৮ বছরে গণপিটুনিতে নিহত ৮০০, কেন এতো নির্মম হয়ে উঠছে মানুষ?

বাংলাদেশে বিভিন্ন স্থানে গত কয়েকসপ্তাহে বেশ কয়েকটি গণপিটুনির ঘটনায় অন্তত সাত জন নিহত এবং আরো অনেকে আহত হয়েছেন।পরিসংখ্যান বলে ২০১১ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ৮ বছরে গণপিটুনিতে দেশে প্রায় ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে – যেগুলোর কোনটায় ছেলেধরা বা ডাকাত সন্দেহে, আবার কোন কোন ঘটনায় সামান্য চোর সন্দেহেও পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটেছে।

গত কয়েকদিনে যেসব গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে তার প্রায় সবগুলো ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীকে ছেলেধরা হিসেবে সন্দেহ করায় তার ওপর চড়াও হয় মানুষ। পদ্মা সেতু তৈরির কাজে মানুষের মাথা প্রয়োজন হচ্ছে – এমন একটি গুজব ছড়িযে পড়ার কারণেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছেলেধরা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে এবং গণপিটুনির ঘটনাগুলো ঘটছে।

গুজবটি এতই ভয়াবহভাবে ছড়িয়েছে যে গুজব নিরসনে সেতু কর্তৃপক্ষ এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দু’দফায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করার পরও তা সাধারণ মানুষকে সামান্য পরিমাণেও আশ্বস্ত করতে পারেনি। পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা প্রয়োজন হওয়ার গুজবকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি গণপিটুনির ঘটনা বেড়ে গেলেও বাংলাদেশে কিন্তু গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা নতুন নয়।

পরিসংখ্যান যাচাই করলে দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত প্রতিবছরই সারাদেশে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে গণপিটুনিতে – যদিও সেসব ঘটনার অধিকাংশই ছিল বিচ্ছিন্ন গণপিটুনির ঘটনা। এরকম প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক যে, সাধারণ মানুষ কেন তুচ্ছ কারণে পাশবিক নির্মমতায় আরেকজন মানুষ হত্যায়ও পিছপা হচ্ছে না?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাহফুজা খানমের মতে, মানুষ তাদের ব্যক্তিগত জীবন বা সামাজিক জীবনের অপ্রাপ্তি থেকে উৎসারিত ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ পেলে হিংস্র হয়ে উঠতে পারে।

“মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ফ্রয়েড বলেছিলেন, সুযোগ পেলেই মানুষের ভেতরের আদিম পশুপ্রবৃত্তি বেরিয়ে আসতে চায়। ছোট্ট একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে যখন মানুষের মধ্যে এরকম প্রতিক্রিয়া দেখা যায় তখন বুঝতে হবে যে ঐ পশুপ্রবৃত্তিটি কাজ করছে।”

তবে মিজ. খানম মনে করেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং অপেক্সাকৃত কম শিক্ষিত মানুষের মধ্যেই এভাবে ক্রোধ উদগারের প্রবণতা বেশি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রাজীব নন্দী, যিনি ভারত ও বাংলাদেশে গণপিটুনি বিষয়ক একটি গবেষণা করেছিলেন, মনে করেন মানুষের মধ্যে এই পশুপ্রবৃত্তি প্রকাশ হওয়ার প্রবণতা তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে।

নিজের গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে মি. নন্দী বলেন, “এ ধরণের গণপিটুনির সংখ্যা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার নিম্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা বেশি।”

উদাহরণ হিসেবে মি. নন্দী একটি চর এলাকায় ডাকাত সন্দেহে কয়েকজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা তুলে আনেন।

“বাংলাদেশের চর এলাকার মানুষ যেরকম মনস্তত্ব নিয়ে চলে – অর্থাৎ প্রাকৃতিক ও সামাজিক প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে তাদের টিকে থাকতে হয় – সেরকম ক্ষেত্রে রাতের বেলা অচেনা মানুষ দেখলেই তাকে শত্রু মনে করা এবং নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভয়ের বশবর্তী হয়ে তাকে আক্রমণ করা স্বাভাবিক।”

সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক জিনাত হুদা ওয়াহিদের মতে, সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে মানসিকতার বিভেদ তৈরি হওয়া সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়ার একটি বড় কারণ।

“আমাদের দেশে একইসাথে অনেক ধরণের চিন্তাধারার মানুষ রয়েছে। পুঁজিবাদী, ভোগবাদী চিন্তাভাবনার পাশাপাশি যেমন কট্টর মৌলবাদী ধারণার মানুষের বসবাস, তেমনি সামন্তবাদী মানসিকতার মানুষও রয়েছে”, বলেন মিজ. ওয়াহিদ।

“কাজেই দেখা যায়, এখানে চরম রক্ষণশীল থেকে শুরু করে রক্ষণশীল, সামন্তবাদী, ঔপনিবেশিক, প্রগতিশীল থেকে চরম প্রগতিশীল পর্যন্ত সব ধরণের মানুষ বাস করে।”

বিভিন্ন চিন্তাধারার মানুষ পাশাপাশি কারণে একজনের কর্মকান্ডের প্রতি আরেকজনের এক ধরনের নির্লিপ্ততা তৈরি হয়, যার ফলে এধরণের নির্মম অপরাধ সংঘটন করার পরও এর বিরুদ্ধে গণ প্রতিরোধ বা প্রতিবাদ তৈরি হয় না বলে মন্তব্য করেন মিজ. ওয়াহিদ।

আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি বাংলাদেশের মানুষের অনাস্থার বিষয়টি একেবারেই নতুন নয়। পুলিশের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সহায়তার বদলে হয়রানি করারও অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি একটি গণপিটুনির ঘটনার ভিডিওতেও উপস্থিতদের ‘পুলিশ আসার আগে যতটুকু পারি মেরে নেই, কারণ পুলিশ আসলে টাকা খেয়ে ছেড়ে দেবে’ জাতীয় কথা বলতে শোনা যায়।

আইনের প্রয়োগের উদাহরণ তৈরি না হওয়ায় এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা না থাকায় সাধারণ মানুষ একত্রিতভাবে এধরণের অপরাধ করতে ভয় পায় না বলে মনে করেন মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাহফুজা খানম।

“বয়স কম থাকাকালীন, অর্থাৎ অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে, এবং বিশেষ করে শিক্ষিত না হলে সেই ব্যক্তির কাছ থেকে বিবেকবান আচরণ কিন্তু আমরা আশা করতে পারি না। এরকম মানুষ ছোটখাটো অপরাধ সংঘটন করে পার পেয়ে যাওয়াকে অধিকাংশ সময়ই গৌরবের বিষয় বলে মনে করে।”

সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশের নেতিবাচক ভাবমূর্তি, বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা এবং বিচারব্যবস্থার ওপর অনাস্থার কারণে সাধারণ মানুষ শুধু যে নিজেরা বিচারে উদ্যোগী হচ্ছে তাই নয়, অপরাধ সংঘটন করেও পার পেয়ে যাচ্ছে কারণ তারা জানে যে এরকম ঘটনায় তাদের বিচার করা কতটা কঠিন।

(বিবিসি, ঘাটাইলডটকম)/-