রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে ছিলেন

জুলা ১, ২০২০

… তাকে (খান মোহাম্মদ শামসুর রহমান ওরফে ডক্টর জনসন, সিএসপি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী) জিজ্ঞেস করেছিলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্বর্ণযুগ’ বা সেরকম কোন গৌরবদীপ্ত সময় হিসেবে কোনো মেয়াদকে চিহ্নিত করা যায় কিনা। তখন শামসুর রহমান এক কথায় কোন জবাব দেননি। তবে একটু পূর্বকথার মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালীন ঝগড়া-ফ্যাসাদ সম্বন্ধে আলোকপাত করেছিলেন।

ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবির পেছনে অনেক রকমের যুক্তি তুলে ধরা হয়েছিল। তবে ইংরেজ শাসকদের কাছে অন্য সব যুক্তি ছাপিয়ে রাজনীতির যুক্তিটাই ছিল প্রবলতম। আর কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের প্রধান দৃষ্টিভঙ্গিটাও ছিল রাজনৈতিক। আন্তর্জাতিক ব্যাপ্তির খ্যাতি অর্জনকারী একমাত্র বাঙ্গালী মনীষী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ঢাকায় প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে জোরেসোরে অভিমত দিয়েছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য উপযুক্ত শিক্ষক পাওয়া যাবে কিভাবে তা নিয়ে তিনি ঘোর সন্দিহান ছিলেন।

এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে পড়ল হিন্দুরা। ১৯১২ সালের ২৮শে মার্চ কলকাতায় গড়ের মাঠে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে তারা সভা করল। এই সভায় সভাপতিত্ব করলেন স্বয়ং কবি রবীন্দ্রনাথ।

[দ্রষ্টব্য : অধ্যাপক আব্দুন নুর (চ.বি) / ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সিলেবাস বিতর্ক এবং অতীত ষড়যন্ত্রের কাহিনী – দৈনিক সংগ্রাম, ২৬ এপ্রিল, ১৯৯৩ইং]

বিস্ময়ের ব্যাপার, পূর্ববঙ্গে যে রবীন্দ্রনাথের বিশাল জমিদারি ছিল, সে রবীন্দ্রনাথও তার মুসলিম প্রজারা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে শিক্ষিত হোক তা চাননি।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মহল হতে ছিল সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধকতা। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখার্জীর বিরোধিতা ছিল একেবারে সর্বজনবিদিত ও অতি প্রকাশ্য। এক্ষেত্রে তার পরম সুহৃদ ও বন্ধু পন্ডিত মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ছিলেন একাট্টা। কিন্তু অবশেষে ঢাকায় যখন বিশ্ববিদ্যালয় হয়েই গেল তখন এর ভাইস-চ্যান্সেলর হার্টগের মেধা-শিকারযজ্ঞের প্রথম দিকের পাত্রই হয়ে গেলেন এই বিখ্যাত পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। অনেকে অবাক হলেন।

আশুতোষ মুখার্জী তো ক্ষেপে অস্থির হয়ে গেলেন। কদিন আগেই না দু’বন্ধু মিলে প্রস্তাবিত ঢাকা ইউনিভার্সিটিকে ব্যঙ্গ করে ‘মক্কা ইউনিভার্সিটি’ নামে অভিহিত করেছেন। কত যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিতে সচেষ্ট হয়েছেন যে, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার কোন প্রশ্নই ওঠে না। আর কদিনের ব্যবধানে হরপ্রসাদ সেই প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিলেন। হরপ্রসাদের ছুটি বা রিলিজ নেয়া ও তার পাওনাদি আদায়ের আবেদনের ওপরও বাগড়া বাঁধানো হয়েছিল তখন।

আশুতোষ ও হরপ্রসাদের বন্ধুত্ব তো আশৈশবের। একেবারে হরিহর-আত্মা ছিলেন দু’জনে। বন্ধুতার গভীরতা এতখানি ছিল যে, বয়স হলে তাদের যখন ছেলে হ’তে থাকে তখন উভয়েই তাদের অভিন্নহৃদয় বন্ধুর নামের সাথে মিলিয়ে ছেলেদের নাম রাখতেন।

যেমন, হরপ্রসাদের ছেলেদের নাম মহীতোষ, ভবতোষ ইত্যাদি। আবার আশুতোষের ছেলেরা হলেন শ্যামাপ্রসাদ, উমাপ্রসাদ ইত্যাদি।

মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার পর ছুটিতে একবার কলকাতায় গিয়ে বন্ধুর সাক্ষাতের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। যে ক’বছর বেঁচে ছিলেন স্যার আশুতোষ মুখার্জী আর হরপ্রসাদের মুখদর্শন করেননি। বাক্যালাপ তো দূরের কথা, পত্রালাপও হয়নি কখনো॥”

 ড. শেখ আব্দুর রশীদ / সেই সিভিল সার্ভিস সেইসব সিভিলিয়ান ॥ [ মুক্তচিন্তা প্রকাশনা – ২০১১ । পৃ: ২২৬-২২৭ ]

০২

“… আর. সি. মজুমদার এক সময়ে বলেছেন যে, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে মুসলমানরা খুবই খুশি হলেন বটে কিন্তু হিন্দুদের মনে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়।” তারা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলেন। সাধারণত যারা রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে দূরে থাকতেন, তারাও এবার এর প্রতিবাদী আন্দোলনে যোগ দেন। এরা হলেন রাসবিহারী ঘোষ, আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ও গুরুদাস বন্দোপাধ্যায়। তাদের প্রধান যুক্তি হল যে, প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বঙ্গভঙ্গ রহিত হয়েছে সত্য কিন্তু তার বদলে এখন একটা সাংস্কৃতিক বিভাগ করা হচ্ছে। ফলে এতে গুরুতর বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। ক্রমে এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। হিন্দু নেতাগণ একে ‘মক্কা’ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে তাচ্ছিল্য করেছেন। অনেকে ‘ফাক্কা’ বিশ্ববিদ্যালয়ও বলেছেন।

অনেকে মন্তব্য করেছেন যে, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন। বহু বছর পর ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এ. কে. ফজলুল হক চ্যান্সেলরের ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন যে, লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে সাক্ষাৎ করার সময় তিনিও উপস্থিত ছিলেন। প্রতিপক্ষের তরফ থেকে প্রবল বাধা আসে এবং তাদের সেটাকে অতিক্রম করতে হয়॥”

– ড. মো: মকসুদুর রহমান (অধ্যাপকরাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ – রা.বি) / বঙ্গভঙ্গ ও বাঙালির ঐক্য ॥ [ প্রতীক – ফেব্রুয়ারি২০০৬ । পৃ: ১৪৬ ]

০৩

“… বস্তুত ১৯০৪ সালেই বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনার মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কার্যক্রম ছিল। পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানীতে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় থাকার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা গিয়েছিল। বঙ্গভঙ্গ রদের ব্যাপক আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ ধামাচাপা পড়েছিল।

যখন ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলো – কলিকাতা ঢাকা এক হলো এবং পূর্ববঙ্গের নেতৃস্থানীয় মুসলমান যখন ক্ষুব্ধ তখন ১৯১২ সালে বড় লাট হার্ডিঞ্জ ঘোষণা করলেন যে, বিভিন্ন দিকে বিভিন্ন পর্যায়ে ঢাকার উন্নয়ন সাধন করা হবে, তারই একটি অংশ ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন। সাথে সাথেই প্রতিবাদ-প্রতিরোধ শুরু হয়। বাংলার বাঘ আশুতোষ মুখার্জি, রাসবিহারী ঘোষ প্রমুখ নেতারা এর তীব্র সমালোচনা ও বিরোধিতা শুরু করেন। এ কথাও বলা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে বাঙালি জাতি শিক্ষা-সংস্কৃতির দিক থেকে বিভক্ত হয়ে যাবে।

(বাংলায় হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক : ড: নজরুল ইসলাম ২২০ পৃ:)।

প্রতিরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত সরকার নেতৃবৃন্দ বুদ্ধিজীবীদের সাথে আপোস করতে বাধ্য হন। পরিকল্পনাটি পাল্টে ঘোষণা করা হলো : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হবে, তবে তা হবে আবাসিক বিশ্বব্দ্যালয় মাত্র। মাত্র দশ মাইল থাকবে চারদিকের সীমানা। কোনো কলেজ তার অধীনে থাকবে না।

উপরন্তু কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো নতুন চারটি অধ্যাপকের পদ সৃষ্টি করতে হলো। বড়লাট তার ঘোষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বছরে মাত্র ৫ লাখ টাকা অর্থ মঞ্জুরি করেছিলেন। কিন্তু পরে খতিয়ে দেখা গেল ১৯১৯ সালের আইন মোতাবেক শিক্ষা কার্যক্রম প্রদেশের এখতিয়ারভুক্ত হওয়ার ফলে বাংলার তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী কী অবলীলাক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বড়লাটের বরাদ্দকৃত মঞ্জুরি কেটে ফেলেন। এসব প্রতিবন্ধকতা থেকেই বোঝা যায় তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা উঠে এসেছিলেন তাদের কত বিঘ্ন-বাধা মাড়িয়ে উঠে আসতে হয়েছিল। বস্তুত ত্রিশের দশকে প্রবেশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রমাণ করতে সক্ষম হলো পূর্ববঙ্গের জন্য সত্যিই একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন ছিল। বস্তুত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম-ইতিহাসও সাম্প্রদায়িকতার কলংকে রঞ্জিত॥”

 আবু আল সাঈদ / ফজলুর রহমান : অনুদার ইতিহাসের একদশক (১৯৩৭-৪৭) ॥ [ আগামী প্রকাশনী – ফেব্রুয়ারি১৯৯৭ । পৃ: ১৫ ]

০৪

“… ১৯১১ খ্রীষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ বাতিল হওয়ায় ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার জন্য ইংরেজ সরকার প্রতিশ্রুতি দেয়। মুসলমানেরা হতভম্ব হয়ে দেখল, তাতেও হিন্দুরা আপত্তি করছে। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ও রাসবিহারী ঘোষের মত বুদ্ধিজীবীরাও বলতে থাকেন যে, তার ফলে, বাঙ্গালী জাতি ও সংস্কৃতির ক্ষতি হবে। ঢাকার হিন্দুরাও ঐ মত সমর্থন করে। ১৯২১ খ্রীষ্টাব্দে ঐ বিশ্ববিদ্যালয স্থাপিত হলেও তার পঠন-পাঠন ক্ষেত্র হয় বেশ সীমাবদ্ধ। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও ব্যাপারটি ঠিকভাবে নিতে পারেননি।

তিনি তাই লিখেছিলেন : ‘আমার নিশ্চয় বিশ্বাস, নিজেদের স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রভৃতি উদযোগ লইয়া মুসলমানরা যে উৎসাহিত হইয়া উঠিয়াছে তাহার মধ্যে প্রতিযোগিতার ভাব যদি কিছু থাকে তবে সেটা স্থায়ী ও সত্য পদার্থ নহে। ইহার মধ্যে সত্য পদার্থ নিজেদের স্বাতন্ত্র্য উপলব্ধি। মুসলমান নিজের প্রকৃতিতেই মহৎ হইয়া উঠিবে ইহাই মুসলমানের সত্য ইচ্ছা। অতএব যাহারা স্বতন্ত্রভাবে হিন্দু বা মুসলমান বিশ্বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে ভয় করেন তাহাদের ভয়ের কোন কারণ নাই এমন কথা বলিতে পারি না।’

(পরিচয় – “হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়” প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য)॥”

– সৈয়্দ আব্দুল হালিম / বাঙ্গালী মুসলমানের উৎপত্তি ও বাঙ্গালী বিকাশের ধারা (তৃতীয় খন্ড / পরাধীনতা ও প্রতিকার) ॥ [ নবযুগ প্রকাশনী – ফেব্রুয়ারি২০১৬ । পৃ: ২১১ ]

০৫

“… সংখ্যাগুরু হিন্দুদের হিংসা এবং মুসলমানদের সর্বনাশ দেখার জেদ বঙ্গভঙ্গ রদ করেই শেষ হয়ে গেলনা এবং মর্লি-মিণ্টো সংস্কারের পৃথক নির্বাচন ও মুসলমানদের স্বতন্ত্র প্রতিনিধিত্ব-সুযোগের বিরোধিতা অব্যাহত রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলোনা, মুসলিম বিরোধী তাদের সহিংস মন ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তও মেনে নিতে পারলো না। উল্লেখ্য, বঙ্গভঙ্গ রদের পর মুসলমানদের স্বান্তনা দেবার জন্যে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত ভারত সরকার ১৯১২ সালের ২রা ফেব্রুয়ারী ঘোষণা করেন।

এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে পড়ল হিন্দুরা। ১৯১২ সালের ২৮শে মার্চ কলকাতায় গড়ের মাঠে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে তারা সভা করল। এই সভায় সভাপতিত্ব করলেন স্বয়ং কবি রবীন্দ্রনাথ।

[দ্রষ্টব্য : অধ্যাপক আব্দুন নুর (চ.বি) / ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সিলেবাস বিতর্ক এবং অতীত ষড়যন্ত্রের কাহিনী – দৈনিক সংগ্রাম, ২৬ এপ্রিল, ১৯৯৩ইং ]

বিস্ময়ের ব্যাপার, পূর্ববঙ্গে যে রবীন্দ্রনাথের বিশাল জমিদারি ছিল, সে রবীন্দ্রনাথও তার মুসলিম প্রজারা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে শিক্ষিত হোক তা চাননি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সেদিন একাট্টা হয়ে প্রচারে নেমেছিল হিন্দু সংবাদপত্রগুলো। হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন শহরে মিটিং করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাশ করে পাঠাতে লাগলেন বৃটিশ সরকারের কাছে।

[দ্রষ্টব্যঃ Calcutta University Commission report. Vol. IV পৃষ্ঠা ১১২, ১৫১। ]

‘এভাবে বাবু গিরীশচন্দ্র ব্যানার্জী, ডঃ স্যার রাসবিহারী ঘোষ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখার্জীর নেতৃত্বে বাংলার এলিটগণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ১৮ বার স্মারক লিপি সহকারে তদানীন্তন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ-এর উপর চাপ সৃষ্টি করলেন। ডঃ স্যার রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে হিন্দু প্রতিনিধিগণ বড় লাটের কাছে এই বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে যুক্তি প্রদর্শন করলেন যে, পূর্ব বাংলার মুসলমানগণ অধিকাংশই কৃষক। অতএব বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করলে তাদের কোন উপকার হবে না।

[ দ্রষ্টব্যঃ Calcutta University Commission report. Vol. IV পৃষ্ঠা ১১৩। ]

বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের সময় মুসলিম স্বার্থের বিরুদ্ধে সব হিন্দু যেমন এক হয়েছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার ক্ষেত্রেও তাই হলো। পূর্ববঙ্গের, এমনকি ঢাকার হিন্দুরাও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে বাধা দেবার জন্যে এগিয়ে এল।

‘A History of Freedom Movement’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, The Controversy that started on the Proposal for founding a university at Dacca, throws interesting on the attitude of the Hindis and Muslims. About two hundred prominent Hindis of East Bengal, headed by Babu Ananda Chandra Ray, the leading pleder of Dacca, submitted a memorial to the Viceroy vehemently against the establishment of a University at Dacca For a long time afterwards. They tauntingly termed this University as ‘Mecca University’.

[ দ্রষ্টব্য : ‘A History of the Freedom Movement’,

গ্রন্থের চতুর্থ খণ্ডের Dacca University; Its role in Freedom Movement’ শীর্ষক অধ্যায়, পৃষ্ঠা ১০ (Published in 1970). ]

অর্থাৎ ‘ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব যে বিতর্কের সৃষ্টি করল তাতে হিন্দু ও মুসলমানদের ভূমিকা সম্পর্কে মজার তথ্য প্রকাশ পেল। পূর্ব বাংলার প্রায় দুই’শ গণ্যমান্য হিন্দু ঢাকার প্রখ্যাত উকিল বাবু আনন্দ চন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের তীব্র বিরোধিতা করে ভাইসরয়কে একটি স্মারক লিপি দিয়েছিল। পরে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়’ বলে বিদ্রুপ করা হতো

হিন্দুদের এই সর্বাত্মক বিরোধিতা সত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি তাদের বিরোধিতা ও ঘৃণা তারা অব্যাহতই রাখল। এর একটা সুন্দর প্রমাণ পাই আমরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি অধ্যাপক শ্রী দেবদত্ত রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকর’ এর বক্তব্যে। শ্রীভাণ্ডারকর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া তার এক বক্তৃতায় বলেন “কলিযুগে বৃদ্ধগঙ্গা নদীর তীরে হরতগ নামক একজন অসুর জন্ম গ্রহণ করবে। মূল গঙ্গার তীরে একটি পবিত্র আশ্রম আছে। সেখানে অনেক মুনি-ঋষি এবং তাদের শিষ্যগণ বাস করে। এই অসুর সেই আশ্রমটি নষ্ট করার জন্যে নানা রকম প্রলোভন দেখিয়ে একে একে অনেক শিষ্যকে নিজ আশ্রমে নিয়ে যাবে। যারা অর্থ লোভে পূর্বের আশ্রম ত্যাগ করে এই অসুরের আকর্ষণে বৃদ্ধ গঙ্গার তীরে যাবে, তারাও ক্রমে অসুরত্ব প্রাপ্ত হবে এবং তারা অশেষ দুর্দশাগ্রস্ত হবে।”

[ দ্রষ্টব্য : শ্রী ভাণ্ডারকরের এই উক্তিটি ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার তার স্মৃতিকথা ‘জীবনের স্মৃতিদ্বীপে’ উল্লেখ করেছেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সভায় শ্রী ভাণ্ডারকরের এ উক্তি করেন, সে সভায় ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার উপস্থিত ছিলেন।]

পরিস্কার যে, শ্রী ভাণ্ডারকর এই বক্তব্যে ‘হরতগ’ বলতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর মিঃ ফিলিপ ‘হরতগ’ কে বুঝিয়েছেন। মিঃ হরতগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে দীর্ঘ ২৫ বছর ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন। শ্রী ভাণ্ডারকরের বক্তব্যে হরতগ-এর ‘আশ্রম’ বলতে বুঝানো হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। আমাদের ‘বুড়িগঙ্গা’ হয়েছে শ্রী ভাণ্ডারকরের বক্তব্যে ‘বৃদ্ধাগঙ্গা’। আর মূল গঙ্গা-তীরের ‘পবিত্র আশ্রম’ বলতে শ্রী ভাণ্ডারকর বুঝিয়েছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে। শ্রী ভাণ্ডারকরের কথায় ঢাকা অর্থাৎ পূর্ববাংলা অসুরদের স্থান। পবিত্র স্থান কলকাতা থেকে যেসব ঋষি শিষ্য ঢাকায় চাকুরী করতে আসবেন তারাও অসুর হয়ে যাবে। এ থেকেই বুঝা যায়, মুসলমানদর প্রতি শ্রী ভাণ্ডারকরদের বৈরিতা কত তীব্র, ঘৃণা কত গভীর।

তাদের এ বৈরিতার কারণে উপযুক্ত বরাদ্দের অভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ভীষণ অর্থকষ্ট ভোগ করতে হয় এবং অঙ্গহানিও হয়েছিল। ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার-এর ভাষায় “(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায়) মুসলমানরা খুবই খুশী হলেন বটে, কিন্তু হিন্দুদের মনে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। তারা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলেন। সাধারণত যারা রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে দূরে থাকতেন, তারাও এবার এই প্রতিবাদ আন্দোলনে যোগ দিলেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রাস বিহারী ঘোষ ও গুরুদাস বন্দোপাধ্যয়। তাদের প্রধান যুক্তি হলো এই যে, প্রশাসন ক্ষেত্রে বঙ্গভঙ্গ রহিত হয়েছে বটে, কিন্তু তার বদলে এখন একটি সাংস্কৃতিক বিভাগ করা হচ্ছে। ফলে, এতে গুরুতর বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। ক্রমে এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে বড় লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ হিন্দুদের এই বলে আশ্বাস দিলেন যে, তাদের এমন আশংকার কোন কারণ নেই। ঢাকায় যে বিশ্ববিদ্যালয় হবে তার ক্ষমতা ও অধিকার ঢাকা শহরের দশ মাইল পরিধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।”

[ দ্রষ্টব্য : ‘জীবনের স্মৃতিদ্বীপে’, ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার। ]

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও এই ভাবে হিন্দুরা একে ‘ঠুটো জগন্নাথে’ পরিণত করে রাখার ব্যবস্থা করেছিল। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপারঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সিন্ডিকেটে হিন্দু যারা নির্বাচিত হয়ে আসতেন তারাও বিশ্ব-বিদ্যালয়ের বৈরিতা ত্যাগ করতেন নাতাদের ভোট বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করারই চেষ্টা করত। ডক্টর রমেশচন্দ্র লিখছেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোর্টের (সিনেটর) সদস্যদের মধ্যে অর্ধেক ছিলো মুসলমান এবং অর্ধেক ছিলেন হিন্দু। প্রফেসররা কোর্টের সদস্য ছিলেন। বার লাইব্রেরীর অনেক উকিল রেজিষ্টার্ড গ্রাজুয়েটদের দ্বারা নির্বাচিত হয়ে এর সভ্য হতেন। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনকে হিন্দুরা ভাল চোখে দেখেনি, একথা পূর্বেই বলেছি। কারণ হিন্দুদের বিশ্বাস ছিল বঙ্গভঙ্গ রহিত করায় মুসলমানদের যে ক্ষতি হয়েছে, অনেকটা তা পূরণ করার জন্যই এই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রীতির চোখে দেখেননি। বাইরে এ বিষয়ে যে আলোচনা হত কোর্টের সভায় হিন্দু সভ্যদের বক্তৃতায় তা প্রতিফলিত হত। অবশ্য ভোটের সময় জয়লাভের ব্যাপারে আমরা অনেকটা নিশ্চিত ছিলাম। মুসলমান সদস্য এবং হিন্দু শিক্ষক সদস্যরা একত্রে হিন্দু সদস্যদের চেয়ে অনেক বেশী ছিলেন”।

[ দ্রষ্টব্য : ‘জীবনের স্মৃতিদ্বীপে’, ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার।]

সংখ্যাগুরু হিন্দুরা মুসলমানদের কোন ভালই সহ্য করতে পারেনি। মুসলিম লীগ গঠন তাদের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিল, মর্লি-মিণ্টোর শাসন-সংস্কারে মুসলমানদের স্বতন্ত্র প্রতিনিধিত্বের সুযোগ তারা বরদাশত করেনি, বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলমানদের যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, তাকে তারা সহ্য করতে পারেনি এবং ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের সহ্য হলোনা। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার মধ্য দিয়ে মুসলমানদের প্রতি হিন্দু মনোভাব সবচেয়ে নগ্নভাবে ফুটে উঠেছে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্যে ‘গুরুতর বিপদ’ অবলোকন করেছে। এই ‘গুরুতর বিপদ’টা কি? সেটা মুসলমানদের উন্নতি ও উত্থান। অর্থাৎ হিন্দুরা হয়ে উঠেছিল মুসলমানদের অস্তিত্বের বিরোধী, যা মাথা তুলেছিল শিবাজী, স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী, শ্রী অরবিন্দের আন্দোলনে। সংখ্যাগুরু হিন্দুদের উত্থিত এই সংহার মূর্তিই সেদিন মুসলমানদের রাজনৈতিক আন্দোলনে তাদের আত্মরক্ষার সংগ্রামকেই অপরিহার্য করে তুলেছিল॥”

– আবুল আসাদ / একশ‘ বছরের রাজনীতি ॥ [ বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি – মে২০১৪ । পৃ: ৭১-৭৪ ]

০৬

“… যারা কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বাধা প্রদান করেন তারা কোন সময়ে এ অঞ্চলের মানুষের কল্যাণের কথা মাথায় আনেননি। বহুকাল থেকে বাংলার পূর্বাঞ্চল শিক্ষা-দীক্ষায় অবহেলিত হতে থাকে। কলিকাতাকেন্দ্রিক ভদ্রলোক শ্রেণী কেবল কলিকাতার উন্নতিকেই দেশের উন্নয়ন হিসেবে গণ্য করেছেন। সে কারণে শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, সংস্কৃতি সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কলিকাতা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তারা কোন সময়ে চাচ্ছিলেন না যে, কলিকাতার অনুরূপ আর একটি প্রতিষ্ঠান মুসলমান অধ্যুষিত ঢাকায় গড়ে উঠুক।

কলিকাতা তখন শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। পিছিয়ে পড়া মুসলমান ছাত্ররা সুদূর কলিকাতায় গিয়ে লেখাপড়া করতে পারতেন না। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলমানদের যেমন পড়ার সুযোগ কম ছিল তেমন পরিচালনা সংস্থাগুলোতেও তাদের তেমন প্রাধান্য লক্ষ কর্স যায় না। ১৯০৪ সালের পূর্বে কোন মুসলমান সিন্ডিকেট সদস্য ছিলেন না। এ সময় পর্যন্ত কোন মুসলমান ফেলোও প্রবেশ করতে পারেননি। ১৯১৭ সালে দেখা যায় ১১০ জন ফেলোর মধ্যে মুসলমান ছিলেন মাত্র ৭ জন। আবাসিক বা প্রশাসনিক কমিটিতে কোন মুসলমান ছিলেন না। পাঠ্যসূচিতে হিন্দু প্রভাব লক্ষ করা যায়। মুসলমানদের যে সব ইতিহাস ছিল তাও বিকৃত করা হয়। পাঠ্যতালিকা সম্পর্কে শিক্ষামন্ত্রী আজিজুল হক বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ্যপুস্তকসমূহ প্রায়ই সংস্কৃত উদ্ধৃতিযুক্ত পুরাণ কাহিনী এবং কিংবদন্তীতে পরিপূর্ণ। এমন কয়েকটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে, মুসলমান ছাত্ররা আর সকল বিষয়ে খুব কৃতিত্বপূর্ণ নম্বর পেয়েছে, অথচ তাদের দূর্ভাগ্য কেবল মাতৃভাষার পরিক্ষাতেই অকৃতকার্য হয়েছে। মুসলমান ছাত্রদের সমস্যা সৃষ্টি করে পাঠ্যপুস্তক। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরিষদ প্রায় সম্পূর্ণরূপেই মুসলমান বর্জিত হওয়ায় মুসলমান বিষয় সম্পর্কিত পুস্তকের কিংবা মুসলমান লেখক রচিত পুস্তকের প্রতি সহানুভূতিমূলক বিবেচনা প্রদর্শিত হয়নি।”

এ কারণেই ১৯০৩ সালে সৈয়দ আমীর আলী আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের লন্ডনস্থ ছাত্রদের সমাবেশে বলেন যে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আসলে হিন্দুদের বিশ্ববিদ্যালয়।

১৯১৫ সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির শিক্ষা সম্মিলনে নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী বলেন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ন্ত্রনের ভারও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর অথচ সেখানে কোন মুসলমান সিন্ডিকেট সদস্য নেই। একশত জন সাধারণ সিনেট সদস্যের মধ্যে কেবল মাত্র ৬ জন হলেন মুসলমান। কোন অফিসে মুসলমান কর্মকর্তা দেখা যায় না। ১৯১৫-১৬ সালে বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন যে, আজ পর্যন্ত সেখানে মুসলমান ছাত্র্দের কোন হল নির্মিত হয়নি। এজন্য তাদের অবর্ণনীয় কষ্ট করে থাকতে হয়। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, কলিকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ, ল কলেজ – কোথাও কোন ছাত্রাবাস ছিল না। ভারতীয় আইনসভায় ১৯২০ সালে বলেন, ২৩টী কলেজের গভর্ণিং বডিতে কোন মুসলমান প্রতিনিধি নেই, ১০৬৫ জন কলেজিয়েট শিক্ষকদের মধ্যে মাত্র ৩৭ জন মুসলমান। ল কলেজের ৭০ জনের মধ্যে কোন মুসলমান নেই। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ২ জন প্রভাষক হলেন মুসলমান। সে কারণে তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে সাম্প্রদায়িক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

… পূর্বে কলিকাতাকেন্দ্রিক ভদ্রলোক শ্রেণীর ধারণা ছিল যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হবে মুসলমানদের বিশ্ববিদ্যালয়। কে কেউ একে ‘মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়’ বলে তাচ্ছিল্য করেছেন। কিন্তু আমরা যদি গঠণ প্রণালী, ছাত্র সংখ্যা, পাসের হার সব কিছু বিবেচনা করি, তাহলে দেখতে পাব যে, সেখানে হিন্দুদের প্রাধান্য কম ছিল না। প্রথম একাডেমিক কমিটির ১৯ জন সদস্যের মধ্যে ৬ জন হিন্দু, ৮ জন ইংরেজ ও ৫ জন মুসলমান। এর মধ্যে আর. সি. মজুমদার একজন সদস্য। মুসলমান সদস্যের মধ্যে ছিলেন স্যার এফ. রহমান ও মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্।

… আসলে কমিটি গঠন, ছাত্র সংখ্যা, পাসের হার সবক্ষেত্রে দেখা যায় যে, হিন্দুদের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। তাহলে তারা আগাম কি করে বলেন যে, ঢাকা হবে মুসলমানদের বিশ্ববিদ্যালয়? ছাত্র হবে না, কেননা কৃষক সন্তান আর কয়জনইবা পড়তে আসবে। আসলে সুযোগ পেলে পরিস্থিতি যে আলাদা হতে পারে তা তারা বুঝতেই চাননি। অনেকে বলেছেন যে, এটা হবে ‘ফাক্কা বিশ্ববিদ্যালয়’ অর্থাৎ এখানে তেমন মেধাবী ছাত্র পড়তে আসবেন না। যারা সম্ভ্রান্ত ঘরের সন্তান তারা কলিকাতায় গিয়েই পড়াশোনা করেন। এটা আসলে তেমন ফলদানকারী প্রতিষ্ঠান হবে না। কিন্তু ফলাফল বিশ্লেষণ করলে তা প্রমাণ হয় না। ১৯২২ সালে বি.এ. প্রথম শ্রেণীতে যারা পাস করেন এর মধ্যে ৫ জন ছিলেন হিন্দু, এম.এ. – তিনজন প্রথম শ্রেণীতে পাস করেন এবং তারা সবাই ছিলেন হিন্দু। তুলনামুলক আলোচনা করলে দেখা যায়, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে ঢাকার ফলাফল ভাল ছিল। প্রমাণসহ বলা যায়, ১৮৫৮ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শিক্ষাবর্ষে ১০ জন বি.এ. পরীক্ষা দেন। দশজনের মধ্যে ঢাকা কলেজ থেকে ১ জন অংশ নেন। সকলেই অকৃতকার্য হন। পরে দুজনকে প্রমার্জন নম্বর দিয়ে পাস করান হয়। এর মধ্যে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একজন এবং অন্যজন হলেন যদুনাথ বসু। সেই থেকে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রমার্জন নম্বরের বিধান চালু হয়। এতকিছু জানা ও বুঝার পরও অন্নদাশঙ্কর রায়ের মত ব্যক্তিও বলেছেন যে, আসলে মুসলমানদের সুবিধার জন্য নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি হযেছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন মুসলমানদের জন্য একটি ছাত্রাবাস নির্মাণের সুপারিশ করে। প্রথমে তিনটি হল ছিল। যথা: ঢাকা হল, জগন্নাথ হল ও মুসলিম হল। মুসলিম হলে ১৯২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র ছিলেন ৭৫, ১৯২৩-২৪ ১২৭, ১৯২৫-২৫ ১৬০, ১৯২৬-২৭ ২০৪, ১৯২৭-২৮ ২২৯ জন। ছাত্র সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়। প্রথম প্রভোস্ট ছিলেন স্যার এফ. রহমান এবং হাউজ টিউটর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। এসব ছাত্রের বিভিন্ন স্থানে আবাসন দেয়া হত। সেজন্য একটি স্বতন্ত্র বিল্ডিং নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় এবং ১৯২৭ সালে একটি হল নির্মিত হয়। ১৯২৯ সালে এর নাম হয় এস. এম. হল বা সলিমুল্লাহ মুসলিম হল। ১৯২৩ সালে এ হল নির্মাণের সংবাদ শোনার পর পরই নানা কথা বলতে থাকেন। কেউ কেউ বলেন যেমুসলমান ছাত্র সংখ্যা কোন সময়ে এত বেশি হতে পারে নাতাই প্রকান্ড হল নির্মাণের কোনোই প্রয়োজন নেই।

তারা মন্তব্য করেন যেএ হলে ছাত্রের অভাবে এক সময়ে গরু-ছাগল থাকবে। এস. এম. হলের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে যে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হয় সেটি আমি সম্পূর্ণ পাঠ করেছি এবম স্বাভাবিকভাবেই স্তম্ভিত হয়েছি যে, ঐ হল কত পৃথিবীখ্যাত ও দেশবরেণ্য ব্যক্তিকে বুকে ধারণ করেছে।

… এসব আলোচনা থেকে একটি ভাব বেরিয়ে আসে, তাহল এ অঞ্চলের মানুষের উন্নয়নকে কোন সময়ে মনেপ্রাণে গ্র্হণ করা হয়নি। সে কারণেই একটি মহান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনকে কেন্দ্র করেও তাদের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায়। বঙ্গভঙ্গের ফলে যে উন্নতি হয় তা রদ হয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। এর কিছু ক্ষতি পুষিয়ে দেবার জন্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। ১৯২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কনভোকেশনে ভাষণদানকালে লর্ড লিটন বলেছিলেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হল বঙ্গভঙ্গ রদের কিছুটা ক্ষতি পূরণ। এ অঞ্চলের মানুষ একে মনে প্রাণে আশীর্বাদ হিসেবে গ্র্হণ করে কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল চক্র নানাভাবে ক্ষতি করতে তৎপর হয়। ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক বলেনঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য সরকার সে সময়ে ৬৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয় অথচ শিক্ষামন্ত্রী প্রভাস সিং তা সমগ্র বাংলাদেশের কাছে এনে সেটা সমগ্র বাংলা প্রদেশের শিক্ষা বিস্তারের জন্য বরাদ্দ দেন।

এমনিভাবে বিস্তারিত আলোচনা করলে এটা সহজে প্রমাণিত হয় যে, এ অঞ্চলের মানুষের প্রতি তাদের মনোভাব কেমন ছিল। পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের কল্যাণের জন্য কোন প্রকার দরদ প্রদর্শন করা হয়নি আর এভাবেই সহানুভূতি দেখান হয় বাঙালীকে মানুষ করার জন্য॥”

– ড. মো: মকসুদুর রহমান (অধ্যাপকরাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ – রা.বি) / বঙ্গভঙ্গ ও বাঙালির ঐক্য ॥ [ প্রতীক – ফেব্রুয়ারি২০০৬ । পৃ: ১৪৭-১৫১]

(সংকলনে মুজতবা খন্দকার, ঘাটাইল ডট কম)/-

ফেসবুক (ঘাটাইলডটকম)

বিভাগসমূহ

ঘাটাইলডটকম আর্কাইভ

পঞ্জিকা

July 2020
S S M T W T F
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031