মধুপুরের গারো মেয়েদের জীবনও সুন্দর করছে বিউটি পার্লার

এক পোয়া চালের সঙ্গে অনেকখানি বুনো আলু মিশিয়ে খিচুড়ির মতো কিছু একটা রান্না হতো। পরিবারে নয়টা পেট। একবেলাতেই খাওয়া  ফুরিয়ে যেত। অন্য বেলাগুলোতে সবাই মিলে উপোস। কখনো হয়তো কারও জন্য কিছুটা আলু সেদ্ধ করা হতো। টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার কাকড়াগুনী গ্রামে অনিলা সিমসাংয়ের পরিবারের দিন এভাবেই কাটত।

তিন দশক আগের সেই অনটনের কথা মনে করে ৭২ বছর বয়সী গারো বৃদ্ধা বলেন, ‘নয়জন খাওয়্যাউয়া, হাল বাওয়া আর লাকড়ি বিক্রি ছাড়া কোনো কাজ নাই। চাষের জমিও ছিল না। বাচ্চাদের নিয়া জীবনে খুব কষ্ট হইছে।’

অনিলার বাড়িতে এখন টিনচালা পাকা ঘর উঠেছে। তিনবেলা মনমতো পদ রান্না হচ্ছে। অতিথি-কুটুম এলে না খেয়ে ফেরে না। পরবে-উৎসবে জাঁকজমক করে ভোজ হয়।

গারোরা মাতৃবংশীয়। তাদের বংশপরিচয় হয় মায়ের সূত্রে। আর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় মেয়েরা। অনিলার পরিবারটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে মূলত মেয়েদের আয়ে। তাঁর সাত সন্তানের চারজন মেয়ে। আশির দশকের শেষ থেকে একে একে মেয়েরা গ্রাম ছেড়েছিলেন ঢাকায় বিউটি পারলারে কাজ করতে। তিনজন এখন রাজধানীতে নিজেরা পারলার দিয়েছেন।

শুধু এ পরিবার নয়। শহরে রূপচর্চা-পেশাজীবী মেয়েদের আয়-রোজগার মধুপুরের অনেক গারো পরিবারের আর্থিক অবস্থা পাল্টে দিয়েছে। ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়ক থেকে অনেকটা ভেতরে কাকড়াগুনী, গায়রা, শোলাকুঁড়ি, জলছত্র ও আমলিতলা গ্রাম ঘুরে সে সচ্ছলতার ছবি দেখা গেল।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সেড) ২০১৮ সালের একটি জরিপ বলছে, মধুপুর এলাকার গারো কর্মজীবী নারী-পুরুষদের ৮ শতাংশের বেশি শহরাঞ্চলে পারলারে কাজ করেন। সংখ্যায় তাঁরা হাজারের বেশি। এলাকার কিছু বাঙালি মেয়েও পারলারে কাজ করছেন।

সেডের হিসাবে, মধুপুরে গারো জনসংখ্যা ১৭ হাজারের মতো। গারোরা অবশ্য বলে থাকেন, সংখ্যাটা ২৫ হাজার ছাড়াবে। এলাকায় খ্রিষ্টান মিশনারিরা অনেক বছর ধরে বেশ কিছু স্কুল চালান। সব মেয়েই স্কুলে যায়। ঢাকাতে অনেক গারো মেয়ে বিদেশিদের বাসায় গৃহকর্মীর কাজও করেন। গ্রামের মেয়েরা ধানখেত, আনারস, পেঁপে ও কলার বাগানে কাজ করেন।

টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার গারো মেয়েরা বিউটি পারলারে কাজ করে অনেক পরিবারের অবস্থা ফিরিয়েছেন। তবে সামাজিক সমস্যাও হচ্ছে।

৫০টি পার্লারের মালিক সংগঠন বিউটি সার্ভিস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কানিজ আলমাস খান। তিনি বলেন, ঢাকায় রূপচর্চাকেন্দ্র শুরু করেছিল চীনা বংশোদ্ভূতরা। তারাই গারো মেয়েদের পেশায় এনেছিল।

কানিজের পারলারের ১১টি শাখায় তিন হাজারের কাছাকাছি মেয়ে কাজ করেন। প্রায় অর্ধেকই মধুপুর-ময়মনসিংহ এলাকার গারো। তিনি বলেন, পারদর্শী, কর্মঠ ও বিশ্বস্ত এই মেয়েরা কাজ করে নিজেদের ভাগ্য ফিরিয়েছে।

মধুপুরে এখনো পাকা ঘরের সংখ্যা হাতে গোনা। পাঁচ গ্রামে মাটির ঘরের মধ্যে মধ্যে যেসব পাকা ঘর দেখা যায়, সেসব বাড়ির মেয়ে অথবা বউ পারলারে কাজ করেন। কাজ করেন তাঁরা ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন শহরে। এর মধ্যে সাতটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনটির মেয়েরা নিজেরাই পার্লার-মালিক।

সেডের পরিচালক ফিলিপ গাইন মধুপুর বনাঞ্চল আর গারো জাতিসত্তার মানুষদের নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন। তিনি বলেন, গারো সমাজে মেয়েরা স্বাধীনতা ভোগ করে। পেশার বিষয়ে পুরুষেরা বাধা দেয় না। তা ছাড়া রূপচর্চাকর্মী মেয়েরা পরিবারে সচ্ছলতা আনছে।

অনিলার বড় মেয়ে সুচন্দা সিমসাং (৫৫) বলেন, ১৯৮৯ সালে খাবারের কষ্ট সইতে না পেরে এক খালার সঙ্গে ঢাকায় আসেন। স্বজাতীয় এক পারলারকর্মীর বাচ্চা রাখতেন। পরে গ্রিন রোডের একটি পারলারে মাসিক ৩০০ টাকা বেতনে কাজ নেন। থাকা-খাওয়া মালিকের।

বাড়িতে টাকা পাঠাতেন সুচন্দা। তাঁর আয়েই পরিবারের কষ্ট দূর হতে থাকে। গ্রাহকদের সঙ্গে বাংলা ভাষায় কথাবার্তা বলতে সমস্যা হতো। সংস্কৃতির পার্থক্যের কারণেও অসুবিধা হতো। খাওয়ার কষ্ট ছিল। সুচন্দা কিন্তু লেগে থেকে ২০০৭ সালে নিজে মোহাম্মদপুরে একটি পারলার দেন। সুচন্দার হাত ধরে ক্রমে অন্য তিন বোন সুজাতা সিমসাং (৫০), প্রমিতা সিমসাং (৪৫), ভাবনা সিমসাং (২৬) ঢাকায় আসেন। সুজাতা-প্রমিতাও নিজস্ব পারলার দিয়েছেন। প্রতি মাসে গ্রামে টাকা পাঠান। তাঁদের টাকায় চাষবাস চলে, আপদ-বিপদ পার হওয়া যায়। ২০১৬ সালে পাকা ঘর উঠেছে। বোনেরা গ্রামে আর ময়মনসিংহ শহরে জমি কিনেছেন।

অনিলার বাড়ির পাশেই আরেকটি পাকা বাড়ি, তালাবদ্ধ। মালিক মিনিতা সিমসাং পারলারে কাজ করে ঘর তুলেছেন। স্বামী-সন্তানসহ ঢাকায় থাকেন, উৎসব-পার্বণে গ্রামে আসেন।

চাষ ক্ষেতের আল আর পাহাড়ি মাটির রাস্তা পেরিয়ে আমলিতলায় প্রেমলা নকরেকের বাড়িতে পৌঁছে দেখা যায়, এটিও পাকা। তাঁর চার মেয়ের দুই মেয়েই ঢাকায় পার্লারে কাজ করেন। অভাবের তাড়নায় ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বড় মেয়ে ববিতা নকরেককে ঢাকায় কাজে পাঠিয়েছিলেন। ববিতাই কয়েক বছর পর মেজ মেয়ে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী মিতালিকে ঢাকায় নেন। দুই বোন মিলে বাড়ি পাকা করেছেন। সংসার চালাচ্ছেন, ছোট বোনদের ঢাকা আর চট্টগ্রামে দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন। ববিতা নিজে ২০১২ সালে চট্টগ্রাম শহরে পারলার দিয়েছেন। সেখানে ২৫ জনকে চাকরি দিয়েছেন।

গায়রা গ্রামের দুই জা জিলিতা চাম্বুগং ও রোজিনা দফো ঢাকায় পারলারে কাজ করেন। ২০১৫ সালে ঝড়ে তাঁদের মাটির ঘর ভেঙে গেলে তাঁরা টাকা পাঠিয়ে টিনের ঘর তৈরি করিয়েছেন। ধান আবাদের সময় থোক টাকা দেন। মাসে নিয়মিত টাকা তো পাঠানই।

মধুপুরে জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক বলেন, অভাবী পরিবারের মেয়েরাই মূলত পার্লারে কাজ করছে। তাদের সুবাদে বেশ কিছু পরিবারে আয়-উন্নতি হয়েছে, এটা ভালো। তবে পাকা বাড়ি তৈরির দিকে না ঝুঁকে টাকাটা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করলে ভালো হতো। অন্যদের কাজের সুযোগও হতো।

এদিকে পারলারে কাজ করতে গিয়ে কেউ কেউ বাঙালি ছেলে বিয়ে করছেন, যা সমাজ ভালো চোখে দেখছে না। মধুপুরের গারোরা প্রায় সবাই ধর্মে খ্রিষ্টান। এমন পরিস্থিতিতে অনেক পরিবার মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।

অনিলার স্বামী প্রমুত মারাক (৮০) বলেন, কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের সংস্কৃতি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাঁর বড় দুই মেয়েও বাঙালি বিয়ে করেছেন। পরিবার পাঁচ বছর পর মেনে নিয়েছে। তবে এই দুই মেয়ে সম্পত্তির উত্তরাধিকার হারিয়েছেন।

(মুসলিমা জাহান, ঘাটাইলডটকম)/-