১৪ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৮শে মে, ২০২০ ইং

‘সম্পদ বৃদ্ধিতে জাকাত যাকে, যেভাবে, যখন দেবেন’

মে ১৬, ২০২০

জাকাত ইসলামী সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান। জাকাত একদিকে দরিদ্র, অভাবী ও অক্ষম জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। জাকাত ইসলামী শরিয়তের অন্যতম স্তম্ভ। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হলো জাকাত।

জাকাত আরবি শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে পবিত্রতা, ক্রমবৃদ্ধি, আধিক্য ইত্যাদি। পারিভাষিক অর্থে জাকাত হলো, ধনীদের ধন-মাল থেকে আল্লাহর নির্ধারিত হারে উপযুক্ত ব্যক্তিকে দান করা। এর আভিধানিক অর্থ কোনো বস্তুকে পরিশুদ্ধকরণ, প্রবৃদ্ধিকরণ, পবিত্রতা, সুসংবদ্ধকরণ ইত্যাদি। আর জাকাতের শাব্দিক অর্থ পরিচ্ছন্নতা বা পবিত্রতা, ক্রমবৃদ্ধি, আধিক্য ইত্যাদি। কোরআনে শব্দটি আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

মহান আল্লাহ সম্পদশালীদের সম্পদ থেকে জাকাত সংগ্রহ করে নির্ধারিত আটটি খাতে ব্যয় বণ্টন করার জন্য ইসলামী রাষ্ট্রের সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন।

জাকাত একদিকে জাকাতদাতার মন ও আত্মাকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে, তার ধন-সম্পদকেও পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র করে দেয়; অন্যদিকে দরিদ্রদের অভাব পূরণে সহায়তা করে এবং সম্পদে ক্রমবৃদ্ধি বয়ে আনে।

জাকাত বলতে ধন-সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ দান করাকে বোঝায়। পারিভাষিক অর্থে জাকাত হলো, সাহেবে নিসাবের ধন-মাল, জমির ফসল ও খনিজ সম্পদের ওপর ইসলামী শরিয়াহ নির্ধারিত অংশ নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করা। আল্লাহ তাআলা জাকাত ব্যয়ের খাতগুলো সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন।

সূরা রুমের ৩৯ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “হে মানুষ! ধনসম্পত্তি বৃদ্ধির জন্যে তোমরা যে সুদী বিনিয়োগ করো, আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায় না। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের জন্যে শুদ্ধচিত্তে যা দান করো, তা-ই বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।”

ইসলামে জাকাতের গুরুত্ব

মহান আল্লাহ বলেন, ‘…সম্পদ যেন শুধু তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।’ (সুরা : হাশর,  আয়াত : ৭)

অন্য আয়াতে এসেছে, ‘আমার রহমত সব কিছু পরিব্যাপ্ত করে নিয়েছে। শিগগির আমি তা লিখে দেব সেই লোকদের জন্য যারা তাকওয়া অবলম্বন করে ও জাকাত দেয় এবং যারা আমার আয়াতগুলোর প্রতি ঈমান রাখে।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৫৬)

কোনো সংগঠনকে দেওয়ার দ্বারা জাকাত আদায়ের শর্ত পূরণ হয় না, তাই জাকাত আদায় হবে না। (আদ দুররুল মুখতার: ২/৩৪৪, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/১৮৮)

নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হলে ভাই-বোন, চাচা, মামা, ফুফু, খালা ও তাদের সন্তানদেরকে জাকাতের টাকা দিতে পারবে। (ফাতহুল কাদির: ২/২০৯, রদ্দুল মুহতার: ২/৩৪২)

মেয়ের জামাই ও ভগ্নিপতিকে জাকাত দেওয়া যাবে, যদি সে জাকাতের উপযুক্ত হয়। (রদ্দুল মুহতার ২/৩৪৬)

জাকাতের টাকা দিয়ে ক্রয়কৃত জিনিষ পরবর্তিতে নিজে নিসাবের মালিক হয়ে যাওয়ার পরও নিজে ব্যবহার করতে পারবে। (ফাতহুল কাদির: ২/২০৫)

জাকাতের টাকার মালিক বানিয়ে দেওয়া জাকাত আদায়ের শর্ত। তাই মালিক না বানিয়ে দাওয়াত খাওয়ানোর দ্বারা জাকাত আদায় হবে না। (রদ্দুল মুহতার: ২/২৫৭)

দোকান, কারখানা বা বাড়ির কর্মচারী যদি গরিব ও জাকাত নেওয়ার উপযুক্ত হয় তাহলে তাদের নিঃস্বার্থ জাকাত দেওয়া জায়েয হবে, অন্যথায় জায়েয হবে না। তবে তাদের জাকাত দেওয়ার কারণে তাদের প্রাপ্য নিয়মিত পারিশ্রমিকের মধ্যে কোনো ব্যাঘাত যেন সৃষ্টি না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ জাকাত দ্বারা কারো হক আদায় করা যায় না। বেতন যেহেতু চাকরিজীবীর প্রাপ্য হক, তাই জাকাত দ্বারা বেতনের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হবে না। (মুলতাকাল আবহুর: ১/২৮৪, ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম: ৬/২৪৫)

হাদিস শরিফে এসেছে, ‘আল্লাহ যাকে ধন দিয়েছেন, সে যদি জাকাত আদায় না করে তাহলে কিয়ামতের দিন তা একটি বিষধর অজগরের রূপ ধারণ করবে, যার দুই চোখের ওপর দুটি কালো চিহ্ন থাকবে। ওই সাপ বলতে থাকবে, আমিই তোমার ধন-মাল, আমিই তোমার সঞ্চয়।’ (বুখারি)

জাকাত ইসলামের মৌলিক ফরজ। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে তৃতীয় স্তম্ভ হচ্ছে জাকাত। ঈমানের পর নামাজ এবং তার পরই জাকাতের স্থান। পবিত্র কোরআনের ৩২ জায়গায় জাকাতের কথা বলা হয়েছে। তার মধ্যে ২৮ জায়গায় নামাজ ও জাকাতের উল্লেখ একত্রে করা হয়েছে।

ইসলামের প্রথম খলিফা আবুবকর সিদ্দিক (রা.) জাকাত না দেওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন।

জাকাত কারা দেবেন

ইসলামী আইনবিদরা এ ব্যাপারে একমত যে জাকাত শুধু স্বাধীন, পূর্ণবয়স্ক মুসলিম নর অথবা নারী, যার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ আছে, তার ওপর নিম্ন শর্ত সাপেক্ষে জাকাত ধার্য হবে।

শর্তগুলো হলো—

১. সম্পদের ওপর পূর্ণাঙ্গ মালিকানা। সম্পদের ওপর জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সম্পদের মালিকানা সুনির্দিষ্ট হওয়া জরুরি ।

২. সম্পদ উৎপাদনক্ষম হওয়া। জাকাতের জন্য সম্পদকে অবশ্যই উৎপাদনক্ষম, বর্ধনশীল বা প্রবৃদ্ধমান হতে হবে।

৩. নিসাব। জাকাত ধার্য হওয়ার তৃতীয় শর্ত হচ্ছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা। নিসাব বলা হয় শরিয়ত নির্ধারিত নিম্নতম সীমা বা পরিমাণকে। সাধারণভাবে ৫২.৫০ তোলা রুপা বা ৭.৫০ তোলা সোনা বা এর সমমূল্যের সম্পদকে নিসাব বলা হয়। কারো কাছে ৭.৫০ তোলা সোনা বা ৫২.৫০ তোলা রুপা থাকলে বা উভয়টি মিলে ৫২.৫০ তোলা রুপার মূল্যের সমান অথবা সব সম্পদ মিলে ৫২.৫০ তোলা রুপার সমমূল্যের সম্পদ থাকলে  সে সম্পদের জাকাত দিতে হবে।

৪. মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ থাকা। সারা বছরের মৌল প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত সম্পদ থাকলেই শুধু জাকাত ফরজ হবে।

৫. ঋণমুক্ত হওয়া। জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য ঋণমুক্ত হওয়ার পর নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা জরুরি।

৬. সম্পদের ওপর এক বছর পূর্ণ হওয়া। কারো কাছে কমপক্ষে নিসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর থাকলেই শুধু সে সম্পদের ওপর জাকাত দিতে হবে।

জাকাত কাদের জন্য

পবিত্র কোরআনে আট শ্রেণির লোক জাকাত পাওয়ার যোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। (দেখুন—সুরা : তাওবা, আয়াত : ৬০)

► ফকির। ফকিরকে বাংলায় গরিব বলা হয়।

► মিসকিন। যাদের আর্থিক অবস্থা গরিবদের চেয়েও খারাপ, তারাই মিসকিন।

► আমেল। জাকাতের কাজে নিযুক্ত ব্যক্তি।

► মন জয় করার জন্য। ইসলামের বিরোধিতা বন্ধ করা বা ইসলামের সহায়তার জন্য কারো মন জয় করার প্রয়োজন হলে এবং নওমুসলিমদের সমস্যা দূর করার জন্য জাকাত তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করা হবে।

► গলদেশ মুক্ত করা। গলদেশ মুক্ত করা বলতে দাসত্ব শৃঙ্খলে আবদ্ধ লোক এবং বন্দিদের মুক্ত করাকে বোঝানো হয়েছে।

► ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধ। ঋণভারে জর্জরিত লোকেরা মানসিকভাবে সর্বদাই ক্লিষ্ট থাকে এবং কখনো কখনো জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়ে। তাদের জীবনীশক্তির ক্ষয় সাধিত হয়। অনেক সময় তারা অন্যায় ও অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। সুতরাং যথার্থ প্রয়োজনে ঋণগ্রস্ত লোকদের ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত করা ইসলামী সমাজের দায়িত্ব। এ জন্য আল্লাহ জাকাতের অর্থ ব্যয় করার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে সমাজকে সুস্থ রাখা যায়।

► আল্লাহর পথে ব্যয়। কোরআনের ভাষায় এ খাতের নাম বলা হয়েছে ‘ফি সাবিলিল্লাহ’, যার অর্থ হচ্ছে আল্লাহর পথে। আল্লাহর পথে কথাটি খুব ব্যাপক। মুসলমানদের সব নেক কাজ আল্লাহর পথেরই কাজ।

► পথিক-প্রবাসী। মুসাফির বা প্রবাসী লোকের বাড়িতে যত ধন-সম্পত্তিই থাকুক না কেন, পথে বা প্রবাসে সে যদি অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়ে তাহলে তাকে জাকাত তহবিল হতে প্রয়োজনীয় সাহায্য অবশ্যই দিতে হবে।

যেসব সম্পদে জাকাত নেই

যেসব সম্পদকে জাকাত থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে সেগুলোর একটি তালিকা নিম্নে দেওয়া হলো—

বসবাসের জমি, মিল, ফ্যাক্টরি, ওয়্যারহাউস, গুদাম, দোকান, বাড়িঘর, জায়গাজমি, এক বছরের কম বয়সের গবাদি পশু, ব্যবহারের যাবতীয় কাপড়চোপড়, বই-খাতা-কাগজ ও মুদ্রিত সামগ্রী, গৃহের যাবতীয় আসবাব, বাসনকোসন ও সরঞ্জামাদি, তৈলচিত্র, স্ট্যাম্প, অফিসের যাবতীয় আসবাব, যন্ত্রপাতি, ক্যালকুলেটর, কম্পিউটার ইত্যাদি সরঞ্জাম, গৃহপালিত সব ধরনের মুরগি ও পাখি, কলকবজা, যন্ত্রপাতি ও হাতিয়ার ইত্যাদি, চলাচলের জন্তু বা গাড়ি, যুদ্ধাস্ত্র ও সরঞ্জাম, ক্ষণস্থায়ী বা পচনশীল যাবতীয় কৃষিপণ্য, বপন করার জন্য সংরক্ষিত বীজ, জাকাত বছরের মধ্যে পেয়ে সে বছরের মধ্যেই ব্যয় করা হয়েছে এমন যাবতীয় সম্পদ, দাতব্য বা সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, যা জনগণের উপকার ও কল্যাণে নিয়োজিত, সরকারি মালিকানাভুক্ত নগদ অর্থ, সোনা-রুপা এবং অন্যান্য সম্পদ।

কোন কোন সম্পদের জাকাত দিতে হবে

১)   সোনা-রুপা। সোনা-রুপার মধ্যে পিণ্ড আকারে রক্ষিত সোনা-রুপা, সোনা-রুপার বাসন, অলংকার, এসবের বানানোর মূল্য হিসাব করে ৭.৫০ শতাংশ হিসাবে জাকাত দিতে হবে।

২)   নগদ অর্থ। হাতে ও ব্যাংকে রক্ষিত নগদ অর্থ ছাড়াও সঞ্চয়পত্র, সিকিউরিটি, শেয়ার সার্টিফিকেট ইত্যাদি নগদ অর্থ বলে গণ্য হবে।

৩)   ব্যবসার মালামাল। ব্যবসার মালামালের জাকাত নিরূপণকালে বছর শেষে হিসাব সমাপ্তি দিবসে যে সম্পদ থাকবে তা-ই সারা বছর ছিল ধরে নিয়ে তার ওপর জাকাত দিতে হবে।

৪)   কৃষি ফসল। কৃষি ফসলের ক্ষেত্রে প্রতিটি শ্রেণির ফসলের নিসাব পৃথক পৃথকভাবে হিসাব করে নিসাব পরিমাণ ফসল হলে উশর দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, ধান যদি ৩০ মণ বা তার বেশি হয়, পাট  যদি ৩০ মণ বা তার বেশি হয়, তাহলে ফসল তোলার সময়ই তার উশর দিতে হবে। তেমনিভাবে কলাই, সরিষা, মধু ইত্যাদি প্রতিটির নিসাব পৃথকভাবে ধরতে হবে।

৫)   খনিজ সম্পদ। খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে কোনো নিসাব নেই। খনিজ সম্পদ ব্যক্তিমালিকানায় থাকলে সম্পদ উত্তোলনের পরই হিসাব করে জাকাত দিতে হবে। খনিজ সম্পদের জাকাতের হার হচ্ছে ২০ শতাংশ।

৬)   গরু-মহিষ। নিজের কাজে খাটে এবং বিচরণশীল বা ‘সায়েমা’ নয় এমন গরু-মহিষ বাদ দিয়ে ৩০টি হলেই তার ওপর জাকাত দিতে হবে। যাকাতের হার হবে প্রতি ৩০টির জন্য একটি এক বছর বয়সের গরু এবং প্রতি ৪০টি বা তার অংশের জন্য দুই বছর বয়সের একটি গরু।

৭)   ছাগল-ভেড়া। ছাগল-ভেড়ার সংখ্যা ৪০টি হলে একটি, ১২০টি পর্যন্ত দুটি, ৩০০টি পর্যন্ত তিনটি এবং এর ওপরে প্রতি ১০০টি ও তার অংশের জন্য আরো একটি করে ছাগল জাকাত দিতে হবে।

জাকাত কখন দেবেন

জাকাত চান্দ্রবর্ষ অনুসারে দেওয়াই শ্রেয়। এর মধ্যে আবার রমজান মাস হচ্ছে উত্তম। অন্য মাসে কোনো পুণ্যের কাজ করলে যে সওয়াব পাওয়া যায়, রমজান মাসে সেই কাজ করলে আল্লাহ তার অনেক গুণ বেশি সওয়াব দিয়ে থাকেন। সে জন্য রমজান মাসে জাকাত দিলে অন্য মাসের তুলনায় অনেক বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়।

আমাদের দেশে এবং অন্যান্য মুসলিম দেশে ও অনেকেই রমজান মাসে জাকাত দিয়ে থাকেন। কিন্তু সারা বছর জাকাত দিলেও কোনো ক্ষতি নেই। মোট কথা, পরিকল্পিতভাবে জাকাত সংগ্রহ ও ব্যয় বণ্টনের ব্যবস্থা করতে পারলে যেকোনো দেশে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও দুস্থ মানবতার কল্যাণে বিরাট ভূমিকা পালন করা সম্ভব।

জাকাত হিসাব করার তরীকা ও মাসায়েল

১। যে অর্থ/সম্পদে যাকাত আসে সে অর্থ/সম্পদের ৪০ ভাগের ১ ভাগ যাকাত আদায় করা ফরয। মূল্যের আকারে নগদ টাকা দ্বারা বা তা দ্বারা কোনো আসবাবপত্র ক্রয় করে তা দ্বারাও যাকাত দেয়া যায়।

২। জাকাতের ক্ষেত্রে চন্দ্র মাসের হিসাবে বৎসর ধরা হবে। যখনই কেউ নেছাব পরিমান অর্থ/সম্পদের মালিক হবে তখন থেকেই যাকাতের বতসর শুরু ধরতে হবে।

৩। সোনা রূপার মধ্যে যদি ব্রঞ্জ, রাং, দস্তা, তামা ইত্যাদি কোনো কিছুর মিশ্রণ থাকে আর সে মিশ্রণ সোনা রুপার চেয়ে কম হয়, তাহলে পুরোটাকেই সোনা রুপা ধরে যাকাতের হিসাব করা হবে-মিশ্রিত দ্রব্যের কোনো ধর্তব্য হবে না। আর যদি মিশ্রিত দ্রব্য সোনা রুপার চেয়ে অধিক হয়, তাহলে সেটাকে আর সোনা রুপা ধরা হবে না। বরং ঐ মিশ্রিত দ্রব্যই ধরা হবে।

৪। জাকাত হিসাব করার সময় অর্থাৎ, ওয়াজিব হওয়ার সময় সোনা, রুপা, ব্যবসায়িক পণ্য ইত্যাদির মুল্য ধরতে হবে তখনকার (ওয়াজিব হওয়ার সময়কার) বাজার দর হিসাবে এবং সোনা রুপা ইত্যাদি যে স্থানে রয়েছে সে স্থানের দাম ধরতে হবে।

৫। শেয়ারের মূল্য ধরার ক্ষেত্রে মাসয়ালা হল-যারা কোম্পানীর লভ্যাংশ অর্জন করার উদ্দেশ্যে নয় বরং শেয়ার ক্রয় করেছেন শেয়ার বেচা-কেনা করে লাভবান হওয়া এর উদ্দেশ্য, তারা শেয়ারের বাজার দর ধরে যাকাত হিসাব করবেন। আর শেয়ার ক্রয় করার সময় যদি মূল উদ্দেশ্য থাকে কোম্পানী থেকে লভ্যাংশ অর্জন করা এবং সাথে সাথে এ উদ্দেশ্যও থাকে যে, শেয়ারের ভাল দর বাড়লে বিক্রিয় করে দিব, তাহলে যাকাত হিসাব করার সময় শেয়ারের বাজার দরের যে অংশ যাকাতযোগ্য অর্থ/সম্পদের বিপরীতে আছে তার উপর যাকাত আসবে, অবশিষ্ট অংশের উপর যাকাত আসবে না।

উদাহরন স্বরূপ শেয়ারের মার্কেট ভ্যালু (বাজার দর) ১০০ টাকা, তার মধ্যে ৬০ ভাগ কোম্পানীর বিল্ডিং, মেশিনারিজ ইত্যাদির বিপরীতে, আর ৪০ ভাগ কোম্পানীর নগদ অর্থ, কাঁচামাল ও তৈরী মালের বিপরীতে, তাহলে যাকাতের হিসাব করার সময় শেয়ারের বাজার দর অর্থাৎ, ১০০ টাকার ৬০ ভাগ বাদ যাবে। কেননা সেটা এমন অর্থ/সম্পদের বিপরীতে যার উপর যাকাত আসে না । অবশিষ্ট ৪০ ভাগের উপর যাকাত আসবে।

৬। জাকাতদাতার যে পরিমান ঋণ আছে সে পরিমাণ অর্থ বাদ দিয়ে বাকিটার যাকাত হিসাব করবে। ঋণ পরিমাণ অর্থ বাদ দিয়ে যদি যাকাতের নেছাব পূর্ণ না হয় তাহলে যাকাত ফরয হবে না। তবে হযরত মাওলানা মুফতী তাকী উছমানী সাহেব বলেছেন, যে লোন নিয়ে বাড়ি করা হয় বা যে লোন নিয়ে মিল ফ্যাক্টরী তৈরী করা হয় বা মিল ফ্যক্টরীর মেশনারীজ ক্রয় করা হয়, এমনিভাবে যেসব লোন নিয়ে এমন কাজে নিয়োগ করা হয় যার মূল্যের উপর যাকাত আসে না- যেমনঃ বাড়ি ও ফ্যক্টরী বা ফ্যক্টরীর মেশিনারিজের মূল্যের উপর যাকাত আসে না-এসব লোন যাকাতের জন্য বাধা নয়।

অর্থাৎ, এসব লোনের পরিমান অর্থ যাকাত থেকে বাদ দেয়া যাবে না। হাঁ যে লোন নিয়ে এমন কাজে নিয়োগ করা হয় যার উপর যাকাত আসে।

যেমনঃ লোন নিয়ে ফ্যাক্টরীর কাচামাল ক্রয়, এরুপ ক্ষেত্রে এ লোন পরিমাণ অর্থ যাকাতের হিসাব থেকে বাদ যাবে। মুফতী তাকী উছমানী সাহেব তার এ মাসলাটিকে শক্তিশালী যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত করেছেন, অতএব তার এ মতটি গ্রহন করার মধ্যেই সতর্কতা রয়েছে।

৭। কারও নিকট যাকাতদাতার টাকা পাওনা থাকলে সে পাওনা টাকার যাকাত দিতে হবে।

পাওনা তিন প্রকারঃ

(ক) কাউকে নগদ টাকা ঋণ দিয়েছে কিংবা ব্যবসায়ের পণ্য বিক্রি করেছে এবং তার মূল্য বাকী রয়েছে। এরূপ পাওনা কয়েক বছর পর উসুল হলে যদি পাওনা টাকা এত পরিমান হয় যাতে যাকাত ফরয হয়, তাহলে অতীত বতসরসমুহের যাকাত দিতে হবে। যদি একত্রে উসূল না হয়-ভেঙ্গে ভেঙ্গে উসুল হয়, তাহলে ১১ তোলা রূপার মূল্য পরিমাণ হলে যাকাত দিতে হবে। এর চেয়ে কম পরিমাণ উসূল হলে তার যাকাত ওয়াজিব হবে না-তবে অল্প অল্প করে সেই পরিমাণে পৌছে গেলে তখন ওয়াজিব হবে। আর যখনই ওয়াজিব হবে তখন অতীত সকল বতসরের যাকাত দিতে হবে। আর যদি এরুপ পাওনা টাকা নেছাবের চেয়ে কম হয় তাহলে তাতে যাকাত ওয়াজেব হবে না।

(খ) নগদ টাকা ঋণ দেয়ার কারণে বা ব্যবসায়ের পণ্য বাকিতে বিক্রি করার কারণে পাওনা নয় বরং ঘরের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড়, চাষাবাদের গরূ ইত্যাদি বিক্রয় করেছে এবং তার মূল্য পাওনা রয়েছে, এরূপ পাওনা যদি নেছাব পরিমান হয় এবং কয়েক বছর পর উসূল হয় তাহলে ঐ কয়েক বতসরের যাকাত দিতে হবে। আর যদি ভেঙ্গে ভেঙ্গে উসুল হয় তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্য পরিমাণ না হবে ততক্ষন যাকাত ওয়াজিব হবে না। যখন উক্ত পরিমাণ উসূল হবে তখন বিগত বতসর সমূহের যাকাত দিতে হবে।

(গ) মহরের টাকা, পুরষ্কারের টাকা, খালা তালাকের টাকা, বেতনের টাকা ইত্যাদি পাওনা থাকলে এরূপ পাওনা উসূল হওয়ার পূর্বে যাকাত ওয়াজিব হয় না। উসূল হওয়ার পর ১ বতসর মজুদ থাকলে তখন থেকে তার যাকাতের হিসাব শুরু হবে। পাওনা টাকার যাকাত সম্পর্কে উপরোল্লিখিত বিবরণ শুধু তখনই প্রযোজ্য হবে যখন এই টাকা ব্যতীত তার নিকট যাকাতযোগ্য অন্য কোনো অর্থ/সম্পদ না থাকে। আর অন্য কোনো অর্থ/সম্পদ থাকলে তার মাসলা উলামায়ে কেরাম থেকে জেনে নিবেন।

৮। যে ঋণ ফেরত পাওয়ার আশা নেই, এরূপ ঋণের উপর যাকাত ফরয হয় না। তবে পেলে বিগত সমস্ত বতসরের যাকাত দিতে হবে।

৯। যৌথ কারবারে অর্থ নিয়োজিত থাকলে যৌথভাবে পূর্ণ অর্থের যাকাত হিসাব করা হবে না বরং প্রত্যেকের অংশের আলাদা আলাদা হিসাব হবে।

১০। যেসব সোনা রূপার অলংকার স্ত্রীর মালিকানায় দিয়ে দেয়া হয় সেটাকে স্বামীর সম্পত্তি ধরে হিসাব করা হবে না বরং সেটা স্ত্রীর সম্পত্তি। আর যেসব অলংকার স্ত্রীকে শুধু ব্যবহার করতে দেয়া হয়, মালিক থাকে স্বামী, সেটা স্বামীর সম্পত্তির মধ্যে ধরে হিসাব করা হবে। আর যেগুলোর মালিকানা অস্পষ্ট রয়েছে তা স্পষ্ট করে নেয়া উচিত। যেসব অলংকার স্ত্রীর নিজস্ব সম্পদ থাকে তৈরী বা যেগুলো বাপের বাড়ি থেকে অর্জন করে, সেগুলো স্ত্রীর সম্পদ বলে গণ্য হবে। মেয়েকে যে অলংকার দেয়া হয় সেটার ক্ষেত্রেও মায়েকে মালিক বানিয়ে দেয়া হলে সেটার মালিক সে। আর শুধু ব্যবহারের উদ্দেশ্যে দেয়া হলে মেয়ে তার মালিক নয়। নাবালেগা মেয়েদের বিয়ে-শাদি উপলক্ষে তাদের নামে যে অলংকার বানিয়ে রাখা হয় বা নাবালেগা ছেলে কিংবা মেয়ের বিবাহ শাদীতে ব্যয়ের লক্ষ্যে তাদের নামে ব্যাংকে বা ব্যবসায় যে টাকা লাগানো হয় সেটার মালিক তারা।

অতএব সেগুলো পিতা/মাতার সম্পত্তি বলে গণ্য হবে না এবং পিতা/মাতার যাকাতের হিসাবে সেগুলো ধরা হবে না। আর বালেগ সন্তানের নামে শুধু অলংকার তৈরী করে রাখলে বা টাকা লাগালেই তারা মালিক হয়ে যায় না যতক্ষণ না সেটা সে সন্তানের দখলে হয়। তাদের দখলে দেয়া হলে তারা মালিক, অন্যথায় সেটার মালিক পিতা/মাতা।

১১। হিসাবের চেয়ে কিছু বেশি যাকাত দিয়ে দেয়া উত্তম। যাতে কোনো রূপ কম হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে। প্রকৃতপক্ষে সেটুকু যাকাত না হলেও তাতে দানের ছওয়াব তো হবেই।

(অনলাইন ডেস্ক, ঘাটাইল ডট কম)/-

রিলেটেড নিউজ

নতুন ৪ জন সহ টাঙ্গাইলে করোনা আক্রান্ত বেড়ে ১৩৫

নতুন ৪ জন সহ টাঙ্গাইলে করোনা আক্রান্ত বেড়ে ১৩৫

টাঙ্গাইলে নতুন করে আরও চারজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ নিয়ে জেলায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ১৩৫ জনে। জানা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে সদর উপজেলায় দুজন,...

বিস্তারিত
ঘাটাইলে গাজীপুর ফেরত জুলফিকার করোনা আক্রান্ত

ঘাটাইলে গাজীপুর ফেরত জুলফিকার করোনা আক্রান্ত

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার আনেহলা ইউনিয়নে গাজীপুর ফেরত এক যুবকের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। আজ বুধবার (২৮ মে) উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়...

বিস্তারিত
অসহায় মানুষদের জন্য আপনাকে বাঁচতে হবে স্যার

অসহায় মানুষদের জন্য আপনাকে বাঁচতে হবে স্যার

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মহান মুক্তিযুদ্ধের এক কিংবদন্তি যোদ্ধা। রণাঙ্গনে ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন অসংখ্য আহত ও অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধার।...

বিস্তারিত
ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আগুন, ৫ রোগী নিহত

ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আগুন, ৫ রোগী নিহত

ঢাকার গুলশানে ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এতে কমপক্ষে পাঁচজন মারা গেছেন। তারা সবাই করোনার রোগী ছিলেন। নিহতদের মধ্যে চারজন পুরুষ ও একজন...

বিস্তারিত

সাম্প্রতিক প্রকাশনাসমূহ

ফেসবুক (ঘাটাইলডটকম)

Adsense

Doctors Dental

ঘাটাইলডটকম আর্কাইভ

বিভাগসমূহ

Divi Park

পঞ্জিকা

মে 2020
শনি রবি সোম বুধ বৃহ. শু.
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  

Adsense

%d bloggers like this: