১৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১লা জুন, ২০২০ ইং

যুদ্ধ নয়, ভাইরাসই সবচেয়ে বড় শঙ্কা : বিল গেটস

মার্চ ২২, ২০২০

পুরো বক্তৃতাটি শুনে মনে হতে পারে, করোনাভাইরাসের কথা বিল গেটস বুঝি পাঁচ বছর আগেই জানতেন! ২০১৫ সালে টেডএক্সে একটি বক্তব্য দিতে গিয়ে মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বলেছিলেন, সংক্রামক ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকা উচিত। কিছু পরামর্শও দিয়েছিলেন তিনি। পড়ুন সেই বক্তৃতার অনুবাদ।

ছেলেবেলায় যে দুর্যোগটি নিয়ে বেশি আতঙ্কিত থাকতাম, তার নাম ছিল পারমাণবিক যুদ্ধ। এ কারণে আমাদের বাড়ির বেসমেন্টে একটি ব্যারেল রাখা হয়েছিল। খাবার ও পানির বোতলে ঠাসা ছিল ব্যারেলটি। কথা ছিল, পরমাণু যুদ্ধ বাধলেই আমরা নিচে চলে যাব এবং ব্যারেলটি হবে আমাদের খাবারের সংস্থান।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যে বিপর্যয়ের ভীষণ শঙ্কা আছে, তা দেখতে অবশ্য এমনটা নয় (বড় পর্দায় পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের ছবি দেখিয়ে)। এটা দেখতে হবে এমন (ভাইরাসের ছবি দেখিয়ে)। আগামী কয়েক দশকে কোনো কারণে যদি লাখ লাখ মানুষ মারা পড়ে, তাহলে কারণটি মোটেও যুদ্ধ হবে না; মানুষ মারা পড়বে ভীষণ সংক্রামক কোনো ভাইরাসের সংক্রমণে। মানুষ মিসাইলের আঘাতে প্রাণ হারাবে না, প্রাণ যাবে ক্ষুদ্র জীবাণুতে। এর কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো, আমরা পারমাণবিক প্রতিরোধক তৈরিতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছি; অথচ একটি মহামারি ঠেকানোর সিস্টেমের বেলায় সত্যিকার অর্থে আমাদের বিনিয়োগ সামান্যই। আমরা পরবর্তী মহামারির জন্য প্রস্তুত নই।

ইবোলার দিকেই চোখ বোলানো যাক। এর জন্য আমাদের বেশ কঠিন কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। আমি নিশ্চিত, আপনারা সবাই বিষয়টি পত্রিকায় পড়েছেন। পোলিও নির্মূল করার জন্য আমরা যে বিশ্লেষণকারী টুল ব্যবহার করি, সেই টুল দিয়েই ইবোলার বিষয়টি খুব নিবিড়ভাবে খেয়াল করেছি আমি। এবং কী দেখা গেল? যদি হতো যে আমাদের একটি সিস্টেম ছিল, তবে ঠিকঠাক কাজ করেনি, তা কিন্তু নয়। সমস্যাটি হলো, আমাদের কোনো সিস্টেমই ছিল না। আদতে ইবোলা ছড়িয়ে পড়ার ওই সময়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু কর্তব্য আমরা পালন করিনি।

আমাদের কোনো মহামারি বিশেষজ্ঞ ছিলেন না; যাদের গিয়ে দেখার কথা ছিল, রোগটি আদতে কী এবং তা কত দূর পর্যন্ত ছড়াতে পারে। আমরা কাগজে-কলমে প্রতিবেদন অবশ্য পেয়েছি। তবে তা অনলাইনে পেতে পেতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল এবং যা ছিল ভীষণ ভুলে ভরা। আমাদের কোনো চিকিৎসা দলও ছিল না। ইবোলার ব্যাপারে মানুষকে প্রস্তুত করে তোলার মতো কোনো উপায় জানা ছিল না আমাদের। মেডিসিনস সানস ফ্রন্টিয়ারস (আন্তর্জাতিকভাবে চিকিৎসাদানকারী মানবতাবাদী বেসরকারি সংস্থা) স্বেচ্ছাসেবীদের সংঘবদ্ধ করার ব্যাপারে অবশ্য বেশ ভালো কাজ করেছে। তারপরও এ ক্ষেত্রে আমাদের গতি ছিল ভীষণ মন্থর, আক্রান্ত দেশগুলোতে হাজার হাজার কর্মী পাঠানোই কাম্য ছিল। এ কারণেই বৃহৎ মহামারির বেলায় আমাদের প্রয়োজন হবে লাখ লাখ কর্মী। ইবোলার সময় চিকিৎসার জন্য হাত বাড়ানোর মতো কেউ ছিল না। রোগ নির্ণয় করার মতো কাউকে দেখিনি আমরা। ইবোলার ক্ষেত্রে কোন জিনিসটি কাজে আসবে, তা কেউ জানতও না। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, বেঁচে থাকা মানুষের শরীর থেকে রক্ত নিতে পারতাম আমরা, সেই রক্ত থেকে প্লাজমা সংগ্রহ করে আক্রান্তদের বাঁচানো যেত। অথচ সেই চেষ্টাও করা হয়নি।

কাজেই ওই সময় অনেক কিছুই করা হয়নি। এবং সত্যিকার অর্থে এগুলো বৈশ্বিক ব্যর্থতা। সেই সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মহামারি পর্যবেক্ষণের জন্য অর্থ বরাদ্দ করেছিল। তবে এতক্ষণ যা বললাম, সেসব করার লক্ষ্যে নয়। সিনেমার দৃশ্যপট অবশ্য একেবারেই আলাদা (কন্ট্যাজিওন সিনেমার পোস্টার দেখিয়ে)। সিনেমায় সুদর্শন মহামারি বিশেষজ্ঞরা কর্তব্য পালনে সদাপ্রস্তুত। তারা বিপদ দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং সবার প্রাণ রক্ষা করে। তবে যা বললাম, সেগুলো খাঁটি হলিউডি ব্যাপারস্যাপার।

এই প্রস্তুতির ব্যর্থতা পরবর্তী মহামারিকে ইবোলার চেয়েও নাটকীয়ভাবে ভয়াবহ করে তুলবে। ইবোলা কতটা প্রভাব ফেলল দেখুন। প্রায় ১০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এতে, এবং তাদের প্রায় সবাই পূর্ব আফ্রিকার তিনটি দেশের নাগরিক। তিনটি কারণে ইবোলা আর ছড়ায়নি। প্রথমটি হলো, স্বাস্থ্যকর্মীরা ব্যাপক নায়কোচিত ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁরা আক্রান্ত মানুষকে খুঁজে বের করে সংক্রমণ প্রতিরোধ করেছিলেন। দ্বিতীয়টি হলো, ভাইরাসটির চরিত্র। ইবোলা বাতাসে ছড়ায় না। সংক্রমিত মানুষ এতটাই অসুস্থ ছিল যে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিল। তৃতীয় কারণটি হলো, রোগটি খুব বেশি শহরে ছড়ায়নি। এসবই হয়েছে ভাগ্যগুণে। শহরাঞ্চলে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়লে আক্রান্তের সংখ্যা হতো বিপুল।

তো পরবর্তী সময়ে ভাগ্যদেবী আমাদের ওপর হয়তো অতটা প্রসন্ন থাকবেন না। আমরা এমন একটা ভাইরাসে হয়তো আক্রান্ত হব, যার ফলে বিমানে চড়ার সময় কিছুই টের পাব না। বাজারে যাওয়ার সময় হয়তো শরীর ঠিকঠাক থাকবে। ভাইরাসটির উৎস হতে পারে ইবোলার মতো কোনো প্রাকৃতিক মহামারি। কিংবা তা জৈব সন্ত্রাসবাদের (বায়োটেরোরিজম) কারণেও হতে পারে। অর্থাৎ দুনিয়ায় এমন অনেক কিছুই আছে, যার ফলে পরিস্থিতি আক্ষরিক অর্থেই লক্ষগুন খারাপ হতে পারে।

১৯১৮ সালে বিশ্বব্যাপী বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া স্প্যানিশ ফ্লুর কথাই ধরা যাক। নতুন ভাইরাসটিও হয়তো দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়বে ভীষণ দ্রুতগতিতে। স্প্যানিশ ফ্লু নামক ওই মহামারিতে বিশ্বের ৩০ মিলিয়নের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। ফলে এটা ভয়াবহ এক সমস্যা। আমাদের সচেতন হতেই হবে।

তবে আমরা চাইলে চমৎকার একটি সাড়াদান পদ্ধতি তৈরি করতে পারি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুবিধা কিন্তু আমাদের আছেই। মানুষের সঙ্গে তথ্য আদানপ্রদানের জন্য আমাদের আছে মুঠোফোন। আমাদের আছে স্যাটেলাইট মানচিত্র, যা দিয়ে আমরা মানুষের অবস্থান ও গতিবিধির ওপর নজর রাখতে পারি। জীববিজ্ঞানেও আমরা অনেক এগিয়েছি। এর ফলে রোগজীবাণু পরীক্ষা করে উপযুক্ত ওষুধ এবং টিকা তৈরি করতে সক্ষম আমরা। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় অস্ত্র আমাদের আছে। কিন্তু এই অস্ত্রগুলো সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য কাজে লাগাতে হবে। এবং আমাদের দরকার প্রস্তুত থাকার মানসিকতা।

আমি মনে করি, প্রস্তুত থাকার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ তা-ই, যা আমরা যুদ্ধের সময় করি। যুদ্ধে যেমন পেশাদার যোদ্ধা তৈরিই থাকে। তাদের অপেক্ষা কেবল ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। এমনকি অতিরিক্ত যোদ্ধাও মজুত থাকে, ফলে একটি দল আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। ন্যাটোর (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন) একটি মোবাইল ইউনিট আছে, যা খুব দ্রুত মোতায়েন করা সম্ভব। যুদ্ধে নামার আগে তারা অনেক কিছুই যাচাই করে নেয়। তাদের লোকবল যথেষ্ট প্রশিক্ষিত কি না, তা পরখ করে। তাদের মধ্যে সবাই জ্বালানি ও রসদ সম্পর্কে অবগত কি না তা-ও বুঝে নেয়। তারা সবাই একই বেতার তরঙ্গ ধরতে পারে কি না, তা নিশ্চিত করে। মানে হলো, লড়াইয়ে নামার আগে তারা পুরোপুরি প্রস্তুত থাকে। অর্থাৎ মহামারির সময় আমাদের এভাবেই প্রস্তুত থাকতে হবে।

আমাদের প্রধান কর্তব্যগুলো তাহলে কী কী? প্রথমত, দরিদ্র দেশগুলোতে শক্তিশালী স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন। যেখানে মায়েরা নিরাপদে সন্তান জন্ম দিতে পারবেন, শিশুরা পাবে সব টিকা। আবার যেসব অঞ্চলে প্রথম দিকেই প্রাদুর্ভাব দেখা দেবে, সেখানেও এসব প্রয়োজন। আমাদের একটি বিশেষায়িত চিকিৎসক বাহিনীও লাগবে। যে বাহিনীতে যথেষ্ট পরিমাণে পেশাদার এবং প্রশিক্ষিত মানুষ থাকবে, যারা যেকোনো মুহূর্তে অভিজ্ঞতা পুঁজি করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত থাকবে সব সময়। তারপর ওই চিকিৎসক বাহিনীর সঙ্গে সেনাবাহিনীকে জুড়ে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর দ্রুত গতিময়তা, রসদ এবং নিরাপত্তার সুবিধাগুলো কাজে আসবে। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার দিন নেই, সময় এখন জীবাণুর সঙ্গে লড়াই করার। শেষবার জীবাণুর বিরুদ্ধে যুদ্ধটি হয়েছিল ২০০১ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। তবে তাতে খুব একটা সুবিধা করা যায়নি। এখন পর্যন্ত ফলাফল জীবাণু ১: মানুষ ০। সব শেষে প্রয়োজন টিকা এবং রোগনির্ণয়ে ভালো গবেষণা-উন্নয়ন।

আমি জানি না এসবের পেছনে কত টাকা খরচ হবে। তবে এটা নিশ্চিত, সম্ভাব্য ক্ষতির তুলনায় অঙ্কটি হবে নিতান্তই সামান্য। বিশ্বব্যাংকের অনুমান, ফ্লুজনিত কোনো মহামারি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে দুনিয়ার অর্থনীতি ধসে পড়বে। আর্থিক ক্ষতি হবে তিন ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। প্রাণ হারাবে লাখো মানুষ। যে বিনিয়োগগুলোর কথা বললাম, সেগুলো করলে কেবল মহামারির জন্য প্রস্তুতই হব না আমরা; এর বাইরে আরও উল্লেখযোগ্য কিছু সুবিধাও মিলবে। গবেষণা-উন্নয়ন এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসমস্যা হ্রাস পাবে। পৃথিবীটা হয়ে উঠবে আরও নিরাপদ।

সুতরাং আমি মনে করি, এটাই আমাদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বাড়িতে স্প্যাগেটির ক্যানের ভান্ডার গড়ে তোলার দরকার নেই, প্রয়োজন নেই বেসমেন্টে ঘাপটি মারার। তবে আমাদের প্রস্তুত হতেই হবে, কারণ, সময় আমাদের পক্ষে নয়।

ইবোলা মহামারি থেকে যদি অন্তত একটি ইতিবাচক দিকও পাই আমরা, তা হলো মহামারিটি আমাদের আগাম সতর্কতা দিয়ে গেল। এটা আমাদের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য জাগরণের ডাক। এখন থেকে শুরু করলে পরবর্তী মহামারির জন্য প্রস্তুত থাকতে পারব আমরা।

(ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মাহফুজ রহমান, সূত্র: টেডএক্স/ ঘাটাইল ডট কম)/-

সাম্প্রতিক প্রকাশনাসমূহ

ফেসবুক (ঘাটাইলডটকম)

Adsense

Doctors Dental

ঘাটাইলডটকম আর্কাইভ

বিভাগসমূহ

Divi Park

পঞ্জিকা

জুন 2020
শনি রবি সোম বুধ বৃহ. শু.
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  

Adsense