সক্ষমতা অব্যবহৃত, তবুও নতুন রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন

বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎকন্দ্রগুলোর স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। আর প্রকৃত উৎপাদনক্ষমতা (ডিরেটেড ক্যাপাসিটি) ১৩ হাজার মেগাওয়াটের মতো। সঞ্চালন সক্ষমতার উন্নয়ন হলেও এর বিপরীতে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন পর্যন্ত ১০ হাজার মেগাওয়াট।

সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত থাকার পরও বেসরকারি খাতে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকন্দ্র অনুমোদন পাচ্ছে। এসব কেন্দ্র থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয়ে লোকসান বাড়ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি)। এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মোট প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইনের আওতায় দরপত্র ছাড়াই অনুমোদন পাচ্ছে নতুন এসব বিদ্যুৎকন্দ্র। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকেও ২০০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্রের সঙ্গে বাস্তবায়ন ও ক্রয় চুক্তি করেছে বিপিডিবি। সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ীতে পাঁচ বছর মেয়াদি এ বিদ্যুৎকন্দ্র নির্মাণ করবে যৌথভাবে প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল ও বাংলাট্র্যাক লিমিটেড। ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্রটি থেকে বিপিডিবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনবে ২৫ সেন্ট বা ১৯ টাকা ৬৭ পয়সায়।

এছাড়া মার্চের প্রথম সপ্তাহে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক ১৬২ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি রেন্টাল বিদ্যুৎকন্দ্রের অনুমোদন পেয়েছে চ্যাং জু কোল পাওয়ার লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির স্থানীয় পার্টনার হিসেবে রয়েছেন তাহজিব আলম সিদ্দিকী এমপি ও নাইমুর রহমান দুর্জয় এমপি। মানিকগঞ্জে স্থাপনের অনুমোদন পাওয়া ১৮ বছর মেয়াদি কেন্দ্রটি থেকে ইউনিটপ্রতি ৮ টাকা ৭৪ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কিনবে বিপিডিবি।

বেশ কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকন্দ্রের নির্মাণ পিছিয়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে নতুন এসব কেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলে দাবি বিপিডিবির। এসব বড় বিদ্যুৎকন্দ্রের মধ্যে রামপাল ও মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকন্দ্র অন্যতম।

বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ বণিক বলেন, নির্ধারিত সময়ে বেশকিছু বিদ্যুৎকন্দ্র থেকে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য মধ্যবর্তী ব্যবস্থা হিসেবে দ্রুততম সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে এসব কেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। বড় বিদ্যুৎকন্দ্রগুলোর নির্মাণ সম্পন্ন হলে এ ধরনের সংকট থাকবে না।

গত বছরের নভেম্বরেও বেসরকারি খাতে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক তিনটি বিদ্যুৎকন্দ্রের সঙ্গে বাস্তবায়ন ও ক্রয় চুক্তি করেছে বিপিডিবি। মোট ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এসব বিদ্যুৎকন্দ্রের ৩০০ মেগাওয়াটই আসবে কুইক রেন্টাল থেকে। তিনটি কেন্দ্রের মধ্যে দুটি স্থাপন করবে বাংলাট্র্যাক ও একটি অ্যাকর্ন গ্রুপ। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাট্র্যাকের বিদ্যুৎকন্দ্র দুটির একটি স্থাপন হবে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে, অন্যটি যশোরের নওয়াপাড়ায়। ২০০ ও ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্র দুটি থেকে বিপিডিবি বিদ্যুৎ কিনবে প্রতি ইউনিট ২৫ দশমিক ৪১ সেন্ট বা ১৯ টাকা ৯৯ পয়সা দামে।

গত বছরের আগস্টে অনুমোদন দেয়া হয় ডিজেলভিত্তিক আরো দুটি বিদ্যুৎকন্দ্র। দুটি কেন্দ্রই পাঁচ বছর মেয়াদি। এর মধ্যে ঢাকার কেরানীগঞ্জে হাইস্পিড ডিজেলভিত্তিক (এইচএসডি) ৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকন্দ্রের অনুমোদন পেয়েছে এপিআর এনার্জি। কেন্দ্রটির উৎপাদিত বিদ্যুতের মূল্য হবে প্রতি ইউনিট ১৯ টাকা ৯৯ পয়সা।

কেরানীগঞ্জে এইচএসডিভিত্তিক মোট ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকন্দ্র স্থাপন করবে অ্যাগ্রেকো ইন্টারন্যাশনাল প্রজেক্টস। এ কেন্দ্রে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১৯ টাকা ৬৭ পয়সায় কিনবে বিপিডিবি।

ডিজেলের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক একাধিক বিদ্যুৎকন্দ্রও গত বছর অনুমোদন পেয়েছে। এর একটি অ্যাকর্ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার সার্ভিস লিমিটেডের ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকন্দ্র। চট্টগ্রামের জুলদায় এ কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৮ টাকা ২৬ পয়সায় কেনার চুক্তি করেছে বিপিডিবি। ১৫ বছর মেয়াদি কেন্দ্রটি চলতি বছরের মে মাসে উৎপাদনে আসার কথা।

জানা গেছে, বর্তমানে উৎপাদিত বিদ্যুতের ১৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ আসছে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে। আর ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন হচ্ছে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ। উৎপাদিত বিদ্যুতের ৬৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ আসছে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে। এছাড়া ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ বিদ্যুৎ ভারত থেকে আমদানি করা হচ্ছে। বাকি বিদ্যুৎ আসছে কয়লা ও নবায়নযোগ্য উৎস থেকে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও চাহিদা সে তুলনায় বাড়ছে না। ২০১০ সালে প্রণীত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা মহাপরিকল্পনায় ২০১৫ সাল নাগাদ দেশে বিদ্যুতের চাহিদা নিরূপণ করা হয়েছিল ১০ হাজার ২৮৩ মেগাওয়াট। তবে সে হারে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়েনি। মূলত শিল্প খাতের শ্লথ চাহিদা সামগ্রিকভাবে বিদ্যুতের চাহিদার এ প্রক্ষেপণে প্রভাব ফেলেছে।

২০১৬ সালের মহাপরিকল্পনায় দেখা গেছে, প্রকৃতপক্ষে ২০১৫ সালে বিদ্যুতের চাহিদা ৭ হাজার ৮১৭ মেগাওয়াটে গিয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে সাব স্টেশন পর্যায়ে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ৮ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটের মতো।

তার পরও বেসরকারি খাতে উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎকন্দ্র অনুমোদনের বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে এসব কেন্দ্রের প্রয়োজন হতো না। প্রায় এক দশক আগে কুইক রেন্টাল চালুর যেসব যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়েছে, এখনো একই যুক্তিতে স্বল্পমেয়াদি নতুন এসব কেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। একইভাবে আগের বিদ্যুৎকন্দ্রগুলোরও চুক্তি নবায়ন করা হচ্ছে। এগুলো খাতটির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে উৎপাদনে রয়েছে বেসরকারি খাতের ৩২টি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকন্দ্র। এর মধ্যে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকন্দ্রের সংখ্যা ১৮। বাকিগুলো রেন্টাল। এসব কেন্দ্র থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনায় লোকসান বাড়ছে বিপিডিবির।

সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরও প্রতিষ্ঠানটি লোকসান দিয়েছে ৪ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। আর এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। আর ২০৩০ সাল নাগাদ ৪০ হাজার ও ২০৪১ সাল নাগাদ ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

(সুমন আফসার, বনিকবার্তা/ ঘাটাইল.কম)/-