রাণীনগরে ৪৮ বছরের সংগ্রামে ১০ নারী পাচ্ছেন বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি

মহান স্বাধীনতা পরবর্তী ৪৮ বছর সংগ্রামের পর নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার মিরাট ইউনিয়নের আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামের ১০ জন বীরাঙ্গনা মহিলা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্টীয় স্বীকৃতি ও আর্থিক সুযোগ সুবিধার গেজেট প্রকাশ হওয়ায় জীবনের শেষ মহুর্তে তাদের মুখে এখন হাসির ঝিলিক। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে নিজেদের স্বজন, পাড়া প্রতিবেশিদের জীবন, সম্ভ্রম ও সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে এ দেশীয় রাজাকার আলবদরদের সহযোগীতায় পাক হানাদার বাহিনীরা দিনভর পৈশাচিক নির্যাতন, খুন, লুটপাট, ভাংচুড়, অগ্নিসংযোগসহ নানা রকমের নির্যাতন চালিয়ে ৫২ জন মুক্তিকামি ব্যক্তিকে প্রকাশ্য দিবালোকে এক ঘরের বারান্দায় সারিবদ্ধ করে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে পাক সেনারা।

১৯৭১ সালে দেশ ও মার্তৃকার টানে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আতাইকুলা পাল পাড়া গ্রামের নারীরা বীরোত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও নানান কারণে রাষ্টীয় সম্মান মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি তাদের ভাগ্যে জোটেনি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ক্ষমতায় আসার পরও নানা চরাই-উতরায় পার করে কপালে জুটেছে রাষ্টীয় স্বীকৃতি।

আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামের এই ১০ বীরাঙ্গনা মহিলা মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে বাণী রানী পাল, ক্ষান্ত রাণী, রেনু বালা, সুসমা বালা ইতিমধ্যেই মারা গেছে। এখনও ধুকে দুখে বেঁচে আছেন মায়া সূত্রধর, রাশমুনিপাল, কালিদাসি পাল, সন্ধ্যা রাণী পাল, গীতা রাণী পাল।

উত্তর জনপদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক প্রয়াত আব্দুল জলিলের জন্মভূমি জেলা নওগাঁর রাণীনগরে ১০জন বীরাঙ্গনার নাম তালিকাভূক্ত হওয়ায় পরিবার ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা বেশ খুশি।

রাণীনগর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে নওগাঁর ছোট যমুনা নদীর তীরে সবুজ গাছপালার ছায়া ঘেরা শান্ত আতাইকুলা পালপাড়া গ্রাম। ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল পাক হানদার বাহিনীর স্থানীয় দোসর রাজাকার আলবদরদের প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় প্রকাশ্য দিবালোকে ওই দিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত বিভর্ষ অপকর্ম চালায়। এই সময় গনহত্যা, নারী নির্যাতন, অগ্নীসংযোগ, লুটপাটসহ জঘন্যতম ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে সংখ্যালঘু পরিবারের কিশোর, যুবক, মাঝ বয়সী, ও বিভিন্ন বয়সী নারীদেরকে ধরে আতাইকুলা গ্রামের যোগেন্দ্রনাথ পালের বাড়ির বারান্দায় জরো করে ”জয়বাংলা বলতে হ্যায় নৌকামে ভোট দিতে হ্যায়” এভাবে পাক সেনারা ব্যাঙ্গাত্তো উক্তি করতে করতে ব্রাশফায়ার করে গবীন্দ চরণ পাল, সুরেশ্বর পাল, বিক্ষয় সূত্রধর, নিবারন পালসহ ৫২ জন মুক্তি কামীকে নির্বিচারে হত্যা করে।

এ সময় পাক হানদার বাহীনি গণহত্যা, লুটপাট ও নারী নির্যাতনের মতো ধ্বংস লীলা থেকে বিশেষ করে নারীরা স্বামী সন্তানদেরকে প্রাণে বাঁচানোর শেষ আকুতি করেও পাক-জান্তাদের মন গলাতে পারেনি। উল্টো হায়েনারা সুযোগ বুঝে নারীদের উপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে নওগাঁ জেলা সদরে পাক সেনাদের স্থাপিত ক্যাম্পের উদ্দেশে চলে যায়। ৫২ শহীদের তাজা রক্তে সে দিন নওগাঁর ছোট যমুনা নদীর পানি লাল হয়ে ভাসিয়ে যায়। নির্যাতিত নারী ও স্বজনদের হৃদয় বিদারক আর্তনাত ও কান্নায় আকাশ ভারী হয়ে উঠে। সেই সময়ের ১০ বীরাঙ্গনা আজ মহিলা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেল। খুব তারাতারি তাদের পাওনা আর্থিক সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হবে বলে জানা গেছে।

শহীদ পরিবারের সদস্য গৌতুম পাল জানান, আমাদের আতাইকুলা পাল পাড়া গ্রামের ১০ বীরাঙ্গনা মহিলা মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতিসহ বদ্ধভূমি সংরক্ষন, স্মৃতিস্তম্ভ নির্মানে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ, শহীদ-হিসাবে নিহতদের নাম গেজেটে অন্তর্ভূক্তিসহ পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সাহায্য প্রদান, শহীদ পরিবার হিসাবে স্বীকৃতি দান। এমন খবর পেয়ে আমরা শহীদ পরিবারের সদস্যরা অনেক খুশি।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সাবেক কমান্ডার ইসমাইল হোসেন জানান, ১০ বীরাঙ্গনাকে মহিলা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি ও বদ্ধভূমি সংরক্ষণের অনুমোদন গত ২৯ জুলাই হয়েছে। তাদের রাষ্টীয় সুযোগ সুবিধা প্রদানের ও নির্দেশনা আমরা পেয়েছি। অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের এই আর্থিক সুযোগ-সুবিধা হাতে তুলে দেওয়া হবে।

(রাজেকুল ইসলাম, রাণীনগর, নওগাঁ/ ঘাটাইলডটকম)/-