মায়ের বুকে চিরনিদ্রায় শায়িত খোকা

সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন ঢাকা নগরীর মানুষের ভালোবাসা। রাজধানী ঢাকার নিযুত অশ্রুসজল শোকার্ত মানুষ তার মরদেহকে ঘিরে পথে নেমে তা প্রমাণ করেছে। লাখো মানুষ তাদের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা দিয়ে বিদায় অভিবাদন জানিয়েছে তাদের ভালোবাসার বরপুত্রকে।

একটি কফিনকে ঘিরে পুরো নগরী যেন নেমে এসেছিল পথে। কিশোর, কুলবধু, প্রবীন, ছাত্র, যুবক, মুক্তিযোদ্ধা, নানা দলমতের রাজনৈতিক কর্মী, শ্রমজীবী-কর্মজীবী নাগরিক, মসজিদ-মাদ্রাসার আলেম, সনাতনের ধর্মের প্রতিনিধি, সংষ্কৃতি ও ক্রীড়াঙ্গনের মানুষ কেউ বাদ থাকেনি। এমনকি নারী পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও ফুল হাতে পথের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন এই ঢাকার প্রিয় খোকাকে শেষবিদায় যাত্রায় শ্রদ্ধা জানাতে।

সাদেক হোসেন খোকা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বীরোচিত সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন। সেটা তার জীবনের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। মানুষের এতো ভালোবাসার কারণ কি কেবল সেটাই? অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধার অন্তিমযাত্রায় এতোটা ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ তো ঘটতে দেখা যায় না। মুক্তিযুদ্ধে অবদান অবশ্যই মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হবার প্রধান কারণ, তবে একমাত্র কারণ নয়। আরো কিছু কারণ ও ব্যাপার অবশ্যই আছে যা খুঁজতে হবে সাদেক হোসেন খোকার জীবন থেকে।

রাষ্ট্রশক্তি ও ক্ষমতার বিপরীত মেরুতে থেকেও এতো অপরিমেয় ভালোবাসা সত্যিই বিরলপ্রাপ্তি। যে আদর্শ তিনি লালন করতেন তা আজ আক্রান্ত। রাষ্ট্রীয় আক্রোশ ও কারসাজিতে তার দলটি ছত্রখান হয়ে আছে। সংগঠিত ভাবে কোনো কিছুর আয়োজন ও প্রচারের সাধ্য-শক্তিও তাদের এখন নেই। কিন্তু কোনো সীমাবদ্ধতাই যে মানুষের ভালোবাসার প্রতিবন্ধক হতে পারেনা তা মানুষ আরেকবার প্রমাণ করলো।

ইঙ্গিতের আদালতের ফরমায়েশি সাজা এবং ক্ষমতার কুরসি থেকে স্পন্সর করা কুৎসাকে অবজ্ঞা ও উপেক্ষা করেই মানুষ তাদের ভালোবাসা ও আস্থার প্রকাশ ঘটিয়েছে। ভালোবাসা ও একতার আদর্শের প্রতি মানুষ তাদের সমর্থন এভাবেই প্রকাশ করে যে-কোনো সুযোগ ও উপলক্ষ পেলেই। এ ভালোবাসার আরেক নাম দেশপ্রেম।

যারা ঘৃণা-বিদ্বেষ-প্রতিহিংসার আবাদ করেন তারা জেনে রাখুন, ঘৃণা ও দ্বন্দ্বকে পুঁজি করে ক্ষমতার চর্চায় মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে আপনাদের থেকে। সশস্ত্র সান্ত্রী-সিপাইয়ের পাহারাঘেরা ক্ষমতা আপনাদের জন্য জমিয়েছে মানুষের ঘৃণার পাহাড়। সেখান থেকে মানুষের কাছে, ভালোবাসার কাছে ফিরে আসার কোনো পথ কি খোলা আছে?

মায়ের কোল আলো করে এসেছিলেন খোকা, শেষ আশ্রয়ও সেই মায়ের বুকে। ঢাকায় চার দফা জানাজা শেষে আজ বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) বিকেলে জুরাইনে মায়ের কবরে দাফন করা হয়েছে অবিভক্ত ঢাকার শেষ মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে। সব আপনজন আর শুভাকাঙ্খীদের কাঁদিয়ে চির দিনের জন্য আশ্রয় হলো মায়ের কাছে।

২০০২ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের অবিভক্ত থাকা কালে মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন খোকা, সেখানে শেষবারের মত বেলা পৌনে তিনটায় নেয়া হয় তার মরদেহ। প্রিয় মানুষের মরদেহ আনার পর (বর্তমান) ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশের অনেক কর্মকর্তা কর্মচারীরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন অনেকে। নগর ভবনও যেন কাঁদছিলো খোকার শোকে।

বেলা পৌনে ৪ টায় গোপীবাগের ধুপখোলা মাঠে নিয়ে যাওয়া হয় খোকার মরদেহ। সেখানে শেষ নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তারপর দাফন করা হয়।

সাদেক হোসেন খোকার জন্ম ১৯৫২ সালের ১২ মে। চলতি বছরের গত ৪ নভেম্বর নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করেন তিনি।

আশির দশকে বামপন্থি রাজনীতি ছেড়ে আসেন বিএনপিতে। ওই সময় নয়াবাজার নবাব ইউসুফ মার্কেটে বিএনপির কার্যালয় থেকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সূচনা করে সাতদলীয় জোটের নেতৃত্ব দেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ওই অন্দোলনে ঢাকা মহানগর সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছিলেন খোকা।

১৯৯০ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে পুরান ঢাকার মানুষের মনে আস্থার জায়গা করে নেন। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৭ আসনে (সূত্রাপুর-কোতোয়ালি) শেখ হাসিনাকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় আসেন। এসময় তিনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ঢাকার আটটি আসনের মধ্যে সাতটিতে বিএনপি প্রার্থী পরাজিত হলেও একমাত্র খোকা নির্বাচিত হন। দিনে দিনে তার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ঢাকার রাজনীতিতে খোকা ফ্যাক্ট হয়ে ওঠেন। পরে আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনে প্রায় পাঁচ বছর একক নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মৎস্য ও পশুসম্পদমন্ত্রী হন। ওই সময় পুরান ঢাকায় বিএনপির রাজনীতিতে নিজস্ব বলয় তৈরির পাশাপাশি প্রতিটি থানা ও ওয়ার্ডে দলকে শক্তিশালী করার পেছনে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

এর আগে ১৯৯৪ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ হানিফের কাছে পরাজিত হন মির্জা আব্বাস। বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য বিরোধী দল কঠোর আন্দোলন শুরু করলে ঢাকায় বিএনপি কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় খোকাকে ১৯৯৬ সালে মহানগর বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনি মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি ঢাকার মেয়র ছিলেন।

(বিশেষ প্রতিবেদক, ঘাটাইলডটকম)/-