মধুপুরে কোচদের বিড়ম্বিত জীবন, দৃশ্যমান নয় উন্নয়ন কর্মসূচির সুফল

টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচনে গৃহীত শতকোটি টাকার সরকারি প্রকল্পের সুফল মাঠ পর্যায়ে দৃশ্যমান হচ্ছে না। কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না হওয়ায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কোচ সম্প্রদায় দৃশ্যত অন্ধকারেই রয়ে গেছে।

বেসরকারি সংস্থা সেড প্রকাশিত ‘কোচ অব মধুপুর’ গ্রন্থে দেখা যায়, মধুপুর উপজেলার পাহাড়ি তিরিশ গ্রামে ৮৩৩ পরিবারে সাড়ে ৩ হাজার কোচের বাস। এদের ৮৯ শতাংশ ভূমিহীন। শিক্ষার হার মাত্র ৪৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। মূল পেশা দিনমজুরি। অনেকে বাঁশবেতের কাজ করেন।

কামারচালা গ্রামের অমূল্য বর্মন জানান, ৪৭ থেকে ৭৫ পর্যন্ত ৪ দফা দাঙ্গায় অনেকেই ভারতে যান। ফিরে এসে বাড়িঘর ও জমিজমা ফিরে পাননি। বনের খাস জমিতে অনেকের বসবাস। বিগত সাড়ে তিন দশকে সরকার এখানকার ভূমিহীন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন, পুনর্বাসন এবং দারিদ্র্য বিমোচনে তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। প্রথমটি ১৯৮৬ সালে বনশিল্প উন্নয়ন সংস্থার ২০০ কোটি টাকায় ৭ হাজার একরে রাবার প্রকল্প। ১৯৯৩ সালে বাণিজ্যিকভাবে রাবার কষ আহরণ শুরু হয়।

পীরগাছার সত্যেন কোচ জানান, এ খাতে আড়াই হাজার লোকের কর্মসংস্থান হলেও কোচরা চাকরি পাননি। অথচ বাগানের জন্য বনভূমি থেকে উচ্ছেদের সময় বলা হয়েছিল, রাবার উত্পাদনে গেলে গারো-কোচরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চাকরি পাবেন।

মধুপুর বনাঞ্চলে সরকারের দ্বিতীয় দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্প ছিল পতিত বনভূমিতে অংশীদারের ভিত্তিতে সামাজিক বনায়ন। ১৯৮৯ থেকে শুরু হওয়া বন মন্ত্রণালয়ের তিন পর্যায়ের প্রকল্পের কাজ শেষ, চতুর্থটি চলছে। তিন দশকে দেশি-বিদেশি অর্থায়নে প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১৫২ কোটি টাকা। প্রকল্পে উডলট ও অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি মডেলের বনায়নে স্থানীয় ভূমিহীনদের দুই একর করে বনভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরকারি খরচে বৃক্ষচারা রোপণের পর গাছের সারির ফাঁকে আবাদ করা অর্থকরী ফসলের পুরোটাই নেন অংশীদাররা। গাছ বড় হলে নিলামে বিক্রির পর আধাআধি হিস্যা বণ্টন হয়।

বাংলাদেশ কোচ সমিতির সম্পাদক গৌরাঙ্গ কোচ জানান, বনবিভাগ প্রায় ২০ হাজার অংশীদার বাছাই করে প্রায় ৭ হাজার একরে সামাজিক বনায়ন করেন। কোচরা এ বনেই উদ্বাস্তু হিসেবে বাস করলেও তাদের বনায়নের অংশীদার করা হয়নি। সেলামি নিয়ে বহিরাগত ও প্রভাবশালীরা প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন। তাই বনভূমিতে গাছ আর ফলফসলের মিশেল আবাদে দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারি প্রকল্পের সুফল কোচরা পাননি।

মধুপুর বনাঞ্চলে ১৯৯৭ সাল থকে সরকারের তৃতীয় দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর উন্নয়ন প্রকল্প’ চলমান। বিগত ২৩ বছরে দারিদ্র্য বিমোচন খাতে কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। আমলিতলা গ্রামের রাখাল বর্মন জানান, এ প্রকল্পে কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন চোখে পড়ে না। দোখলা ফরেস্ট অফিস পাড়ায় ২০ হাজার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর গারোকোচের জন্য যে সাংস্কৃতিক মিলনায়তন নির্মিত হয় সেটিতে একসঙ্গে ৫০ জনও বসতে পারেন না। নির্মিত কয়েকটি কালভার্ট দুই বছরও টেকেনি। ফলোআপ না থাকায় বিতরণ করা গবাদিপশু বেচাবিক্রি করে খেয়েছেন অনেকেই।

সাইনামারি গ্রামের পূর্ণিমা বর্মন জানান, কোচ পল্লিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় মিশনারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোচ শিশুরা গারো ভাষায় প্রাকপ্রাথমিকে পড়ে থাকেন। অভাব-অনটনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার না হতেই কোচশিশুরা ঝরে পড়ে। সাইনামারি গ্রামের ৪০ কোচ পরিবারের অনেকের বাড়িতেই পলিথিনে ছাওয়া অস্বাস্থ্যকর খোলা লেট্রিন। সরকারি স্বাস্থ্যসম্মত লেট্রিন কখনো জোটেনি। তিন-চার বাড়ি মিলে একটি নলকূপ। পাড়ায় কমিউনিটি ক্লিনিক নেই। আমাশয়, ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও পুষ্টিহীনতা লেগেই থাকে। সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা, প্রসূতি ভাতা শব্দের সঙ্গে তারা পরিচিত নন। সরকারি বসতঘর কোচরা পাননি।

বাংলাদেশ কোচ সমিতির সভাপতি উষারঞ্জন কোচ জানান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসনে পিছিয়ে থাকা কোচরা ছোটজাত বিবেচিত হওয়ায় রাষ্ট্রীয় সুযোগ থেকেও বঞ্চিত। সমাজবিজ্ঞানী ড. আবিদ হাসান জানান, সরকারের এসডিজির ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’ কথাটি বাস্তবায়নে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী কোচদের উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

কুড়াগাছা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুল হক জানান, কোচরা বনের খাস জমিতে বাস করায় নিয়মানুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর ঘর বরাদ্দ পাচ্ছেন না।

দোখলা রেঞ্জ অফিসার আব্দুল আহাদ জানান, এবার থেকে ভূমিহীন কোচরা সামাজিক বনায়নের অংশীদার হচ্ছেন। মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফা জহুরা জানান, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর উন্নয়ন প্রকল্প থেকে গারো ও কোচদের পাওয়ার টিলার, শিক্ষা উপবৃত্তি ও উপকরণ দেওয়া হয়। এবার বিত্তহীন গারোদের ঘর দেওয়া হচ্ছে। সামনে কোচরাও পাবেন।

(জয়নাল আবেদীন, ঘাটাইল ডট কম)/-

Print Friendly, PDF & Email