মুদ্রা দোষ; পরিত্রাণের উপায়

মুদ্রা দোষ! দুনিয়ায় এমন খুব কম মানুষ আছে যার একটা না একটা মুদ্রা দোষ নাই। মুদ্রা দোষ আসলে বড় কোন দোষ না। এইটা মানুষের এমন একটি অভ্যাস যা মানুষ নিজের অজান্তেই করে থাকেন। অনেক সময় এই দোষ অনেকের পছন্দের কারণ হয়। আবার অনেক সময় মারাত্মক অপছন্দের ব্যাপার হয়ে  দাঁড়ায়। ইংরেজিতে এটাকে বলা যেতে পারে Mannerism বা peculiar habit।

অভিজ্ঞজনরা বলছেন, মুদ্রাদোষ মোটামুটিভাবে তিন রকম। আঙ্গিক, বাচনিক আর কাল্পনিক।

কারো মুদ্রা দোষ প্রকাশ পায় কথায় কথায়। কারো মুদ্রা দোষ প্রকাশ পায় কাজে কর্মে। ব্যাক্তিগত ভাবে আমার নিজের একটা মুদ্রা দোষ আছে। সেটা হল কথার মুদ্রাদোষ। আমি কথায় কথায় বলে থাকি “কোন সমস্যা নাই” এইটা আমার একটা বাজে মুদ্রা দোষ।

অনেকের যেমন কথায় কথায় ‘এই আর কি’, ‘এই হলো’, ‘এখন দ্যাখেন’, ‘বুঝলেন কিনা’ বা অন্য কোন কথা মাঝে মধ্যেই বলার মুদ্রা দোষ রয়েছে। আবার কিছু মানুষ আছে যারা ইয়ে মানে ইয়ে মানে না করলে যেন তার কথা আধুরা রয়ে যায়।

অনেকে আছেন যার প্রধান কাজ হচ্ছে একটা ম্যাচের কাঠি বা নরম কোন কিছু দিয়ে নিজের নাকের ভেতরের এমন অংশে গুতো মারা যাতে করে তার হাচি আসে। এইটা সে সারাদিন করতেই থাকে। এই কাজ না করলে তার যেমন চলেই না। অন্যদিকে অন্যান্য লোকজন এতে মারাত্মক রকমের বিরক্ত বোধ করে থাকেন।

আবার কিছু মানুষ আছেন যারা বেহুদায় হাসবে। কোন কারণ ছাড়াই হাসবে। আজব কিসিমের মুদ্রা দোষ এটি। তারা কোন পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে না। তাদের কাছে হাসা টাই মুখ্য। এই মুদ্রাদোষ যাদের আছে, তাঁরা কথায় কথায় নিজের প্রতিভা জাহির করেন। কখন কোথায় কী বলছেন কোন খেয়াল থাকে না। আর কাল্পনিক মুদ্রাদোষের মতো বাচনিক মুদ্রাদোষও ভয়াবহ।

কেউ কেউ আছেন হঠাৎ হঠাৎ ক্ষেপে যান, এটাও কী এক ধরণের মুদ্রাদোষ। কেউ কেউ সময় অসময় নেই অন্যের ত্রুটি খুঁজে বেড়াতে পছন্দ করেন এটাও মুদ্রাদোষ। আবার অনেকেই ভয় দেখিয়ে বেড়াতে বেশ পছন্দ করেন, এটাকেও কি মুদ্রাদোষের পর্যায়ে ফেলা যায়। মনোবিজ্ঞানীরা ভালো বলতে পারবেন।

তবে মোদ্দাকথা দাঁড়াচ্ছে এই যে, মুদ্রাদোষ জিনিসটা খুব মারাত্মক।

এক ভদ্রলোকের মুুদ্রাদোষ ছিল। কথায় কথায় তিনি ‘তোমার’ শব্দটি যোগ করে দিতেন। বএ নিয়ে গল্পের ফাঁদও আছে। তিনি গেছেন এক বন্ধুকে দাওয়াত করতে। খাবারের মেন্যু কী হবে সেটা বলছিলেন তিনি বন্ধুকে। বললেন, ‘কাল আমার বাড়িতে তোমার দাওয়াত। আসবেই কিন্তু, না এলে ভাই তোমার বিচার হবে। তোমার কব্জি ডুবিয়ে বন্ধুরা খাওয়া-দাওয়া করবো। ধরো তোমার খাসির মাংস ভুনা হবে। তোমার বেগুন ভাজা হবে। তোমার রুই মাছের দোপেঁয়াজি হবে। আর তোমার মাথা দিয়ে হবে মুড়োঘন্ট!’

মুদ্রাদোষ নানা রকমের হতে পারে। যেমন : হাতের নখ কামড়ানো বা পা নাচানো। কথা বলার সময় বার বার শ্রাগ করা। হাতের কাছে কিছু পেলেই সেটা নিয়ে কান চুলকানো। মাথা বা শরীরের কোন স্থান চুলকানো। কোন একটি বিশেষ শব্দ বার বার ব্যবহার করা। হাতের আঙ্গুল ফোটানো।মানুষ নিজের অজান্তেই এগুলোর চর্চা করতে থাকে।

মুদ্রাদোষগুলো থেকে নিজেরাই নিজেদের কিভাবে মুক্তি দিতে পারি।

১. প্রথমে মুদ্রাদোষটি শনাক্ত করুন। ২. সব সময় সচেতন থাকুন, যাতে মনের ভুলে এমন অভ্যাসের চর্চা না হয়। ৩. যিনি আনমনে বারবার পা নাড়েন, তিনি বসার ধরন বদলে ফেলুন।৪. যিনি কথা বলতে বলতে হাত নাড়েন, তিনি হাত পেছনে রেখে মনে জোর নিয়ে এসে কথা বলতে পারেন।৫. নিজের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ রাখুন।৬. যেকোনো কাজে গভীর মনোনিবেশ করুন।৭. আলস জীবনযাপন বা অতিরিক্ত ঘুমের অভ্যাস বাদ দিন।৮. নিয়মিত ব্যায়াম এবং ধ্যান করে মুদ্রাদোষ পরিহার করার ক্ষমতা তৈরি করুন।৯. কাছের মানুষদের জানিয়ে রাখুন, যাতে তাঁরা থামিয়ে দেন বা মনে করিয়ে দেন।১০. মুদ্রাদোষ থেকে মুক্তি পেতে আরেকটি ব্যায়াম করা যেতে পারে। তা হলো যিনি পা নাড়ান কিংবা হাত দিয়ে নাক, কান বা মাথা চুলকাতে থাকেন, তিনি দিনের একটা সময় ধরে একটানা পা বা হাতের দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে থাকুন। মনোযোগ নিয়ে দেখুন আর ভাবতে থাকুন অভ্যাসগুলোর কথা।১১. মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গেলে অবশ্যই মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

মুদ্রাদোষ থেকে পরিত্রাণের উপায় জানতে কথা জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মেখলা সরকারের সঙ্গে। তিনি বলেন উদ্বেগ কিংবা মানসিক অবসাদ মুদ্রাদোষের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে মানুষ যখন চিন্তামগ্ন থাকে, তখন নিজের অজান্তেই অপ্রয়োজনীয় সব কাজ বারবার করতে থাকে। মুদ্রাদোষগুলো দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। মৃদু কিংবা তীব্র। সব ধরনের মুদ্রাদোষকে মানসিক রোগ বলা ঠিক হবে না। বিশেষ করে মানুষ চিন্তামগ্ন অবস্থায় যে কাজগুলো করে, অন্যান্য সময় সাধারণত সে কাজগুলো করে না।

সমস্যা গুরুতর হলে তা শারীরিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে শৈশবে এ ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি থাকে। সে ক্ষেত্রে মনস্তত্ত্ববিদ বা সাইকিয়াট্রিস্টের শরণাপন্ন হতে হবে এবং তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

(অনলাইন ডেস্ক, ঘাটাইলডটকম)/-