মির্জাপুরে সেতুর ওপর পলিথিনের ছাউনিতে শতাধিক পরিবারের ঈদ

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলায় বন্যার কারণে শতাধিক দরিদ্র পরিবারের ঈদ কাটল বংশাই নদীতে নির্মিত একাব্বর হোসেন সেতুর ওপর পলিথিনের ছাউনিতে।

গত ২৪ ঘণ্টায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও পানিতে নিমজ্জিত বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলোর দুর্ভোগ কমেনি। খেয়ে না-খেয়ে অতি কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের।

মির্জাপুর পৌর এলাকার পোষ্টকামুরী পূর্বপাড়া (সওদাগরপাড়া) বন্যার পানিতে অধিকাংশ বাড়িঘর নিমজ্জিত হয়ে গেছে। এতে ওই পাড়ার অন্তত শতাধিক পরিবার বংশাই নদীর ওপর নির্মিত একাব্বর হোসেন সেতুতে আশ্রয় নিয়েছে।

আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলো প্রায় দুই সপ্তাহ যাবৎ ওখানে পলিথিনের ছাউনি দিয়ে বসবাস করছে। কখনো রোদে পুড়ছে আবার কখনো বৃষ্টিতে ভিজে খেয়ে না-খেয়ে দিন কাটাচ্ছে তারা।

সরেজমিন ওই এলাকার মানুষগুলোর দুর্ভোগের কথা জানা গেছে।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার বংশাই নদীর পাশে দুই শতাধিক পরিবার বসবাস করছে। যাদের অধিকাংশেরই পেশা ছাতা, গ্যাসলাইটার মেরামত, ফেরি করে কাচের জিনিস, ক্ষুদ্র কসমেটিক্স বিক্রি ও মুদি দোকান করা।

অনেকেই আবার অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। তারা মূলত বেদে সম্প্রদায়ের বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন।

ওই এলাকার বাবলী জানান, বন্যার পানিতে ঘর ডুবে যাওয়ার পর তিনি স্বামী ও তিন সন্তান নিয়ে প্রায় ১২ দিন আগে আশ্রয় নেন একাব্বর হোসেন সেতুর ওপর।

বাবলীর স্বামী আসাদ গ্যাসলাইটার ও ছাতা মেরামত করেন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতির জন্য কয়েক মাস ধরে তেমন কাজ নেই। তার ওপর বন্যা। বাড়ি ছেড়ে সেতুর ওপর ঠাঁই নেওয়ার পর কোনোরকমে সন্তানদের নিয়ে খেয়ে না–খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন বলে তিনি জানান।

মাহাবুব মিয়া (৩২) জানান, তিনি ফেরি করে গ্যাসলাইটের কাজ করেন। বন্যার কারণে কোথাও যেতে পারেননি।

শাহানা আক্তার (৫৫) জানান, তিনি ব্রিজের কাছে ছোট একটি দোকান করেন। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে।

দুই পা হারা পাভুজ আলী (৭০) জানান, তিনি কোনো কাজ করতে পারেন না। তাই ভিক্ষা করেন। বন্যার কারণে কোথাও যেতে পারেন না।

রোকসানা (৪৫) জানান। তিনি একজন গৃহিণী হলেও অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। তার চার ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে। করোনার জন্য কেউ কাজে নিচ্ছে না। তার মধ্যে আবার বন্যা। সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটছে বলে জানান।

পা হারা জিহাদ মিয়া (১৪) জানায়, সে চকির ওপর বসে পেয়ারা বিক্রি করছেন। এতে সে প্রতিদিন ১০০/১৫০ টাকা উপার্জন করছে বলে জানায়।

তারা জানান, ঘর ছেড়ে আসার পর দিনে দুবেলা খান তারা। ঈদের দিনও তিন বেলা খেতে পারেননি। অনেকেই আলুভর্তা ভাত খেয়েছেন।

এছাড়া সেতুতে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলো শিশু সন্তানদের নিয়ে ‍দুশ্চিন্তায় রয়েছে।

সেতুটির ওপরে দুই পাশে পলিথিনে মোড়ানো প্রায় শতাধিক ছোট ছোট পৃথক ছাউনি রয়েছে। সেখানে তারা আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রয়স্থলে ছোট ছোট শিশুরা খেলা করছে। অনেক শিশু চৌকিতে ঘুমাচ্ছে। বড়দের অনেকে ক্লান্ত শরীরে গবাদিপশুর সঙ্গে একই ছাউনিতে ঘুমাচ্ছেন।

বৃদ্ধ সোনাভানু বলেন, ১২ দিন ধইরা এনে আইছি। খ্যায়া না খ্যায়া দিন কাটাইতাছি। একবার একজনে আয়্যা কয়ডা চ্যাল দিল। তারপর আর কেউ খবর নিল না। কাম নাই। ভালো খাওন নাই। খালি ঘুম আর ঘুম। খালি প্যাটে তো ঘুমও আহে না। গরু-ছাগল নিয়ে সেতুটিতে আশ্রয় নিয়েছেন ছমন মিয়া। তিনি সেই গবাদিপশুর সঙ্গে একই পলিথিনের ছাউনিতে ঘুমাচ্ছিলেন।

মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবদুল মালেক বলেন, সেতুর ওপর আশ্রয় নেওয়া লোকদের সরকারিভাবে কিছু সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আরো সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানান।

(মির্জাপুর সংবাদদাতা, ঘাটাইল ডট কম)/-

Print Friendly, PDF & Email