২২শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৬ই জুলাই, ২০২০ ইং

‘মধুপুরের চুনিয়া গ্রামে জনির জীর্ণ কুটিরে বসেছিলেন বঙ্গবন্ধু’

ফেব্রু ১৯, ২০২০

ত্রিকালদর্শী জনি নকরেকের বর্তমান ঠিকানা টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলের চুনিয়া গ্রামে। ইটে গাঁথা, লাল টিনের চৌচালার সুদৃশ্য “চুনিয়া বাংলো” ডাইনে রেখে পায়ে চলা পথ গজারী বন বিদীর্ন করে প্রবেশ করেছে আদিবাসী গ্রাম চুনিয়ায়। বাঁক খেয়ে পথের মাথা যেখানে শেষ, সেখান থেকে দশ কদম পা মেললেই পরিচ্ছন্ন মাটির ঘর। আর সেটিই জনির শান্তি নিকুঞ্জ।

জনির জন্ম ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উদয়পুর পাহাড়ে। বাবার নাম অতীন্দ্র মৃ। আর মা অনছি নকরেক। পীরগাছা ছিল নানানানীর বাড়ি। নানার নাম ছিল সুরমান চিরান। আর নানী বালমী নকরেক।

কৈশোরে দূরন্ত যৌবন যখন উড়ুউড়ু, বনবনানী, পাখপাখালী, বাইদ আর পাহাড়ী ঝর্ণায় মিতালী পাতানোর খায়েশ অনবরত ঘুরপাক খেতো; ঠিক তখনই মামা বাড়ি বেড়াতে এসে ওয়ানগালা বা নবান্ন উৎসবে নাচগান আর চুং পানের আসরে চারচক্ষুর মিলন ঘটে। বিয়ের পর আর ত্রিপুরায় ফেরা হয়নি জনির। অনিতার গলায় মালা বদলে সেই যে মায়ার বন্ধনে সুর মিলিয়েছিল, তা নিয়েই কাটছে পড়ন্ত বেলা। ঘরে ছয় ছেলে, তিন মেয়ে। চার ছেলে ঘর জামাই গেছে। মেয়ে বৈজয়ন্তী নকনার মর্যাদায় বাড়িতে জামাই এনেছেন। সব মিলিয়ে তার নাতিনাতনীর সংখ্যা ৩০জন। জমিজমা খুব একটা নেই। কায়ক্লেশে দিন চলে জনির।

জনি জানান, তার জীবনে সবচেয়ে বড় স্মৃতি হলো ১৯৭১ সালের জানুয়ারী মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মধুপুর বনাঞ্চলের দোখোলা বাঙলোতে অবস্থানকালে তার সাথে বিরল সাক্ষাৎ। বেগম মুজিব সেদিন বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী ছিলেন। দোখলা বাঙলোতে বঙ্গবন্ধু অবস্থানকালে গারো গ্রাম চুনিয়া ভ্রমণ করেন। তিনি আদিবাসী গারো নেতা প্রয়াত পরেশ মৃর বাড়িতে গমন করেন। বাঙলোতে ফেরার পথে তার জীর্ণ কুটিরেও বঙ্গবন্ধু একদন্ড বসেছিলেন। তার নিকট এটি অমূল্য স্মৃতি।

নিজের জীবনের গল্প বলতে গিয়ে ত্রিকালদর্শী জনি নকরেক বলছেন, অনিতাকে প্রাণভরে ভালোবাসতাম। পাহাড়ী টিলার ধানী জমিতে মায়ের সাথে অনিতা কাজে গেলে, নানা ছুঁতোয় জমির আইলে দাড়িয়ে থাকতাম। অগোচরে আগাছা পরিস্কারে হাত লাগাতাম দুজনের সাথে। ডানেবায়ে তাকিয়ে মিষ্টি হাসতো অনিতা। আর মা নর্জ মৃ বাঁকা চোখে তাকাতো। মায়ের কড়া নজর সত্বেও দিনের পর মাস। মাসের পর বছর না পেরোতেই অনিতার সাথে মন দেয়া নেয়া, হৃদয় হরণের পালা শেষ হয়। গারো মাহারী বা সমাজের মানুষ জানতে পারলো, জানতে পেরে বুঝতে পারলো, বুঝতে পেরে অনিতার পরিবারকে চাপ দিলো। শেষ পর্যন্ত, এক হাড় কাঁপানো পৌষের নিশিতে গারো সমাজের প্রচলিত রীতিনুযায়ী আমাদের দুজনকে ঘরের দুই দরজা দিয়ে এক ঘরে তুলে দেয়া হলো। জীবনের সেই রাতে বাইরে পৌষের প্রচন্ড শীত থাকলেও ভেতরে অনিতা আর আমার বসন্ত চলছিল। সে এক অনন্ত ভালোবাসার বসন্ত। সেই ভালোবাসা মন থেকে মনে, দেহ থেকে দেহে, শিরা থেকে শিরায় ছড়িয়ে পড়েছিল।

জনি বলেন, পরম সুখে নিশিবসান ঘটে মোরগ ডাকা ভোরে। দু,হাত মিলিয়ে পায়ে ছন্দ তুলে একই দরজায় হাসিমুখে বেরুলাম। বিহানে দুজনের এক দরজায় হাসিখুশিতে বেরুতে দেখে উৎফুল্ল হলো বাড়ির সবাই। তারপর? তারপর পুরোহিতকে ডাকা হলো। গারো সমাজের রীতিনুযায়ী মন্ত্রজপ আর মালা বদল হলো। মোরগ জবাই হলো। শুরু হলো নতুন জীবনের জয়যাত্রা। সেই যে বিনে সূতোর মালায় অনিতা অঙ্কশায়িনী হলো; তা টিকেছিল টানা পয়ষট্রি বছর।

জনি নকরেক ইতিহাসের জীবন্ত কিংবদন্তী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চলমান গল্প বাল্যে শুনেছেন। যৌবনে ব্রিটিশ শাসন দেখেছেন। ভারত-পাকিস্তান আন্দোলন ও দেশভাগ দেখেছেন। জনি “হাত মে বিড়ি মুখমে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” শ্লোগান শুনেছেন। তারও আগে মধুপুর থেকে ময়মনসিংহ চল্লিশ কিলো পায়ে হেটে গিয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং মহাত্মা গান্ধীর জনসভায় অংশ নিয়েছেন। কিন্তু বৃিটিশ শাসনের অবসানে পাকিস্তানেরর জন্ম হলেও আদিবাসী গারোদের কোনো লাভ হয়নি। দুই দুই বার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় গারোরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেকেই সীমান্ত পেরিয়ে ভারত চলে যায়। পরবর্তীতে পাকিস্তান খেদাও আন্দোলন শুরু হলে গারো জনগোষ্ঠি তাতে সক্রিয় অংশ নেয়। বহু গারো মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে অংশ নেয়। কিন্তু কেউ রাজাকার বা আলবদরে যোগ দেয়নি।

জনি স্মৃতি হাতড়ে জানান, সে সময় মধুপুর জঙ্গলে জুম চাষ হতো। জুম জমিতে নানা ফসল ছাড়াও স্থানীয় জাতের আনারস আবাদ হতো। শুধু লবন, কেরোসিন আর বস্ত্র ক্রয় ছাড়া গারোরা জঙ্গলের বাইরে মানে হাটবাজারে যেতেন না। জীবনের সব উপকরণ জঙ্গলেই মিলতো। তিনি গল্প জমিয়ে বলেন” নিজ হাতে বাঘ ও বনমহিষ শিকার করেছি।”

বেসরকারি সংস্থা ” শেড” প্রকাশিত গ্রন্থ ” madhupur, the vanishing forest and her people in.agony” থেকে জানা যায়, মধুপুর বনাঞ্চলে আদিবাসী গারো জনসংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার। এদের মধ্যে সাংসারেক বা আদি গারো ধর্মাবলম্বির সংখ্যা মাত্র ৪৭ জন। দিনে দিনে নানা কারণে মধুপুর বনাঞ্চলের গারোরা খৃস্ট ধর্ম গ্রহন করে আধুনিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সচেতনায় এগিয়ে গেছেন। কিন্তু জনি নকরেকের মতো হাতেগোনা কিছু মানুষ এখনো আদিধর্ম আকড়ে পড়ে আছেন।

জনি এখনো আদি গারোদের মতো পূজাপার্বণ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে থাকেন। নিজ ধর্মেের আচারনিষ্ঠার প্রতি তার প্রচন্ড অনুরাগ। পরিবারের সবাই খৃস্টান হলেও নিজের মতাদর্শ থেকে তিনি এক চুল ও নড়েননি।

এখানে ধর্মীয় প্রার্থনার জন্য কোনো মন্দির নেই। থাকার ঘরের এক অংশকে তিনি মন্দির হিসাবে ব্যবহার করছেন। তার অন্তিম ইচ্ছা কেউ না কেউ, কোনো না কোনো একদিন, তার ডাকে সাড়া দেবে। তার দেবতার পুজা অর্চণার জন্য একটা মন্দির নির্মাণ করে দেবে।

(সিনিয়র সাংবাদিক জয়নাল আবেদীন, ঘাটাইলডটকম)/-

Recent Posts

ফেসবুক (ঘাটাইলডটকম)

Doctors Dental

ঘাটাইলডটকম আর্কাইভ

বিভাগসমূহ

পঞ্জিকা

July 2020
S S M T W T F
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031