মধুপুরের বুনো কৃষিতে নিরাপদ জীবিকায়ন

তলোয়ারের মতো বাঁকানো লম্বা পাতার দুই ধার লালচে কাঁটায় সুচালো হয়ে উঠেছে। কদিন পরই কোমল পত্রগুচ্ছে উঁকি দেবে লাল টুকটুকে আনারস ফুল। খেত জুড়ে সাথি ফসল হিসেবে থরে থরে সাজানো পেঁপে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাতাবি লেবু। মাটি কামড়ে রয়েছে ওষুধি গুল্মলতা। মাসখানেক আগে তোলা হয়েছে পাকা বাঙ্গি আর মিষ্টিকুমড়া। এসব ছাড়িয়ে নকশাকার সবুজ পাতার বনজ আকাশমনি লকলকিয়ে ওপরে উঠছে। এ যেন ফলদ, বনজ, ভেষজ গুল্মাদি নিয়ে বুনো কৃষির এক অপূর্ব সমাহার।

টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় এমন কৃষি বন বাগানের দেখা মেলে হরহামেশা। যেসব বাগান জোগান দিচ্ছে শরীরের চাহিদার জন্য পুষ্টিকর ফল, রোগব্যাধি উপশমে বিনা মূল্যের দেশীয় চিকিত্সা উপকরণ আর গৃহস্থালি কাজের জ্বালানি ও মূল্যবান কাঠ।

একই জমিতে ফল, ফসল, ভেষজ আর বনজ গাছের বুনো কৃষির আবাদ বাড়তি উত্পাদন, পণ্যের জোগান ও আয়-রোজগারই বাড়াচ্ছে না, উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে দাবি স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের।

জানা যায়, বৃহত্তর ময়মনসিংহের মধুপুর গড়ের মধুপুর, ঘাটাইল, মুক্তাগাছা, ফুলবাড়িয়া ও জামালপুর সদর উপজেলায় (আংশিক) আনারসের বাণিজ্যিক আবাদ সাম্প্রতিক ল্যাটিন আমেরিকান ফল আনারস কলম্বাসের হাত ধরে আসে পর্তুগালে। পর্তুগিজরা ১৫৪৮ সালে নিয়ে আসেন ভারতের কেরালায়। খ্রিস্টান মিশনারিরা ঊনবিংশ শতাব্দীতে কেরালা থেকে আনেন মেঘালয়ে।

পরে ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর সিলেট ও চট্টগ্রামে। তবে মেঘালয় থেকে মধুপুরে আনারস আসে ১৯৪২ সালে। ইদিলপুর গ্রামের গারো নারী মিজিদয়াময়ী সাংমা প্রথম আনারস আবাদ শুরু করেন।

ভুটিয়া গ্রামের ফলচাষি মজনু মিয়া জানান, ফলের বাণিজ্যিক আবাদে খামারিরা কৃষি বিভাগ ছাড়াও ইউটিউবের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। আগে জমিতে আনারস বা কলার একক আবাদ হতো। ভালো ফলন হলেও পণ্য বাজারজাত ও বিপণন সমস্যায় লোকসানের ঝুঁকি থাকত। এখন আনারস বা কলার সঙ্গে সাথি ফসল, ফল, মসলা বা ভেষজের মিশ্র চাষের প্যাকেজ করেন।

গাছাবাড়ী গ্রামের আনারস চাষি শামসুল হক জানান, আনারসের সঙ্গে হলুদ, আদা, সরিষা, সবজি বা ভেষজের আবাদ করেন। কলা ও আনারসের মিশ্র চাষ ছাড়াও পেঁপে, বাঙ্গি, মাল্টা, বাতাবি লেবু, পেয়ারা ও সবজির মিশ্র আবাদ হয়। এমন বিন্যাসে হালচাষ, নিড়ানি সার, কীটনাশকে বাড়তি খরচ হয় না। কম খরচে বেশি ফলন, বাড়তি লাভ হয়।

বন বিভাগের উডলট কার্যক্রমের আওতায় জাতীয় সদর উদ্যান বিটের আমলীতলায় পতিত বনভূমির প্লট বরাদ্দ নিয়ে তিন একরে কৃষি বন বাগান করেছেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মতিয়ার রহমান। বছরে সেখান থেকে ৪০/৫০ লাখ টাকা আয়।

ফরেস্টার আব্দুল আহাদ জানান, নিয়মানুসারে বনজ চারা লাগানোর পর সারির ফাঁকে চাষাবাদ করা ফসল বা ফলের পুরোটাই কৃষক ভোগ করেন। আর ১০ বছর পর প্লটের বনজ গাছ ক্লেয়ার ফেলিং করে ফিফটি ফিফটি হারে হিস্যা বণ্টন হয়। উজাড় হওয়া প্রায় ৫ হাজার একর বিরান বনভূমিতে উডলট মডেলের কৃষি বন বাগান রয়েছে বলে জানান তিনি।

বুনো কৃষির উদ্যোক্তা কৃষিবিদ অলোক আহমেদ জানান, মধুপুরে পাহাড়ি কৃষিতে নীরব বিপ্লব ঘটেছে। আগর থেকে বাসক, ড্রাগন থেকে মাল্টা, ঘৃতকুমারী থেকে কফি বাণিজ্যিক খামারে ঠাঁই পেয়েছে। রকমারি ফল, ফসল, ভেষজ, মসলা আর নানা প্রজাতির উদ্ভিদকুল বৈচিত্র্যের মর্যাদায় তৃণমূলের বনবাগানে গুরুত্ব পাচ্ছে। কৃষিতে জীবিকায়ন নিরাপদ হচ্ছে।

মধুপুর উপজেলা কৃষি অফিসার মাহমুদুল হাসান জানান, প্রায়োগিক ক্ষেত্রে কৃষির আধুনিক প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে নেওয়ায় ফল ও ফসল আবাদে নানা মাত্রার বৈচিত্র্য ও রকমারি দৃশ্যমান হচ্ছে।

(জয়নাল আবেদীন, ঘাটাইল ডট কম)/-

Print Friendly, PDF & Email