মুক্তাগাছার মণ্ডা, আড়াইশ বছরেও স্বাদে-গুণে অতুলনীয়

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার নাম নিলেই চলে আসে মণ্ডার নাম। এখানকার মণ্ডার স্বাদ নেয়নি এমন ভোজনরসিক খুব কমই আছে। কেউ যদি বলে ময়মনসিংহ কিসের জন্য বিখ্যাত, প্রথম উত্তরটাই হবে ‘মুক্তাগাছার মণ্ডা’। এখানে বিয়ে, জন্মদিন কিংবা যেকোনো অনুষ্ঠানে এ মণ্ডা ছাড়া তো কল্পনাই করা যায় না।

আহ-হা! মুখে দিলেই সে কি তৃপ্তি। আড়াইশ বছরের ঐতিহ্যসমৃদ্ধ গোপাল চন্দ্র পালের মণ্ডা এভাবেই স্বাদে-গুণে ধরে রেখেছে সুখ্যাতি। এ মণ্ডার দোকান ময়মনসিংহ নগরী থেকে ১৬ কিলোমিটার পশ্চিমে মুক্তাগাছা পৌর সদরে অবস্থিত।

জানা গেছে, আড়াইশ বছর আগে স্বপ্নের মধ্যে এক ঋষি মণ্ডা মিষ্টি তৈরি করতে আদেশ দিয়েছেন মুক্তাগাছার গোপাল পালকে। পরদির গোপাল ঋষির আদেশে চুল্লি খনন শুরু হয়। সেখানে এক সাধু দৃশ্যমান হয়ে হাত বুলিয়ে দিলেন সেই চুল্লিতে। গোপালকে শিখিয়ে দিলেন মণ্ডা তৈরির কলাকৌশল। গোপাল তার নব উদ্ভাবিত মণ্ডা পরিবেশন করলেন তৎকালীন মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর রাজদরবারে। মণ্ডা খেয়ে মহারাজা পরম তৃপ্তির ঢেকুর তুলে প্রশংসায় ভাসালেন গোপালকে। শুরু হলো মণ্ডার যাত্রা। পরবর্তীতে প্রসিদ্ধ মণ্ডার জনক হিসেবে পরিচিতি পান গোপাল পাল।

জমিদারদের খুবই পছন্দের মিষ্টান্ন ছিল এ মণ্ডা। তাদের হাত ধরে দিনদিন উপমহাদেশের সবখানে ছড়িয়ে পড়ে এ মণ্ডার সুখ্যাতি। মুক্তাগাছার মণ্ডা খেয়েছেন বিখ্যাত মহামানব ও মনীষীরা। গোপাল পালের মণ্ডা তৈরির সময়টা বাংলা ১২৩১ ও ইংরেজি ১৮২৪ সাল থেকে।

জানা গেছে, ১৭৯৯ সালে ভারতবর্ষের মুর্শিদাবাদ জন্মগ্রহণ করেন গোপাল চন্দ্র পাল। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর পালিয়ে তিনি সেখান থেকে রাজশাহী চলে যান। এরপর আসেন মুক্তাগাছার তারাটি গ্রামে। ১৯০৭ সালে গোপাল পালের মৃত্যুর পর তার ছেলে রাধানাথ পাল, রাধানাথের ছেলে কেদার নাথ পাল, কেদার নাথের ছেলে দ্বারিকানাথ পাল এবং বর্তমানে দ্বারিকানাথের ছেলে রমেন্দ্র নাথ পাল অ্যান্ড ব্রাদার্স মণ্ডা তৈরি করে বিক্রি করছেন।

আরও জানা গেছে, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানও এ মণ্ডা খেয়ে প্রশংসা করেছেন। মুক্তাগাছার মণ্ডার স্বাদ নিয়েছেন পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান, ভারতের পশ্চিম বঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধান কৃষ্ণ রায়, উপমহাদেশের প্রখ্যাত সারোদ বাদক ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, রাশিয়ার কমরেড স্ট্যালিন, চীনের নেতা মাও সেতুং। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তাগাছার এক সভায় এসে মণ্ডা খেয়ে প্রশংসা করেছিলেন। স্বাধীনতার পর তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও ব্রিটেনের রাণী এলিজাবেথ বাংলাদেশে এলে মুক্তাগাছার মণ্ডা দিয়ে আপ্যায়ন করা হলে তারাও এটির বেশ প্রশংসা করেছিলেন।

মুক্তাগাছার মণ্ডা আসলে এক প্রকার সন্দেশ। দুধের ছানা ও চিনি দিয়ে এটি তৈরি করা হয়। মণ্ডার তৈরির বৈশিষ্ট্য যারা এটি তৈরি করেন কেবল সেই কারিগররাই জানেন।

গোপাল পালের দোকানের বর্তমান মালিক ৫ম বংশধর রমেন্দ্র নাথ পাল জানান, প্রতি কেজি মণ্ডা ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হয়, সেখানে ২০টি মণ্ডা থাকে। মণ্ডা তৈরির পর তা ফ্রিজে সংরক্ষণ করা হয় না।

তিনি বলেন, ‘আসল মণ্ডার স্বাদ পেতে হলে মুক্তাগাছায় আসতে হবে। দেশের কোথাও আমাদের কোনো শাখা নেই। তবে মুক্তাগাছার মণ্ডার নাম দিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ক্রেতাদেরকে প্রতারিত করছে।’

যাতায়াত ব্যবস্থা:

বাস ঢাকা থেকে সড়ক পথে ময়মনসিংহে আসতে মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে বিভিন্ন পরিবহন সংস্থার মেইল ও লোকাল গাড়িতে ২ ঘন্টা ৩০ মিনিট থেকে ৩ ঘন্টা ৩০ মিনিটে ময়মনসিংহে পৌঁছা যায়। মহাখালী ছাড়াও কমলাপুর, বিআরটিসি টার্মিনাল থেকে ঢাকা-নেত্রকোনা রুটের গাড়িতেও ময়মনসিংহে আসা যেতে পারে। এ পথে সবচেয়ে ভাল পরিবহনের মধ্যে রয়েছে এনা ট্রান্সপোর্ট। এ সেবা পেতে জনপ্রতি গুনতে হবে ২২০ টাকা। মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে এই পরিবহণ ছেড়ে যায়। সৌখিন পরিবহন-১৫০ টাকা। ময়মনসিংহ থেকে মুক্তাগাছা বাস সার্ভিস রয়েছে। চাইলে মুমিনুন্নেসা মহিলা কলেজ মোড় থেকে সিএনজি চালিত অটোরিকশায় চড়েও মুক্তাগাছা যেতে পারেন। মাথা পিছু ভাড়া পড়বে ২০ টাকার মতো)।

ট্রেন: ঢাকা থেকে তিস্তা এক্সপ্রেস সাতটা বিশ এ ময়মনসিংহ এর উদ্দেশ্যে ছাড়ে। এছাড়াও অগ্নিবীনা এক্সপ্রেস নয়টা চল্লিশ এ ছাড়ে। এগুলো সব আন্তঃনগর ট্রেন। মেইল ট্রেনেও যেতে পারেন। মেইল ট্রেন গুলো হল মহুয়া এক্সপ্রেস, দেওয়ানগঞ্জ এক্সপ্রেস, বলাকা এক্সপ্রেস ইত্যাদি।

(উবায়দুল হক, ঘাটাইলডটকম)/-

225total visits,1visits today