স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা ; আ ল ম ফজলুল রহমান

মুক্তিযুদ্ধের সময়টা সম্ভবত: সেপ্টেম্বর মাস। আমি কাটলা মুক্তিফৌজ ক্যাম্পের অফিসার ইনচার্জ। সংবাদ পেলাম ভারতের দাউদপুর এলাকায় রাস্তায় পুতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে একটি বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঐ মাইন বিস্ফোরণে একজন আহত হয়েছেন যার পরিচয় তখন পেলাম না। ভারতের দাউদপুর গ্রাম আর বাংলাদেশের বনতাড়া গ্রাম যার নাম গঙ্গাপ্রসাদ ও পূর্ব-পশ্চিম পাশাপাশি গ্রাম। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত আত্রাই নদী গ্রাম দুটোকে বিচ্ছিন্ন করেছে। নদীতে গোসল করার সময় দাউদপুর এবং বনতাড়ার মানুষ ভাবের আদান প্রদান করে।

আমি সংবাদ পেয়ে দাউদপুর এসে দেখলাম স্হলমাইন বিস্ফোরণের জায়গায় একটি বড় গর্ত হয়েছে এবং একটি যাত্রীবাহী বাস আড়াআড়ীভাবে রাস্তার পশ্চিম পাশে থেমে আছে। বাসের একটি চাকা মাইনের আঘাতে বেঁকে গেছে। অনেক মানুষ নানান মন্তব্য শুনলাম। কিন্তু কেউ বলতে পারলোনা মাইন বিস্ফোরণে আহত ব্যাক্তি কে এবং তিনি এখন কোথায়।

আমার বাবা মা ভাই বোন সবাই ভারতে শরণার্থী হয়ে দাউদপুরের নদী লাগোয়া আম বাগানে শরণার্থী শিবিরে আছেন। ঐ সময় ওখানে পঙ্গপালের মতো মানুষ আর মানুষ। কেউ বলতে পারলো না মাইনে কে আহত হয়েছে। সবার মুখে এক কথা পাকিস্তানি আর্মি এই মাইন পুঁতে রেখেছিল। সবাই আরো আশঙ্কা করছে, এবারে হয়তো পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারতে ঢুকবে। যারা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় শরণার্থী শিবিরগুলিতে অবস্হান করছে তারা বলছে আমাদের সরতে হবে। শিবির স্থাপন করতে হবে আরে ভিতরে নিরাপদ স্থানে।

এই করতে করতে বিকাল হয়ে গেল। বাবা-মার সংবাদ নিতে শরণার্থী শিবিরে গেলাম। আমার পরিবারের লোকজন যেখানে থাকেন ওখানে অনেক লোকের ভিড়। আমাকে দেখে আত্মীয় স্বজনদের অনেকে ছুটে এসে আমাকে জানালো যে মাইন বিস্ফোরণে আমার বাবা গুরুতর আহত হয়েছেন। আমি দ্রুত ঘরে ঢুকে দেখলাম আমার বাবা শকে এবং ব্যথায় কাতর হয়ে শুকনো মুখে আহ্ উহ্ করেছেন। মাকে দেখলাম ভিষন মুশড়ে পড়েছেন।

স্থানীয় ডাক্তার এসেছেন চিকিৎসা দিচ্ছেন। আমাকে দেখে বাবা-মা বল পেলেন। আমি সাহস দিয়ে বললাম সব ঠিক হয়ে যাবে। পায়ের মোচা বা কাফ মাসেলে মাইনের স্প্লিন্টার ঢুকে এফোঁড় ওফোঁড় করে ফেলেছে। পা ফুলে চরম ব্যাথায় তিনি ব্যাকুল হয়ে গেছেন।

আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম মাইন বিস্ফোরণের সময়ের কথা তাঁর কতটুকু মনে আছে। উনি বললেন একটা বাস আমার পাশদিয়ে যাবার সময় একটা বিকট আওয়াজ হলো। এর পরের কথা তিনি জানেন না। যাই হোক অনেক দিন লেগেছিল তাঁর সেরে উঠতে।

আমার বাবার বড় ভাই শহীদ মহির উদ্দীন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে দিনাজপুরের প্রথম শহীদ। মোহনপুর যুদ্ধে পাকিস্তান আর্মির সাথে যুদ্ধে আমরা টিকতে না পেরে ছত্রভঙ্গ হলে সৈয়দপুর সেনানিবাস হতে দিনাজপুরের দিকে এ্যাডভান্সরত পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের মোহনপুর গ্রামে ঢুকে সমস্ত গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। গ্রামের মানুষ যে যেদিকে পারে জীবন বাঁচাতে দিকবিদিক ছুটাছুটি করতে থাকে। আমার বাবার বড় ভাই আমাদের বড় বাবা মহির উদ্দীন তাঁর ছোট ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে দৌড়ে পালাবার সময় পাকিস্তান আর্মির একজন সৈনিক তাঁকে গুলি করে। উনি মাটিতে পড়ে যান এবং শাহাদাতবরণ করেন।

তাঁকে উদ্ধার করার সময় গ্রামের মানুষ দেখতে পায় যে তিনি চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ে আছেন। সমস্ত বুকে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। এই রক্তের উপরে তাঁর ছোট ছেলে ঘুমিয়ে আছে। সবার ধারণা ছেলেটিও গুলিবিদ্ধ হয়ে মরে গেছে। ছেলেটিকে ধরে উঠার সময় সে কেঁদে ওঠে। অল্পের জন্য সে বেঁচে গেছে। ওর হাতের পাশদিয়ে গুলি বেরিয়ে চলে যায়। ওতে ওর হাতে সামান্য ক্ষত হয়েছিল।

আমি তখন আফিসার ক্যাডেট হিসেবে ঢাকার ব্যাটেল স্কুলে শিক্ষানবিস। তখনও সেনাবাহিনীতে কমিশন পাইনি। ছুটিতে বাড়িতে এসে শহীদদের জন্য সরকার ঘোষিত দুইহাজার টাকা পেতে ঐ সময় দিনাজপুরের ডেপুটি কমিশনার যিনি মুক্তি যুদ্ধের ন’মাস পাকিস্তান সরকারের চাকরিতে ছিলেন আমাকে টাকা দিতে অপারগ বলে বিদায় করে দেন।

আজও আমরা শহীদ মহির উদ্দীন এর শাহাদতের সরকারি স্বীকৃতি পাইনি। আমার বাবও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার সরকারি স্বীকৃতি পান নাই। তবে আমি বিডিআরের মহাপরিচালক হলে আমাদের গ্রামের ভিতর দিয়ে চলাচলের সড়কের নামকরণ করি শহীদ মহির উদ্দীন সড়ক এবং সড়কটি পাকা করে দেই।

“লেখক : জেনারেল আ ল ম ফজলুল রহমান, বিডিআর প্রধান (অবসরপ্রাপ্ত)”