সর্বশেষ
টাঙ্গাইলেও শাহেদের ক্ষমতা আর প্রতারণার জালসখীপুরে হত্যার শিকার মাওলানা ফরিদ, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে লোমহর্ষক তথ্য‘নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণ করা হবে’আ’লীগ নেতাদের মদদ আর ছত্রছায়ায় যেভাবে সাহেদের উত্থানকরোনায় মারা গেছেন ধনবাড়ী আ’লীগের সহসভাপতি আজাদবাংলাদেশে করোনার সার্টিফিকেট জালিয়াতির খবর ইতালির পত্রিকায়ঘাটাইলে নতুন করে এক নারী করোনা পজিটিভসখীপুরে সাপের কামড়ে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মৃত্যু, ভ্যাকসিন নেই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেঘাটাইলে বর্ষাকালে পরীক্ষামূলক তরমুজ চাষে সাফল্যটাঙ্গাইলে মুক্তিযোদ্ধা হাসান আলী এডভোকেট হত্যার বিচার মিলেনি এক বছরেও

সাড়ে পাঁচ মাস পর টাঙ্গাইলে জামিনে মুক্ত ভারতীয় নাগরিক জয়িতা

নভে ২০, ২০১৯

চোখে আনন্দাশ্রু। মুখে লজ্জিত হাসির ঝিলিক। বুকে চাপা কান্না। লাল রঙে ছাপ দেয়া সালোয়ার-কামিজ পড়নে। গাট করে বাধা চুলের ডগা হেমন্তের বৈকালিকতায় উড়ছে। কারাগারের ভেতর থেকে হালকা পায়ে হেটে বেড়িয়ে আসছে ৩০ বছর বয়সী এক রমণী। নাম জয়িতা মান্না পিউ, বাবা পরেশ চন্দ্র দাস। ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনার জগদ্দল এলাকার ২৫, কাবিলের বাসিন্দা। এসেই ৪৫ফুট দূরত্বে দাঁড়ানো বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন কিছুক্ষণ- সে এক হৃদয়গ্রাহী দৃশ্য। কথা বললেন মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, সাংবাদিক ও অভ্যাগতদের সাথে। দীর্ঘ পাঁচ মাস ১৭দিন হাজত বাসের পর রোববার (১৭ নভেম্বর) বিকালে উচ্চ আদালতের জামিনে টাঙ্গাইল কারাগার থেকে মুক্ত হন ভারতীয় নাগরিক জয়িতা মান্না পিউ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্রে নাটোরের জনৈক আল আমিনের সাথে বিয়ে- অত:পর বিচ্ছদ এবং একটি মামলায় জড়িয়ে জেল-হাজতে যান তিনি।

গত ৩ মে টাঙ্গাইলের গোপালপুর থানায় দায়ের করা মানব পাচার প্রতিরোধ আইনের একটি মামলায় (জিআর নং-৮৪/১৯ইং) সম্ভাব্য অভিযুক্ত হিসেবে টাঙ্গাইল কারাগারে হাজতবাস করছিলেন জয়িতা মান্না পিউ।

ঘটনাটি প্রথমে ভ্রমণ পিয়াসী আইএফআইসি ব্যাংক কর্মকর্তা মো. মোর্শেদুল আলম তালুকদারের নজরে আসে। তিনি বিষয়টি বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন ফাউন্ডেশনের টাঙ্গাইলের সভাপতি মো. সেলিম তরফদার ও সাংবাদিক মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুলের সাথে আলোচনা করেন এবং মেয়েটিকে সহায়তা করার আহ্বান জানান।

কারাগারে জয়িতা মান্না পিউ, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা ও ঘটনার পূর্বাপর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে মানবিক বিবেচনায় ঘটনাটি বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন ফাউন্ডেশন টাঙ্গাইল জেলা শাখা ভারতীয় নাগরিক জয়িতা মান্না পিউকে আইনগত ও সার্বিক সহায়তা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে গত ২২ অক্টোবর বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন ফাউন্ডেশনের টাঙ্গাইল জেলা শাখার আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকবর আলী খানকে জয়িতা মান্না পিউয়ের আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হয়।

এরপর বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন ফাউন্ডেশনের টাঙ্গাইলের সভাপতি মো. সেলিম তরফদার, অ্যাডভোকেট আকবর আলী খান, সাংবাদিক মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল, ব্যাংক কর্মকর্তা মো. মোর্শেদুল আরম তালুকদারের সাথে ভারতীয় হাই কমিশন, জয়িতা মান্নার পরিবার ও মামলা সংশ্লিষ্টদের সাথে একের পর এক বৈঠক চলতে থাকে। একই সাথে মামলাটি আদালতে মোকাবেলা করার আইনগত প্রক্রিয়া চলতে থাকে। পরে ভারতীয় হাই কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী জয়িতা মান্না পিউয়ের মামলায় জামিনের জন্য ভারত ও বাংলাদেশ সরকার যৌথভাবে খরচ বহন করার সিদ্ধান্ত হয়।

জয়িতা মান্না পিউ জানান, তিনি ১১ ও ৬ বছর বয়সী দুই ছেলের জননী, সর্ট ডিভোর্সী। ঢাকাস্থ শান্তি নগরের ইস্টার্ণপ্লাজায় থ্রিপিস-সার্ট পিসের ব্যবসা করতেন। সেই সুবাদে বাংলাদেশে অবারিত যাতায়াত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের কল্যাণে বাংলাদেশের নাটোর জেলার লালপুর থানার গোপালপুর গ্রামের শরিফুল মিয়ার ছেলে কাপড় ব্যবসায়ী আলআমিনের সাথে পরিচয়। তিনি বাংলাদেশে আসেন এবং দেখা করেন। পরিচয়ের পর ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। আলআমিন তাকে ব্যবসায় সহায়তা করতে থাকে। এক পর্যায়ে ঘনিষ্ঠতা থেকে প্রেম।

চলতি বছরের ৮মার্চ তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আলআমিনের সাথে ঝগড়া হয়। পাল্টে যায় আলআমিন। কিন্তু জয়িতা মান্না পিউ তাকে হারাতে চায়না। বন্ধু-বান্ধবদের পরামর্শে এদেশীয় তাবিজ-কবজের মাধ্যমে আলআমিনকে কাছে ধরে রাখতে চায়।

সেই সূত্রে জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার আওনা ইউনিয়নের স্থল গ্রামের ভুয়া কবিরাজ আব্দুস সাত্তারের সাথে পরিচয় হয়। কবিরাজ আব্দুস সাত্তার তাকে নিজ বাড়িতে ডাকেন। হুজুরের বাড়ি গিয়ে জয়িতা মান্না পিউ তাবিজ-কবজ গ্রহন করেন এবং অসময় হওয়ায় সেখানে রাত যাপন করেন। সেখানে রাতে আলাপ হয় স্থানীয় আয়শার সাথে। তাবিজ-কবজ নিয়ে তিনি পরের দিন সকালে নাটোর জেলার লালপুর থানার গোপালপুর গ্রামে আলআমিনের বাড়িতে আসেন।

সেদিন আলআমিন তাকে ঈশ্বরদী নিয়ে যায় এবং একটি আবাসিক হোটেলে রেখে বাড়ি চলে যায়।

জয়িতা মান্না পিউ পরে আলআমিনকে মোবাইল ফোনে জানান, তার কাছে বেশি টাকা নেই- তাই ব্যবসার ক্লায়েণ্টদের কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে টাকা আনতে হবে। আলআমিন তাকে হোটেলের উল্টোদিকে একটা বিকাশের দোকানের কথা জানায়। সেই বিকাশের দোকানে যান এবং টাকা আনেন। কিন্তু সেখানে বিশ্বজিত নামে এক হিন্দু ভদ্রলোকের সাথে আলাপ জমে ওঠে। আলাপের এক পর্যায়ে ওই লোক জয়িতা মান্নার ‘দাদা’ হয়ে ওঠেন।

জয়িতা মান্না পিউ জানান, গত ২৯এপ্রিল তিনি বাংলাদেশে আসেন এবং ওইদিনই ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে আলআমিনের সাথে আদালতের মাধ্যমে ৬০হাজার টাকা দেনমোহরে বিয়ে হয়। ৩০এপ্রিল তিনি পিত্রালয় ভারতে ফিরে যান।

গত ৮মে বাংলাদেশে এসে ওই বিশ্বজিত দাদার মাধ্যমে জয়িতা মান্না পিউ জানতে পারেন, আল আমিন তাকে ডিভোর্স দিয়েছে এবং ঢাকা থেকে ব্যবসায়িক টাকা এনে আত্মসাত করার চেষ্টা করছে। মনের দুঃখে জয়িতা পরদিন অর্থাৎ ৯ মে ভারতে ফিরে যান। প্রতারক আলআমিনের সাথে শেষ বোঝাপড়া করতে জয়িতা মান্না পিউ এক বান্ধবীকে সাথে নিয়ে গত ২ মে আবার বাংলাদেশে আসেন।

তিনি আলআমিনের গ্রামের লোকদের সাথে কথা বলতে ওই বিশ্বজিত দাদার সহায়তা চান। সে সময় আয়েশাকে ওই বিশ্বজিতের বাড়িতে অবস্থান করতে দেখেন। বিশ্বজিতের বাড়িতে তারা দুই বান্ধবী রাতে থাকেন। আয়েশার সাথে আলাপ-পরিচয় হয়।

আয়েশার বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর থানায়। সে একজন হিন্দু ছেলের সাথে প্রেম করে এবং কলকাতা যেতে চায়।

পরদিন অর্থাৎ ৩০মে তারা ঢাকা যাওয়ার বাসটিকিট কাটেন এবং আয়েশা বাড়িতে যাওয়ার। আয়েশাকে বাসস্ট্যান্ডে বসিয়ে রেখে জয়িতা মান্না পিউ ও তার বান্ধবী খাবার কিনতে যান। খাবার নিয়ে ফিরে এসে দেখেন পুলিশ আয়েশাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। পরে পুলিশ তিনজনকেই আটক করে ঈশ্বরদী থানায় নিয়ে যায়।

থানায় ওই বিশ্বজিত দাদাকেও দেখতে পায় জয়িতা মান্না পিউ। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পরদিন অর্থাৎ ৩১ মে তাদেরকে টাঙ্গাইলের গোপালপুর থানায় নেয়া হয়। পরে জয়িতা মান্নার বান্ধবীকে ভারতে ও বিশ্বজিতকে ছেড়ে দিয়ে আয়েশাকে বাদী করে মামলা দায়ের করে জয়িতা মান্না পিউ ও ভুয়া কবিরাজ আব্দুস সাত্তারকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।

আক্ষেপ করে জয়িতা মান্না পিউ জানান, গত ৮মার্চ থেকে ৩১মে পর্যন্ত তার জীবনে ঘটনাবহুল সময়। আলআমিনের সাথে ব্রেকআপ। ২৯ এপ্রিল বিয়ে এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ। ৮মে তালাক হয়। এ সময়টাতে তিনি খুবই আবেগপ্রবন ছিলেন। আজো তা সব ঘোলাটে। প্রেম-বিয়ে ও তালাকের বিড়ম্বনায় তার জীবনের অনেকটা সময় নষ্ট হয়েছে। এখন তিনি বুঝতে পেরেছেন, ওই প্রেম ও বিয়ে ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। তিনি জানান, টাঙ্গাইল কারাগারের জেল সুপার, জেলার ও সহকারী জেলার খুব ভাল মানুষ। হাজতে তাকে খুব সহায়তা করেছে।

ভিনদেশি নাগরিক জয়িতা মান্না পিউ মানব পাচার প্রতিরোধ আইনে দায়েরকৃত মামলায় জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। এখন তিনি বাড়ি ফিরে যেতে চান, যেতে চান দুই সন্তানের কাছে। তার দাবি তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে অভিযুক্ত। তিনি বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সুষ্টু তদন্ত দাবি করেন।

(দৃষ্টি, ঘাটাইলডটকম)/-

Recent Posts

ফেসবুক (ঘাটাইলডটকম)

Doctors Dental

ঘাটাইলডটকম আর্কাইভ

বিভাগসমূহ

পঞ্জিকা

July 2020
S S M T W T F
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031