ের জামাই ও ভগ্নিপতিকে জাকাত দেওয়া যাবে, যদি সে জাকাতের উপযুক্ত হয়। (রদ্দুল মুহতার ২/৩৪৬)

জাকাতের টাকা দিয়ে ক্রয়কৃত জিনিষ পরবর্তিতে নিজে নিসাবের মালিক হয়ে যাওয়ার পরও নিজে ব্যবহার করতে পারবে। (ফাতহুল কাদির: ২/২০৫)

জাকাতের টাকার মালিক বানিয়ে দেওয়া জাকাত আদায়ের শর্ত। তাই মালিক না বানিয়ে দাওয়াত খাওয়ানোর দ্বারা জাকাত আদায় হবে না। (রদ্দুল মুহতার: ২/২৫৭)

দোকান, কারখানা বা বাড়ির কর্মচারী যদি গরিব ও জাকাত নেওয়ার উপযুক্ত হয় তাহলে তাদের নিঃস্বার্থ জাকাত দেওয়া জায়েয হবে, অন্যথায় জায়েয হবে না। তবে তাদের জাকাত দেওয়ার কারণে তাদের প্রাপ্য নিয়মিত পারিশ্রমিকের মধ্যে কোনো ব্যাঘাত যেন সৃষ্টি না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ জাকাত দ্বারা কারো হক আদায় করা যায় না। বেতন যেহেতু চাকরিজীবীর প্রাপ্য হক, তাই জাকাত দ্বারা বেতনের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হবে না। (মুলতাকাল আবহুর: ১/২৮৪, ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম: ৬/২৪৫)

হাদিস শরিফে এসেছে, ‘আল্লাহ যাকে ধন দিয়েছেন, সে যদি জাকাত আদায় না করে তাহলে কিয়ামতের দিন তা একটি বিষধর অজগরের রূপ ধারণ করবে, যার দুই চোখের ওপর দুটি কালো চিহ্ন থাকবে। ওই সাপ বলতে থাকবে, আমিই তোমার ধন-মাল, আমিই তোমার সঞ্চয়।’ (বুখারি)

জাকাত ইসলামের মৌলিক ফরজ। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে তৃতীয় স্তম্ভ হচ্ছে জাকাত। ঈমানের পর নামাজ এবং তার পরই জাকাতের স্থান। পবিত্র কোরআনের ৩২ জায়গায় জাকাতের কথা বলা হয়েছে। তার মধ্যে ২৮ জায়গায় নামাজ ও জাকাতের উল্লেখ একত্রে করা হয়েছে।

ইসলামের প্রথম খলিফা আবুবকর সিদ্দিক (রা.) জাকাত না দেওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন।

জাকাত কারা দেবেন

ইসলামী আইনবিদরা এ ব্যাপারে একমত যে জাকাত শুধু স্বাধীন, পূর্ণবয়স্ক মুসলিম নর অথবা নারী, যার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ আছে, তার ওপর নিম্ন শর্ত সাপেক্ষে জাকাত ধার্য হবে।

শর্তগুলো হলো—

১. সম্পদের ওপর পূর্ণাঙ্গ মালিকানা। সম্পদের ওপর জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সম্পদের মালিকানা সুনির্দিষ্ট হওয়া জরুরি ।

২. সম্পদ উৎপাদনক্ষম হওয়া। জাকাতের জন্য সম্পদকে অবশ্যই উৎপাদনক্ষম, বর্ধনশীল বা প্রবৃদ্ধমান হতে হবে।

৩. নিসাব। জাকাত ধার্য হওয়ার তৃতীয় শর্ত হচ্ছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা। নিসাব বলা হয় শরিয়ত নির্ধারিত নিম্নতম সীমা বা পরিমাণকে। সাধারণভাবে ৫২.৫০ তোলা রুপা বা ৭.৫০ তোলা সোনা বা এর সমমূল্যের সম্পদকে নিসাব বলা হয়। কারো কাছে ৭.৫০ তোলা সোনা বা ৫২.৫০ তোলা রুপা থাকলে বা উভয়টি মিলে ৫২.৫০ তোলা রুপার মূল্যের সমান অথবা সব সম্পদ মিলে ৫২.৫০ তোলা রুপার সমমূল্যের সম্পদ থাকলে  সে সম্পদের জাকাত দিতে হবে।

৪. মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ থাকা। সারা বছরের মৌল প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত সম্পদ থাকলেই শুধু জাকাত ফরজ হবে।

৫. ঋণমুক্ত হওয়া। জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য ঋণমুক্ত হওয়ার পর নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা জরুরি।

৬. সম্পদের ওপর এক বছর পূর্ণ হওয়া। কারো কাছে কমপক্ষে নিসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর থাকলেই শুধু সে সম্পদের ওপর জাকাত দিতে হবে।

জাকাত কাদের জন্য

পবিত্র কোরআনে আট শ্রেণির লোক জাকাত পাওয়ার যোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। (দেখুন—সুরা : তাওবা, আয়াত : ৬০)

► ফকির। ফকিরকে বাংলায় গরিব বলা হয়।

► মিসকিন। যাদের আর্থিক অবস্থা গরিবদের চেয়েও খারাপ, তারাই মিসকিন।

► আমেল। জাকাতের কাজে নিযুক্ত ব্যক্তি।

► মন জয় করার জন্য। ইসলামের বিরোধিতা বন্ধ করা বা ইসলামের সহায়তার জন্য কারো মন জয় করার প্রয়োজন হলে এবং নওমুসলিমদের সমস্যা দূর করার জন্য জাকাত তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করা হবে।

► গলদেশ মুক্ত করা। গলদেশ মুক্ত করা বলতে দাসত্ব শৃঙ্খলে আবদ্ধ লোক এবং বন্দিদের মুক্ত করাকে বোঝানো হয়েছে।

► ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধ। ঋণভারে জর্জরিত লোকেরা মানসিকভাবে সর্বদাই ক্লিষ্ট থাকে এবং কখনো কখনো জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়ে। তাদের জীবনীশক্তির ক্ষয় সাধিত হয়। অনেক সময় তারা অন্যায় ও অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। সুতরাং যথার্থ প্রয়োজনে ঋণগ্রস্ত লোকদের ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত করা ইসলামী সমাজের দায়িত্ব। এ জন্য আল্লাহ জাকাতের অর্থ ব্যয় করার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে সমাজকে সুস্থ রাখা যায়।

► আল্লাহর পথে ব্যয়। কোরআনের ভাষায় এ খাতের নাম বলা হয়েছে ‘ফি সাবিলিল্লাহ’, যার অর্থ হচ্ছে আল্লাহর পথে। আল্লাহর পথে কথাটি খুব ব্যাপক। মুসলমানদের সব নেক কাজ আল্লাহর পথেরই কাজ।

► পথিক-প্রবাসী। মুসাফির বা প্রবাসী লোকের বাড়িতে যত ধন-সম্পত্তিই থাকুক না কেন, পথে বা প্রবাসে সে যদি অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়ে তাহলে তাকে জাকাত তহবিল হতে প্রয়োজনীয় সাহায্য অবশ্যই দিতে হবে।

যেসব সম্পদে জাকাত নেই

যেসব সম্পদকে জাকাত থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে সেগুলোর একটি তালিকা নিম্নে দেওয়া হলো—

বসবাসের জমি, মিল, ফ্যাক্টরি, ওয়্যারহাউস, গুদাম, দোকান, বাড়িঘর, জায়গাজমি, এক বছরের কম বয়সের গবাদি পশু, ব্যবহারের যাবতীয় কাপড়চোপড়, বই-খাতা-কাগজ ও মুদ্রিত সামগ্রী, গৃহের যাবতীয় আসবাব, বাসনকোসন ও সরঞ্জামাদি, তৈলচিত্র, স্ট্যাম্প, অফিসের যাবতীয় আসবাব, যন্ত্রপাতি, ক্যালকুলেটর, কম্পিউটার ইত্যাদি সরঞ্জাম, গৃহপালিত সব ধরনের মুরগি ও পাখি, কলকবজা, যন্ত্রপাতি ও হাতিয়ার ইত্যাদি, চলাচলের জন্তু বা গাড়ি, যুদ্ধাস্ত্র ও সরঞ্জাম, ক্ষণস্থায়ী বা পচনশীল যাবতীয় কৃষিপণ্য, বপন করার জন্য সংরক্ষিত বীজ, জাকাত বছরের মধ্যে পেয়ে সে বছরের মধ্যেই ব্যয় করা হয়েছে এমন যাবতীয় সম্পদ, দাতব্য বা সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, যা জনগণের উপকার ও কল্যাণে নিয়োজিত, সরকারি মালিকানাভুক্ত নগদ অর্থ, সোনা-রুপা এবং অন্যান্য সম্পদ।

কোন কোন সম্পদের জাকাত দিতে হবে

১)   সোনা-রুপা। সোনা-রুপার মধ্যে পিণ্ড আকারে রক্ষিত সোনা-রুপা, সোনা-রুপার বাসন, অলংকার, এসবের বানানোর মূল্য হিসাব করে ৭.৫০ শতাংশ হিসাবে জাকাত দিতে হবে।

২)   নগদ অর্থ। হাতে ও ব্যাংকে রক্ষিত নগদ অর্থ ছাড়াও সঞ্চয়পত্র, সিকিউরিটি, শেয়ার সার্টিফিকেট ইত্যাদি নগদ অর্থ বলে গণ্য হবে।

৩)   ব্যবসার মালামাল। ব্যবসার মালামালের জাকাত নিরূপণকালে বছর শেষে হিসাব সমাপ্তি দিবসে যে সম্পদ থাকবে তা-ই সারা বছর ছিল ধরে নিয়ে তার ওপর জাকাত দিতে হবে।

৪)   কৃষি ফসল। কৃষি ফসলের ক্ষেত্রে প্রতিটি শ্রেণির ফসলের নিসাব পৃথক পৃথকভাবে হিসাব করে নিসাব পরিমাণ ফসল হলে উশর দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, ধান যদি ৩০ মণ বা তার বেশি হয়, পাট  যদি ৩০ মণ বা তার বেশি হয়, তাহলে ফসল তোলার সময়ই তার উশর দিতে হবে। তেমনিভাবে কলাই, সরিষা, মধু ইত্যাদি প্রতিটির নিসাব পৃথকভাবে ধরতে হবে।

৫)   খনিজ সম্পদ। খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে কোনো নিসাব নেই। খনিজ সম্পদ ব্যক্তিমালিকানায় থাকলে সম্পদ উত্তোলনের পরই হিসাব করে জাকাত দিতে হবে। খনিজ সম্পদের জাকাতের হার হচ্ছে ২০ শতাংশ।

৬)   গরু-মহিষ। নিজের কাজে খাটে এবং বিচরণশীল বা ‘সায়েমা’ নয় এমন গরু-মহিষ বাদ দিয়ে ৩০টি হলেই তার ওপর জাকাত দিতে হবে। যাকাতের হার হবে প্রতি ৩০টির জন্য একটি এক বছর বয়সের গরু এবং প্রতি ৪০টি বা তার অংশের জন্য দুই বছর বয়সের একটি গরু।

৭)   ছাগল-ভেড়া। ছাগল-ভেড়ার সংখ্যা ৪০টি হলে একটি, ১২০টি পর্যন্ত দুটি, ৩০০টি পর্যন্ত তিনটি এবং এর ওপরে প্রতি ১০০টি ও তার অংশের জন্য আরো একটি করে ছাগল জাকাত দিতে হবে।

জাকাত কখন দেবেন

জাকাত চান্দ্রবর্ষ অনুসারে দেওয়াই শ্রেয়। এর মধ্যে আবার রমজান মাস হচ্ছে উত্তম। অন্য মাসে কোনো পুণ্যের কাজ করলে যে সওয়াব পাওয়া যায়, রমজান মাসে সেই কাজ করলে আল্লাহ তার অনেক গুণ বেশি সওয়াব দিয়ে থাকেন। সে জন্য রমজান মাসে জাকাত দিলে অন্য মাসের তুলনায় অনেক বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়।

আমাদের দেশে এবং অন্যান্য মুসলিম দেশে ও অনেকেই রমজান মাসে জাকাত দিয়ে থাকেন। কিন্তু সারা বছর জাকাত দিলেও কোনো ক্ষতি নেই। মোট কথা, পরিকল্পিতভাবে জাকাত সংগ্রহ ও ব্যয় বণ্টনের ব্যবস্থা করতে পারলে যেকোনো দেশে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও দুস্থ মানবতার কল্যাণে বিরাট ভূমিকা পালন করা সম্ভব।

জাকাত হিসাব করার তরীকা ও মাসায়েল

১। যে অর্থ/সম্পদে যাকাত আসে সে অর্থ/সম্পদের ৪০ ভাগের ১ ভাগ যাকাত আদায় করা ফরয। মূল্যের আকারে নগদ টাকা দ্বারা বা তা দ্বারা কোনো আসবাবপত্র ক্রয় করে তা দ্বারাও যাকাত দেয়া যায়।

২। জাকাতের ক্ষেত্রে চন্দ্র মাসের হিসাবে বৎসর ধরা হবে। যখনই কেউ নেছাব পরিমান অর্থ/সম্পদের মালিক হবে তখন থেকেই যাকাতের বতসর শুরু ধরতে হবে।

৩। সোনা রূপার মধ্যে যদি ব্রঞ্জ, রাং, দস্তা, তামা ইত্যাদি কোনো কিছুর মিশ্রণ থাকে আর সে মিশ্রণ সোনা রুপার চেয়ে কম হয়, তাহলে পুরোটাকেই সোনা রুপা ধরে যাকাতের হিসাব করা হবে-মিশ্রিত দ্রব্যের কোনো ধর্তব্য হবে না। আর যদি মিশ্রিত দ্রব্য সোনা রুপার চেয়ে অধিক হয়, তাহলে সেটাকে আর সোনা রুপা ধরা হবে না। বরং ঐ মিশ্রিত দ্রব্যই ধরা হবে।

৪। জাকাত হিসাব করার সময় অর্থাৎ, ওয়াজিব হওয়ার সময় সোনা, রুপা, ব্যবসায়িক পণ্য ইত্যাদির মুল্য ধরতে হবে তখনকার (ওয়াজিব হওয়ার সময়কার) বাজার দর হিসাবে এবং সোনা রুপা ইত্যাদি যে স্থানে রয়েছে সে স্থানের দাম ধরতে হবে।

৫। শেয়ারের মূল্য ধরার ক্ষেত্রে মাসয়ালা হল-যারা কোম্পানীর লভ্যাংশ অর্জন করার উদ্দেশ্যে নয় বরং শেয়ার ক্রয় করেছেন শেয়ার বেচা-কেনা করে লাভবান হওয়া এর উদ্দেশ্য, তারা শেয়ারের বাজার দর ধরে যাকাত হিসাব করবেন। আর শেয়ার ক্রয় করার সময় যদি মূল উদ্দেশ্য থাকে কোম্পানী থেকে লভ্যাংশ অর্জন করা এবং সাথে সাথে এ উদ্দেশ্যও থাকে যে, শেয়ারের ভাল দর বাড়লে বিক্রিয় করে দিব, তাহলে যাকাত হিসাব করার সময় শেয়ারের বাজার দরের যে অংশ যাকাতযোগ্য অর্থ/সম্পদের বিপরীতে আছে তার উপর যাকাত আসবে, অবশিষ্ট অংশের উপর যাকাত আসবে না।

উদাহরন স্বরূপ শেয়ারের মার্কেট ভ্যালু (বাজার দর) ১০০ টাকা, তার মধ্যে ৬০ ভাগ কোম্পানীর বিল্ডিং, মেশিনারিজ ইত্যাদির বিপরীতে, আর ৪০ ভাগ কোম্পানীর নগদ অর্থ, কাঁচামাল ও তৈরী মালের বিপরীতে, তাহলে যাকাতের হিসাব করার সময় শেয়ারের বাজার দর অর্থাৎ, ১০০ টাকার ৬০ ভাগ বাদ যাবে। কেননা সেটা এমন অর্থ/সম্পদের বিপরীতে যার উপর যাকাত আসে না । অবশিষ্ট ৪০ ভাগের উপর যাকাত আসবে।

৬। জাকাতদাতার যে পরিমান ঋণ আছে সে পরিমাণ অর্থ বাদ দিয়ে বাকিটার যাকাত হিসাব করবে। ঋণ পরিমাণ অর্থ বাদ দিয়ে যদি যাকাতের নেছাব পূর্ণ না হয় তাহলে যাকাত ফরয হবে না। তবে হযরত মাওলানা মুফতী তাকী উছমানী সাহেব বলেছেন, যে লোন নিয়ে বাড়ি করা হয় বা যে লোন নিয়ে মিল ফ্যাক্টরী তৈরী করা হয় বা মিল ফ্যক্টরীর মেশনারীজ ক্রয় করা হয়, এমনিভাবে যেসব লোন নিয়ে এমন কাজে নিয়োগ করা হয় যার মূল্যের উপর যাকাত আসে না- যেমনঃ বাড়ি ও ফ্যক্টরী বা ফ্যক্টরীর মেশিনারিজের মূল্যের উপর যাকাত আসে না-এসব লোন যাকাতের জন্য বাধা নয়।

অর্থাৎ, এসব লোনের পরিমান অর্থ যাকাত থেকে বাদ দেয়া যাবে না। হাঁ যে লোন নিয়ে এমন কাজে নিয়োগ করা হয় যার উপর যাকাত আসে।

যেমনঃ লোন নিয়ে ফ্যাক্টরীর কাচামাল ক্রয়, এরুপ ক্ষেত্রে এ লোন পরিমাণ অর্থ যাকাতের হিসাব থেকে বাদ যাবে। মুফতী তাকী উছমানী সাহেব তার এ মাসলাটিকে শক্তিশালী যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত করেছেন, অতএব তার এ মতটি গ্রহন করার মধ্যেই সতর্কতা রয়েছে।

৭। কারও নিকট যাকাতদাতার টাকা পাওনা থাকলে সে পাওনা টাকার যাকাত দিতে হবে।

পাওনা তিন প্রকারঃ

(ক) কাউকে নগদ টাকা ঋণ দিয়েছে কিংবা ব্যবসায়ের পণ্য বিক্রি করেছে এবং তার মূল্য বাকী রয়েছে। এরূপ পাওনা কয়েক বছর পর উসুল হলে যদি পাওনা টাকা এত পরিমান হয় যাতে যাকাত ফরয হয়, তাহলে অতীত বতসরসমুহের যাকাত দিতে হবে। যদি একত্রে উসূল না হয়-ভেঙ্গে ভেঙ্গে উসুল হয়, তাহলে ১১ তোলা রূপার মূল্য পরিমাণ হলে যাকাত দিতে হবে। এর চেয়ে কম পরিমাণ উসূল হলে তার যাকাত ওয়াজিব হবে না-তবে অল্প অল্প করে সেই পরিমাণে পৌছে গেলে তখন ওয়াজিব হবে। আর যখনই ওয়াজিব হবে তখন অতীত সকল বতসরের যাকাত দিতে হবে। আর যদি এরুপ পাওনা টাকা নেছাবের চেয়ে কম হয় তাহলে তাতে যাকাত ওয়াজেব হবে না।

(খ) নগদ টাকা ঋণ দেয়ার কারণে বা ব্যবসায়ের পণ্য বাকিতে বিক্রি করার কারণে পাওনা নয় বরং ঘরের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড়, চাষাবাদের গরূ ইত্যাদি বিক্রয় করেছে এবং তার মূল্য পাওনা রয়েছে, এরূপ পাওনা যদি নেছাব পরিমান হয় এবং কয়েক বছর পর উসূল হয় তাহলে ঐ কয়েক বতসরের যাকাত দিতে হবে। আর যদি ভেঙ্গে ভেঙ্গে উসুল হয় তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্য পরিমাণ না হবে ততক্ষন যাকাত ওয়াজিব হবে না। যখন উক্ত পরিমাণ উসূল হবে তখন বিগত বতসর সমূহের যাকাত দিতে হবে।

(গ) মহরের টাকা, পুরষ্কারের টাকা, খালা তালাকের টাকা, বেতনের টাকা ইত্যাদি পাওনা থাকলে এরূপ পাওনা উসূল হওয়ার পূর্বে যাকাত ওয়াজিব হয় না। উসূল হওয়ার পর ১ বতসর মজুদ থাকলে তখন থেকে তার যাকাতের হিসাব শুরু হবে। পাওনা টাকার যাকাত সম্পর্কে উপরোল্লিখিত বিবরণ শুধু তখনই প্রযোজ্য হবে যখন এই টাকা ব্যতীত তার নিকট যাকাতযোগ্য অন্য কোনো অর্থ/সম্পদ না থাকে। আর অন্য কোনো অর্থ/সম্পদ থাকলে তার মাসলা উলামায়ে কেরাম থেকে জেনে নিবেন।

৮। যে ঋণ ফেরত পাওয়ার আশা নেই, এরূপ ঋণের উপর যাকাত ফরয হয় না। তবে পেলে বিগত সমস্ত বতসরের যাকাত দিতে হবে।

৯। যৌথ কারবারে অর্থ নিয়োজিত থাকলে যৌথভাবে পূর্ণ অর্থের যাকাত হিসাব করা হবে না বরং প্রত্যেকের অংশের আলাদা আলাদা হিসাব হবে।

১০। যেসব সোনা রূপার অলংকার স্ত্রীর মালিকানায় দিয়ে দেয়া হয় সেটাকে স্বামীর সম্পত্তি ধরে হিসাব করা হবে না বরং সেটা স্ত্রীর সম্পত্তি। আর যেসব অলংকার স্ত্রীকে শুধু ব্যবহার করতে দেয়া হয়, মালিক থাকে স্বামী, সেটা স্বামীর সম্পত্তির মধ্যে ধরে হিসাব করা হবে। আর যেগুলোর মালিকানা অস্পষ্ট রয়েছে তা স্পষ্ট করে নেয়া উচিত। যেসব অলংকার স্ত্রীর নিজস্ব সম্পদ থাকে তৈরী বা যেগুলো বাপের বাড়ি থেকে অর্জন করে, সেগুলো স্ত্রীর সম্পদ বলে গণ্য হবে। মেয়েকে যে অলংকার দেয়া হয় সেটার ক্ষেত্রেও মায়েকে মালিক বানিয়ে দেয়া হলে সেটার মালিক সে। আর শুধু ব্যবহারের উদ্দেশ্যে দেয়া হলে মেয়ে তার মালিক নয়। নাবালেগা মেয়েদের বিয়ে-শাদি উপলক্ষে তাদের নামে যে অলংকার বানিয়ে রাখা হয় বা নাবালেগা ছেলে কিংবা মেয়ের বিবাহ শাদীতে ব্যয়ের লক্ষ্যে তাদের নামে ব্যাংকে বা ব্যবসায় যে টাকা লাগানো হয় সেটার মালিক তারা।

অতএব সেগুলো পিতা/মাতার সম্পত্তি বলে গণ্য হবে না এবং পিতা/মাতার যাকাতের হিসাবে সেগুলো ধরা হবে না। আর বালেগ সন্তানের নামে শুধু অলংকার তৈরী করে রাখলে বা টাকা লাগালেই তারা মালিক হয়ে যায় না যতক্ষণ না সেটা সে সন্তানের দখলে হয়। তাদের দখলে দেয়া হলে তারা মালিক, অন্যথায় সেটার মালিক পিতা/মাতা।

১১। হিসাবের চেয়ে কিছু বেশি যাকাত দিয়ে দেয়া উত্তম। যাতে কোনো রূপ কম হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে। প্রকৃতপক্ষে সেটুকু যাকাত না হলেও তাতে দানের ছওয়াব তো হবেই।

(অনলাইন ডেস্ক, ঘাটাইল ডট কম)/-

করোনায় গোপালপুরের কৃতিসন্তান রূপালী ব্যাংক কর্মকর্তা সহিদুলের মৃত্যু

প্রাণঘা‌তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে রাষ্ট্রায়ত্ব রূপালী ব্যাংকের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) সহিদুল ইসলাম খান রিপন মারা গেছেন।

শুক্রবার (১৫ মে) সন্ধ্যায় ঢাকার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তি‌নি মারা যান।

রূপালী ব্যাংকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. এহতেশামুজ্জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার নারোচী গ্রামে। তি‌নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের মেধাবী ছি‌লেন। তিনি ঢাকার বাসাবোতে স্বপরিবারে বসবাস করতেন।

মৃত্যুকা‌লে তার বয়স হ‌য়ে‌ছিল ৪৯ বছর। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও একমেয়েকে রেখে গেছেন। মেয়ে নবম শ্রেণীতে পড়ে। ছেলের বয়স ছয় বছর। ছেলেও কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়ে বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছে বলে জানান রূপালী ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয়ের মহাব্যবস্থাপক খান ইকবাল।

সহিদুল ইসলাম ব্যাং‌কের প্রধান কার্যালয়ের পরিকল্পনা ও গবেষণা বিভাগে কর্মরত ছি‌লেন। ক‌রোনায় আক্রান্ত হ‌য়ে তি‌নি গত ৩০ এ‌প্রিল কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ভ‌র্তি হন।

গত তিন দিন ধরে তার অবস্থার অবনতি হয়। হাসপাতালে ভেন্টিলেটর দিয়ে তাকে নিবিড় পরিচর্যা বিভাগে রাখা হয়েছিল। সেখানেই তিনি সন্ধ্যায় মারা যান।

এ‌ই নিয়ে করোনায় আক্রান্ত হ‌য়ে এ পর্যন্ত মোট তিনজন ব্যাংকার মৃত্যুবরণ করলেন।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে তার জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হবে। তবে কোথায় দাফন হবে তা এখনও জানা যায়নি। তবে আরেকটি সুত্র জানিয়েছে, তার মরদেহ দাফনের জন্য রাতেই গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

এর আগে গত মঙ্গলবার ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দি সিটি ব্যাংকের কর্মকর্তা আবু সাঈদ মারা যান। তিনি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সেন্ট্রাল ক্লিয়ারিং বিভাগের অ্যাসিসটেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসা‌বে কমর্রত ছি‌লেন।

তার আগে ২৬ এপ্রিল ব্যাংকটির মানবসম্পদ বিভাগে মুজতবা শাহরিয়ার নামের এক কর্মকর্তা মুগদা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যু ব্যাংকারদের স্বাস্থ্য বিমার আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে পদক্রম অনুযায়ী ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পাবেন। আর কেউ মারা গেলে তার পরিবার ৫ গুণ টাকা পাবেন।

(কালের কণ্ঠ, ঘাটাইল ডট কম)/-