‘মণিপুরের স্বাধীনতার ঘোষনা ভারতে প্রভাব ফেলতে পারে’

মাত্র ২৮ লক্ষ মানুষ অধ্যুষিত ভার‍তের সবচেয়ে ছোট রাজ্য মণিপুর কি করে স্বাধীনতা ঘোষনা দেয়ার সাহস দেখালো? কারন যাই হোক এক সাগর রক্তে যুদ্ধর মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের একজন অধিবাসী হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীনতাকামীদের পক্ষে থাকা নৈতিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ে বলেই মনে করি।

ভারত সেভেন সিস্টার্স নিয়ে এমনিতেই উদ্বগের মধ্যে থাকে, মণিপুরের স্বাধীনতা ঘোষনা বাকী ছয়টি রাজ্যের উপর কি প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার মণিপুরীদের উপর কি আচরন করে, সেটাও দেখার বিষয়।

সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলো ঐতিহাসিকভাবে কখনোই আজকের ইন্ডিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভূক্ত ছিল না। আর্য সম্প্রদায় সমগ্র ইন্ডিয়া দখল করলেও ব্রক্ষ্মপুত্রের পূবপাশের এই উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে আসতে পারেনি। বরং এখানে গারো, খাসিয়া, বোরো, মিজো বা এইধরণের অনার্য আদিবাসী রাজাদের শাসন ছিল সবসময়ই।

এই অঞ্চলে প্রথম স্বাধিকারের দাবী তুলে নাগাল্যান্ড তথা নাগা’রা। ভারতের স্বাধীনতার ঠিক আগের দিন ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট নাগারা নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে, কিন্তু তাতে কাজ হয় নি। এরপর তাদের নাগাল্যান্ডের স্বাধীনতাকামী সংগঠন নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিলের (NNC) উদ্যোগে ১৯৫১ সালের মে মাসে নাগাল্যান্ডে একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যার মাধ্যমে নাগারা স্বাধীনতার পক্ষে সম্পূর্ণ সমর্থন জানায়। কেন্দ্রিয় সরকার তাদের দাবী প্রত্যাখ্যান করে, এবং ১৯৬৩ সালে আসাম থেকে আলাদা করে ভারতের ১৬তম রাজ্য হিসেবে গঠিত হয় নাগাল্যান্ড।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে বার্মা মণিপুর আক্রমণ করতে পারে, এই আশংকা থেকে এখানকার দূর্বল মণিপুরী রাজা ব্রিটিশ ভারতের সাহায্য চায়। ব্রিটিশ শাসনের দেড়শ বছর পর প্রথমবারের মত ব্রিটিশরা মণিপুর ‘দখল’ করে নেয় উনিশ ত্রিশের দিকে।

ইন্টরেস্টিং বিষয় হলো, পোলো খেলাটি ইউরোপীয়রা এই মণিপুর রাজ্য থেকেই গ্রহণ করেন। একটা মৈত্রি চুক্তির মাধ্যমে এরা ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভূক্ত হলেও স্বায়ত্বশাসিত ছিলো। ১৯৪৯ সালে মণিপুরের রাজা বুধচন্দ্র ভারতীয় ইউনিয়নে মনিপুরকেও শামিল করে নেন।

সাম্প্রতিক সময়ে উইকিলীকসের ফাঁস করা কিছু তারবার্তায় সেভেন সিস্টার্সের প্রতি ভারতীয় প্রশাসনের মনোভাবের কিছু বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাওয়া গেছে, যেখানে তারা এই অঞ্চলকে (বিশেষত মনিপুর) অঙ্গরাজ্যের বদলে উপনিবেশ হিসেবে মূল্যায়ন করে থাকেন। এছাড়া সেখানে নিয়মিত মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা এবং এইসব ঘটনায় সামরিক বাহিনী বিশেষত আসাম রাইফেলস এর সংশ্লিষ্টতা বার বার উঠে আসে।

অব্যাহত গুপ্তহত্যা, এনকাউন্টার এবং মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ভারতীয় সুপ্রীম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সন্তোষ হেজের নেতৃত্বে ২০১৩ সালে গঠিত হয় সন্তোষ হেজ কমিশন; এই কমিশন ৬টি এনকাউন্টারের ঘটনা তদন্ত করে দেখতে পায়, নিহত ছয়জনের কারো বিরুদ্ধেই কোন ধরণের অভিযোগ ছিল না।

সব স্বাধীকার আন্দোলনের পিছনেই থাকে দমন নিপীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের মত ঘটনাগুলি, মণিপুরও হয়তোবা এর ব্যতিক্রম নয়।

(জিল্লুর রহমান, সংবাদ কর্মী/ ঘাটাইলডটকম)/-