মধুপুরে গারো তরুণ-তরুণীর বিয়ের দিনমান

গায়ের রং সোনাবরন। নাসিকার সাথে মানান সই কপাল। ঘন কৃষ্ণকায় কেশগুচ্ছ গোলাকার মাথা ছাপিয়ে কাঁধ বরাবর বুক অবধি প্রলম্বিত। মাথার উর্ধাংশ সাদা গোলাপে গাঁথা জরোয়ারে আচ্ছাদিত। শ্বেতশুভ্র বিয়ের পোষাকে দেখে মনে হয় যেন স্বর্গীয় উবর্সী। অথবা ডানা কাটা পরী। মর্তে নেমেছেন ভক্তের পুস্পার্ঘ বা অঞ্জলী গ্রহনে। আসলে এ তরুণী স্বর্গের উর্বসী নন। নন কেচ্ছাকাহিনীর ডানাকাটা পরী। তিনি মানবী। নৃতত্ত্বে আদিবাসী গারো। নাম আশা দালবৎ। বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলের ধরাটি গ্রামে।

আর নেভীব্লু কোটটাই পরা তরুণ, যিনি মাটিতে হাটু গেড়ে রোমানীয় স্টাইলে তরুণীকে পুস্পগুচ্ছ তুলে দিচ্ছেন, তিনি লিন্টু নকরেক। বাড়ি একই বনাঞ্চলের জয়নাগাছা। পেশায় বেসরকারি চাকুরীজীবী। বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে ১৪ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার এ গারো তরুণ তরুণী জুটি বেঁধেছেন। ভালোবাসার চিরবন্ধনে আবদ্ধ থাকার শপথ নিয়েছেন।

এ তরুণীর বিয়েকে কেন্দ্র করে আদিবাসী ধরাটি গ্রাম জেঁগে উঠে উৎসব আর আনন্দে। গানবাজনা, নৃত্যাদি, খানাপিনা, আর উপহার, উপঢৌকনে বিয়ে বাড়ি যেন খুশির বণ্যায় ভেসে যায়। আর অরণ্যচারিদের এ প্রাণ খোলা আনন্দানুষ্ঠানে সকালসন্ধ্যা একাকার হয়ে গারো জীবন আর সংস্কৃতির মেলবন্ধনে নিজকে পুরোটাই সমর্পিত করেছিলাম। মনে হলো সংস্কৃতির কোনো জাত নেই। নেই ভালোলাগার কোনো সীমাবদ্ধতা।

আশা পেশায় নার্স। ঢাকার এক হাসপাতালে চাকুরি করেন। বাবা মৃত তনেত নকরেক। মা গিলিতা দালবৎ। গারোরা মাতৃতান্ত্রিক বিধায় মায়ের পদবীকেই গ্রহন করেন। আশারা সাত বোন এক ভাই। আশা সর্ব কণিষ্ঠ। বড় বোন হান্না দালবৎ পরিবারের নকনা অর্থাৎ সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারি। তিনি নকনা হিসাবে বিজয় চিশামকে বাড়িতে ঘরজামাই বা নকরম করে এনেছেন।

বড় বোন প্রনালী দালবৎ, মাধুরী দালবৎ এবং লীনা দালবৎ ও বিয়ে করে ঘরজামাই এনেছেন। আজ আশা দালবৎ বিয়ে করে লিন্টু নকরেককে ঘরজামাই করে আনলেন। তবে মেঝো বোন ছবি দালবৎ শেরপুরে বিয়ে করে বউ গেছেন। পেশায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। অপর বোন প্রীতি দালবৎ সিস্টার হিসাবে খৃস্ট মিশনে উৎসর্গ করেছেন চিরকুমারী থাকার ব্রত নিয়ে। একমাত্র ভ্রাতা টগর দালবৎ খৃস্ট মিশনারীর ব্রাদার। ফাদার হবার আশায় রয়েছেন। তিনিও চিরকুমার থাকবেন।

আমি নৃ-তত্ত্বে অস্ট্রীয়। জাতিতে বাঙ্গালী। ধর্মে মুসলিম। আদিবাসী গারোদের মননশীলতা, সংস্কৃতজাত উপলদ্ধি, নৃ- জীনগত বৈশিষ্ট্য অবলোকন করছি টানা সাড়ে তিন দশক । কালের প্রবাহে এসবের বিবর্তনে ক্ষুদ্র জাতিসত্বা হিসাবে তাদের ক্রমবর্ধমান রুপান্তর, চেতনাগত পরিবর্তন এবং জীবনাদর্শন গত দৃষ্টিভঙ্গী অনেকটাই পাল্টে গেছে।

বন উজাড়, সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালী জনগোষ্ঠির ক্রমবর্ধমান চাপ, গারো বা মান্দি ধর্ম থেকে খৃস্ট ধর্মে অনুগমন এবং জৈবিক ও রাস্ট্রীক চাপে তাদের পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। ধর্মীয় খোলস পুরোটা পাল্টালেও আদি সংস্কৃতির আকর এখনো হৃদয়মানসে ফল্গুধারায় বহমান।

তাই গারো সম্পত্তির ভাগবন্টন, উত্তরাধিকার মনোনয়ন, পারিবারিক উপাধি ও মর্যাদা সংরক্ষণ, খাবারদাবার, গানবাজনা, আদবকায়দা, সামাজিক মূল্যবোধ, রীতিনীতি ও আচরণ এবং বিয়েশাদীতে সনাতনী ধারার প্রভাব লক্ষ্যনীয়। সংস্কৃতির পরিবর্তনগত হাওয়ার মিশ্রন বা শঙ্করায়ন সবটুকু রাহুগ্রাসে যায়নি।

যে কোনো জাতির সংস্কৃতির বড় উজ্জীবন বিয়েশাদী ও বংশ প্রজনন। আদিতে গারোদের বিয়েশাদীর ক্ষেত্রে খামালরা মূল ভূমিকা পালন করতেন। সামাজিক কিছু রীতিসিদ্ধ কাঠামোয় বিয়ে হতো। বিয়ে পছন্দ-অপছন্দে পাত্রপাত্রীর উপর কখনো চাপিয়ে দেয়া হতো না। বর কনের মতামত ও ইচ্ছাঅনিচ্ছাকে গুরুত্ব দেয়া হতো। ফলে প্রতিটি গারো সংসার হতো সুখের নীড়। বিবাহবিচ্ছেদ শব্দের সাথে গারোরা কোনোকালেই পরিচিত ছিলনা। এখনো নেই।

নারী নির্যাতন, ভিক্ষাবৃত্তি, মাবাবাকে খোরাকী না দেয়া অথবা নীতিনৈতিকতাহীন স্বভাব সহজে মেনে নেয়না গারো সমাজ। ইদানিং বাঙ্গালী দূষণে দুষ্টজাত স্বভাব তাদের মধ্যে সংক্রমিত হচ্ছে।

গারোদের বিয়েতে এখন পুরোহিত বা খামালের ভূমিকায় অবতীর্ন হয়েছেন গীর্জার ফাদাররা। গীর্জাকে মনোরম সাজে সাঁজিয়ে ভেতরে উঁচু মঞ্চে হয় বিয়ের আয়োজন।

আশার বিয়েতে দেখা যায়, বর লিন্টু নকরেক আগের দিন সদলবলে আসেন ধরাটি গ্রামে। রাতে মঞ্চ মাতানো হলো নাচগানে। গারো ভাষায় যতো প্রেমের গান অথবা যতো প্রেমজাত নৃত্য তার কোনোটিই বাদ যায়নি। বাঙলা নাচগানও চলেছে ধুঁমছে। আনন্দ উৎসবে মাতোয়ারা গারোদের দেখলে মনে হয় জীবনে কোনো দুঃখকষ্ট নেই। গারো জীবন যেন শুধুই সুখে মাতোয়ারা। সুখঅবগাহনের দরুন শত অভাবঅনুযোগেও তারা দীর্ঘায়ু হয়ে থাকেন।

বাড়ি থেকে বর কণেকে মিছিল সহকারে স্থানীয় গীর্জায় নিয়ে যাওয়া হয়। মঙ্গল সঙ্গীত দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু। মঞ্চে দুজন ফাদার উপস্থিত ছিলেন। বাইবেল থেকে বিশেষ অংশ পাঠ করে শোনান কণে আশা দালবৎ। এরপর ফাদার মন্ত্র ও শপথ বাক্য পাঠ করান। মালা বদল করান। দাম্পত্য জীবন গঠনে বাইবেলের উদ্ধৃতিতে নীতিদীর্ঘ বক্তৃতা দেন ফাদার। দ্রাক্ষা রস ও রুটিতে ঝাঁকফুঁক দিয়ে নবদম্পতিকে পান করান তিনি।

গীর্জা ছিল অতিথতে ঠাসা। মূল প্রার্থনা শেষে উভয় পক্ষের মুরুব্বীরা তাদের সন্তানকে একেঅপরের জীবনে সমর্পনের ঘোষণা দেন। বিয়েনুষ্ঠান শেষে গীর্জার বাইরে দম্পতি একেঅপরকে বিশেষ কায়দায় উইশ করেন।

গারোদের বিয়েতে প্রচুর খরচ হয়। আশার বিয়ের জাঁকজমক দেখে অভিভূত হয়েছি। মাহারী বা সমাজের সকল মানুষকে অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রন করা হয়। হাজারো মানুষ দলবেঁধে নিমন্ত্রণে আসেন। তবে কেউ খালি হাতে নয়। টাকাপয়সা, চাল, ডাল, তেল, লবন থেকে শুরু করে গরু, ছাগল, হাঁসমুরগী এবং শূকর পর্যন্ত নিয়ে আসেন। সারাদিন চলে ভোঁজ পর্ব। সামর্থ থাকুক আর নাই থাকুক এ ধরনের বড় ভোজ পর্ব ছাড়া কোনো বিয়ে হয় না। এজন্য বাড়তি খরচে অনেকেই ঋণের জালে আটকে পড়েন।

গারোদের বিয়ের নেমন্তনে আরো এক মজার জিনিস নিয়ে আসেন অতিথিরা। তা হলো ড্রাম বা জালা ভর্তি গারো মদ বা চূ। ভোজ পর্ব শেষে চলে চূ পান। নারী, পুরুষ, শিশুকিশোর নির্বিশেষে চূ পানের দৃশ্য অবাক করার মতো।

সারাদিন যেসব গারো মুরুব্বীরা সাথে ছিলেন, শিক্ষক হিসাবে সম্মানার্থে স্যার বলতে অজ্ঞান ছিলেন, ভোজন ও চূ পর্ব শেষে মাতাল হয়ে তাদের একজন তুইতোকারি শুরু করেন। একজন আমার ব্লেজারে টান দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, তার সাথে আজ স্বর্গে যাবো কিনা? মাথা নেড়ে সায় দিয়ে পাশ কাটিয়ে চূ অঙ্গন ত্যাগ করলাম। স্বর্গে না গেলেও বাসায় ফেরার বড় তাগিদ ছিল।

(সিনিয়র সাংবাদিক, জয়নাল আবেদীন, ঘাটাইলডটকম)/-