মগ জাতি ও মগের মুল্লুকের গল্প

স্বেচ্ছাচারিতা বা অরাজক অবস্থা বোঝাতে বাঙালী জাতি ‘মগের মুল্লুক’ কথাটি প্রায়ই ব্যবহার করে।  ….তারে কি ‘মগের মুল্লুক’ পাইছো নাকি, ইত্যাদি। তো এই কথাটি কোথা থেকে কিভাবে আসলো?

উইকিপিডিয়া বলছে, “মগ জাতিগোষ্ঠী বাংলাদেশের একটি উপজাতি। এরা বর্মার আরাকান জাতির মানুষ বা তাদের বংশধর যারা ১৫০০- ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ জলদস্যু হিসেবে বা আরাকান রাজ্যবিস্তারের উদ্যেশ্যে বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম এবং তার আশেপাশের উপকূলবর্তী কিছু অংশে আক্রমণ চালায় ও স্থানীয় মানুষদের ধরে নিয়ে গিয়ে বাটাভিয়াতে (ওলন্দাজ ইস্ট ইণ্ডিয়া কম্পানী অধিকৃত জাকার্তা) ক্রীতদাস হিসাবে চালান করে।”

বিস্তারিততে গেলে দেখা যায়, ‘মগ’-এর মুল্লুকই কেন হল, গ্লাস বা জগের মুল্লুক কেন হলো না। তাহলে এই মগ কী। এটা চা-পানি খাওয়া বা গোসল করার মগ থেকে আসেনি। এই ‘মগ’ হচ্ছে মিয়ানমারের আরাকান জলদস্যু।

বার্মা বা মায়ানমার নামে প্রাচীনকালে সে দেশের নামই ছিল আরাকান।

মগ ও জাতি

মগ শব্দটির আরেকটি বিকল্প ব্যুৎপত্তি হচ্ছে, শব্দটিমঙ্গোল থেকে এসেছে। আরাকান ইতিহাসে আরাকান রাজাদের পূর্বপুরুষদের আদি বাসস্থান হিসেবে “মগ” এর কথা উল্লেখ করা হয়েছিল, যারা বুদ্ধের আত্মীয় ছিল।

১৬২৫ সালের দিকে বঙ্গভূমি যখন খুব সমৃদ্ধশালী ছিল তখন, ‘পর্তুগিজ আর মগ’ জলদস্যুরা পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ এখন যেটা বাংলাদেশ তার দক্ষিণ অংশ বা নিম্নাঞ্চলে এসে লুটপাট চালায়। তখন এ ভূখণ্ড শাসন করত মুঘল সুবেদাররা।

এরা এসেছিল আফগান ভূমি থেকে, আর শাসনের কেন্দ্র ছিল দিল্লি।

মুঘল সুবেদাররা কখনওই মগদের সঙ্গে পেরে উঠেনি।

ইতিহাস ও লুণ্ঠন

মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর তার স্মৃতিকথাগুলোতে একদল মগের বর্ণনা দেন যারা ইসলাম খানের পুত্র হুশাং সহ তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। তার মতে ভ্রমণের তারিখ ছিল ১লা এপ্রিল, ১৬১৩ (ইরানী ক্যালেন্ডারে ১৪শ ফারওয়ারদিন)। তিনি এই দলটিকে পেগু (মন রাজ্যের রাজধানী) এবং আরাকানের কাছে একটি মগ নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে আগত বলে বর্ণনা করেছেন।

জাহাঙ্গীর মনে করতেন মগরা তাদের খাদ্যাভ্যাস এবং বৈবাহিক অভ্যাসের ব্যাপারে অনিয়ন্ত্রিত (“তারা স্থলে বা সমুদ্রে যা কিছু আছে সবই খায়, এবং তাদের ধর্ম দ্বারা কোন কিছুই নিষিদ্ধ নয়” এবং “তারা অন্য মা এর দ্বারা জাত বোনদেরকে বিয়ে করে”)। তিনি তাদের ভাষাকে “তিব্বতীয়” এবং তাদের ধর্মকে “মুসলিম বা হিন্দু কোনটাই নয়” বলে বর্ণনা করেন।

ঢাকার সুবেদার তখন খান-ই-দুরান। কথিত আছে, তিনি তো মগদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো দূরে থাকুক কোনো প্রতিবাদও করেননি (যেমন বর্তমানের বাংলাদেশ)। মগদের ভয়ে উল্টা রাজমহল থেকে পালিয়ে যান।

এই সুযোগে মগরা এই ভূমিতে একদম যা ইচ্ছে তাই রকমের লুটপাট, অত্যাচার নির্যাতন চালায়।

মানুষদের ওরা ধরে ধরে নিয়ে যেত, তাঁদের অন্যান্য দেশে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দিত। নিপাট, নিরীহ, নির্বিবাদ একজন গৃহস্থ মানুষের সব কেড়ে নিয়ে রাতারাতি অন্যের কৃতদাস করে দিত।

মুঘল আমলের শেষে, সুলতানি আমলেও মগদের এই অত্যাচার অব্যাহত ছিল।

১৭৮৪ সালে বার্মিজরা আরাকান রাজ্যটি দখল করে হাজার হাজার আরাকানিকে হত্যা করে। পুরো বাংলা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে, তারা আসামেও অনেক অত্যাচার করে।

কথায় বলে রতনে রতন চেনে। কথাটা পর্তুগিজ জলদস্যু আর মগদের বেলায় ষোল আনা খাটে। পর্তুগিজ জলদস্যুরা যখন চট্টগ্রাম পেরিয়ে আরাকানে পৌঁছাল, মগদের সঙ্গে দ্রুতই গলায় গলায় ভাব হয়ে গেল তাদের। এই উভয় জাতিই পরিবার-পরিজন নিয়ে নৌকা বা জাহাজে যাযাবর জীবন যাপন করত এবং লুটপাট, ডাকাতি, অপহরণ—ইত্যাদিই ছিল তাদের মূল পেশা। ফলে এই দুই ত্রাস একত্র হতে পেরে বাংলার বুকে অপকর্মের বন্যা বইয়ে দিল।

যামিনীমোহন ঘোষের ‘মগ রেইডার্স ইন বেঙ্গল’ এবং বার্নিয়েরের ভ্রমণকাহিনীতে মগদের অত্যাচারের কাহিনী পড়লে আজো গা শিউরে ওঠে।

শিহাবউদ্দিন মোহম্মদ তালিশ নামে মীর জুমলার এক রাজকর্মচারীর লেখাতেও বাঙ্গালিদের ওপর মগদের নির্মম অত্যাচারের বিবরণ আছে। বারোভূঁইয়ারা এসব মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যু দমনে যথাসাধ্য চেষ্টা করতেন বটে তবে তাদের পক্ষে পুরোপুরি দমন করা সম্ভব হয়নি।

বাংলায় মোগল শাসন প্রতিষ্ঠালগ্নে বারোভূঁইয়ারা দুর্বল হয়ে পড়লে মগ ও ফিরিঙ্গি জলদস্যুদের অত্যাচার মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। মোগল আমলেই মগরা তিন তিনবার ঢাকা লুণ্ঠন করে।

যতীন্দ্রমোহন রায়ের ঢাকার ইতিহাসে লেখা হয়েছে, ‘নবাব খানজাদ খাঁ এরূপ ভীরু স্বভারের লোক ছিলেন যে, তিনি মগের ভয়ে ঢাকা নগরীতে অবস্থান করিতেন না। মোল্লা মুরশিদ ও হাকিম হায়দারকে ঢাকায় প্রতিনিধি নিযুক্ত করিয়া তিনি রাজমহলে অবস্থান করিতেন।’

মগরা ঢাকা আক্রমণ করলে এই দুই প্রতিনিধি নগরী রক্ষায় যথাসাধ্য চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।

যতীন্দ্রমোহন লিখেছেন, ‘মগী সৈন্যের তাণ্ডব নৃত্যে ঢাকা শহর টলটলায়মান হইয়াছিল। উহারা নগর ভস্মসাত্ করিয়া প্রচুর ধনরাশি লুণ্ঠন ও আবালবৃদ্ধনির্বিশেষে বহুলোক বন্দী করিয়া চট্টগ্রাম প্রদেশে লইয়া যায়।’

ইতিহাসে তিনবার ঢাকা লুণ্ঠনের উল্লেখ থাকলেও কেবল ১৬২০ সালে হামলার বিবরণ পাওয়া যায়।

বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খাঁ’র অন্যতম মহত্ কীর্তি হল এই মগ ও ফিরিঙ্গি জলদস্যুদের কবল থেকে এদেশের বাসিন্দাদের রক্ষা করা। ১৬৬৪ সালে বাংলার শাসনভার হাতে নিয়েই তিনি প্রথম নজর দেন এসব ইতর জলদস্যু দমনে। ১৬৬৫ সালে তিনি এদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন এবং ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রাম জয়ের মাধ্যমে তিনি এদের সমূলে বিনাশ করেন। বাংলায় অর্ধশতাব্দী জুড়ে চলে আসা ‘মগের মুল্লুকের’ অবসান ঘটে তার এই অভিযানেই। এজন্য শায়েস্তা খাঁ এদেশের মানুষের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

ঢাকা নগরীতে মগবাজার নামের সঙ্গে মিশে আছে এই মগদেরই স্মৃতি। তবে তারা এই জায়গাটি দখল করে বসেছিল, তা নয়। এই নামের উত্পত্তি কিভাবে, তা নিয়ে একাধিক মত থাকলেও সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হল, ইংরেজ আমলে আরাকান থেকে কিছু মগ ব্রিটিশ রাজের আশ্রয় কামনা করেছিল।

ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তত্কালীন ঢাকা শহর থেকে তিন মাইল উত্তরে তাদের বসবাসের ব্যবস্থা করেন। সেই মগরা যেখানে বসবাস করত, সেই এলাকাটিই এখন সবার কাছে মগবাজার নামে পরিচিত।

বস্তুত সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাংলার উপকূলীয় এলাকায় মগ-ফিরিঙ্গিদের অব্যাহত দৌরাত্ম্য সমাজ জীবনে এক অভিশাপরূপে আবির্ভূত হয়। বিশেষ করে হিন্দু সমাজে নারীদের অবস্থা করুণ পর্যায়ে উপনীত হয়। যেসব স্ত্রীলোক কোনো না কোনোভাবে মগ-ফিরিঙ্গির সংস্পর্শে আসত তারা সমাজে চরম লাঞ্ছনা ভোগ করত।’ (মোহাম্মদ আলী চৌধুরী ‘চট্টগ্রামে মগ-ফিরিঙ্গি দৌরাত্ম্য, ‘ইতিহাস অনুসন্ধান-১৫’)

ফিরিঙ্গিরা তাহার চালক এবং তাহাদের যথেষ্ট নৌকা ছিল বলিয়া, আরাকানের রাজা ইদানীং নিজের নৌকা বাংলায় পাঠাইতেন না; কেবল ফিরিঙ্গিদের দিয়া লুট করাইয়া তাহার অর্ধেক ভাগ লইতেন।’ (শিহাব উদ্দিন তালিশ ‘ফাতিয়া ই ইবরিয়া’, অনু : স্যার যদুনাথ সরকার)

‘বঙ্গের সীমান্ত আরাকান রাজ্যে (চট্টগ্রামে) পর্তুগীজ ও অন্যান্য ফিরিঙ্গি জলদস্যুরা উপনিবেশ স্থাপন করিয়াছিল। … এমন কোনো অপকর্ম ছিল না যা তারা করতে পারত না। … হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ ইত্যাদি বিষয়ে তাদের সমকক্ষ কেউ ছিল না। মুঘলদের ভয়ে ভীত আরাকানের রাজা যুদ্ধাদির প্রয়োজনে এসব ফিরিঙ্গি দস্যুদের নিজ রাজ্যের সীমান্তদেশে, চাটগাঁও বন্দরে পর্তুগীজ দস্যুদিগকে জমি দিয়া বাস করিতে অনুমতি দিয়াছিলেন। ছোট বড় নৌকার সাহায্যে উহারা প্রায়ই গঙ্গার শাখা-প্রশাখা দিয়া ৬০-৭০ ক্রোশ পর্যন্ত দেশের ভেতরে প্রবেশ করিয়া লুটপাট করিত।’ (বিনয় ঘোষ, ‘বাদশাহী আমল’ ফ্রাঁসোয়া বর্নিয়া’র ভারত ভ্রমণ বৃত্তান্তের অনুবাদ)

‘আরাকান শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় উপরোল্লিখিত ফিরিঙ্গিরা মগ জলদস্যুদের সঙ্গে এক হয়ে চট্টগ্রাম ও তৎসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় দস্যুবৃত্তি, খুন, অপহরণ ইত্যাদি মাধ্যমে বিভীষিকাময় অবস্থার সৃষ্টি করে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ১৬২১ খৃ. থেকে ১৬২৪ খৃ. সময়কালে তারা ৪২ হাজার বন্দী বঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসে।…মূলতঃ মগ-ফিরিঙ্গিদের অত্যাচারে বঙ্গের উপকূলীয় এলাকা জনশূন্য হয়ে পড়ে। … তাদের লুণ্ঠন ও অপহরণের ভয়ে এসকল এলাকার লোকে রাতে বাতি পর্যন্ত জ্বালাত না।’ (মোহাম্মদ আলী চৌধুরী, চট্টগ্রামে মগ-ফিরিঙ্গি দৌরাত্ম্য : ‘ইতিহাস অনুসন্ধান-১৫’)

‘ইসলাম খাঁ তাহার রাজধানী ঢাকায় স্থাপন করিলেন। এই মগ ও পর্তুগীজদিগকে দমন করাই তাহার এই রাজধানী পরিবর্তনের প্রধান কারণ ছিল। তৎপূর্বে প্রতাপাদিত্য মগ ও পর্তুগীজদের দৌরাত্ম্য অনেক পরিমাণে দূর করিয়াছিলেন। এমনকি ছলনাপূর্বক সন্দ্বীপের শাসনকর্তা কার্ভালোকে ধূমঘাটে (সাতক্ষীরা) আনিয়া অবিচারে নিহত করিয়াছিলেন। এই ঘটনায় পর্তুগীজদের মধ্যে মহা আতঙ্ক উপস্থিত হয়। … শায়েস্তা খাঁ (১৬৬৬ খ্রি.) মগদিগের হস্ত হইতে চট্টগ্রাম উদ্ধার করিয়া উহাকে ইসলামাবাদ নামে পরিচিত করেন।

দীনেশ চন্দ্র সেন, ‘বৃহৎবঙ্গ’ সেই মগেরা আজও বাঙালির নিকট বর্বর, অসভ্য, জলদস্যু বলিয়া পরিচিত। সেই মগ রাজাদের রাজসভায় সে সময় বঙ্গ-ভারতী অভিনন্দিত হইয়াছিলেন। কেননা সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকান রাজসভায় বাঙ্গালা ভাষা যেরূপ নানা দিক দিয়া পরিপুষ্ট হইয়া উঠিয়াছিল ইহার আপন ভূমিতে তেমনটি হয় নাই।’ (ড. এনামুল হক, ‘আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্য’)

মগদের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ

১৮২৪ সালের দিকে এই অত্যাচার চরম আকার ধারণ করে। তারপর তাদের সঙ্গে শাসক এবং সাধারণ মানুষের অনেকগুলো যুদ্ধ হয়। ১৮২৪, ১৮৫২ এবং ১৮৮৫ সালের যুদ্ধের পরে মগদের শক্তি কমে আসে। এক সময় মগদের অত্যাচার থেকে মুক্তি পায় এই ভূখণ্ডের মানুষ।

১৯৮৯ সালে আরাকানের নাম বৌদ্ধ জাতীয়তাভিত্তিক ‘রাখাইন’ রাখা হয়।

তাহলে দেখা যাচ্ছে ১৫০০ বা ১৬২৫ থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ একটা সময় এই অঞ্চলে মগ জাতি গোষ্ঠীরা যার পর নাই অত্যাচার, নির্যাতন লুটপাট চালিয়েছে। দস্যুতার মাধ্যমে সব কিছু দখল করে নিয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চল পুরোপুরি দখল করে নিয়েছিল।

আরাকানী রাজ্যের স্বর্ণযুগে মগ নামে পরিচিত অনেক আরাকানী গোষ্ঠী বাংলার চট্টগ্রাম অঞ্চলে বাস করত। বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থিত চট্টগ্রাম অতীতে একসময়ে আরাকানের অংশ ছিল, আরাকানী মগ গভর্নররা বাংলার একটা অংশকে আরাকানের উপনিবেশ হিসেবে শাসন করতেন, চট্টগ্রাম ছিল তাদের রাজধানী।

আরাকানের রাজা পার্বত্য চট্টগ্রামের বোহমং হতাউং-এ (বোমান সার্কেল) পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন করার জন্য বোহমং গোষ্ঠী-প্রধানদের নিযুক্ত করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা (থাইক জনগণ) অঞ্চল এবং ত্রিপুরা রাজ্যও সে সময় আরাকানের অংশ ছিল।

আরাকানের শাসনের সময় থেকে এখনও পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামবাসী, বিশেষ করে বান্দরবানবাসীগণ বোহমং প্রধান দ্বারা শাসিত হয়।

ষোড়শ শতাব্দীতে আরাকানী সাম্রাজ্যের উত্থানের পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী আরাকানীরা মারমা জনগণ নামেও পরিচিত ছিল। আরাকানী বংশধর হওয়ায় এই মারমারা বাংলার মানুষের কাছে মগ নামে পরিচিত।

আরাকানীরা সেই প্রাচীনকাল থেকে ভারতের পার্বত্য ত্রিপুরা রাজ্যে বসবাস করে, এছাড়াও ত্রিপুরা রাজ্যের স্থানীয় জনগণ তাদেরকে মগ বা মাঘ বলে ডাকে।

বাঙলা সাহিত্যে মগদের পৃষ্ঠপোষকতা

সুলতানি আমলের গোড়ার দিকে এবং মুঘল শাসনের প্রথমার্ধে চট্টগ্রামে আরাকান সাম্রাজ্য তথা মগদের আধিপত্য ছিল।

স্থাপত্যকলা ও শিল্প সাহিত্যে মুঘলদের কদর সারা ভারত বিখ্যাত হলেও বাঙলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা কিন্তু মুঘলরা করেনি। করেছিল আরাকান রাজসভা।

মধ্যযুগের কবি আলাওল, শাহ্ মুহম্মদ সগীর, দৌলত কাজী, মাগন ঠাকুর আরাকান রাজসভার সভাকবি ছিলেন।

সংস্কৃত, আরবি, ফার্সির মতো ‘আশরাফ’ ভাষায় রচিত সাহিত্যের কাছে বাঙলা ভাষা আদৃত হয়নি মুঘলদের দৃষ্টিতে।

সেই সময় মধ্যযুগের চট্টগ্রামের কবিরা আরাকান রাজসভাতে বসেই তাদের বিখ্যাত কাব্যগুলো রচনা করেছিলেন।

রাখাইনের সঙ্গে মগের সম্পর্ক

রাখাইনরা সুদীর্ঘকাল ধরে তাদের আবাসভূমিকে ‘রাখাইন প্রে’ নামে ডাকত। পরে ইংরেজরা দখল করে এ রাষ্ট্রকে ‘রাকান’ নামে সম্বোধন শুরু করে। এভাবে ‘রাকান’ শব্দের আগে ‘আ’ যুক্ত হয়ে তা হয়ে যায় ‘আরাকান’। রাখাইন দেশের জনগণ ‘আরাকানিজ’ নামে অভিহিত হয়। আরাকানই বর্তমান মায়ানমার।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রমতে, খ্রিস্টপূর্ব ৫ থেকে ৬ হাজার বছর আগে এই অঞ্চলে নিগ্রিতা ও দ্রাবিড়িয়ান জনগোষ্ঠী বাস করত। পরে আর্য ও মঙ্গোলীয়রা এখানে বসবাস শুরু করে। এক সময় দ্রাবিড়িয়ানরা নিগ্রিতাদের এ অঞ্চল থেকে বিতাড়িত করে। দ্রাবিড়িয়ানরা আবার সভ্য আর্য ও মঙ্গোলীয়দের দ্বারা বিতাড়িত হয়।

ফলে এ অঞ্চলে টিকে থাকা সভ্য আর্য জনগোষ্ঠী ও মঙ্গোলীয়দের সংমিশ্রণে এক সময় সৃষ্টি হয় রাখাইন জাতির।

সময়টি অষ্টাদশ শতাব্দীর চতুর্থ থেকে শেষ দশক পর্যন্ত। সে সময় আরাকান অঞ্চলটি ছিল ব্যাপক বিদ্রোহ, হত্যা ও ক্ষমতা দখলের দ্বন্দ্বমুখর এক বিপর্যস্ত রাজ্য।

অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে নিজ আমলাদের চক্রান্তে আরাকানের তৎকালীন স্বাধীন রাজা বার্মার রাজা বোদোফায়ার কাছে যুদ্ধে পরাজিত হন। ফলে বর্মীরা আরাকান দখলে নেয়। বর্মী সেনারা সে সময় অসংখ্য আরাকানি নারী-পুরুষ গ্রেপ্তার করে স্ত্রীলোকদের বার্মায় পাঠিয়ে দেয় এবং পুরুষদের হত্যা করতে থাকে।

বর্মীরা আরাকানের মহামুনি বুদ্ধমূর্তি তাদের রাজধানী মান্দালয়ে নিয়ে যায়। এতে ক্ষোভে ফেটে পড়ে আরাকানবাসী। তারা বর্মী দখলদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। বিদ্রোহ দমনে বর্মী বাহিনী নির্মম অত্যাচার চালায়। ফলে জীবন বাঁচাতে দেশ ছাড়ে রাখাইনরা।

১৭৮৪ সালের শীতের হিম হাওয়ায় মগ্ন এক রাত। আরাকানের মেঘবতী থেকে ১৫০টি রাখাইন পরিবার ৫০টি নৌকা নিয়ে বঙ্গোপসাগরে নৌকা ভাসায়। সাগর পাড়ি দিয়ে তিনদিন তিনরাত পর তারা আশ্রয় নেয় পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী দ্বীপে। সে সময় ওই দ্বীপে ছিল না কোনো জনমানব। ছিল শুধু হিংস্র জন্তু-জানোয়ার।

রাখাইনরা সঙ্গে নিয়ে আসা শস্যবীজ দিয়ে ফসল রোপণ শুরু করে। তারা হিংস্র জন্তু-জানোয়ারদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে তখন বাসগৃহের চারপাশে সুন্দরী কাঠের গুঁড়ি দিয়ে ঘিরে রাখত। বড় ছেনি আর বল্লম ছাড়া তাদের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না। তা দিয়েই তারা কৌশলে জন্তু শিকার করে তার মাংস খেত।

এক সময় এক ইউরোপিয়ান নাবিক রাখাইনদের অবস্থান খুঁজে পান। তার মাধ্যমে অন্যদের সঙ্গেও রাখাইনদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অফিসাররা তাদের জন্য বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, কাপড়-চোপড়ের ব্যবস্থা করে দেয়।

এ অঞ্চলে তখন ইংরেজ শাসন চলছে। ইংরেজরা স্বপ্ন দেখত বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা এবং আরাকান রাজ্য দখলের। তাই তারা আদিবাসী জাতিগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখত। রাখাইনরা তখন ইংরেজদের সহযোগিতায় আরাকান থেকে তাদের আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের নিয়ে আসতে থাকে।

এভাবে এদেশের মাটিতে রাখাইনদের বসতির বিস্তৃতি ঘটে। ধীরে ধীরে রাখাইনরা ছড়িয়ে পড়ে গলাচিপা, কলাপাড়া, আমতলী, বরগুনা, বানিয়াহাতী, টিয়াখালী, কুয়াকাটা, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে।

রাখাইনদের অনেকেই ‘মগ’ বলে থাকে। কিন্তু রাখাইনরা নিজেদের ‘মগ’ বলতে রাজি নয়। ফারসি শব্দ ‘মুগ’ থেকে ‘মগ’ নামের উৎপত্তি।

মুগ অর্থ অগ্নি উপাসক। ধারণা করা হয় আরাকানের আদিবাসীরা জড় উপাসক ছিল।

এ বিষয়ে গবেষক সতেন্দ্রনাথ ঘোষাল মনে করেন সংস্কৃত শব্দ ‘মগদু’ থেকে ‘মগ’ শব্দের উৎপত্তি। মগদু অর্থ জলদস্যু। তার মতে, আরাকানে কতিপয় লোক পর্তুগিজদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে পূর্ব বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলে লুটতরাজ চালাত। তাই তাদের ডাকা হতো ‘মগদু’ নামে। কালক্রমে এই মগদু বিকৃত হয়ে ‘মগ’ রূপ ধারণ করে।

এ বিষয়ে ভিন্ন মতামত দেন প্রফেসর ডি জি ই হল। তার মতে ‘মগ’ শব্দটি ‘মাঙ্গাল’ বা মঙ্গোলীয় শব্দ থেকে আসা। তিনি মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আরাকানের অধিবাসীদের চেহারাগত মিল খুঁজে পান। ডা. গ্রিয়ারসন তাকে সমর্থন করেছেন। তার মতে মগরা ইন্দোচীন জনগোষ্ঠীর একটি শাখা ছাড়া আর কিছুই নয়।

এ বিষয়ে রতন লাল চক্রবর্তী তার ‘বাংলাদেশ-বার্মা সম্পর্ক’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘মগ’ শব্দটি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তার মতে, আরাকানের মগরা পর্তুগিজ জলদস্যুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত। মগরা আরাকানের স্থায়ী বাসিন্দা হলেও আরাকানের সমস্ত অধিবাসী জলদস্যু ছিল না এবং তারা সবাই মগও নন। তার রচনায় আক্রমণকারীদের মগ এবং পরে চট্টগ্রামে আগত আরাকানিদের ‘আরাকানি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরাকানিদের মধ্যে রাখাইনরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও সে সময় আরও অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তা আরাকানে বাস করত। তথাকথিত যারা মগ বা জলদস্যু ছিল তারা রাখাইন নয় বরং অন্য কোনো ক্ষুদ্র জাতি বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া মিয়ানমার রাজ্যে ৭টি প্রদেশের মধ্যে একটি প্রদেশের নাম রাখাইন স্টেট। এটি পূর্বে আরাকান নামে পরিচিত ছিল। সে আরাকানে তথা পুরো মিয়ানমারে মগ নামে কোনো জনগোষ্ঠী এখনো নেই এবং আগেও ছিল না। কিন্তু তবুও রাখাইন আদিবাসীদের ভাগ্য থেকে বিতাড়িত হয়নি ‘মগ’ নামক অমর্যাদাকর শব্দটি।

বর্তমান অবস্থা

১৮৮৫ থেকে ২০২০ সালের আজকের এই ১৩৫ বছর পরেও মগদের সেই অত্যাচার নির্যাতন অব্যাহত আছে। মগ উপজাতি, নৃ-গোষ্ঠী বা জলদস্যুদের শিকার হয়ে বাংলাদেশ এখন আজকে শরণার্থী আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বে তৃতীয়।

গত ৫০ বছর ধরে আরাকানে এই হত্যাযজ্ঞ নির্দ্বিধায় চলমান রেখেছে মগরা। শত শত লাশ ভেসে ভেসে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে চলে আসছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন ১২ লাখের বেশী রোহিঙ্গা জাতি গোষ্ঠীর মানুষ।

বাঙালী জাতি গোষ্ঠী রোহিঙ্গা জাতি গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছে, আর মগ জাতি গোষ্ঠী এই হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে পৃথিবীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে।

পত্রিকা বলছে, “রাখাইনের গ্রামগুলো একের পর এক পুড়িয়েছে সেনাবাহিনী ও মগ নৃ-গোষ্ঠীরা। রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিয়ে গ্রামের নিয়ন্ত্রণ এখন মগদের কাছে দিয়েছে মিয়ানমারের বিজিপি। সুযোগ লুফে নিয়েছে মগরা। তাদের চ্যালেঞ্জ এখন রোহিঙ্গাদের দেশে ঢুকতে না দেওয়া, দেশে ফেরা ঠেকাতে গ্রামগুলো পাহারা দিচ্ছে মগরা। এগুলো এখন মগের মুল্লুক হয়ে গেছে। মগদের সহায়তা করতে তাদের হাতে বিভিন্ন সরঞ্জাম তুলে দিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। সীমান্তে (বাংলাদেশ সীমান্তে) মাইন পুঁতে রাখার কাজেও সেনাবাহিনীকে সহায়তা করেছে মগরা।”

(স্টাফ রিপোর্টার, ঘাটাইল ডট কম)/-