লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হোক

১.

সমগ্র বিশ্বে ছাত্ররা জাতি গঠনে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশেও সেই ব্রিটিশ আমল থেকে ছাত্ররা জাতি গঠনে বিভিন্নভাবে ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ’৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন; সর্বোপরি স্বাধীনতা আন্দোলনে এ দেশের ছাত্ররা গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে। স্বাধীনতার পরও জাতীয় স্বার্থে ছাত্ররা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠেছে। বিশেষ করে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে, নব্বইয়ের গণআন্দোলন।

কিন্তু দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির ফলে একদিকে যেমন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাস্তানি ইত্যাদির কারণে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে; অন্যদিকে একটি খুনোখুুনির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যার সর্বশেষ বলি বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার।

সোনিয়া নামের মেধাবী ছাত্রী ২০০৪ সালে এ বুয়েটেই নিহত হয়েছেন।

আবরার হত্যার পর অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী, আইনুন নিশাত, অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামসহ অনেক বিশিষ্টজন লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে মত প্রকাশ করেছেন।

১৯৭২ সালে মুহসীন হলে সাত মার্ডারসহ শতাধিক ছাত্র খুনের শিকার হন। ১৯৮৪-৮৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলে থাকার সময় লেখাপড়ার পরিবর্তে ছাত্র রাজনীতির সন্ত্রাস ও মাস্তানরূপ দেখার সুযোগ হয়েছে।

২.

স্বাধীনতার পর থেকেই দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি জাতীয় উন্নয়নে অগ্রসরতার চেয়ে অনগ্রসরতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বর্তমানে প্রকট আকার ধারণ করেছে।

ছাত্ররা নিকট অতীতে ভ্যাট-বিরোধী আন্দোলন, কোটাবিরোধী আন্দোলন, ট্রাফিক-বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ধর্ষণের বিরুদ্ধে ছাত্ররা জেগে উঠেছে, আন্দোলন করেছে এবং করছে।

এখানে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজন হয়নি। জাতীয় যে কোনো প্রয়োজনে ছাত্ররা জেগে উঠবে, এটাই আমাদের ইতিহাস।

অতএব জাতীয় স্বার্থে এখনই এ নষ্ট দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হওয়া জরুরি।

৩.

সংকীর্ণ ও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝতে অক্ষম যে, দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি জাতির ভয়াবহ ক্ষতির কারণ।

দলীয় ছাত্র রাজনীতির অনিবার্য ফলস্বরূপ অনেক শিক্ষকও দলীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। এ নষ্ট ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতির কারণে শিক্ষার মান তলানিতে। বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে, প্রতিযোগিতায় আমরা অনবরত পিছিয়ে যাচ্ছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এখন র‌্যাংকিংয়ে বিশ্বের ১ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ ধরনের ছাত্র রাজনীতির কারণে শিক্ষার মান উন্নয়ন না করে, গবেষণা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে  প্রতিযোগিতা না করে, সভ্যতা-ভদ্রতা-নম্রতা চর্চা না করে, গুটিকয় ছাত্রনেতা ও শিক্ষক জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে ব্যতিব্যস্ত।

এ কথা বলা প্রয়োজন যে, রোগটি মূলত মূল রাজনৈতিক নেতৃত্বের মেধা, দূরদর্শিতা ও অপরিণামদর্শিতার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

৪.

ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে অনেক ভালো নেতা জাতি পেয়েছে সত্য, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য সাধারণ মানুষ ছাত্রনেতাদের আর সম্মানের চোখে দেখে না, ভয় পায়।

কেউ কেউ ছাত্র রাজনীতি থেকে আসা ভালো-মন্দ, অনৈতিক, চরিত্রহীন, দুর্নীতিবাজসহ সবাইকে গণহারে ছাত্র রাজনীতির সোনালি ফসল বলে আখ্যা দিতে চায়।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বলে বলীয়ান হয়ে এরা কমবেশি যেসব ফসল উৎপাদন করে তা হলো লেখাপড়া না করা, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ফাও খাওয়া, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, ভাড়া খেটে জমি দখল, টাকা আদায়, ধর্ষণে সেঞ্চুরি করা, দুর্নীতির মাধ্যমে ১২০টি ফ্ল্যাটের মালিক, নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দেওয়া, অনৈতিকতায় সিদ্ধহস্ত হওয়া, ক্যাডারবাজি, বেয়াদবি, অনৈতিকতা ও সন্ত্রাস সমাজে সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া, দুর্বৃত্ত রাজনীতিকদের দুর্বৃত্তপনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া, সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি ইত্যাদি।

ছাত্রদের প্রধান কাজ লেখাপড়া করা। জীবনযুদ্ধে জ্ঞান অর্জন করে আন্তর্জাতিক মান অর্জন করা। একই সঙ্গে সভ্যতা, ভদ্রতা, নম্রতা, সংস্কৃতি শিখে নেওয়া। নৈতিকতাহীন জীবন তো পশুর জীবন।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দলীয় রাজনীতিতে জড়িত ছাত্ররা এখন আর জাতীয় স্বার্থের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে, গণতন্ত্র, সুশাসনের পক্ষে মাঠে নামে না। বরং দুর্নীতিবাজ, দুর্বৃত্তদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৫.

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সন্ত্রাস ও অনৈতিকতার হাতেখড়ি এখানেই, যা রাষ্ট্রের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমান লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির কারণে একদিকে যেমন তারা জ্ঞান অর্জনে অত্যন্ত নিম্নগামী অন্যদিকে চাঁদাবাজি ও সম্পত্তি লোভের কারণে অনৈতিকতার শিক্ষা গ্রহণ করে।

ফলে এসব ছাত্রের বেশির ভাগ শিক্ষাগত নিম্নমান ও অনৈতিকতা নিয়ে প্রশাসন, শিক্ষা, নেতৃত্বসহ সমগ্র সমাজে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই উক্ত নিম্নমান ও অনৈতিকতা পরিচর্যা চালিয়ে যেতে থাকে।

সন্ত্রাস ও অনৈতিকতাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে বেছে নেয়। ফলে জাতীয় নৈতিকতা তলানিতে এবং এটাই হলো সমাজ ও রাষ্ট্রের অনগ্রসরতার মূল কারণ।

৬.

বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এমনকি ভারতেও এর উদাহরণ নেই। ছাত্র রাজনীতি নেতা তৈরির একমাত্র কারখানা হলে, পৃথিবীর অন্য দেশসমূহে নেতৃত্ব আসে কীভাবে?

নেতৃত্ব যে কোনো জায়গা থেকেই আসতে পারে, একাংশ ছাত্র রাজনীতি থেকেও আসবে। ইতিহাস বলে, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি নেতৃত্ব এসেছে সশস্ত্র বাহিনী ও আইন পেশা থেকে।

উদাহরণস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪ জন প্রেসিডেন্টের মধ্যে ৩৪ জন সশস্ত্র বাহিনীর চাকরি করেছেন। এ ৩৪ জন কিন্তু সামরিক শাসনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট হননি। তারা অবসরের পর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। ফ্রান্সের চার্লস ডাগল, তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ন, সুহার্ত, দক্ষিণ কোরিয়ার পার্ক চুং-হি ইত্যাদি।

আমাদের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন জেনারেল, যিনি ২৩টি বড় যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন। অন্যদিকে ছিলেন শাসক।

আবার এ কে ফজলুল হক, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, জওহরলাল নেহরু, টনি ব্লেয়ার, বিন ক্লিনটন ছিলেন আইন পেশার লোক।

৭.

কেহই ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে নয়। দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে। দলীয় ছাত্র রাজনীতি যদি জাতি গঠনে এতটাই প্রয়োজন হতো তাহলে উন্নত দেশে এ ধরনের ছাত্র রাজনীতির চর্চা দেখা যেত।

উন্নত দেশের ছাত্র রাজনীতির মূল কার্যক্রম আবর্তিত হয় শিক্ষামূলক কার্যক্রম নিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশের দুর্বল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এখন পর্যন্ত এ বাস্তবতা অনুধাবন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন।

অতএব জাতীয় স্বার্থে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি এখনই বন্ধ হওয়া উচিত।

(ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেন, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, সাবেক সেনা কর্মকর্তা)/-

Print Friendly, PDF & Email