মফঃস্বল সাংবাদিকতায় ঝুঁকি

গত এক দশকে বাংলাদেশে সংবাদপত্র ও টেলিভিশন সাংবাদিকতার প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। সাংবাদিকতার পরিধির বিস্তার ঘটেছে। সাংবাদিকতা এখন রাজধানী ঢাকার বাইরে গ্রামীণ জনপদে বিস্তৃত হয়েছে। ক্রম অগ্রসরমান সাংবাদিকতায় পেশাগত ঝুঁকিও বেড়েছে সমানতালে। বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকতায় ঝুঁকি বেড়েছে বেশি। প্যারিসভিত্তিক বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স ২০১৬ সালে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচক নিয়ে ১৮০টি দেশের মধ্যে একটি জরিপ চালিয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৪-এ। ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স- ২০১৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই রেঙ্কিংয়ে আগের বছরের তুলনায় বাংলাদেশ ১৫ ধাপ পিছিয়েছে। শুধু এই পরিসংখ্যানই নয়, বিশ্বব্যাপী সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা নিয়ে কাজ করে এমন অনেক সংস্থার পরিসংখ্যানেও বাংলাদেশের অবস্থা সূচনীয় হিসেবেই উঠে এসেছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দুটি গ্রুপের সংঘাতের সময় ছবি তোলায় ব্যস্ত ছিলেন সিরাজগঞ্জের সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুল। হঠাৎ করে গুলি এসে জীবন কেড়ে নেবে, এমনটা হয়তো তিনি কখনোই ভাবেননি। তাকে লক্ষ্য করেই গুলি করা হয়েছিল কি না সেটি এখনো পরিষ্কার নয়। কিন্তু বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় মফস্বলে সাংবাদিকদের টার্গেট করে হত্যা এবং নির্যাতন প্রায়ই ঘটে।

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন নাহার রুনি হত্যা মামলার তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা জেনে হতাশা প্রকাশ করে উচ্চ আদালত বলেছে, চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবেই এটি তালিকায়ই থেকে যাবে। সোমবার (১১ নভেম্বর) বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাই কোর্ট বেঞ্চ থেকে এ মন্তব্য আসে।

ফেনীর টিপু সুলতানের কথা অনেকেরই হয়তো এখনো মনে আছে। হত্যার উদ্দেশ্যে তাকে যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল সেটি বেশ বিরল।তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের এমপি জয়নাল হাজারীর বিরুদ্ধে ছিল মূল অভিযোগ। তার পর থেকে ফেনীতে আর সাংবাদিকতা করা হয়নি টিপু সুলতানের। গত ১৪ বছর ধরে তিনি ঢাকায় কাজ করছেন। মফস্বলে সাংবাদিকতা ঢাকার তুলনায় তার কাছে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ বলেই মনে হয়।

সাংবাদিক টিপু সুলতান বলেন, “মফস্বলের প্রত্যেকটা সাংবাদিক পরিচিত। সবাই সবাইকে চেনে। ওখানে কোন সংবাদ হলে তাকে টার্গেট করা সহজ। ঢাকায় সেটা সম্ভব না। মফস্বলের সাংবাদিক প্রতি মুহুর্তে, প্রতিদিনই ঝুঁকির মধ্যে থাকে।”

বেশ কিছু অঞ্চল আছে যেখানে সাংবাদিকতা বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ। এ ঝুঁকি তৈরি হয় নানা দিক থেকে। এর মধ্যে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল অন্যতম। চোরাকারবারি, মাদক ব্যবসায়ী, সরকারি প্রশাসন এবং ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদরা বিভিন্ন সময় মফস্বল সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠে। পাশাপাশি মফস্বলে একজন সাংবাদিক তার পেশাগত কারণে যখন কোন প্রতিকূলতার মাঝে পড়ে তখন তার নিয়োগকারী সংবাদমাধ্যম তাকে সহায়তার জন্য কতটা এগিয়ে আসে সেটি নিয়েও প্রশ্ন আছে।

যশোরের সাংবাদিক সাজেদ রহমানের বড় ভাই শামসুর রহমানকে ১৭ বছর আগে তার অফিসে গুলি করে হত্যা করা হয়। সাজেদ রহমানও দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করছেন। তিনি বলেন, “কিছু বড় পত্রিকা আছে যারা সাংবাদিকরা সমস্যায় পড়লে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ দেখে। মামলায় পড়লে কর্তৃপক্ষ সেটা দেখে এবং সহযোগিতা করে। কিন্তু আমরা দেখেছি অধিকাংশ পত্রিকা কোন সহযোগিতা করেনা।”

জেলা পর্যায়ে যেসব সাংবাদিকরা কাজ করছেন, তাদের অনেকেরই প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে কোন নিয়োগপত্র নেই । অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম জেলা প্রতিনিধিদের কোনও মাসিক বেতন দেয় না। অনেক জায়গায় রাজনৈতিক মতাদর্শকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের মাঝেও রয়েছে তীব্র বিভেদ। মফস্বল সাংবাদিকদের অনেকেই বলছেন এসব কারণে অনেক সাংবাদিক সাংবাদিকতার বাইরেও অন্য ক্ষেত্রে নিজেদের জড়িয়ে ফেলছে। ফলে তার কাজের ঝুঁকিও বাড়ছে।

সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন ইউনিয়নগুলোও রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে বিভক্ত। এই যদি পরিস্থিতি হয় তাহলে সাংবাদিকদের সংগঠনগুলো অধিকার রক্ষায় কতটা কাজ করতে পারছে?

বাংলাদেশে ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক মহাসচিব আব্দুল জলিল ভুঁইয়া মনে করেন নানা ‘সীমাবদ্ধতা’ সত্ত্বেও সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো সবসময় নির্যাতিত সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগপত্র এবং মাসিক বেতনের নিশ্চয়তা না থাকলেও খবর পাঠানোর চাপ ঠিকই থাকছে মফস্বল সাংবাদিকদের উপর। ফলে খবরের পেছনে যখন সাংবাদিক ছুটছেন তখন অনেক সময় নিজের নিরাপত্তার দিকে নজর দেবার সুযোগ থাকে না তাদের। পরিস্থিতি মোকাবেলার কোন প্রশিক্ষণও নেই তাদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক শামীম রেজা মনে করেন, “যেসব জায়গায় বা পরিস্থিতিতে সাংবাদিকরা সহিংসতা কিংবা অন্যকোন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন, সেসব জায়গায় সাংবাদিকদের নিজস্ব কিছু প্রস্তুতি থাকা উচিত। আমাদের একজন স্থানীয় সাংবাদিক হয়তো লেখার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, কিন্তু পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে এবং কীভাবে ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে হবে, সে প্রশিক্ষণ তার নেই।”

বিশ্লেষক এবং সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃস্থানীয়রা বলছেন, গত এক দশকে বাংলাদেশে টেলিভিশন, পত্রিকা এবং অনলাইনের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়লেও মফস্বল সাংবাদিকদের স্বার্থ উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। শীঘ্রই পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হবে – এমন আশাও করেছন না মফস্বল সাংবাদিকরা।

সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার প্যারিসভিত্তিক বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স ২০১৬ সালে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচক নিয়ে ১৮০টি দেশের মধ্যে একটি জরিপ চালিয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান গিয়ে ঠেকেছে ১৪৪-এ। ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স- ২০১৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই রেঙ্কিংয়ে আগের বছরের তুলনায় বাংলাদেশ ১৫ ধাপ পিছিয়েছে। শুধু এই পরিসংখ্যানই নয়, বিশ্বব্যাপী সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা নিয়ে কাজ করে এমন অনেক সংস্থার পরিসংখ্যানেও বাংলাদেশের অবস্থা সূচনীয় হিসেবেই উঠে এসেছে।

নিউইয়র্কভিত্তিক সংস্থা প্রোটেক্ট টু জার্নালিস্টের তথ্য বলছে, বিশ্বব্যাপী সাংবাদিক হত্যাকারীদের দায়মুক্তির ক্ষেত্রে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ১১’তে (ভয়াবহতার তীব্রতায় উপর থেকে নিচে)। বাংলাদেশে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, হয়রানি ও আক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে বলে মনে করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংগঠন আর্টিকেল-১৯।

২০১৫ সালে প্রকাশিত সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে সাংবাদিক নির্যাতনের হার ছিল ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে ২০১৪ সালে এই হার হয়েছে ৩৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এর প্রায় ২৩ শতাংশ নির্যাতনই হয়েছে পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশের হাতে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৪ সালে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঘটা সহিংস ঘটনার একটিরও বিচারের মাধ্যমে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব ঘটনার মধ্যে মাত্র পাঁচটি ঘটনার তদন্ত শেষ করা হয়েছে। ২৭ শতাংশ ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়াধীন। আর প্রায় ৭০ শতাংশ ঘটনা আইনের আওতার বাইরে রয়েছে।

বাংলাদেশে পরমতসহিষ্ণুতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। সেই সাথে সাংবাদিকদের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে। আগে হুমকি দেয়া হতো, এখন আক্রমণ করা হয়, হত্যা করা হয়। রাষ্ট্র ক্ষমতায় যারা আছেন, তারা গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ বা শত্রু মনে করেন। এ কারণে কোনো সম্পাদককে নিষিদ্ধ আর কারো বিরুদ্ধে ৮০টি মামলা হয়। সাংবাদিকের হাতে হাতকড়া, কোমরে রশি দিয়ে বাঁধা হয়।

ইদানীং বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে সাংবাদিক হত্যার পরিমাণও বেড়ে গেছে। সম্প্রতি ইউনেস্কোর ডিরেক্টর জেনারেলের ‘সেফটি অব জার্নালিস্টস অ্যান্ড দ্য ডেনজার অব ইমপিউনিটি’ শীর্ষক এক গবেষণায় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে বিশ্বে মোট ৮২৭ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। এরমধ্যে ২০১৪-১৫ সালেই নিহত হয়েছেন ২১৩ জন। সংঘাতপূর্ণ এলাকায়ই সবচেয়ে বেশি সাংবাদিক হত্যার শিকার হন। এই প্রতিবেদনে সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, ৮২৭টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে মাত্র ৫৯টি দেশ ৪০২টি হত্যা মামলার বিষয়ে তথ্য দিয়েছে। নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৩টি। তদন্ত চলছে ৩৩৯টির। আর ৪২৫টি মামলার বিষয়ে সদস্য দেশগুলো কোনো তথ্যই দেয়নি। সব মিলিয়ে সাংবাদিক হত্যায় বিশ্বব্যাপী ৯২ ভাগ মামলার নিষ্পত্তি হয় না।

(বিশেষ প্রতিবেদক, ঘাটাইলডটকম)/-