মাদকের আমদানি ও কেনাবেচায় রেকর্ড, বছরে ৯ হাজার কোটি টাকা খরচ করছে মাদকসেবীরা

ধারাবাহিক ‘বন্দুকযুদ্ধ’ ও সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যেই দেশে মাদকের আমদানি ও কেনাবেচা আগের বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাবে, গত বছর বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে ৫ কোটি ৩০ লাখ ইয়াবা বড়ি এবং সাড়ে ১১ মণ হেরোইন উদ্ধার করা হয়েছে। এই পরিমাণ আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।

জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউএনওডিসির মতে, যত মাদক বিক্রি হয়, ধরা পড়ে তার মাত্র ১০ শতাংশ। এই হিসাব ধরলে গত বছর দেশে শুধু ইয়াবা বড়িই বিক্রি হয়েছে ৫৩ কোটির মতো। যার বাজারমূল্য প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা (প্রতি বড়ি দেড় শ টাকা)। আর হেরোইন পাচার বা বিক্রি হয়েছে ১১০ মণ, যার বাজারমূল্য (প্রতি কেজি ২০ লাখ টাকা ধরে) প্রায় ৯০০ কোটি টাকা।

হিসাব করে দেখা গেছে, সব মিলে মাদকের পেছনে বছরে মাদকসেবীরা প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা খরচ করছে, যা বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বার্ষিক বাজেটের তিন গুণ। আর পুলিশের বাজেটের ৪ ভাগের ৩ ভাগ। দেশে ৬৬-৭০ লাখ লোক মাদকাসক্ত বলে মনে করা হয়।

মাদক সমস্যা নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাজনৈতিক দলের নেতাদের সংশ্লিষ্টতা থাকে, মদদ থাকে। বড় মাদক কারবারিরা বিপদে পড়লে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পায়। আর সেই ব্যবসায়ীরা তখন নিজেদের লোকদের সহজে রক্ষা করে। এ কারণে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান সফল হয় না। তাই মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জিততে হলে শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে ভেতর-বাইরে। কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত মঙ্গলবার নিজের কার্যালয়ে পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পুলিশ কর্মকর্তাদের বলেন, ‘যা যা দাবি করেছেন, সবই মেনে নিয়েছি। এখন মাদকের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নিন।’

মাদকবিরোধী অভিযানে সম্পৃক্ত সূত্রগুলো বলছে, এত বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ যেখানে, সেই মাদকের বাজার ও চাহিদা নিয়ন্ত্রণই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। মাদক প্রতিরোধে ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ ঘোষণা করা হলেও এই অভিযানে যেমন সমন্বয় নেই, তেমনি সব মহল আন্তরিকও নয়। আবার অভিযানের বাইরে মাদক সেবন বন্ধ করতে সচেতনতা সৃষ্টির তৎপরতা নেই। সে কারণে মাদক যে দ্রুত নিয়ন্ত্রণ হবে, এমন আশাও নেই। তবে পুলিশ সপ্তাহের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঘুরেফিরে মাদক নির্মূলের কথা বলেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক জাবেদ পাটোয়ারী।

ইয়াবার ভয়াবহতা রোধে গত বছরের ৪ মে থেকে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করে বিভিন্ন বাহিনী। এই অভিযানে ২৬০ দিনে (৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ২৯২ জন। এর মধ্যে শুধু কক্সবাজারেই নিহত হয় ৪৪ জন।

অভিযানের পাশাপাশি ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণের প্রস্তাবেও রাজি হয়েছে সরকার। ১৬ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারে এই আত্মসমর্পণ হবে। ধারণা করা হচ্ছে, দুই শতাধিক ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করতে পারেন। ইতিমধ্যে আত্মসমর্পণে সম্মত ১২০ জন পুলিশি হেফাজতে আছেন। তবে এই আত্মসমর্পণ এবং এর পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে বাহিনীগুলোর মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে যুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, স্থল ও নৌসীমান্ত দিয়ে মাদকের প্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না। অভিযানের ভেতরেও স্থলপথ ও জলপথ—দুই দিক থেকেই মাদক আসছে। এই বছরে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারই তার বড় প্রমাণ। আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন মূলত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মাদক আনা-নেওয়ার কাজে যুক্ত ব্যক্তিরা। তালিকাভুক্ত গডফাদারদের মধ্যে মাত্র দুজন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। বড় মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে এখন পর্যন্ত আমিন হুদা ছাড়া আর কেউ ধরা পড়েনি। ইয়াবা তৈরির অভিযোগে আমিন হুদার সাজা হয়েছে। তিনি এখন কারাগারে আছেন।

তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, এই অভিযানের বড় সফলতা হলো, মাদক এখন আর অত সহজলভ্য নয়। যাঁরা এই ব্যবসায় যুক্ত, তাঁরা আতঙ্কে আছেন।

মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়া একটি বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, সাঁড়াশি অভিযানে তাঁরা মাদক ব্যবসায়ীদের সরবরাহ লাইন কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পেরেছেন। কিন্তু মাদক কেনাবেচা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। গত মঙ্গলবারও টেকনাফ সীমান্তে আড়াই লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। শুধু টেকনাফ নয়, সীমান্তের অনেক স্থান দিয়েই এখন মাদক আসছে। দেশে বিভিন্ন বাহিনীর চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী আছেন তিন হাজারের বেশি। কিন্তু সবার নজর শুধু টেকনাফের দিকে। হেরোইনের মতো মাদক নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। অথচ দেশে হেরোইনেরও বড় বাজার রয়েছে। মাদক কারবারিরা বাংলাদেশে হেরোইন পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবেও ব্যবহার করে বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা ও চীনে আটক করা মাদকের চালান পাচারের সময় বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে সিআইডির বিশেষ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন।

নজর শুধু কক্সবাজারে

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাসহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, ইয়াবার কারণে সবার নজর শুধু কক্সবাজারের টেকনাফের দিকে। মাদক কারবারিদের আত্মসমর্পণও সেখানে হচ্ছে। তাঁরা বলেন, মাদক এখন আর কক্সবাজার সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই। সমুদ্রপথে বিভিন্ন স্থান থেকে মাদক আসছে। এসব পথে হেরোইনও আসে। কিন্তু সেদিকে নজর কম।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাফিনুল ইসলাম গত বুধবার বলেন, ইয়াবা ব্যবসায়ীরা আর দক্ষিণের সীমান্তে আসছে না। সেখান থেকে সরে গিয়ে পশ্চিম প্রান্তের সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা নিয়ে প্রবেশ করছে। কিছুদিন আগে সিলেট সীমান্তে ইয়াবা উদ্ধার হয় বলে তিনি জানান। মহাপরিচালক বলেন, ইয়াবা কারবারিরা টেকনাফে না গিয়ে উত্তর দিকেও চলে যাচ্ছে।

মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এই ব্যবসার হাতবদল হচ্ছে। এখন নতুন নতুন বিক্রেতা দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে নতুন চক্রের সক্রিয় হওয়ার খবর পাচ্ছেন তাঁরা। তাঁরা আরও বলছেন, মাদকবিরোধী অভিযান চলতে থাকায় ছোট ও মাঝারি মানের মাদক ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ একটু আড়ালে চলে গেছে। গডফাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে মাদকের নিরাপদ কেনাবেচা নিশ্চিত করার কাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যেরও সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও রাজবাড়ীতে এমন চার পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। শুধু পুলিশের নিচের দিকের সদস্যরাই নন, পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ আছে পুলিশের ওপরের দিকের অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও।

সার্বিক পরিস্থিতিতে করণীয় জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূরুল হুদা বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রথমে দরকার সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। তা না থাকলে মাদক কোনোভাবেই নির্মূল হবে না। তিনি বলেন, মাদক ব্যবসা করে বড়লোকেরা আর অভিযানে মাদকসহ ধরা পড়ে এর বাহক, যারা গরিব মানুষ। মাদক নির্মূলে তাই বড়লোকদের গায়েও হাত দিতে হবে। ওপরের দিকে হাত না দিলে নিচের প্রবাহ বন্ধ হবে না।

বিশেষজ্ঞ অভিমত

শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে ভেতরে–বাইরে

মাদক পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। সরকার পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। সরকার যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, সেটা ভালো কথা, কিন্তু মনে রাখতে হবে মাদকের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ, সেটা প্রথাগত যুদ্ধের মতো নয়। এটা তার চেয়েও জটিল। কারণ, প্রচলিত যুদ্ধ হয় শত্রুপক্ষের সঙ্গে। আর মাদকের যুদ্ধ হয় সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অপরাধীদের সঙ্গে, নিজেদের লোকদের বিরুদ্ধে। সে কারণে এই যুদ্ধ করা এবং যুদ্ধে জেতা দুটোই কঠিন কাজ।

মাদকের যুদ্ধে জিততে হলে আগে শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে ভেতরে-বাইরে। সে ক্ষেত্রে প্রথম এবং জরুরি কাজ হলো আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা। এতে কোনো ফাঁকফোকর থাকলে চলবে না। নীতি বা কৌশলে দুর্বলতা থাকলে যুদ্ধে সফল হওয়া সম্ভব হবে না। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রও এ ধরনের দ্বৈত পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল। দুই নীতির কারণে তারা সফল হতে পারেনি। উল্টো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হয়েছে।

একটি দেশ ও জাতি অভিভাবকহীন হিসেবে চলতে পারে না। এ জন্য দলকে নিয়ন্ত্রণে রেখে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে মাদক-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে সরকারকে। মাদকের বিরুদ্ধে যে অভিযান, তাতে পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি থাকতে হবে। তা না হলে মাঝপথে এসে সবকিছু হোঁচট খাবে।

সমাজের সবাই এটা মানেন যে মাদক ব্যবসা চালায় গডফাদাররা। মাদক প্রতিরোধে যে আইন, তার প্রয়োগ হয় মাঠপর্যায়ে। স্বাভাবিকভাবে মাঠপর্যায়ে এর শিকার হয় বাহকেরা। পর্দার অন্তরালে থেকে যাঁরা মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁরা খুব কমই আইনের আওতায় আসেন। পত্রপত্রিকায় যে খবর দেখা যায়, তার গড় চিত্র এ রকমই হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ নিয়ে সংশয় আছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ কম নেই। যেসব খবর পাওয়া যায় তাতে দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্য নানাভাবে মাদকের সঙ্গে যুক্ত। অভিযানের সঙ্গে সঙ্গে এসব জায়গা পরিষ্কার করতে হবে, যাতে সরষেতে ভূত না থাকে। আমি মনে করি, বর্তমান সরকারে অনেক অর্জন আছে, বড় বড় অর্জন। কিন্তু সেসব অর্জন নষ্ট হয়ে যাবে, যদি মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয়। এখন দরকার হলো এই অভিযানে রাজনৈতিক দলকেও মাঠে নামাতে হবে। মনে রাখতে হবে, মাদক ও দুর্নীতি বন্ধ না হলে জঙ্গিবাদ আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে ।

(প্রথম আলো, ঘাটাইলডটকম)/-

163total visits,1visits today