‘মধুপুর বনাঞ্চলের আদিবাসী গারো বিউটিশিয়ানদের সাথে একদিন’

টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কের মধুপুর উপজেলার পঁচিশমাইল বাসস্ট্যান্ড থেকে, ডানে গজারী বনের ভেতর দিয়ে, যে সর্পিল রাস্তা এগিয়ে গেছে, তা মিলেছে জাঙ্গালিয়া গ্রামে। এটি মধুপুর উপজেলার একটি আদিবাসী গারো গ্রাম। গত শুক্রবার (২৭ ডিসেম্বর) গিয়েছিলাম এ গ্রামের বিউটিশিয়ানদের হালচাল জানতে। এরা দেশের বিভিন্ন বিউটি পার্লারে মানুষের সৌন্দর্য বৃদ্ধির কাজ করেন। বড় দিন উপলক্ষে গ্রামের বাড়িতে তারা ছুটিতে এসেছিলেন। মধুপুরের ৪৪টি গ্রামের ১ হাজার ১৮৯ জন গারো রমনী বিউটিপার্লারে চাকরি করেন, যাদের বয়স ১২ থেকে ৩২।

জাঙ্গালিয়া গ্রামের অলরাউন্ডার বিউটিশিয়ান মেরিনা পাথাং। ঢাকার গুলশানের এক পার্লারে কাজ করেন। বাবা বিশেন্দ্র মাংসাং। মা ফনিন্দ্র পাথাং। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে মেরিনা দ্বিতীয়। আবাদী জমি নেই। ফুফীর ভিটেয় বসবাস। বাবামা দুজনই দিনমজুর। তাই মেধাবী ছাত্রী হয়েও প্রাইমারীর গন্ডি অতিক্রম করতে পারেননি মেরিনা। কৈশোরে দারিদ্র্যতায় যখন আষ্ট্রেপৃষ্ঠে বাঁধা, তখন গ্রামের আরেক বিউটিশিয়ান রুনি রিছিল সাহায্যের হাত বাড়ান। তার সাথেই চলে যান ঢাকায়। হাতেকলমে শেখেন বিউটিশয়ানের কাজ। ক্রমান্বয়ে হাত পাঁকান মেরিনা। এভাবে কেটে যায় ১৪ বছর।

মেরিনা পাথাং হন অলরাউন্ডার বিউটিশিয়ান। ব্রাইডাল মেকআপ থেকে রিবোর্ডিং, এমব্লোকালার, মেনিকিউ, পেটি কেউ, হেয়ার কালার্ড, হেয়ার স্টাইলসহ প্রায় সব কিছু নিঁখুতভাবে সম্পন্নে পারদর্শী তিনি।

সম্প্রতি ধানমন্ডির অপূর্ব পার্লার ছেড়ে গুলশান পার্লারে যোগ দেন। বেতন মাত্র দশ হাজার। খাওয়াপড়া নিজের। থাকেন পার্লার সংলগ্ন মেসে। বিনাভাড়ায়। বেতনে পোষেনা। কায়ক্লেশে জীবন চালিয়ে আয়ের এক অংশ পাঠান বাড়িতে।

মেরিনার বাবামার বয়স হয়েছে। মাঠে দিনমজুরি করতে পারেন না। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ুয়া কনিষ্ঠ ভ্রাতা সজীবের খরচও চলে পাঠানো টাকায়। বাড়িতে পাঠানোর পর বেতন থেকে এক হাজার ঢাকা ক্রেডিট ব্যাংকে সঞ্চয় রাখেন। জীবনে অনেক স্বপ্ন মেরিনার। আরো পাঁচছয় বছর সঞ্চয় করবেন। গ্রামে বাড়ির জন্য জমি কিনবেন। চার লক্ষ টাকা সঞ্চয় হলে ঘর বাঁধবেন।

বলা অনাবশ্যক, মেরিনার বয়স এখন ২৪+। ছোট ভগ্নী শিলেনা পাথাং এর বয়স ১৯। সিলেটের মৌলভীবাজারের এক পার্লারে কাজ করেন শিলেনা। শিক্ষানবীশ বলে বেতন পান নামেমাত্র।

মেরিনা জানায়, পার্লারে কাজের টাইম দীর্ঘ। সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা। ঈদ, পুজাপার্বন, বড়দিন বা বিভিন্ন জাতীয় দিবসে কাজের পরিধি বেড়ে যায়। ১৫ থেকে ১৬ ঘন্টা দাড়ায়। অনেকটা হাড়ভাঙ্গা খাটুনি। কিন্তু অভারটাইম বা বোনাস নেই। সবাই বখশিস ও দেয় না।

মেরিনার বাবা বিশেন্দ্র মাংসাং জানান, জঙ্গলে ঘেরা ছিল বলে গ্রামের নাম জাঙ্গালিয়া। গ্রামে এক সময় শুধু আদিবাসীরাই বাস করতেন। কালক্রমে বাঙ্গালীদের আগমন ঘটে। প্রভাবশালীরা বন উজাড় করে আবাদী জমি বাড়াতে থাকেন। সেসব জমিতে কলা আর আনারসের আগ্রাসন বাড়তে থাকে। গজারী বনের গহীন অরণ্য কলা আর আনারসের বানিজ্যিক আবাদে বিলীন হয়ে যায়।

কালক্রমে উদ্যানভিত্তিক ফল আবাদ চলে যায় বহিরাগত মহাজনের হাতে। আসে বহিরাগত শ্রমিক। ফলে আদিবাসীসহ এলাকার শ্রমিকরা ফলবাগানে দিনমজুরি থেকে বঞ্চিত হন বলে তিনি জানান।

দারিদ্র পীড়নে অতিষ্ঠ গারোরা

তাদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, মেয়েরা শহরে অভিবাসিত হচ্ছেন। কাজ নিচ্ছেন বিউটি পার্লারে। বনে জন্ম, বনের আলোবাতাসে বেড়ে উঠা, বনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে হৃদয়েমননে আত্মস্থ করায় সৌন্দর্য কলায় বাড়তি ছোঁয়া রাখতে সক্ষম গারো রমনীরা। এজন্য তারা সহজেই পেশাদার বিউটিশিয়ান হয়ে উঠতে পারেন।

গারোরা যেহুতু মাতৃতান্ত্রিক পরিবার, আর পরিবারের দুঃসময়ে যেহেতু মেয়েদেরই হাল ধরতে হয়, সে কারণে বাবামার সংসারের টানাপোড়নে কিশোরী মেরিনা পাথাংরা পার্লারে কাজ নিতে বাধ্য হন।

অধিকন্তু গজারী বন উজাড় হওয়ায় তাদের জীবনজীবিকা, আয়রোজগার, সংস্কৃতি সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দিন দিন জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এবং অরণ্যানি জীবনযাপন বাধাগ্রস্ত হওয়ায়, দারিদ্র্যতা সর্বত্র ভর করছে।

বহিরাগত বাঙ্গালীরা সর্বত্র দখলদারিত্ব শুরু করায় বনাঞ্চলে গারোরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠিতে পরিণত হচ্ছেন। সুতরাং মেরিনা পাথাং এর মতো গারো কিশোরীরা অভাবদারিদ্র্যতার করাল গ্রাস থেকে রেহাই পাবার জন্য পড়ালেখা ছেড়ে ইটপাথরের শহরে অভিবাসিত হচ্ছেন। উপাধি পাচ্ছেন বিউটিশিয়ান।

“MADHHUPUR. THE VANISHING FOREST AND HER PEOPLE IN AGONY” গ্রন্থে দেখা যায়, জাঙ্গালিয়া গ্রামে বাঙ্গালী পরিবারের সংখ্যা ৩৭৭, আর গারো পরিবার মাত্র ১৪৪। ওই গ্রন্থে আরো দেখা যায়, মধুপুর বনাঞ্চলের বেড়িবাইদ, কুড়াগাছা, শোলাকুড়ি, ফুলবাগচালা ও অরনখোলা ইউনিয়নের ৪৪টি গ্রামে, ৩ হাজার ২২২ খানায়, ১৬ হাজার ৬৪৪ জন গারো রয়েছেন। পক্ষান্তরে এখানে বাঙ্গালী রয়েছেন ৩০ হাজার ৩৮৯ জন।

৪৪টি গ্রামের ১ হাজার ১৮৯ জন গারো রমনী বিউটিপার্লারে চাকরি করেন। যাদের বয়স ১২ থেকে ৩২। অবশ্য নিজেদের বিউটিশিয়ান পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন তারা।

গারো ছাড়াও এসব ইউনিয়নে কোচ বা বর্মন জাতি গোষ্ঠির মানুষ রয়েছেন ২ হাজার ৬৯৩ জন। মধুপুর বনাঞ্চলে বসবাসরতদের শতকরা হিসাবে বাঙ্গালী প্রায় ৬০% আর অবাঙ্গালী ৪০%।

বলা অনাবশ্যক, গারোরা মধুপুর বনাঞ্চলের প্রথম বাসিন্দা। জুম চাষ ছিল তাদের জীবিকা।

কালক্রমে মধুপুর বনাঞ্চলে বাঙ্গালীদের বসবাস শুরু হয়। বাঙ্গালীদের চাপে আদিবাসী গারো ও কোচরা নিজ ভূমিতে কোনঠাসা হয়ে পড়ছেন। হয়ে উঠছেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠি।

মধুপুর উপজেলা ছাড়াও পাশ্ববর্তী ফুলবাড়ীয়া উপজেলায় ৭টি গ্রামে ৯২৯ জন, মুক্তাগাছা উপজেলার ৯ গ্রামে ৯০৯জন এবং জামালপুর সদর উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের সনাতন এবং দীঘর গড় গ্রামে ১৪৩ জন গারো রয়েছেন।

যাই হোক, বলছিলাম গারো বিউটিশিয়াদের কথা। একই ধরনের জীবন বঞ্চনা আর অনটনের গল্প জাঙ্গালিয়ার চম্পা মাংসাং, পলি নকরেক এবং সুমিত্রা দফোর। সবাই মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। পড়ালেখায় ভালো ছিলেন। বড় হওয়ার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু বিউটিশয়ান হয়ে মানুষের দেহ সৌন্দর্য বিকাশের শিল্পী এখন।

গারো বিউটিশিয়ানরা যে বেতন পান তা দিয়ে পোষে না। কিন্তু বিকল্প নেই। বাধ্য হয়ে এ পেশায় পড়ে থাকেন। তাদের শৈল্পিক ছোঁয়ায় মানুষ গেটআপ, সেটআপে সাময়িকের জন্য অপূর্ব হয়ে উঠেন। সেটি দেখে তখন নিজেরাও আমোদিত হন।

একই গল্প গাছাবাড়ী গ্রামের রীতাদফোর, জালিচিরা গ্রামের মৈত্রী চিরান ও রিচি সাংমার, গায়রা গ্রামের অন্তরা মাংসাং, মমিনপুর গ্রামের হৈমন্তী চিরান এবং জলছত্র গ্রামের শিল্পা সাংমার। বনাঞ্চল সাবাড় হওয়ায় পরিবারের জীবিকার চাকা অচল। বৈচিত্র্যময় জীবিকা নিয়ে ভাবার স্বভাতগত চিন্তা কম।

পরিবারের অনটন তাদের পড়তে দেয়নি। গ্রামে কোনো কাজ নেই। তাই শহরে অভিবাসিত হয়েছেন। কিন্তু সেখানেও ভালো নেই তারা। হৈমন্তী জানান, বিউটিশিয়ানদের সম্পর্কে অনেকেই খারাপ ধারনা পোষণ করেন। তারা যে সৌন্দর্যের প্রতীক, মানুষকে সৌন্দর্যের আলোয় উদ্ভাসিত করেন, সেটি ভুলে যান।

সুযোগ পেলে কুপ্রস্তাব দেন, যৌন হয়রানি করেন। বিশেষ করে পার্লারের ম্যানেজাররা তাদেরকে খারাপ কাজে প্ররোচিত করেন। সুযোগ পেলে ফাঁদে ফেলে নির্যাতনের চেষ্টা করেন বলে জানান তারা।

বিউটি পার্লার ক্ষুদ্রকায় হলেও শিল্পের মর্যাদা পাচ্ছে। কিন্তু এ শিল্পের যারা অন্তঃপ্রাণ সেই শ্রমজীবি বিউটিশিয়ানরা অবহেলিত, ক্ষেত্রবিশেষে নির্যাতিত। তাদের বেতনভাতা, সুযোগসুবিধা নিয়ে কারো মাথাব্যাথা নেই। তাদের নানাছুঁতায় শোষণ করা হচ্ছে। শ্রমের যথাযোগ্য পারিশ্রমিক তারা পাচ্ছেনা তারা।

মধুপুরে আদিবাসী গারো নারীদের নিয়ে কাজ করেন ‘আচিকমিচিক সোসাইটি’। এর প্রধান, গারো নেত্রী সুলেখা ম্রং জানান, বন উজাড় হওয়ায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আদিবাসী গারোরা। গারো সমাজ মাতৃতান্ত্রিক। পরিবারে মায়ের ভূমিকাই মূখ্য। সুতরাং এমন সমাজের মেয়েরা বাইরে গিয়ে কাজ করতে অস্বাচ্ছন্দবোধ করেন না। কিন্তু অধিকাংশ বিউটি পার্লারে নিরাপদ কাজের পরিবেশ নেই। এখানে গারো নারীরা প্রায়ই হয়রানির শিকার হন।

তিনি বিউটিশিয়ানদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ এবং উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রদানের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন।

(সিনিয়র সাংবাদিক জয়নাল আবেদীন, ঘাটাইলডটকম)/-