শুভ জন্মদিন যুবদল

বিএনপির সহযোগী সংগঠন যুবদলের ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ ২৭ অক্টোবর। ১৯৭৮ সালের এই দিনে যুবদল প্রতিষ্ঠা করেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সংগঠটির গঠনতন্ত্রে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—উৎপাদনমুখী রাজনীতি, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও গণতন্ত্রের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা, মানবকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জাতীয় সমৃদ্ধি অর্জনে প্রত্যেক স্তরে সৎ, মেধাবী ও নিঃস্বার্থ যুবকদের সমন্বয়ে আদর্শবান নেতৃত্ব গড়ে তোলা।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ‘আমরা একটা প্রতিকূল অবস্থা মোকাবিলা করছি। আমাদের কমিটি গঠনের পরে আমি নিজেই ১৩ মাস জেলে ছিলাম। একটা দেশে যখন স্বাভাবিক পরিবেশ থাকে, তখন সমাজ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করা যায়। কিন্তু গত ৬ বছর ধরে দেশে অবৈধ ও ফ্যাসিস্ট সরকার রয়েছে। যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো হরণ করা হয়েছে। ফলে আমরা দেশে সুশাসন, মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন করে যাচ্ছি।’

টুকু আরও বলেন, ‘আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্ত করাসহ অবৈধ সরকারকে হটিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা যুবদলের মূল লক্ষ্য।’

তবে, নিজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে নেন সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন হাসান। তিনি বলেন, ‘আমাদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কিছুই করতে পারিনি, এটা বলতে পারেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে সংগঠনটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, ‘গত ১২ বছর দেশের কী অবস্থা তা আপনারা জানেন। বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে আমরা যুব সমাজকে বিভিন্ন কাজে লাগাতে পারতাম, তাদের কর্মদক্ষতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতাম। কিন্তু দল ক্ষমতায় না থাকায় এখন সেই সুযোগ নেই আমাদের।’

জানা গেছে, ২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারি পূর্ববর্তী কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম নীরবকে সভাপতি ও বিএনপির বর্তমান সহ-ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে সাধারণ সম্পাদক করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট যুবদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। তিন বছর মেয়াদি এই কমিটির বয়স ৩৪ মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সংগঠনটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারেননি দায়িত্বপ্রাপ্তরা। সর্বশেষ গত ৯ অক্টোবর যুবদলের ৫ নেতার সঙ্গে স্কাইপে বৈঠক করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেই বৈঠকে তিনি ২০ অক্টোবরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে নির্দেশ দেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা দিতে পারেনি যুবদল।

তারেক রহমানের বেঁধে দেওয়া তারিখের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ‘আপনি হয়তো ভুল শুনেছেন, তিনি কমিটি গঠন নিয়ে নির্দিষ্ট কোনও তারিখ বেঁধে দেননি। বলেছেন, দ্রুত কমিটি দিতে। আশা করি এক মাসের কম সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারবো আমরা।’

তবে মামুন হাসান বলেন, ‘ত্যাগী, পরীক্ষিত ও রাজপথের নেতাদের নিয়ে যুবদলের কমিটি হবে। সেটা যাচাই-বাছাই করতে সময় লাগছে। এ কারণে ২০ অক্টোবরের মধ্যে কমিটি ঘোষণা করতে পারিনি। সময় বাড়ানোর জন্য তারেক রহমানকে অনুরোধ করেছি। তিনি সেটা অনুমোদন করেছেন। আশা করি শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারবো।’

সংগঠনটির পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীরা বলছেন, যুবদলের গত কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক থাকা অবস্থায় সাইফুল আলম নীরবের নিজস্ব বলয় ছিল। এখন পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে তিনি নিজের আস্থাভাজনদের রাখতে চান। অন্যদিকে, ছাত্রদলের সভাপতি থাকা অবস্থায় সুলতান সালাউদ্দিন টুকু তার নিজস্ব একটি বলয় তৈরি করেছেন। তিনি আস্থাভাজনদের কমিটি করতে চান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক পদপ্রত্যাশী বলেন, ‘এই দুই নেতার দ্বন্দ্বের কারণে পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয় না। এ কারণে নেতাকর্মীরা ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন বা বিএনপির কর্মসূচিতে অংশ নেন না। কারণ, আন্দোলন করতে গিয়ে কোনও নেতাকর্মী গ্রেফতার হলে তখন তার রাজনৈতিক পরিচয় কী হবে? পদ-পদবি থাকলে নেতাকর্মীরা সেটা বাঁচানোর জন্য হলেও মাঠে নামতো।’

নিজেদের দ্বন্দ্বের কথা অস্বীকার করেন সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তিনি বলেন, ‘আমাদের কমিটি হওয়ার আগে থেকে খালেদা জিয়াকে সপ্তাহে ৩-৪ দিন আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে। তখন আদালতে আসা-যাওয়ার পথে সময় চলে গেছে। এরপর তিনি গ্রেফতার হলে আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে কখনও আমি, কখনও সভাপতি গ্রেফতার হয়েছেন। ফলে চাইলেও আমরা কমিটি দিতে পারিনি।’

যুবদল সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৮ সালে আবুল কাশেমকে আহ্বায়ক করে যুবদলের কমিটি গঠন করা হয়। এরপর আবুল কাশেমকে সভাপতি ও সাইফুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠন করা হয়। এরপর ১৯৮৭ সালের ২৩ মার্চ কাউন্সিলের মাধ্যমে যুবদলের সভাপতি মির্জা আব্বাস ও সাধারণ সম্পাদক গয়েশ্বর চন্দ্র নির্বাচিত হয়। ১৯৯৩ সালের ৮ অক্টোবর কাউন্সিলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এই দুইজন আবার যুবদলের যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০২ সালে বরকতউল্লাহ বুলুকে সভাপতি ও মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকে সাধারণ সম্পাদক করা হয় যুবদলের।

এরপর ২০১০ সালের ১ মার্চ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও সাইফুল আলম নীরবকে যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করে যুবদলের কমিটি গঠন করা হয়। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারি সাইফুল আলম নীরবকে সভাপতি ও সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে সাধারণ সম্পাদকে করে যুবদলের কমিটি ঘোষণা করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

যুবদলের প্রথম আহ্বায়ক আবুল কাশেম এখন বিএনপির কোনও পর্যায়ের রাজনীতিতে নেই। আর প্রথম সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান যুবদলে থাকার সময়ই জাতীয় পার্টিতে চলে যান। মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে আছেন। তাদের পরবর্তী কমিটির সভাপতি বরকতউল্লাহ বুলু বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আর সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

যুবদলের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতা প্রসঙ্গে সংগঠনটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘বর্তমান যুবদল কেন, বর্তমান ছাত্রদল বা যেকোনও বিরোধী রাজনৈতিক দল জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সফলতা দেখাতে সক্ষম হয়নি। এটা যে তাদের নেতৃত্বের ব্যর্থতা তা নয়, বর্তমানে যে পরিবেশ দেশে বিরাজ করছে তাতে কাজ করার ন্যূনতম সুযোগ নেই। ফলে এখানে নেতৃত্বের মাপকাঠি কীভাবে বিচার করা হবে।’ ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকলে নেতাকর্মীরা কিছুই করতে পারেন না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

(অনলাইন ডেস্ক, ঘাটাইলডটকম)/-