মায়ের কাছে একটি জারজ সন্তানের চিঠি

মা শব্দটি অতি ছোট কিন্তু জগতের সবচেয়ে ভারী সন্মান ও মায়ার, আদরের। নারী জাতির স্বার্থকতা মাতৃত্বে। সন্তান তার গর্বের ধন। আর তাইতো “মা” সবচেয়ে মর্যাদা ও সন্মানের। কিন্তু কখনো কখনো মা হয় কলংকিনী। আমাকে গর্ভে ধারণ করে তুমি তাই হয়ে গেলে মা।

জানি লোক লজ্জার ভয়ে তুমি আমাকে এভাবে ছুঁড়ে ফেলে দিলে। সুন্দর এ পৃথিবীর আলোর মূখ দেখাবে না, তাহলে কেন আমাকে গর্ভে ধারণ করেছিলে?

আমিতো তোমার যৌবন জ্বালার ক্ষনিকের মোহে তোমার অবৈধ মিলনের কলংকের ফসল। লোক সমাজে মেকী সন্মান বাঁচাতে স্নেহ-মায়া- মমতা বিসর্জন দিয়ে নির্দয়ের মত তাই আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছো।

কাঁচা শরীরে আমি খুব ব্যথা পেয়েছিলাম মা, ভেবেছিলাস প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হয়তো তড়িঘড়ি করে ফেলে গেছো, ব্যথার যন্ত্রনায় অনেকক্ষন কাতরানের পরও যখন তুমি এলে না তখন বুঝতে পারলাম তুমি আর ফিরে আসবে না।

কারণ তোমার অবৈধ মেলামেশার ক্ষনিকের আনন্দের সমাজের কলংকিত ফসল আমি। যাকে লোক বলবে পিতৃহীন জারজ, আর তোমাকে বলবে ব্যভিচারিনী কলংকিনী, ভ্রষ্টা।

এতে আমার কি দোষ মা, গর্ভে এনে আমাকে এভাবে ফেলে দিলে? সমাজের কাছে তুমি রয়ে গেলে পুত পবিত্র, সতীসাধ্বী।

কিন্তু লোকচক্ষুর আড়ালে তুমি যে কাজ করলে তাতে সমাজে সতী সাজলেও অন্তর তোমাকে কি ক্ষমা করবে- হবে কি তোমার পাপমোচন? তুমি এখনো আসছো না কেন মা?

ভয়ে যে আত্মা আর গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। কাছেই গহীন আঁধারে শেয়ালের ডাক শুনে ভয়ে ছোট্ট হৃদয় কেঁপে উঠছে মা, শরীর শিউরে উঠছে এখনই বুঝি শেয়াল কুকুরে আমার দেহ ছিঁড়ে ছুবরে খাবে।

আমার কচিদেহে পিঁপড়া, পোকার বিষাক্ত কামড়ের যন্ত্রনাও ভুলে গেছি মা। নরম শরীরে পোকার কামড়ের যন্ত্রনায় কাদতে পারি না মা। যদি কান্না শুনে রাতে খাবারের সন্ধানে আসা শেয়াল কুকুরেরা শব্দ শুনে দ্রুত ছুটে এসে আমাকে খুবরে খায় এই ভয়ে। মৃত্যু যন্ত্রনা সয়েও ভোরের আশায় প্রহর গুনছি।

ভোরে যদি কেউ আমাকে দেখে দয়াপরবশ হয়ে মানবিক বিবেচনায় তুলে নেয়, হয়তো বেঁচে যেতে পারি।

ভয়ার্ত হৃদয়ে যন্ত্রনায় বিদ্ধস্ত শরীরে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে এসে প্রতিক্ষীত ভোরের আলো বিচ্ছুরণে কিঞ্চিত আশায় বুক বাধলাম। হয়ত কেউ এসে দেখবে, পরে তার সাড়ায় আরো অনেকে আসবে, নানা কথা বলবে। তার মাঝে হতে কারো হৃদয়ে মানবতা জাগলে আমাকে তুলে নিতে পারে। কারো ঘরে বা কোন অনাথ আশ্রমে পরিচয়হীনভাবে অন্তিম মূহুর্তে বেঁচেও যেতে পারি।

এমনি নানা ভাবনায় ঘোরপাক খেতে একটি চিৎকার কানে এলো, ও মাগো! এ কোন মায়ের সন্তান এভাবে ফেলে গেছে! মহিলার আর্তচিৎকারে মুহুর্তের মধ্যে ছোটবড় অনেকে এসে ভীড় জমালো

আমাকে উৎসুক দৃষ্টিতে দেখে দুঃখ আফসোস সহানুভূতি প্রকাশ করতে লাগল। সাথে সাথে যে নরাধম একাজ করেছে তার প্রতি ঘৃনা জানিয়ে অকথ্য ভাষায় তিরস্কার ও গালাগালি করতে লাগল।

জান মা সবাই যখন দোষারোপ, তিরস্কার আর গালিগালাজ করছিল আমার ভীষন খারাপ লাগছিল।শত হলেও তুমি তো আমার গর্ভধারিনী। সন্তানের কাছে মা কখনো দোষী হয় না।

যাক ততক্ষণে আমার সব শেষ হয়ে গেছে মা।

নানা কথার পর আমাকে মৃত ভেবে সমবেত সুধীজন সিদ্ধান্ত নিল শিয়াল কুকুরে খেলে পঁচে দুর্গন্ধ হবে-তাই আমাকে কাছেই নদীর জলে ফেলে দেওয়াই উত্তম। যে কথা সই কাজ। সাথে সাথে একজন লাঠিস্বরুপ একটি লাকড়ী দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমাকে যখন নদীর দিকে নিচ্ছিল সেকি কষ্ট মা তোমাকে বুঝাতে পারব না। লাঠির প্রতি খোঁচায় শুধু তোমার কথাই মনে পড়ছিল।

নদীর জলের ধারে এনে লম্বা এক খোঁচায় আমাকে নদীর জলের মাঝে ফেলে দিল।আমি তলিয়ে যাচ্ছি মা,নিশ্বাস বন্দ হয়ে আসছে। জলজ প্রাণীদের উদরে বিলীন হয়ে যাবার অপেক্ষামাত্র।

তুমি তো সতীসাদ্ধী বেশেই বিয়ের পিঁড়িতে বসবে, নূতন জীবন সাথী নিয়ে সুখে করবে ঘর সংসার। জগতের কেউই জানবে না লোকচক্ষুর অন্তরালে তুমি যে ফুল ধারণ করেছিলে প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই কেন তাকে কিভাবে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছো। সংসারে তুমি অনেক ফুল ফোটাবে কিন্তু কোন ফুল যদি অকালে ঝরে যায় তখন অনেক কান্নাকাটি করবে দুঃখ পাবে, বুঝাবে গর্ভের আদরের সন্তান হারানোর বেদনা।

অধোর ধারায় ঝরবে চোখের জল, তা দেখে অনেকে তোমায় দেবে শান্তনা,জানাবে সমবেদনা।

দূর্ভাগ্য আমার -তোমার দু’ফোটা চোখের জল দেখে জীবন সায়াহ্নের অবসান হলো না।

বিদায় বেলায় শুধু এইটুকু বলি কোন নারী যেন যৌবনের উম্মাদনায় কারো প্রলোভনে পরে এভাবে সন্তান জন্ম দিয়ে মা জাতির উপর কলংকের কদর্য কালিমা লেপন না করে।

সম্প্রতি টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার গোলাবাড়ী এলাকায় বংশাই নদীর তীরে রাতের আঁধারে ছবির শিশুটি ফেলে যাওয়ার ঘটনা অবলম্বনে লিখেছেন সিনিয়র সাংবাদিক এম এ রউফ।

(ঘাটাইলডটকম)/-