রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে দেখা, পর্ব-১

দেশ বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের অাশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ জাতিসংঘ, বিশ্বের কয়েকটি রাষ্ট্র ও শতাধিক দাতা সংস্থার সহায়তায় যেভাবে প্রতিপালন করছে তা সীমাহীন প্রশংসনীয়। অার্তমানবতার সেবায় এর চেয়ে নজির, প্রকৃষ্ট উদাহরণ অার হতে পারে না। খাদ্য, বস্ত্র ও অাশ্রয় মানুষের এই তিন মৌলিক প্রয়োজন মিটানোর পরও একজন মানুষ তথা নাগরিকের শিক্ষা, চিকিৎসা প্রয়োজন। বাংলাদেশ জাতিসংঘ, দাতা সংস্থাগুলোর সহায়তায় রাষ্টীয় জনবল খাটিয়ে তাই করে যাচ্ছে। উপরন্তু উন্নত দেশের মতোই ব্যবহার্য জিনিষপত্র, শিশুদের ভালো খাবার, খেলাধুলার সরঞ্জাম সরবরাহ করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে অাপাত দৃষ্টিতে তারা ভালোই অাছে।

কিন্তু অনেকের দূঃখ অার পরিতাপের শেষ নেই। জন্মভূমির মায়া, হারিয়ে অাসা স্বজন, ফেলে অাসা সাজানো গুছানো সংসার, সামাজিক ও পেশাগত অবস্থান সবকিছুই অাজ স্মৃতিপটে ভেসে উঠে অার পীড়া দেয়।

উচু পাহাড়ের চুড়ায় ঝুপরি ঘরে বসে ৭০ বছরের বৃদ্ধা অায়মনা বিবি গালে হাত দিয়ে ভাবছে স্বজন হারানো অার ফেলে অাসা দিনের স্মৃতি। পাহাড়ের চুড়ায় উঠা নামা তার ভীষন কষ্ট, এর উপর সামনে বৃষ্টির দিনের দূর্গতির চিন্তায় সে মগ্ন।

জীবন বাঁচাতে চলে অাসা অনেকে জনপ্রতিনিধি, চাকুরীজীবি, ব্যবসায়ী অার কৃষিকাজে অবস্থাসম্পন্ন। তাদের অনেকরই ছিল স্বচ্ছল সুখের সংসার । অত্যাচারে, নিধনে দেশ বিতাড়িত হয়ে সব ফেলে এসে অাজ এখানে অাশ্রয়ে সবার সাথে হয়ে গেছেন শরনার্থী। নিরাপদ অারামের ঘরবাড়ি ফেলে এখানে বাস হয়েছে ঝুপরিতে। দিতেন শিক্ষা, করতেন সহায়তা, অাজ জীবন বাঁচাতে এখানে হাত পাতা। শত দুঃখ পরিতাপেও তারা বাংলাদেশ সরকার, সেবাদানকারী বাহিনী ও এদেশের মানুষকে সাধুবাদ জানায়, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

এখনো বাংলা ভালোভাবে রপ্ত করতে পারেনি ইংরেজীতেও খুব কাঁচা, স্থানীয় একজনের সহায়তায় তালহা নামের একজন অালাপচারিতায় জানায়, মিয়ানমারে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে তার চাকুরী ছিল। বাড়ীতে কৃষিকাজে ছিল ভালো অবস্থা। সবমিলিয়ে বাবা মা, স্ত্রী, দু’ সন্তান নিয়ে সুখের সংসার ছিল। বৃদ্ধ পিতাকে পিছনে ফেলে জীবন বাঁচাতে মা স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে চলে এসেছে। পিতা অাসতে পেরেছে, না মিয়ানমার জান্তার হাতে নিহত হয়েছে সে খবর অাজও সে জানতে পারেনি। তাই ক্যাম্পের প্রতি ঝুপরি ঘরে সে খুঁজে বেড়ায় বৃদ্ধ পিতাকে।

৩৫ বছর বয়সের দুলু বেগম বেশ পর্দানশীল। তার সাথে অামাদের দেখা হয় উখিয়ার বালুখালীতে, চাউল ও অন্যান্য জিনিষপত্র নিয়ে যাওয়ার সময়। জিজ্ঞাসাবাদে সে বলে, দেশে (মিয়ানমারে) তাদের ভালো অবস্থা ছিল, চাষাবাদের সাথে ছিল মাছের চাষ। ৩ সন্তানের ২ জন স্কুলে লেখাপড়া করত। স্বচ্ছলতায় বেশ সুখের সংসার ছিল তাদের। জীবন বাঁচাতে সব ফেলে চলে এসেছে। দেশ অার সংসারের প্রতি মায়া থাকলেও হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞের কথা মনে করে, নিরাপদ নিশ্চয়তা না পেয়ে ফিরে যেতে মন সায় দেয় না।

ছানিয়া ও সালেহা দুই বোন। ছানিয়া তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ত। ছোটবোন সালেহা সবে স্কুলে যাতায়াত করত। বাবা মার কাজে সংসার ভালোই চলত, এখানে একটু ভালোভাবে চলতে ওরা পান বিক্রি করে। চোখে মুখে বেদনা অার হতাশার ছাপ। পড়ার ও খেলার সাথীদের জন্য মন কাঁদলেও হত্যাযজ্ঞের দৃশ্য চোখে ভেসে উঠলে অার ফিরে যেতে মন চায় না।

অচেনা অজানা জায়গায় অামাদেরকে ঘুরতে বনবিভাগের পরিচালক সামাজিক বনায়ন ড. জহিরুল হক, অবঃরেঞ্জার ঘনিষ্ঠজন কামরুল মুজাহিদ , উখিয়া রেঞ্জ প্রধান মুনির ভাই’র সহায়তায় বালুখালী বিটকর্মকর্তা মোবারক ভাই সর্বাত্মক সহায়তা করায় তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

রোহিঙ্গাদের অাশ্রয় ও প্রতিপালন করে বাংলাদেশ মানবতার সেবায় বিশ্বে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কিন্তু এতে অামাদের কি অপূরনীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে ও হচ্ছে এবং কি প্রকট সমস্যায় নিমজ্জিত হচ্ছে, তা ধারাবাহিকের এক পূর্বে প্রকাশের চেষ্টা করব।

  • দ্বিতীয় পর্বের জন্য ঘাটাইল.কমের সাথে থাকুন।

(এম এ রউফ, ঘাটাইল.কম)/-