মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী বীর চিত্তরঞ্জন দত্ত এখন স্মৃতি ও ইতিহাসের অংশ

একবার ওসমানী সাহেব আমাকে সি আর দত্তের কাছে পাঠিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গণী ওসমানীর সঙ্গে আমি কিছুদিন কাজ করেছিলাম। তখন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেন।

ওসমানী সাহেব সেই তালিকার জন্য ফরম আনিয়ে তা পূরণ করেন। নিয়ম ছিল তাতে দু’জন উর্ধতন বা সহযোদ্ধার সাক্ষ্য লাগবে। সে হিসেবে ওসমানী সাহেব তাঁর ফরমে যে দু’জনের সাক্ষ্য নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন তার একজন চিত্তরঞ্জন দত্ত এবং আরেক জন এইচ.এম.এ গাফফার। দু’জনেই মুক্তিযুদ্ধের বীরউত্তম।

মেজর জেনারেল দত্ত ৪ নম্বর সেকটরের অধিনায়ক ছিলেন। জেনারেল ওসমানীর মতনই বৃহত্তর সিলেট জেলার সন্তান। কর্নেল গাফফার সালদা নদী অববাহিকায় প্রচন্ড বীরত্বপূর্ণ লড়াই চালিয়েছিলেন।

ওসমানী সাহেবের ফরম পূরণ তৎপরতার সেই সময়ে গাফফার সাহেব খুলনা ছিলেন। তাঁর কাছে একজনকে পাঠালেন জেনারেল ওসমানী। আর আমাকে পাঠান জেনারেল দত্তের কাছে। তিনি তখন সেনাবাহিনী থেকে অবসরে।

১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগের আমলেই তাঁকে বিডিআর থেকে সরানো হয়। তিনি বিডিআর প্রধান ছিলেন। জেনারেল দত্তের হাতেই বাংলাদেশে এই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গোড়া পত্তন হয়। তাঁকে সরিয়ে পাকিস্তান ফেরত ব্রিগেডিয়ার খলিলুর রহমানকে করা হয় বিডিআর-এর মহাপরিচালক। পরে তাঁকে আর্মি থেকে অবসরে পাঠানো হয়।

এভাবে অবসর দেয়াটা মনে হয় মন থেকে মানতে পারেননি মুক্তিযুদ্ধের বীরউত্তম। হয়তো সে কারণেই তিনি নিজের নাম লেখার সময় অবসরপ্রাপ্ত না লিখে লিখতেন ‘রিলিজড’ অর্থাৎ অব্যাহতিপ্রাপ্ত।

আমি অবশ্য সেটা খেয়াল না করে তাঁকে রিটায়ার্ড বলে উল্লেখ করলে ঘোর আপত্তি করলেন। বললেন, নো নো আই অ্যাম নট রিটায়ার্ড, আই হ্যাভ বিন রিলিজড।

আগে থেকেই এপোয়েন্টমেন্ট করে আমি গিয়েছিলাম সকালের দিকে উনার বাসায়। উনি তখন মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান। প্রেসিডেন্ট জিয়া তাঁকে এ পদে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। খুবই হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল তাদের দু’জনের মধ্যে।

পাকিস্তানে একসময় আর্মির একই কোয়ার্টারের ওপর তলায় নিচতলায় বাসা ছিল তাঁদের। একটা পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তাঁদের মধ্যে। জেনারেল দত্ত কিছুটা সিনিয়ার হলেও বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন তাঁরা।

দু’জনের আরেকটা ব্যাপারে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে দু’জনেই ভারতের বিরুদ্ধে লড়াই করে গ্যালান্ট্রি এওয়ার্ড পান। আবার তাঁরা দু’জনেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অর্জন করেন বীরউত্তম খেতাব।

যা হোক, সি.আর. দত্তকে প্রেসিডেন্ট জিয়া বিআরটিসি চেয়ারম্যানও করেছিলেন। পরে আবারো তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান হিসেবে দ্বিতীয়বার দায়িত্ব দেন। একটানা ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি সে দায়িত্ব পালন করে অবসরে যান।

জেনারেল দত্ত কখনো কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেননি। নিজ ধর্মে প্রবল নিষ্ঠাবান হলেও তিনি উদার অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন।

খুব স্বল্পভাষী হওয়া সত্বেও নিজের মতামত খুব স্পষ্ট করে সাহসের সঙ্গে তুলে ধরতে কখনো পিছপা হতেন না।

১৯৮৮ সালে এইচ.এম. এরশাদ ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম করেন। এই পদক্ষেপ কতটা ধর্মানুরাগী আর কতটা রাজনৈতিক তা নিয়ে সংশয় থাকলেও বিপুল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এমন একটি স্পর্শকাতর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা সহজ কথা নয়। কিন্তু কোনো মুসলমান নাগরিকেরই যেটা করা কঠিন সেটাই করলেন সি.আর. দত্ত। রাষ্ট্রধর্মের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানালেন।

তিনি তাঁর নিজের হিন্দু সম্প্রদায় সহ ধর্মীয় সংখ্যালঘু অন্যান্য সম্প্রদায়কে নিয়ে গঠন করলেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ।

নাগরিকদের একটা বড় অংশ তাঁর এই ভূমিকাকে মেনে নিতে পারেনি। এই সংগঠনটি বিভিন্ন সময়ের তৎপরতা ও বক্তব্যের কারণে বিতর্কিত ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে চিত্রিত হয়। জেনারেল দত্ত নিজেও সমালোচিত হন এমন একটি সংগঠনের প্রধান হিসেবে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাযুদ্ধের একজন অধিনায়ক হয়েও তিনি কেন সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় সকলকে নিয়ে মূলধারার লড়াই গড়ে তুললেন না? কেন তিনি নিজেকে মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি সংকীর্ণ পরিচয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ করলেন? কেন তিনি এমন একটা সাম্প্রদায়িক সংগঠনের জন্ম দিয়ে নিজে তার প্রধান হলেন? কেন তিনি নিজেকে এমন করে বিতর্কিত ও ক্ষুদ্র করলেন?

আমি একদিন তাঁকে বিনীতভাবে এ প্রশ্নগুলো করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। নানামুখি সমালোচনায় তিনি বোধ হয় তখন খুব ক্ষুব্ধ। কিছুটা অসহিষ্ণুও। আমাকে প্রশ্ন শেষ করতে না দিয়েই খুব তিক্ত ও ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে উঠলেন: আমি বাঙলা নামের মানুষ, কাজেই আপনারা তো ধরেই নিয়েছেন আমি ইন্ডিয়ার এজেন্ট।

ভুলে গিয়েছেন এই দেশ অর্জনের জন্য আমিও জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলাম। তখন কিন্তু নিজেকে হিন্দু ভাবিনি, দেশের সন্তান ভেবেছিলাম। এখন মনে হয়, আমি তো হিন্দু। আমার দিকে সবাই সন্দেহের চোখে তাকায়।

এমন একটি দেশ গড়তে যুদ্ধ করিনি। এদেশে নিজে হিন্দু হলে বুঝতেন এ যন্ত্রণা কতো তীব্র। এসব প্রশ্ন করতেন না।

আমি কিছুটা অবাক হয়ে আর তাঁকে এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করিনি। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে আমার প্রশ্ন ছিল না। শ্রদ্ধা নিয়েই প্রশ্নটা করেছিলাম, আবেগের বশে তিনি কোনো ভুল পথ বেছে নিয়েছেন কিনা সেটা বুঝতে। কিন্তু তিনি ভুল বুঝলেন সম্ভবত।

আসলে ইতিহাসের নানান ক্রান্তিকালে এমন সব পরিস্থিতি ও পরিবেশের উদ্ভব ঘটে এবং নানান ঘটনাপ্রবাহ বিভিন্ন অবস্থানের মানুষকে এমনভাবে উৎক্ষিপ্ত করে তোলে, ভাবনাকে এমনভাবে পাল্টে ফেলে, মানবীয় সম্পর্কগুলোকেও এমনভাবে বদলে দেয় যা আমাদের কারুর আয়ত্বেই থাকে না।

পরিবর্তিত সময় কি জেনারেল দত্তকে বদলে ফেলেছিল? নাকি আমাদেরকে বদলে দিয়েছিল? নাকি পরিস্থিতিকেই এমন করে বদলিয়েছিল যাতে আমাদের অজান্তেই দুটি ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে তৈরি হয়ে গিয়েছিল মস্ত দূরত্ব?

খুবই কঠিন এসব প্রশ্নের জবাব মেলানোও এখন দুষ্কর।

সি.আর দত্ত সুদূর পরবাসে মৃত্যুবরণ করেছেন। বয়স হয়েছিল তাঁর। কিন্তু ইতিহাসের নির্মাতা এই মানুষগুলো আর ফিরবেন না কোনো দিন। তাঁর মৃত্যুর খবরে মনে পড়লো পুরনো দিনের কথাগুলো।

তাঁর বাসায় প্রথম ঘনিষ্ঠ সাক্ষাতকালে দেখেছিলাম কী বিনয়ী একজন বিরাট মানুষকে।

ওসমানী সাহেবের মুক্তিযোদ্ধা ফরমে কিছু লিখে সই করতে বলায় তিনি প্রথমেই বললেন, স্যার এটা কী করছেন? আমাকে ফোন করেছিলেন। উনাকে তো বলতে পারি না। আপনাকে বলছি। উনার তো এ ফরম পূরণের দরকার নাই। উনি সর্বাধিনায়ক। উনাকে কে সার্টিফিকেট দেবে যে উনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কিনা?

আমরা যারা সেকটর কমান্ডার ছিলাম তারাও তো ফরম ফিলাপ করছিনা। আমাদেরও দরকার নাই। এটা অন্যরা করবে।

আমি বললাম, সেটা উনাকে আরো কেউ কেউ বলেছে। কিন্তু ওসমানী সাহেব বলেছেন, আমি নিজে স্বাধীনতার পর থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করার কথা বলে আসছি। কিন্তু আওয়ামী লীগ কোনো মতেই রাজি নয়। তারা বলে থাকে, তালিকা কিসের? অল্প কিছু লোক ছিল স্বাধীনতা বিরোধী, বাকি সব মুক্তিযোদ্ধা।

লিস্ট করলে এই স্বাধীনতাবিরোধীদের করা উচিৎ। আসলে তাদের ভয় মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করলে আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে মাইনোরিটি হয়ে যেতে পারে। তাই তারা করেনি।

এখন জিয়াউর রহমান সেই উদ্যোগ নিয়েছেন। এতে আমার সমর্থন দেয়া উচিৎ। সকলকে উৎসাহিত করা উচিৎ। আমি ফরম ফিলাপ করে জমা দিলে বাকিরাও মনে করবে তাদেরও করা উচিৎ।

জেনারেল দত্ত আমার মুখের দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে থেকে বিনা মন্তব্যে ওসমানী সাহেবের যুক্তিটা শুনলেন। তারপর হাত বাড়িয়ে ফরমটা নিয়ে তাতে চোখ বুলিয়ে বললেন : ও মাই গড! এই ফরমে আমি কিছু লিখতে পারবো না। আমার এতোটা ধৃষ্টতা নেই। আমি উনার উর্ধতন বা সহযোদ্ধা নই। আমি উনার অধীনস্ত ছিলাম। কিছু লিখতে হলে আমি আলাদা কাগজে লিখে দিই।

এরপর উনি উনার প্যাডে একটা বক্তব্য লিখে আমার হাতে দিলেন। আমার যদ্দুর মনে পড়ে তাতে তিনি ইংরেজিতে যা লিখেছিলেন তার মর্মার্থ এ রকম: “আমি পরম গৌরবের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, আমাদের মহান জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে আমি সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানীর অধীনে চার নম্বর সেকটরের অধিনায়ক হিসাবে অংশগ্রহন করি। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নেই ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের শুরুতে আমরা তেলিয়াপাড়া চা বাগানের বৈঠকে তাঁকে সর্বাধিনায়ক করে মুক্তিবাহিনী গঠন করি। তিনি আমাকে অন্যতম সেকটর কমান্ডার নিযুক্ত করেন। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য গঠিত প্রবাসী সরকার এই সকল সিদ্ধান্ত ও নিয়োগ অনুমোদন করে।”

এই ছিলেন সেদিনের সি.আর.দত্ত।

পরে তাঁকে অনেকবারই বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে আসতে দেখেছি। কখনো তিনি আসতেন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কথা বলতে।

কিন্তু এসব ইস্যুতে তিনি বাইরে যত তীব্র ভাষাভঙ্গিতে কথা বলতেন বেগম জিয়ার সান্নিধ্যে তার সম্পূর্ণ বিপরীত মূর্তিতে দেখতাম তাঁকে। কথায় ও আচরণে প্রকাশ পেতো সৌজন্য ও আন্তরিকতা।

এছাড়া পূজা-পার্বণ সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করতে কিংবা নিছক সৌজন্য সাক্ষাতেও আসতে দেখেছি তাঁকে বেশ কয়েকবার।

আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর গুলশান অফিসেও বার দুয়েক তিনি এসেছেন। তাদের দু’জনের কাউকে কখনো রাজনৈতিক বিষয়ে কোনো কথা তুলতে আমি দেখিনি।

পারষ্পরিক স্বাস্থ্য ও পারিবারিক খবরাখবর বিনিময় এবং পুরনো দিনের স্মৃতিচারণই তারা বেশি করতেন।

একবার দত্ত বাবু দীর্ঘক্ষণ আলাপ সালাপ সেরে চলে যাবার পর মাঝ লেবেলের এক নেতা তাঁর সংগঠনের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললে ম্যাডাম বললেন, জানি, কিন্তু ওটা আলাদা বিষয়। উনার সাংগঠনের ব্যাপারে রিজার্ভেশন তো আছেই। কিন্তু সি. আর. দত্ত আমাদের পুরনো পারিবারিক বন্ধু।

মানুষের জীবন নানা অধ্যায়ে বিভক্ত। জীবনের থাকে কতো দিক-দিগন্ত, কতো বর্ণ ও বিভা, কতো কালার এন্ড শেড। কিন্তু একটা মানুষকে কি খণ্ডিত করে বিচার বা মূল্যায়ন করা যায়?

আমরা মানুষের মূল্যায়ন করি মোটের ওপর। কখনো জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ের কর্মের কারণে তার আগের সব কর্মকে বিবেচনার বাইরে ফেলে দিই আমরা। তাতে কি কারুর সঠিক মূল্যায়ন কিংবা তার প্রতি সুবিচার করা হয়? কে জানে? এ প্রশ্নেরও সরল কোনো জবাব নেই।

মুক্তিযুদ্ধের এক বিজয়ী বীর চিত্তরঞ্জন দত্ত এখন হয়ে গেলেন আমাদের স্মৃতি ও ইতিহাসের অংশ। একজন মানুষ একটি সমাজে বিশেষ সময়কালে যেভাবে পরিচিতি পান সেটিই তার পরিচয়ের সবটা কিনা এবং এই পরিচয়ের আড়ালে আরো কোনো সত্য লুকিয়ে আছে কিনা সেই প্রশ্নটা রেখেই তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।

প্রার্থনা করি অনন্তলোকে তাঁর আত্মা পরম শান্তি লাভ করুক।

(মারুফ কামাল খান, ঘাটাইল ডট কম)/-