স্মরণ: ঘাটাইলের কৃতি সন্তান মোফাখ্খারুল ইসলাম উয়ায়সী

১৯২১ সালে টাঙ্গাইলে ঘাটাইল উপজেলার নূরপাড়া গ্রামে এক খান্দানী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, ভাষা সৈনিক, কবি মোফাখ্খারুল ইসলাম উয়ায়সী। পিতা মৌলভী ময়েজ উদ্দিন স্হানীয় মসজিদের ঈমাম ছিলেন এবং তিনি নিজ বাড়িতে মাদরাসা স্হাপন করে শিক্ষা বিস্তারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন।

জনশ্রুতি আছে, আশেপাশের গ্রামে আরব্য উপন্যাস, পুঁথি পাঠের জন্য ময়েজ উদ্দিনকে জিয়াফত করে নিয়ে যাওয়া হতো। মাতা নাজিরন্নেছা ছিলেন আদর্শ গৃহিণী।

পিতার কাছেই মোফাখ্খারুল ইসলাম উয়ায়সীর পড়ালেখার হাতেখড়ি। পরে হরিপুর প্রাইমারি স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে ভর্তি হন টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী হাইস্কুলে এবং সেখান থেকেই এন্ট্রান্স পাশ করেন ১৯৪০ সালে। করটিয়া সা’দত কলেজ থেকে ১৯৪৪ সালে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৪৬ সালে বি.এ পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৫০ সালে।

মাইনর পাশের পর মোফাখ্খারুল ইসলাম সাধুটি নজীব উদ্দিন মাইনর স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন। ইন্টারমিডিয়েট পাশের পর সা’দত কলেজে কিছুদিন লাইব্রেরিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষকতাকেই জীবনের মূল পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে ১৯৫১ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন।

১৯৫৩ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত রংপুর কারমাইকেল কলেজে শিক্ষকতা করেন মোফাখ্খারুল ইসলাম। ১৯৭১ সালে যোগ দেন ঢাকা কলেজে। পরবর্তীতে খুলনা বয়রা মহিলা কলেজে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োজিত থাকেন এবং সেখান থেকেই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে ১৯৮০ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

কবি হিসেবে মোফাখ্খারুল ইসলামের আত্মপ্রকাশ ঘটে সা’দত কলেজে অধ্যয়নকালীন। তখন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশ হতো। তাঁর লেখা “বয়াতী” কবিতাটি মেট্রিকে পাঠ্য ছিল।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ

হে পাক ফৌজ, জালালী কবুতর

নাটকঃ মুরশীদ আওলাদ, প্রহরী পুত্র, বড় ঈদ, মারাঠা বিজয়িনী, ঈমান পরখ

অন্যান্য গ্রন্থঃ আল্লাহকে দেখা যায়, নবীর জোব্বা পেলেন যিনি, ইতিহাসগত বিভ্রান্তির রহস্য, ইসলাম পথের বাঁধা, তমদ্দুন রুপায়ন, ভাষা ও রচনারীতি ইত্যাদি।

এছাড়া তাঁর ২৫ এর অধিক অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি রয়েছে।

সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা

মোফাখ্খারুল ইসলাম উয়ায়সী তমদ্দুন মজলিশের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, এশিয়াটিক সোসাইটির আজীবন সদস্য, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সমিতির সদস্য। তিনি ১৯৫৯ সালে পাকিস্তানের করাচী সাহিত্য সম্মেলনে যোগদান করেছিলেন।

পারিবারিক জীবন

মোফাখ্খারুল ইসলাম ১৯৫১ সালে সুরাইয়া সুলতানা মুফলিহার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম.এ ডিগ্রি লাভ করে দীর্ঘদিন কাপাসিয়া কলেজে প্রভাষক হিসেবে চাকরি করেছেন।

তাঁর সন্তানদের মধ্যে- বীর মুক্তিযোদ্ধা ময়ীজুল আবরার শাহীন (এম.এ, জাপানে কর্মরত), ডা. নিবারাস পারভীন রুমা (স্বামীসহ আমেরিকায় কর্মরত), রুবাব নাসরীন (এম.এ, গৃহিণী), তুতিয়া ইয়াসমীন পাপিয়া (এম.এ, বেতার ও টিভি নাট্যশিল্পী), রাসেল মো. শামীম (ব্যবসায়ী)।

ভাষা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় কালিদাসপাড়া- সাধুটি সড়কটি তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে।

দীর্ঘদিন রোগভোগের পর তিনি ২০০৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

কবি মোফাখখারুল ইসলাম উয়ায়সী ছিলেন উয়ায়সী তরিকার একজন আধ্যাত্মিক সাধক। দেশেবিদেশে রয়েছে তাঁর অসংখ্য ভক্ত, অনুসারী, গুণগ্রাহী।

(স্টাফ রিপোর্টার, ঘাটাইল ডট কম)/-

Print Friendly, PDF & Email