যমুনার চরাঞ্চলে শিক্ষকদের একমাত্র বাহন ‘মাস্টার সার্ভিস’

বিশাল চরাঞ্চলের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা প্রতিদিন নির্দিষ্ট শ্যালো ইঞ্জিন চালিত বড় নৌকায় যমুনা নদী পাড়ি দিয়ে কর্মক্ষেত্রে যান। শুধুমাত্র শিক্ষকরাই ওই নৌকায় যাতায়াত করেন বলে এলাকার মানুষ এটার নাম দিয়েছে ‘মাস্টার সার্ভিস’। সম্প্রতি টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার চরাঞ্চল গাবসারা ও অর্জুনা ইউনিয়নে সরেজমিনে গিয়ে এই মাস্টার সার্ভিসের দেখা মেলে।

জেলার ভূঞাপুর উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার মধ্যে গাবসারা ইউনিয়ন পুরোটা, অর্জুনা ইউনিয়নের অর্ধেক, গোবিন্দাসী ও নিকরাইল ইউনিয়নের এক চতুর্থাংশ এবং পৌর এলাকার কিছু অংশ যমুনা নদীর দুর্গম চর। আর চরাঞ্চলে যাতায়াত করা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। শুষ্ক মৌসুমে কোনো কোনো চরে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করা গেলেও অধিকাংশ চরে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম নৌকা। আর বর্ষা মৌসুমে চরাঞ্চলে যাতায়াতের জন্য রয়েছে শতাধিক ছোট-বড় নৌকা। এসব নৌকা গোবিন্দাসী ঘাট থেকে যাতায়াত করে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নৌ-ঘাটে চা বিক্রেতারা চায়ের চুলায় আগুন দিচ্ছেন। ঘাটে তখন অর্ধশত নৌকা সারিবদ্ধভাবে বাঁধা। চরে যাওয়ার উপায় জানতে চাইলে চা বিক্রেতা রাসেল মিয়া বলেন, ‘সকাল ৯টার আগে চরে নৌকা পাওয়া যায় না। কেউ যদি রিজার্ভ করে যেতে চান তাহলে যাবে। অন্যদিকে চরে যেতে নৌকায় কমপক্ষে ৬০-৭০ জন যাত্রী হলে নৌকা ছাড়বে। এছাড়া চরের স্কুলগুলোতে যেসকল মাস্টার চাকরি করেন তাদের নিয়ে ৮টার দিকে মাস্টার সার্ভিস নামে একটি নৌকা ছেড়ে যায়। সেই নৌকায় যেতে পারবেন।’

গল্প করতে করতে সকাল ৮টার আগে শিক্ষকরা ঘাটে চলে আসলেন। মাস্টার সার্ভিসে ওঠার জন্য সিঁড়ি থাকায় শিক্ষকদের কোনো কষ্টই করতে হয় না। নৌকায় রয়েছে জুতা রাখার বিশেষ ব্যবস্থা। মাস্টার সার্ভিসের নৌকার চালক জহুরুল। মজা করে তাকে অনেকে পাইলট বলে ডাকে। যাত্রীরা ছইয়ের নিচে, নৌকার দুপাশে এবং ছইয়ের ওপর সারিবদ্ধভাবে বসেছেন।

শিক্ষকরা জানান, সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যে স্কুলে উপস্থিত হতে হয়। অনেক নৌকা থাকলেও ৯টার আগে কোনো নৌকা ছাড়ে না। ফলে কর্মক্ষেত্রে পৌঁছাতে প্রায় প্রতিদিনই তাদের দেরি হয়। আবার সাড়ে ৪টার পর বাড়ি ফিরতেও বেগ পেতে হয়। সময়মতো পৌঁছাতে না পারলে স্কুলের পরিচালনা কমিটি ও বিভাগীয় কর্মকর্তাদের গালমন্দ শুনতে হতো। তাই এ অবস্থা এড়াতে কয়েকজন শিক্ষক ২০০৭ সালে ৩২ হাজার টাকা দিয়ে একটি পুরাতন নৌকা কেনেন।

তারা আরো জানান, প্রথমে ১৩ জন শিক্ষক ওই নৌকায় য়াতায়াত করতেন। পিন্টু মিঞা নামের স্থানীয় একজনকে নৌকার চালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। মাসে তাকে প্রত্যেক শিক্ষক ৫শ’ টাকা করে বেতন দিতেন। অল্প দিনের মধ্যে নৌকাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

জানা গেছে, বাসুদেব কোল, চর বিহারী ও গোবিন্দপুর বাজার ঘাট থেকে শিক্ষকরা নৌকায় ওঠেন ও নামেন। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে বা অন্য নৌকায় যার যার স্কুলে যান। তবে এক বছর পর পুরাতন নৌকাটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়লে শিক্ষরা বেশ বেকায়দায়পড়েন। তবে সুলতান মিঞা নামে একজন নিজস্ব নৌকা দিয়ে এ সার্ভিস চালু করেন। বর্তমানে হাসান ও জহুরুল দুইভাই ‘মাস্টার সার্ভিস’ চালু রেখেছেন। সার্ভিসটি চালু রাখতে ১১ সদস্যের পরিচালনা কমিটি আছে। প্রতি বছর নতুন কমিটি গঠন করা হয়।

শুশুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা ফাহিমা আক্তার বলেন, ‘আগে অনিশ্চয়তার মধ্যে স্কুলে যাতায়াত করতাম। সময়মতো নৌকা পাওয়া যেত না। এখন ‘মাস্টার সার্ভিস’ চালু আছে বলেই শিক্ষকরা সময়মতো, নিশ্চিন্তে ও নিরাপদে কর্মস্থলে যেতে পারছেন।’

কমিটির সভাপতি ও আছাতুন্নেছা দাখিল মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক আব্দুস সামাদ মণ্ডল বলেন, ‘মাস্টার সার্ভিসে যাতায়াত করতে আগে মাসে ৫০০ টাকা দিতে হতো। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় ১০০ টাকা বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হয়েছে। প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে চালককে টাকা দিতে হয়।’

( কে এম মিঠু, ঘাটাইলডটকম)/-