মানুষের লেখার শক্তিকে কমিয়ে দিচ্ছে স্মার্টফোন

দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে স্মার্টফোন। প্রযুক্তি পণ্যটি নানাভাবে জীবনকে যেমন সহজ করে তুলছে, তেমনি এর বিরূপ প্রভাব নিয়েও দেশে-বিদেশে চলছে বিস্তর গবেষণা। এমনই একটি গবেষণা পরিচালনা করেছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন গবেষক। ওই গবেষণার তথ্য বলছে, টানা স্মার্টফোনের ব্যবহার স্নায়ুর ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে স্মার্টফোনের অতি ব্যবহার আঙুলের শক্তি কমিয়ে দেয়, যা তাদের পরীক্ষায় লেখার গতিকে শ্লথ করে দিতে পারে।

শিক্ষার্থীদের হাতের লেখার শক্তির ওপর স্মার্টফোনের প্রভাব নিয়ে এ গবেষণা চালানো হয়। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালের তত্ত্বাবধানে গবেষণা দলে ছিলেন ওই বিভাগের দুই শিক্ষার্থী আদিত্য রাইহান আকিব ও ওয়াসিফ হোসেন।

পিঞ্চ স্ট্রেন্থের মানের ওপর স্মার্টফোন ব্যবহারের প্রভাব নির্ধারণ এবং স্মার্টফোন ব্যবহারের আগে ও পরে পিঞ্চ স্ট্রেন্থের কী পরিবর্তন হয়, তা বের করাই ছিল এ গবেষণার লক্ষ্য। পিঞ্চ স্ট্রেন্থ মূলত তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুলের মিলিত শক্তি, যা দিয়ে ছোট কোনো বস্তু ধরা হয়। কলম, সুই, স্ক্রু-ড্রাইভার ইত্যাদি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আঙুলের এ শক্তির প্রয়োজন হয়।

গবেষণার তথ্য বলছে, শিক্ষার্থীরা একটানা বেশিক্ষণ স্মার্টফোন ব্যবহার করলে তাদের পিঞ্চ স্ট্রেন্থ কমে যায়। স্মার্টফোন ব্যবহারের সময় মানুষ তার বেশির ভাগ শক্তি হাতের এ দুই আঙুলের ওপরই দিয়ে থাকে। আর কলম ধরার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় গবেষণার জন্য তা বেছে নেয়া হয়।

পিঞ্চ স্ট্রেন্থ পরিমাপ করার জন্য ‘ডিজিটাল পিঞ্চ/গ্রিপ অ্যানালাইজার’ নামে একটি ইনস্ট্রুুমেন্ট ব্যবহার করা হয়। এ গবেষণায় পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণের জন্য রিসার্চ টুল হিসেবে ব্যবহার হয়েছে মাইক্রোসফট এক্সেল ও স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যানালাইসিস টুল (এসপিএসএস) সফটওয়্যার।

মোট ৭১ জন শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত এ গবেষণায় ডিজিটাল ইনস্ট্রুমেন্টের মাধ্যমে প্রথমে প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর পিঞ্চ স্ট্রেন্থের মান বের করা হয়। তাদের ৬৮ দশমিক ১ মিলিমিটার, ৭৩ দশমিক ৯ মিলিমিটার ও ৭৭ দশমিক ২৬ মিলিমিটার—এ তিনটি ভিন্ন প্রস্থের স্মার্টফোন দেয়া হয়েছিল। ৩০ মিনিট পরপর পিঞ্চ স্ট্রেন্থের মান নেয়া হয়।

গবেষণায় পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর শিক্ষার্থীদের পিঞ্চ স্ট্রেন্থ কমে যায়। আর ৯০ মিনিট পর এটির মান সবচেয়ে বেশি কমে যায়। ছেলেদের ক্ষেত্রে স্মার্টফোন ব্যবহারের আগে পিঞ্চ স্ট্রেন্থের গড় মান ছিল ২৮ দশমিক ৮৩ নিউটন, যা ৯০ মিনিট ব্যবহারের পর ১৪ দশমিক ২৫ নিউটনে নেমে আসে। মেয়েদের ক্ষেত্রে স্মার্টফোন ব্যবহারের আগে পিঞ্চ স্ট্রেন্থের গড় মান ছিল ২৩ দশমিক ৫৩ নিউটন, যা ৯০ মিনিট ব্যবহারের পর ১১ দশমিক ৯৫ নিউটনে নেমে আসে।

১৯-২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত ওই গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, গড় পিঞ্চ স্ট্রেন্থ সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে ১৯ বছর বয়সী ছেলেদের ক্ষেত্রে, ২৪ দশমিক ৭৬ নিউটন। একই বয়সী মেয়েদের ক্ষেত্রে এটি ২৪ দশমিক ৬ নিউটন। ২০ বছর বয়সী ছেলেদের পিঞ্চ স্ট্রেন্থ ২৩ দশমিক ৭৮ ও মেয়েদের ২৩ দশমিক ৫ নিউটন। ২১ বছর বয়সী ছেলেদের পিঞ্চ স্ট্রেন্থ ২৪ দশমিক ৮২ ও মেয়েদের ক্ষেত্রে তা ২২ দশমিক ৪ নিউটন। আর ২২ বছর বয়সী ছেলেদের পিঞ্চ স্ট্রেন্থ পাওয়া গেছে ২২ দশমিক ৫৬ ও মেয়েদের ২৩ দশমিক ৬৭ নিউটন।

জানতে চাইলে গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা হয়ে থাকে। এটা নিয়ে আগে গবেষণা হলেও আমাদের দেশে আঙুলের শক্তি নিয়ে এটাই প্রথম মৌলিক গবেষণা। আমরা পরীক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি, স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে হাতের বহুল ব্যবহূত আঙুলের শক্তি কমে যাচ্ছে। সাধারণত আমরা যে দুই আঙুল দিয়ে লিখি, সেই দুই আঙুলেই স্মার্টফোন বেশি ব্যবহার করে থাকি। দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে হাতে কলম ধরার ওই স্থানে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়। ফলে হাতের ওপর সেটার বিরূপ প্রভাব পড়ে। এতে আঙুলের কার্যক্ষমতা কমে গিয়ে তার লেখার ক্ষমতাও কমে যায়। এটা অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারকারী যে কারো ক্ষেত্রে হতে পারে।

তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে এ গবেষণাটি আমাদের শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল, অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার বা গেমিংয়ের মতো অভ্যাসের ফলে শিক্ষার্থীদের খাতায় লেখার সক্ষমতায় যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে, সে সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা। এখানে আমরা একটা ফলাফল দেখাতে পেরেছি, যেটা কিছুটা হলেও স্মার্টফোনের বিরূপ প্রভাবের ব্যাপারে সচেতন করতে সহায়তা করবে। তবে আরো বিস্তৃত পরিসরে এ গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি।

গবেষক দলের দুই সদস্য তাদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, গবেষণাটি একটু সময়সাপেক্ষ হওয়ায় কাজটি শেষ করতে আমাদের বেশ সময় লেগেছে। আমরা যখন শিক্ষার্থীদের মোবাইল ব্যবহার করতে দিয়েছি তখন তারা নিজেরা যেভাবে মোবাইল ব্যবহার করে থাকে, সেভাবেই ব্যবহার করেছে। তখন কয়েক ঘণ্টা আমরা তাদের ওপর নজর রেখেছি। তবে আঙুলে শক্তি নির্ধারণ পরীক্ষা করতে গিয়ে আমরা তাদের লেখার ভঙ্গিতে বসিয়ে ডিজিটাল গ্রিপ অ্যানালাইজার ব্যবহার করে সেটার রেকর্ড নিয়েছি। পুরো গবেষণাটি এক বছর মেয়াদে চালানো হয়েছে উল্লেখ করে তারা বলেন, অনেক লম্বা সময় বসে থাকতে হবে বলে অনেকে আমাদের পরীক্ষণে আসতে চায়নি। এর মধ্যেও আমরা চেষ্টা করেছি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ঠিক রেখে কাজটি শেষ করা সম্ভব হয়।

স্মার্টফোনের ব্যবহার নিয়ে দেশে পরিচালিত অন্য এক গবেষণার তথ্য বলছে, স্মার্টফোনের মতো বিভিন্ন ডিভাইসের স্ক্রিনে মাত্রাতিরিক্ত আসক্তির কারণে অন্ধত্বের ঝুঁকি। মায়োপিয়া বা ক্ষীণদৃষ্টি নিয়ে বেড়ে উঠছে দেশের শিশুদের উল্লেখযোগ্য অংশ। কিশোরগঞ্জে স্কুলগামী সাড়ে ছয় হাজার শিশুর ওপর এ গবেষণা করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালের অপথালমোলজি বিভাগের চিকিৎসকরা। ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের ওপর পরিচালিত ওই গবেষণায় ১৫ শতাংশের চোখে সমস্যা ধরা পড়ে। আর ক্ষীণদৃষ্টির সমস্যা ধরা পড়ে ৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর।

সিঙ্গাপুরে পরিচালিত অন্য একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছিল কীভাবে স্মার্টফোন আঙুলের হাড়গুলোর যুক্ত স্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। জর্ডানের একটি গবেষণা দল স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে মানুষের ওপর এর এডিকশনের মাত্রা নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু ছাত্রদের পিঞ্চ স্ট্রেন্থের ওপর স্মার্টফোনের প্রভাব নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা প্রকাশিত হয়নি।

লেখার অভ্যাস কম থাকলে বা একটানা অন্য কোনো কাজে বেশি সময় দিলে তা লেখার ওপর প্রভাব ফেলে থাকে বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসার্জন ডা. মো. রুহুল কুদ্দুস বিপ্লব। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, লম্বা সময় কাজ করার ফলে আঙুলের কার্যক্ষমতা, লেখার ক্ষমতা কমবে। পরীক্ষার সময় লিখতে গেলে হাতে সমস্যা হবে, এটা যুক্তিসংগত ব্যাপার। ২-৩ মিনিট বা এর চেয়ে কম সময় লিখতে গেলে এ সমস্যা তেমনভাবে পরিলক্ষিত না-ও হতে পারে। তবে পরীক্ষা বা অন্য কোনো সময়, যখন একটানা লিখতে হয়, তখন এ সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে জানান তিনি।

(বণিকবার্তা, ঘাটাইলডটকম)/-