৪৪ দিনে দেশে এসেছে ৪০৯ প্রবাসীর লাশ

মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসী কর্মীর মরদেহ আসার সংখ্যা শুধুই বাড়ছে। এ চলতি বছরের ৪৪ দিনেই কফিনবন্দি হয়ে ফিরেছেন ৪০৯ কর্মী। এদিকে সৌদি আরব থেকে প্রতি মাসেই ফিরে আসছেন শত শত প্রবাসী। সংখ্যাটা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বৈধ-অবৈধ বাছবিচার নয়, সৌদি পুলিশ অভিযানকালে যাকে সামনে পাচ্ছে ধরে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। এক কাপড়ে, খালি হাতে এঁরা স্বদেশের মাটিতে পা রাখছেন অনেকটা জীবন্ত লাশ হয়ে।

সৌদি আরব থেকে গত বুধবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রাতে দেশে এসেছে দুই নারীসহ আট প্রবাসী কর্মীর মরদেহ। পরিবারের সুখের আশায় এক বুক স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গিয়ে এঁরা ফিরেছেন লাশ হয়ে। গভীর রাতে বিমানবন্দরে কফিন আঁকড়ে স্বজনদের আর্তচিৎকার শোনারও কেউ ছিল না। এ নিয়ে চলতি বছরের ৪৪ দিনে কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফিরেছেন ৪০৯ জন।

সরকারি হিসাবে গত এক দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ২৭ হাজার ৬৬২ জন প্রবাসী শ্রমিকের লাশ দেশে ফেরত এসেছে। ২০১৯ সালেও তিন হাজার ৬৫৮ জনের মরদেহ ফিরেছে দেশে। অর্থাৎ গত বছর প্রতিদিন গড়ে ১০ জনের বেশি প্রবাসীর লাশ এসেছে। কারণ হিসেবে বেশির ভাগের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও স্বাভাবিক মৃত্যু বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রবাসে শ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নানা কারণে মারা যাওয়া কর্মীর মরদেহ ফেরার সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। ১৯৯৩ সালে মাত্র ৫৩ জন শ্রমিকের লাশ দেশে আসে। সেখানে গত বছর সেই সংখ্যা দাঁড়ায় তিন হাজার ৬৫৮। এর এক-তৃতীয়াংশই এসেছে সৌদি আরব থেকে। এক বছরে দেশটি থেকে নারী শ্রমিকসহ মোট এক হাজার ১৯৮ জনের লাশ এসেছে।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বলছে, এই হিসাব শুধু যেসব লাশ ফেরত আসে সেই সংখ্যা ধরে। এর বাইরে অনেক লাশই সংশ্লিষ্ট দেশে দাফন করা হয়, যার হিসাব সব সময় হালনাগাদ থাকে না।

গত বুধবার রাতে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে এসেছেন ২০ নারীসহ আরো ১৮৩ শ্রমিক। রাত ১১টা ২০ মিনিটে সৌদি এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ৮৯ জন এবং রাত ১টা ১০ মিনিটে একই এয়ারলাইনসে পৃথক ফ্লাইটে ৯৪ জন হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে পা রাখেন। অন্য এক ফ্লাইটে আট প্রবাসী ফিরেছেন কফিনবন্দি হয়ে।

প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে বরাবরের মতোই ফেরত আসা এসব প্রবাসী কর্মীকে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রগ্রাম থেকে জরুরি সহায়তা দেওয়া হয়। ফেরত আসা কর্মীদের একজন সাথী বেগম (৩০) এতটাই অসুস্থ ছিলেন যে বিমানবন্দর থেকে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সহায়তায় তাঁকে উত্তরার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সাথী জানান, গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে তিনি সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। সেখানে নিয়োগকর্তার নির্যাতনের শিকার হন। একই ধরনের সমস্যার মুখে পড়ে দেশে

ফিরেছেন ঢাকার হীরা খাতুন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আবেদা খাতুন, সুনামগঞ্জের আমিরুন বেগম, মৌলভীবাজারের ফারজানা আক্তারসহ ২০ নারী।

বুধবার রাতে ফেরত আসা কর্মীদের একজন পাবনার শরিফ হোসেন মাত্র এক বছর আগে গিয়েছিলেন সৌদি আরবে। বৈধ সব কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও শূন্য হাতে দেশে ফিরতে হয়েছে। কাজের জন্য বাইরে বের হতেই পুলিশ আটক করে। কাগজপত্র দেখানো হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। একইভাবে কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও দেশে ফেরত আসতে হয়েছে কিশোরগঞ্জের শাকিল, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খাইরুল ইসলাম, পিরোজপুরের শামিম, ময়মনসিংহের আমিন, কুমিল্লার বাবুল, রশিদসহ ১৮৩ কর্মীকে।

প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ২০১৯ সালে মোট ৬৪ হাজার ৬৩৮ কর্মী দেশে ফিরেছেন; যাদের পরিচয় ডিপোর্টি।

ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘চলতি বছরের জানুয়ারিতেই সৌদি থেকে দেশে ফিরেছে ১৭৫ নারীসহ তিন হাজার ৬৩৫ বাংলাদেশি। ফেরত আসা প্রবাসীদের আমরা শুধু বিমানবন্দরে সহায়তা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করছি না। তারা যেন ঘুরে দাঁড়াতে পারে সে জন্য কাউন্সেলিং, দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং আর্থিকভাবেও পাশে থাকার চেষ্টা করছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা সবাই মিলে কাজটি করতে হবে। পাশাপাশি এভাবে যেন কাউকে শূন্য হাতে ফিরতে না হয় সে জন্য রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে দায়িত্ব নিতে হবে। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে হবে দূতাবাস এবং সরকারকেও।

(কালের কণ্ঠ, ঘাটাইলডটকম)/-